ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৬৫
শানজানা আলম
ঐশি নিজেই শিফট হয়ে গেল গেস্টরুমে। বাড়িতে তিনটা বেডরুম, একটা রুমে বাবা মা থাকেন, আরেকটা বড় রুমে দুই বোন থাকত। ছোট একটা বেডরুম গেস্টরুম হিসেবে করা হয়েছিল। ঐশির বিয়ের পরে অথৈ ওখানে গিয়ে মাঝে মাঝে থাকত ঐশি এলে। ঐশি বিয়ের পরপরই ঢাকায় বাসা নিয়ে নিয়েছিল, এমবিএ ভর্তি হলো, তাই বাড়িতে খুব একটা আসা হয় নি। বাবার প্ল্যান ছিল দোতলায় তিনটা বেডরুম সহ বড় করে করবেন, দুই বোন জামাই নিয়ে এসে কোথায় থাকবে! তবে বিভিন্ন ইস্যুতে সেটা করা হয়ে ওঠেনি।
অদ্ভুত হলো দুই বোনের একসাথে জামাই নিয়ে এসে থাকা হয়ে ওঠে নি! ঐশি যে কবে বিয়ে করবে, আর আদৌ করবে কিনা, সেটাও নিশ্চিত নয়।
অথৈ আর এহসান আসবে বলে, ঐশি বাড়িটা লোক রেখে গোছগাছ করালো। বাগান পরিস্কার করিয়ে নিলো৷ রুমে নতুন পর্দা, বেডশিট দিলো, ফার্নিচার পরিস্কার করা থেকে কোনো কিছুই বাদ দিলো না।
এমনকি ওরা একদিন থাকার কথা, কোন বেলায় কি খাবে, সেটাও মেনু ঠিক করে নিলো।
নন্দীপুরে একজন আপাই আছে যে বিয়ের পিঠা, কেক বানিয়ে সেল করে। ওনার কাছে ঐশি বিয়ের ডালা ভরা পিঠা, ডেজার্ট আইটেম অর্ডার করে দিলো। কনফার্ম করল যেন অথৈ আসার আগেই সব রেডি হয়ে যায়।
তাহিরা বেগমের তেমন কিছু করতে হলো না। ঐশি বলল, মা ফুলের দোকান থেকে লোক এনে এন্ট্রেসে একটা গেট করাব ভাবছি। বেডরুমেও একটু ডেকোরেশন করাব।
তাহিরা বেগম বললেন, কেন এত কিছু দরকার! তাছাড়া তোর মনের মধ্যে কি হচ্ছে সেটা আমি জানি, আমি তো মা! আমার ভালো লাগছে না। আমি বা তোর বাবা কিন্তু এত সহজ হতে পারব না!
ঐশি ঈষৎ হেসে বলল, মা, ছাড়ো তো, অথৈ তো নিজেই এই জীবন, এহসানকে বেছে নিয়েছে। ওর তো টুকটাক বুদ্ধি আছে, আমি সংসারী না,গোছানো না, তোমরাই তো বলতে, এহসান চেয়েছে সংসার করা পুতুল, আমি তেমন হতে পারি নি। অথৈ পেরেছে! ওদের ভালো থাকতে দাও। আসছে যখন, শীতল আচরন করো না।
তাহিরা বেগম বললেন, ঐশি, খাওয়া দাওয়া একদম বাদ দিয়ে দিয়েছিস,চোখের নিচে কালি পড়ে যাচ্ছে। তুই বরং ঢাকায় চলে যা। একটা দিন, ওদের সামনে তোর থাকতে হবে না।
ঐশি বলল, তাড়িয়ে দিচ্ছ?
তাহিরা বেগম ঐশির গায়ে হাত রেখে বললেন, না রে মা। ওদের সামনে দেখলে অনেক বেশি কষ্ট হবে, মেনে নিতে পারবি না৷ তার চাইতে দরকার নেই সামনাসামনি হওয়ার।
ঐশি বলল, মা, এহসানকে আমি নিজে ছেড়ে দিয়েছি। ওর সাথে আমার কিছুই নেই। আমার কোনো কষ্ট হবে না। কি সামনাসামনি ফেস না করলে সম্পর্কে অস্বস্তি থেকে যাবে। এই অস্বস্তি নিয়ে আমি থাকতে চাই না। সব স্বাভাবিক হয়ে যাক।
তাহিরা বেগম আর কিছু বললেন না।
ঐশি রুমে এসে দেখল, নাসির কয়েক বার ফোন করেছে হোয়াটসঅ্যাপে। এখন নাসিরের ফোন!
ঐশি কলব্যাক করল।
নাসির ফোন তুলে বলল, কি ব্যাপার, তুমি ফোন পিক করছ না কেন?
ঐশি বলল, এমনিই! বিজি ছিলাম।
বিজি ছিলাম মানে?
মানে আমার কাজ ছিল!
