Home বুনো মেঘের হাতছানি বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ২৩

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ২৩

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ২৩
ইসরাত জাহান দ্যুতি

গাইডদের মুখে মারিশা শুনেছিল, জঙ্গলের ভেতর দিয়ে একটা পুরনো চোরাপথ সরাসরি সিডিং গ্রামে গিয়ে মিশেছে। সিডিং থেকে খুব ভোরেই ফোর-হুইল ড্রাইভ জিপগুলো পোখরা শহরের দিকে রওনা দেয়। ও তখন হিসেব করেছিল, যদি সে কোনোমতে জঙ্গলটা পার হয়ে সিডিং পৌঁছাতে পারে, তবে সকালের প্রথম জিপটা ধরেই সে পোখরা এয়ারপোর্টে চলে যেতে পারবে। আশফি যখন ঘুম থেকে উঠে তাকে খুঁজবে, ততক্ষণে সে হিমালয়ের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে।

ভোর তখন ৫টা বেজে ৪৫ মিনিট।
বনের প্রথম সারির রডোডেনড্রন গাছগুলো পার হওয়ার সময় অরণ্য যেন ওকে গিলে ফেলার জন্য মুখিয়ে ছিল। এখানকার গাছগুলো সমতলের মতো সতেজ নয়। প্রতিটি ওক আর রডোডেনড্রন গাছ কয়েকশ বছরের পুরনো। তাদের ডালপালাগুলো অদ্ভুতভাবে বেঁকে চুরে আছে, আর সারা শরীরে লেপ্টে আছে ধূসর রঙের এক ধরনের ঝুলন্ত শ্যাওলা, যাকে স্থানীয়রা বলে ওল্ড ম্যানস বিয়ার্ড। কুয়াশায় ভেজা সেই শ্যাওলাগুলো গাছের ডাল থেকে ভূতের হাতের মতো ঝুলে থেকে মারিশার চুলে আর মুখে জাপটে ধরছিল।
​পায়ের নিচের জমিটা ছিল চরম বিভ্রান্তিকর। কয়েক ইঞ্চি পুরু পচে যাওয়া ওক পাতার আস্তরণ। যেটা হাজার বছর ধরে জমে জমে এক ধরনের স্পঞ্জের মতো নরম স্তূপ তৈরি করেছে। পা ফেললেই সেই স্তরটা ডেবে যাচ্ছিল, আর নিচ থেকে উঠে আসছিল এক ভ্যাপসা, অম্লীয় গন্ধ। সেই পচা পাতার স্তূপের নিচেই লুকিয়ে ছিল ধারালো কোয়ার্টজ পাথরের লুকানো খাঁজ।
​হঠাৎ করেই পাহাড়ের এই অংশটা ভীষণ খাড়া হয়ে এল। মারিশা একটা বড়ো ফার্ন ঝোপ সরিয়ে এগোতে চাইল, কিন্তু পায়ের নিচের ভেজা শ্যাওলা ওকে বিন্দুমাত্র ছাড় দিল না। একটা পাথরের খাঁজে পা হড়কাতেই ও ভারসাম্য হারিয়ে নিচের দিকে গড়িয়ে পড়ল কয়েক ফুট।

​“আহ্…!” চিৎকার করে উঠল মারিশা। একটা তীক্ষ্ণ যন্ত্রণায় ওর শরীর কুঁকড়ে গেল। ওর বাম পা-টা একটা ধারালো পাথরের চিবুকে আটকে গিয়ে গভীর এক ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। পাহাড়ের সেই রুক্ষ পাথরটা ওর চামড়া চিরে মাংসের ভেতর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। মুহূর্তের মধ্যে উষ্ণ রক্তের একটা ধারা ওর বুটের ওপর দিয়ে গড়িয়ে নিচের শুকনো পাতায় গিয়ে মিশল। কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে ওই অসহ্য যন্ত্রণাটা সহ্য করার চেষ্টা করল। মনে হচ্ছিল চারপাশটা যেন ঘুরছে ওর। হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে কব্জিতে বাঁধা অর্ধ ছেঁড়া নীল স্কার্ফটা খুলে নিল। বনে প্রবেশের আগ মুহূর্তে আরও একবার চোট পেয়েছিল এই একই জায়গাতেই। রক্ত থামাতে তখনো ব্যবহার করেছিল এটাই।
হাত কাঁপছিল ওর। স্কার্ফটা দিয়ে দ্বিতীয়বার আঘাত পাওয়া ক্ষতস্থানটা চেপে ধরতেই নীল কাপড়টা দ্রুত গাঢ় লাল রং ধারণ করল। রক্ত থামাতে গিয়ে শক্ত করে গিট দিল সেখানে৷ কিন্তু যন্ত্রণার চোটে ওর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমল এই হাড়কাঁপানো ঠান্ডাতেও। তাজা রক্তের গন্ধটা মুহূর্তেই বনের জমাট, বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল।

