বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ২২
সুমি চৌধুরী
৯/৫/২০২৬
মঙ্গলবার,,,
দেখতে দেখতে কেটে গেছে চারটি দিন। এই চারদিনে রূপার জীবনটা যেন পুরোপুরি বদলে গেছে। সকাল শুরু হয় কলেজ দিয়ে, আর দিন শেষ হয় কেক ডেলিভারি আর ফুল বিক্রির ক্লান্তিতে। ফাঁকা সময় পেলেই সে সাকিন ভাই’র দোকানে বসে ফুল বিক্রি করে, আর সময়মতো ছুটে যায় কেক ডেলিভারির কাজে। শরীরটা ক্লান্ত হয়ে পড়ে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ে মনটা। কারণ যতই কাজ করুক, তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যটা এখনও অনেক দূরে। নাদিয়ার মামা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন অগ্রিম কোনো টাকা দেওয়া হবে না। আগে কাজ, তারপর পারিশ্রমিক। বাধ্য হয়েই রূপা এই শর্ত মেনে নিয়েছে। সাকিন ভাই’র কাছ থেকে অগ্রিম পঞ্চাশ হাজার টাকা জোগাড় করতে পেরেছে ঠিকই, কিন্তু এখনও আরও এক লাখ দশ হাজার টাকা প্রয়োজন। সেই টাকার কথা মনে পড়লেই বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে। বারবার হিসাব মেলায়, বারবার ভাবে, কিন্তু কোনো পথ খুঁজে পায় না। তার ওপর প্রতিদিন কলেজে মিথ্যা বলতে হচ্ছে। আকাশের ক্লাসটুকু করে কখনও শরীর খারাপের অজুহাত, কখনও মায়ের অসুস্থতার কথা বলে ছুটি নিয়ে চলে আসে কাজে। প্রথম প্রথম ব্যাপারটা সহজ মনে হলেও এখন প্রতিদিন একটা অপরাধবোধ বুকের ভেতর কুরে কুরে খায় তাকে। কিন্তু উপায় কী? সময়ের সঙ্গে যুদ্ধ করা মানুষদের কাছে অনেক সময় সত্য বলার সুযোগও থাকে না।
সবচেয়ে বেশি কষ্টের বিষয় হলো এই চারদিনে বাঁধনের সাথেও তার একবারের জন্য দেখা হয়নি। বাঁধন এখন নিয়মিত সুপার কার্যালয়ে যাওয়া-আসা করে। খুব সকালে বেরিয়ে যায়, আর রাত গভীর করে বাড়ি ফেরে। রূপাও সারাদিন কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। একই বাড়িতে থেকেও যেন তারা দুই ভিন্ন পৃথিবীর মানুষ হয়ে গেছে। রূপা জানেও না, এই কয়েকদিনে বাঁধন কেমন আছে। আর বাঁধনও জানে না, রূপা প্রতিদিন নিজের স্বপ্ন আর প্রয়োজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কতটা লড়াই করে যাচ্ছে।
প্রতিদিনের মতো আজও আকাশের ক্লাস শেষ করে বৃষ্টির সাহায্যে ছুটি নিয়ে রূপা দ্রুত ছুটল কেক ডেলিভারির দোকানে। দোকানে পা রাখতেই গতি থমকে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে আনসার শেখ, দোকানের মালিক, নাদিয়ার মামা। মুখে বিরক্তি। তিনি চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন,
—- “প্রতিদিন এভাবে খেয়ালখুশি মতো দেরি করে আসার মানে কী? দোকান কি বাপের বাড়ি? যখন মন চাইল, নবাবজাদির মতো পা বাড়িয়ে চলে এলে?”
লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল রূপা। এই চারদিনে খুব ভালো করেই বোঝা হয়ে গেছে, আনসার শেখ বড্ড কঠিন ধাচের মানুষ। কাজের জায়গায় ফাঁকিবাজি একদম বরদাস্ত করেন না। নিজের কান্না চেপে শান্ত, জড়সড় গলায় জবাব এল,
—- “আই অ্যাম সরি স্যার! আসলে কলেজের একটা জরুরি ক্লাস শেষ করে বাস ধরে আসতে হয় তো, তাই মাঝে মাঝে দেরি হয়ে যায়।”
সন্দিহান চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন আনসার শেখ। তারপর চড়া গলায় প্রশ্ন করলেন,
—- “কলেজে পড়ো, সম্মানজনক ভবিষ্যৎ আছে। তাহলে এই বয়সে পড়াশোনা বাদ দিয়ে রোদে রোদে ঘুরে কেক ডেলিভারির মতো এই খাটুনির কাজ করছ কেন? দরকারটা কী?”
বুকটা ধক করে উঠল রূপার। গোপন সত্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়। কিছু উত্তর চিৎকার করে দিতে ইচ্ছে করে, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সেই অনুমতি দেয় না। মুহূর্তখানেক চুপ থেকে আত্মসম্মান বাঁচিয়ে ধরা গলায় রূপা উচ্চারণ করল,
—- “স্যার, প্লিজ আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি নিজের ব্যক্তিগত কোনো বিষয় নিয়ে এখানে কথা বলতে চাইছি না।”
মুখের চামড়া শক্ত হয়ে উঠল আনসার শেখের। আর কোনো প্রশ্ন করলেন না। তাচ্ছিল্যের সুরে সংক্ষেপে নির্দেশ দিলেন,
—- “ঠিক আছে, পার্সোনাল কথা ঘরেই থাক। এখন আর দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট না করে তাড়াতাড়ি পোশাক বদলে রেডি হয়ে যাও। একটা স্পেশাল কেকের বড় অর্ডার এসেছে। পার্সেলটা নিয়ে এক্ষুনি বের হতে হবে।”
মাথা নেড়ে ভেতরের রুমের দিকে পা বাড়াল রূপা। চারদিন তো কেটেই গেল। হাতে সময় আছে আর মাত্র তিনদিন! এই তিনদিনের মধ্যেই বাকি এক লাখ দশ হাজার টাকার পাহাড় টপকাতেই হবে। তবুও থমকে যাওয়া যাবে না। কিছু যুদ্ধ এমন হয়, যেখানে ক্লান্ত হয়ে ভেঙে পড়ার অধিকার থাকলেও, থমকে দাঁড়িয়ে যাওয়ার কোনো অধিকার থাকে না।
অন্যদিকে বৃষ্টি আজও আগের মতোই কলেজ ফাঁকি দিয়ে সাকিন ভাইয়ের দোকানের দিকে পা বাড়াল। উদ্দেশ্য একটাই রূপার হয়ে ফুল বিক্রি করা। কারণ রূপা সবসময় দোকানে থাকতে পারে না, রূপার মূল কাজ কেক ডেলিভারি। দিনের বেশিরভাগ সময় রূপাকে রাস্তায় রাস্তায় ছুটে বেড়াতে হয়, তাই ফুলের দোকানে রূপা থাকে শুধু অল্প কিছু সময়ের জন্য। আর সেই অল্প সময়ের ভিত্তিতেই রূপার সেলারি ধরা হয়েছিল মাত্র তিন হাজার।কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই অল্প সময়টা যেন নীরবে বদলে গেছে দায়িত্বে। কারণ রূপা না থাকলেও দোকানের কাজ থেমে থাকে না, আর সেই শূন্য জায়গাটাকে নিঃশব্দে ভরে দিয়েছে বৃষ্টি। প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর, আবার দুপুর থেকে বিকেল বৃষ্টি রূপার হয়ে পুরো দোকান সামলায়, ফুল সাজায়, ক্রেতাদের সাথে কথা বলে, আর একা হাতে গুছিয়ে রাখে পুরো কাজের ভার। বৃষ্টির এই নিঃশব্দ পরিশ্রমেই ধীরে ধীরে সেলারিটাও বেড়ে ছয় হাজারে পৌঁছে গেছে। যদিও এসব কোনো কিছুই রূপা জানে না, আর জানলে রূপা কোনোভাবেই এটা মেনে নিত না, এটা বৃষ্টি খুব ভালো করেই জানে। দোকানে পৌঁছে বৃষ্টি ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকে সাকিন ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বললো,
—- “আসসালামু আলাইকুম সাকিন ভাইয়া। কেমন আছেন?”
