বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ২৬
সুমি চৌধুরী
—- “রূপা।”
মেয়েটি আর কেউ না। স্বয়ং রূপা। বাঁধন মনে মনে যা সন্দেহ করেছিল। সব সত্যি করে এই রহস্যময়ী মেয়েটি রূপাই হলো। বাঁধন অপলক তাকিয়ে থাকে সেই মায়াবী মুখখানার দিকে। যেই মুখটা দেখার জন্য গত কয়েকটা দিন ধরে সে ভেতর ভেতর চাতক পাখির মতো ছটফট করছে। বাঁধনের সেই তীব্র। নেশাতুর চাউনি রূপা আর সহ্য করতে পারে না। তার বুকের ভেতরটা ভয়ে আর লজ্জায় তোলপাড় হতে থাকে। নিজেকে মুক্ত করার জন্য সে ছটফট করতে শুরু করে। কিন্তু বাঁধন তাকে কিছুতেই ছাড়ে না। রূপা তখন ব্যাকুল হয়ে ফিসফিসিয়ে বলে,
—- “ছাড়ুন। প্লিজ আমাকে ছাড়ুন।”
তবুও বাঁধন তাকে ছাড়ে না। বরং বুকের সাথে আরও শক্ত করে জড়িয়ে নেয়। যেন ছেড়ে দিলেই মেয়েটি আবার চিরতরে হারিয়ে যাবে। কোনো উপায় না পেয়ে রূপা নিরুপায় হয়ে হুট করে বাঁধনের ঘাড়ের ওপর নিজের ধারালো দাঁত দিয়ে সজোরে একটা কামড় বসিয়ে দেয়। হঠাৎ এই তীব্র ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠে বাঁধন,
—- “উহ’ফফ।”
ব্যথার চোটে তার হাতের শক্ত বাঁধনটা মুহূর্তের জন্য কিছুটা আলগা হয়ে আসে। আর ঠিক এই সুবর্ণ সুযোগে রূপা এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। সে আর এক সেকেন্ডও পেছনে না তাকিয়ে সোজা জঙ্গলের ঘন অন্ধকারের দিকে তীব্র গতিতে দৌড় দেয়। রূপার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে থাকে বাঁধন। তার ঠোঁটের কোণে তখন এক অদ্ভুত। তৃপ্তির হাসি ফুটে ওঠে। সে নিজের রক্তাক্ত ঘাড়টা হাত দিয়ে চেপে ধরে মনে মনে বলে,
—- “পালিয়ে আর কোথায় যাবি রূপা? আজ এই রাত থেকে আমি তোকে আমার মনের মণিকোঠায় বন্ধি করে নিলাম। বিয়ে করব তোকে আমি। খুব তাড়াতাড়ি তোকে আমার অর্ধাঙ্গিনী বানাবো। জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ।”
রূপা দেখতে দেখতে জঙ্গলের নিবিড় অন্ধকারে milie যায়। ঠিক তখনই আলতাф মাহবুব একদল পুলিশ ফোর্স নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ওখানটায় দৌড়ে আসেন। মাটিতে রক্তা-রক্তি অবস্থায় বাঁধনকে ওভাবে পড়ে থাকতে দেখে তিনি চরম উদ্বেগে বডি ঝুঁকিয়ে বলে,
—- “বাঁধন। বাঁধন। তুমি ঠিক আছো? হোয়াট হ্যাপেনড টু ইউ?”
বাঁধনের চোখের সামনে তখন চারপাশের দুনিয়াটা ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে। মাথার ক্ষতটা দিয়ে অনবরত রক্ত ঝরছে। সে কোনোমতে ভারী হয়ে আসা চোখ দুটো মেলে আলতাফ মাহবুবের দিকে তাকায়। অত্যন্ত দুর্বল। ভাঙা গলায় বলে,
—- “কিছু হয়নি আমার আই অ্যাম অ্যাবসোলিউটলি ফাইন। স্যার”
কথাটা শেষ করতে করতেই বাঁধনের চোখের পাতা দুটো পুরোপুরি বুজে আসে। সে এক টানে নিজের জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। তারপর তার আর কোনো কিছুই মনে নেই। চারপাশটা এক নিরেট অন্ধকারে তলিয়ে যায়।
সকালবেলা কড়া শ্যাম্পুর তীব্র ঘ্রাণে মাঝপথেই ভেঙে যায় ইশতিয়াকের অপূর্ণ ঘুমটা। চোখে-মুখে একরাশ বিরক্তি নিয়ে কোনোমতে চোখ মেলে সে সামনে তাকায়। ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আপনমনে মাথার ভেজা চুল মুছছে সীমা। তার কোমরছোঁয়া লম্বা চুলগুলো থেকে টপটপ করে পানি ঝরে ড্রেসিং টেবিলের কাঠে পড়ছে। দেখেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। সে এইমাত্র গোসল সেরে এসেছে। এত সাতসকালে সীমাকে ওভাবে গোসল করতে দেখে ইশতিয়াকের ভেতরের রাগটা দপ করে জ্বলে ওঠে। সে বিছানা থেকেই বেশ কড়া আর কর্কশ গলায় বলে ওঠে,
—- “এই,তুই এভাবে প্রায় প্রায় সকালে গোসল কেন করিস রে?”
নিঝুম ঘরে হুট করে ইশতিয়াকের অমন চড়া কণ্ঠস্বর শুনে চমকে ওঠে সীমা। সে আয়না থেকে নিজের নজর সরিয়ে চট করে সামনে ঘুরে তাকায়। ইশতিয়াক চরম বিরক্তি আর রাগ নিয়ে বিছানায় বসে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। সীমার ফরসা। নিষ্পাপ মুখটা মুহূর্তের মধ্যে ফ্যাকাশে হয়ে যায়। সে হাতের তোয়ালেটা চিপড়াতে চিপড়াতে বেশ জড়সড় আর কাঁপা গলায় বলে,
—- “আসলে ওটা…”
ইশতিয়াক আর কোনো কথা শোনার আগেই বিছানা থেকে সজোরে ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। তার লম্বা। সুঠাম শরীরটা নিয়ে রাগে গজগজ করতে করতে সে সীমার একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। কোনো কিছু ভাবার সুযোগ না দিয়েই সে এক ঝটকায় সীমার নরম দুটো গাল নিজের শক্ত আঙুলে চেপে ধরে নিজের দিকে টানে। সীমার চোখের দিকে নিজের ক্রুদ্ধ দৃষ্টি স্থির রেখে অত্যন্ত কড়া সুরে ইশতিয়াক বলে,
—- “আই টোল্ড ইউ বিফোর। তোকে বলেছিলাম না এভাবে সকালে গোসল করতে যেন তোকে আর কখনো না দেখি। আমার কথা তোর কানে যায় না?”
