Home ফিরে এসো অনুরাগে ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩২ (৩)

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩২ (৩)

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩২ (৩)
নওরিন কবির তিশা

আঁধার আচ্ছন্ন যামিনী নিবিড় আলিঙ্গনে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে ধরিত্রীকে। নিস্তব্ধ আঙিনার বুক চিরে দূর বনস্পতির গাত্র হতে ক্বচিৎ পাখির মৃদু কলতান শ্রবণের দ্বারে করাঘাত করছে। ঝিল্লীরবপূর্ণ বাগানের কার্নিশ ঘেঁষা কক্ষটি তখন টুইংকেল আর তৃষার প্রাণবন্ত গুঞ্জনে মুখর। কিছুক্ষণ পূর্বে শাহরিয়ারের থেকে কক্ষ প্রবেশের অনুমতি শুল্ক বাবদ হাসিলকৃত অর্থের ভাগ-বাঁটোয়ারা শেষে সবে কক্ষে ফিরেই টুইংকেলকে খাওয়াতে তৎপর হয়েছে ও।
টুইংকেল ছুটছে নিজ গতিতে। আর ওর পেছনে পেছনে খাবারের থালা হাতে বৃত্তাকার পথে সমগ্র কক্ষে দৌড়িয়ে বেড়াচ্ছে তৃষা।

-‘ এইটুকু মাম্মাম একটুই তো। খেয়ে নাও সোনা।
টুইংকেল ছুটতে ছুটতে খিলখিলিয়ে হেসে বলল,-‘ না বানি।ওটা তুমি খাও। আমার ক্ষুদা নাই তো।
-‘ একটু সুইটহার্ট আমার লক্ষ্মী সোনা। এইটুকু নিলেই বানি কাল তোমাকে নিয়ে ঘুরতে বের হবে।
বেড়াতে যাওয়ার প্রতিশ্রুতিতে থেমে গেলো টুইংকেল,-‘ সত্যি তো? প্রমিস?
টুইংকেল থামতেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচল তৃষা। খানিক মুচকি হেসে ওর দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলতে চাইলো,‘প্রমিস।’কিন্তু তার আগেই কক্ষে প্রবেশ করলো আর্য। কিঞ্চিৎ গম্ভীর ওর মুখাবয়ব। তবে তৃষা বিন্দু মাত্র অবাক হলো না। কেনোনা এটাইতো মিস্টার ক্যাপ্টেনের চিরাচরিত বৈশিষ্ট্য।
-‘ কি হচ্ছে মাম্মাম? এখনও খাবার ফিনিশ হয়নি?
টুইংকেল আর্যর দিকে চেয়ে বলল,,-‘ হুম পাপা। আর একটু আছে।

-‘ তাড়াতাড়ি সেটা ফিনিশ করো,মাম্মাম। রাতে পাকিটিং আছে। কাল ফিরতে হবে তো।
আকস্মিক আর্যর মুখে ফেরার কথা শুনতেই ভ্রু কুঁচকে গেল তৃষার। বিস্মিতও হলো খানিক,,-‘ কাল ফিরতে হবে,মানে?
আর্য তৃষার বিস্মিত মুখাবয়বে চেয়ে বলল,,-‘ আ’ম আ মেরিন ইঞ্জিনিয়ার তৃষা। কাজ কর্ম বলেও তো কিছু আছে আমার নাকি?
বলতে বলতে আর্য খেয়াল করলো তৃষা মুখটা ছোট হয়ে আসছে। ও এইবার কন্ঠটা সামান্য কোমল করে বলল,,
-‘ আর এমনিতেও ছুটির টাইম ওভার আমার। হেড কোয়াটার থেকে কল আসছে। চার দিনের ভেতর জয়েন করতে হবে, তাই।
-‘ ওহ।
ছোট্ট স্বরে কথাটা বলেই তৃষা টুইঙ্কেলের দিকে এগিয়ে গিয়ে শান্ত ভঙ্গিমায় ওকে খাওয়াতে লাগলো। আর্য আড়দৃষ্টিতে চেয়ে দেখল তৃষার সংকুচিত মুখোশ্রী। ওর বিষণ্ণ মুখচ্ছবি দেখে আর্যর বুঝতে বাকি রইল না যে, এই মায়াভরা পরিবেশ ছেড়ে হঠাৎ চলে যাওয়ার খবরটা তৃষার মনে কতটা চোট দিয়েছে। হয়তো সে ভেবেছিল আরও কিছুদিন এই স্নিগ্ধ সময়গুলো তার মুঠোয় বন্দি থাকবে। আর্য কিঞ্চিৎ অপরাধবোধে ভুগলেও কর্তব্যের টানে ও নিরুপায়।

