বিষাক্ত প্রেমের অনুভূতি পর্ব ১২
Muntaha jahan
কিচেনে গভীর মনোযোগ দিয়ে পাস্তা বানাচ্ছে নিল,ধ্যান জ্ঞান এখন পাস্তা বানানোতে,রান্নার কাজ সব সময়ই সে করে,তবে এ্যাশ আর ফাহাদের খাবার তো ওই ঘাস লতাপাতা যেটায় নিলের পোশায় না,সে সব সময়ই নিজের জন্য বাঙালি ডিস রান্না করবে। এতোদিন রান্না করার আলসামিতে ওই লতাপাতা ই কোনো রকমে খেয়েছে কিন্তু আজকে কিছুতেই এগুলো মুখে রুচছে না তার,তারজন্য এ্যাশ যাওয়ার পরপরই মুখের রুচি ফিরিয়ে আনার জন্য ঝালঝাল পাস্তা বানাচ্ছে।
পাসওয়ার্ড চেপে দরজা খুলে এ্যাশের বাসায় প্রবেশ করলো কেনায়া,পিছন পিছন মোহনা ও গেলো মাথা নিচু করে,ভিতরে যেতেই নিলকে ডাইনিং এ দেখলো কেনায়া,কোনোকিছু না ভেবেই দৌড় দিলো সেদিকে।
নিল সবেই তার সাধের ঝালঝাল পাস্তা নিয়ে ডাইনিং বসেছিলো যে ই না মুখে দিবে ওমনি হামলে পড়লো কেনায়া,নিল হকচকিয়ে চিৎকার করে উঠলো
-“ওরে কোন রাক্ষসীর আম্মা হামলে পড়লো আমার সাধের পাস্তার উপর।
ততক্ষণে তিন চার চামচ মুখে পুড়ে নিয়েছে কেনায়া,নিল কেনায়াকে দেখেই ক্ষেপে গেলো
-“ছখিনার বাচ্চা তোর ঘরবাড়ি নেই? সাত সকালে আমার বাড়িতে তোর কি? যা বের হ।
বলেই ঘাড় চেপে ধরলো কেনায়ার,একসাথে তিন চার চামচ পাস্তা মুখে নিয়ে বিপদে পড়লো কেনায়া,এতো ঝাল যে চোখ দিয়ে পানি পড়া শুরু করেছে,চিবুতে নিতেই বিষম খেয়ে গেলো,নিল পানি এগিয়ে দিলো,সে জানে কেনায়া এগুলো খেতে পারে না,তবুও মুখে নিবে আর ঝালে পাগল পাগল হবে। পানি খেয়ে একটু আরাম পেলো কেনায়া,চেয়ায়ে মাথা ঠেকিয়ে বসে মুখের গুলো চিবুলো।
নিল অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে তার পাস্তা দিকে,বড় বড় চামচে অর্ধেক পাস্তাই মুখে নিয়ে নিয়েছে কেনায়া। নিল বড়ই আফসোসোস স্বরে বললো
-“১ ঘন্টা ধরে কওো কষ্ট করে পাস্তা রান্না করলাম আর ছকিনা রাক্ষসী কি না আমার সব সাধের পাস্তা গিলে নিলো? এই তুই কতোদিন ধরে খাস না? বের হ বাসা থেকে বের হ বলছি।
-“নিল আপনার টাকাটা।
কথাটা বলে কেনায়াকে ধাক্কা মারতে নিছিলো নিল তখনই পাশ থেকে পরিচিত মেয়েলী কন্ঠ শুনে চমকে তাকালো,মোহনাকে এখানে দেখে বিস্ময়ে চোয়াল ঝুলে পড়লো,বিস্ময় নিয়েই বললো
-“তুমি এখানে কি করছো?
নিলকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে বিব্রত হলো মোহনা কোনোরকমে টাকাটা নিলের হাতে গুঁজে দিয়েই দৌড়ে বেরিয়ে গেলো বাসা থেকে,নিল তখনো বিস্ময়ে হা করে তাকিয়ে।
কেনায়া আরেক চামচ পাস্তা মুখে তুলে নিলের হা করা মুখে এক চামচ পাস্তা তুলে দিয়ে বললো
-“মশা না খেয়ে ধর পাস্তা খা।
মুখের পাস্তা টুকু চিবুতে চিবুতে নিল বললো
-” ও বাসায় কি করে ঢুকলো? আর কেনো এসেছিলো এখানে? এভাবে বেরিয়ে গেলো যে?