হুট করে গালে এমন শক্ত হাতের চাপে ব্যথায় চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলে সীমা। তার ফর্সা গাল দুটো ইশতিয়াকের আঙুলের চাপে লাল হয়ে ওঠে। সে তো ইচ্ছে করে এই সকালে গোসল করেনি। কাল রাতেই তার পিরিয়ড হয়েছে। আর পিরিয়ড চলাকালীন প্রতিদিন সকালবেলা গোসল করা তার পুরোনো অভ্যাস। কিন্তু এই রাগী পুরুষটাকে সে এই ব্যক্তিগত কথাটা বুঝিয়ে বলবে কী করে? সে ব্যথায় নিজের ঠোঁট দুটো গোল করে কোনোমতে ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে,
—- “ছাড়ুন প্লিজ ছাড়ুন। ব্যথা লাগছে আমার।”
ইশতিয়াকের চোয়াল আরও শক্ত হয়ে ওঠে। চোখের মণি দুটো রাগে কুঁকড়ে যায়। সে সীমার মুখের আরও কাছে ঝুঁকে এসে গর্জে ওঠে,
—- “হাউ ডেম ইউ। আমার কথা অমান্য করার সাহস কী করে হয় তোর?”
সীমা নিজের ভেজা চোখ দুটো মেলে আকুল সুরে বোঝানোর চেষ্টা করে,
—- “আমি আপনার কথা অমান্য করিনি। আসলে…”
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই ইশতিয়াক আঙুলের চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়ে চরম ধমকের সুরে বলে ওঠে,
—- “শাট আপ। একদম চুপ। জাস্ট একটা বাড়তি কথা যদি আর মুখ দিয়ে বের করেছিস। থাপ্পড় দিয়ে দুই গাল লাল করে দেব তোর।”
ইশতিয়াকের এই হিংস্র রূপ আর চড়া ধমকে ভয়ে নিজের চোখ জোড়া শক্ত করে বন্ধ করে নেয় সীমা। তার পাতলা ঠোঁট দুটো অবশ হয়ে আসে। পুরো শরীরটা এক অজানা আশঙ্কায় থরথর করে কাঁপতে থাকে। ইশতিয়াক তখনো রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সীমার ওই বন্ধ হয়ে থাকা মায়াবী। ভয়ার্ত মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে থাকে। ভীতিতে কাঁপতে থাকা সীমার চোখের পাপড়ি আর তার ওই কোমল। ফর্সা মুখটা দেখে হুট করেই অজান্তে ইশতিয়াকের বুকের বাম পাশটা কেমন যেন এক তীব্র দোলাচলে কেঁপে ওঠে। নিজের ভেতরের এই আকস্মিক পরিবর্তন টের পেয়ে সে দ্রুত সীমার মুখ থেকে চোখ নামিয়ে নেয়। সে এক ঝটকায় সীমার গাল দুটো ছেড়ে দিয়ে নিজের তোয়ালেটা টেনে নেয় এবং লম্বা লম্বা পা ফেলে খটখট শব্দ করে ওয়াশরুমে ঢুকে সজোরে দরজাটা আটকে দেয়। সীমা স্তব্ধ হয়ে তার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে থাকে। এতক্ষণের চেপে রাখা কান্নাটা আর বাধা মানে না তার চোখ ফেটে দু-ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গাল বেয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ে। কেন জানি আজ তার মনের গহীন থেকে এক তীব্র হাহাকার জেগে ওঠে। তার মনে হতে থাকে। সে হয়তো ইশতিয়াকের জীবনে কেবলই একটা বাড়তি বোঝা। একটা চরম বিরক্তিকর জিনিস ছাড়া আর কিছুই নয়। কোনো অধিকার ছাড়া সে শুধু শুধু এই মানুষটার সংসারে পড়ে আছে।
দুপুর বারোটার দিকে বাঁধনের জ্ঞান ফেরে। সে ধীরে ধীরে ভারী চোখের পাতা দুটো মেলে তাকায়। চারপাশের চেনা পরিবেশটা দেখে বুঝতে বাকি থাকে না যে সে হাসপাতালের একটা কেবিনে শুয়ে আছে। মাথায় সাদা ব্যান্ডেজ জড়ানো। তার বেডের ঠিক পাশেই চিন্তিত মুখে বসে আছেন আহসান রহমান এবং আকাশ। বাঁধনকে চোখ খুলতে দেখে আহসান রহমান দ্রুত কিছুটা ঝুঁকে এসে নরম গলায় বলে,
—- “এখন কেমন লাগছে বাঁধন? মাথায় কি খুব বেশি পেইন হচ্ছে?”
বাঁধন আলতো করে না-সূচক মাথা নাড়ায়। তাকে বেশি কথা বলতে না দিয়ে আকাশ তড়িঘড়ি করে কেবিন থেকে বেরিয়ে ডাক্তারকে ডেকে নিয়ে আসে। ডাক্তার কিছু রিপোর্ট হাতে নিয়ে কেবিনে প্রবেশ করতেই আহসান রহমান বেশ উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করে,
—- “ডাক্তার। সবকিছু ঠিক আছে তো? মাথায় গভীর কোনো ইনজুরি হয়নি তো?”
ডাক্তার রিপোর্টের ফাইলটা ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলে,
—- “না। ফরচুনেটলি আঘাতটা খুব বেশি গভীরে যেতে পারেনি। সো। ভয়ের কিছু নেই। তবে প্রিকশানের জন্য কিছুদিন পর আমাদের আরেকবার সিটি স্ক্যান করাতে হবে।”
আহসান রহমান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলে,
—- “অবশ্যই ডাক্তার। আমি কিছুদিন পরেই ওকে আবার নিয়ে আসব।”
ডাক্তার কেবিন থেকে চলে যেতেই বাঁধন সোজা আকাশের দিকে তাকায়। নিজের এই অবস্থার মাঝেও তার ভেতরের দায়িত্বশীল এসপি সত্ত্বাটা জেগে ওঠে। সে কিছুটা ভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করে,
—- “অখিল কেমন আছে? আর বাকি পুলিশ ফোর্সরা কেমন আছে এখন?”
