Home বাঁধন রূপের অধিকারী বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ২৩

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ২৩

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ২৩
সুমি চৌধুরী

ইশতিয়াক আর সীমার জীবনটা আর দশটা সাধারণ স্বামী-স্ত্রীর মতো কাটছে না। ইশতিয়াক যেন সুযোগ পেলেই সীমার ওপর নিজের সব রাগ উগড়ে দেয়, কথায় কথায় গায়ে হাত তোলে। এক কথায়, রূপাকে হারিয়ে সে যেন পুরোপুরি অন্ধ হয়ে গেছে; ভালো-মন্দের তফাত করার ক্ষমতাটুকুও হারিয়ে ফেলেছে।
সীমা মেয়েটা জন্মগতভাবেই অনেক শান্ত আর নরম স্বভাবের, তাই সংসারের সব ঝড়-ঝাপটা মুখ বুজে মানিয়ে নেয়। তবে আজ সীমার জীবনে একটা খুশির দিন। ময়মনসিংহ আনন্দ মোহন কলেজে আজ তাকে ভর্তি করে দেওয়া হয়েছে। এসএসসিতে তার পয়েন্ট বেশ ভালো থাকায় সহজেই চান্স পেয়ে গেছে সে। এখন থেকে ইসরাত আর সীমা একসাথেই কলেজে যাওয়া-আসা করবে।
কলেজ ছুটির পর সীমা আর ইসরাত মনের আনন্দে গল্প করতে করতে বাড়ি ফিরছিল। কিন্তু হুট করেই তাদের সেই আনন্দে বাধা পড়লো। রাস্তার এক কোণায় কয়েকজন বখাটে ছেলে বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সীমা আর ইসরাতকে ওদিক দিয়ে হেঁটে যেতে দেখে তারা নোংরা মন্তব্য ছুড়তে লাগলো। একজন বখাটে সীমার দিকে তাকিয়ে একটা কুৎসিত শিস দিয়ে বললো,

—- “কী রে, নতুন নাকি? আগে তো কখনো দেখিনি এই এলাকায়!”
তার কথা শুনে পাশে থাকা আরেকজন বখাটে হেসে উঠে বললো,
—- “আরে, আমার তো জিনিসটারে সেই লাগছে! কেউ একটু প্রেম করিয়ে দে না ভাই এই মেয়েটার সাথে!”
টিটকারি মারতে মারতে একজন ছেলে তো সরাসরি এসে ইসরাত আর সীমার পথ আটকে দাঁড়ালো। ইসরাত ভয় পেলেও নিজেকে সামলে নিয়ে একটু কড়া গলায় বললো,
—- “কী হয়েছে? আমাদের পথ আটকিয়েছেন কেন?”
ছেলেটি ঠোঁটের কোণে একটা শয়তানি হাসি ফুটিয়ে উগ্র ভঙ্গিতে বললো,
—- “একটু লুতুভুতু করতে পথ আটকিয়েছি, বুঝেছো ফুলটুসি?”
সীমা এমনিতে ভীষণ ভীতু আর শান্ত প্রকৃতির মেয়ে হতে পারে, কিন্তু এমন নোংরা কথা সে কখনোই সহ্য করতে পারে না। এবারও পারলো না। বখাটে ছেলেটার নোংরা মুখের কথা শেষ হওয়ার আগেই সীমা নিজের ডান হাতটা বাতাসে তুলে সজোরে ছেলেটার গালে ঠাস করে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল। থাপ্পড়ের শব্দে চারপাশটা যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। সীমা রাগে কাঁপতে কাঁপতে গর্জে উঠে বললো,

—- “লজ্জা করে না আপনাদের? রাস্তায় মেয়েদের দেখলে মা-বোনদের মতো সম্মান না দিয়ে এমন নোংরামি করতে করতে? বাবা-মা কি ঘরে কোনোদিন কোনো ভালো শিক্ষা দেয়নি?”
থাপ্পড়ের সেই চড়া শব্দে বখাটে ছেলেগুলোর চোখ এক মুহূর্তে কপালে উঠলো। থাপ্পড় খাওয়া ছেলেটা নিজের লাল হয়ে যাওয়া গালে হাত দিয়ে হিংস্র চোখে সীমার দিকে তাকিয়ে গর্জন করে বললো,
—- “কী রে! তোর এত বড় সাহস? তুই আমার গায়ে হাত দিস!”
সীমা রাগে আর অপমানে কাঁপতে কাঁপতেও নিজের জেদ ধরে রাখলো। সে সটান দাঁড়িয়ে কড়া গলায় বললো,
—- “বেশ করেছি! আরেকবার মুখে এমন নোংরা কথা আনলে আরও দেবো!”
ঠিক তখনই বাইক থেকে নেমে এলো দলের অন্য বখাটে ছেলেটা। সে ধীরপায়ে সীমার সামনে এসে দাঁড়ালো এবং পা থেকে মাথা পর্যন্ত খুব নোংরাভাবে তাকে পর্যবেক্ষণ করলো। তারপর কিছু বুঝে ওঠার আগেই, আচমকা এক ঝটকায় সীমার গলা থেকে ওড়নাটা টান দিয়ে নিজের হাতে নিয়ে নিলো।
ওড়না কেড়ে নিতেই সীমা তীব্র লজ্জায় আর অপমানে দুই হাত দিয়ে নিজের বুক ঢাকতে ঢাকতে রাস্তার মাটিতে বসে পড়লো। ইসরাত এই ভয়ানক কাণ্ড দেখে কান্নায় ভেঙে পড়লো এবং বখাটেদের হাত জোড় করে অনুরোধ করতে লাগলো,

—- “কী করছেন আপনারা? প্লিজ, দিয়ে দিন ওর ওড়নাটা! ওড়নাটা ফিরিয়ে দিন!”
কিন্তু ইসরাতের কান্নায় কারো মন গললো না। ওড়নাটা হাতে নিয়ে বখাটে ছেলেগুলো উচ্চশব্দে পৈশাচিক হাসিতে মেতে উঠলো। আশপাশে বেশ কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছিল, কিন্তু কেউ একটা পা-ও এগিয়ে আসার সাহস পাচ্ছিল না। কারণ, ওই বখাটে ছেলেগুলোর কোমরে অস্ত্র গোঁজা ছিল কেউ একটু নড়াচড়া করলেই তারা মেরে ফেলার হুমকি দেয়। তাছাড়া, ছেলেগুলো এই এলাকারও না, অন্য কোনো গ্যাংয়ের।সীমা নিজের সবটুকু শক্তি হারিয়ে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেললো। লজ্জায় আর অপমানে মাটিতে বসে কেঁদে কেঁদে সে বখাটেদের উদ্দেশ্যে মিনতি করতে লাগলো,
—- “আল্লাহর দোহাই লাগে, আমার ওড়নাটা ফিরিয়ে দিন! আমি আপনাদের বোনের মতো। নিজের বোনকে এভাবে রাস্তার মাঝখানে অসম্মান করবেন না, প্লিজ!”

বখাটে ছেলেগুলো পাগলের মতো পৈশাচিক হাসিতে মেতে রইলো। কিন্তু তাদের সেই হাসি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। ঠিক তখনই রাস্তার মোড় ঘুরে তীব্র গতিতে পরপর তিনটা বাইক এসে বিকট শব্দে ব্রেক চেপে থামলো।
বাইক আরোহীদের দেখা মাত্রই ইসরাতের ফ্যাকাশে মুখে এক চিলতে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠলো। কারণ, প্রথম বাইকটা থেকে যে নেমে আসছে, সে আর কেউ নয় ইশতিয়াক! ইশতিয়াকের চোখ দুটো রাগে একদম রক্তবর্ণ হয়ে আছে, কপাল বেয়ে ঝরছে তপ্ত ঘাম। বাইক থেকে নেমেই সে এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে নিজের গা থেকে জ্যাকেটটা খুলে সীমার দিকে ছুঁড়ে মারলো। সীমাও লজ্জায় কুঁকড়ে থাকা অবস্থায় দ্রুত জ্যাকেটটা টেনে নিয়ে নিজেকে ভালোভাবে ঢেকে নিলো।
ইশতিয়াককে সদলবলে দেখে বখাটে ছেলেগুলো তাৎক্ষণিক তাদের হাসি থামিয়ে দিল। তবে তারা নিজেদের ভাবমূর্তি ধরে রাখার জন্য মুখে একটা স্বাভাবিক ভাব ফুটিয়ে রাখলো, যেন তারা ইশতিয়াককে একটুও ভয় পাচ্ছে না। ইশতিয়াক ধীর কিন্তু ভারী পায়ে এগিয়ে এলো ঠিক সেই ছেলেটার সামনে, যার হাতে সীমার ওড়নাটা ছিল।
চোখ সরু করে ইশতিয়াক একবার ছেলেটাকে দেখলো। একে সে খুব ভালো করেই চেনে। ছেলেটার নাম সাবিল, পাশের অন্য এলাকার ত্রাস। ইশতিয়াকের মতোই সাবিলও ওই এলাকার একটা গ্যাং চালায়। স্বাভাবিকভাবেই, সাবিলের সাথে ইশতিয়াকের শত্রুতাটা বহু পুরোনো আর বেশ কড়া।
ইশতিয়াক কোনো ভূমিকার মধ্যে গেল না, কোনো কথা না বলে আচমকা এক সজোরে টান দিয়ে সাবিলের হাত থেকে সীমার ওড়নাটা কেড়ে নিলো। আর এক সেকেন্ড সময় পার হতে না হতেই, রাগে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে সেই ওড়নাটা দিয়েই সাবিলের গলায় পেঁচিয়ে ধরে একটা মরণফাঁস লাগালো। ওড়নার টানে সাবিলের চোখ দুটো এক্ষুনি বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। ইশতিয়াক সাবিলের মুখের ওপর ঝুঁকে এসে হিংস্র বাঘের মতো গর্জে উঠে বললো,

