Home ফিরে এসো অনুরাগে ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩
নওরিন কবির তিশা

তৃষা তৎক্ষণাৎ দেওয়াল হাতরে প্রকম্পিত আঙুলের ডগা দ্বারা সুইচ অন করল। উজ্জ্বল আলো উদ্ভাসিত হলো কক্ষজুড়ে। আকস্মিক উজ্জ্বলতায় চোখ মুদে আসলো তৃষার। পরক্ষণেই সে মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় তাকালো সামনে বসা ছোট্ট মেয়েটির দিকে। একটা ফটো ফ্রেম বক্ষে আগলে বসে আছে মেয়েটি।
পিঠ অবধি জড়ানো বাদামি চুলের অধিকারী বার্বি ফ্রক পরিহিত ফর্সা মেয়েটি বড্ড গোলুমোলু‌। তুলতুলে বিড়ালের ছানার ন্যায় গড়নের বাচ্চাটাকে দেখলেই ইচ্ছা করবে ছুট্টে গিয়ে আদর করতে। তৃষা আমার ছোট্টবেলা থেকেই বড্ড বাচ্চা প্রেমি। বাচ্চা দেখলে মাথা কাজ করে না তার, আর যদি হয় এমন কিউট একটা মেয়ে তাহলে তো কথাই নেই।
সে এক প্রকার দৌড়ে গেল মেয়েটির কাছে। হাঁটু মুড়ে মেয়েটির সম্মুখে বসে বলল,,

—‘কিউটি!
সে বাচ্চা মেয়েটির তুলতুলের চোয়ালে আদর করতে যেতেই মেয়েটি তৎক্ষণাৎ ঘুরিয়ে নিল। বাচ্চাদের থেকে সচরাচরে এমন আচরণ পেতে অভ্যস্ত নয় তৃষা। কিঞ্চিৎ বিস্মিত হয়ে সামান্য হাসলো সে। তবে হাল ছাড়লো না, ভাব জামাতে ফের বললো,,
—‘কিউটি পাই?
মেয়েটি তাকালো না তবুও। তৃষা পুনরায় বলল,,
—–‘তোমার নাম কি সুইট ক্যান্ডি?
তুলতুলে মেয়েটি এবার মুখ তুলে চাইল, কি ডাগর তার চোখগুলো। তবে মনি দুটো হালকা নীলাভ। তৃষা মিষ্টি হাসতেই মেয়েটির কিছুটা গম্ভীর স্বরে বলল,,

—-‘ছিফরা,ছিফরা ইয়ারিন!
তৃষা মেয়েটির নরম মিষ্টি কন্ঠে হেসে বলল,,—‘ওওহ, স্নিগ্ধ একটা নাম. তোমার মতোই কিউট।
তৃষা দুহাত বাড়িয়ে ছিফরার তুলতুলে চোয়ালে হাত বুলালো। সস্নেহে আরো কিছু বলতে যাবার পূর্বেই পিছন থেকে ডাক দিলো কেউ একজন।
—-‘আরে টুইংকেল? তুমি এখানে আমি তোমাকে সারা বাড়ি খুজছি।
তৃষা পিছন ঘুরে দেখল খাবারের বাটি হাতে দাঁড়িয়ে আছে ঝুমা। মেয়েটি এই বাড়ির পরিচারিকা; বড্ড বন্ধুত্বসুলভ। তার কাছেই তৃষা প্রত্যেকের গল্প শুনেছে এই এক মাসে। আর তার জানামতে টুইংকেল আর্যর মেয়ে, মেয়েটা বড্ড ঘর কুনো আরবি কত মাসে তৃষার ব্যস্ততার দরুন তার সাথে দেখা করতে পারিনি তৃষা। তার মানে কি এই আর্যর মেয়ে? তবে মেয়েটি কে বলল তার নাম ছিফরা।