মুখে একটা চেনা সাকিনের হাসি ফুটিয়ে উত্তর এল,
—- “ওয়ালাইকুম আসসালাম। হ্যাঁ রে বোন, ভালো আছি। তা তোমার খবর কী?”
নরম আর বিনয়ী গলায় বৃষ্টির জবাব এল,
—- “আলহামদুলিল্লাহ ভাইয়া, ভালো। আজ আসতে একটু বেশিই দেরি হয়ে গেল, আসলে কলেজ থেকে সব গুছিয়ে আসতে হলো তো, তাই।”
স্বাভাবিক আর আপন ভঙ্গিতেই সাকিন বললেন,
—- “আরে না না, এটা কোনো ব্যাপারই না। তোমার যখন সুবিধা হয় তখনই আসবে, একদম চিন্তা করবে না।”
বুকের ভেতর থেকে স্বস্তির একটা হালকা নিঃশ্বাস বের হলো। তারপর চারপাশটা দেখে নিয়ে ধীরে ধীরে মুখের ওপর মাস্কটা টেনে ভালো করে পরে নিল বৃষ্টি। কাপড়ের এই মাস্কটাই এখন নীরব পরিচয়, সবচেয়ে বড় আড়াল আর সুরক্ষাকবচ। কলেজে চেনা কেউ এসে ফুল বিক্রেতা হিসেবে চিনে ফেলবে, সেটা কিছুতেই চাই না। এই ছোট্ট মাস্কের আড়ালে কত বড় একটা নীরব লড়াই প্রতিদিন একা হাতে হাসিমুখে বহন করা হচ্ছে, কেউ যেন না জানে।
কাউন্টারের পাশে গিয়ে দাঁড়াল বৃষ্টি, একদম নিঃশব্দে নতুন আসা তাজা ফুলগুলো গুছিয়ে বালতিতে সাজাতে শুরু করল। একটার পর একটা গোলাপ আর রজনীগন্ধা যেন বৃষ্টির মায়াবী আঙুলের ছোঁয়ায় আরও বেশি জীবন্ত হয়ে উঠছে। সুবাসিত ফুলগুলোর ভেতরেই যেন লুকিয়ে আছে রূপার না বলা তীব্র ক্লান্তি, বৃষ্টির না বলা বিশাল দায়িত্ব আর দু’জনের এক অজানা ভালোবাসার নীরব ডানা মেলার গল্প।
হঠাৎ করেই আকাশ কোথ থেকে এসে ফুলের দোকানের সামনে বাইক থামাল। বাইকের ইঞ্জিনটা গরম হয়ে ধোঁয়া ছাড়ছে। সে পকেট থেকে ফোন বের করে কাউকে কল দিয়ে কানে তুলল। হুট করে আকাশ কে দোকানের সামনে দেখে বৃষ্টি যেন এক লহমায় চমকে গেল, দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে দাঁড়িয়ে পড়ল যেন তাকে চিনতে না পারে। বুকের ভেতর তখন ভয়ের তীব্র ঝড়, একটাই চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।
—- “সর্বনাশ! এই হিটলার লোকটা এখানে এই সময়ে কী করছে? আমাকে দেখে ফেলেনি তো?”
রুদ্ধশ্বাস ভাবনার মাঝেই বাইকের ওপর থেকেই ভেসে এল আকাশের গম্ভীর আর চেনা কণ্ঠস্বর,
—- “এক্সকিউজ মি আপু? একটু শুনবেন?”