​পা টানতে টানতে আবার হাঁটতে শুরু করল ও। এখন আর সিডিং গ্রামে পৌঁছানো লক্ষ্য নয়, লক্ষ্য হলো এই অরণ্য থেকে বের হওয়া। কিন্তু অরণ্য তো তার নিজের নিয়মেই চলে। মারিশা একবার ভাবল ও পুব দিকে যাচ্ছে, কিন্তু পরক্ষণেই দেখল ও একটা বিশাল রডোডেনড্রন গাছের সামনে দাঁড়িয়ে। যেটা ও আধঘণ্টা আগেই পেরিয়ে এসেছিল।
​পাহাড়ের এই অংশে কুয়াশা এখন আরও ভয়ংকর। গাছের ডালপালাগুলো কঙ্কালের হাতের মতো কুয়াশার ভেতর থেকে বের হয়ে আছে। পথ চেনার কোনো উপায় নেই। চারদিকে শুধু রডোডেনড্রনের ঝোপ, যাদের কাষ্ঠল ডালগুলো এতই ঘন যে সেগুলোকে সরানো প্রায় অসম্ভব। ও যতবারই ভাবছিল নিচের দিকে নামছে, ততবারই দেখছিল কোনো এক অদৃশ্য চড়াই ওকে আবার ওপরের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। বারবার দিক পরিবর্তন করছিল, ঝোপঝাড় ছিঁড়ে এগোতে চাইছিল। কিন্তু ফলাফল একই। প্রতিবারই জঙ্গল যেন ওকে একই জায়গায় ফিরিয়ে আনছিল। তখন থেকেই ভয় আষ্টেপৃষ্টে ধরল ওকে।

বনের মধ্যে নিস্তব্ধতা এতটাই নিরেট যে, নিজের কান দিয়ে নিজের নিঃশ্বাসের শব্দও শোনা যায়। মাঝে মাঝে কোনো নাম না জানা পাহাড়ি পাখি আচমকা ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে যাচ্ছিল, আর সেই শব্দে ওর হৃৎপিণ্ডটা যেন গলার কাছে চলে আসছিল। এখানকার গাছগুলোতে কোনো ফুল নেই, শুধু শ্যাওলা আর ফার্নের আধিপত্য। কুয়াশা এখানে স্থির হয়ে থাকে না। বরং মেঘের বড়ো বড়ো খণ্ডগুলো বনের ভেতরে এমনভাবে ঢুকে পড়ছিল যে, চোখের সামনে থাকা গাছগুলোও যেন হঠাৎ উধাও হয়ে যাচ্ছিল। চারপাশটা এতটাই ঝাপসা হয়ে আসছি যে, এক হাত দূরে কী আছে তাও বোঝার উপায় ছিল না। মারিশা দিকভ্রান্ত হয়ে ঝোপঝাড় ছিঁড়ে যখন বাঁচার পথ খুঁজছিল, ঠিক তখনই ও এক গভীর গিরিখাদের কিনারায় এসে থমকে যায়। কুয়াশার কারণে খাদের গভীরতা বোঝার উপায় ছিল না। পিচ্ছিল মাটি আর ঝোপের ঘষা লেগে ওর ক্ষতবিক্ষত পায়ের সেই আলগা হয়ে যাওয়া স্কার্ফটির একটি অংশ পাথরের সুচালো কোণায় আটকে যায়। মারিশা টাল সামলাতে গিয়ে হ্যাঁচকা টান দিতেই স্কার্ফের সেই লালচে টুকরোটি ছিঁড়ে খাদের ধারের এক ফালি ডাল আর পাথরের খাঁজে ঝুলে পড়ে। ও বুঝতেও পারেনি যে ও ওর অস্তিত্বের একটা চিহ্ন সেখানে ফেলে এসেছে।

