বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ২২
ইসরাত জাহান দ্যুতি
ভোর তখন সাড়ে চারটে। আকাশ তখনো ঘন নীল মখমলের মতো। তারাগুলো নিভে আসছে। মারিশার নিজের ছোটো তাঁবুটা ছিল আশফিদের থেকে কিছুটা দূরে, একটা বড়ো পাথরের আড়ালে। গায়ে জ্বর নিয়ে ও যখন তাঁবুর চেইনটা সন্তর্পণে টেনে বের হলো, ওর শরীরটা তখন প্রচণ্ড ঠান্ডায় জমে আসছিল। কিন্তু তার চেয়েও বেশি শীতল ছিল ওর মনটা। অন্ধকারে হাতড়ে নিজের ব্যাকপ্যাকটা গুছিয়ে নেওয়ার পর তাঁবুর খুঁটিগুলো খোলার সময় ধাতব শব্দ যাতে বেশি না হয়, সেজন্য খুব সন্তর্পণে কাজ করছিল ও। তাঁবুটা গুছিয়ে ছোটো করে ব্যাগের সাথে বেঁধে যখন সে উঠে দাঁড়াল, তখন আকাশটা মাত্র নীল হতে শুরু করেছে। হৃদয়টা একেবারে ছিন্নভিন্ন হওয়া দহন আর নীরব অভিমান নিয়ে কেবল একবারের জন্য ফিরে দেখেছিল দিলিশার তাঁবুটাকে। যেখানে সে আশফিকে কল্পনা করছিল তখনো৷ জানা ছিল না ওর, আরও অনেক আগেই ওই তাঁবু ত্যাগ করেছে আশফি। কিন্তু রাতের অপমান, অবিশ্বাস আর দিলিশার কাছে আশফিকে কল্পনা করে ওর মনে হচ্ছিল, এই পৃথিবী থেকেই একেবারে চলে যেতে পারলে বেঁচে যেত সে৷
ক্যাম্পের শেষ সীমানায় এসে ও যখন থামল, তখন ওর ফুসফুসটা হাড়কাঁপানো ঠান্ডা বাতাসে ভরে উঠেছে। সামনে তাকাতেই কেমন ভয় লাগল ওর। হাই ক্যাম্প থেকে লো ক্যাম্পের দিকে যাওয়ার প্রধান ট্রেইলটা চোখের সামনে ভয়ংকর খাড়াভাবে নিচের দিকে নেমে গেছে। ওপর থেকে নিচের দিকে তাকালে বুকটা কেঁপে ওঠে। প্রতিটি পাথরের খাঁজ সেখানে একেকটা ধারালো দাঁতের মতো বের হয়ে আছে। এই ধসে যাওয়া খাড়া ট্রেইল দিয়ে নামা মানেই হলো হাঁটুর ওপর অমানুষিক চাপ আর প্রতি পদে আছাড় খাওয়ার ঝুঁকি। তার ওপর এই খোলা পথে নামলে ওপর থেকে আশফিরা অনায়াসেই ওকে দেখে ফেলবে।
বিষণ্ণ চোখে সেই রুক্ষ পথের দিকে চেয়ে রইল মারিশা। ওর ক্লান্ত শরীর আর বিক্ষুব্ধ মন এই কঠিন লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত ছিল না। ঠিক তখনই ওর নজর গেল ডান দিকে, যেখানে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে একটি সরু পথ সোজা ঘন অরণ্যের ভেতরে ঢুকে গেছে। ওপর থেকে জঙ্গলটাকে মনে হচ্ছিল দুধে-ভেজা কুয়াশার এক শান্ত সমুদ্র।
সেদিকে দেখতে দেখতে মারিশার অনভিজ্ঞ চোখে মনে হলো, মূল রাস্তার সমান্তরালে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যাওয়া এই ছায়াশীতল পথটা নিশ্চয়ই কোনো শর্টকাট, যা হয়তো একটু নিচেই আবার মূল ট্রেইলের সাথে মিশেছে। সে ভাবল, একটু আড়ালে আড়ালে বনের ভেতর দিয়ে নামলে সে দ্রুত এবং সবার অলক্ষ্যে নিচে পৌঁছে যাবে।
