আসবো ফিরে আবারো পর্ব ২১
সুরভী আক্তার
রাত্রি এখন দশটা,,,
ডক্টর এসেছিলো তখন । মেঘার শারীরিক অবস্থা অবলোকন করে চলে গেছেন । এখন জ্বর পড়েছে একটু । মেয়েটার শরীর নিস্তেজ । শক্তি হারিয়ে দূর্বল হয়ে পড়ে আছে এ অবধি । রাতের খাবার মুখে তুলে খাইয়েছেন শাহিনা কাবির । প্রেসক্রিপড সব মেডিসিন খেয়ে সময়ের আগেই ঘুমিয়েছে মেঘা ।
বেপরোয়া ছেলে বাড়িতে নেই । বারবার নাকোচ করা সত্ত্বেও সব নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বেরিয়ে পড়েছে রোজকার মতো । ফিরবে তো সেই মাঝরাতে ।
ইদানিং বিদেশ থেকে ফেরার পর একটা আড্ডা খানা জুটেছে ওদের । রোজ রোজ দশটার পর রৌদ্র কে সঙ্গ দিতে চলে আসে ওর বন্ধুরা । রৌদ্র ব্যাতীত সবাই নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত সারাদিন । সময় কুলোয় না বন্ধু কে কম্পানি দেওয়ার জন্য । রাতে সময় করে চলে আসে একবার হলেও ।
ক্রিস্টাল ক্যাফের দ্বিতীয় তলায় পার্টি জোন । পাবে নাচ গান হয় বড়লোকের বিগড়ে যাওয়া সব ছেলে মেয়েদের । ঠিকঠাক বলতে গেলে বখাটে বলা চলে এদের ।
মাঝে পার্টিশন দিয়ে একপাশ আলাদা করে ঘরের মতো । সেদিকটা কাবির পরিবারের ছোট ছেলের জন্য অকুপাইড । লাস্ট কদিন ধরে বারের এই আলাদা জায়গাটা কেবলই নিজের জন্য বরাদ্দ করে নিয়েছে সে । কারোর ডিস্টার্ব নেই এখানে ।
ক্যারাম বোর্ড সে ঘরের এক কোণে । সার্ভেন্ট এসে খানিক আগে চারটে উইস্কির বোতল রেখে গেছে ।
তুহিন , সৌভিক , রোহান , আর রৌদ্র চারজন বসেছে খেলতে । একপাশে নাচগান হচ্ছে উশৃঙ্খলের মতো । গান শোনা যাচ্ছে এপাশ হতেই । অন্যপাশে ওরা চারজন ঠান্ডা মাথায় খেলতে রত । এখানে আসা মানেই ক্যারাম খেলা বর্তমান । অ্যালকোহলের নেশার পর বাজি লেগে এই ক্যারাম খেলার নেশাটা এক কালে বড্ড জ্বালাতো রৌদ্র কে । তবে এখন স্বভাব বদলেছে । সেই নেশা টা চূড়ান্ত নেই আজ আর ।
বাম হাতের উইস্কির বোতলে চুমুক বসিয়ে নিলো রৌদ্র । দৃষ্টি খুব তীক্ষ্ণ করে স্ট্রাইকার দিয়ে ক্যারাম বোর্ডের সাদা গুটিটাকে তাক করে কিক করলো সজোরে । লক্ষ্যচ্যুত হলো এইবার মিলে চতুর্থ বার । ফসকালো নিশানা । এভাবেই দিকভ্রান্ত হয়ে আসছে সেই খেলা শুরু হয়েছে থেকে । এপর্যন্ত একটা গুটিকেও নিশানা করে পকেটে ফেলতে পারে নি । বারবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়ায় এবার চরম বিরক্ত হয় সে । দাঁত খিচে পা দিয়ে সজোরে লাথি বসায় চারকোনা কাঠের বোর্ডে । উল্টে পড়ে বোর্ডটা । হিসহিসিয়ে অস্পষ্ট স্বরে উচ্চারণ করে….
” ফা*কিং গেইমস ! আই ওন্ট প্লে….
এটুকুনি বলেই দুই হাঁটুতে দুই কনুই ঠেসে খামচে চেপে ধরলো মাথার চুল । চোখ বোজা মাত্রই বন্ধ চোখ সম্মুখে ভেসে উঠলো জ্বরে কাতরানো বেঢাল রমনীর শুকনো মুখাবয়ব । মাথায় জোঁকের ন্যায় জেঁকে বসে আছে ঐ মেয়ে । কিছুতেই বাদ বাকিতে মন বসছে না । বসাতে পারছে না রৌদ্র । এখন ঐ মেয়ের জ্বর কেমন হলো কে জানে ? কমেছে তো জ্বর ? সুস্থ হয়েছে কি একটু ? নাকি সেভাবেই অসার হয়ে পড়ে আছে ?
শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছে রৌদ্রের । স্বস্তি মিলছে না কিছুতেই । হাঁসফাঁস লাগছে ঐ মেয়ের কথা স্মরণে । রৌদ্র তো মাথা থেকে সরাতে চাইছে , পারছে আর কই ? ইডিয়ট টা গেড়ে বসে আছে সম্পুর্ন মস্তিষ্ক জুড়ে ।
আর পারা যাচ্ছে না । দম বন্ধ হয়ে আসছে এবার । শরীর কাতরাচ্ছে । রৌদ্র জিভে ঠোঁট ভেজায় । বন্ধুরা একে অপরের দিকে তাকায় । রৌদ্র কে পরখ করে বলে রোহান…
” রুডি , আর ইউ ওকে ? হলো টা কি হঠাৎ ? খেলবি না ?
