বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ২০+২১
ইসরাত জাহান দ্যুতি
“ওয়েল… এই যে, থেমে গেলাম”, হাতদুটোও আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে তুলে দাঁড়িয়ে পড়ল মারিশা।
“মাই গুডনেস”, বিদ্রূপ থেকে চোখে-মুখে কৃত্রিম ভীতি ফুটিয়ে বলল, “খুব ভয় পেয়েছি! একদম কিচ্ছু করব না, যাও! একটুও খামচি দেব না তোমার লাভকে। প্রমিজ! শুধু তুমি ওর মুখটাতে গাম ইউজ করো, অথবা হট গার্লসের জন্য নিজের টুয়েন্টি ফোর/সেভেন অ্যাভেইলাবল ঠোঁটদুটোকেই কাজে লাগাও৷ যেটাই করো, বাট…”
কথার এ পর্যায়ে এক পলের জন্য থামল সে। কণ্ঠে পূর্বের শীতলতা এনে তারপর হুমকি দিল, “ওর ওই মুখটাকে থামাও, ডার্লিং। নয়তো হাতে একটা পাথর নেব শুধু। বাকিটা ওর চিৎকারই বলে দেবে। বুঝতে পারছ নিশ্চয়ই?”
আশফির তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে শেষবারের মতো ঠান্ডা চাউনিজোড়া ছুড়ে আর দাঁড়াল না সে৷ হাঁটতে হাঁটতে ফোনের স্ক্রিনে একবার তাকিয়ে সময়টা দেখে নিল, তারপর ঢুকে পড়ল নিজের তাঁবুতে।
বাকিরা হাঁ করে চেয়ে রইল শুধু সেদিকে। কিন্তু রসিকপ্রিয় হৃদয় এমন গুরুগম্ভীর একটা মুহূর্তে কেমন অবুঝ সুরে আশফিকে জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু বাপ, ও এটা কী বলে গেল? তোর টুয়েন্টি ফোর/সেভেন অ্যাভেইলাবল ঠোঁট বলতে কী বোঝাল আসলে? আর সেটা দিয়ে দিলিশাকে কী করতে বলল?”
কথাটা শেষ হতেই দিব্য খিকখিক করে হেসে ফেলল। ঠোঁট চেপে হাসতে লাগল পরাগ আর সৌভিকও। কিন্তু রাগ আর অপমানে আশফির মুখটা হয়ে উঠল কঠিন। মারিশার তাঁবুর দিকে দৃষ্টিদুটো স্থির রেখে কিছু একটা ভাবনাতেও যেন মত্ত হলো সে।
তবে দিলিশাও রেগে গেল বেশ। ওকে থাপ্পড় মেরে এত অনায়াসেই ছাড় পেয়ে গেল মারিশা, তা নিয়ে কেউ কোনো জোরালো প্রতিবাদ তো করলই না — উলটে মশকরা আরম্ভ করেছে এই পরিস্থিতিতে!
কান্না সুরে কণ্ঠটা কাঁপিয়ে সে অভিযোগ তুলল আবারও, “ও আমার গায়ে হাত তুলে কী করে এভাবে চলে যেতে পারে, আশফি? আর আমাকে মারতে চেষ্টা করল! এত বড়ো একটা অপরাধ করে ও পার পেয়ে যাবে?”
“দিলিশা?” পরাগ বলে উঠল, “আমরা মারিশাকে মাত্র দুয়েকদিন হলো চিনছি। কিন্তু তবু ওকে যতটুকু চিনেছি, হিংসা বা জেলাসি যেটাই বলো, এরকম একটা ব্যাপার থেকে খুন করার মতো খারাপ মানুষ ওকে মনে হয় না আমার। তুমি একটু ঠান্ডা হও, রেস্ট করো৷ তারপর নিজেও ব্যাপারটা বুঝবে আশা করি।”
“হুঁ, আমারও তাই মনে হয়”‚ একমত হলো সৌভিক, “মেয়েটা ডেঞ্জারাস, এতে সন্দেহ নেই৷ বাট খুন করার মতো ডেঞ্জারাস নয় ও৷ এরকম চরিত্রের হলে আশফির মতো ছেলের কাছে আসার সুযোগই পেত না কোনোদিন।”
দিলিশা তখন আরও দুর্বল গলায় বলল, “তাহলে ও কেন আমাকে ওরকম একটা জায়গা দেখাল, বলো? এটার কী লজিক তোমাদের কাছে?”