আকাশের ডাকে যেন আরও একবার বড়সড় ধাক্কা খেল। বুকের ভেতরটা ড্রামের মতো ধকধক করে উঠলেও কোনোমতে কাঁপন সামলে নিল বৃষ্টি। শক্ত করে ঢোক গিলে, গলাটা যতটা সম্ভব বদলে, ধীরে ধীরে কিন্তু পিছন ফিরে না তাকিয়েই জবাব দিল,
—- “জ্বি বলুন স্যার, আপনাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি? কী ফুল লাগবে?”
আকাশের দুই ভ্রু মুহূর্তের মধ্যে কুঁচকে এক হয়ে গেল। কাস্টমারদের সাথে কথা বলার এই কণ্ঠটা শোনা মাত্রই ভেতরের গোয়েন্দা মনটায় অদ্ভুত খটকা। এই কণ্ঠস্বরটা বড্ড চেনা চেনা লাগছে! খুব কাছের কোনো মানুষের, বহুদিনের অতি পরিচিত কোনো ছায়া। বাইকের ওপর বসেই দোকানের ভেতর দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়ল আকাশ।
—- “আপু, আমি আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করছি আর আপনি ওভাবে উল্টো দিকে দেয়াল ঘেঁষে মুখ লুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? কোনো সমস্যা?”
পিঠ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই কাঁপতে থাকা হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরল বৃষ্টি। ধরা পড়ে যাওয়ার এক চরম ভয় যেন গলায় এসে আটকে গেছে, কথা বের হতে চাইছে না। কোনো রকমে কণ্ঠের কাঁপুনি আড়াল করে বললো,
—- “না না স্যার… কোনো সমস্যা না। এমনি… ফুলগুলো গুছাচ্ছিলাম তো, তাই।”
আকাশের গলার আওয়াজটা এবার আরও কড়া শোনাল, যেন বাইকের ওপর বসেই আরেকটু সামনের দিকে ঝুঁকে এসেছে। আকাশ বললো,
—- “তো আপনি ওইভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? সামনের দিকে ঘুরেন?”
কথাটা শুনে ভেতরের রাগটা যেন একদম চড়াৎ করে মাথায় চড়ে গেল বৃষ্টির। মনে মনে একগাদা ঝাঁঝালো গালি উথলে উঠল, ঘুরতে কেন হবে শুনি? মেয়েমানুষ দেখার এতই যেহেতু শখ, এতই যেহেতু ইচ্ছে, তাহলে এই দোকানে কী? সোজা গাঙ্গিনাপার গিয়ে দেখে আসুক না কেন! ওখানে তো মেয়েদের অভাব নেই! কিন্তু এই জ্বলন্ত রাগটা বাইরে প্রকাশ করার কোনো উপায় নেই। এখন একটু রাগ দেখাতে গেলেই গলার আসল স্বর বেরিয়ে আসবে, আর এই হিটলার স্যার এক সেকেন্ডে চিনে ফেলবে। কলেজের একটা মেয়েকে এভাবে রাস্তার ধারের দোকানে ফুল বিক্রি করতে দেখলে যে কী পরিমাণ কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে, সেই চিন্তাতেই বৃষ্টির পিঠের চামড়া ঠাণ্ডা হয়ে গেল। তার এই রুদ্ধশ্বাস ভাবনার মাঝেই আকাশ আবারও অধৈর্য গলায় তাগাদা দিল,
—- “কাস্টমারের থেকে মুখ ঘুরিয়ে কথা বলাটা অভদ্রতা। এদিকে ঘুরুন।”