আকাশ বাঁধনের পাশে এসে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় উত্তর দেয়,
—- “এভরিথিং ইজ আন্ডার কন্ট্রোল। সবাই মোটামুটি সুস্থ আছে। যার যার কেবিনে রেস্ট নিচ্ছে। অখিলের কন্ডিশনও এখন স্টেবল।”
সবাই ভালো আছে শুনে বাঁধন আর কোনো কথা বাড়ায় না। সে ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিয়ে চুপচাপ চোখ দুটো বন্ধ করে নেয়। তবে চোখ বন্ধ করতেই। মুহূর্তের মধ্যে তার সজাগ মনের আয়নায় ভেসে ওঠে কাল রাতের সেই রূপার মায়াবী মুখমণ্ডল। বুকের ভেতরের হার্টবিটটা এক অদ্ভুত দোলাচলে আচমকা কেঁপে ওঠে বাঁধনের। কেবিনের শান্ত পরিবেশে সেভাবেই চোখ বন্ধ করে থাকা বাঁধনের ঠোঁটের কোণে আবারও এক চিলতে রহস্যময়। তৃপ্তির হাসি ফুটে ওঠে।
বিকাল চারটার দিকে বাঁধনকে হাসপাতাল থেকে ছুটি দেওয়া হয়। ছাড়া পাওয়া মাত্রই বাঁধন কারোর জন্য অপেক্ষা না করে দ্রুত আকাশের গাড়ির ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসে পড়ে। তার এই কান্ড দেখে আকাশ বেশ চিন্তিত গলায় বলে,
—- “বাঁধন। তোর শরীর এখনো পুরোপুরি রিকভার করেনি। এই অবস্থায় ড্রাইভিং করলে যদি কোনো প্রবলেম হয়। তুই প্লিজ পাশে গিয়ে বোস। আমি চালাচ্ছি।”
আকাশের কথার পিঠে তার দিকে এক রাশভারী আর রাগী দৃষ্টিতে তাকায় বাঁধন। অত্যন্ত কড়া গলায় বলে,
—- “কোনো সমস্যা নেই। কথা না বাড়িয়ে গাড়িতে ওঠ।”
বাঁধনের সেই তপ্ত আর রাগী চাউনি দেখে আর কথা বাড়ানোর সাহস পায় না আকাশ। সে চুপচাপ বাধ্য ছেলের মতো পাশের সিটে উঠে বসে। বাঁধন কোনো দিকে না তাকিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে হাই স্পিডে ড্রাইভিং শুরু করে। গাড়ি নিয়ে কিছুটা দূর আসতেই বাঁধন হুট করে সামনের দিকে তাকিয়ে বেশ গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করে,
—- “আনন্দ মোহন কলেজে রূপা কোন হোস্টেলে উঠেছে?”
চলন্ত গাড়িতে হুট করে বাঁধনের মুখ থেকে রূপার হোস্টেলের ব্যাপারে এমন প্রশ্ন শুনে আকাশ বেশ অবাক হয়ে যায়। সে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে কিছুটা দ্বিধা নিয়ে বলে,
—- “সৈয়দা নাফিসা ইসলাম ছাত্রী নিবাস।”
বাঁধন আর কোনো পাল্টা কথা বলে না। চুপচাপ স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে ড্রাইভিং করতে থাকে। ওদিকে আকাশ কৌতূহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করে,
—- “হঠাৎ এই খোঁজ কেন?”
তবুও পুরোপুরি নিশ্চুপ থাকে বাঁধন। কিছুক্ষণ পর আকাশ চারপাশটা খেয়াল করে দেখে বাঁধন গাড়ি নিয়ে বাড়ির রাস্তার দিকে যাচ্ছে না। বরং আনন্দ মোহন কলেজের মেইন রোডের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সে কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে বলে ওঠে,
—- “এদিকে কোথায় যাচ্ছিস বাঁধন? এটা তো বাড়ির রাস্তা না।”
বাঁধন কোনো উত্তর দেয় না। সে গাড়ির স্পিড আরও বাড়িয়ে দিয়ে সোজা আনন্দ মোহন কলেজের ক্যাম্পাসে এসে গাড়ি থামায়। ব্রেক কষতেই বাঁধন দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে লম্বা লম্বা পা ফেলে কলেজের ভেতরে প্রবেশ করে। তার এমন অদ্ভুত আচরণ দেখে পেছন পেছন আকাশও হন্তদন্ত হয়ে ছুটতে থাকে। বাঁধন ছাত্রী নিবাসের নামফলকটা দেখে সোজা মেয়েদের হোস্টেলের ভেতরে ঢুকে পড়ে। মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা এমন একজন সুদর্শন আর লম্বা সুঠাম দেহের পুরুষকে হুট করে মেয়েদের হোস্টেলে ঢুকতে দেখে অনেক ছাত্রীই হা করে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। তাদের চাউনি দেখে মনে হচ্ছে যেন বাঁধনকে এক নজরেই গিলে খেয়ে ফেলবে। আকাশ এতক্ষণে পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পারে যে বাঁধন আসলে রূপাকেই খুঁজতে এখানে এসেছে। সে ভিড় ঠেলে দৌড়ে এসে সরাসরি বাঁধনের সামনে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,
—- “৫০ নম্বর রুমে রূপা আছে। আচ্ছা। তুই হুট করে রূপাদের হোস্টেলে কেন আসলি। বলবি তো?”
বাঁধন এবারও কোনো জবাব দেয় না। সে আকাশকে পুরোপুরি ইগনোর করে নিজের মতো সামনে এগিয়ে যায়। আকাশ চরম রেগে গিয়ে তাকে কিছু একটা বলতে যাবে। তার আগেই বাঁধন করিডোরের নম্বরগুলো মেলাতে মেলাতে সোজা ৫০ নম্বর রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। সে আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে শক্ত হাতে রুমের দরজায় নক করে।কিছু ক্ষনের মধ্যে ৫০ নম্বর রুমের দরজাটা একটা মেয়ে খুলে দেয়। দরজায় হুট করে রূপার বদলে অচেনা একটা মেয়েকে দেখে গভীর বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকায় বাঁধন। ওদিকে সামনে বাঁধনের মতো একজন সুঠাম। সুদর্শন আর মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা পুরুষকে দেখে মেয়েটা জাস্ট হা হয়ে যায়। চোখের পলক না ফেলে হা করে তাকিয়ে থাকে সে। মেয়েটার এমন চাউনি দেখে আরও বেশি বিরক্ত হয় বাঁধন। নিজের রাশভারী। কড়া কণ্ঠে সে সরাসরি প্রশ্ন করে,
—- “রূপা কোথায়?”