ধরণীর বক্ষ চিরে নেমে আসা সুপ্ত নিস্তব্ধতায় চারিধার এখন আচ্ছন্ন। ঝিল্লীরব ক্লান্ত হয়ে থিতু হয়েছে নিঝুম নিশীথে; ঝিরঝিরে সমীরণে পত্রপল্লবের মৃদু মর্মর ধ্বনি ব্যতীত আর কোনো স্পন্দন নেই। ধরিত্রীর থমথমে ঘুমন্ত অবয়বে প্রান্তর জনহীন। তৃষা আজ তামান্নাদের সাথে ঘুমিয়েছে তবে প্রায় দেড় ঘন্টা যাবৎ বিছানায় এপাশ ওপাশ করছে ও ঘুমের লেশ মাত্র নেই চোখে। বিরক্তিতে এবার উঠে বসলো ও।
হাত বাড়িয়ে পাশের টেবিল থেকে ফোনটা তুলে নিয়ে ডেটা অন করতেই স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। আর ঠিক তখনই তৃষার হৃদস্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। ‘সেইলিং কিং’ নামটার পাশে সবুজ বিন্দুর সংকেত দিচ্ছে আর্য এখন অনলাইনে।
তৃষা দ্রুত সময়ের কাটায় তাকাল। একটা বেজে পাঁচ মিনিট। ওর কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল। এই মানুষটা কি তবে ওর মতোই অনিদ্রার দহনে পুড়ছে? নাকি ওপাশ থেকে অন্য কারো সাথে শব্দের মায়াজাল বুনছে? কৌতূহল আর কিঞ্চিৎ ঈর্ষার মিশ্রণে তৃষার আঙুলগুলো কিবোর্ডে সচল হলো। ও লিখে পাঠালো,

-‘ এত রাতে লাইনে যে?
তৃষা ঈষৎ বিড়ম্বনায় ভুগছিল এত রাতে মেসেজের প্রত্যুত্তর আদেও পাওয়া যাবে কিনা তবে ওকে অবাকের চূড়ান্তে পৌঁছে মেসেজটা সেন্ড হওয়া মাত্রই ‘Typing…’ লেখাটা ভেসে উঠল। তবে তৃষার চিন্তার রেশ বিন্দুমাত্র না কমে বরং দ্বিগুণ হলো। কিছুক্ষণের মাঝেই আর্য লিখে পাঠালো,,
-‘ ঘুম আসছে না।
-‘ রিজন?
-‘ বউ নাই পাশে।
আর্যর এমন অকপট উত্তরে তৃষা বিস্ময়ের চূড়ান্ত সীমা চূর্ণ করে তাজ্জব বনে গিয়েছে। ওর হৃৎপিণ্ড যেন পাঁজরের ভেতর রীতিমত ড্রাম বাজাচ্ছে উত্তেজনায়। ও বিমূঢ় নেত্রে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল খানিকক্ষণ। এই কি সেই পাথরের মূর্তির মতো গম্ভীর আর্য এহসান? যে লোকটা সামনে থাকলে নাথিং ছাড়া কথা বলে না, সে ইনবক্সে এমন? অতঃপর তৃষা নিজেকে সামলে নিয়ে টাইপ করল,