আচ্ছা সে তোমার যতই কাজ থাকুক, বেশি দেরি করো না ঢাকায় ফিরতে। আমি মাসুদকে বলে দিয়েছি, রিভার ভিউ ক্লিনিকে সব ব্যবস্থা করে রাখবে। এসেই চলে যাবে ওখানে। মনে থাকবে?
ঐশি বলল, হুম।
কোনো চালাকি করার চেষ্টা করবে না ঐশি, বিষয়টা ক্যাশ করার চেষ্টা করলে তার ফল কিন্তু ভালো হবে না।
ঐশি বলল, নাসির, তোমার একটা ছেলে আছে না?
নাসির বলল, আমার সংসার পরিবার এগুলো তোমার দেখার বিষয় না।
ঐশি বলল, আমি ভেবেছিলাম তুমি আমাকে ভালোবাসো!
বাসি তো! কিন্তু তার মানে এই না যে জায়গায় জায়গায় আমি বাচ্চা পয়দা করব! তোমাকে এতটা আনস্মার্ট আমি ভাবতে পারি না!
একটা শো রুম করে দিলাম, এত হাইলাইটেড হলো, মিডিয়া কভারেজ পেলো, সেটা নিয়ে বিজি থাকবে, তা নয়, পেট বাঁধিয়ে বসে আছ! অদ্ভুত মেয়ে মানুষ! একটাই চিন্তা, পেট বাঁধিয়ে তারপর টাকা আদায়! তোমাকে কি আমি কম দিয়েছি?
ঐশি বলল, নাসির, আমি কি তোমাকে বলেছি, আমাকে টাকা দাও?
বলো নি, কিন্তু তোমার মত মেয়েদের ইনটেনশন আমি বুঝি না ভাবছ! সুবহানা তোমার ফ্রেন্ড না? একেকবার একেকজনের সাথে ট্যুরে যাচ্ছে, লাখ লাখ টাকা পেমেন্ট নিচ্ছে, একবারও প্রেগন্যান্ট হয় নি! আর তুমি?
একবার মালদ্বীপ ঘুরেই পেটে বাচ্চা নিয়ে ফেললে!
ঐশি বলল, নাসির, ফোন রাখছি। তোমার নোংরা কথা আমার শুনতে ইচ্ছে করছে না।
-নোংরা কাজ করলে নোংরা কথা তো শুনতে হবেই।
শোনো ঐশি, একবারও যদি ভুলেও চেষ্টা করো আমাকে ট্রাপ করতে, তাহলে তোমার ন্যুড ফটো সোশ্যাল মিডিয়া ভরে যাবে।
ঐশি বলল, নাসির, আমার ন্যুড ফটো সোশ্যাল মিডিয়ায় ভরে গেলে, তোমার ন্যুড ভিডিও সবার হাতে হাতে থাকবে। তোমার বিকৃত কামনার ভিডিও সবাই দেখবে। এটাও মাথায় রেখো। আমার মতন ঐশি কিন্তু হাজার হাজার আছে, তবে নাসির কিন্তু একজনই, তার ন্যুড ভিডিও আমি সেল করতে পারব কত কোটি টাকায়, তুমি ইমাজিনও করতে পারবে না।
নাসির হাইপার হয়ে গিয়ে বলল, নটির ঘরের নটি, মা★গী, বে★শ্যা! তোর কি করতে হয়, আমি দেখতেছি!
-ঐশি ফোন কেটে ফোন বন্ধ করে দিলল। নায়েব পাশাকে দরকার এই মুহুর্তে। দুটো দিন তাড়াতাড়ি কেটে গেলেই হয়।
সকালে অথৈ প্রেগন্যান্সি টেস্ট করল। ভাবীর ধারনাই সঠিক, রেজাল্ট পজেটিভ৷
এহসান অনেক খুশি হয়ে গেল। মনে হচ্ছে অথৈ পুরোপুরি তার হয়ে গেছে। এখন আর দুজন নেই, দুজনের মাঝে আরেকটা প্রাণ চলে এসেছে।
বাড়িতে বসে এমন একটা খবর পাওয়ায় সবাই অনেক খুশি হলো। অথৈকে পারলে মাথায় তুলে নেয়। ওর খাওয়া দাওয়া থেকে সব কিছু টেক কেয়ার করতে লাগল সকলে।
এহসানের মা বললেন, তিনি অথৈ এর সাথে ওদের বাসায়ই যাবেন। এই সময়ে একা একা অথৈকে রাখা ঠিক হবে না।
ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৬৪
ভাইয়া বললেন, এই সময়ে নন্দীপুরে না যাওয়াই ভালো হবে। এত ধকল নেওয়ার দরকার নেই।
এহসানও মনে হলো এটাই চায় তবে মুখে বলল না।
সত্যি বলতে, ঐশি আছে ওখানে, অথৈ এর প্রেগন্যান্সির খবরটা সে কিভাবে নেয়, এটা একটা ভাইটাল ইস্যু৷
তাই এহসানের মা অথৈ এর মা কে ফোন করে বিষয়টা জানালেন। তাহিরা বেগম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ঠিক আছে, আমি ওর বাবার সাথে কথা বলে জানাব।