অথচ অতীতে এ অভিজ্ঞতা ওর ছিল, এ এক পাহাড়ের অদ্ভুত ছলনা৷ ওপর থেকে যা কোমল দেখায়, তার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে বিষাক্ত মরণফাঁদ। কিন্তু আজ এই সত্যের অস্তিত্ব ওর উদাসী মন–মস্তিষ্কের কোথাও নেই। দেহটা জাগতিক জগতে দাঁড়িয়ে রইলেও অন্তরটা যেন মৃত বলে ঘোষিত হয়ে চলে গেছে অপার্থিব কোথাও।
কেমন এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা আর একেবারে আশফির নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার অদম্য জেদের বশবর্তী হয়েই বুট পরা পাদুটো সে ঘুরিয়ে নিল। লো ক্যাম্পের প্রধান ট্রেইলকে অবজ্ঞা করে সে ঢুকে পড়ল সেই শ্যাওলাধরা ঘন ছায়ার ভেতর। কুয়াশার পাতলা চাদরগুলো যখন ওকে জাপটে ধরছিল, ও তখন এক অলীক স্বস্তিতে বনের গভীরে বিলীন হয়ে গেল। ও জানত, এই পরিবেশে একা বেরিয়ে যাওয়ার পাগলামিটা সে দ্বিতীয়বারের মতো করছে। কিন্তু চিরতরে চলে যাওয়ার অভিমানটা যে তখন যুক্তির চেয়েও শক্তিশালী।
তবে মারিশা এটা জানত না, সে আসলে নিজের অজান্তেই চেনা পথ থেকে যোজন যোজন দূরের এক অন্ধকার গোলকধাঁধার মুখে নিজেকে সঁপে দিয়েছে।
সকাল ৬টা ১৫ মিনিট।
মারিশার তাঁবু যেখানে থাকার কথা, সেখানে কেবল পড়ে আছে কয়েকটা আলগা হয়ে যাওয়া পাথরের খাঁজ। কেমন এক বিমূঢ় বেশে তাকিয়ে আছে আশফি ওই খালি জায়গাটার দিকে। তন্দ্রাভাবটা ছুটে গেলেও শরীরের রক্ত যেন জমে হিম হয়ে গেছে ওর।
দিব্য, হৃদয়, পরাগ, সবার চোখে-মুখেও গভীর চিন্তা আর উদ্বেগ। কেবল দিলিশা গুটিসুটি মেরে বসে আছে নিজের তাঁবুর মুখে। কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না তার মাঝে৷ তবে মনে মনে ঠিক করল, এ মুহূর্তে মারিশাকে নিয়ে কোনো বাঁকাচোরা কটূ মন্তব্য করা যাবে না৷ বরং আশফির মানসিক পরিস্থিতি বুঝে ওকে সঙ্গ দিতে হবে। জ্বরটা ছেড়ে গেলেও দুর্বল পায়ে কাঁপতে কাঁপতে এসে দাঁড়াল সে আশফির পাশে৷
এর মাঝেই পরাগ বলে উঠল, “আমার মনে হচ্ছে, ও কোনো লজে গিয়ে উঠেছে। এত ভোরে নিশ্চয়ই লো ক্যাম্পে রওনা করবে না৷ আমাদের আগে লজগুলোতে গিয়ে খোঁজ নিতে হবে।”
ঠিক তারপরই দিলিশাও একমত জানিয়ে আশফিকে বলল, “আমারও তাই মনে হয়, আশফি। দেরি না করে আমরা জলদি লজগুলোতে যাই, চলো।”
দিব্য আর সৌভিক তখন জবাবের আশায় তাকাল আশফির দিকে। কিন্তু ওর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তখনো মাটির দিকে নিবদ্ধ। হাই ক্যাম্পের এই রুক্ষ পাথুরে জমিতে ঘাসের দেখা মেলা ভার, কিন্তু ভোরের হিমের কারণে মাটির উপরিভাগ কিছুটা নরম হয়ে আছে। আশফি লক্ষ করল, মারিশার তাঁবুর জায়গাটা থেকে একটা অস্পষ্ট রেখা ডানদিকের সেই বুনো ঢালের দিকে চলে গেছে।
“লজে যায়নি ও”, অত্যন্ত নিচু কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলে উঠল ও, “লজের পথ সোজা। আর এই দাগগুলো বলছে, কেউ একজন ভারী কিছু টেনে নিয়ে গেছে অথবা খুব দ্রুতপায়ে এই শ্যাওলা ধরা ঢাল দিয়ে নেমেছে।”