” তোরা খেল । আ’ম গোয়িং….
উঠে দাঁড়ায় রৌদ্র । তুহিন প্রশ্ন ছোড়ে….
” কোথায় ?
” বাড়িতে ।
” এতো তাড়াতাড়ি ?
” হু , আর পারছি না । দেয়ার ইজ নো পিস ফর মি… নট আনটিল আই সি হার….
রৌদ্র পা বাড়াতে গেলে রোহান প্রশ্ন করে থামায় ওকে….
” তোর ভাবসাব বুঝতে পারছি না ভাই । থাকতে পারছিস না ওকে না দেখে ! ওকে কি ভালোবেসে ফেললি তাহলে ? রুডভিক কাবির রৌদ্র তাহলে ফোর্স ম্যারেজ করার এতো বছর পর বউকে ভালোবেসে ফেললো ? সিরিয়াসলি ব্রো , ইউ ফলেন ইন লাভ ? ইটস্ পসিবল….
সৌভিক মুখে ব্যাথাতুর ভঙ্গিমা প্রকাশ করে । রোহানের পিঠে চাপড় মেরে বলে…
” তা আর বলতে ? ঐ মেয়েকে ছেড়ে যাবে না বলে কোনো কিছুর পরোয়া না করে নিজের জীবন বাজি রেখে নিজের এক্সিডেন্ট নিজেই করালো এই ছেলে । আঘাত দেখেছিস ওর মাথার ? আমাকে গাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে , যাতে বেশি আঘাত না পাই । আবার কেউ যাতে সন্দেহ না করে তাই এক পাঞ্চে কপাল ফাটিয়েও দিয়েছে আমার ।
রোহান আর তুহিন হো হো করে হেসে উঠলো । টিটকারী মারলো তুহিন….
” ব্যাথা পেয়েছিলি দোস্ত ?
” হুহহহহ , মজা নিচ্ছিস ? কতটা ব্যাথা পেয়েছিলাম যদি বোঝাতে পারতাম তোদের । আমার কথা ছাড় , ভেবে দেখতো … যদি ওভাবে এক্সিডেন্টের ফলে এদিক ওদিক কিছু একটা হয়ে যেতো রৌদ্রের ! তাহলে কি হতো ? মজা পেয়েছে ও সবকিছুতে । বেপরোয়া গিরির লিমিট থাকে একটা । তুই যাবি না যাস না । এভাবে ইগো বজায় রেখে বেপরোয়া হয়ে নিজের এক্সিডেন্ট করানোর কি প্রয়োজন ছিলো ?
তাল মেলায় বাকি দুজন ।
” সিরিয়াসলি ভাই , এভাবে রিস্ক নেওয়া মোটেও উচিত হয় নি । যদি বেশি কিছু হয়ে যেতো তখন ?
” বেশি কিছু তখনই হতো , যখন আমি করাতাম । লাইফ এবং গাড়ি , দুটো কন্ট্রোলে রেখে তবেই এক্সিডেন্ট করিয়েছি । মরার জন্য করাই নি । জাস্ট টেক ইট ইজি । আমার যাওয়া টা ক্যান্সেলের জন্য ছোট্ট একটা নাটক সাজিয়েছি শুধু । কিচ্ছু হতো না আমার….
দীর্ঘ শ্বাস ফেলে রোহান । বলে হুতাশ করে….
” বাহ্ ভাই বাহ্ , ব্রাভো । একটা মেয়ের জন্য এতো কিছু ? জাস্ট ওর কাছে থাকার জন্য ? এই থেকে কি বুঝলি ? ইউ ব্যাডলি ফলেন ইন লাভ….
” লাভ মাই ফুট , আই হ্যাভেন্ট ফলেন ইন লাভ উইথ হার অ্যাট অল । সি ইজ মাই ফল্ট । আর আমি ভুল শোধরানোর চেষ্টা করবো শুধু ।
” আচ্ছা ? এখনো ওকে নিজের ভুল ভাবিস ? একটা মেয়ের জন্য নিজের জীবন বাজি….
” ওওও শাট আপ ,, সি ইজ মাই ওয়াইফ । আমি মানলেও ও আমার ওয়াইফ , আর না মানলেও ও আমারই ওয়াইফ । ও আমার জীবনের ভুল হলেও আমারি ওয়াইফ , আর সঠিক হলেও আমারই ওয়াইফ । এভাবে একটা মেয়ে,একটা মেয়ে কাকে বলছিস তুই ? রেসপেক্ট হার । সি… ইজ…মাই ওয়ান এন্ড অনলি বেডফিলোউ । মাই সানি….