বৃষ্টি এবার পড়ল মহা বিপদে! এখন উপায় কী? এই লোকটার চোখ তো আর সাধারণ চোখ নয়, একদম হাই-পাওয়ার ওয়ালা চশমার মতো তীক্ষ্ণ! এই চোখে চোখ পড়লেই নিশ্চিত চিনে ফেলবে। এখন কী করা যায় ভাবতে ভাবতে হুট করে মগজে একটা দুর্ধর্ষ বুদ্ধি খেলে গেল। চট করে গলাটা যতটা সম্ভব মোটা আর অদ্ভুত বানিয়ে বৃষ্টি বললো,
—- “আপনি একটু দাঁড়ান স্যার, আমি একটা জিনিস নিয়ে এক্ষুনি আসছি।”
বলেই বৃষ্টি এক দৌড়ে দোকানের পেছনের অন্ধকার ঘরটায় ঢুকে গেল। বাইকের ওপর বসে আকাশ বিরক্তির একশেষ হয়ে দুই ভ্রু একদম কুঁচকে ফেলল। ভারী অদ্ভুত তো মেয়েটা। কাস্টমার সামনে দাঁড় করিয়ে রেখে এভাবে হুট করে ভেতরে চলে গেল কেন? চরম বিরক্ত মুখে বাইকের ওপর বসেই রইল সে।
এদিকে ভেতরের ঘরে ঢুকে বৃষ্টি তো তখন হন্যে হয়ে পথ খুঁজছে। হুট করে চোখ পড়ল সাকিন ভাই’র বোনদের ফেলে যাওয়া একটা সস্তা মেকআপ বক্সের ওপর। আর যায় কোথায়! সময় নষ্ট না করে বৃষ্টি চটপট আঙুলে এক গাদা গাড় সাদা মেকআপ বা পাউডারের পেস্ট নিয়ে চোখের কোণায় আর চোখের চারপাশে একদম ভুতুড়ে স্টাইলে লেপে দিল, যাতে সহজে আসল চোখ দুটো ধরাই না যায়! তারপর গায়ের ওড়নাটা টেনে মাথার ওপর একদম লম্বা করে, ঘোমটার মতো করে পেঁচিয়ে নিল। সব শেষে আয়নায় নিজের সেই কিম্ভূতকিমাকার চেহারাটার দিকে তাকিয়ে বৃষ্টি নিজেই আর হাসি চেপে রাখতে পারল না। নিজের মুখে হাত চাপা দিয়ে ফিসফিস করে হেসে উঠল,
—- “হি হি! মিস্টার আকাশ রহমান, দেখি এবার আমাকে চিনো কীভাবে! হা হা, একদম চুনকালি মাখা ভূতের মতো লাগছে! আসো এবার, যত পারো চোখ বড় বড় করে তাকাও।”
বৃষ্টি বাইরে এসে দেখে আকাশ বিরক্ত হয়ে বাইকের ওপর বসে আছে। খুব সাবধানে দোকানের কাউন্টারের মাঝে গিয়ে দাঁড়াল বৃষ্টি। আকাশ চোখ তুলে তাকাল। বৃষ্টির চোখে-মুখে ওভাবে গাঢ় সাদা মেকআপের লেপালেপি দেখে মুহূর্তের মধ্যে আকাশের নাক কুঁচকে গেল। মনে হলো যেন আস্ত এক ময়দার বস্তা সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আকাশ চিবুক বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বললো,
—- “এই জন্যই তো বলি বাজারে আজকাল ময়দা পাওয়া যায় না কেন? সব তো দেখি এই দোকানেই এনে মজুদ করা হয়েছে!”
কথাটা শুনে বৃষ্টির ভ্রু কুঁচকে আসল। ভেতর থেকে রাগ চড়চড় করে বাড়লেও গলাটা মোটা আর বিকৃত করে বৃষ্টি বললো,
—- “কিছু বললেন স্যার?”
আকাশ না-সূচক মাথা নাড়ল। তবে চোখ সরাল না, বেশ কিছুক্ষণ তীক্ষ্ণ আর গভীর নজরে তাকিয়ে রইল বৃষ্টির দিকে। যেন এই কিম্ভূতকিমাকার সাজার আড়ালের আসল রূপটা পড়ার চেষ্টা করছে। এরপর হুট করেই আকাশের ঠোঁটের কোণে এক বাঁকা, রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। বাইকের হাতলে এক হাত রেখে আকাশ বেশ রসিয়ে রসিয়ে বললো,
—- “আপনি না অনেক সুন্দর। প্রেম করবেন আমার সাথে?”