‘ওহ তুমি টুইংকেল? টুইংকেল টুইংকেল লিটল স্টা…!’—-তৃষার কথাটা শেষ হলো না।ও কিছু বুঝে ওঠার আগেই, ছিফরা পাশের টি-টেবিল থেকে ভারী পিতলের একটি শোপিস তুলে নিল।ঝুমা আর্তনাদ করে ওঠার আগেই ছিফরা সজোরে শোপিসটা ছুঁড়ে মারল তৃষার কপাল লক্ষ্য করে। নিখুঁত নিশানায় সেটা তৃষার কপালে বিঁধল। একটা তীক্ষ্ণ যন্ত্রণায় তৃষার মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল, চোখের সামনে সব যেন অন্ধকার হয়ে আসছে। কপালে হাত দিতেই দেখল, আঙুলের ডগা বেয়ে উষ্ণ গাঢ় র*ক্ত গড়িয়ে পড়ছে।
ঝুমা হাতের বাটিটা টেবিলের ওপর রেখেই ছুটে এলো। ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া গলায় চিৎকার করে উঠল,,

—‘ হায় খোদা! একি করলে টুইঙ্কেল মনি? একি কাণ্ড!
ছিফরা তখন নির্বিকার, যেন কিছুই হয়নি। সে আবার সেই ফটো ফ্রেমটা বক্ষে চেপে ধরে জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে বসল। ঝুমা আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। তৃষার হাত ধরে এক প্রকার টেনে ঘর থেকে বের করে নিয়ে গেল। যেতে যেতে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল,,
—-‘চলো আপু তোমাকে ড্রেসিং করিয়ে দেই!
র*ক্তের ধারা তখন তৃষার গাল বেয়ে নিচে নামছে। ব্যথায় কুঁচকে যাওয়া চোখে সে শেষবার ছিফরার দিকে তাকাল। এইটুকুন একটা মেয়ের মনে কিসের এতো বিষাদ, কিসের এতো ক্ষোভ? তৃষার মনে হলো, শরীরের এই ক্ষতটার চেয়েও ওই ছোট্ট মেয়েটার নীরবতা অনেক বেশি ভয়ংকর।

ক্যাপ্টেন আর্য এহসানের নিজস্ব কেভিনের প্রকোষ্ঠে তখন এক পশলা নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। আর্য ইজি চেয়ারটায় গা এলিয়ে বসে আছে।দুপুরের এই বিরতিটুকুই তার সারাদিনের ব্যস্ততার মাঝে এক চিলতে অবকাশ। কক্ষটি বেশ সুবিন্যস্ত; দেয়াল ঘেঁষে সারিবদ্ধ বইয়ের তাক, যেখানে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভারী ভারী সব গ্রন্থের সহাবস্থান। এক কোণে একটি ইনডোর প্ল্যান্ট থেকে লতানো সবুজ পাতাগুলো যেন ঘরের কৃত্রিমতায় প্রাণের স্পন্দন যোগাচ্ছে।
আর্যর সম্মুখেই এক কাঁচের জানালা, বিস্তৃতির যত সামান্য হলেও তা দিয়ে স্পষ্ট দেখা যায় সমুদ্রের অজস্র জলকেলিগুলো। বাতাসের মৃদু হিল্লোলে জলের ওপর যে ছোট ছোট ঢেউয়ের সৃষ্টি হচ্ছে, তাতে প্রতিফলিত আলোকরশ্মিগুলো স্ফটিকের ন্যায় দ্যুতি ছড়াচ্ছে। আর্য আনমনে সেই নীলাভ জলের কম্পনের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার চোখের দৃষ্টিতে এক বিষণ্ণ গাম্ভীর্য। বাইরের সেই শান্ত সৌন্দর্য কি তার মনের ভেতরকার বিক্ষুব্ধ ঢেউগুলোকে স্থির করতে পারছে? পারেনি হয়তো।