রৌদ্র আর থামলো না । কথা টুকু শেষ করেই গটগটিয়ে বেরিয়ে গেলো পাব হতে । পেছনে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো বাকি তিনজন ।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে সময় সাড়ে এগারোটার কাছাকাছি ।
চাবি দিয়ে সদর খুলে ভেতরে ঢুকলো রৌদ্র । ড্রইং রুমের লাইট জ্বলছে এখনো । কেউ হয়তো জেগে আছেন । তবে বসার ঘরে কাউকেই দেখলো না সে । কিচেন থেকে ঠুকঠাক আওয়াজ আসলো । এ বাড়ির সবাই নিয়ম মেনে চলে । এগারোটা হতে হতেই ঘুমিয়ে পড়ে সবাই । কদিন ধরে বিয়ে থেকে শুরু হয়ে এসব ঝুট ঝামেলায় নিয়মে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে একটু ।
রৌদ্র গা বাঁচিয়ে সোজা উপরে উঠলো । নিজেকে প্রাধান্য দেওয়ার আগে মন মস্তিষ্কের তৃপ্ততা খুঁজে নিলো । ছটফটে অবাধ্য মন জুড়ে বিচরণ কারিনী কে এক ঝলক দেখার তৃষ্ণায় ব্যাকুল তার ছন্নছাড়া হৃদয় । এই আকুলতা কে শিথিল না করা অবধি স্বস্তি মিলবে না । দম ফেলতে পারবে না সে ।
করিডোরে এদিক ওদিক সতর্কিত নজরে তাকালো । সামনের ঘরটার দরজা চাপানো । হাত লাগাতেই খুলে যাবে । রৌদ্র হাঁফ ছাড়ে । দরজা ঠেলে সন্তর্পণে নিঃশব্দে পা ফেলে ঘরে ঢোকে । লালচে রঙের ডিম লাইট জ্বলছে রমনীর ঘরে । ঘোলাটে দেখাচ্ছে পুরো ঘর । রৌদ্র ঠাহরে ধারন করলো সবটা । মেঘা বিছানার ডান দিকে শোয় বরাবর । এ কদিনে ঠিক বুঝতে পেরেছে তা ।
রৌদ্র ঘাড় ডললো । আস্তে ধীরে এগোলো মেয়েটার দিকে । দুই ঘুমন্ত রমনীর ভারী নিঃশ্বাসে গুমোট পুরো ঘর । তবুও কোথাও যেন মিষ্টি সুঘ্রাণ পাচ্ছে সে । শ্বাস টেনে নিঃশব্দে মেঘার পাশে দাঁড়ায় ধীরে । ডান কাত হয়ে একেবারে বিছানার ধারে শুয়ে আছে মেয়েটা । একটু বেগতিক হলেই পড়তে সময় লাগবে না । রৌদ্র দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করে । মেয়েটার অবয়ব বুঝতে পারে না লালচে আলোয় । বিরক্ত হয় খানিক । মুখে চ সূচক শব্দ উচ্চারণ করে ঠেকায় বিরক্তির মাত্রা । বসে অস্বস্তি নিয়ে ।
কপালে হাত ছোঁয়ায় প্রথমে , না তাপমাত্রা একেবারেই স্বাভাবিক ।
আপনা আপনি স্বস্তিতে চোখ বুজে আসে রৌদ্রের । পড়ে লম্বা তৃপ্ত শ্বাস । হালকা হয় ভারাক্রান্ত হৃদয় । মিলিয়ে যায় সব উদগ্রীবতা । মৃদুমন্দ হাসি ফোটে ধুসর দুখানি ওষ্ঠপূটে । হাত সরিয়ে নেয় । এসির বাতাসে কুঁকড়ে শুয়ে আছে মেয়েটা । ডান দিকে আরেকটু কাত হলেই ধপাস করে পড়বে খাট হতে । রৌদ্র ওর ছিপছিপে দেহটাকে একটু আলগোছে সরিয়ে খাটের মাঝামাঝি স্থান দিলো । মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো বার দুয়েক । পাতলা কমফোর্টার জড়িয়ে দিলো শরীরে । বিড়বিড় করলো নির্বিশেষে…..
” ইডিয়ট,,,
তোর জন্য মরার পথ ধরেও বেঁচে ফিরলাম । আর তুই আমার বাঁচার রাস্তাটাই বদলে দিলি ? মস্তিষ্ক দখল করে রাজত্ব নিয়েছিস পুরোপুরি । শূন্য রাজস্বের অধিকারিণী হয়ে অবাধ্য এই রুডভিক কাবির রৌদ্রের পুরো মস্তিষ্ক জুড়ে দখলদারি চালাচ্ছে আরেক অবাধ্য রমনী । নিজের অবাধ্যতার বিরুদ্ধে গিয়ে না হয় তোর আধিপত্য মেনে নিলাম ।
আর একটু ও অপেক্ষা করে না । মেঘা কে শেষ পলক দেখে বেরিয়ে আসে রুম থেকে । ও বেরোনো মাত্রই ঝট করে বালিশ হতে মাথা তুলে চায় একবিংশী । শেষাংশে রৌদ্রের ছায়ামূর্তি নজরে আসে কেবলই । যত্ন টুকু সজ্ঞানে গ্রহণ করলেও বিড়বিড় করা কথা গুলো বুঝতে সক্ষম হলো না । চোয়াল খিচে নিজেও বিড়বিড় করলো একান্তে রাগ প্রকাশ করে..