​সকাল প্রায় সাতটা।
মারিশার পা পুরোপুরি অবশ হয়ে এসেছে তখন। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দটা হঠাৎ থেমে গিয়ে সেখানে একটা ভারী আর্দ্রতা দানা বাঁধল। সামনের কুয়াশাটা একটু সরতেই ও থমকে গেল। সামনে কোনো গ্রাম নেই, নেই কোনো পথ।
শুধু সেই নিথর জলাশয় — কালচে পোখরিটা। ​​ও যেখান থেকে যাত্রা শুরু করেছিল, পাক খেয়ে আবার সেখানেই ফিরে এসেছে। জলাশয়টার পাড় ঘেঁষে বিশাল সব গাছের শেকড়গুলো অজগরের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে আছে। পানিটা এতই স্থবির যে সেখানে নিজের প্রতিফলন দেখলেও ভয় লাগে। ঠিক সেই মুহূর্তে ওর নাকে এল একটা গন্ধ‚ বুনো পশুর গায়ের এক তীব্র কটু গন্ধ।
​জলাশয়ের ঠিক ওপাড়ে রডোডেনড্রন বনের ঘুপচি অন্ধকার। ও দেখতে পেল সেই দানবীয় জন্তুটাকে। মুখে একটা শিকার৷ শিকারের জানটা দেহে তখনো ছিল। চাপা গোঙানি বের হচ্ছিল অসহায় প্রাণীরটার গলা থেকে।
অসহায় সে মুহূর্তে মারিশাও। ও বুঝতে পারল, এই জঙ্গল ওকে পথ দেখায়নি। বরং ওকে এক অবধারিত মরণফাঁদের দিকে ঠেলে দিয়েছে। পাথরের খাঁজে আটকে গিয়ে স্কার্ফের বাকি অংশটাও সেখানেই ছিঁড়ে পড়ে রইল, আর মারিশা হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে পাশের ঘন রডোডেনড্রন ঝোপটার ভেতর সেঁধিয়ে গেল।

সকাল তখন ৭টা বেজে ১৫ মিনিট।
পাহাড়ের চুড়ায় সূর্য উঁকি দিলেও বনের এই গভীর খাঁজে আলোর প্রবেশাধিকার নেই বললেই চলে। ঝোপঝাড় ছিঁড়ে উন্মত্তের মতো সেই শব্দের উৎসের দিকে যখন দৌড়াচ্ছিল আশফি, বনের গভীরতা তখন তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছিল। এই জঙ্গলটা যেন একটা শ্বাসরোধকারী গোলকধাঁধা। ডালপালার ঘষায় ওর গাল আর হাত ছড়ে যাচ্ছে, কিন্তু সেদিকে ওর বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। ওর মস্তিষ্কে তখন কেবল একটাই দৃশ্য ঘুরছে, রক্তমাখা সেই নীল স্কার্ফ।
​একটু এগোনোর পরই ঝোপের আড়ালে অরণ্যের দৃশ্যপট হঠাৎ বদলে গেল। আশফিও থমকে দাঁড়াল। সামনেই সেই কালচে জলাশয়। নিথর, কুচকুচে কালো জল। জলাশয়ের ঠিক ওপারে বনের এক অন্য জগত। সেখানে বড় বড় গাছগুলোর শেকড় সাপের মতো মাটির ওপর বিছিয়ে আছে। ওর নজর গেল জলাশয়ের ঢালু পাড়ে। সেখানে কাদা আর পচা পাতার ওপর দিয়ে দীর্ঘ এক গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে। যেন কোনো ভারী বস্তুকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ওপারে একটা বিশাল গুহার মতো রডোডেনড্রন ঝোপের আড়ালে। সেই ক্ষতের গায় ছোপ ছোপ টাটকা লাল রক্ত।
​আশফি পা টিপে টিপে জলাশয়ের কিনারা ধরে ওপারে যাওয়ার চেষ্টা করল। ঠিক তখনই সেই শব্দটা আবার এল। একটা হাড় হিম করা গোঙানি আর সাথে শুকনো হাড় ভাঙার মতো শব্দ, ‘মচমচ … ক্যাঁক’।
​ঝোপের আড়াল থেকে ধীরে ধীরে একটা প্রকাণ্ড ছায়া বেরিয়ে এল। সেই বিশাল হিমালয়ান ব্ল্যাক বিয়ার। জন্তুটা পেছনের দুপায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল। তার বুকে বিশেষ সাদা ভি চিহ্নটা ভোরের ম্লান আলোয় অশুভ এক চন্দ্রকলার মতো চকচক করছে। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ছিল তার মুখ আর থাবা, যেখানে লেপ্টে আছে টাটকা, গাঢ় লাল রক্ত।