সঙ্গে সঙ্গে দিব্য কর্কশ সুরে জবাব দিল, “ও ভুলে গিয়েছিল আশফির অ্যালার্ট, শুনতে পাওনি? তুমি ওভার রিয়্যাক্ট না করলে সিচুয়েশনটা এত বিশ্রী হতই না।”
“তোমাকে আমি জিজ্ঞেস করেছি?” মুহূর্তেই রূঢ় স্বরে বলে উঠল দিলিশা, “তুমি কথা বলার কে? আমার ব্যাপারে তুমি একদম কোনো কথা বলবে না। তোমার মতো উমেইনাজার তো ওর কোনো দোষ দেখবেই না। দেখলে যে আর চান্স পাবে না ওকে নিয়ে খেলার।”
“আহ্হা…! এত কথা থাকতে আমার খেলাখেলির গল্পেই ঢুকতে হলো তোমাকে?” নাটকীয় হতাশা নিয়ে দিব্য ওর সামনে এগিয়ে এল একটু।
পকেটে দু হাত পুরে দাঁড়িয়ে বলল আবার, “সবাই অপিনিয়িন দিচ্ছে, তাই আমিও দিলাম। কিন্তু আমার অপিনিয়ন দেয়া নিষেধ, তাই তো? কিন্তু কেন? তোমার সঙ্গেও কয়েক ম্যাচ খেলেছিলাম, তাই? বাট খেলা তো আর একা একা হয় না, বেইব।”
বলেই এক চোখ টিপল সে। শয়তানি হাসি হাসতে হাসতে বলল, “তুমি খুবই অকৃতজ্ঞ, বুঝলে? যখন তুমি আশফির রিজেকশন পেয়ে একদম ব্রোকেন হার্ট নিয়ে এসেছিলে আমার কাছে, তখন তো আমি তোমাকে মেনটালি, ফিজিক্যালি, দুভাবেই বুস্ট করেছি। তারপরও এত রাগ, এত ঘেন্নার কারণ কী, সিস্টার?”
“খবরদার! আর একটা কথাও বলবে না”, চিৎকার করে উঠল দিলিশা, “তুমি আমার দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছিলে, দিব্য। আমার ড্রাঙ্ক অবস্থায় সুযোগ নিয়েছিলে। শুধু আমার ভুলটা ছিল যে, তোমাকে ভালো বন্ধু ভেবে বিশ্বাস করে নিজেই তোমার কাছে গিয়েছিলাম। নয়তো আত্মীয়তার ধার ধারতাম না। পুলিশের কাছে যেতাম আমি৷ আর এতদিন জেলে বসে জেলের ভাত খেতে তুমি।”
“এই না, প্লিজ! আমি খুবই লাজুক ছেলে”, কথাটা বলে মুখটা আড়াল করে একটু লজ্জা পাওয়ার ভানও করল দিব্য৷
তারপর হঠাৎ হাসতে হাসতে ভ্রু-কপাল কুঁচকে পাথর চোয়ালে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা আশফির দিকে তাকাল সে, “মাই ব্রাদার, আমি কি লজ্জা ভেঙে কটা হট সেলফি পাঠাব মাসুদ চৌধুরীকে? কী বলো?”
“ওই সেলফিগুলোতে আমি ড্রাঙ্ক ছিলাম, আশফি”, অস্থির হয়ে উঠে ভীতসন্ত্রস্ত গলায় বলতে লাগল দিলিশা, “ও সেই সুযোগে ছবিগুলো তুলেছে। আমি সেন্সেই ছিলাম না, বিলিভ মি…”
কথার মাঝপথেই দিব্য কথা কাটল কপট ঘুম ঘুম কণ্ঠে, “নট অ্যাগেইন, দিব্যওওও… ইউ আর ক্রে…ই…জি ওয়াইল্ড! ইস! মনে পড়তেই কেমন হর্নি ফিল করছি, বেইব!”
“অফ যা, দিব্য”, ধমক মারল আশফি।
তারপর দিলিশাকেও বলল থমথমে গলায়, “তোমাকে কাল সকাল হলেই পোখরা এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেব আমি। তারপর কাঠমান্ডু পৌঁছে বাংলাদেশ ফ্লাইট বুক করে নিয়ো প্লিজ।”
এক লহমায় সমস্ত প্রতিবাদ যেন হাওয়ায় উবে গেল দিলিশার৷ চমকে তাকাল আশফির দিকে৷ আর দিব্যর ঠোঁটের কোণে ফুটল কিছুটা বিরক্তি৷ মেয়েটাকে বিষাক্ত লাগলেও এরকম পরিস্থিতিতে সে মোটেও চায়না সে বিদায় হোক৷ কিন্তু তবু চুপ করে রইল৷ কারণ, যার প্রয়োজর সে নিজেই পারবে প্রতিরোধ গড়তে।
“আশফি!” ব্যথিত সুরে ডেকে উঠল দিলিশা, “আশফি, আমাকে চলে যেতে বলছ তুমি?”