—- “তোর এত বড় সাহস! তুই আমার বোনকে রাস্তায় আটকাস? তারপর আমার স্ত্রীর দিকে নজর দিস? তোকে আজকে আমি জ্যান্ত কবর দেবো!”
মুহুর্তে সাবিলের সাথের ছেলেগুলো ইশতিয়াককে মারার জন্য তেড়ে আসলো, আর সাথে সাথে ইশতিয়াকের সাথে থাকা রবীন আর বাকি দুজন ছেলে বখাটেদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। মুহূর্তের মধ্যে রাস্তার মাঝখানে তুমুল মারামারি লেগে গেল। ওদিকে ইশতিয়াক ওড়নার ফাঁস আরও শক্ত করে সাবিলকে রাস্তার ওপর আছাড় মেরে ফেলে দিল। সাবিলের দম আটকে মুখ নীল হয়ে আসছে, কিন্তু ইশতিয়াকের কোনো হুঁশ নেই। সে সাবিলের বুকের ওপর নিজের ভারী বুট জুতোসহ পা তুলে দিয়ে ওড়নাটা আরও জোরে টানলো। দাঁত চিবিয়ে হিংস্র গলায় বললো,
—- “তোর শত্রুতা আমার সাথে, যা করার আমার সাথে করবি! আমার বোন আর স্ত্রীর দিকে কোন সাহসে চোখ দিতে গেলি বল? আজকে তোকে আমি এই ওড়না দিয়েই শ্বাস আটকে মেরে কুচিকুচি করে কেটে রাস্তায় ফেলে যাবো!”

মুহূর্তের মধ্যে চারপাশের মানুষজন এসে বিশাল ভিড় জমিয়ে ফেললো। রাস্তার ধুলোয় বসে সীমা তখনো কাঁপছে, কিন্তু তার চোখ দুটো ইশতিয়াকের ওপর স্থির হয়ে গেছে। সে চরম অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো। যে লোকটা চার দেয়ালের মাঝে তাকে স্ত্রী হিসেবে কোনোদিন স্বীকারই করে না, সুযোগ পেলেই অত্যাচার করে—সেই লোকটাই আজ এই চরম বিপদে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে তাকে নিজের ‘স্ত্রী’ বলে দাবি করছে! একটা অদ্ভুত, অবর্ণনীয় অনুভূতি সীমার পুরো মনকে গ্রাস করে নিলো।
পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে ভিড়ের মাঝখান থেকে কেউ একজন পুলিশে কল দিল। খবর পেয়ে ওসি অখিল দ্রুত পুলিশের ভ্যান নিয়ে সেখানে
ছুটে আসলো। উপস্থিত মানুষজন ধমক দিয়ে পুলিশকে সব খুলে বলল কীভাবে সাবিলরা মেয়ে দুটোর পথ আটকে সীমার ওড়না কেড়ে নিয়েছ। কীভাবে ইশতিয়াক নিজের স্ত্রীর সম্মান বাঁচাতে ওদের ওপর চড়াও হয়েছে। সব শুনে পুলিশ কনস্টেবলরা অনেক কষ্টে ইশতিয়াকের হাত থেকে আধমরা সাবিলকে ছাড়ালো। এরপর সাবিলসহ ওর পুরো গ্যাংটাকে ধরে টেনেহিঁচড়ে পুলিশের ভ্যানে তুললো।
ভ্যানে ওঠার আগে সাবিল নিজের গলা চেপে ধরে কাশতে কাশতে ইশতিয়াকের দিকে একটা রক্ত জল করা হিংস্র চাহনি দিল। চোখের সেই ভাষায় স্পষ্ট লেখা ছিল সে এর প্রতিশোধ নেবেই।ওরা চলে যেতেই ইশতিয়াক দ্রুত পা চালিয়ে সীমা আর ইসরাতের সামনে এসে দাঁড়ালো। দুজনকে ওপর-নিচ ভালো করে দেখে নিয়ে চরম রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বললো,

—- “বাসায় কি বোরকা নেই তোদের? বোরকা পরে বাইরে আসতে পারিস না?”
ইশতিয়াকের সেই রুদ্রমূর্তি দেখে দুজনেই একসাথে অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে ফেললো। ইশতিয়াক সীমার ওড়নাটা সীমার দিকে ছুঁড়ে দিল, তারপর ওদের দিকে রাগে আঙুল উঁচিয়ে একদম চূড়ান্ত হুমকি দিয়ে বললো,
—- “নেক্সট টাইম যদি কখনো তোদের বোরকা ছাড়া বাইরে দেখেছি, তাহলে সেদিনই হবে তোদের শেষ দিন!”

রূপা আর বৃষ্টি কলেজ ছুটির পর যার যার জায়গায় চলে আসলো। তাদের কথা ছিল যে কলেজ ছুটির পর বৃষ্টি রূপার বাড়ির রাস্তার মোড়ে দাঁড়াবে, আর রূপা সাকিনের দোকান থেকে কাজ সেরে এসে তার সাথে যোগ দেবে। দুজনে একসাথে বাড়ি ফিরবে, কারণ একা একা আলাদা সময়ে বাড়ি ফিরলে বাড়ির লোক সন্দেহ করতে পারে। পরিকল্পনা মতোই দুজনে একসাথে বাড়ি চলে আসলো।
আজ বৃষ্টির মেজাজটা ভীষণ খিটখিটে হয়ে আছে, আকাশের ওপর সে মনে মনে খুব বিরক্ত। আকাশ যে এত বড় একটা ফ্লার্ট, সেটা সে আগে বুঝতেই পারেনি। সে রুমে ঢুকেই রাগ কমানোর জন্য সোজা ফ্রেশ হতে ওয়াশরুমে চলে গেল।অন্যদিকে রূপার মাথায় চলছে অন্য চিন্তা। চার চারটে দিন পার হয়ে গেল, কাল পাঁচ দিন পূর্ণ হবে, অথচ এখনো টাকার কোনো সুরাহা হলো না। রূপা ব্যাগটা টেবিলের ওপর রেখে ক্যান্ডিকে কোলে তুলে নিয়ে ব্যালকনিতে আসলো। সে চুপচাপ রেলিং ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি ফ্রেশ হয়ে রুমে ফিরে রূপাকে না দেখে ব্যালকনিতে আসলো। এসে রূপাকে এভাবে উদাস মনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বেশ চিন্তিত গলায় বললো,

—- “কী হয়েছে রে তোর? মন খারাপ?”
রূপা আলতো করে না-সূচক মাথা নেড়ে লুকানোর চেষ্টা করে বললো,
—- “না রে, এমনি।”
বৃষ্টি রূপার কাঁধে হাত দিয়ে একটু জোর দিয়ে বললো,
—- “বল আমায় কী হয়েছে। আমার সাথেও কী এখন কথা শেয়ার করবি না?”
রূপা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ক্যান্ডির নরম মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে মনমরা গলায় বললো,
—- “চারদিন চলে গেল রে, আর আমি এখনো টাকাটা জোগাড় করতে পারছি না। মাথায় কিচ্ছু খেলছে না, বুঝতে পারছি না ঠিক কী করবো।”
বৃষ্টি এবার রূপার মনের আসল অবস্থাটা বুঝতে পারলো। সে রূপার কাঁধটা আলতো করে চেপে ধরে একটা সান্ত্বনার হাসি হেসে বললো,
—- “ওহ আচ্ছা, এই ব্যাপার! চিন্তা করিস না, ঠিক একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। এখন এসব ভাবা বন্ধ করে যা, ফ্রেশ হয়ে আয়।”
রূপা আর কথা না বাড়িয়ে ক্যান্ডিকে বৃষ্টির কোলে দিয়ে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল। রূপা ভেতরে ঢুকতেই বৃষ্টি তাড়াহুড়ো করে রুমে এসে নিজের ফোনটা তুলে নিলো এবং আবার ব্যালকনিতে চলে আসলো। সে আর দেরি না করে তার বাবা হায়দার শেখের নাম্বারে কল দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওপাশ থেকে ফোনটা রিসিভ হলো। বৃষ্টি সাথে সাথে বেশ মিষ্টি গলায় বললো,