​-‘ ও বাবা! তা সিলিং কিং ম্যারিড নাকি? আগে তো জানতাম না। তা আপনার বউ কোথায়? বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন বুঝি?
​প্রতিউত্তরে আর্যর ‘Typing…’ লেখাটা দেখে তৃষার উত্তেজনায় হাত কাঁপতে লাগল। ওপাশ থেকে মেসেজ এল,
​-‘ আরে না ম্যাম! আমি সিঙ্গেল, একদম পিওর সিঙ্গেল।
​তৃষা বিস্ফোরিত নয়নে চেয়ে রীতিমতো দাঁত কিড়মিড়ালো। মনে মনে বলল,
‘ওরে মিথ্যাবাদী রে! শা’লা কি মিথ্যা বলে রে! বেড়া সারাক্ষণ সবার সামনে সি ইজ মাই ওয়াইফ ওয়াইফ করে অনলাইনে এসেই সিঙ্গেল! শা’লা ড্যাশ, ড্যাশ,ড্যাশ। তোর বউ থাকবে না শা”লা। না না আমিই তো ওর বউ কি বলি! ধুর!
ও তড়িঘড়ি করে লিখল,

​-‘ তাই নাকি? তার মানে আপনি একদম সিঙ্গেল? তাহলে একটু আগে যে বললেন বউ পাশে নেই তাই ঘুম আসছে না, ওটা কি তবে আসমান থেকে আমদানি করেছেন?
​আর্য এবার এক বাঁকা হাসির ইমোজি পাঠিয়ে লিখল,
​-‘ ওটা তো জাস্ট রূপক অর্থে বলা ম্যাম। আসলে আমার মতো দুর্ভাগা মানুষের কপালে কি আর বউ জোটে? যাদের পাশে কেউ নেই, তাদের কল্পিত বউ ই ভরসা।
তৃষা রাগে ফেটে পড়েছে। রাতবিরেতে আর্যর এমন মিথ্যাচারে ইচ্ছা করছে রান্নাঘর থেকে বটি নিয়ে গিয়ে ওর গলার কাছে ধরে বলতে,-‘ শা’লা বল তোর ঘরে একটা সুইট কিউটনেস ওভারলোডের বউ আছে। নাম তৃষা নেওয়াজ স্যরি তৃষা আর্য এহসান।
কিন্তু আফসোস পারলো না; ফোনটা এক প্রকার বিছানায় আছাড় মারতে গিয়েও সামলে নিল। দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে গজগজ করতে করতে টাইপ করল,
-‘ ওহ আচ্ছা।
তৃষা এবার ক্ষিপ্ত মেজাজে ফোনটা রাখার জন্য ডেটা অফ করতে যাবে ঠিক তখনই আর্যর আরেক বিব্রতকর মেসেজে চোখ মুখ খিঁচে আসলো ওর,

-‘ তা আপনি এত রাতে লাইনে কি করছেন মিস? বয়ফ্রেন্ড-ঠয়ফ্রেন্ড আছে নাকি?
তৃষা যেন উত্তর দিতে ভুলে গেল। কি বলবে ও? ইচ্ছা তো করছে..! না থাক ও কথার ইতি টানতে বলল,,
-‘ না। নাই।
তবে ওকে যেন আজকে কিছুতেই ছাড়তে নারাজ। ও ফের টাইপ করলো,,
-‘ তাহলে কি হাজবেন্ড আছে?
তৃষা দাতে দাত চেপে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। ভাবল একবার বলেই দেয়,,
-‘ হ্যাঁ, আছে! এক পিস মেকি গম্ভীর রোবট বর আছে আমার!
কিন্তু পরক্ষণেই নিজের জেদ চেপে ধরল ও। আর্য যেহেতু নিজেকে সিঙ্গেল দাবি করছে, তবে ও-ও কেন পিছিয়ে থাকবে? ও আঙুল চালিয়ে টাইপ করল,
​-‘ না, হাজব্যান্ডও নেই। একাই তো বেশ আছি। কেন, আপনার কি মনে হয় আমার মতো মেয়েদের পাশে কেউ থাকা খুব জরুরি?
​ওপাশ থেকে আর্যর রিপ্লাই আসতে এক মুহূর্ত দেরি হলো না,
​-‘ জরুরি কি না জানি না, তবে আপনার মতো মেয়ের পাশে কেউ না থাকাটা তো প্রকৃতির বড় অবিচার। যে আপনার পাশে থাকবে, তাকে তো সারাদিন আপনার বকবকানি সামলাতেই হিমশিম খেতে হবে। ভাগ্যিস কেউ নেই, বেঁচে গেল লোকটা!
​তৃষা বিছানায় শুয়ে পা দাপাতে লাগল রাগে। মনে মনে বলল,

