বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ২৪
ইসরাত জাহান দ্যুতি
এই দৃশ্যটাই যেন ওর মধ্যে কয়েক মাস পূর্বের সেই খুনি দ্বৈত সত্তাটা জাগিয়ে তুলল। তুরস্কের আনাতোলিয়ার সেই রুক্ষ পাহাড় চষে বেড়ানো মেয়েটা, যার রক্তেই মিশে আছে তুর্কি শিকারি পূর্বপুরুষদের তেজ। সে আজ এক লহমায় ফিরে এল। নিজের জীবনের পরোয়া না করে সে দা-টা হাতে নিয়ে মরণপণ জেদে সোজাসুজি ভালুকটার সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। জন্তুটা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল তখন। তার ক্ষুদ্র, রক্তাভ চোখ দুটো আশফিকে ছেড়ে এই নতুন আপদকে মেপে নিতে চাইল। বনের সবচেয়ে বড়ো নিয়ম হঠাৎ আসা কোনো বাধাকে আগে দমানো।
আশফির ওপর থেকে তার শরীরের ভর কিছুটা সরিয়ে নিয়ে পেছনের দু-পায়ে ভর দিয়ে আধখাড়া হলো। তার আদিম প্রবৃত্তি অনুযায়ী প্রচণ্ড এক গর্জন ছাড়ল। প্রকাণ্ড এক দেয়ালের মতো পাহাড়ের ঢালে নিজেকে মেলে ধরল জন্তুটা। তারপর তার বিশাল এক থাবা মারিশার মাথা লক্ষ করে চালাল। বাতাসের বুক চিরে আসা সেই থাবার আঘাতটা যদি লাগত, তবে মারিশার খুলিটা চূর্ণ হয়ে যেত। থাবার ঝাপটায় কেবল গায়ের জ্যাকেটটা কেঁপে উঠল ওর।
সাধারণ কেউ হলে হয়তো ভয়ে কুঁকড়ে যেত৷ কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে মারিশার আনাতোলিয়ান রক্ত কথা বলে উঠল। সে জানত, সামনে থেকে আসা এই থাবা এড়ানোর একমাত্র পথ শরীরটা নিচু করে একপাশে সরে যাওয়া। তখন সে তার বাম পা-টা পাথুরে মাটিতে শক্ত করে গেঁথে শরীরটাকে ডানে ঘুরিয়ে নিল, একদম সেকেন্ডের ভগ্নাংশের হিসেবে।
ভালুকের সেই প্রকাণ্ড থাবাটা ওর কান ঘেঁষে শূন্যে আঘাত করল। জন্তুটা তার নিজের ভার সামলাতে গিয়ে সামান্য ঝুঁকে পড়ল সামনের দিকে। পশুর এই ভারসাম্যের অভাবটাই একজন শিকারির সবচেয়ে বড়ো সুযোগ। সেই সুযোগটা হারাল না মারিশা। ভালুকটা আবার থাবা চালানোর আগেই সুযোগে সে ঘুরে দাঁড়িয়ে তার শরীরের পুরো ওজনটা ডান হাতের কব্জিতে চালান করে দিয়ে দা-টা উঁচিয়ে ধরল। ভালুকটা যখন আবার আশফির টুঁটি লক্ষ করে কামড় বসাতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তে ওর হাতের দা-টা বাতাসের বুক চিরে নেমে এল।
হাড় আর পেশী কাটার একটা বীভৎস শব্দ বনের নিস্তব্ধতায় শোনা গেল। দা-টা গিয়ে বিধল ভালুকটার ঘাড়ের সেই সন্ধিস্থলে, যেখানে মেরুদণ্ডটা মাথার খুলির সাথে মিশেছে। তপ্ত কালচে রক্ত ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে এসে মারিশার মুখ আর জ্যাকেটে এসে পড়ল। যন্ত্রণায় আর বিস্ময়ে ভালুকটা এক নারকীয় চিৎকার দিল। সে হয়তো কল্পনাও করেনি এই ক্ষুদ্র শরীরটার ভেতরে এত জোর লুকিয়ে থাকতে পারে।