কথাটা শুনে বৃষ্টির পুরো ভিরমি খাওয়ার জোগাড়! এই হিটলার স্যার এত বড় ফ্লার্ট? রাগে, ক্ষোভে আর অপমানে বৃষ্টির ইচ্ছে করল হাতের ফুলের তোড়াটা দিয়ে আকাশের মাথায় সজোরে একটা বাড়ি মারতে।
থানায় রিমান্ডে কাল বাঁধা হয়েছে মারুফ হোসেনকে। কাল তাকে অনেক বাধ্য করে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। আর পুলিশ অ্যাকশন নিয়ে ধরে রিমান্ডে ঢুকিয়ে সোজা চার হাত-পা বেঁধে রেখেছে। মারুফের পিঠের চামড়া ফেটে তখন রক্তারক্তি অবস্থা।
থানায় আসলো বাঁধন। উদ্দেশ্য মারুফ হোসেনের সাথে দেখা করা। দেখতে চায় কেমন পুরুষ যে স্ত্রীকে ধরে রাখতে পারে না। বাঁধন থানায় ঢুকতেই সব পুলিশ একদম এটেনশন হয়ে স্যালুট জানাল। ঠিক সেই মুহূর্তে রিমান্ড রুমের ভারী লোহার দরজা খুলে অখিল বের হলো। হুট করে বাঁধনকে থানায় দেখে বুক চিতিয়ে চট করে স্যালুট দিয়ে অখিল বলল,
—- “তুই এখানে? আসবি আমাকে ফোন দিবি তো?”
বাঁধন এসবের কোনো উত্তর না দিয়ে হাত তুলে স্যালুটটা রিসিভ করল, তারপর একদম গম্ভীর, মেদহীন গলায় প্রশ্ন করল,
—- “মারুফ হোসেন কোন সেলে?”
অখিলও তাৎক্ষণিক নিজের বন্ধুমহল ভুলে একদম প্রফেশনাল টোনে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে জবাব দিল,
—- “তিন নম্বর ইন্টারোগেশন সেলে ক্লোজড জেরা চলছে। আলতাফ স্যার’র কড়া অর্ডার, ২৪ ঘণ্টার ভেতর ফরওয়ার্ড করতে হবে। ফরেন কারেন্সি আর স্মাগলিংয়ের সোর্সগুলোর খোঁজে থার্ড ডিগ্রি দেওয়া হচ্ছে।”
বাঁধন ঠান্ডা চোখে হাড়হিম করা দৃষ্টিতে তাকিয়ে সংক্ষেপে জানতে চাইল,
—- “কী ওগলাল?”