পাস্তার পুরো প্লেট এখন নিজের আয়ত্বে নিয়ে নিয়েছে কেনায়া,বড্ড ভালো পাস্তা বানিয়েছে নিল,কেনায়া একটু প্রশংসা করবে ভাবলো কিন্তু ভাব বেড়ে যাবে বলে করলো না। নিলের প্রশ্নের উওরে নিলের হাতের টাকার দিকে ইশারা দিলো,তারপর মুখে বললো
-“আমি বাসায় ঢুকার সময় দেখলাম ও বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে,জিজ্ঞেস করলাম এখানে কি দরকার বললো তোর সাথে দেখা করবে তাই তো সাথে নিয়ে ভিতরে আসলাম,আমার সাথেই ভিতরে এসেছে তুই ই খেয়াল করিস নি।
টাকার দিকে তাকাতেই গম্ভীর হয়ে গেলো নিল,সেদিনের কথা মনে পড়তেই দাঁড়িয়ে গেলো,কোনো কিছু না বলেই সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেলো। কেনায়া নিলের যাওয়ার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে,ঝাল লেগেছে আবার কত কেজি মরিচ দিয়েছে কে জানে, একটু পানি খেয়ে আরেক চামচ পাস্তা মুখে নিলো কোনো রকমে বিড়বিড় করে বললো
-“এর আবার কি হলো? বাড়িতে যে আমি এসেছি চোক্ষে পড়লো না? যত্ন আত্মী করবে না? এমন ঢেঙ ঢেঙ করে উপরে চলে গেলো কোন আক্কেলে?
সারাদিন রোদের আলোয় জ্বলমলে ছিলো দিনটা,সূর্যি মামা তার রুপের তেজ দিয়ে সবাইকে পুড়িয়ে মেরেছে অথচ সন্ধ্যা নামতে না নামতেই ধরনীতে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে,আর এই বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বাড়ি ফিরছে ইহান,ব্যাস্ত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ৩ তলায় উঠলো,দুপুরে বাসায় আসে নি কল করে ও না ফেরার কথা বলতে পারে নি,ফুফু আর তার বউটা নিশ্চয়ই চিন্তা করছে।
কলিং বেলে বেজ চাপ দিতেই দরজা খুললো কেউ,দরজার ওপাশে নিজের মাকে দেখেই চমকালো ইহান,আয়েশা বেগম কোমড়ে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পিছনের সোফায় বসা নূর আর সাইফা বেগম,ইহান তাদের দিকে এক পলক তাকিয়ে আবার ও মায়ের দিকে তাকালো,গুটিশুটি পায়ে ভিতরে এসে বললো
-” মা তুমি এখানে?
-” কান ধর।
-“কিহ?
-“কান ধর।
মায়ের এমন কথার মানে বুঝলো না ইহান,তবে তৃতীয় বার প্রশ্ন করার সাহস ও পেলো না,সোফার দিকে এক পলক তাকালো বউ তার মিটিমিটি হাসছে,বউয়ের সামনে আজকে তার ইজ্জতের বেইজ্জত হয়ে গেলো,ঠোঁট উল্টে কান ধরে দাড়ালো ইহান,নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করলো
-“আমার অপরাধ?
-“এরকম একটা বাচ্চা মেয়েকে তোর মতো বুড়ো কি করে বিয়ে করলি? বাল্যবিবাহ করা অপরাধ জানোস না? তুই ডাক্তার হয়েও অপরাধ করলি।
মায়ের মুখে বুড়ো শুনে হতভম্ব ইহান,২৮ বছরে কেউ বুড়ো হয়ে যায়? তার মা তাকে বু্ড়ো উপাধি দিয়ে দিলো? তাহলে বউ? সে তো আরো আগে নাচতে নাচতে বলবে এখন।
-“আমি বুড়ো মা?
-“ওর পাশে তো তাই মনে হবে। ওর বয়স দেখেছিস? খেলাধুলা করার বয়স এখন ওর।
-“নূর এতোটাও ছোট না আম্মু। ১৫ বছর বয়স।
-“তো কি? আমি এই বিয়ে মানবো না ডিভোর্স দিবি তুই ওকে।
ডিভোর্সের কথা শুনতেই গম্ভীর হয়ে গেলো ইহান কান থেকে হাত নামিয়ে ফেললো,মায়ের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর রাশভারি কন্ঠে বললো
-“মৃত্যু ছাড়া আমাদের আলাদা করা অসম্ভব মা,আমি নূরকে কখনোই ডিভোর্স দিবো না,এই চিন্তা মাথায় আনলে ছেলেকে ভুলে যাও।
-“তোর বাবা তোকে তেজ্য পুএ করবে ইহান।
-“করুক তাতে আমার সমস্যা নেই,আমি নূরকে কখনোই ডিভোর্স দিবো না।
ছেলের দিকে এখন এগিয়ে গেলেন আয়েশা বেগম ছেলে তার খুব রেগে গেছে এটা বুঝলেন তিনি,ছেলের কাঁধে হাত রেখে বললেন
-“কওো কষ্ট করে জন্ম দিয়েছি তোকে আমি আর তুই কি সহজেই বলে দিলি ছেলেকে ভুলে যাও? তুই এরকম একটা কান্ড করলি তারপর কি তোকে একটু শাস্তি দেওয়ার ও অধিকার নেই আমার?
চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে ইহান,আয়েশা বেগম নূরের দিকে তাকিয়ে বললেন
-“আমি তো একটু দেখছিলাম ডিভোর্সের কথা শুনলে তুই কেমন রিয়েক্ট করিস,এমন রসগোল্লার মতো বউকে আমি হাতছাড়া করবো নাকি?