কথাটা বলেই সে চঞ্চল পায়ে এগোতে শুরু করল। বাকিরা ওর পিছু নিল। হাই ক্যাম্পের সেই মায়াবী সকালটা এখন ওদের কাছে এক বিভীষিকা হয়ে ধরা দিচ্ছে।
৬টা ৪০ মিনিট।
সূর্যের আলো এখন পাহাড়ের গায়ে আছড়ে পড়ছে ঠিকই, কিন্তু উপত্যকার নিচ থেকে উঠে আসা ঘন কুয়াশা জঙ্গলটাকে গ্রাস করে নিতে চাইছে। আধঘণ্টা খাড়া ঢাল আর শ্যাওলা ধরা পাথরের ওপর দিয়ে নামার পর ওরা যেখানে পৌঁছাল, সেখানে রডোডেনড্রন জঙ্গলটা যেন দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কুয়াশার চাদর এতই নিরেট যে, দশ হাত দূরের মানুষটাকেও ঝাপসা দেখাচ্ছে। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দটা এখানে এসে এক গুমোট নিস্তব্ধতায় রূপ নিয়েছে, যেখানে নিজেদের নিশ্বাসের শব্দও কানে তালা লাগিয়ে দেয়।
পাহাড়ের এই উচ্চতায় কেউ হারিয়ে গেলে প্রাথমিক ধাপ হলো ফুটপ্রিন্ট ট্র্যাকিং। সেটাই করছিল আশফি। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ সে থমকে দাঁড়াল। একটা বড়ো পাথরের আড়ালে মাটিটা অস্বাভাবিকভাবে দেবে আছে। সেখানে ঘাসগুলো দুমড়ে-মুচড়ে একাকার। নিচু হয়ে বসে পড়ল ওখানটাতে৷ তা দেখে সবাই এগিয়ে এল।
“কী হয়েছে, আশফি?” কণ্ঠে মেকি আতঙ্ক ফুটিয়ে জিজ্ঞেস করল দিলিশা।
কোনো উত্তর দিল না আশফি। পাথরের খাঁজে একটা উজ্জ্বল নীল রঙের কাপড় পড়ে থাকতে দেখল ও। একটা স্কার্ফ! দ্রুত সেটা কুড়িয়ে নিতেই ওর নাকে এসে লাগল অতি পরিচিত এক পারফিউমের ঘ্রাণ৷ গত পরশু রাতে এই ঘ্রাণটাই তো পেয়েছিল সে মারিশার কাছ থেকে। কিন্তু কাপড়ের তন্তুর ভেতরে জমাট বেঁধে আছে গাঢ় লাল রক্ত! রক্তটা এখনো পুরোপুরি শুকায়নি, ভোরের শিশিরে ভিজে এক বীভৎস রূপ নিয়েছে।
এরপরই চোখে পড়ল ওর, মাটির ওপর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে একটা বিশাল থাবার ছাপ। নখের গভীরতা বলে দিচ্ছে, প্রাণীটা কোনো সাধারণ চতুষ্পদ নয়। সেটা চিতার থাবার ছাপ মনে হলো আশফির। ছাপের ঠিক পাশেই রক্তের একটা দীর্ঘ রেখা ঘষটে যাওয়ার মতো করে বনের গভীরে নেমে গেছে। যেন কোনো এক অসম যুদ্ধের পর শিকারকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ওই অন্ধকার জলাশয়ের দিকে। বুকের রক্ত ছলকে উঠল ওর, স্কার্ফ ধরা আঙুলগুলোও যেন শিউরে উঠল মুহূর্তে।
“এই আশফি…”, অজানা বিপদের ভয়ে পরাগের কণ্ঠস্বর যেন বুজে আসতে চাইল, “ওটা… ওটা তো মনে হচ্ছে টাটকা রক্ত রে! আর থাবাটা কিসের? ওই হিমালয়ান ব্ল্যাক বিয়ারটা না-কি?”
আশফি নিশ্চুপ। স্থবিরের মতো দাঁড়িয়ে স্থির চেয়ে রইল পাথরটার দিকে। কিন্তু তার চোখের সামনে ভাসতে লাগল মারিশার শেষ আহত চাউনি, মারিশার শেষ অভিমান, মারিশার শেষ স্পর্শ, ওর শেষ হাসিটুকু, ওকে বুকে জড়িয়ে ধরার শেষ মুহূর্তটা!