-‘ ওরে আমার দয়াশীল রে! বেঁচে গেল মানে? আমাকে সামলানো বুঝি এতই কষ্টের? দাঁড়ান মিস্টার ক্যাপ্টেন, আপনার এই বেঁচে যাওয়া আমি বের করছি!
ও ক্ষিপ্ত হয়ে লিখল,
​-‘ বাঁচল কি না সেটা তো সময়ই বলবে। তবে মিস্টার, আপনার এই অন্যের জন্য মায়াকান্না দেখে তো মনে হচ্ছে আপনি নিজেই কাউকে সামলাতে গিয়ে ছ্যাঁকা খেয়ে ব্যাঁকা হয়ে বসে আছেন। তাই বুঝি একা থাকার গুণগান গাইছেন?
​আর্য এবার একটা হাসির ইমোজি পাঠিয়ে লিখল,
​-‘ ছ্যাঁকা খাওয়ার মতো কপাল কি আর আমার আছে ম্যাম? তবে হ্যাঁ, একটা অবাধ্য মানবীর পাল্লায় যদি কোনোদিন পড়ি, তবে হয়তো..!
-‘ হয়তো ?
-‘ কিছু না। তা আপনার কী মনে হয়? আমার কপালে কি তেমন কেউ জুটবে?
​তৃষা বালিশটা কামড়ে ধরে বিড়বিড়িয়ে বলল,
-‘ জুটবে মানে? অলরেডি জুটে বসে আছে, শুধু আপনার মত বেত্তমিজ লোক সেটা স্বীকার করে না!
ও ফোনটা একপাশে সরিয়ে রেখে ডেটা অফ করে দিল। আর কথা বাড়ালে হয়তো রাগের মাথায় নিজের পরিচয়ই ফাঁস করে দেবে। এদিকে হুট করে ওকে অফলাইনে চলে যেতে দেখে মুচকি মুচকি হাসলো আর্য। মূলত এই সময়টারই অপেক্ষায় ছিল এতক্ষণ, যখন তৃষা নিজে থেকেই বিরক্ত হয়ে নেট অফ করবে। হাসির এক পর্যায়ে ও আনমনে বলল,,
-‘ গেম অন ম্যাডাম! দেখি কতক্ষণ আপনি এটা চালাতে পারেন?

বিদায়বেলা সর্বদাই বড্ড ব্যথাতুর যা আনন্দঘন মুহূর্তগুলোকে এক নিমেষে ম্লান করে দেয়। সর্বদা কলহাস্যে মুখরিত তালুকদার মঞ্জিলের প্রাঙ্গণে আজ কেবলই গুমট নীরবতা। রোদেলা সকালটাও যেন আজ বড় বেশি ম্লান, যেন এই প্রাচীন অট্টালিকার প্রতিটি ইট-পাথর প্রিয়জনদের প্রস্থানের পদধ্বনি শুনে ব্যথায় গুমরে মরছে।
​প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে লটবহর। যাওয়ার প্রস্তুতি চূড়ান্ত। বড়দের চোখের কোনে পানি জমেছে কিঞ্চিৎ, নবকুড়িদের চঞ্চলতা আজ স্থবির‌। জাহানারা বেগম অশ্রুসিক্ত নয়নে বারংবার তৃষার মাথায় হাত রেখে দোয়া করছিলেন সায়রা বেগম তৃষাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন,