অখিল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানাল,
—- “থার্ড ডিগ্রি দেওয়ার পর কেবল মুখ খোলা শুরু করেছে। শুধু এইটুকু স্বীকার করেছে যে, এই স্মাগলিং আর ক্রাইমের লাইনে ও নিজে থেকে আসতে চায়নি। ওকে এই নোংরা পথে নামতে বাধ্য করেছে ওর প্রাক্তন স্ত্রী।”
কথাটা শোনা মাত্রই বাঁধনের খটকা লাগলো মারুফ হোসেনের প্রাক্তন স্ত্রী! তার প্রাক্তন স্ত্রী তো মিসেস রজনী রহমান, যে এখন তার নিজের বাবার স্ত্রী! জটলাটা যেন মাথার ভেতর চড়চড় করে পাকিয়ে উঠলো, বাঁধনের ক্ষুরধার বুদ্ধিও যেন এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল। সে অখিলের দিকে তাকিয়ে একটু গম্ভীর আর নিচু স্বরে বললো,
—- “আমাকে ভেতরে নিয়ে চল। আমি নিজে কাস্টডি ইন্টারোগেট করবো।”
অখিল চটপট জবাব দিয়ে বললো,
—- “আয়।”
ভারী লোহার দরজাটা ক্যাঁচক্যাচ শব্দে খুলে গেল। দুজনে চলে আসলো রিমান্ড সেলের গুমোট অন্ধকারের । মারুফ হোসেন ঘাড়টা কাত করে ঝিমুচ্ছে, চামড়া ফেটে যাওয়া শরীরে পুলিশের কড়া থার্ড ডিগ্রির ক্ষতগুলো টাটকা লাল হয়ে আছে। অখিল মারুফ হোসেনের চিবুকটা শক্ত মুঠোয় চেপে ধরে একটা ঝাড়া মেরে কড়া গলায় ধমকে বললো,
—- “এই, সোজা হয়ে বোস! চোখ খোল, স্যার এসেছেন।”
মারুফ হোসেন ব্যথায় ককিয়ে উঠে ধীরে ধীরে ঝাপসা চোখে তাকালো। সামনে দাঁড়ানো ছিপছিপে, সুদর্শন আর ইস্পাত-কঠিন মেজাজের পুরুষ বাঁধনকে দেখে তার চোরের চোখ দুটো কেমন কুঁচকে গেল। বাঁধন এক মুহূর্তে থমকে দাঁড়ালো মারুফ হোসেনের মুখের দিকে তাকিয়ে। তীক্ষ্ণ নজরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো অবয়বটা। এটাই কি রজনী রহমানের প্রাক্তন স্বামী, অর্থাৎ রূপার জন্মদাতা বাবা? কিন্তু এই নোংরা লোকটার মলিন চেহারার সাথে রূপার সেই নিষ্পাপ রূপের একটুও মিল পাচ্ছে না বাঁধন। পৃথিবীর সব বাবা-সন্তানের চেহারার মাঝে রক্তের টানে অন্তত ১% হলেও একটা অদৃশ্য মিল থাকে, কিন্তু এই লোকটাকে দেখে ০% মিলও খুঁজে পাচ্ছে না বাঁধন। ভেতরের খটকাটা আরও গাঢ় হলো। বাঁধন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামনের কাঠের চেয়ারটা টেনে মারুফ হোসেনের ঠিক মুখোমুখি বসলো। তারপর তার চোখের মণিতে সরাসরি হাড়হিম করা দৃষ্টি রেখে একদম ঠান্ডা আর ধারালো গলায় কেটে কেটে বললো,
—- “আপনার প্রাক্তন স্ত্রীর নাম কী?”
মারুফ হোসেন মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। মিনিটখানেক কেটে গেল, কিন্তু লোকটা টু শব্দটিও করলো না। বাঁধনের চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে আছে মারুফের দিকে। তার ধৈর্য ফুরিয়ে আসছে। বাঁধন হাতের ঘড়িটার দিকে একবার তাকিয়ে শান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ গলায় বললো,
—- “মারুফ, ডন’ট ওয়েস্ট মাই টাইম। খুব সহজ প্রশ্ন করেছি আপনার স্ত্রীর নাম কী?”
মারুফ হোসেন কাঁপা কাঁপা গলায় বিড়বিড় করে বললেন,
—- “রজনী?”
বাঁধনের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো। যা সন্দেহ করেছিল, সেটাই। এই লোকটাই রজনী রহমানের প্রথম স্বামী। বাঁধন অখিলের দিকে একটা চাহনি দিলো, অখিল ততক্ষণে ফাইলটা গুছিয়ে নিয়েছে। বাঁধন আবার মারুফের দিকে ঝুঁকে এসে ঠান্ডা গলায় বললো,
—- “আপনার সন্তানের নাম কী?”