কিন্তু আহত বন্য জন্তু যে কত ভয়ংকর হতে পারে, তা পরের মুহূর্তেই বোঝা গেল।
আনাতোলিয়ান রক্ত মারিশার দ্বৈত সত্তাকে সাহস দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু প্রকৃতির এই আদিম শক্তির সামনে তা যথেষ্ট ছিল না। দা-র প্রথম কোপটা খেয়ে ভালুকটা যন্ত্রণায় উন্মাদ হয়ে আশফিকে ছেড়ে দিয়েই তার বিশাল শরীর নিয়ে মারিশার ওপর আছড়ে পড়ল। মারিশা সেই প্রচণ্ড ভার সামলাতে পারল না। কয়েকশ কেজি ওজনের একটা চলন্ত পাহাড়ের ধাক্কায় ও ছিটকে গিয়ে পড়ল রডোডেনড্রন গাছের কর্কশ গুঁড়িতে। পিঠের হাড়গুলো মটমট করে উঠল ওর। যন্ত্রণায় এক মুহূর্তের জন্য পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে এল। গলা থেকে বেরিয়ে এল গগনবিদারী আর্তনাদ … চিৎকার করে কেঁদে উঠে মাকে ডাকল৷ তারপরও আপ্রাণ চেষ্টা করল মাটিতে পড়ে থাকা দা-টা আবার আঁকড়ে ধরতে, কিন্তু ওর বাম কাঁধের সেই গভীর ক্ষতটার জন্য হাতটা তখন পুরোপুরি অবশ। ওর আঙুলগুলো অবাধ্য হয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল। ঠিক সেই মুহূর্তেই ভালুকটা তার রক্তমাখা মুখ হাঁ করে ওর ওপর শেষ ঝাঁপটা দিল। জন্তুটার নখরযুক্ত বিশাল থাবা ওর বুকের ওপর চেপে বসল, মুহূর্তেই ফুসফুস থেকে বাতাস বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো ওর। নিমিষেই বুঝে গেল, ওর সময় শেষ। ভালুকটার দানবীয় থাবা ওর বুকের খাঁচাটা পিষে ফেলছে, শ্বাস নেওয়ার প্রতিটি চেষ্টা যেন এক একটা ধারালো ছুরির মতো ফুসফুসে বিঁধছে। ওর চোখের মণির একদম কাছে ভালুকটার লালা ঝরা বিভীষিকাময় মুখটা। মৃত্যু অবধারিত ভেবে ও চোখদুটো বন্ধ করে নিল।
কিন্তু ঠিক তখনই অরণ্যের সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে এক পৈশাচিক চিৎকার ভেসে এল, “এই … জানোয়ারের বাচ্চা…!”
আশফি! কীভাবে উঠে দাঁড়াল সে … অভাবনীয় শক্তিটুকু ও কোথায় পেল, তার কোনো যুক্তি নেই। মানুষের মস্তিষ্ক যখন প্রিয়জনকে মরতে দেখে, তখন শরীর অ্যাড্রেনালিনের এমন এক জোয়ার তৈরি করে যা যন্ত্রণাকে সাময়িকভাবে অবশ করে দেয়।
দৌড়ে এল না আশফি, সে যেন ঠিক একটা আহত বাঘের মতো ঝাপিয়ে পড়ল। জলাশয়ের পিচ্ছিল পাথরের ওপর পড়ে থাকা দা-টা সে ঝড়ের বেগে তুলে নিল। ভালুকটা যখন মারিশার টুঁটি লক্ষ করে কামড় বসাতে মুখ নামিয়েছে, ও তখন পাশ থেকে ওর ঘাড়ের ওপর আছড়ে পড়ল। তবে কোনো নিপুণ কোপ নয়, শরীরের পুরো ওজন আর আক্রোশ দিয়ে দা-টা নামিয়ে আনল ভালুকটার ঘাড় আর চোয়ালের সংযোগস্থলে। পেশী চিরে হাড়ের ভেতর আটকে গেল দা-টা।