​-‘ মা, আবার আসিস কিন্তু। তুই না থাকলে এই বিশাল বাড়িটা বড্ড খাঁ খাঁ করবে।
​গলার কাছে কান্নারা দলা পাঁকিয়ে আসায় মিথ্যা হাসির প্রচেষ্টায় ‌ব্যর্থ হলো তৃষা। তামান্না,রায়া আর রাইসা তো রীতিমতো চোখের পানি মুছতে ব্যস্ত। তামান্না জড়িয়ে ধরে করে বলল,
-‘ ভাবি, গিয়েই কিন্তু মেসেজ দিবা। ভীষণ মিস করবো তোমাকে।
তৃষা ওর পিঠে হাত বুলালো,-‘ আমিও খুব মিস করবো তোমাদের ডিয়ার।
​বিষন্ন মেহসানা অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে রাইসা এগিয়ে এসে ওর হাত ধরে বলল,
-‘ মেহু আপু, তোমার ওই বকবকানি খুব মনে পড়বে।
​তৃষা চোখ ঘুরিয়ে আর্যকে খুঁজতে চাইল। দেখল আর্য শাহরিয়ারের সাথে এক কোণে দাঁড়িয়ে গম্ভীর মুখে কিছু প্রয়োজনীয় কথা সারছে। ওর মুখাবয়বে বিচ্ছেদের কোনো লেশমাত্র নেই। তবে কথোপকথনের মাঝে মাঝেই সাধারণের অলক্ষ্যে ওর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তৃষার দিকে আছড়ে পড়ছিল।
টুইংকেল এতক্ষণ যাবৎ সবার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল, ও ঠিক বুঝতে পারছিল না কেন সবার মুখগুলো এমন থমথমে। ও আর্যর পাঞ্জাবির কোণা ধরে টান দিয়ে বলল,

-‘ পাপা, দাদিয়ারা কাঁদছে কেন? আমরা কি আবার আসব না?
আর্য টুইংকেলকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
-‘ আসব তো মাম্মাম। এখন চলো, আমাদের অনেকটা পথ যেতে হবে।
ধীরে সবাই যার যার নির্ধারিত গাড়ির দিকে অগ্রসর হলো।​মেহেসানা, সাবরিনা আর মৃত্তিকা উঠে বসল আদ্রিয়ানের গাড়িতে। অন্যদিকে হামিদা বেগম আর আর্যর বাবা-মা উঠলেন অন্য একটি বড় গাড়িতে। তাদের চোখেমুখের ‌মলিনতায় প্রিয়জনদের ছেড়ে যাওয়ার বেদনা স্পষ্ট।
​সবশেষে আর্যর কালো রঙের গাড়িটা স্টার্ট নিল। পেছনের সিটে টুইংকেল আর তৃষা পাশাপাশি বসা। আর্য স্টিয়ারিং হুইলে হাত রেখে আয়নায় একবার তৃষার বিষণ্ণ মুখচ্ছবিটা দেখে নিল। টুইংকেল জানালার পাশে বসে হাত নেড়ে সবাইকে বিদায় দিচ্ছিল,

-‘ টা-টা দাদিয়া! টা-টা পিপি!
​গাড়িটা যখন তালুকদার মঞ্জিলের বিশাল গেট পার হয়ে মূল রাস্তায় পড়ল, তৃষা শেষবারের মতো পেছনের দিকে তাকাল। আর্য ড্রাইভ করতে করতে খুব শান্ত স্বরে বলল,
-‘ মন খারাপ করবেন না তৃষা। জীবনটা তো আসলে একটা সফর, যেখানে প্রতিটা স্টেশনে কাউকে না কাউকে বিদায় দিতেই হয়।
​তৃষা ওর কথার পিঠে কোনো উত্তর দিল না, শুধু উদাস নয়নে বাইরের দ্রুত ধাবমান গাছপালার দিকে চেয়ে রইল। ​গাড়িটা এগিয়ে চলল রাজপথের উদ্দেশ্যে।