” রাইনো মুখো ,,, আই জাস্ট হেইট ইউ ।
সকাল হতে না হতেই আদ্র ভার্সিটিতে বেরিয়েছে আজ একাই ।
সেও ছুটিতে ছিলো বেশ ক’দিন । মেঘা মোটামুটি সুস্থ , তবুও ওকে বাড়িতেই বিশ্রামে রেখেছে আজ । মেঘা না গেলে টুকটুকিও যাবে না ।
আদ্র একাই এসেছে তাই । প্রথম ক্লাস ওর নিজের । ক্লাস শুরু পাক্কা দশটায় । এখন ঘড়ির কাঁটা নয়টা পঞ্চাশের ঘরে । হাতে সময় নিয়ে সর্বদা বেরোয় সে । করিডোর দিয়ে দাম্ভিকতায় এগিয়ে চলেছে নিজের ক্লাসরুমের দিকে । পথিমধ্যে ফোন আসায় থেমেছে একটু । কানে ফোন গুঁজে কথা শেষ করেছে দাঁড়িয়েই । এর মধ্যেই ধুপধাপ দৌড়ানোর আওয়াজ কানে আসতেই কপাল জড়ো করে বিরক্তি নিয়ে পিছু ফিরে তাকালো ।
সেই আধো পরিচিত রমনী দ্রুত কদমে ছুটে আসছে । ওকে দেখা মাত্রই কপালের ভাঁজ তীক্ষ্ণ হয় আরো । কান থেকে ফোন নামিয়ে পকেটে পুরে নেয় । কব্জিতে বাঁধা ঘড়ির দিকে তাকায় এক ঝলক । ক্লাস শুরু হতে এখনো আট মিনিট বাকি । এই মেয়ে আজ সময়ের আগেই এসেছে । বাহ্ ! নিচের অধর উল্টিয়ে ভ্রু উঁচায় আদ্র । ক্লাসে ঢুকতে গিয়ে সেদিনের কথা মনে পড়া মাত্রই দাঁড়িয়ে যায় আবার ।
শিশির পায়ের গতি কমিয়েছে আদ্র কে দেখা মাত্রই । জড়োসড়ো হয়ে এক মুহুর্ত দাঁড়িয়ে ধীরে পা বাড়ালো চিবুক নামিয়ে । আদ্র কে সোজাসুজি নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ইতস্তত হলো । চোখ তুলে আলতো স্বরে সালাম দিলো । ফের নামিয়ে নিলো চোখ জোড়া । আদ্র উত্তর করলো কিনা কে জানে , আকস্মিক পাল্টা প্রশ্ন করে বসলো গমগমে গলায়…..
” তুমিই তো সেদিন ছিলে ? তাই না ?
” জ্বি স্যার ।
” নাম কি তোমার ?
” শিশির ।
” হু,, সেদিন গাড়ি থেকে কোথায় উধাও হয়ে গেছিলে ?
পিটপিট করে চোরা চোখ তোলে শিশির । ভেজা স্বরে বলে…..
” সরি স্যার ,, আপনি মেবি হেকটিক ছিলেন সেদিন । আমি চলে এসেছি পরে ।
” গুড , আসলেই বিজি ছিলাম । তোমার কথা মাথায় ছিলো না সেসময় ।
” ইটস্ ওকে !
” ক্লাসে যাও…..
শিশির মাথা তুলে তাকায় । লোকটার কন্ঠ বড্ড শান্ত । এভাবে স্থবির হয়ে কথা বলতে শোনে নি আগে । চোখাচোখি হয় দুজনার । শিশির না বুঝে শুধায় নিভু স্বরে…
” হু ?
আদ্র ডান হাতে ক্লাসের দিকে অভ্যর্থনার ভঙ্গিতে ইশারা করে বলে গলা ভার করে…..
” ক্লাসে যেতে বলেছি….!
এক মুহুর্ত বিলম্ব করে না মেয়েটা । এক চিলতে হেসে ক্লাসের দিকে পা বাড়ায় তড়িঘড়ি করে ।
আদ্র ভার্সিটি থেকে ফিরেছে দুপুর একটার দিকে । ফিরেই ড্রইং রুমে দেখতে পেলো বাড়ির সকলকে । টুকটাক মেহমান যারা থেকে গেছেন , সবাই বাড়িতে ফিরবেন আজ । লাঞ্চের পর পরই । সকালের নাস্তা সেরে শুভ্রর মামা-মামিরা চলে গেছেন বাড়িতে । তাদের বাড়ি গ্রামে । যাওয়ার আগে শুভ্র সহ সকলকে নিজেদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য ইনভাইট করে গেছেন । মাঝে সাবার ইয়ারলি পরীক্ষা আছে । দিন বিশেকের মধ্যে পরীক্ষা শেষ হবে । তখন গেলে মন্দ হয় না । দিন বিশেকের মাথাতেই গ্রামে যাওয়ার ডেট ফিক্সট হয়েছে এর মধ্যেই । শাহিনা কাবির বাপের বাড়িতে যান না আজ কতদিন । পড়াশোনা , কাজ , উভয়ের চাপে ছেলে মেয়েরাও যেতে পারে না । শাফাহ্ ভীষণ খুশি । নানু বাড়ি , মধুর হাড়ি । যাওয়াই হয় না আজকাল । শুভ্র যাবে ওর নতুন বউ কে নিয়ে । এই নিয়ে কতশত প্লানিং হলো ওদের মাঝে ।
লাঞ্চের সময় হয়েছে । খেতে বসবেন সকলে । মেঘা, শাফাহ্, সারা , সবাই ড্রইং রুমে উপস্থিত । আদ্র সকলকে একসাথে দেখে মুচকি হাসলো । এগিয়ে সেই ঘর্মাক্ত শরীরেই বসলো একপাশে । হাতে কিছু একটার প্যাকেট । দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বাড়িয়ে দিয়ে বললো মেঘার উদ্দেশ্যে…..
” মেঘ , এখানে কিছু খাবার আছে । তোর জন্য সবটা । সারাকেও দিস একটু ।
” কি আছে ভাইয়া ?