মারিশাকে ছেড়ে দিয়ে মৃত্যুসম যন্ত্রণায় জানোয়ারটা অরণ্য কাঁপিয়ে বিকট এক আর্তনাদ করে উঠল। সে ঘাড় ঝাড়া দিয়ে আশফিকে ফেলে দিতে চাইল, কিন্তু মারিশার মতো আশফিও তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। দা-টা টেনে বের করার সময় পেল না ও। বরং ওটা ধরে রেখেই ওপর-নিচ মোচড় দিতে লাগল। দাউদাউ করে জ্বলে ওঠা আক্রোশে ও দ্বিতীয়বার কোপ বসাল জন্তুটার উন্মুক্ত শ্বাসনালী লক্ষ করে।
ওর জন্য লড়াইটা কোনো বীরত্বের ছিল না, ছিল স্রেফ একটা মরনপণ কাড়াকাড়ি। যতবারই ওকে এভাবে লড়তে হয়েছে, তা স্রেফ জীবন বাঁচানোর তাগিদে বা জীবন ঝুঁকিতে না পড়লে। নয়তো কখনোই কোনো নিরীহ প্রাণী অথবা হিংস্র প্রাণীকে হত্যা করেনি সে।
ভালুকটার বিশাল থাবা আশফির পিঠে আর পেটে যখন এলোপাথাড়ি আঁচড় কাটল, তবু ও কামড় দিয়ে ধরা শিকারির মতো জন্তুটার ঘাড় আঁকড়ে ধরে দা-টা চালিয়েই গেল। তপ্ত রক্তে দুজনেই ভিজে সপসপে।
শেষমেশ ভালুকটার শ্বাসনালী চিরে যাওয়ায় তার চিৎকার এক বীভৎস ঘড়ঘড় শব্দে পরিণত হলো। বাতাসের বদলে তার ফুসফুসে এখন নিজেরই রক্ত ঢুকছে। জন্তুটা কয়েকবার টাল সামলাতে না পেরে পাথুরে ঢালে আছড়ে পড়ল। আশফি তখনো দা-টা শক্ত করে ধরে রাখা অবস্থাতেই ওর ওপর ছিটকে পড়ল।
ভালুকটার বিশাল পা দুটো কয়েকবার মাটিকে খামচে ধরার চেষ্টা করল, তারপর এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে নিথর হয়ে গেল।
এরপরও আশফি দা-র বাঁটটা দুই হাতে আঁকড়ে ধরে আছে। ওর চোখ দুটো রক্তবর্ণ, আঘাতে জর্জরিত শরীর থরথর করে কাঁপছে, ওর হাতের কব্জি পর্যন্ত রক্তে লেপটে আছে। নির্বাক হয়ে দেখতে লাগল জন্তুটার মৃত্যুর মুহূর্ত।
তারপর হঠাৎ করেই ওর শরীরের সেই অলৌকিক শক্তিটা যেন ফুটো হয়ে যাওয়া বেলুনের মতো বেরিয়ে গেল। দা-টা ছেড়ে দিয়ে ভালুকটার থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে ধীরে ধীরে তাকাল কয়েক হাত অদূরে থাকা প্রাণপ্রিয় মানুষটার দিকে।
উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করছিল মারিশা। কাঁধের ক্ষত, পায়ের ক্ষত, আছড়ে পড়ায় সারা শরীরটাই যন্ত্রণাতে বিষাক্ত হয়ে উঠেছে যেন৷ টলমল পায়ে কোনোরকমে দাঁড়িয়েই যখন সামনে তাকাল আশফির দিকে, মুহূর্তেই বুকটা কেঁপে উঠল ওর৷ ক্ষত-বিক্ষত, আহত শরীরটা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আপন পুরুষটাকে চিনতে কষ্ট না হলেও ভয় জাগছে ভেতরে৷