আনমনেই এমন চিন্তনকালে হুট করেই পাশে থাকা ইলেকট্রনিক যন্ত্রটার মৃদু কম্পন নিজের উপস্থিতি জানান দিল এর সঙ্গে ছেদ ঘটালো আর্যের চিন্তার। বিরক্তিতে কিঞ্চিৎ ভ্রু কুঞ্চনপূর্বক আর্য অবহেলিত দৃষ্টিতে তাকালো ফোনটার দিকে। প্রায় শ’খানেক আনরিড ম্যাসেজ এসে উপস্থিত হয়েছে।
বলাবাহুল্য,‌ক্যাপ্টেন আর্য এহসান এই মায়াবী অন্তর্জালের জগতে বিচরণ করতে বড্ড বিমুখ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা মেসেঞ্জারের এই চটুল হাতছানি তাকে কখনোই সেভাবে টানেনি। দিনের পর দিন, হয়তোবা সপ্তাহের পর সপ্তাহ পার হয়ে যায়, তার ওই নীলরঙা অ্যাপটিতে প্রবেশ করা হয় না। আজ জানালার ওপারের ওই টলটলে নীল জলরাশি দেখতে দেখতেই কি জানি এক অদম্য কৌতুহলে সে নিজের ফোনটা হাতে নিল। লগ-ইন করতেই যেন বিস্ময়ের এক পশলা ঝাপটা এসে লাগল তার চোখে।

অজস্র বার্তার ভিড়। কয়েক সপ্তাহের জমানো কয়েকশ বার্তা একে একে ফোনের পর্দায় ভেসে উঠছে। যেন এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বাঁধভাঙা জলস্রোত আছড়ে পড়ছে। আর্য নিস্পৃহ চোখে স্ক্রল করে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎই তার আঙুল দুটো থমকে গেল একটি বিশেষ নামের ওপর। অন্য সবার চেয়ে এই একটি মানুষের বার্তার সংখ্যা যেন একটু বেশিই অসমঞ্জস। শুধু বেশি নয়, বরং বলা চলে অকল্পনীয়।
প্রায় এক হাজারের ওপর না-পড়া বার্তার পাহাড় জমে আছে ওই একটি চ্যাটবক্সে। মেয়েটি যেন এক বিরামহীন কথক, যে প্রতিদিন আপন মনে নিজের কথাগুলো এখানে জমা করে রেখে গিয়েছে। আর্যর মতো গম্ভীর আর হিসেবি মানুষের মনেও এবার কিঞ্চিৎ কৌতুকের উদয় হলো। সে ভ্রু কুঁচকে কি যেন ভাবল অথবা নিজের অজান্তেই এক বুক কৌতূহল আর সামান্য বিস্ময় নিয়ে আর্য সেই চ্যাটবক্সের অন্দরমহলে প্রবেশ করল। পর্দার উজ্জ্বল আলোয় ভেসে উঠল সেই মেয়েটির অজস্র না-বলা প্রলাপের ভিড়।

প্রথম মেসেজটা এমন,,‘এই যে মিস্টার? আপনি নিজেকে কি মনে করেন হ্যাঁ? অনেক দামি কেউ (যদিও আমার জন্য একটি স্পেশাল) তাই বলে এরকম করে মানুষকে ঝুলিয়ে রাখবেন? কতগুলো মেসেজ দিয়েছি আপনাকে হ্যাঁ! একবারও রিপ্লাই তো দেননি ‌সিন করার প্রয়োজনও করেনিই । সাচ আ হার্ডলেস পার্সন! বাট ইউ নো মিস্টার? আপনি যতদিন চিন্তা করবেন আমি ততদিনই আপনাকে এভাবেই মেসেজ দিতেই থাকব, দেখি কতদিন সিন না করে পারেন।
এরকমই হাজারটা মেসেজ জমা রয়েছে ইনবক্সে। অন্যদের কাছে এটা ইন্টারেস্টিং মনে হলেও ক্যাপ্টেন আর্যর মত পেশাদারী ব্যক্তিত্বের কাছে নেহাতই ন্যাকামো হিসেবে গণ্য হয়েছে। তাই আর্য আর বাকি গুলো পড়লো না এক প্রকার বিরক্তিকে ফোনটা ছুঁড়ে মারল বিছানায়।