—- “আসসালামু আলাইকুম বাবা, কেমন আছো?”
হায়দার শেখ ওপাশ থেকে স্নেহ জড়ানো কণ্ঠে বললেন,
—- “ওয়ালাইকুম আসসালাম মামণি। আমি ভালো আছি, তুমি কেমন আছো? আর কলেজ কখন ছুটি হয়েছে?”
বৃষ্টি বললো,
—- “এই তো বাবা, কিছুক্ষণ আগেই বাসায় আসলাম।”
হায়দার শেখ বললেন,
—- “তা মামণি, খেয়েছো তুমি?”
বৃষ্টি পাল্টা প্রশ্ন করে বললো,
—- “না, এখনো খাইনি। তুমি খেয়েছো?”
হায়দার শেখ হেসে বললেন,
—- “হ্যাঁ মামণি, আমি খেয়েছি। এখন যাও, তুমিও চটপট খেয়ে নাও।”
বাবার এমন নরম সুর শুনে বৃষ্টি একটু আমতা আমতা করতে লাগলো। নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে জড়তা জড়ানো গলায় বললো,

—- “বাবা ইয়ে মানে, একটা কথা বলার ছিল।”
হায়দার শেখ খবরের কাগজটা পাশে রেখে মেয়ের কথার গুরুত্ব বুঝে বেশ মন দিয়ে বললেন,
—- “হ্যাঁ মামণি বলো, কী বলবে?”
বৃষ্টি নখ কামড়াতে কামড়াতে ফোনটা কানের কাছে আরও শক্ত করে ধরলো। একটু ইতস্তত করে বললো,
—- “আসলে বাবা, আমার নাম্বারে এক লাখ দশ হাজার টাকা দিতে পারবে?”
মেয়ের মুখে এতগুলো টাকার কথা শুনে ওপাশে হায়দার শেখ বেশ অবাক হলেন। তিনি কিছুটা চমকে উঠে বললেন,
—- “বলো কী মামণি! এতগুলো টাকা দিয়ে তুমি এই সময়ে কী করবে?”
বৃষ্টি এবার মিথ্যে অজুহাত দিয়ে নিজের গালটা ফুলিয়ে অভিমানী গলায় বললো,
—- “ড্রেস কিনবো! তোমার কাছে টাকা চেয়েছি, তুমি দেবে কি দেবে না শুধু সেটা বলো?”
মেয়ের গলার সুরে রাগ আর অভিমান টের পেয়ে হায়দার শেখ ওপাশ থেকে নরম সুরে বললেন,
—- “কুল ডাউন মামণি! আমি তো দেবো না সেটা বলিনি। কিন্তু এই মুহূর্তে হুট করে এতগুলো টাকা দিয়ে কী ড্রেস কিনবে, সেটাই তো ভাবছি।”
বৃষ্টি এবার একদম চূড়ান্ত অভিমানের নাটক শুরু করে দিয়ে গলার স্বর আরও চড়িয়ে বললো,
—- “আবার জিজ্ঞেস করছো কী করবো? বললাম না ড্রেস কিনবো! তুমি কি টাকাটা দেবে নাকি দেবে না, বলো?”
মেয়ের এই জেদের কাছে হায়দার শেখ সবসময়ই বড় অসহায়। তিনি আর কথা না বাড়িয়ে হেসে ফেলে বললেন,
—- “আচ্ছা আচ্ছা মামণি, ঠিক আছে। রাগ করতে হবে না, আমি এখনই তোমার নাম্বারে টাকাটা পাঠিয়ে দিচ্ছি।”

রাতের বেলা শান্তা এসেছে রূপা আর বৃষ্টির সাথে একটু আড্ডা দেওয়ার জন্য। বৃষ্টি আর রূপা তখন পড়ার টেবিলে বই খুলে বসেছিল ঠিকই, কিন্তু শান্তাকে রুমে ঢুকতে দেখে পড়া ওখানেই মুলতবি হয়ে গেল। তিনজনের হাসাহাসি আর গল্পে পুরো রুমটা একদম জমে উঠলো।
আর ঠিক তখনই বাড়ির সামনে তীব্র গতিতে এসে থামলো বাঁধনের বাইক। আজ সে ভীষণ ক্লান্ত, আর তার চেয়েও বেশি মেজাজটা খিটখিটে হয়ে আছে। বাইকটা একপাশে স্ট্যান্ড করিয়ে সে দ্রুত পায়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলো। ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে তখন আরাম করে খবরের কাগজ ওল্টাচ্ছিলেন হাজি রহমান। বাঁধনকে এই অসময়ে, এত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে দেখে তিনি বেশ অবাক হয়ে বললেন,
—- “কী রে দাদু, আজ এত তাড়াতাড়ি যে?”
বাঁধন সিঁড়ি দিয়ে তরতরিয়ে উঠতে উঠতে হালকা গলায় বললো,

—- “এমনি দাদু, শরীরটা কেমন যেন ম্যাজম্যাজ করছে। আমি ফ্রেশ হয়ে এসে পরে তোমার সাথে কথা বলছি।”
বলেই বাঁধন বড় বড় পা ফেলে সোজা রূপার রুমের সামনে চলে আসলো। ঘরের ভেতরে তখন বিছানার ওপর গোল হয়ে বসে রূপা, বৃষ্টি আর শান্তা তুমুল আড্ডায় ব্যস্ত। বাঁধন কোনো শব্দ না করে চুপচাপ রূপার রুমে প্রবেশ করলো। আজই প্রথম বাঁধন নিজের ইচ্ছেয় রূপার এই চেনা রুমে পা রাখলো। সে সোজা হেঁটে গিয়ে রূপার বিছানার ঠিক সামনে এসে গম্ভীর মুখে দাঁড়ালো।
বৃষ্টি হাসতে হাসতে আচমকা সামনের দিকে তাকাতেই তার হাসিমুখটা জমে গেল। সামনে যমের মতো বাঁধনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে যেন একটা বড়সড় শক খেলো। বৃষ্টির দেখাদেখি রূপা আর শান্তার চোখও গেল সামনের দিকে; একই সাথে দুজনেও যেন বিষম খেলো।বাঁধনের চোখ স্থির হয় বিছানায় বসে থাকা রূপার ওপর। তার চোখের পলক একটা সেকেন্ডের জন্যও নড়া বন্ধ করে দেয়। মেয়েটার পরনে ছিমছাম বেগুনি রঙের সাধারণ কামিজ, লম্বা মেঘবরণ চুলগুলো দু পাশে দুটো ঝুঁটি করে বাঁধা, আর সেই ঝুঁটির গোড়ায় যত্ন করে গোঁজা বেলি ফুলের মালা। রূপার ফর্সা গায়ের রঙে এই বেগুনি কালারটা এক অদ্ভুত মায়া ছড়াচ্ছে। বাঁধনকে এভাবে একদৃষ্টিতে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে রূপা ভয়ে আর আতঙ্কে শিউরে উঠে তড়িঘড়ি করে মাথা নিচু করে ফেলে।বাঁধন একটা দীর্ঘশ্বাস টেনে নিজের গম্ভীর চোখ দুটো বৃষ্টি আর শান্তার দিকে ফেরায়। কপালে সামান্য কুঁচকানো ভাব এনে কড়া গলায় শুধায়,

—- “শান্তা আর কী যেন নাম? ওহ হ্যাঁ, বৃষ্টি। তোমরা দুজনে একটু রুম থেকে বের হও। লিভ দ্য রুম রাইট নাও।”
কথাটা শোনা মাত্রই রূপার কলিজাটা ছ্যাৎ করে ওঠে। শান্তা বেশ অবাক চোখে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে চোখের পাতা দ্রুত ফেলে আমতা আমতা করে আওড়ায়,
—- “কেন ভাইয়া? কোনো সমস্যা হয়েছে?”
বাঁধনের নাকের দুপাশ রাগে ফুলে ওঠে, শান্তার প্রশ্ন শুনে সে ওপরের ঠোঁটটা শক্ত করে ধমকের সুরে ফুঁসে ওঠে,
—- “যেতে বলেছি মানে যাবি! কোনো কথা না বাড়িয়ে এখন বের হ! জাস্ট গেট আউট!”
বাঁধনের এমন চড়া গলার ধমকে বৃষ্টির ঠোঁট দুটো ভয়ে কেঁপে ওঠে, সাথে শান্তাও দমে যায়। দুজনেই আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে গুটিগুটি পায়ে বিছানা থেকে নেমে দরজার দিকে এগোতে থাকে। রূপাও ভয়ে তাদের সাথে বিছানা থেকে নামতে নিলে বাঁধন তড়িৎ গতিতে তার দিকে তাকায়, হাতের তর্জনী উঁচিয়ে চোয়াল শক্ত করে কড়া গলায় ফিসফিসিয়ে ওঠে,