হঠাৎ করে মাইগ্রেনটাও যন্ত্রণা দিতে শুরু করেছে আশফির। মারিশার সন্দেহজনক আচরণগুলো আর মাইগ্রেন, দুইয়ে মিলিয়েই সব কিছু এ মুহূর্তে প্রচণ্ড অসহ্য লাগছে ওর৷ তাই দিলিশার মানসিক বা শারীরিক পরিস্থিতির বিবেচনা একটুও মাথাতে এল না। একদম নীরস গলাতেই জবাব দিয়ে বসল, “হ্যাঁ, বলছি। এই ব্যাপারগুলোতে আমি খুবই স্ট্রেস ফিল করছি, দিলিশা৷ আর আজকে যে সিচুয়েশন ক্রিয়েট হলো, এরকম সিচুয়েশন বারবার ফেইস করার মতো ধৈর্য আমার থাকবে না। তাই প্লিজ, তুমি বাংলাদেশ ব্যাক করো।”
“অথচ তোমার এই অপমানটা ওই মেয়েটা ডিজার্ভ করত, আশফি! ও যেটা করল আমার সঙ্গে, এর কোনো বিহিতও করলে না। কিন্তু আমি তোমাকে জানতাম, তুমি সারা জীবন মোরালিটি মেনে চলো। আজ সেটা ভুল লাগছে ভীষণ। সত্যিই কি ভুল?”
এক মুহূর্তের জন্য নিশ্চুপ দেখাল আশফিকে। মারিশার তাঁবুর দিকে নজরবিদ্ধ রেখেই সে কেমন অভিমানী কণ্ঠে উত্তর দিল, “তাকে শাস্তি দেওয়ার কেউ নই আমি৷ তোমার যদি বিচার প্রয়োজন হয় তবে দেশে ফিরে ওর মায়ের কাছে অভিযোগ কোরো। তাও আমি অনাধিকার চর্চা করে যতটুকু বলে ফেলেছি, তা নিজের মোরালিটি থেকেই। এর বেশি কিছু আমি বলতেও পারব না, করতেও পারব না।”
কথাগুলোর জবাবে হৃদয় হঠাৎ কথা বলে উঠল, তবে এবার সে সত্যিই অবুঝ, “তুই তো বলছিস তুই ওর কেউ না। কিন্তু ও তো নিজেকে তোর ওয়াইফ দাবি করল। সেটা কী করে? তোকে ছেড়ে যাওয়ার পর ও না ওর বাপের পছন্দের ছেলেকে বিয়ে করেছিল? তাহলে এখনো কী করে নিজেকে তোর ওয়াইফ বলছে?”
“সেটা ওকেই জিজ্ঞেস কর”, আচমকাই চেঁচিয়ে উঠল আশফি, “যে বলে গেল তাকে ডেকে জিজ্ঞেস কর, কোন সাহসে নিজেকে সে আমার ওয়াইফ দাবি করল? আমাকে প্রেশার দিচ্ছিস কেন সবাই? বুঝলাম না, এই ট্রিপে আমি এখনো কী করছি আসলে? আমার নিজেরই চলে যাওয়া উচিত৷”
শেষ কথাটার পর পরই মারিশা ব্যাগপ্যাক থেকে দুটো কাগজ বের করল। ভেতরে বসে সবার সমস্ত কথায় সে শুনতে পাচ্ছিল। কিন্তু সে কথাগুলো এড়িয়ে যেতে পারলেও আশফির কথাতেই মাথার মধ্যে আবার আগুন জ্বলে উঠল তার। কাগজদুটো হাতে নিয়ে বেরিয়ে এল তাঁবু থেকে৷ মুহূর্তেই সবার দৃষ্টি ছুটল তার দিকে। দাপুটে চালে এগিয়ে এসেই একদম মুখোমুখি দাঁড়াল সে আশফির। কিন্তু ওর সঙ্গে কোনো কথা বিনিময় করল না৷ পরাগের দিকে ঘুরে তাকে বলল, “পরাগ ভাই, আপনাকে আমার সব থেকে বেশি জুডিশাস লাগে। তাই কাগজদুটো আপনাকেই দিচ্ছি। আপনি একটু দেখুন তো। একটা ডিভোর্স সার্টিফিকেট, একটা ম্যারেজ সার্টিফিকেট।”
কাগজদুটো বাড়িয়ে দিতেই পরাগ একবার আশফির দিকে চেয়ে হাতে তুলে নিল সেটা। তখনই মারিশা জানাল তাকে, “আমার আর ডেনিজের সিভিল ম্যারেজ হয়েছিল৷ সেখানে কোনো ইসলামি কন্ডিশন পূরণ হয়নি৷ মানে কোনো ইজাব-কবুল হয়নি, কোনো মোহরানা নির্ধারণ হয়নি। আর ডেনিজের সঙ্গে বিয়ের আগে আপনার বন্ধুর সঙ্গে আমার কোনো ডিভোর্স হয়নি। এখন বলুন, কোন বিয়েটা ইসলামি কন্ডিশন অনুযায়ী ভ্যালিড ছিল বা আছে?”