​জন্তুটা তৃপ্তির সাথে কিছু একটা চিবোচ্ছিল। আশফি দেখল, ভালুকটার পায়ের কাছে পড়ে আছে একটি পাহাড়ি কস্তুরী মৃগের আধখাওয়া নিথর দেহ। অভাগা প্রাণীটার পেছনের অংশটা কামড়ে ছিঁড়ে ফেলেছে দানবটা। হাড়ের মজ্জা চিবানোর সেই বীভৎস শব্দে, না-কি মারিশার ক্ষতি হওয়ার ভয়ে কে জানে — আশফির পাকস্থলীটা গুলিয়ে উঠতে চাইল যেন। ভালুক সাধারণত সর্বভুক হলেও এত উচ্চতায় তীব্র শীতে যখন খাবারের অভাব পড়ে, তখন তারা অত্যন্ত আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে এবং ছোটো হরিণ বা গবাদি পশুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
​জন্তুটার মুখ থেকে লালা আর রক্তের মিশ্রণ ঝরে পড়ছে জলাশয়ের পাড়ে। হঠাৎ হরিণের দেহটা ছেড়ে দিয়ে সে থুতনি উঁচু করল। আকাশের দিকে নাক তুলে ছোট ছোট নিঃশ্বাসে বাতাস শুঁকতে লাগল সে। আশফি বুঝতে পারল, সুস্বাদু শিকার সামনে থাকা সত্ত্বেও সে অর্ধেক খেয়ে ফেলে রাখল মানে নিশ্চয়ই নতুন কোনো তাজা রক্তের ঘ্রাণ পেয়েছে। যখন কোনো শিকারি প্রাণী বারবার মাথা ঘুরিয়ে একই দিকে নাক তাক করে থাকে, তখন বুঝতে হবে সে নিশ্চিত কোনো নির্দিষ্ট গন্ধের উৎস খুঁজে পেয়েছে।
​একটা বড়ো ওক গাছের গুঁড়ির আড়ালে নিজেকে দ্রুত লুকিয়ে ফেলল ও। তারপরই ওর খেয়ালে এল আবার সেই রক্তমাখা নীল স্কার্ফটার কথা। মারিশা নিশ্চয়ই কোনোভাবে আঘাত পেয়ে রক্ত মোছার কাজে স্কার্ফটা ব্যবহার করেছিল। তবে ওর রক্তের ঘ্রাণই কি পেল দানবটা? তা ভাবতেই বুকের মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়ে গেল তার। আঙুলগুলো পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল যেন।

​ভালুকটার নাকের ছিদ্রগুলো দ্রুত কাঁপছে। সে একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে বাতাসটা নিজের ফুসফুসে ভরে নিল, আর পরক্ষণেই তার গলার ভেতর থেকে এক চাপা, কর্কশ গোঙানি বেরিয়ে এল। তারপরই তার ছোট কিন্তু তীক্ষ্ণ চোখ দুটো দিয়ে সামনের ওই গভীর রডোডেনড্রন ঝোপের দিকে স্থির হয়ে তাকাল। তাজা রক্তের ঘ্রাণটা ওদিক থেকেই আসছে। চার পায়ে নেমে এল সে। মাটিতে তার শরীরের ভারী ভার পড়ার সাথে সাথে একটা চাপা আওয়াজ হলো। আশফি ওক গাছের আড়াল থেকেই দেখতে লাগল, ওটা ধীরপায়ে ওই গভীর ঝোপের দিকে যাচ্ছে।
​“মাহি…! ওই ঝোপেরই কোথাও লুকিয়ে নেই তো মেয়েটা?” মনে মনেই ভাবতে লাগল আশফি। ও হিসেব করে দেখল ভোর পাঁচটার মধ্যে যদি বের হয় মারিশা, তবে এই দুর্গম পথে ওর পক্ষে এর চেয়ে বেশি দূর যাওয়া সম্ভব নয়। আর এই জলাশয়টাই হলো বনের এমন এক বিন্দু যেখান থেকে সব বুনো পথ গোল হয়ে ফিরে আসে। এমনও তো হতে পারে, পাগলটা হয়তো পথ হারিয়ে এখানেই ঘুরপাক খাচ্ছিল! আর স্কার্ফের এই ছেঁড়া টুকরোগুলো যতটা বলছে, ততটাই তার ইন্দ্রীয় সত্তাও বলছে, ও আশেপাশেই খুব কাছাকাছি কোথাও আছে হয়তো।
​কিন্তু এখন যদি সামান্য একটা শব্দও করে আশফি, তবে ওই হরিণটার মতো পরিণতি হতে তারও বেশি সময় লাগবে না। তার ভাবনাচিন্তার মাঝেই ঝোপের ভেতর থেকে আচমকা একটা শুকনো ডাল ভাঙার টাস করে শব্দ হলো। যেন কেউ একজন ভারসাম্য রাখতে না পেরে নড়ে উঠেছে। ভালুকটা সাথে সাথে একটা হিংস্র গোঙানি দিয়ে ঝোপের দিকে দুই পা এগিয়ে গেল।