—- “তোকে যেতে বলিনি, ওদের যেতে বলেছি। তুই এখানেই থাক।”
বৃষ্টি আর শান্তা দুজনে আর কোনো কথা বলার সাহস পায় না, চুপচাপ ঘর থেকে বের হয়ে যায়। বাঁধন এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে দরজার দিকে এগিয়ে যায়, খটাস করে খিলটা তুলে দিয়ে দরজাটা লক করে দেয়।ভেতর থেকে লক হওয়ার সেই খটখটে শব্দে রূপার বুকের ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়, সে দুই হাত দিয়ে নিজের কামিজের কোণটা মারাত্মক জোরে চেপে ধরে। মনে মনে শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে বাঁধন দরজাটা কেন বন্ধ করলো? এখন সে কী করবে?
বাঁধন চুপচাপ রূপার পড়ার টেবিলের পাশ থেকে চেয়ারটা টেনে নিয়ে বিছানায় জড়সড় হয়ে বসে থাকা রূপার ঠিক মুখোমুখি বসে। বসার সাথে সাথেই রূপার বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে, তার গলার ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায় এবং ফুসফুস চিরে বাতাস বের হতে চায় না। বাঁধন একটা দীর্ঘ বুক চেরা লম্বা শ্বাস টানে, তার চোখের মণি দুটো রূপার চোখের ওপর একদম স্থির হয়ে যায়, সে ওপরের ঠোঁটটা সামান্য শক্ত করে গম্ভীর গলায় শুধায়,

—- “আমি এখন যা প্রশ্ন করবো সোজা উত্তর দিবি, একদম মিথ্যা কথা বলবি না। গট ইট?”
ভয়ের চোটে নিজের থুতনিটা বুকের কাছে নামিয়ে আনে রূপা। কোনোমতে শুকনো ঢোক গিলে জোরে জোরে দুইবার মাথা দোলায়। বাঁধন তার চোখের পাতা দুটো এক ফোঁটাও না ফেলে, মুখের চামড়া টানটান করে আওড়ায়,
—- “তোর জন্মদাতা বাবার নাম কী? আই সেড, হোয়াট ইজ হিজ নেম?”
হুট করে এমন একটা প্রশ্নে রূপার চোখের পাতা ওখানেই থমকে যায়, তার মুখের চোয়াল আলগা হয়ে আসে, কী বলবে ভেবে পায় না। রূপাকে এভাবে স্তব্ধ হয়ে মুখ হা করে থাকতে দেখে বাঁধনের কপাল কুঁচকে তিনটে রাগের ভাঁজ পড়ে, সে চেয়ারে বসা অবস্থাতেই রূপার দিকে সামান্য ঝুঁকে আসে, তার গলার রগগুলো শক্ত হয়ে ওঠে এবং দাঁত চিবিয়ে ধমকের সুরে গলা চড়ায়,
—- “অ্যানসার মি! বোবা হয়ে গেলি নাকি হুট করে?”
রূপার চোখের মণি দুটো ভয়ের চোটে কেঁপে ওঠে, সে নিজের দুই ঠোঁট একসাথে চেপে ধরে আমতা আমতা করে কোনোমতে আওড়ায়,

—- “মারুফ হোসেন।”
বাঁধনের মুখের পেশিগুলো এক নিমেষে শক্ত হয়ে যায়, সে চোখের পাতা দুটো একদম সরু করে বরফশীতল গলায় শুধায়,
—- “মিথ্যা কথা! ইউ আর লাইং!”
রূপা চরম অবাক হয়ে চোখ দুটো বড় বড় করে বাঁধনের দিকে তাকায়, তার মুখটা সামান্য হাঁ হয়ে যায়, থতমত খেয়ে বলে,
—- “মানে?”
—- “মানে এটাই যে তোর বাবার নাম মারুফ হোসেন না! মিথ্যা বলছিস তুই আমায়। আমার রাগ কন্ট্রোলের বাইরে যাওয়ার আগে, বিফোর আই লুজ মাই টেম্পার, সুন্দর করে তোর আসল বাবার নামটা বলে দে!”
এবার মারাত্মক এক ধাক্কা খায় রূপা, তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। সে মিথ্যা বলছে মানে কী? জ্ঞান হওয়া ইস্তক সে তো এটাই জেনে এসেছে যে তার জন্মদাতা বাবার নাম মারুফ হোসেন। সে নিজের নিচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরে কান্না চেপে জোর গলায় বলে,

—- “আমি মিথ্যা বলছি না! আমার জন্মদাতা বাবার নাম মারুফ হোসেনই! সত্যি বলছি আমি!”
কথাটা শোনামাত্রই রাগে চোয়ালের হাড় দুটো ডেলা পাকিয়ে শক্ত হয়ে যায় বাঁধনের। নিজের রাগ আর সামলাতে না পেরে বাঁধন আচমকা হাত তুলে ঠাসিয়ে একটা চড় বসিয়ে দেয় রূপার নরম গালে। চড়ের তীব্রতায় রূপা বিছানার ওপর কিছুটা ছিটকে যায়, হুট করে এমন একটা থাপ্পড় খেয়ে গালের তীব্র ব্যথায় মুখ কুঁচকে ডুকরে কেঁদে ওঠে সে।
বাঁধন নিজের চেয়ার ছেড়ে ঝড়ের গতিতে খাড়া হয়ে দাঁড়ায়, রূপার পড়ার টেবিলের কাছে এসে দুই হাত দিয়ে কাঠের ওপর মারাত্মক জোরে খামচে ধরে। রাগে তার নাকের দুপাশ ফুলতে থাকে, গলার রগগুলো দপদপ করে ওঠে, সে বুনো হিংস্রতায় চেঁচিয়ে বলে,

—- “মিথ্যা! সব মিথ্যা! তোর বাবার নাম মারুফ হোসেন না! এখনো মিথ্যা বলছিস তুই আমাকে?”
বাঁধনের ওপরের ঠোঁটটা রাগের চোটে নিজের দুই পাটির দাঁতের নিচে পিষে যায়, তার চোখের মণি দুটো কুঁচকে ছোট হয়ে আসে, মনে হচ্ছে রূপা তাকে চরম মিথ্যা কথা বলছে। অন্য দিকে রূপা বিছানার একদম কোনায় নিজের শরীরটা গুটিয়ে বসে মাথা নিচু করে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, ভয়ের চোটে তার ফর্সা নাকটা টকটকে লাল হয়ে উঠেছে, পাশে ক্যান্ডি চুপচাপ বসে আছে যেন সে একটা পাথরের মূর্তি।মেয়েটার এই ভেজা কান্নার টলটলে শব্দে বাঁধন তার কড়া দৃষ্টি রূপার দিকে ঘোরায়, রূপার কান্নাশিক্ত ভেজা মুখটা দেখামাত্রই বাঁধনের বুকের পাজরের ভেতরের এক অজানা কোণ আচমকা কেঁপে ওঠে। মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে নিজের ফর্সা মুখটা গোল করে ফেলছে, চোখের নোনা জল পাপড়ি বেয়ে গাল ভিজে একাকার, চড়ের দাগ বসা ফর্সা গালটা আবছা লাল হয়ে উঠেছে, এই অবস্থায় মেয়েটাকে আরও মারাত্মক কিউট লাগছে।অদ্ভুত এক ঘোর নেমে আসে বাঁধনের ভেতরে, তার এতক্ষণের রাগী দৃষ্টিটা এক নিমেষে কেমন নেশালো আর গাঢ় হয়ে ওঠে, চোখ দুটো অজান্তেই ছোট আর ঝাপসা হয়ে আসে, তার তীব্র ইচ্ছে করছে এখনই দৌড়ে গিয়ে রূপার ওই সারা গালে একের পর এক চুমুতে ভরিয়ে দিতে, নিজের শক্ত বুকে জোরে জড়িয়ে ধরতে। সে নিজের ভেতরের এই অবাধ্য উন্মাদনা সামলানোর জন্য নিচের ঠোঁটটা দাঁত দিয়ে আরো শক্ত করে কামড়ে ধরে, চোখ দুটো বন্ধ করে ফুসফুস চিরে বড় বড় শ্বাস ফেলতে লাগে। খাট থেকে রূপার ফুপিয়ে কান্নার শব্দ তার কানের পর্দায় এসে অনবরত বাজছে, সে কিছুক্ষণ এই গুমরে মরা নীরবতার মাঝে রূপার কান্না শুনলো।
তারপর ধীরে ধীরে চোখের পাতা খুলে অজান্তেই নিজের শরীরটা রূপার দিকে ঝুঁকিয়ে আনলো, গম্ভীর চোখের মণি দুটো রূপার মুখের ওপর রেখে কর্কশ কণ্ঠটা শান্ত করে শুধায়,