ড্রেসিং করা শেষ করে ঝুমা যখন তৃষার কপালে শেষ ব্যান্ডেজটা এঁটে দিল, তখনও তৃষা পাথরের মূর্তির মতো নিশ্চুপ হয়ে আছে। কপালে চিনচিনে ব্যথাটা মাঝেমধ্যেই দপদপিয়ে উঠছে, কিন্তু তার চেয়েও বড় দহন চলছে তৃষার মনে। এইটুকু একটা মেয়ে, অথচ তার দুচোখে কী গভীর হাহাকার!
ঝুমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানার চাদরটা ঠিক করতে করতে বলল—
— “আপা, ব্যথাটা কি খুব বেশি হচ্ছে? একটু শুয়ে পড়েন দেখি।”
তৃষা উত্তর দিল না। সে তখনো শূন্য দৃষ্টিতে মেঝের দিকে তাকিয়ে ছিল। অবশেষে নিজের ভেতরকার কৌতূহলকে অবদমিত করতে ব্যর্থ হয়ে প্রশ্নাত্মক কন্ঠে সে শুধালো,,
—’আচ্ছা ঝুমা?ওইটুকু একটা মিষ্টি মেয়ে এমন হিংস্র কেন হয়ে উঠল বলো তো? আমি তো ওকে শুধু ভালোবেসে একটা নাম ধরে ডেকেছিলাম। টুইংকেল আমার সাথে এমন করল কেন?
ঝুমার হাতের কাজ থেমে গেল। সে কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে তৃষার জিজ্ঞাসু দৃষ্টির দিকে চেয়ে রইল। হঠাৎ এক বিষণ্ণ হাসি তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল। সে তৃষার পাশে বসে ধীর স্বরে বলতে শুরু করল,

—’ও আসলে আগে এমন ছিল না আপু। আজকের এই চুপচাপ টুইংকেলই ছিল বাড়ির প্রাণ। সারা বাড়ি ওর দুষ্টুমি আর হাসিতে মুখর হয়ে থাকত। যে ছোট ছোট নীল চোখদুটো দেখে আপনি আজ ভয় পেলেন, ওগুলো দিয়েই ও সবাইকে মায়ার জালে বেঁধে রাখত। ঠিক যেন আকাশ থেকে নেমে আসা কোনো ছোট্ট এক তারা।
তৃষা উৎসুক হয়ে চাইল। ঝুমা বলতে লাগল,,
—‘ওর মা ওকে বড় ভালোবেসে ‘লিটল স্টার’ বলে ডাকতেন। যখনই মেয়েটা দুষ্টুমি করত, মাহেরিন আপু ওকে বুকে টেনে ওই নাম ধরে গান শোনাতেন। ওই নামটার সাথে ওর মায়ের অস্তিত্ব জড়িয়ে আছে আপু। কিন্তু বছর খানেক আগে সেই মা যখন না-ফেরার দেশে চলে গেলেন, মিষ্টি টুইংকেলটাও যেন বদলে গেল। হঠাৎ করেই হাসিখুশি চঞ্চল মেয়েটা পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। এখন কেউ ওকে ওই নামে ডাকলে ওর মায়ের বিরহ সইতে পারে না ও। মনে হয়, কেউ ওর বুকের ভেতরের সেই দগদগে ঘা-টা উপড়ে দিচ্ছে। সেই থেকেই ও ঘরকুনো হয়ে গেছে, কাউকে সহ্য করতে পারে না। আজকের এই আঘাতটা আসলে তোমাকে নয় আপু, ও ওর ভেতরের ওই অসহ্য যন্ত্রণাটাকেই বাইরে ছুঁড়ে দিয়েছে।
তৃষা শুনল আর স্তব্ধ হয়ে রইল। ছিফরার ওই রুক্ষ আচরণের আড়ালে যে এতো বড় এক শূন্যতা লুকিয়ে আছে, তা সে কল্পনাও করতে পারেনি। মেয়েটার ওই ফর্সা গোলুমোলু মুখটা তৃষার চোখের সামনে আবার ভেসে উঠল, তবে এবার আর বার্বি ডলের মতো নয়, বরং এক মাতৃহীন একাকী রাজকন্যার মতো।