হুট করে বাঁধনের মুখে রূপার নাম শুনে বেশ চমকে ওঠে মেয়েটা। সে নিজের ঘোর কাটিয়ে আমতা আমতা করে বলে,
—- “আমাদের সাথে যে থাকে ওই রূপার কথা বলছেন?”
চোয়াল শক্ত করে সংক্ষিপ্ত উত্তর দেয় বাঁধন,
—- “জ্বি।”
মেয়েটি ছাদের দিকে ইশারা করে বলে,
—- “ও তো ছাদে আছে।”
কথাটা শোনামাত্রই আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে ছাদের সিঁড়ি খুঁজে হনহন করে ওপরে উঠে আসে বাঁধন। তার এই ঝড়ের গতির সাথে তাল মেলাতে না পেরে পেছন পেছন প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে আসে আকাশ। ছাদের তখন রেলিংয়ের গায়ে পিঠ ঠেকিয়ে বৃষ্টি আর রূপা আপনমনে গল্প করছিল। রূপার কোলে শান্ত হয়ে বসে আছে ক্যান্ডি। রূপা খিলখিল করে হাসছে আর পরম আদরে ক্যান্ডির মাথায় হাত বুলাচ্ছে। তার পরনে আজ একটা চমৎকার অ্যাশ রঙের গাউন। সাথে ম্যাচিং করা টাইস ওড়না। দুই হাতে রিনরিন করে বাজছে ম্যাচিং চুড়ি। লম্বা ফরসা পিঠ জুড়ে তার ঘন কালো চুলগুলো আজও পুরোটাই ছেড়ে দেওয়া। মাথায় পরা সাদা রঙের কিউট একটা বানি ইয়ার হেডব্যান্ড আর কানে দুলছে এক জোড়া সাদা ঝুমকো। রূপা আজ ইচ্ছে করেই একটু জমকালো সেজেছে হুট করে আজ সাজার খুব শখ হয়েছিল তার। তাই মনের মতো সেজে নিজের শখটা পূরণ করেছে সে। বাঁধন ছাদে পা রাখতেই তার তীক্ষ্ণ চোখ জোড়া গিয়ে পড়ে রেলিংয়ের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা ওই মায়াবী রূপার দিকে। এক লহমায় বাঁধনের পা দুটো যেন মাটির সাথে থমকে যায়। সে এক দৃষ্টিতে পা থেকে মাথা পর্যন্ত পুরোটা স্ক্যান করে নেয় রূপার। এই পড়ন্ত বিকেলের আলোয় রূপার ফরসা মুখটা যেন হিরের মতো চকচক করছে। সুন্দরের চেয়েও বহুগুণ সুন্দর লাগছে মেয়েটাকে। বাঁধনের মনে মনে মনে হয় সাজলে বোধহয় মেয়েদের আসলেই অন্যরকম অপার্থিব লাগে। সে আর নিজের ভেতরের তীব্র আবেগকে ধরে রাখতে পারে না। লম্বা লম্বা পা ফেলে সে সরাসরি গিয়ে দাঁড়ায় রূপার একদম মুখোমুখি। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বৃষ্টি কিংবা কোলে ক্যান্ডিকে নিয়ে রূপা কিছু বুঝে ওঠার আগেই। বাঁধন এক ঝটকায় রূপার নরম হাতটা নিজের শক্ত মুঠোয় পুরে নেয়। রূপার বাদামি চোখের দিকে নিজের তৃষ্ণার্ত চাউনি স্থির রেখে একরোখা গলায় বলে,
—- “চল।”
হুট করে বাঁধনকে চোখের সামনে দেখে আকাশ থেকে পড়ার মতো দশা হয় রূপা আর বৃষ্টির। বাঁধনের ওই চওড়া সুঠাম অবয়ব। কপালে লেপ্টে থাকা এলোমেলো চুল আর মাথার সাদা ব্যান্ডেজটা দেখে রূপার বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে। তার ফর্সা মায়াবী মুখটা মুহূর্তের মধ্যে ফ্যাকাশে হয়ে যায়। রূপা নিজের কাঁপতে থাকা পাতলা গোলাপী ঠোঁট দুটো কোনোমতে ফাঁক করে। বাদামি চোখে এক রাশ আতঙ্ক নিয়ে অত্যন্ত জড়সড় গলায় জিজ্ঞেস করে,
—- “কো-কোথায়?”
বাঁধনের শক্ত চোয়াল রাগে আরও টানটান হয়ে ওঠে। চোখের তীক্ষ্ণ মণি দুটো স্থির হয়ে যায়। নিজের গম্ভীর। পুরুষালি আর রাশভারী কণ্ঠে সে সংক্ষিপ্ত অথচ আদেশসূচক উত্তর দেয়,
—- “বাড়ি যাবি। চল।”
ভয়ে রূপার পুরো শরীর কাঁপতে থাকে। তার ফর্সা গালে এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা ফুটে ওঠে। সে নিজের নরম হাতটা বাঁধনের শক্ত লোহার মতো মুঠো থেকে ছাড়ানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে বেশ ব্যাকুল সুরে বলে ওঠে,
—- “আমি যাব না। ছাড়ুন আমাকে।”
রূপার এই অস্বীকৃতি আর ছটফটানি দেখে বাঁধনের ভেতরের একরোখা জেদটা যেন মুহূর্তে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। সে আর এক সেকেন্ডও কথা না বাড়িয়ে। কোনো কিছু বোঝার সুযোগ না দিয়েই এক ঝটকায় রূপাকে নিজের চওড়া কাঁধের ওপর তুলে নেয়। সাথে সাথে উল্টোভাবে ঝুলে পড়ে রূপা। তার লম্বা ঘন কালো চুলগুলো বাতাসে এলোমেলো হয়ে নিচের দিকে দুলতে থাকে। এই কাণ্ডে তার কোল থেকে ক্যান্ডি ছিটকে নিচে পড়ে যেতে নিলে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আকাশ চট করে ছো মেরে ক্যান্ডিকে শূন্যেই ধরে ফেলে। রূপা বাঁধনের শক্ত পিঠে নিজের ফর্সা হাত-পা ছুড়তে ছুড়তে চরম ক্ষোভে আর লজ্জায় মুখ লাল করে চিৎকার করে বলতে থাকে,
—- “হোয়াট ইজ ইওর প্রবলেম? সমস্যা কী আপনার? আমাকে এভাবে কাঁধে নিলেন কেন? নামান বলছি। জাস্ট নামান আমাকে।”
রূপার কোনো চেঁচামেচি, কোনো আকুতিই বাঁধনের কানে পৌঁছায় না। সে কোনো কথা না বলে নিজের লম্বা লম্বা পা ফেলে রূপাকে কাঁধে নিয়েই ছাদ থেকে নেমে যায়।ছাদে বৃষ্টি তখনো হা করে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে। তার চোখের সামনে কী ঘটে গেল সব যেন মাথার ওপর দিয়ে চলে যায়। আকাশ বৃষ্টির ওমন হা করা অবস্থা দেখে নিজের ঠোঁট দুটো চেপে ফিক করে হেসে দেয়। পরক্ষণেই নিজের রূপ পাল্টে মুখের অবয়বটা একদম গম্ভীর করে ছদ্ম-গাম্ভীর্য নিয়ে বলে,
—- “এখন কি তোমাকেও কাঁধে নিতে হবে?”