—- “কাঁদছিস কেন? আমি কি মেরেছি? হ্যাভ আই হিট ইউ?”
কথাটা শোনা মাত্রই রূপার বুকের ভেতরট মোচড় দিয়ে ওঠে, সে নিজের চোখের পাতা আর ওপরে তোলে না, নিচের দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ভাঙা গলায় আওড়ায়,
—- “থাপ্পড় তো মেরেছেন।”
বাঁধনের মুখের চামড়ায় কোনো পরিবর্তন আসে না, সে নিজের ডান ভ্রুটা সামান্য উঁচু করে বরফশীতল গলায় বলে,
—- “সো?”
রূপার পুরো শরীরটা ভয়ের চোটে একঝলক কেঁপে ওঠে, সে নিজের হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখের পানি মুছতে মুছতে ধীরে ধীরে বলে,
—- “ব্যথা লেগেছে।”
এক মুহূর্তের জন্য পুরো ঘরজুড়ে যেন এক নিরেট নীরবতা নেমে আসে, বাঁধন একদম স্থির মূর্তির মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে শক্ত আঙুলে রূপার নরম থুতনিটা ওপরে তুলে ধরলো, বাধ্য হয়ে রূপাকে তার ওই নেশালো চোখের মণি দুটোর দিকে তাকাতে হলো। বাঁধনের কণ্ঠস্বর এবার আরও নিচু, আরও ভারী শোনায়,

—- “মিথ্যা বললে আরো দেবো। আন্ডারস্ট্যান্ড?”
থুতনি ধরা অবস্থাতেই দ্রুত মাথা নাড়ে রূপা,
—- “আমি মিথ্যা বলিনি।”
—- “রিয়েলি?”
বাঁধনের ঠোঁটের এক কোণে এক চিলতে তাচ্ছিল্যের বিষাক্ত হাসি ফুটে ওঠে, সে চোখ দুটো আরও কুঁচকে বলে,
—- “তুই ভাবছিস আমি কিছু বুঝি না? ইউ থিঙ্ক আই অ্যাম এ ফুল?”
রূপার চোখ দুটো আবার নতুন করে নোনা জলে ভিজে উঠল, সে তীব্র অসহায়ত্বের চোখে বাঁধনের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
—- “বিশ্বাস করুন, আমি মিথ্যা বলছি না।”
বাঁধনের চোয়ালের হাড় দুটো আবার শক্ত হয়ে ডেলা পাকিয়ে ওঠে, চোখ দুটো সরু করে রূপার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে সে,
—- “আবার মিথ্যা কথা।”
রূপা ভয়ে শিউরে ওঠে,
—- “আমি সত্যি বলছি।”
—- “চুপ।”

বাঁধনের কণ্ঠ এবার একদম বজ্রের মতো ঘরের দেয়ালে গিয়ে আছড়ে পড়ে, সে দাঁত চিবিয়ে গর্জে ওঠে,
—- “একদম চুপ! আমার সামনে দাঁড়িয়ে মিথ্যা বলার সাহস কোথা থেকে আসে তোর? হাউ ডেয়ার ইউ!”
রূপা আতঙ্কে নিজের চোখের পাতা নামিয়ে ফেলে, শরীরটা আরও গুটিয়ে নেয়,
—- “আমি…”
—- “আই সেড চুপ”
বাঁধন নিজের চেয়ার ছেড়ে বিছানা থেকে একদম টানটান হয়ে উঠে দাঁড়ায়, তার লম্বা চওড়া দেহটা যেন পুরো অন্ধকার ঘরটাকেই আরও বেশি ভারী আর দমবন্ধ করে তোলে, সে ওপর থেকে রূপার দিকে তাকিয়ে বলে,
—- “আমি সব জানি, সব বুঝি। তবু সুযোগ দিচ্ছি সত্যি বলার। আই অ্যাম গিভিং ইউ আ চান্স!”
রূপার নিচের ঠোঁটটা ভয়ে কাঁপতে লাগে, সে নিজের ভেতরের সবটুকু সাহস এক করে পাল্টা বলে দেয়,
—- “ভীষণ ভয় লাগে আপনাকে।”
বাঁধন এক পাশ দিয়ে তীক্ষ্ণ হাসে,
—- “রিয়েলি?”
রূপা মাথা নিচু করে আলতো করে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ে। বাঁধন কয়েক সেকেন্ড একদম স্থির মারণ দৃষ্টিতে রূপার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর নিজের মুখটা রূপার কানের কাছে নামিয়ে এনে শান্ত কণ্ঠে আওড়ায়,
—- “লাস্ট টাইম জিজ্ঞেস করছি। সত্যিটা বল?”
কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে উচ্চারণ করে রূপা,
—- “সত্যি বলছি আমার বাবার নাম মারুফ হোসেন, আমি মিথ্যা… ”
বাকিটুকু শেষ করতে পারে না, তার আগেই বাঁধন নিজের শক্ত হাত দিয়ে রূপার গালটা মারাত্মক জোরে চেপে ধরে। গাল চেপে ধরায় রূপার ঠোঁট দুটো গোল হয়ে উল্টে যায়, ভেতরের ফর্সা চামড়াটা কুঁচকে আসে এবং তীব্র ব্যথায় সে নিজের চোখ জোড়া শক্ত করে বন্ধ করে ফেলে। বাঁধন নিজের চোয়াল শক্ত করে, নাকের দুপাশ ফুলিয়ে রেগে রেগে বলে,

—- “ফাউল পেয়েছিস তুই আমাকে, হ্যাঁ? ইউ থিঙ্ক দিস ইজ আ জোক? তোর ওই মারুফ হোসেন বাবা বর্তমানে জেলে রিমান্ডে বন্দি আছে। আজকেই তার কাছ থেকে জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। সে স্পষ্ট স্বীকার করেছে তার কোনো সন্তান নেই!”
ঝড়ের গতিতে চোখ খোলে রূপা, তার চোখের মণি দুটো ভয়ের চোটে একদম বড় বড় হয়ে যায়। তার বাবা মারুফ হোসেন না মানে কী? পুরো দুনিয়াটা যেন তার চোখের সামনে দুলছে, মাথাটা ঝিমঝিম করে ঘোরে। বাঁধন এসব কী বলছে!বাঁধন রূপার গালটা আরও জোরে চেপে ধরে তার মুখের কাছে নিজের মুখটা আরও বেশি ঝুঁকিয়ে আনে। নিজের তীক্ষ্ণ চোখের মণি দুটো রূপার চোখের ওপর সই সই করে রেখে, দাঁত চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
—- “আর উনি এটাও বলেছেন যে রূপা নামের কোনো মেয়েকে তিনি চেনেনই না! সিরিয়াসলি? কোনো বাবা এত সহজে অস্বীকার করতে পারে যে তার কোনো সন্তান নেই? তোকে চেনে না! হোয়াট ডু ইউ থিঙ্ক? তোর কি মনে হয় আদৌ কি সে তোর জন্মদাতা বাবা”
শব্দ করে ডুকরে কেঁদে দেয় রূপা, তার চোখের মণি বেয়ে নোনা জলের ধারা গাল বেয়ে নিচে নেমে আসে। সে নিজের ঠোঁট দুটো কামড়ে ধরে ভাঙা গলায় আওড়ায়,

—- “তাহলে আমার বাবা কে? মা তো আমাকে এই নামই বলেছে!”
হুট করে বাঁধনের চোখ একদম আটকে পড়ে রূপার চোখের মণির দিকে। রূপার চোখের মণি দুটো হালকা বাদামি রঙের দেখে বাঁধনের মগজের ভেতর আচমকা বিদ্যুৎ খেলে যায়, তার মনে পড়ে যায় সেইদিনের গভীর জঙ্গলের কথা। যেদিন একটা মেয়ে তাকে বাঁচিয়েছিল, মেয়েটার মুখ দেখতে পারেনি সে, শুধু চোখ জোড়া দেখেছিল। আর সেই চোখ দুটোর মণি স্পষ্ট বাদামি রঙের ছিল, ঠিক এই রূপার চোখের মতো একদম হুবহু। বাঁধনের মাথা কাজ করা বন্ধ করে দেয়, সে নিজের অবশ হয়ে যাওয়া হাতটা রূপার গাল থেকে সরিয়ে নেয়, অজান্তেই রূপার মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে থেকে ঘোরের মাঝে শুধায়,
— “তুই সেদিন জঙ্গলে গিয়েছিলি? অয়ার ইউ দেয়ার?”
রূপা চরম অবাক হয়ে নিজের চোখের জল মোছা বন্ধ করে দেয়, কপালে একরাশ বিস্ময় নিয়ে বলে,