পরদিন সকাল বেলা; ভোরের আলো সবে কিঞ্চিত পরিসরে ফুটতে শুরু করেছে। সারারাত এক দীর্ঘ চিন্তা আর কপালের চিন চিন সেই ব্যথার দরুন প্রায় একপ্রকার নির্ঘুম কেটেছে তৃষার। তাই ভোরবেলাতেই চোখটা লেগে এসেছিল সবে, ঠিক তখনই বিকট শব্দে তন্দ্রা টুটলো তার বিরক্তিতে ভ্রুকুটি পূর্বক দৃষ্টিতে সে বালিশের পাশে হাতড়ে ফোনটা তুলে নিল সে। স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল তার প্রাণের সখী মেহসানার কল। এই অসময়ে মেহসানার ফোন মানেই কোনো না কোনো জরুরি হাহাকার অথবা নিছক পাগলামি।
তৃষা চোখের পাতা কোনোরকমে মেলে ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে মেহসানার উত্তেজিত কণ্ঠ ভেসে এল,,
—‘কিরে তৃষু! তুই কি এখনো কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমাচ্ছিস? আমি এদিকে উত্তেজনায় শেষ হয়ে যাচ্ছি আর তুই অঘোরে ঘুমিয়ে আছিস?
তৃষা ভাঙা গলায় জবাব দিল,,,

—-‘তোর কি কাণ্ডজ্ঞান কোনোদিন হবে না মেহু? ভোর ছয়টা বাজে এখন! কী এমন রাজকার্য উদ্ধার করলি শুনি?
মেহসানা যেন শোনার পাত্রই নয়, সে মহাউল্লাসে বলল— —-‘আরে ধুর, আগে শোন! দ্য সেইলিং কিং একাউন্ট টা কাল প্রায় দুই মাস পর লাইনে এসেছিস তুই চেক করেছিস?”
দ্য সেইলিং কিং’ নামটা শুনতেই তৃষার ঘুম এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল। কপালের ব্যান্ডেজটার জায়গায় যেন নতুন করে স্পন্দন অনুভূত হলো। সে ধপ করে বিছানায় উঠে বসে বলল,,
—‘আর ইউ সিরিয়াস মেহু?
—‘তা নয়তো কি?শোন…উমমম… আচ্ছা একটা কলেজে আসতে পারবি তাহলে সামনাসামনি বলতে পারতাম!

তৃষার ‌ওষ্ঠপ্রান্তে হ্যাঁ’ শব্দটি এসেও যেন থমকে গেল। এক মুহূর্তের জন্য জানালার বাইরে উদীয়মান সূর্যের রক্তিম আভার দিকে চেয়ে সে স্তব্ধ হয়ে রইল। মেহসানার উচ্ছ্বাস তাকে টানলেও, তার অন্তরাত্মার গহীনে এক অদ্ভুত দায়বদ্ধতার সুর বেজে উঠল। যার উত্তর খুঁজতে সে কাল সারাটি রাত নির্ঘুম কাটিয়েছে।
মেহসানা ওপাশ থেকে তাগাদা দিয়ে বলল,,,—‘কিরে, চুপ করে আছিস কেন? চলে আয় না দ্রুত!
তৃষা মৃদু এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার মনে হলো, যে প্রদীপের শিখা কাল এক ঝটকায় তার কপাল র’ক্তা’ক্ত করে দিয়েছে, সেই শিখাটি আসলে নিভে যাওয়ার যন্ত্রণায় ছটফট করছে।মাতৃহীন সেই একাকী রাজকন্যাটি এখন তার মনের কোণে এক বিশাল জায়গা দখল করে নিয়েছে।
তৃষা ধীরস্থির কণ্ঠে মেহসানাকে বলল,,—‘আজকে পসিবল না রে, ইভেন এই সপ্তাহেও পসিবল না। আমার অন্য একটা কাজ আছে। পারলে তুই একবার আসিস।