মারুফ হোসেন মাথা নাড়ালো, যেন কিছুই জানে না।
—- “আমার কোনো সন্তান নেই, স্যার।”
বাঁধনের ঠোঁটে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠলো। সে চেয়ারের হাতলে আঙুল দিয়ে মৃদু টোকা দিয়ে বললো,
—- “ডোন্ট লাই টু মি, মারুফ। রেকর্ড চেক করার আগেই আমি আপনার প্রোফাইল তৈরি করে রেখেছি। মিথ্যা বলে নিজের বিপদ বাড়াবেন না।”
মারুফ হোসেন এবারও ঘাড় শক্ত করে রাখলো।
—- “আমি মিথ্যা বলি না, স্যার। যা সত্য তাই বলছি।”
বাঁধন যেন খুব একটা মজার কথা শুনলো এমন ভঙ্গি করে একটু হাসলো। তারপর ধীরস্থির স্বরে বললো,
—- “আসামী মিথ্যা বলে না এই কথা পাগলেও বিশ্বাস করবে না। তবে একটা জিনিস মনে রাখবেন, আপনি কী বলছেন তার চেয়ে বড় কথা আপনি কী লুকাচ্ছেন।”
মারুফ হোসেন বাঁধনের চোখে চোখ রেখে একটু সাহস সঞ্চয় করার চেষ্টা করলো, কিন্তু বাঁধনের সেই ইস্পাত-কঠিন দৃষ্টির সামনে সে বেশিক্ষণ টিকতে পারলো না। সে আমতা আমতা করে বললো,
—- “আমি সব বলি না, স্যার। কাজেরটাই বলি, অকারণে মিথ্যা বলার অভ্যাস আমার নেই।”
বাঁধন এবার সোজা হয়ে বসলো। মারুফ হোসেনের শরীরের প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি যেন এক একটা ক্লু। সে একদম স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,
—- “তার মানে আপনি স্বীকার করছেন আপনার কোনো সন্তান নেই?”
মারুফ হোসেন একটু ইতস্তত করে মাথা নাড়ালো।
—- “হুম।”
তলোয়ারের মতো প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো বাঁধন,
—- “তাহলে রূপা কে?”
রূপা নামটা কানে যেতেই মারুফ হোসেনের যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো অবস্থা হলো। এতক্ষণ যে মানুষটা ঝিমুচ্ছিল, নামটা শোনার সাথে সাথে তাঁর সমস্ত জড়তা যেন মুহূর্তেই উবে গেল। তিনি আতঙ্কের দৃষ্টিতে বাঁধনের দিকে তাকালেন। ভাঙা গলায় বললেন,
—- “রূপা?”
বাঁধন ঝুঁকে পড়লো। শিকারি যেমন ওত পেতে থাকে, বাঁধনের প্রতিটি অঙ্গভঙ্গিতে এখন সেই শাণিত হিংস্রতা। সে ধারালো গলায় বললো,
—- “ইয়েস, রূপা।”
মারুফ হোসেন দ্রুত মাথা নিচু করে ফেললেন। তাঁর হাতের আঙুলগুলো কাঁপছে। তিনি দম নিতে নিতে বললেন,
—- “আমার কোনো সন্তান নেই, স্যার।”
বাঁধন চেয়ারটা একটু পিছিয়ে নিলো। তার চোখে এখন আগুনের হলকা। সে শ্লেষের হাসি হেসে বললো,
—- “তাহলে রূপা মেয়েটা কে?”
মারুফ হোসেন এবার পুরো গুটিয়ে গেলেন। ভয়ে শুকিয়ে যাওয়া কণ্ঠে বললেন,
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ২১
—- “জানি না স্যার।”
বাঁধনের ধৈর্যের বাঁধ এবার পুরোপুরি ভেঙে গেল। গুমোট ভাবটা যেন আরও বেড়ে গেল। গর্জন করে বললো,
—- “ডন’ট লাই টু মি, সব জানেন আপনি!”
মারুফ হোসেন কাঁপতে কাঁপতে মাথা নিচু করেই বললেন,
—- “সত্যি বলছি স্যার, আমি কিছু জানি না।”