সৌম্য মানুষটার হলদে ফরসা মুখটা রোদে পুড়ে তামাটে হলেও হালকা লম্বাটে ওই মুখে সৌন্দর্যের কখনো ঘাটতি পড়েনি৷ কিন্তু এই মুহূর্তে সেই মুখটা আর চেনার উপায় নেই। দীর্ঘ উচ্চতার মেদবিহীন ছিপছিপে শরীরে জ্যাকেটটা ছিঁড়ে কেটে একাকার। প্রশস্ত কপালে এবং দু গালে ছড়ে যাওয়ার চিহ্ন, কালচে রক্তে মাখামাখি। তার মাঝে মৃত মাছের মতো শীতল চাউনির চোখদুটোতেও যেন কেউ রক্ত ঢেলে দিয়েছে৷ যেন এক অশুভ প্রতিমূর্তি সামনে দাঁড়িয়ে।
আশফির সেই রক্তাভ চোখের অস্বাভাবিক শীতল চাউনি স্থির হয়ে রইল মারিশার ওপর। তাকিয়ে থাকতে থাকতেই তার সুতীক্ষ্ণ চোয়াল দুটো আরও শক্ত হয়ে উঠল। মুহূর্তেই মারিশার মনে হলো, আশফির মাঝে এখন দানবীয় শক্তির চেয়েও ভয়ঙ্কর এক খুনচাপা রাগ ভর করেছে।
তারপর হঠাৎই সে টলতে টলতে ওর দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করলে ভেতরে ভেতরে বেশ শিউরে উঠল মারিশা। আজ নিজের হঠকারিতার কারণেই দুজন মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরেছে। আর সে জানে, আশফি এমন ছেলে নয় যে এই চরম ভুলকে বিনা শাস্তিতে ছেড়ে দেবে। বুকটা ওর দুরুদুরু করতে লাগল, যদি হুট করেই ওর গালে দুটো থাপ্পড় বসিয়ে দেয়? দিশানের কাছে সে শুনেছিল, মানুষটা এমনিতে ধৈর্যশীল আর ঠান্ডা মাথার হলেও রাগ সীমা ছাড়ালে সে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে।
না, এই শাসন সে কোনোভাবেই মেনে নেবে না। শাসন করার মতো কোনো অধিকার বা সম্পর্ক তো আশফি নিজেই রাখেনি। তাছাড়া ডেনিজ আর তার পরিবার ছাড়া আর কেউ কোনোদিন ওর গায়ে হাত তোলার কথা ভাবেওনি। সেখানে মাত্র চার মাসের স্বামীর হাতের চড় খাবে সে? অসম্ভব!
কাঁপতে থাকা হাতটা তুলে আঙুুল উঁচিয়ে সে সাবধান করে বসল, নিস্তেজ স্বরে, “অ্যাই, দেখো! খবরদার, একদম মারবে না কিন্তু৷ আমি তোমাকে ডাকিনি … আমাকে বাঁচাতে বলিনি। গায়ে হাত তুলবে না বলে দিচ্ছি। আমাদের মধ্যে এমন কোনো সম্পর্কই নেই, ঠিক না?”
সাহস সঞ্চয় করে কথাগুলো বললেও মারিশার অন্তরের গভীরে আশফির প্রতি এক স্পষ্ট ভীতিটা জমাট বেঁধেই ছিল। আশফি যখন ওর একদম খুব কাছে চলে এল, তখন মারিশার নিঃশ্বাস যেন থমকে যাওয়ার জোগাড়। কিন্তু তার কথা শেষ হওয়ার সুযোগ না দিয়েই আশফি হঠাৎ ক্ষীণ স্বরে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল, “আমাকে ধরো।”
কথাটা শেষ হতে না হতেই সে ভারসাম্য হারিয়ে আছড়ে পড়ল মারিশার ওপর। নিজেও আহত, তবুও সেই অতর্কিত ভার সামলাতে মারিশা দ্রুত ওকে জড়িয়ে ধরল। আশফি তখন ওর পিঠটা প্রচণ্ড শক্ত করে আঁকড়ে ধরল, মাথাটা এলিয়ে দিল ওর অক্ষত কাঁধের ওপর। মুহূর্তেই রাগী মানুষটা যেন এক অসহায় আশ্রয়ে পরিণত হলো।