বিসর্পিল রাজপথের বুক চিরে আর্যর কালো গাড়িটা তীরের বেগে ধাবমান। দীর্ঘক্ষণ যাবৎ নিস্তব্ধতা বিদ্যমান গাড়ির ভেতর , তৃষা জানালার বাইরে দ্রুতবেগে ধাবমান ধূসর দিগন্ত আর সবুজ বনানীর দিকে চেয়ে নিজের বিষণ্ণতাকে প্রশমিত করার ব্যর্থ চেষ্টায় লিপ্ত। ​হঠাৎ নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করল টুইংকেল। ও তৃষার কোলের ওপর মাথা রেখে শুয়ে থেকে হুট করে বলে উঠল,
-‘ বানি, মনটা একদম ভালো নেই। মিষ্টি দাদিয়াদের ওখান থেকে চলে এলাম, এখন খুব বোরিং লাগছে। তুমি আমাকে একটা গান শোনাবে?
​তৃষা টুইংকেলের কপালে হাত বুলিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
-‘ সোনা, আমার তো গলা ভেঙে গিয়েছে। অন্য কিছু শোনাই?
​টুইংকেল উঠে বসল। আর্যর দিকে তাকিয়ে আবদার করল,
-‘ পাপা, বানি গান গাইবে না। তুমি গাও না!
​আর্য স্ট্রিয়ারিং হুইলে হাত রেখে আয়নায় একবার তৃষার দিকে চাইল। তৃষা তখন কৌতূহলী দৃষ্টিতে আয়নায় আর্যর চোখের দিকে নিবদ্ধ। আর্যর সেই নীলচে-ধূসর চাউনি আজ কিঞ্চিৎ নমনীয়। ও এক হাত পেছন দিকে বাড়িয়ে টুইংকেলের গাল ছুঁয়ে মৃদু হাসল। কিছুক্ষণের মাঝে কোনো ভূমিকা ছাড়াই আর্যর ভরাট, গম্ভীর কণ্ঠস্বর কক্ষের নিস্তব্ধতা চিরে ঝঙ্কৃত হলো,

🎶 এই ভালো এই খারাপ…
ওও প্রেম মানে মিষ্টি পাপ…
চলো মানে মানে দিয়ে ফেলি ডুব….
তুমি আমি মিলে….
দুজনেই মনটাকে…
ও ও বেঁধে ফেলি সাতপাকে….
চলো ছোটখাটো করি ভুলচুক…
তুমি আমি মিলে….
সাজিয়েছি ছোট্ট এক ফালি সুখ….
রাজি আছি আজকে বৃষ্টি নামুক….
তুমি আমি ভিজবো দুজনে খুব….
ভরসা দিলে…..🎶

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩২ (২)

আর্যর কণ্ঠে গানের প্রতিটি কলি তৃষার হৃদপিণ্ডে যেন অননুভূত এক কম্পন সৃষ্টি করল। ও বিস্ময়াভিভূত হয়ে আর্যর সেই বলিষ্ঠ পিঠের দিকে তাকিয়ে রইলো পরক্ষণেই দ্রুত আয়নায় আর্যর চোখের দিকে নজর দিল। আর্যও ঠিক সেই মুহূর্তেই আয়নায় তৃষার চোখের মণি বরাবর দৃষ্টি নিবদ্ধ করল। দুজোড়া চোখের সেই নীরব সংঘর্ষে তৃষা যেন নিজেকে পুরোপুরি হারিয়ে ফেলল। ও কিঞ্চিৎ অপ্রস্তুত হয়ে তড়িঘড়ি করে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো, কিন্তু ওর রাঙা কপোলদ্বয় আর ঠোঁটের কোণের ওই সূক্ষ্ম হাসিটা আর্যর নজর এড়ালো না।

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩৩

1 COMMENT

Comments are closed.