ফোনের আলো জ্বালিয়ে কাগজদুটোতে সবেই চোখ বুলাতে শুরু করল পরাগ, তক্ষুনি আশফি বর্জ্র স্বরে ধমক মারল তাকে, “এই, ওসব রাখ! দেখতে হবে না। এখন আর এসব নিয়ে আমার কোনোই কেয়ার নেই।”
“আমি বলেছি তোমার কেয়ার আছে?” পালটা ধমক মারল মারিশাও, “এত বেশি বুঝতে বলে কে? তোমার বউ হয়ে থাকার জন্য মরে যাচ্ছি না আমি। বেঁচে থাকা সম্পর্কটাকে কেবল রিভিল করেছি। যেটা যখন খুশি তখন তুমি এন্ড করতে পারো। আই হ্যাভ স্টপড্ কেয়ারিং!”
“হাহ্! কমেডি গোল্ড…” তাচ্ছিল্য ভরে হাসল আশফি, “তুমি কেয়ার করেছই-বা কবে? এমনভাবে বলছ যেন খুব এফোর্ট দেয়ার পর তুমি এখন ক্লান্ত, তাই হাল ছেড়ে দিচ্ছ?”
“লিসেন…” আঙুল উঁচিয়ে মাত্রই জবাব দিতে যাচ্ছিল মারিশা।
কিন্তু কথাটা সম্পূর্ণ করতে পারল না। পরাগ দ্রুত ওদের মাঝে এসে দাঁড়াল। আশফিকে অভিভাবকের গলায় শাসন করল, “থাম বলছি। ঝগড়াঝাঁটি থামা। আর কোনো কথা বলবি না কিন্তু। এসব নিয়ে ঠান্ডা মাথায় কথা বলা যাবে। এখন সবাই ক্লান্ত আমরা। খেয়েদেয়ে সবাই রেস্ট করব। রান্নাবান্নার ব্যবস্থা করতে হবে আগে, চল!”
“আমার কথা আগে শেষ করতে দিন, ভাইয়া”, জেদি গলায় কথাটা বলেই আশফির দিকে তাকাল মারিশা, “এফোর্টের কথা বললে না? চার বছর আগে তোমার ফুপু আর তোমার ফুপুর ছেলে রাগ, ক্ষোভ নিয়ে এই দেশে বসে না থেকে যদি ওসমান বারিশ সুলতানের বাড়িতে গিয়ে দাঁড়াত, তাহলে আমি এই সম্পর্কের জন্য কতটা এফোর্ট দিতে পারি — তা দেখানোর সুযোগ পেতাম। আর চার বছর পর যখন ফিরলাম, তখন এই এফোর্টটা দিতেই এসেছিলাম। কিন্তু এবারও আমাকে কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি। ওই সুযোগের অপেক্ষাও আর করব না। আমার দাবি নিয়ে দ্বিতীয়বার তোমার সামনে কোনোদিন দাঁড়াবও না, সেটা তো বলেছিই। আর দিলিশাকে যেতে বলার কোনো প্রয়োজন দেখছি না, যখন আমিই থাকছি না। হোপ ইউ ফিল বেটার নাও।”
পরাগকে মাঝখান থেকে ঠেলে সরিয়ে এবার ওর সামনে এসে দাঁড়াল আশফি৷ “কাগজে যখন সম্পর্কটা বেঁচে আছেই আর নিজেও যখন আজ সেটা রিভিল করে স্বীকৃতি দিলেই, তখন শুনে রাখো”, তর্জনী আঙুল উঁচিয়ে প্রতিটি শব্দের ওপর আলাদা করে জোর দিয়ে বলল, “আমাকে না বলে, আমার পারমিশন না নিয়ে এখান থেকে এক পাও কোথাও নড়বে না। নয়তো ফল ভালো হবে না… আই রিপিট, ফল ভালো হবে না। আমাকে কোনোরকম ভোগান্তি দেবে না বলে দিচ্ছি।”
কথাগুলো শেষ করেই পরাগের হাত থেকে ছোঁ মেরে কাগজগুলো নিয়ে মারিশার হাতে তা ধিক্কারের সঙ্গে তুলে দিয়ে বলল, “তোমার এসব পার্সোনাল সম্পদ কেউ দেখতে চাইনি৷ তোমার সম্পদ তুমি রেখে দাও যত্ন করে।”