ক্ষণিকের জন্য মারিশা হকচকিয়ে গেলেও পরক্ষণেই ওর চেতনায় ধরা দিল অন্য এক অনুভূতি। এই নিবিড় আলিঙ্গনের গভীর অর্থ ছিল, প্রিয় কাউকে চিরতরে হারিয়ে বসতে গিয়েও ফিরে পাওয়ার এক তীব্র, অবাধ্য স্বস্তি। দুজনের বুক একে অপরের সাথে মিশে থাকায় মারিশা স্পষ্ট অনুভব করতে পারল, আশফির হৃদপিণ্ড তখনো ঝড়ের বেগে কাঁপছে। সেই কম্পন যেন নীরবেই বলে দিচ্ছিল, ভেতরটা তার কতটা দুমড়েমুচড়ে গিয়েছিল ওকে ফিরে পাবে না ভেবে।
তারপর হঠাৎ মারিশার কাঁধের সামান্য উন্মুক্ত ত্বকে প্রবল আবেগ আর গভীর মমতায় নিজের শীতল ঠোঁটজোড়া চেপে ধরল আশফি। কয়েক সেকেন্ড সেই স্পর্শ স্থির হয়ে রইল। বাবা আর ভাইয়ের অতি আদরে বেড়ে ওঠা মেয়েটা তার নিষ্ঠুর স্বামীর এই সামান্যতম স্নেহের ছোঁয়ায় যেন মুহূর্তেই আরও বেশি আহ্লাদী হয়ে উঠল৷ চোখ ভিজে উঠলেও ঠোঁট টিপে ধরে রইল সে, যেন কোনোভাবেই কেঁদে না ফেলে। গতরাতের প্রতিটি অপমান, অবজ্ঞা, সেই বিষাক্ত মিথ্যা অপবাদ আর দিলিশার সান্নিধ্যে আশফির রাত কাটানো — কিছুই সে ভোলেনি। তাই একবিন্দুও কমল না তার পুঞ্জীভূত রাগ আর অভিমান।
এর মাঝেই আশফি আবার মাথা এলিয়ে দিল ওর কাঁধে। বোজা চোখে অস্ফুট স্বরে ঝরল রাশভারী সব অভিযোগ, অনুযোগ, “কবে বড়ো হবে তুমি? আর কত জ্বালাবে আমাকে? ওসমান বারিশ সুলতান একদম মানুষ করতে পারেনি তোমাকে! একটুও না৷ আই হেইট দ্যাট গাই … জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমি তাকে ঘৃণা করে যাব।”
জেদি, অভিমানী মনে কথাগুলো বিষের মতো বিঁধল মারিশার গায়ে, অপমানে যেন তার ভেতরটা জ্বলে উঠল। জড়িয়ে ধরে রেখেই ঝগড়াটে সুরে কড়া জবাব দিল সে, “আমার বাবা যদি আমাকে মানুষ না করতে পারে, তাহলে তোমার দাদাও তোমার বাবাকে মানুষ করতে পারেনি। তোমার দাদা নিজেও মানুষ হয়নি। তোমার পুরো খানদানই শয়তানের ঘরের শয়তান। আর তুমি … তুমি হলো ইন্টারন্যাশনাল শয়তান!”
বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ২৩
কিন্তু জবাবটা কানে পৌঁছানোর আগেই আশফি হঠাৎ শরীরের সমস্ত ভার ছেড়ে দিল ওর ওপর। এই শরীরটা প্রথম দেখায় পাতলা মনে হলেও কাছে এলে বোঝা যায়, মোটেও হালকা নয় মানুষটা। আবার বলিষ্ঠও নয়। তবে প্রতিনিয়ত কঠিন পাহাড়ে ওঠানামা আর দীর্ঘদিন কঠোর পথে চলাচলে গড়ে ওঠা এক শক্তিশালী দেহ এটা।
নিজের আহত শরীরে এই আকস্মিক ওজনটা আর সামলাতে পারল না মারিশা। আশফিকে নিয়েই সে ধপাস করে আছড়ে পড়ল কাদা আর পচা পাতার পুরু স্তরের ওপর। এই অতুলনীয় দৃঢ় সত্তার মানুষটা কি মাত্রাতিরিক্ত মানসিক চাপে জ্ঞান হারাল, নাকি আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে, তা আর বুঝতে পারল না মারিশা। নিথর, নিশ্চল আশফি তখন ওর বুকের ওপর এক পাহাড় সমান স্তব্ধতা নিয়ে পড়ে রইল।