—- “মানে?”
এক মুহূর্তে থেমে যায় বাঁধন, তার ভেতরের পুলিশি মগজ সজাগ হয়ে ওঠে। প্রমাণ ছাড়া কোনো কিছু হুট করে জিজ্ঞেস করা বোকামি ছাড়া আর কিছু না। সে নিজের ভেতরের এই মারাত্মক সন্দেহ আর তোলপাড় করা কথাটা বুকের গভীরে চেপে রেখে একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে, রূপার রক্তাভ চোখের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলে,
—- ” তুই বলতে চাচ্ছিস তোর মা তোকে এই নাম বলেছে? ইউ মিন তোর মা তোকে ট্রুথ বলেনি?”
রূপা নিজের থুতনিটা বুকের কাছে নামিয়ে এনে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ে। কয়েক সেকেন্ড রূপার সেই টলটলে বাদামি চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বাঁধন, মেয়েটার মুখের ভয়ার্ত এক্সপ্রেশন দেখে এখন আর মনে হচ্ছে না মেয়েটা মিথ্যা বলছে। তাহলে এখন তাকে যা সত্য বের করার, তা রজনী রহমানের কাছ থেকেই বের করতে হবে। কিন্তু রজনী রহমানের সাথে তার একদম কথা বলতে ইচ্ছে করে না। কেন জানি তার ছোটবেলা থেকেই ওই মহিলাটাকে স্বাভাবিক কোনো নারী মনে হয় না, কেমন যেন অদ্ভুত চুপচাপ থাকে সারাক্ষণ। কেউ চরম খারাপ ব্যবহার করলেও সে কোনো পাল্টা রাগ দেখায় না, যেন দীর্ঘ বছর ধরে কোনো একটা বড় কিছুর অপেক্ষায় আছে, আর সেই কারণেই এখন সবকিছু মুখ বুজে সহ্য করে যাচ্ছে।বাঁধন নিজের চওড়া বুকটা ফুলিয়ে বড় বড় কয়েকটা লম্বা শ্বাস নেয়, তার উত্তপ্ত ফুসফুসটা আস্তে আস্তে শান্ত হয়ে আসে। সে বেশ শান্তভাবে রূপার পাশ থেকে নিজের লম্বা শরীরটা সোজা করে উঠে আসে, রূপার ওই কান্নায় ভেঙে পড়া বিবর্ণ মুখটার দিকে গভীর চোখে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,

—- “ওকে, মানলাম তুই কিছু জানিস না। আই বিলিভ ইউ। তবে এসব কথা তোর ওই মা যেন কোনোভাবেই না জানতে পারে। জানলে আমার থেকে খারাপ আর কেউ হবে না! মাইন্ড ইট!”
রূপা ভয়ার্ত চোখে বাঁধনের মুখের দিকে চেয়ে থেকে দ্রুত হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ায়। বাঁধন আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়িয়ে না থেকে দরজার দিকে পা বাড়ায়, কিন্তু খিলটার কাছে গিয়ে কী ভেবে যেন হুট করে থেমে যায়। সে দরজার হাতলে হাত রেখে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে বিছানায় জড়সড় হয়ে থাকা রূপার দিকে তাকায়, ঠোঁটের কোণে একটা রহস্যময় ক্ষুরধার রেখা ফুটিয়ে কড়া গলায় বলে,
—- “যদি সত্যি তুই আমার সৎ বোন না হোস, তাহলে সেদিন থেকে তোর জীবনটা বন্দী হবে কারাগারে। পার্থক্য এটাই, জেলের কারাগারে না, কারো জীবনের কারাগারে! ইউ উইল বি ট্র্যাপড ফরএভার!”
বলেই বাঁধন এক ঝটকায় দরজাটা খোলে, তারপর খটাস করে সেটা টেনে ওখান থেকে চলে যায়। রূপার মাথায় বাঁধনের এই শেষ অদ্ভুত কথাগুলো একদম ঢোকে না, তার পুরো মগজ এখন অন্য এক অচেনা জগতে হারিয়ে গেছে। তার বুকের ভেতরটা এক মারাত্মক ঝড়ে তোলপাড় হচ্ছে তার বাবা যদি মারুফ হোসেন না হয়, তবে তো রজনী রহমানও তার মা না! তাহলে সে কার মেয়ে? সে আসলে কে? এই ভয়ানক প্রশ্নটা মাথায় আসতেই রূপার পুরো শরীর অবশ হয়ে আসে, সে বিছানায় ধপ করে শুয়ে পড়ে বালিশে মুখ গুঁজে অঝোরে কেঁদে দেয়। তবে কি সে এতিম? এই বিশাল পৃথিবীতে তার কি আপন বলতে কোনো বাবা-মা নেই।
অন্য দিকে বাঁধনের মাথায় তখন হাজারো চিন্তা কিলবিল করছে, যেকোনো ভাবেই হোক তাকে রূপার আসল পরিচয় বের করতে হবে। রূপার আসল জন্মদাতা বাবা কে, তার শেকড় কোথায় সবকিছু নিখুঁতভাবে জানতে হবে। কিন্তু সেই সব বড় বড় চিন্তার ওপর টেক্কা দিয়ে তার মগজে বারবার চক্কর কাটছে সেদিন রাতের ওই রহস্যময়ী মেয়েটার কথা। রূপার ওই বাদামি রঙের চোখের মণি দুটো দেখে কেন জানি তার মনের গভীরের পুলিশি সন্দেহ বারবার সায় দিচ্ছে, সেদিন রাতের মেয়েটা আর কেউ নয়, ওটা এই রূপাই ছিল!

এত মানসিক চাপ আর সহ্যসীমার মধ্যে থাকছে না, শরীরের সবকটা রগ যেন ছিঁড়ে আসতে চাইছে। নিজের রুমে এসে কোমর থেকে ভারী রিভলবারটা খটাস করে টেবিলের ওপর রেখে, গায়ের পুলিশের ইউনিফর্মটা না খুলেই সে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে যায়। শাওয়ারের নবটা ঘুরিয়ে দিতেই ঝমঝম করে ঠাণ্ডা জল আছড়ে পড়ে তার মাথায়, কিন্তু চোখ বন্ধ করতেই সেখানে এক নিমেষে ভেসে ওঠে রূপার ওই অশ্রুশিক্ত মায়াবী মুখটা। বাঁধনের বুকের বাঁ পাশটা আচমকা এক তীব্র মোচড়ে কেঁপে ওঠে, ঝড়ের গতিতে চোখের পাতা খোলে সে, ফুসফুস চিরে একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে জলের শব্দের মাঝেই অজান্তেই বিড়বিড় করে ওঠে,
—- “কী একটা জ্বালা! রাগ করলে বুক উজাড় করে আদর করতে ইচ্ছে করে, হাসলে মায়াবী ওই ঠোঁটে চুমু খেতে ইচ্ছে করে, কাঁদলে নেশা ধরে যায়, কথা বললে মনে হয় অনন্তকাল শুধু শুনেই যাই! একবার তাকালে পলক ফেলার কথা ভুলে বারবার তাকাতে ইচ্ছে করে, সামনে আসলে বুকের ভেতর হার্টবিট ড্রাম বাজানো শুরু করে, দূরে গেলে চারপাশটা একদম শূন্য লাগে, পাশে থাকলে ছাড়তে ইচ্ছে করে না! আর এই হাজারো ইচ্ছে-অনুভূতির মাঝে আমি আমার বা’লের মনকে বোঝাই আমি তাকে শুধুই ঘৃণা করি! ও আল্লাহ, উপর থেইকা দড়ি ফালাও, আমি উইঠা আসি।”

১০/৫/২০২৬
বুধবার সকাল: ৯:০০
রূপা আর বৃষ্টি কলেজে যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামে। রূপার চোখের পাতাগুলো কাল রাতের কান্নায় অস্বাভাবিক ফুলে ফেঁপে আছে, বৃষ্টির মনটাও একদম ম্লান, মনমরা। কাল রাতে রূপা তাকে ঘরের ভেতরের সব কথা খুলে বলেছে, যা শুনে বৃষ্টির নিজেরও প্রচণ্ড খারাপ লেগেছে। সে রূপাকে কড়াভাবে বুঝিয়ে বলেছে, বাঁধন ভাইয়া যেহেতু বারণ করেছে, তাই এসব বিষয়ে কোনো কথা যেন রজনী রহমানকে কোনোভাবেই না বলা হয়। কারণ একজন এসপি কখনো ভুল পথে হাঁটে না, সে যখন বলেছে তখন তার পেছনে নিশ্চয়ই বড় কোনো কারণ আছে।
তবে রূপা নিজের মনের ভেতর একটা মস্ত বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে বাঁধনের ল্যাপটপটা ফিরিয়ে দিয়ে সে সোজা হোস্টেলে চলে যাবে। এই বেইমান, রহস্যে ঘেরা মানুষদের সাথে সে আর এক ছাদের নিচে থাকতে চায় না। যদিও আহসান রহমান তাকে খুব আদর করেন, নিজের মেয়ের মতোই ভালোবাসেন, তবু রূপার এখন কেমন জানি নিজেকে বড্ড অসহায় আর একা মনে হচ্ছে। বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে তার, কেন জানি মনে হচ্ছে সে এই বাড়ির ওপর একটা মস্ত বড় বোঝা, এই বাড়ির আসলে কেউ না সে, শুধু শুধু এক কোণে পড়ে আছে। অন্য দিকে বাঁধনও তাকে দুচোখে দেখতে পারে না। তাহলে এত বড় বোঝা হয়ে এখানে থেকে লাভ কী? তাই সে বাড়ি ছাড়ার এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ডাইনিং টেবিলে তখন আহসান রহমান, হাজি রহমান, আতিক রহমান, রজনী রহমান আর শিল্পী রহমান বসে আছেন। তারা সবাই এক সাথে সকালের খাবার খাওয়ার জন্য ওদের দুজনের পথ চেয়ে অপেক্ষা করছিলেন। রূপা টেবিলের সামনে এসে বাড়ির সবার সাথে টুকটাক লৌকিক কথা বলে না খেয়েই সোজা মেইন দরজার দিকে পা বাড়ায়। তা দেখে আহসান রহমান হাতের চামচটা রেখে চিন্তিত মুখে বলেন,