“আমি বলেছি এগুলো আমার সম্পদ?” চোখ রাঙিয়ে ঝাঁঝালো গলায় বলল মারিশা।
উপহাস করল আশফি, “সম্পদ না হলে কেউ ট্রিপে বেরিয়েও ব্যাগে নিয়ে ঘোরে না-কি? কই, আমাদের বিয়ের ডকুমেন্টস তো নেই তোমার কাছে! আছে?”
একটু থামল তারপর। তিরস্কারপূর্ণ হাসিতে বলল, “এই যে একটু আগে যে দাবিটা করলে না? ওটার কোনো প্রুভই কিন্তু তোমার কাছে নেই৷ তুমি সেটা সঙ্গে নেওয়ার প্রয়োজনবোধই করোনি। এরপরও যে আমাকে স্বামী বলে স্বীকৃতি দিলে, তার জন্য খুশিতে আমার চোখে পানি চলে আসছে তো, ওয়াইফি! অবশেষে ভাগ্য আমার সদয় হলো কিনা?”
তিরস্কার শেষে এবার সেও আর দাঁড়াল না। নির্বিকারভাবে হেঁটে চলে গেল ক্যাম্পফায়ারের কাছে, রাতের খাবারের ব্যবস্থা করতে৷ ঠিক তখনই মাটিতে ভারী বস্তু পতনের আওয়াজ হলো৷
দিলিশা মাত্র হাত চারেক দূরে দাঁড়িয়ে ছিল মারিশার থেকে। জ্ঞান হারিয়ে নিচে লুটিয়ে পড়েছে সে। তবু ছুটে গিয়ে তাকে ধরল না মারিশা৷ ছুটে এল পরাগ, হৃদয় আর সৌভিক৷ পতনের শব্দটা শুনে আশফিও ফিরে তাকিয়েই দ্রুত এগিয়ে এল দিলিশার কাছে৷
সেদিকে শীতল চোখে চেয়ে হাতে ধরা কাগজদুটো দুমড়াতে মুচড়াতে থাকল মারিশা। তারপর দীর্ঘ একটা শ্বাস ছেড়ে হঠাৎ পা বাড়াল নিজের তাঁবুতে।
ঝগড়া থামলেও পরিবেশের সেই ভারি ভাবটা কাটল না। রাতের খাবার প্রস্তুত করেছে পরাগরা। সবাই খেয়ে নিলেও খায়নি কেবল মারিশা আর আশফি। তাঁবুর বাইরে থেকে তাকে ডাকাডাকি করেছে সবাই-ই৷ কিন্তু একবারের জন্যও বের হয়নি মারিশা। রাগের চোটে তাই আশফিও খায়নি।
এদিকে হঠাৎ প্যানিক অ্যাটাকে দিলিশা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছ। নিজের পাশে একমাত্র আশফি ছাড়া আর কাউকেই ভরসা করতে চাইছে না। কাঁটা গেলার চেষ্টার মতো তাই বাধ্য হয়েই আশফি তার তাঁবুতে এসে বসে আছে।
তাঁবুর বাইরে না এলেও এ খবরটা ইতোমধ্যে মারিশার কানে পৌঁছেও গেছে দিব্যর মাধ্যমে। আর তাতেই আরও বেশি রাগ, জেদ আর অভিমান নিয়ে চোখ বুজে পড়ে আছে সে৷
ক্লান্তিতে বাকিরা আর আগুনের পাশে বসে নেই৷ নিজ নিজ তাঁবুতে গিয়ে শুয়ে পড়েছে তারা৷ মাইগ্রেন যন্ত্রণা নিয়ে আশফিরও খুব ক্লান্ত লাগছে, বসে থাকতে বেশ কষ্ট হচ্ছে ওর৷ না পারতেই দিলিশাকে ডাকল তাই, “দিলিশা? শোনো, আমি আমার টেন্টে যাই। কিছুক্ষণ রেস্ট করেই তোমার টেন্টের বাইরেই বসে থাকব পুরো রাত৷ কোনো ভয় পেয়ো না, কেমন? ঘুমিয়ে পড়ো নিশ্চিন্তে।”