” মোমোস ! তোর ফেভারিট তো ? তাই নিয়ে আসলাম ।
মেঘা চিকচিক করে ওঠে । দ্রুত ঝাঁপিয়ে আদ্রের হাত থেকে প্যাকেটটা ছোঁ মেরে নিয়ে নেয় । শাফাহ্ ওষ্ঠ উল্টায় । আদ্রের কথাটা স্মরণ করে বলে…..
” শুধু মেঘার জন্য মোমোস এনেছো ? তুমি তো বাইরের খাবার খেতে দাও না ।
” হু । ইউ নো , মেঘার তো খুব ফেভারিট এটা । কাল থেকে তেমন কিছু খাচ্ছেও না ও । বাইরের খাবার হলেও সলিড আছে । এটা খেতে পারে ।
” সারা কে দিতে বললে কেনো তাহলে ?
” সারা তো আমাদের মেহমান । মেহমান কে রেখে মেঘ একলা একলা খাবে নাকি ? তার উপর আমাদের সারা হচ্ছে মেঘ বুড়ির বেস্ট ফ্রেন্ড । ওরা শেয়ার করে খেয়ে নেবে ?
শাফাহ্ মুখ মলিন করে । গাল ফুলিয়ে বলে অসহায় কন্ঠে….
” আর আমি ?
হাসি আটকে ওর কাঁদো কাঁদো চেহারার পানে তাকিয়ে কন্ঠ পুরু করে জবাব দেয় আদ্র…..
” আমি কি ? তুই ও খাবি ? ওওও শিট , তোর কথা তো মনেই ছিলো না । আমি তো শুধু একজনের খাওয়ার নিয়ে এসেছি । ভাগ করে যথাসম্ভব দুজন খাওয়া যাবে । এর বেশি তো খেতে পারবে না । বাই দ্যা ওয়ে , তুই কি আসলেই খাবি ? আমি তো তোর জন্য নিয়ে আসিনি । তোকে খেতে হবে না । মেঘ…তুই আর সারা খেয়ে নে । টুকটুকি খাবে না । এসব বাইরের খাবার ওর পছন্দ নয় ।
ওর কথা শেষ হতেই ফোঁস করে উঠলো শাফাহ্ । মেঘা দুদিকে মাথা নাড়িয়ে প্যাকেট খুললো । অনায়াসে ছয় থেকে সাত জনের খাবার বর্তমান । আদ্র কেবলই ইয়ার্কি করছে । শাফাহ্ ঝাইঝাই করে উঠলো আদ্রের দিকে তাকিয়ে….
” হ্যাঁ হ্যাঁ , খাবো না আমি । তোমার টাকার খাবার তুমিই খাও । মেঘাকে খাওয়াও , আর তোমার ঐ খালামনির মেয়েকেও খাওয়াও গান্ডে পিন্ডে । আমি কে , যে আমাকে খাওয়াতে হবে ? আমার কথা মনেই থাকবে না কেনো তোমার ?
” আহ্ টুকটুকি , ভাইয়া জাস্ট মজা করছে । বুঝিস না কেনো তুই ? দেখ কত গুলো মোমোস আছে , সবার জন্যই এনেছে । নে খা… তুই বেকার বেকার ভাইয়ার কথা গায়ে লাগাস ।
” তো , তোর ভাইয়া আমার গায়ে লাগার মতো কথা বলে কেনো ? খাবো না আমি । তোর জন্য এনেছে , তুই খা । সারা কেও দে । আমি ওসব বাইরের পঁচা খাবার খাই না ।
আদ্র শব্দ করে হেসে ওঠে ।
” টুকটুকির বাচ্চা , তোকে খেতে হবে না । মেঘ , তুই খেয়ে নে । তোর তো খুব পছন্দ …
” আদ্র ভাইয়ার বাচ্চা , আমি খাবোও না ।
মেঘা ওদের ঝগড়ার তোয়াক্কা করলো না । জিভ মানছে না । ফাস্ট ফুডের মধ্যে সবথেকে ফেভারিট মোমোস । দেখেই লোভ লাগছে । এক্ষুনি লাঞ্চে বসবে সবাই । টেবিলে খাবার সাজানো হচ্ছে । শাহিনা কাবির দেখলে এখন আর এসব বাইরের খাবার খেতে দেবেন না । মেঘা গপাগপ একটা মোমো মুখে পুরে নিলো । তৃপ্ত তায় চোখ বুজে চিবিয়ে বললো….
” ওয়াও , কি দারুন খেতে । সারা , খেয়ে দেখ….
সারাও মুখে তোলে । মেঘা শাফাহ্’র দিকে বাড়িয়ে দেয় । সে খাবে না । আদ্র কে ভেংচি কেটে মুখ ফিরিয়ে নিলো । মেঘা বললো সবটা গলাধঃকরণ করে…..
” আসলেই ভীষণ টেস্টি ভাইয়া । কোথা থেকে এনেছো ?
আদ্র উঠে দাঁড়িয়ে জবাবে বললো….
” ভার্সিটির বাইরে নতুন একটা ফুড কর্নার ওপেন হয়েছে । আসার পথে দেখলাম । সেখান থেকেই এনেছি । তোরা খা , আমি ফ্রেশ হয়ে আসি । আর , এইই টুকটুকির বাচ্চা , তোর জন্যেও এনেছি । চাইলে খেতে পারিস । গাব্বু , কিছু বুঝিস না । খালি কথায় কথায় গাল ফুলিয়ে বসে থাকতে পারিস । স্টুপিড কোথাকার ।
আদ্র উপরে ওঠে । ভেংচি কাটে শাফাহ্ ।
আদ্র চলে যাওয়া মাত্রই হামলে পড়ে মেঘার উপর । সে খাবে না , তা কি কখনো হয় ?