—- “কী হয়েছে মা? না খেয়ে ওই দিকে কোথায় যাচ্ছো?”
রূপা নিজের পা দুটো থমকে নিয়ে আহসান রহমানের দিকে ঘাড় ঘোরায়। নিজের ফোলা চোখ দুটো লুকিয়ে মুখের চামড়ায় হালকা একটা ম্লান হাসি ফুটিয়ে বলে,
—- “আমি খাবো না বাবা, একটুও খিদে নেই। তোমরা খেয়ে নাও।”
বলেই সে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে শুকনো গলায় বলে,
—- “তুই খেয়ে আয়, আমি বাইরে তোর জন্য অপেক্ষা করছি।”
মেয়ের এমন ফ্যাকাশে মুখ দেখে রজনী রহমান আসন ছেড়ে কড়া গলায় বলেন,
—- “না খেয়ে যাবি মানে? আয় বলছি, এখনি টেবিলে বোস, খেয়ে যা!”
রূপা এক পলক রজনী রহমানের মুখের দিকে তাকায়। তার চোখের মণির দিকে চেয়ে কাল রাতের বাঁধনের কথাগুলো মাথায় আসতেই বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে। সে একটা মলিন, স্লান হেসে ভেজা গলায় বলে,
—- “সত্যি খিদে নেই আমার।”
বলেই রূপা এক সেকেন্ডও না দাঁড়িয়ে দ্রুত বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। তার অমন চলে যাওয়া দেখে পেছন পেছন বৃষ্টিও খাবার না ছুঁয়ে এক কাপড়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। এক মুহূর্তের মধ্যে পুরো ডাইনিং টেবিলে এক থমথমে নীরবতা নেমে আসে। হুট করে মেয়ে দুটোর কী হলো, কেন তারা মুখ চুন করে না খেয়ে চলে গেল, টেবিলে বসা কেউ তার কিছুই বুঝতে পারলো না।বাইরে এসে বৃষ্টি রূপার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কপালে মৃদু ভাঁজ ফেলে হালকা ধমকের সুরে বলল

—- “না খেয়ে কেন চলে আসলি?”
রূপা নিজের ভেজা চোখ দুটো মাটির দিকে নামিয়ে মলিন গলায় বলল,
—- “আমার সত্যি খিদে নেই রে। কিন্তু তুই কেন চলে আসলি? আমি বললাম না আমি বাইরে দাঁড়িয়ে তোর জন্য অপেক্ষা করছি?”
বৃষ্টি রূপার দু কাঁধ ধরে এক ঝাঁকুনি দিয়ে নিজের ওপরের ঠোঁটটা শক্ত করে চেঁচিয়ে উঠল,
—- “তোর কী মনে হয়? তুই না খেয়ে চলে আসবি আর আমি ওখানে গোগ্রাসে গিলে আসব? মরে গেলেও না! এখন চল, না খেয়ে তো আর জীবন চালানো যাবে না। তাই দুজনে মিলে কলেজে গিয়ে ঝটপট ক্যান্টিন থেকে কিছু একটা খেয়ে নেব।”
বলেই দুজনে একটা খালি রিকশা ডেকে চেপে বসল এবং সোজা আনন্দ মোহন কলেজে চলে আসল। তারপর দুজনে মিলে ক্যান্টিনে গিয়ে হালকা কিছু খাবার খেয়ে পেট পুজো করে নিল। খাওয়া শেষ করে দুজনে যেই না ক্লাসে প্রবেশ করতে যাবে, এমন সময় আচমকা রূপা সামনের দিক থেকে আসা একটা মেয়ের সাথে মারাত্মক জোরে ধাক্কা খেয়ে ফ্লোরে পড়ে গেল। ডান হাতের কনুইটা সিমেন্টের মেঝেতে ঘষা খেয়ে তীব্র ব্যথায় মুখ কুঁচকে কুঁকিয়ে উঠল সে,

—- “আহহহ!”
অন্য দিকে সীমা ক্লাস থেকে তড়িঘড়ি করে বেরোচ্ছিল, হুট করে সামনে কারো উপস্থিতি টের পাওয়ার আগেই এই ধাক্কাটা লেগে যায়। সীমা অপরাধবোধে ভুগে তাড়াতাড়ি রূপার হাতটা শক্ত করে ধরে মেঝে থেকে ওপরে তুলতে তুলতে ব্যাকুল গলায় বলল,
—- “সরি, সরি! বড্ড ভুল হয়ে গেছে। তোমার কোথাও বেশি লাগেনি তো?”
রূপা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সীমার মুখের দিকে তাকায়। সীমার চোখের মণি ছাড়া মুখের বাকি কোনো অংশ দেখা যাচ্ছে না পুরো শরীর কালো বোরকায় ঢাকা, মাথায় হিজাব পড়া আর মুখটা যত্ন করে নিকাব দিয়ে বাঁধা। রূপা নিজের কনুইয়ের ব্যথাটা চেপে ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে বলল,
—- “না, না, আমি ঠিক আছি। তুমি কে? তোমাকে তো আগে কখনো আমাদের ক্লাসে দেখিনি?”
সীমা নিজের চোখের পাতা দুটো হালকা নামিয়ে লাজুক গলায় বলল,
—- “আমি আসলে কালকেই এই কলেজে নতুন ভর্তি হয়েছি। আমার নাম সীমা, গ্রাম থেকে এসেছি।”
রূপা সীমার এই সহজ-সরল কথা শুনে আরও চওড়া করে হেসে নিজের হাতটা বাড়িয়ে বলল,
—- “ওহ আচ্ছা! আমি রূপা।”

দুজনের এমন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলা দেখে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বৃষ্টির ভেতরটা হিংসায় একদম জ্বলেপুড়ে শেষ! তার একমাত্র বেস্টি হুট করে কেন অন্য একটা মেয়ের সাথে এত খাতির জমিয়ে এত মিষ্টি করে কথা বলবে? সে এক প্রকার জোর করেই রূপার কবজিটা খামচে ধরে এক টান মেরে সীমার কাছ থেকে সরিয়ে ক্লাসের ভেতরে নিয়ে চলে আসে।ক্লাসের ভেতরে তখন একদম পেছনের জানালার ধারের বেঞ্চে বসে নাদিয়া আর কেয়া নিজেদের মাঝে হাত নেড়ে নেড়ে গভীর গল্পে মেতে আছে।কিছুক্ষণের মধ্যে আকাশ ক্লাসের ভেতরে প্রবেশ করে। আকাশকে দেখা মাত্রই আজকে ক্লাসের ছাত্রীদের চোখ যেন এক নিমেষে কপালে উঠে যায়! ক্লাসের পরিবেশ মুহূর্তে বদলে যায়, সব ছাত্রী তড়িঘড়ি করে সিট ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। বৃষ্টিও আকাশের দিকে তাকিয়ে চরম অবাক হয়ে যায়।আকাশের পরনে আজকে একটা ইস্ত্রি করা ধবধবে সাদা শার্ট, কুচকুচে কালো প্যান্ট আর তার ওপর চাপানো একটা নেভি ব্ল্যাক কোট। এই প্রথম আকাশকে সবাই এভাবে কোট পরা অবস্থায় দেখল, কারণ এর আগে সে সবসময় সাধারণ শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গুটিয়েই ক্লাসে আসত। কলেজের অর্ধেক ছাত্রী তো আগে থেকেই আকাশের রাজকীয় লুকের ওপর ক্রাশ খেয়ে বসে আছে, তার ওপর আজকে এই কোট পরা ড্যাশিং রূপ দেখে নতুন করে যেন আবারও ক্রাশ খেলো সবাই। তবে আকাশের মুখটা আজকে স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশিই থমথমে আর গম্ভীর দেখাচ্ছে। সে গটগট পায়ে ক্লাসের মাঝখানে এসে গম্ভীর গলায় সকল ছাত্র-ছাত্রীদের বসার জন্য ইশারা করল। বসার পর সে এক পলক বৃষ্টির দিকে তাকাল, বৃষ্টির অবাক হওয়া চোখ জোড়া দেখে মনে মনে কী যেন ভেবে ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা, রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে তুলল। তারপর সেই হাসি মুছে সোজা নিজের লেকচারে মনোযোগ দিল।আজকে যেন ক্লাসটা খুব দ্রুত শেষ হয়ে গেল। ক্লাসের একদম শেষ দিকে এসে আকাশ টেবিলের ওপর দুই হাত রেখে সকল ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে চড়া গলায় বলল,