মেহেসানা এবার কিছুটা বিরক্ত হলো; তৃষা তার বহু পুরাতন বান্ধবী বলা চলে গ্রামে একসাথে পড়াশোনা করত তারা। শহরেও একই কলেজে ভর্তি হয়েছিল তারা। তবে মাসখানেক আগে তৃষা রাজধানীতে চলে আসায় সেখানেও নিজের সবকিছু গুছিয়ে গাছিয়ে চলে এসেছে মেহেসানা। একই কলেজে ভর্তি হয়েছে পুনরায় তারা। সবকিছুতে সাথ দিয়েছে তৃষার। হুট করে তার এমন জবাবে কিঞ্চিৎ চিন্তিত হল সে,, —‘তোকে কেউ কিছু বলছে?
মেহেসানের এমন প্রশ্নের কিছুটা অবাক হলো তৃষা,,–‘কে কি বলবে?
—‘তাহলে কিছু হইছে তোর?
—‘নারে মা, কিন্তু হুট করে এমন প্রশ্ন কেন?
—‘না হঠাৎ করে এমন নাকোচ করলি।
—-‘এমনি!
—‘ওহ আচ্ছা!আচ্ছা তাহলে আল্লাহ হাফেজ। আমি রেডি হয়ে নেই আজকে একটু আর্লি ক্লাস আছে।
—‘হুম আল্লাহ হাফেজ।

বেলা ক্রমশ বেড়েই চলেছে; তবে তৃষার ব্যথাতুর কপালটার যন্ত্রণাটা কমার নামই নিচ্ছেনা যেন।সকালের তপ্ত রোদটা জানালার পর্দা ভেদ করে মেঝেতে এসে পড়েছে, বিদ্যমান কপালের অস্থির যন্ত্রণাদায়ক ‌দপদপানিটা সঙ্গে নিয়েই তৃষা ধীর পায়ে বিছানা থেকে নেমে মেঝের ওপর পা রাখল। সারারাত নির্ঘুম কাটানোর একটা ক্লান্তি তার সারা শরীরে লেপ্টে আছে। আলসেমি মাখা পায়ে সে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চোখে-মুখে শীতল জলের ঝাপটা দিতেই রাতের সেই দুঃস্বপ্নের ঘোরটা যেন কিছুটা কাটল। ভেজা মুখটা তোয়ালে দিয়ে মুছে সে ঘর থেকে বের হয়ে এলো।

এবার সে ধীরস্থিরভাবে গিয়ে দাঁড়াল ড্রেসিং টেবিলের সামনে। অবিন্যস্ত চুলগুলো বাগে আনতে হাতে চিরুনিটা তুলে নিল। দীর্ঘ কেশরাশির ভেতর চিরুনি চালনা করতে করতে হঠাৎই তার নজর পড়ল আয়নার ওপর। সেখানে নিজের প্রতিচ্ছবির ঠিক পাশেই অস্পষ্ট আর একটা ক্ষুদ্র অবয়ব দেখা যাচ্ছে।
তৃষা হাতের চিরুনিটা থামিয়ে দ্রুত ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, গুটি গুটি পায়ে ঘরে প্রবেশ করেছে ছিফরা। মেয়েটার গায়ের সেই বার্বি ফ্রকটা কুঁচকে আছে, আর দুই হাত দিয়ে বড্ড যত্ন করে একটা টেডি বিয়ারকে বুকের সাথে জাপ্টে ধরে রেখেছে সে। তৃষা কিছুটা অবাক হলো, কালকের সেই হিংস্র মেয়েটার সাথে আজকের এই কচি মুখটার যেন কোনো মিলই নেই।
তৃষা ধীর স্বরে জিজ্ঞেস করল,,—‘কিউটি? তুমি এখানে কেন সোনা? আমাকে ডাকলে আমিই যেতাম।
ছিফরা কোনো উত্তর না দিয়ে আরও কাছে এগিয়ে এলো। তার সেই হালকা নীলাভ মনি দুটো আজ অপরাধবোধে সিক্ত। তৃষার হাঁটুর কাছে এসে দাঁড়িয়ে খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল,,