আর… আর চিতার এই বিশাল থাবা, ধারালো নখ। সেটা কি কোনো মানুষ শিকার খুঁজে পেয়েছে? ওই জেদি, অভিমানী, পাগলী মেয়েটা? না… না, এক মুহূর্তের জন্যও তা ভাবতে চাইল না আশফি।
দিলিশার গলায় বেজে উঠল মেকি কান্নার সুর। কাঁপতে কাঁপতে সে বলে উঠল, “এটা মারিশার রক্ত নয় তো? ভালুকটা কি ওকে ছিঁড়ে খেল? আমরা কি ওকে আর পাবো না?”
কথাটা শেষ হতে না হতেই বিদ্যুৎ বেগে মাথা তুলল আশফি। ওর ভ্রুকুটি করা ক্রুদ্ধ চোখের চাউনি দেখে চমকে উঠল দিলিশা।
দিব্য আর সৌভিক ততক্ষণে মাটির দিকে ঝুঁকেছে। রক্তটা মানুষের না পশুর, সেটা পরখ করার ব্যর্থ চেষ্টা করছে দুজনে। এর মাঝেই আশফি হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। পকেট থেকে ফোনটা বের করে কল করল মারিশার নম্বরে৷ কিন্তু ওপাশ থেকে নম্বরটা ব্যস্ত বলতে লাগল৷ অবাক হলো না সে। যেন জানতই, জবাবে এটাই শুনবে সে। ছেঁড়া স্কার্ফটা হাতের মুঠোয় চেপে ধরে এবার সে কল করল সুদূর ইস্তাম্বুলে।
ভোর পৌনে তিনটার সময় শিথানের পাশে রাখা ফোনটা বাজতেই মিরানের ঘুমটা ছুটে গেল মুহূর্তেই। বরাবরই তার ঘুম বেশ হালকা। কিন্তু এই অসময়ের ফোনকলে সে মোটেও বিরক্ত হলো না, যখন দেখল কলদাতা আশফি৷ ঘণ্টা কয়েক আগে কথা হলেও এখন আবার কেন কল করল আশফি, তা নিয়ে সে নিজের মতোই ভেবে নিয়েছে, হয়তো আজ না ঘুমিয়ে মারিশার সঙ্গে বোঝাপড়াতে বসেছে ও।
“হ্যাঁ, বল”, ঘুম জড়ানো গলায় বলল মিরান, “রাতে কি ঘুমাসনি তুই?”
“মাহিকে কল কর এক্ষুনি”, কণ্ঠে উদ্বেগ ওর। আর তাতে লুকিয়ে আছে দুশ্চিন্তা… মারিশাকে হারিয়ে ফেলার ভীতি।
এক পল থেমেই মিরানকে বলল আবার, “কখন যেন চলে গেছে ও। কোথায় গেছে জানি না৷ নাম্বারটা বিজি বলছে।”
“কীহ্! কী বলছিস?” ঘুমটা উবে গেল মিরানের চকিতেই।
সে আরও বেশি প্রতিক্রিয়া জানানোর পূর্বেই আশফি বলে উঠল, “হাতে সময় কম, মিরান। আমাকে দ্রুত ইনফর্ম কর, ও কোথায়।”
মিরান সত্যিই কোনো চেঁচামেচি বা বাকবিতণ্ডায় গেল না৷ কলটা কেটে মারিশার নম্বরে কল করতে লাগল।
এদিকে দিব্য বলল আশফিকে, “দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই। লজ মালিকদের হেল্প নিয়ে দু-তিন ভাগে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ি।”
সৌভিকও একই কথায় বলল। আশফির দৃষ্টি আটকে তখন ওই ঘন অরণ্যের দিকে৷ মনটা ওর সেদিকেই ছুটছে বারবার।
পরাগ হঠাৎ হৃদয়কে বলল, “দিলিশা তো অসুস্থ। তাঁবু গুটিয়ে তুই ওকে নিয়ে একটা লজে চলে যা। আমরা চারজন বেরিয়ে পড়ি।”
দিলিশা মাথা নেড়ে অপরাধী স্বরে বলল, “না না, আমিও মারিশাকে খুঁজতে যাব। আমার জন্যই তো ও রাগ করে এভাবে চলে গেল। আমি কাল ওভাবে সিন ক্রিয়েট না করলে কি এত কিছু হত? সব দোষ আমার!”