​মারিশার কথা ভেবেই আশফির হৃৎপিণ্ড তখন পাঁজরের হাড় ফাটিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইল যেন। ওকে বাঁচানোর নেশায় সে আর নিজের মধ্যে নেই। ওক গাছের আড়াল থেকে বেরোনোর সময় কোনো চিৎকার করল না। পাহাড়ে অযথা চিৎকার মানে শক্তি অপচয়। সে খুব ধীর পায়ে, নিঃশব্দে জলাশয়ের কিনারা ধরে ওপাশে গেল। ওর হাতে ধরা ট্রেকিং পোল আর দা। এ দুটোই ওর অস্তিত্ব রক্ষার হাতিয়ার।
​ভালুকটা যখন ঝোপের একদম মুখে, ঠিক তখনই পকেটে থাকা ডিওডোরেন্টের ক্যানটার কথা মনে পড়ল ওর৷ ওটা বের করল দ্রুত। গত রাতে লজে বসে এটা দিয়ে সে নিজের বুট পরিষ্কার করেছিল, কে জানত এটাও এখন ওর ঢাল হবে!

​“এই…!” গলাটা চিরে একটা চাপা কর্কশ স্বর বের হলো আশফির।
ভালুকটা থমকে গেল। মড়মড় করে ঝোপ ভেঙে সে যখন ঘুরে দাঁড়াল, আশফি দেখতে পেল জন্তুটার ছোটো ছোটো চোখে এক আদিম হিংস্রতা। ওটা আর পাঁচটা সাধারণ ভালুকের মতো নয়, এ যেন এই বনেরই এক অভিশপ্ত আত্মা। চার পায়ে ভর দিয়ে কয়েক কদম এগোতেই আশফি তার লাইটারটা জ্বালিয়ে স্প্রের নজল চেপে ধরল। ‘হুঁশশশ’ আওয়াজে আগুনের একটা নীলচে হলকা অন্ধকারের বুক চিরে ভালুকটার ঠিক কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। ঝোপের আড়াল থেকে তখন বাঘের মতো ক্ষিপ্রতায় বেরিয়ে এল সে। আশফি তখন চিৎকার করে ডাকল মারিশাকে, “মাহি…? তুমি… তুমি কি ওখানে আছ?”
কিন্তু ঝোপের ভেতর থেকে কোনো উত্তর এল না, কেবল সঙ্গে সঙ্গে একটা চাপা কান্নার দমকানোর শব্দ শোনা গেল। তাতেই নিশ্চিত হলো আশফি, তার অন্তরিন্দ্রিয়র অনুভব ভুল ছিল না৷ আরও একবার চিৎকার করে বলল ওকে, “যা-ই হয়ে যাক, একচুল এগোবে না।”