ইহান অপরাধীর মতো তাকালো মায়ের দিকে কিভাবে রিয়েক্ট করলো সে,মা হয়তো খুব কষ্ট পেয়েছে মনে মনে। তার মা বরাবরই চাপা সভাবের বুক ফাটে তবু মুখ ফুটে না,সব কষ্ট মুখ বুঝে সহ্য করে নিবে কখনো প্রকাশ করবে না,ইহান মাকে জরিয়ে ধরে বললো
-“সরি মা মাফ করে দাও,,না বুঝেই ওরকম ভাবে রিয়েক্ট করে ফেলেছি।
আয়েশা বেগম ছেলেকে ছাড়িয়ে কপালে একটা চুমু দিলেন,এ্যাশকে কাছে পান নি ইহানই তার সব এ্যাশের ভাগের ভালোবাসা ও সব ইহানকে দিয়েছেন, এ্যাশকে জেনো ইহানের মধ্যেই খুঁজে নিয়েছেন তিনি,তাইতো ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছেন।
ইহান আর নূরকে মানানোর জন্য অনেক ঝগড়া করেছেন স্বামীর সাথে,তবুও তিনি মানেন নি তার এক কথা নূরকে ডিভোর্স দিবে ইহান নয়তো ওকে তেজ্যপূএ করবেন,শেষ অব্ধি স্বামীর সাথে তর্কে না করে তিনি বেরিয়ে এসেছেন বাসা থেকে বলে এসেছেন ইহান নূরকে তিনি না মানলে তিনি ও বাসায় ফিরবে না।
কালকে রাত থেকে না খাওয়া আরাবী তাহা ভার্সিটি থেকে সন্ধ্যায় ফিরে যখন জেনেছে আয়েশা বেগম বাড়ি থেকে চলে গেছে তখন থেকেই অনশন নিয়েছে দুজন,সাইফা বেগমের বাসায় যেতে যেই না পা বাড়াবে অমনি বৃষ্টি শুরু হয়,সে বৃষ্টি সারারাতে ও শেষ হয় না,সকালে এসে কিছুটা কমতেই ড্রয়িং রুমে এসে দাড়িয়েছে দুজন,উদ্দেশ্য সাইফা বেগমের বাসা।
দরজা খুলে বের হওয়ার আগেই কলিং বেলের আওয়াজ কানে আসলো তাদের,আরাবী গিয়ে দরজা খুলতেই একজন জিজ্ঞেস করলো
-“এ বাড়িতে আরাবী খান কে আছেন?
-“জ্বিই আমিই আরাবী,বলুন কি দরকার।
-“আপনার নামে একটা পার্সেল আছে।
ভ্রু কুঁচকালো আরাবী,সে তো কিছু অডার করে নি,তাহলে কিসের পার্সেল?
-“আমি তো কিছু অডার করি নি।
-” এটা গিফট হিসেবে পাঠানো হয়েছে আপনাকে।
বলেই লোকটা তাড়াহুড়ো করে চলে গেলো,আর দাঁড়ালো না,আরাবী দেখলো অনেক বড় একটা বক্স এতো বড় বক্সে কি আছে বুঝলো না আরাবী,তাহা ও এসে পাশে দাড়িয়েছে ততক্ষণে,বক্সের দিকে একপলক তাকিয়ে বললো
-“নিশ্চয়ই তোর কোনো লাভার পাঠিয়েছে,কিন্তু এতো বড় বক্সে কি?
কৌহতুহল বশত তাহাই দৌড়ে গেলো বক্সের দিকে,বক্স খুলে ভিতরে তাকাতেই চিৎকার করে সরে গেলো তাহা,তাহা এতো জোড়ে চিৎকার দিয়েছে যে বাড়ির সবাই ততক্ষণে বাইরে চলে এসেছে,বুকে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাহা,আয়ুশ ওর কাছে এগিয়ে গিয়ে বললো
বিষাক্ত প্রেমের অনুভূতি পর্ব ১১
-” কি হয়েছে? এমন করছিস কেনো? চিৎকার ই বা কেনো করলি?
তাহার বক্সটার দিকে আঙুল তুলে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো
-“ল,,লা\শ ভিতরে কি ভ,,,ভয়ংকর দেখতে মুখটা।
-” কি সব বলছিস পাগলের মতো? লা\শ কোথা থেকে আসবে?
আয়ুশ তাহাকে ছেড়ে নিজেই এগিয়ে গেলো বক্সের দিকে,সাথে সাথে নিজেও চমকে গেলো আয়ুশ,তাকালো তাহার দিকে তাহা তখনো এক নজরে বক্সের দিকে তাকিয়ে। আরাবী দূরে দাঁড়িয়ে আছে এ-সব কিছু তার। মাথায় ঢুকছে না,কালকে রাত থেকে না খেয়ে থাকার ধরুন অসুস্থ লাগছে এখন তার,বক্সের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই মাথা ঘুরিয়ে পড়ে গেলো সে।