দিলিশার কান্নাটা আর কারও কাছে মায়াকান্না লাগল কিনা কে জানে! কিন্তু না দিব্যর কাছে লাগল খুব৷ মেজাজটা ভীষণ চড়ে গেল ওর। গতরাতে অপমানটার বদলা সে এখন পর্যন্ত নিতে পারেনি। এখনো নেওয়ার সুযোগটা নেই। কিন্তু হঠাৎ ধমকে উঠল সে আশফিকে, “কী সমস্যা তোর? দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ধ্যান করছিস? সবাই কী বলছে শুনতে পাচ্ছিস না? সার্চ পার্টি বানিয়ে আমাদের এখনই বের হওয়া দরকার। কিন্তু কোনো আপদ নিয়ে বের হতে পারব না বলে দিলাম।”
“আপদ কে?” সঙ্গে সঙ্গে কথাটা ধরে ফেলল দিলিশা৷ খেপে গিয়ে বলল সে, “তুমি কি আমাকে আপদ বললে, দিব্য?”
এই দলটার মধ্যে সব থেকে অভিজ্ঞ, সব থেকে সাহসী আর সব থেকে নার্ভ শক্ত মানুষ আশফি আনজারই৷ অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় এই মানুষটা জীবনে বহু বিপদ মোকাবেলা করতে করতে নার্ভ ওর এতটাই ইস্পাত-দৃঢ় হয়েছে যে, কোনো কিছুর ভয়ই ওকে আর টলাতে পারে না। সবাইও তাই-ই জানে৷ তাই কেউ ভাবতেও পারছে না — আজ, এ মুহূর্তে এবং এ পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে কতটা দিশাহারা অনুভব করছে সে৷
দিব্য আর দিলিশার তর্কের মাঝেই ফোনটা বেজে উঠল আশফি। মিরানের কলটা দেখে জলদি রিসিভ করল সে। ওপাশ থেকে মুহূর্তেই ভেসে এল শঙ্কিত গলা, “রিং হচ্ছে৷ কিন্তু ধরল না তো।”
তারপরই কেমন রূঢ়ভাবে বলল মিরান, “তোদের মধ্যে কী হয়েছিল কাল? তুই ওকে কী বলেছিলি, আশফি?”
ফোনটা কানে চেপে রাখলেও একটা প্রশ্নেরও জবাব দিল না আশফি। কলটা কেটে দেওয়ার আগে শুধু বলল, “যদি ওকে জীবিত না পাই, ফাঁসিতে ঝোলাস আমাকে। আর যদি আমি অক্ষত ফেরত পাই…”
এক মুহূর্ত থামল আশফি। তারপর কেমন পাথুরে অভিব্যক্তিতে বলল, “তাহলে আজকের পর থেকে ওর ওপর আমি ছাড়া তোর আর তোর বাবার আর কোনো অধিকার থাকবে না।”
কথাটা বলেই কলটা কেটে দিয়ে সে অস্বাভাবিক শান্ত গলায় আদেশ করল পরাগকে, “তোরা ক্যাম্পে চলে যা৷ লজে গিয়ে থাক। আমার ব্যাগপ্যাকটা এনে দে শুধু।”
দিলিশা ছটফটিয়ে উঠল, “কিন্তু তুমি একা কেন যাবে? আমরাও…”
“যাও!” ক্ষণিকেই বনের নিস্তব্ধতা চিরে দিল আশফির বজ্রকণ্ঠ৷ কথাটা আর সম্পূর্ণ করল না দিলিশা। ভয়ে সিঁটিয়ে গেল সে।
কিন্তু একে একে পরাগরাও নারাজি জানাল৷ তবু আশফি নিজের সিদ্ধান্তে অনড়৷ ওই গহিন অরণ্যে একাই প্রবেশ করবে সে। মারিশা ছিল কেবল ওর একার দায়িত্ব৷ তার জন্য বাকিদের কোনো হয়রানির শিকার করতে চায় না আর৷
কিন্তু দিব্য তখন শুরু করল বকাঝকা। দিলিশার প্রতি রাগ আর ঘৃণা থেকে গালাগালের এক পর্যায়ে সে কটাক্ষের সুরে বলে বসল আশফিকে, “তুই তোর দিলিশাকে নিয়ে লজে গিয়ে রুমের দরজা আটকে বসে থাক বা শুয়ে থাক। মারিশার সঙ্গে তোর আর কোনো লেনাদেনা নেই। তুই আমাদের যেতে না বলার কে?”