আচমকা আকাশের মুখ থেকে এমন কথা শুনে ধড়ফড়িয়ে কেঁপে ওঠে বৃষ্টি। এহেন প্রশ্নে সে রীতিমতো ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায়। ফর্সা গোলগাল মুখটা লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে। সে নিজের বড় বড় চোখ দুটো গোল গোল করে তাকিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,
—- “কী কী বলছেন স্যার?”
আকাশ ক্যান্ডিকে এক হাত দিয়ে বুকের সাথে চেপে ধরে একটু ঝুঁকে বলে,
—- “মানে এটাই দেখলে তো বাঁধন রূপাকে নিয়ে বাড়ি চলে গেল। সো,এখন তুমি গিয়ে তোমার আর রূপার প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো গুছিয়ে নাও। আই অ্যাম ওয়েটিং ডাউনস্টেয়ার্স।”
বৃষ্টি নিজের ওড়নার খুঁতটা আঙুলে জড়াতে জড়াতে আমতা আমতা করে বলে,
—- “আ-আচ্ছা স্যার।”
বলেই উল্টো ঘুরে পা বাড়ায় বৃষ্টি। কিন্তু তাড়াহুড়ো করে দু-পা এগোতেই হুট করে পায়ের স্যান্ডেলটা পিছলে তার পা মচকে যায় এবং সে সজোরে মাটির দিকে পড়ে যেতে নেয়। ঠিক তখনই বিদ্যুৎ গতিতে আকাশ তার এক হাত দিয়ে ক্যান্ডিকে শক্ত করে ধরে রেখে। অন্য হাতটা বাডিয়ে সজোরে বৃষ্টির সরু কোমরটা জড়িয়ে ধরে নিজের দিকে টেনে ফেলে। আকস্মিক এই নিবিড় পুরুষালি স্পর্শে পুরো শরীর শিউরে ওঠে বৃষ্টির। মেরুদণ্ড দিয়ে যেন একটা শীতল স্রোত বয়ে যায়। সে ভয়ে আর লজ্জায় নিজের চোখ জোড়া শক্ত করে বন্ধ করে নেয়। তার বুকটা তখন কামারের হাপরের মতো ধড়ফড় করতে থাকে। আকাশ তখন পুরোপুরি এক ধ্যানে বৃষ্টির সেই চোখ-বন্ধ করা ফর্সা। নিষ্পাপ মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে থাকে তার কপালে এসে পড়া দুই-একটা চুল আলতো করে কাঁপছে। কিছুক্ষণ ওভাবে তাকিয়ে থাকার পর আকাশ নিজের মুখভঙ্গিতে একটা চরম বিরক্তিকর লুক এনে বেশ কড়া গলায় বলে,
—- “আই মিন। চোখ কোথায় রেখে হাঁটো তুমি?”
আকাশের এই ধমকানো সুরে কেঁপে উঠে ঝট করে চোখ খুলে ফেলে বৃষ্টি। সে অত্যন্ত অস্বস্তি নিয়ে এক ঝটকায় নিজেকে আকাশের কাছ থেকে ছাড়িয়ে নেয়। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মাথাটা একদম নিচু করে। নিজের আঙুল মটকানো শুরু করে আমতা আমতা করে বলে,
—- “আসলে হঠাৎ করে পা-টা।”
তার কথা শেষ করার আগেই আকাশ নিজের হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
—- “যাও।”
আর এক সেকেন্ডও সেখানে না দাঁড়িয়ে বৃষ্টি এক দৌড়ে ছাদ থেকে সিঁড়ির দিকে চলে যায়। সে পুরোপুরি চোখের আড়াল হতেই আকাশের মুখের সেই গম্ভীর ভাবটা কর্পূরের মতো উবে যায়। সে আশেপাশে তাকিয়ে দেখে ছাড়ে আর কেউ নেই। অমনি সে হুট করে ক্যান্ডিকে দুই হাতে শূন্যে তুলে ধরে আনন্দের চোটে নাচতে শুরু করে দেয়। ছাদের মাঝখানেই ক্যান্ডিকে নিয়ে গোল গোল হয়ে নাচতে নাচতে সে উন্মাদের মতো বলতে থাকে,
—- “ইয়েস। ইয়েস। এইবার বাঁধন একটা কাজের মতো কাজ করেছে। দ্যাটস মাই বয়। উম্মাহ দোস্ত লাভ ইউ। লাভ ইউ সো মাচ।”
অন্যদিকে। বাঁধন রূপাকে কাঁধে নিয়ে হনহন করে নিচে নেমে পার্কিং লটে থাকা গাড়ির কাছে চলে আসে। পুরোটা পথ রূপা অনবরত হাত-পা ছুড়েছে আর তার পিঠে কিল মারতে মারতে আকুল হয়ে বলেছে,
—- “ছাড়ুন আমাকে প্লিজ। আমি আর ওই বাড়ি যাব না। আমার ওই বাড়িতে থাকার কোনো অধিকার নেই।”
গাড়ির সামনে এসেই বাঁধন এক ঝটকায় কাঁধ থেকে নামিয়ে দেয় রূপাকে। রূপা পায়ের নিচে মাটি পেয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর আগেই। বাঁধন বিদ্যুৎ গতিতে তাকে গাড়ির বডির সাথে শক্ত করে চেপে ধরে। দুজনের দূরত্ব শূন্যের কোঠায়। বাঁধন নিজের তীক্ষ্ণ। জ্বলন্ত চোখ জোড়া রূপার বাদামি চোখের ওপর স্থির রেখে অত্যন্ত গম্ভীর তপ্ত গলায় বলে,
—- “হোয়াট ডিড ইউ জাস্ট সে? কী বললি তুই? তোর অধিকার নেই ওই বাড়িতে?”