—‘স্যরি!
মিষ্টি রিনরিনে কন্ঠটায় তীব্র অনুশোচনায় উচ্চারিত ‘স্যরি শব্দ টা প্রতিধ্বনিত হল সমগ্র কক্ষে যেন,তৃষা যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না। সে হাঁটু মুড়ে ছিফরার উচ্চতায় বসে পড়ে অবাক হয়ে শুধাল,,
—-‘হঠাৎ স্যরি কেন কিউটি পাই?
ছিফরা এবার তার ছোট্ট আঙুল দিয়ে তৃষার কপালের সাদা ব্যান্ডেজটা নির্দেশ করল। তার স্নিগ্ধ মিষ্টি সেই আদুরে কণ্ঠস্বরটা এবার করুণ সুরের মতো শোনাল,,
—‘কাল তোমাকে অনেক ব্যথা দিয়েছি তো, তাই। পাপা কাল রাতে কলে অনেক বকা দিয়েছে আমাকে। পাপা বলল, আমি যদি স্যরি না বলি,তাহলে পাপা আর ফিরবে না।
তৃষা মুহূর্তেই বুঝল, আর্য দূর থেকেও তার মেয়ের শাসনের হাল ছাড়েনি। ছিফরার ওই কচি গলায় পাপা’ ডাকটা আর চোখে ছলছল করা জল দেখে তৃষার বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। সে আলতো করে ছিফরার নরম চোয়ালে হাত রেখে বলল,,

—‘তুমি পাপাকে বলে দিও কিউটি পাই আমি একদম রাগ করিনি।আর তুমি যদি আমার বন্ধু হও, তবে তো ব্য’থাই থাকবে না।
ছিফরা এবার নিজের নীলাভ চোখের এক আদুরে দৃষ্টি মেলে তৃষার মুখের দিকে চাইল। এ যেন এক অদ্ভুত নীরবতা, যেখানে কয়েক মুহূর্তের জন্য স্থবির হয়ে গেল মহাকাল। এই প্রথমবার ছিফরা তার ছোট্ট পবিত্র হৃদয়ের সমস্ত আগল খুলে দিয়ে তৃষাকে পূর্ণ দৃষ্টিতে দেখল। সে দেখল, যে মানুষটাকে সে কাল আঘাত করেছে, তার চোখে একটুও ক্রোধ নেই, বরং সেখানে বয়ে যাচ্ছে মমতার এক ফল্গুধারা।
তৃষাও মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগল ছিফরাকে। কালকের সেই ক্রোধিত বাচ্চাটি যেন এক নিমিষেই ধুলোয় মিশে গেছে। এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচ বছরের ছোট্ট স্নিগ্ধ এক আদুরে ছিফরা, যার চোখে শরতের আকাশের মতো শুভ্র এক আশ্বাস। ছিফরার নরম হাতের আঙুলগুলো যখন তৃষার হাতের তালুতে এসে একটু ভরসা খুঁজল, তখন তৃষার মনে হলো, মাতৃহীন এই নিঃসঙ্গ কুঁড়িটি বোধহয় এবার পাঁপড়ি মেলার জন্য একজন মালী খুঁজে পেয়েছে।
ছিফরা ছোট্ট স্বরে বলল,,

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ২

—‘তুমি কি সত্যি আর ব্যথা পাচ্ছো না?
তৃষা হাসল সামান্য অতঃপর ছিফরাকে পরম মমতায় বুকের খুব কাছে টেনে নিল। ছিফরার গায়ের সেই পবিত্র শিশুদের সুবাস তৃষার সমস্ত ক্লান্তি হরণ করে নিল মুহূর্তেই। এই একটি পলকে তারা দুজনে এক অদৃশ্য বন্ধনে জড়িয়ে গেল,তৃষা ছিফরার আদুরে কপালে স্নিগ্ধ চুমু দিয়ে বরাবরের ন্যায় মিষ্টি কন্ঠে বলল,,
—-‘না মাম্মা!

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