আগুন ঝরা চোখে চাইল আশফি। আজ প্রথমবার সে দাপুটে স্বরে, পূর্ণ অধিকারে সাফ গলায় জানাল দিব্যকে, “ও আমার বউ! আমি ওর লিগ্যাল গার্ডিয়ান৷ ওর ওপর আমার থেকে বেশি জোর, বেশি দাবি এই দুনিয়ার আর কারও নেই। তুই নিজের সীমার মধ্যে থাক, দিব্য। আর আজ থেকে মাথায় ঢোকা, সম্পর্কে তুই ওর বড়ো ভাসুর।”
“তোরা ঝগড়া থামা তো”, ধমকে উঠল পরাগ।
তারপরই আশফিকে ঠান্ডা স্বরে বলল সে, “আমার কথা শোন, আশফি৷ একা একা খোঁজার থেকে আমরা সবাই মিলে খুঁজলে জলদি পাবো ওকে। ও তোর ওয়াইফ হলেও আমরা তোর বন্ধু হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব আছে তোর পাশে থাকার৷ তুই কেন এরকম একটা সিচুয়েশনে পর ভাবছিস আমাদের?”
একই কথা বোঝাল সৌভিক আর হৃদয়ও৷ শেষমেশ রাজি হলো আশফি ওদের সিদ্ধান্তে৷ কিছুক্ষণের মাঝেই হৃদয় দিলিশাকে নিয়ে রওনা হয়ে গেল পাহাড়ের উপরের ওই পাথরের লজটায়। আর ওরা বাকি চারজন হাতে ট্রেকিং পোল, ধারাল দা চেপে ধরে দুটো দল বানিয়ে এগিয়ে চলল জঙ্গলের দিকে।
সামনে ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা জঙ্গলটা। সূর্যের আলো সেখানে পৌঁছাতে পারছে না। রডোডেনড্রনের ডালগুলো এখানে এত নিচু যে ওদেরকে ঝুঁকে হাঁটতে হচ্ছে। পায়ের নিচের শুকনো পাতা আর পচে যাওয়া ডালপালার ওপর পা ফেলতেই একটা মচমচ শব্দ হচ্ছে, যা এই স্তব্ধতায় কামানের গোলার মতো শোনায়। আশফি ওর হাতের ট্রেকিং পোলটা দিয়ে বারবার সামনের ঝোপগুলো সরিয়ে দেখছে। রক্তের দাগগুলো এখন আর শুধু পাথরে নেই, বুনো ঘাসের ডগায় ডগায় লেগে আছে গাঢ় লাল ছিটে। হঠাৎ ওর চোখ পড়ল একটা খাড়া গিরিখাদের কিনারায়। সেখানে ওই স্কার্ফের আরেকটা টুকরো খাদে ঝুলে আছে।
বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ২০+২১
আশফির হৃৎপিণ্ডটা যেন একটা স্পন্দন মিস করল। সে দ্রুত খাদের কিনারায় গিয়ে উঁকি দিল। নিচে কেবল ধূসর কুয়াশার সাগর। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই বনের অন্যপ্রান্ত থেকে একটা চাপা গোঙানি ভেসে এল। মানুষের নয়, কোনো শ্বাপদের।
আশফি বিশ্বাস করল, মারিশা নিচে পড়েনি। কেউ তাকে ঘষটে নিয়ে গেছে বনের আরও গভীরে, যেখানে ওই কালচে জলাশয়টা অপেক্ষা করছে। সে কোনো দিকে না তাকিয়ে ঝোপঝাড় ছিঁড়ে পাগলের মতো সেই শব্দের দিকে দৌড়াতে শুরু করল।

এটা স্যাড এন্ডিং, তাই না?😢
#আমার_আলাদিন ১১ পর্ব দ্রুত দেওয়ার চেষ্টা করবেন