করিডোরে রৌদ্র দাঁড়িয়ে । রোলার চেপে ধরে চোয়াল খিচে উপর হতেই নিরেট দৃষ্টিতে চেয়ে আছে নিচে । গপাগপ খাচ্ছে তিনজন । রৌদ্র কে দেখেই আদ্র থামে । কপালে ভাঁজ ফেলে প্রগাঢ় । দৃষ্টি বরাবর নিচে তাকায় । তিন জনকে খেতে দেখে প্রসারিত করে ওষ্ঠ যুগল ।
দুপুরে খাওয়ার পর পরই বিকেল গড়ানোর আগে শিকদার পরিবার এ বাড়ি ছেড়েছে । ইভা ভুল করেও আর রৌদ্রের মুখোমুখি হয় নি সেই ঘটনার পর । ওকে এ বাড়িতে তেমন কেউই পছন্দ করে না পাঁচ বছর পূর্বের সেই ঘটনার পর হতে । আদ্র তো চোখ তুলেও তাকায় না । রৌদ্র তো ওকে কোনো কালেই পছন্দ করে নি । যত্তসব গায়ে পড়া একটা মেয়ে ছিলো ইভা । ওর এই ঢলাঢলির জন্যই রৌদ্রের দু চোখের বিষ ছিলো সে । মাঝে হঠাৎ কি হলো কে জানে ! যার জন্য কথা নেই বার্তা নেই আকস্মিক রৌদ্র বিয়ে করতে চাইলো ওকে । ইভা কে সেদিন ছেলেপক্ষ দেখতে এসেছিল , সেদিনই সবার সামনে ইভার বিয়েটা ভেঙ্গে দিয়েছিলো রৌদ্র ।
একবার বেফাসে মুখ ফুটে বলেছিল , সে ইভা কে বিয়ে করতে চায় । ব্যাস , বাকিটা কাবির পরিবার নিজেদের দায়িত্বে করে নিয়েছেন । অবাধ্য ছেলে মুখ ফুটে চেয়েছে , ছেলেকে বাধ্য করতে এক চাওয়াতেই লেগে পড়েছিলেন তারা । ভেবেছিলেন একটা সুযোগ এসেছে হাতে । কিন্তু হাতছাড়া হলো সেই সুযোগ ।
হাতছাড়া হলো বইকি , অবাধ্য ছেলে ঘর ছাড়াও হলো ।
হলো পরিবারচুত্য । নষ্ট হলো সব সম্পর্ক । রৌদ্রের সেই চাওয়া টা আজ ও ঘোলাটে সবার কাছে । কেনো সেদিন ইভা কে চেয়েছিলো সে ?
বিকেল গড়িয়েছে এখন ।
কলিং বেল বাজতেই দ্রুত দরজা খুলে দিলেন শাহিনা কাবির । নীলচে টিশার্ট পড়নে মাথায় ক্যাপ পরিহিত একটা ছেলে দাঁড়িয়ে দরজার বাইরে । পিঠে চারকোনাকৃতির একটা ব্যাগ । মুখে মাস্ক । শাহিনা কাবির প্রশ্নাত্মক নয়নে তাকাতেই বললো ছেলেটা…
” ম্যাম , আপনাদের বাড়ি থেকে খাবারের অর্ডার ছিলো । পার্সেল নিয়ে এসেছি । কাইন্ডলি, যদি রিসিভ করতেন ।
” খাবার ? কে অর্ডার করেছে ?
ছেলেটা রিসিপ্ট দেখে কিছু বলার জন্য মুখ খোলে । তার আগেই পিছন থেকে রৌদ্রের ভরাট কন্ঠ ভেসে আসে….
” আমি অর্ডার করেছি মনি ।
শাহিনা কাবির কপাল গুটিয়ে পিছু ফিরে চান । রৌদ্র কে দেখে অবাক লোচনে চেয়ে প্রশ্ন করেন….
” তুই আবার বাইরের কি হাবিজাবি খাবার অর্ডার করেছিস ?
পরক্ষনে ছেলেটার দিকে ফিরে ভরাট কন্ঠে শুধান….
” কি আছে এতে ?
ছেলেটা বাধ্যের মতো উত্তর করে….
” মোমোস !
কপালে আরো বেশি ভাঁজ পড়লো শাহিনা কাবিরের । অস্ফুটে বললেন সন্দিহান হয়ে…
” মোমো ? তুই এসব কবে থেকে খাস রৌদ্র ?
পার্সেল রিসিভ করলো রৌদ্র । ছেলেটাকে চার্জ সহ বারতি কিছু টিপস দিয়ে বিদায় করলো । বললো দরজা লাগিয়ে….