ভালুকটা ততক্ষণে ছুটে এসেছে। আশফি তার বাম হাতে ধরা ট্রেকিং পোল দিয়ে জন্তুটার মুখে সজোরে এক খোঁচা মারল। পোলটার তীক্ষ্ণ মাথাটা নাকের নরম মাংসে বিঁধতেই এক বীভৎস আর্তনাদ করে উঠল জন্তুটা। এবার সে তার বিশাল থাবা উঁচিয়ে আশফিকে পিষে ফেলতে চাইল। আশফি পিছু হটল না, বরং শরীরটা নিচু করে একপাশে সরে গিয়ে ডান হাতে ধরা সেই ভারী পাহাড়ি দা-টা চালিয়ে দিল ভালুকটার পেছনের পায়ে। ধাতব ব্লেডটা মাংস চিরে হাড় পর্যন্ত পৌঁছাতেই তপ্ত রক্ত ছিটকে এল আশফির মুখে।
​জন্তুটা যন্ত্রণায় পাগল হয়ে এবার মরণকামড় দিতে চাইল। পেছনের দুপায়ে খাড়া হয়ে উঠেই প্রকাণ্ড শরীরটা নিয়ে সে ঝাঁপিয়ে পড়ল আশফির ওপর। প্রচণ্ড থাবায় জ্যাকেটের পলিয়েস্টার ফালি ফালি হয়ে ছিঁড়ে গেছে, আর তপ্ত লোহার মতো নখগুলো কাঁধের চামড়া ভেদ করে ওর মাংস উপড়ে নিয়েছে৷ ছিটকে গিয়ে জলাশয়ের পাথুরে পাড়ে আছড়ে পড়ল আশফি। ডান হাতের দা-টা পাথরে লেগে ছিটকে পড়ল দূরে। ​কিন্তু কোনো চিৎকার করল না ও। মুখ দিয়ে শুধু একটা গোঙানি বের হলো। ব্যথায় তার সারা শরীর অবশ হয়ে আসতে লাগল।
ওই গোঙানির শব্দেই ঝোপের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল মারিশা। ওর চুলে কাদা আর পচা পাতা মাখামাখি, মুখ ফ্যাকাশে, চোখের দৃষ্টি স্তিমিত, প্রচুর রক্তক্ষরণে শরীরটা টলমল করছিল। কিন্তু আশফিকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে ওর ভেতরের সেই দিশাহারা মেয়েটা যেন মুহূর্তে বদলে গেল। এতক্ষণ কুঁকড়ে ছিল মৃত্যুর ভয়ে, কিন্তু রক্তাক্ত আশফিকে মৃত্যুর মুখে দেখে ভেতরে এক ভয়ংকর বারুদ জ্বেলে উঠল যেন৷

​“আশফি…”, ওর চিৎকারে বনটা কেঁপে উঠল।
“দৌড়াও, মাহি…”, ফুরিয়ে আসা শক্তি নিয়ে জবাব দিল আশফি তখুনি।
পাগলের মতো বিলাপ সুরে মারিশা বারবার বলতে লাগল, “না… না, আমি কোথাও যাব না! কোথাও যাব না তোমাকে ছেড়ে!”
কিন্তু ততক্ষণে ভয়ানক ক্ষিপ্ততায় ভালুকটা আবার আশফির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইল। আশফির বাঁ হাতে ধরা ছিল তার অ্যালুমিনিয়ামের ট্রেকিং পোলটা। দাঁতে দাঁত চিপে সেটা আড়াআড়িভাবে ধরে জন্তুটার চোয়ালের নিচে ঠেকাল। দানবটার কয়েকশ কেজি ওজন ঠেকাতে গিয়ে কাঁধের আঘাত নিয়ে যন্ত্রণায় তার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। বাঁ হাতটা অবশ হয়ে গেল, ডান হাতের কব্জি থরথর করে কাঁপছিল। সে বুঝতে পারল, হয়তো আর কয়েক সেকেন্ডই বড়জোর টিকে থাকবে। চোখের সামনে জগতটা ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল তার, কাঁধ থেকে গলগল করে রক্ত ঝরতে লাগল।
কিন্তু জেদি মারিশাকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টায় সে ডেকে উঠল ওকে আদর গলায়, “মাহি… আমার গুরাস!”
কিন্তু গলাটা শোনাল তার কান্না ভেজার মতো। বিড়বিড় করে অস্ফুটে বলল ওকে, যেন অনুরোধ করতে লাগল,

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ২২

“পালাও… সোনা, পালাও প্লিজ!”
মারিশা কাঁদতেও ভুলে গেল তখন। হিতাহিত জ্ঞান লোপ পেল ওর৷ পাগলের মতো ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে ও দৌড়ে এল আশফির দিকে। জলাশয়ের পাড়ে পেল আশফির সেই দা-টা। এক মুহূর্ত ব্যয় না করে ওটা কুড়িয়ে নিল। তারপর দেখল ভালুকটা এবার আশফির টুঁটি চেপে ধরার জন্য মুখ নামিয়েছে।
এই দৃশ্যটাই যেন ওর মধ্যে ক’মাস পূর্বের সেই খুনি দ্বৈত সত্তাটা জাগিয়ে তুলল।

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ২৪