স্বভাব মতোই আজকেও বাঁধনের এত নিখাদ পুরুষালি স্পর্শ। তার গায়ের কড়া গন্ধ আর শরীরের উত্তাপে পুরো শরীর অবশ হয়ে আসে রূপার। বুকের ভেতর হার্টবিটটা এত জোরে আছাড় খাচ্ছে যে তার ফর্সা। সরু গলা কাঁপিয়ে দম যেন বন্ধ হয়ে আসতে চায়। রূপা নিজের মনেই অস্থির হয়ে ওঠে এই পুরুষটা কি কোনো জাদু জানে? নাহলে এই মানুষটার এত কাছে আসলে সে প্রতিবার এভাবে অসার হয়ে যায় কেন। রূপাকে স্তব্ধ আর নিশ্চুপ থাকতে দেখে বাঁধনের ভেতরের অস্থিরতা আরও বেড়ে যায়। সে রূপার কোমরের দুই পাশে হাত রেখে তাকে আরও শক্ত করে গাড়ির বডির সাথে চেপে ধরে। বাঁধনের চওড়া শরীরের পুরো ভারে রূপা পেছনের দিকে কিছুটা হেলে যায়। তার কানের দুল দুটো রিনরিন করে কেঁপে ওঠে। বাঁধন আরও কিছুটা ঝুঁকে এসে। রূপার ফর্সা মুখের প্রতিটি ভাঁজ আর কাঁপতে থাকা ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
—- “আই অ্যাম আস্কিং ইউ সামথিং। কী বলছি শুনতে পাচ্ছিস না?”
রূপা নিজের অবশ হয়ে আসা শরীর আর থমকে যাওয়া দম কোনোমতে এক করে। ফর্সা মুখটা সামান্য ফিরিয়ে চোখ বুজে চরম অভিমানী সুরে বলে ওঠে,
—- “যা বলেছি সত্যি বলেছি। আমার কোনো অধিকার নেই ওই বাড়িতে!”
নিজের তৃষ্ণার্ত ও অনমনীয় চোখ জোড়া রূপার বাদামি চোখের ওপর গেঁথে দেয় বাঁধন। তার ফর্সা। অভিমানী মুখের প্রতিটি ভাঁজে নিজের অধিকারের ছোঁয়া মেখে নেশাতুর কণ্ঠে বলে,
—- “অধিকার নেই? অধিকার দিয়ে দেব আমি। তীরন্দাজিনী।”
হুট করে এই ভরদুপুরে। জনসমক্ষে বাঁধনের মুখে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় গোপন পরিচয়টা শুনে তীব্র এক বিস্ময়ে আকাশ থেকে পড়ার মতো দশা হয় রূপার। তার ফরসা কপাল জুড়ে একরাশ ভীতি আর অবাক হওয়ার রেখা ফুটে ওঠে। সে নিজের ভেজা চোখের পাতা দুটো বড় বড় করে। ভুরু কুঁচকে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে,
—- “তীর-তীরন্দাজিনী মানে? কী বলছেন আপনি?”
বাঁধন নিজের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময়। ক্রুর হাসি ফুটিয়ে তোলে। সে রূপার ফর্সা অবয়বটার আরও কাছে ঝুঁকে আসে। এতটাই কাছে যে তার ঠোঁট দুটো প্রায় রূপার কাঁপতে থাকা পাতলা গোলাপী ঠোঁটের ওপর এসে আছাড় খায়। বাঁধন তার তপ্ত ও পুরুষালি নিঃশ্বাস রূপার মুখে ফেলে ফিসফিসিয়ে বলে,
—- “যে নিঁখুতভাবে তীর মারতে জানে, যার লক্ষ্য আর কৌশল কখনো ভুল হয় না, তাকে তীরন্দাজিনী ছাড়া আর কী বলা যায়, ইউ কান্ট হাইড অ্যানিমোর।”
মুহূর্তের মধ্যে পুরো শরীর কেঁপে ওঠে রূপার। সে ভুলেই গিয়েছিল যে গত রাতে এবং তারও আগে এই দুর্ধর্ষ এসপি-র জীবন বাঁচাতে গিয়ে তার কঠিন সত্য এই পুরুষের সামনে ফাঁস হয়ে গেছে। নিজের পরিচয় গোপন রাখার একটা তীব্র আতঙ্ক এবার তাকে গ্রাস করে। সে মরণপণে নিজের দুটো ফর্সা হাত দিয়ে বাঁধনের শক্ত। লোহার মতো চওড়া বুকে ধাক্কা দিতে দিতে অবাধ্য সুর এনে বলে,
—- “আমি কোনো তীরন্দাজিনী নই। বানিয়ে কথা বলবেন না। ছাড়ুন আমাকে।”
বাঁধন তার এই ছটফটানিকে পাত্তাই দেয় না। বরং নিজের শরীরের ভারে রূপাকে গাড়ির সাথে আরও নিবিড়ভাবে পিষে ধরে। তার শক্ত চোয়াল আর গম্ভীর কণ্ঠস্বরে এক অনমনীয় আদেশ ফুটে ওঠে। সে বলে,
—- “ছাড়ার জন্য তোকে ধরিনি, আমাকে রাগিয়ে দেওয়ার আগে ভালো মেয়ের মতো চুপচাপ গাড়িতে ওঠ। ডোন্ট টেস্ট মাই পেশেন্স।”
রূপার ভেতরের জেদ আর অভিমানটা এবার যেন বাঁধনের এই ধমকে একবারে দ্বিগুণ হয়ে দপ করে জ্বলে ওঠে। সে নিজের ছলছল করা বাদামি চোখ দুটো সরাসরি বাঁধনের চোখের ওপর স্থির রেখে। ফর্সা মুখটা উঁচিয়ে অত্যন্ত একরোখা ও অবাধ্য গলায় বলে ওঠে,
—- “উঠব না আমি। কী করবেন আপনি? মারবেন আমাকে? মারুন। মার খাব। তবুও আমি আর কোনোদিন ওই বাড়িতে যাব না।”
রূপার এই অবাধ্য আর জেদি চোখের দিকে নিজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি স্থির রাখে বাঁধন। দুজনের নিঃশ্বাস তখন এক হয়ে মিশে যাচ্ছে। বাঁধন নিজের গলার স্বর আরও নিচু আর গভীর করে চোখে চোখ রেখে বলে,
—- “মারব?”