” আগে খাইনি কখনো , তবে হঠাৎ খেতে ইচ্ছে করছে । টুকটুকির ও খুব পছন্দ এটা । তাই অর্ডার করেছি ।
” শাফাহ্ কে খাওয়াতে হবে না । দুপুরে আদ্র এনেছিলো কতগুলো । ঐ মেয়ে খেয়েছে পেট পুরে । এ অবধি ভাতের প্লেটে বসে নি ওসব হাবিজাবি খাওয়ার পর । এসব আর খাওয়াস না ওকে । মেঘাও এ অবধি কিছুই খায় নি ওসব খাওয়ার পর । তবে ওর মোমো পছন্দ । ওর জন্য কটা রেখে দিস পারলে ।
চলে গেলেন শাহিনা কাবির ।
রৌদ্র হাতের পার্সেল টা চেপে ধরে ঠোঁট পিষে হাসে ।
রিসিপশনে কতগুলো গিফট উঠেছে । মেহের সবাইকে সাথে নিয়ে আনবক্সিং করছে সেগুলো । ওর ঘরেই সবাই । শাফাহ্ ,মেঘা, সিরাত, রুবিনা কাবির , সবাই । শাহিনা কাবির আবার উঠলেন । শুভ্র অফিসে বেরিয়েছে দুপুরের পর । মেহের একে একে গিফট গুলো ওপেন করছে সবার সামনে । শাফাহ্ চিকচিক করে নেড়েচেড়ে দেখছে সবগুলো । এরমধ্যেই একটা গিফট হাতিয়েছে । বড্ড পছন্দ হয়েছিলো বিধায় মেহের নিজেই দিয়েছে ওকে । নতুন বউ হিসেবে কতগুলো গিফট পেয়েছে মেহের । সবাই সেই বিয়ে থেকেই কত সুন্দর করে ট্রিট করছে ওকে । শাফাহ্ শুধু চোখ ভরে দেখে সবটা । ওর বিয়ে হলেও ওকে মাথায় করে রাখবে সবাই । ইশ্ , তখন কতো ভালো হবে । মেইন এটেনশন থাকবে ওর প্রতি । কত সুন্দর করে সাজবে , বর আসবে , বিয়ে হবে , গিফট পাবে । এসব ভেবেই ভীষণ আনন্দ লাগে ওর । খুশি চেপে রাখতে না পেরে ভ্যাবলার মতো বলে ওঠে…..
” আম্মু , আমার বিয়ে কবে দেবে ? আমি ও এমন অনেক গুলো গিফট পাবো বিয়েতে ! ইশশ্ , তখন সব আমার হবে । মেহের আপু নিজের ভাগের একটা গিফট দিয়ে দিয়েছে আমায় । আমি কিন্তু আমার ভাগের একটা গিফট ও কাউকে দেবো না বলে রাখলাম । সব আমি নিয়ে নেবো ।
শোনো আম্মু , যে ঘরে ছোট ননদ থাকবে । আমি কিন্তু সে ঘরে বিয়ে করবো না । নয়তো আমার মতো করে আমার ননদ আমার কাছ থেকে গিফট হাতিয়ে নেবে । তোমরা কিন্তু ননদের পাল্লায় বিয়ে দেবে না আমায় । আমি বিয়ে করবো বাড়ির একমাত্র ছেলেকে । বুঝলে ….
শাফাহ্’র দিকে ভ্যাট ভ্যাট করে তাকায় সকলে । এই মেয়ে আস্ত একটা বেকুব , তা সবার জানা । সিরাত , মেঘা আর মেহের মুখ টিপে হেসে উঠলো । শাহিনা কাবির মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন….
” শুনেছিস মেয়ের কথা ? তোকে আদ্র আর শুভ্র এমনি এমনি গাব্বু বলে না ।
শাফাহ্ মুখ বাঁকায়…
” এহহহ্ , কি এমন বললাম আমি ? আমি কিন্তু সত্যি সত্যিই বাড়ির একমাত্র ছেলেকে বিয়ে করবো । একমাত্র বউমা হবো আমি । আমার ভাগের ভাগিদার কেউ হবে না । শুধু আমি আর আমিই রাজত্ব করবো আমার শশুর ঘরে । কবে শশুর ঘরে পাঠাবে আমায় ?
” সময় হোক ,, ঠিক পাঠাবো । এখন চুপ করে থাক ।
মেঘার ফোন বাজে । আননোন নাম্বার । কপাল গুটায় সে । ওর ফোনে কল আসে না তেমন । হাতে গোনা মোটে কয়েকটা সেভ নাম্বার থেকে কল আসে এই যা । আজ প্রথম আননোন কোনো নাম্বার থেকে ফোন এসেছে । ফোন হাতে তুলে মুখ সম্মুখে ধরে চোখ সরু করে চেয়েই রইলো সে । শাফাহ্ জিজ্ঞেস করলো…
” কে ফোন করেছে মেঘা ?
” জানি না । আননোন নাম্বার ।
রুবিনা কাবিরের কাঠ স্বর….
” ধরার প্রয়োজন নেই তাহলে । পরে কোনো কিছু ঘটে গেলে আমাদের ঘাড়ে দোষ পড়বে ।
সিরাত মুখ কুঁচকে ফেললো । বাঁধ সাধলো তৎক্ষণাৎ….
” আম্মু , যা তা বলো না তো ! ফোন করা নিয়ে কি ঘটবে শুনি ? মেঘার ফোনে বাড়তি কল আসে না । আজ হয়তো রং নাম্বারে কেউ ফোন করেছে । মেঘা , রিসিভ করে কথা বলে কেটে দে । নয়তো ডিস্টার্ব করতেই থাকবে ।
মেঘা তাই শুনলো । ফোন রিসিভ করে কানে ঠেকালো । ওপাশ থেকে কারোর আওয়াজ নেই । মেঘা হ্যালো হ্যালো করেও পেলো না । নেটওয়ার্ক প্রবলেম ভেবে বিছানা থেকে নেমে ঘর ছাড়লো ওভাবেই কথা বলার চেষ্টা চালিয়ে ।
তবুও সাঁড়া শব্দ নেই ।
মেঘা বিরক্ত হয় । খিটখিটে স্বরে বিরক্তি প্রকাশ করে….