—- “শোনো, আজকে আমি তোমাদের কিছু অন্যরকম মজার টাইপের প্রশ্ন করব। তোমরা যদি আমার করা প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারো, তাহলে কাল কলেজের ক্যান্টিনে যে যা খাবে সব বিল আমি নিজের পকেট থেকে দেব! ধরতে পারো এটা এক ধরনের খেলা।”
আকাশের মুখ থেকে এই কথা শোনা মাত্রই ক্লাসের সবার চোখ যেন চড়কগাছে! এই গম্ভীর, রাশভারী স্যার আবার তাদের সাথে এমন মজার খেলা খেলবে এটাও আজ নিজেদের কানে বিশ্বাস করতে হচ্ছে! পরক্ষণেই পুরো ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রীরা চরম উৎসাহিত হয়ে আনন্দের চোটে চিৎকার করে উঠল। বৃষ্টি বেঞ্চে বসে নিজের নিচের ঠোঁটটা কামড়ে বাঁকা চোখে তাকায় আকাশের দিকে এই ফ্লার্ট স্যার আবার মাথার ভেতর কী নতুন খেলা নিয়ে এসেছে, আল্লাহই ভালো জানে।আকাশ এক এক করে ডায়েরি হাতে সবার বেঞ্চের সামনে যেতে থাকল আর মজার মজার ধাঁধার মতো প্রশ্ন ধরতে থাকল। কেউ তোতলাতে তোতলাতে উত্তর দিতে পারছে, আবার কেউ লজ্জায় মাথা নিচু করে মুখ বন্ধ করে রাখছে। বন্ধুদের ভুলভাল উত্তর শুনে ক্লাসের সবাই হাসতে হাসতে বেঞ্চের ওপর গড়াগড়ি খাচ্ছে। হাসাহাসির সেই শোরগোলের মাঝেই আকাশ ধীরে ধীরে পা বাড়িয়ে এসে দাঁড়াল রূপার বেঞ্চের ঠিক সামনে। রূপা অস্বস্তি কাটিয়ে সটান হয়ে ধপ করে দাঁড়িয়ে পড়ল। আকাশ রূপার ফোলা চোখ দুটোর দিকে এক পলক তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে হালকা হেসে বললো,

—- “রূপা, তুই এই মুহূর্তে নিজের চোখ জোড়া একদম শক্ত করে বন্ধ করবি। চোখ বন্ধ করে যেকোনো একটা পশুকে মনে মনে কল্পনা করবি। তোর কল্পনায় সবার আগে যে পশুটা ভেসে আসবে, ওই পশুর নাম বলবি এবং তার ডাকটা হুবহু কপি করে ক্লাসের সবাইকে শোনাবি।”
ক্লাসের সবাই এবার তুমুল উত্তেজনা আর উৎসাহ নিয়ে রূপার দিকে তাকায়। রূপা হুট করে এমন অদ্ভুত টাস্ক পেয়ে একদম ভ্যাবচেকা খেয়ে যায়, তার হাত-পা যেন জমে বরফ হয়ে আসে। স্যারের মুখের ওপর প্রশ্ন করার মতো সাহস তো তার কোনো জন্মেও নেই, তাই সে বাধ্য মেয়ের মতো নিজের ভারী চোখের পাতা জোড়া বন্ধ করে ফেলে। কিন্তু চোখ বন্ধ করতেই একি সর্বনাশ! অন্ধকার পর্দায় কোনো পশুর বদলে সবার আগে ধক করে ভেসে ওঠে বাঁধনের সেই রাগাতুর, হিংস্র চেহারাটা! রূপার বুকের ভেতরটা এক মারাত্মক ঝটকায় ধক করে ওঠে, হাত-পা কাঁপতে থাকে। এই মানুষটার চেহারা কেন তার কল্পনায় ভাসছে! সে মাথাটা হালকা ঝাঁকিয়ে অনেক কষ্টে বাঁধনের মুখটা মন থেকে তাড়ানোর চেষ্টা করল। অনেক জোরাজুরি করে কল্পনা করতে করতে শেষমেশ একটা মোরগের ছবি তার কল্পনায় ভেসে উঠল। সে একটা স্বস্তির শ্বাস ফেলে চোখ খুলে তড়িঘড়ি করে বলল,

—- “স্যার, মোরগ ভেসেছে।”
আকাশ নিজের কোটের বোতামে হাত দিয়ে হালকা হেসে বলে,
—- “গুড। তো মোরগ কীভাবে ডাকে?”
রূপা লজ্জায় লাল হয়ে চারপাশের বন্ধুদের দিকে তাকায়। সবাই মুখ চেপে হাসছে। সে নিজের গলাটা হালকা খাঁকারি দিয়ে পরিষ্কার করে নিয়ে, চোখ জোড়া বন্ধ করে মোরগের মতো গলা উঁচিয়ে ডাক দেয়।
—- “কুক্কুরুকুউউউউউ”
রূপার এমন মোরগের ডাক শুনে পুরো ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রীরা হাসির চোটে ফেটে পড়লো, হাসতে হাসতে তারা যেন বেঞ্চ থেকে মেঝেতে পড়েই যাচ্ছে। হাসির সেই তুমুল শোরগোলের মাঝেই আকাশ খুব ধীরে পায়ে হেঁটে এসে দাঁড়াল বৃষ্টির বেঞ্চের ঠিক সামনে। আকাশকে নিজের এত কাছে আসতে দেখে বৃষ্টি লজ্জায় আর অস্বস্তিতে ঝটপট নিজের মাথাটা নিচু করে ফেলে। আকাশ নিজের নিচের ঠোঁটটা দাঁত দিয়ে আলতো করে কামড়ে মনে মনে এক পিশাচী হাসি হেসে মনে মনে বলে,

—- “ও আমার বেগমা, আমার আসল কাজ তো তোমাকে দিয়েই!”
বলেই আকাশ নিজের মুখের সেই হাসির রেখা মুছে এক নিমেষে মুখটা মারাত্মক গম্ভীর করে ফেলে। সে বৃষ্টির নিচু হওয়া মুখের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে কড়া গলায় বলে,
—- “বলো তো, ‘আমার সোনার বাংলা’ গানের এই লাইনের পরের লাইন কী?”
গানের লাইনের উত্তরটা খুব ভালো করেই জানা আছে, এই খুশিতে বৃষ্টি নিজের সব লজ্জা আর দ্বিধা ভুলে মুখটা সোজা করে ফেলে। সে বেশ চওড়া করে হেসে আকাশের চোখের মণি বরাবর তাকিয়ে একদম চটপট বলে দেয়,
—- “আমি তোমায় ভালোবাসি!”

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ২২

হুট করে বৃষ্টির মুখ থেকে বের হওয়া এই তিনটা শব্দ আকাশের বুকের ঠিক মাঝখানে, তার হৃদস্পন্দনে গিয়ে যেন তীরের মতো বিঁধে যায়! এক ধাক্কায় এই শব্দগুলো তার পুরো মস্তিষ্ক ভেদ করে মগজের একদম গভীরে ঢুকে পড়ে, কলিজাটা ছ্যাৎ করে একদম অন্তরাত্মায় গিয়ে নাড়া দেয়। খেলাটা সবার কাছে একটা নিছক মজা হলেও, এই মুহূর্তে আকাশের বেলাতে সেটা মোটেও কোনো মজা রইল না। এক অদ্ভুত ঘোর লাগা, নেশাতুর তীব্র দৃষ্টিতে সে বৃষ্টির ফোলা ফোলা ঠোঁট দুটোর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে, তার মুখের চোয়ালটা আলগা হয়ে আসে।স্যার আর বৃষ্টির এই কাণ্ড দেখে ক্লাসের বাকি সব ছাত্র-ছাত্রীরা হাসতে হাসতে নিজেদের টেবিল চাপড়ে চিৎকার করে বলতে থাকে,
—- “এ কী মজা! বৃষ্টি তো সরাসরি স্যারকে প্রপোজ করে বসলো!”

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ২৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here