রূপা নিজের ফর্সা গালে জমে থাকা জেদ আর চোখের জল নিয়ে একচুলও না দমে বলে,
—- “মারুন।”
—- “আর ইউ শিওর?”
—- “হু।”
রূপার মুখের ওপর অবাধ্য আর জেদি ভাবটা দেখে রেগে আগুন হয়ে যায় বাঁধন। নিজের শক্ত। চওড়া হাতটা সজোরে থাপ্পড় মারার জন্য শূন্যে উঁচিয়ে ধরে। সামনে এমন রুদ্রমূর্তি দেখেও কিন্তু নিজের স্বভাবজাত জেদ থেকে একচুলও নড়ে না রূপা। সে ভয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে নেয় না। বরং নিজের ফর্সা মুখটা উঁচিয়ে বুক টান করে বাঁধনের চোখের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে। মাথার ওপর উঁচিয়ে ধরা হাতটা ঠিক তখনই তীব্র গতিতে রূপার ফর্সা গাল বরাবর নেমে আসে বাঁধনের। কিন্তু গালের ঠিক কয়েক ইঞ্চি দূরত্বে আসতেই নিজের থাপ্পড় মারার ভঙ্গিটা এক লহমায় বদলে ফেলে। সজোরে আঘাত করার বদলে সে অত্যন্ত আলতো পরম মমতায় নিজের বড় হাতের তালুটা রূপার নরম। ফর্সা গালের ওপর স্থাপন করে। হঠাৎ এই অপ্রত্যাশিত আর নিবিড় স্পর্শে পুরো শরীর রিনরিন করে কেঁপে ওঠে রূপার। তার গালে যেন এক অদ্ভুত উষ্ণ স্রোত বয়ে যায়। সে নিজের বড় বড় বাদামি চোখ জোড়া মেলতেই দেখে বাঁধনের চোখের সেই জ্বলন্ত রাগটা উবে গিয়ে সেখানে এক গভীর। নেশাতুর মায়া খেলা করছে। রূপার ফর্সা গালের ওপর নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে আলতো করে স্লাইড করতে করতে নিজের গম্ভীর। পুরুষালি কণ্ঠস্বরটা একদম নরম করে ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে বাঁধন,
—- “রাগ করে না জান’বা’চ্চা, লেটস গো হোম, বাড়ি চল।”
থমথমে পরিস্থিতির মাঝে বাঁধনের মুখে এমন অদ্ভুত। তীব্র ভালোবাসা মাখানো ‘জানবাচ্চা’ শব্দটা শুনে গভীর বিস্ময়ে একবারে আকাশ থেকে পড়ার মতো দশা হয় রূপার। তার ফর্সা। মায়াবী মুখটা থমকে যায়। চোখের মণি দুটো ছানাবড়া হয়ে ওঠে। এই দুর্ধর্ষ। কড়া মেজাজের লোকটা হুট করে তাকে কী বলে ডাকছে সেটা নিজের কানকেও যেন বিশ্বাস করাতে পারে না রূপা। হাঁ করে রূপাকে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তোলে বাঁধন। রূপার সেই মায়াবী। স্তব্ধ হয়ে যাওয়া ফর্সা মুখটার দিকে নিজের নেশাতুর চোখ জোড়া স্থির রেখে রসিকতার সুরে বলে,
—- “বাড়ি গিয়ে যত ইচ্ছে দেখিস আমাকে, আই অ্যাম অল ইওরস। এখন আর কথা না বাড়িয়ে গাড়িতে ওঠ।”
ফ্লার্ট মাখানো কথা শুনে লজ্জায় ও সংকোচে নিজের বড় বড় বাদামি চোখ জোড়া নিচু করে নেয় রূপা। তার ফর্সা গালে লজ্জার রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ে। তবে লজ্জার আড়ালে তার ভেতরের অভিমানটা এখনো পাহাড় সমান অনড় হয়ে আছে কোনোভাবেই সে আর ওই বাড়িতে ফিরে যেতে চায় না। কিন্তু এই একরোখা পুরুষের শক্ত বাঁধন থেকে এখন কীভাবে নিজেকে মুক্ত করবে। তা কিছুতেই বুঝতে পারছে না সে। ঠিক তখনই হুট করে মায়াবী মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে যায় রূপার। সে নিজের ঠোঁটে কৃত্রিম এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে সরাসরি বাঁধনের চোখের দিকে তাকায়। তারপর নিজের একটা ফর্সা আঙুল উঁচিয়ে বাঁধনের ঠিক পেছনের দিকে ইশারা করে বেশ চড়া গলায় বলে ওঠে,
—- “ওই দেখুন। আপনার বউ আসছে।”
রূপার মুখে এমন আজব কথা শুনে গভীর বিস্ময়ে মুহূর্তের জন্য নিজের ঘাড়টা পেছনের দিকে ঘোরায় বাঁধন। আর ঠিক এই সুবর্ণ সুযোগটাই লুফে নেয় রূপা। বাঁধন পেছনে তাকানো মাত্রই সে নিজের শরীরের সমস্ত শক্তি এক করে সজোরে একটা ধাক্কা বসিয়ে দেয় বাঁধনের চওড়া বুকে। আচমকা এই ধাক্কায় বাঁধন কিছুটা পিছিয়ে যেতেই। এক ঝটকায় নিজেকে মুক্ত করে নিয়ে বাতাসের গতিতে কলেজের মেইন গেট দিয়ে বাইরের রাস্তার দিকে দৌড়ে পালিয়ে যায় রূপা। সামনে ফাঁকা রাস্তা দেখে নিজের এই চরম বোকামিটা মুহূর্তের মধ্যে বুঝতে পারে বাঁধন। রূপার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রাগে। ক্ষোভে আর চরম বিরক্তিতে নিজের ডান পা দিয়ে সজোরে গাড়ির চাকার ওপর একটা লাথি বসায়। নিজের মাথার ব্যান্ডেজটা হাত দিয়ে চেপে ধরে। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে দাঁতে দাঁত চেপে কড়া গলায় বলে,
—- “নাক টিপলে যার এখনো দুধের গন্ধ বেরোবে, সেই পিচ্চি মেয়ে কিনা আমাকে এভাবে বোকা বানিয়ে চলে গেল। হাউ ইজ দিস ইভেন পসিবল?”