” হ্যালো , আজব । ফোন করে কথা বলছেন না কেনো ?
ওপাশ থেকে এবেলায় ভেসে আসলো পূরু ভার পুরুষালি কন্ঠ….
” পেছনে তাকা ইডিয়ট ।
মেঘা ভিমড়ি খায় । পেছন হতে যে গম্ভীর স্বরটা শুনলো , ফোনের ওপাশ থেকেও তাই কানে বাজলো । ঝট করে পিছু ফিরে চায় সে । ঠিক দুহাত পেছনে বুকে হাত ঠেসে রৌদ্র দাঁড়িয়ে । ভ্রু যুগল নাকের ডগা বরাবর কুঁচকানো । মেঘা বোকার মতো হা বনে হতবাক হয়ে চায় । একবার ফোনের স্ক্রিন , তো আরেকবার রৌদ্রের তামাটে মুখ পানে । সবটা বুঝলো না । সময় লাগলো অনুমান করতে । মুখে শক্ত ভাব টানলো অমনি । তেঁতে বললো…..
” আপনি ফোন করেছেন ?
প্রশ্নের পৃষ্ঠে রৌদ্রের ধমকানো আদেশ…..
” রুমে চল আমার ।
” হোয়াট ?
” বয়রা হয়েছিস ? শুনতে পারছিস না কি বলছি ? রুমে চল ইডিয়ট ।
” ইরিটেটিং ম্যান…..
মেঘা অহমিকায় অগ্রসর হতে গেলে রৌদ্র খপ করে টেনে আটকে ফেললো ওকে । বাহুতে হেঁচকা টান মেরে সম্মুখে দাঁড় করিয়ে কন্ঠ চিপে বললো…
” ইডিয়ট , তোকে আমার রুমে যেতে বলেছি । ওদিকে কোথায় যাচ্ছিস ?
” ছাড়ুন আমায় , অসভ্য লোক ।
কেনো যাবো আমি আপনার রুমে ?
” প্রেম করবো তোর সাথে , চল । পাঁচ বছর হলো বিয়ের । এখনো অবধি ছুঁয়ে দেখিনি তোকে । আজ একটু ছুঁয়ে দেখবো ! বেশি না, শুধু একটুখানি । চল সানি….
রৌদ্র জোর খাটিয়ে মেঘা কে টেনে হিড়হিড়িয়ে নিজের ঘরের দিকে নিয়ে যায় । ওর জোরের বিপরীতে মেঘার ক্ষিণ শক্তি টুকু নিতান্তই তুচ্ছ । মেয়েটা সেই রুখো ছেলেকে রুখতে পারে না দূর্বল হাতে ।
ওকে ঘরে টেনে নিয়ে গিয়ে ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দিলো রৌদ্র । মেঘা চমকায় । হঠাতই এসির ঠাণ্ডা বাতাসে শিউরে ওঠে নারী তনু । রৌদ্র পিছু ফিরে চাওয়া মাত্রই দৃঢ় স্বরে বলে…..
” এখানে কেনো নিয়ে এসেছেন আমায় ? দরজা খুলে দিন । বেরোবো আমি !
” তখনই বের হবি , যখন আমি তোকে বেরোতে দেবো ।
রৌদ্র এগোলে মেঘা পেছায় অজানা আতঙ্কে ।
শুকনো কন্ঠা ভেজায় ঢোক গিলে । সোজাসুজি ঘন পলক ফেলে ঠোঁট ভিজিয়ে বলে….
” আপনি কিন্তু বাড়াবাড়ি করছেন ইদানিং !
” ট্রাস্ট মি , তোকে দেখলেই বাড়াবাড়ি করতে ইচ্ছে করে ।
” ধৈর্যের পরীক্ষা নেবেন না আমার । সহ্য করতে পারি না আমি আপনাকে ।
” এতো কম তোর সহ্য শক্তি ? এক্সট্রা শক্তি গেইন কর । কজ , আজীবন আমাকেই সহ্য করতে হবে তোকে ।
” কোনো প্রশ্নই ওঠে না , আই হেইট ই…..
কথা সম্পুর্ন করার আগেই বেখেয়ালে পেছাতে পেছাতে ধপ করে পড়লো বিছানার উপর । রৌদ্র ফিক করে হাসে । ওকে নিজের দিকে এগোতে দেখে মেঘা চিবিয়ে ওঠে তিরিক্ষি মেজাজে….
” রাইনো মুখো , অসভ্যতামো করার চেষ্টাও করবেন না । সরুন সামনে থেকে ।
” এ জগতে বউয়ের সাথে সভ্যতামো করেছে কোন পুরুষ ?
” কিসের বউ আমি আপনার ?
” বিয়ে করা বউ তুই আমার ।
” বিয়ে মাই ফুট । ইরিটেটিং ম্যান ,,,
রৌদ্র একটু থামে । চোয়াল খিচে ধমকায়….
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ২০ (২)
” শাট আপ ইডিয়ট । চুপচাপ বসে থাক ।
” থাকবো না আমি ! কাছে আসবেন না আমার । নয়তো চেঁচাবো বলে রাখলাম ।
” সাউন্ড প্রুফ রুম । চেঁচিয়ে লাভ নেই…..
চুপচাপ পিছনে তাকা । কিছু একটা আছে তোর জন্য ।