রাস্তায় এসে বেশ কিছুটা দৌড়ে দম নেওয়ার জন্য এক জায়গায় দাঁড়ায় রূপা। অতিরিক্ত পরিশ্রমে ফর্সা মুখটা লাল হয়ে উঠেছে। বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। ঠিক তখনই গাড়ির ইঞ্জিনের আওয়াজ কানে আসতেই ঝট করে পেছনে তাকায় রূপা। দেখে। ঠিক পেছনেই ক্রুর এক চিলতে হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে ধীর গতিতে গাড়ি নিয়ে এগিয়ে আসছে বাঁধন। সামনে আর কোনো উপায় না পেয়ে আবারও সামনের দিকে প্রাণপণে দৌড় লাগায় সে। ওদিকে গাড়ির গতি একদম কমিয়ে ঠিক পেছন পেছন অত্যন্ত ধীর লয়ে ড্রাইভ করতে থাকে বাঁধন। জ্বলন্ত চোখ জোড়া রূপার ওপর স্থির। আসলে দেখতে চায় এই অবাধ্য মেয়েটা আজ কতদূর দৌড়ে পেরে ওঠে।কিন্তু এভাবে কতক্ষণ। একটানা দৌড়াতে দৌড়াতে একপর্যায়ে একদম হাঁপিয়ে ওঠে রূপা। পা দুটো অবশ হয়ে আসায় রাস্তার ওপর সজোরে আছাড় খেয়ে পড়ে যায়। আর ঠিক তখনই চাকার তীক্ষ্ণ শব্দ তুলে রূপার ঠিক ইঞ্চি খানেক দূরত্বে এসে সজোরে ব্রেক কষে গাড়িটা। ধাক্কা লাগার ভয়ে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে নিলেও। নিজেকে অক্ষত আবিষ্কার করে ধীর পায়ে সামনে ঘোরে রূপা। দুই হাত পিচঢালা রাস্তায় ভর দিয়ে ওভাবেই বসে পড়ে গাড়ির দিকে অসহায় চাউনি মেলে তাকায়। গাড়ির দরজা খুলে অত্যন্ত রাজকীয় ভঙ্গিতে নেমে আসে বাঁধন। তারপর রূপাকে চমকে দিয়ে এক লাফে গাড়ির সামনের কাঁচের ওপর বেশ আয়েশ করে উঠে বসে পড়ে। ঠোঁট সরু করে একটা হালকা শিস বাজাতে বাজাতে রূপার ভয়ার্ত ও ফর্সা মুখের দিকে তাকিয়ে উপহাসের সুরে বলে,
—- “কী হলো? এভাবে রাস্তায় বসে আছিস কেন? রান, রূপা রান। পালা।”
রূপা নিজের অবাধ্য বাদামি চোখ দুটো উঁচিয়ে অত্যন্ত অভিমানী ও ক্লান্ত কণ্ঠে চেঁচিয়ে বলে,
—- “দেখুন, আমি ওই বাড়িতে যাব না। কেন জোর করছেন আমাকে?”
নিজের চওড়া কাঁধ দুটো ঝাঁকিয়ে। চোখের মণি জোড়া কুঁচকে একরোখা সুরে বলে বাঁধন,
—- “আই লাভ চ্যালেঞ্জেস। আমি জোর করেই যেকোনো জিনিস নিজের করতে পছন্দ করি। সো, এখন আমি নিচে নামছি। তুই আবার দৌড়ানো শুরু কর।”
কথাটা শেষ করেই গাড়ির কাঁচ থেকে এক ঝটকায় নিচে নেমে সোজা রূপার দিকে পা বাড়ায় বাঁধন। ওভাবে নামতে দেখে ভয়ে ধড়ফড় করে রাস্তা থেকে কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়ে আবারও সামনের দিকে অন্ধের মতো দৌড় শুরু করে রূপা। এবার আর গাড়িতে নয়। পায়ে হেঁটেই অত্যন্ত ধীর ও আয়েশী চালে রূপার পিছু পিছু ছুটতে থাকে বাঁধন। মাঝরাস্তায় হুট করে এমন অদ্ভুত দৃশ্য দেখে আসেপাশের পথচারীরা পুরো থমকে যায়। দেখা যাচ্ছে অত্যন্ত সুদর্শন। চওড়া অবয়বের এক যুবক মাথায় সাদা ব্যান্ডেজ নিয়ে এক সুন্দরী। হাঁটু ছোঁয়া লম্বা চুলের মেয়ের পিছু পিছু ছুটছে। রাস্তার ভিড়ের মধ্যে অনেকেই চিনে ফেলে ফিসফিস করতে শুরু করে দিয়েছে। অনেকেই ভাবছে আরে। এ তো আমাদের এসপি স্যার। হয়তো মেয়েটা কোনো মারাত্মক ক্রিমিনাল। তাই স্যার নিজে এভাবে তার পেছনে দৌড়ে ধরার চেষ্টা করছেন। এই ভেবে আশেপাশে থাকা সাধারণ মানুষ হা করে পুরো দৃশ্যটা দেখতে থাকে। দৌড়াতে দৌড়াতে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতেই রূপা দেখে। বাঁধন এখনো পিছু ছাড়েনি। একদম কাছাকাছি দূরত্বে বজায় রেখে অত্যন্ত আরাম করে পেছনে দৌড়াচ্ছে। এই সাবলীল দৌড়ানোর ভঙ্গি দেখেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। ইচ্ছে করেই আস্তে দৌড়াচ্ছে এবং রূপাকে ক্লান্ত করার একটা খেলা খেলছে বাঁধন। ক্লান্তিতে রূপার মস্তিষ্ক তখন পুরোপুরি কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। পেছনের পুরুষটা যে একটা গোটা জেলার এসপি। সেই ভীতি আর পদের কথা ভুলেই তীব্র ক্ষোভে চিৎকার করে বলে ওঠে,
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ২৫
—- “কে কোথায় আছেন গো? বাঁচান আমাকে। এই লোকটা আমাকে জোর করে ধরে নিয়ে যাচ্ছে।”
রূপার এমন পাগলামি দেখে পেছন থেকে একগাল হেসে নিজের গলার পুরুষালি স্বর কিছুটা চড়া করে বেশ মজা নেওয়ার সুরে বলে বাঁধন,
—- “বেয়াদব মেয়ে। আরও জোরে দৌড়া। এত আস্তে দৌড়ালে তো আমি তোকে এখনই ধরে ফেলব। আরো ফাস্ট রান কর সুইটহার্ট।”