কথাটা শুনতেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল দিলিশা, “আমি চোখই বুজতে পারছি না৷ চোখ বুজলেই ওই কালো জানোয়ারটাকে নিজের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখছি। একা একা কীভাবে ঘুমাব আমি? তুমি এখানেই একটু কষ্ট করে শোও না! আমরা তো সম্পর্কে কাজিনও হই, তাই না? প্লিজ, একটু কষ্ট করো, আশফি! তুমি ছাড়া এখানে আমার আর কে-ই বা আছে, বলো? কাল সকাল হলেই আমি চলে যাব, প্রমিজ! আর পেইন দেব না তোমাদের।”
জীবনের প্রতিটি সফরে বহুবারই জটিল পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে আশফি৷ কোনো অসুস্থ ব্যক্তিকে সেবা করতে কখনোই অস্বস্তি বা অনীহা প্রকাশ করেনি সে। কিন্তু আজ ওর মানবিক সত্তাটা ভীষণরকম ইতস্তত করছে৷ অধিকন্তু মনটা বারবার ছুটে যাচ্ছে ওই জটিল রূপের নারীর কাছে৷ যে সবার সামনে আজ নিজেকে জোর গলায় তার স্ত্রী বলে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। তাই তো বহুদিনের বোঝাপড়া করাটা আজ অনিবার্যই হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সেসব উৎকণ্ঠা আর ছটফটানি ভেতরে দমিয়ে রাখতে হলে। চুপচাপ বসে রইল দিলিশার হাতটা ধরে।
রাতটা থেমে নেই। ক্যাম্প সাইটটা এখন এক নির্জন দ্বীপের মতো যেন। মাটির বুক ঘেঁষে জন্মানো হলদেটে ঘাস আর লাইকেন ধরা পাথর ছাড়া আর কোনো প্রাণের চিহ্নই নেই। বাতাস এখানে গান গায় না, পাথরের খাঁজে লেগে এক ধরনের অশরীরী শিস দেয়।
অন্ধকারে তাঁবুগুলোর রঙিন নাইলন কাপড়ে যখন বাতাসের ঝাপটা লাগছে, তখন এক অদ্ভুত খসখসে শব্দ উঠছে। পায়ের নিচে মাটির বদলে কেবলই অমসৃণ শিলা আর হিমবাহের বয়ে আনা নুড়িপাথর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ক্যাম্পের চারধারে।
উপরে তাকালে মনে হয় আকাশটা যেন একদম হাতের নাগালে। দূষণহীন এই উচ্চতায় ছায়াপথ এত স্পষ্ট যে মনে হচ্ছে কেউ হীরের কুঁচি ছিটিয়ে দিয়েছে। দূরের মাছাপুছরের ধারালো চূড়াটা চাঁদের আলোয় এক রূপালী প্রেতচ্ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে। পাহাড়ের গায়ে কোনো গাছপালা নেই বলে ছায়াগুলোও কেমন তীক্ষ্ণ। মানুষে মানুষে বিবাদ চললেও, এই আদিম প্রকৃতি হয়ে আছে একদম নির্বিকার, হিমশীতল আর মহিমান্বিত। তাদের ব্যক্তিগত ঘৃণা বা ভয় এই বিশালতার কাছে বড়ো বেশিই তুচ্ছ।
ঘুমিয়ে গেছে সবাই। কান্নায় চোখের পাতা ভারী হয়ে আসা দিলিশাও নিজের অজান্তেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। নিদ্রাহীন থাকার শপথ নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জেগে কাটাল শুধু আশফিই।
খুব সন্তপর্ণে দিলিশার তাঁবু থেকে বেরিয়ে এসেই এগিয়ে গেল সে মারিশার তাঁবুর সামনে। ওকে ডাকবে কিনা, এ দ্বিধা নিয়ে চুপচাপ মিনিটখানিক দাঁড়িয়েই রইল। তবে ডাকলেও রগচটা মেয়েটা তাঁবুর চেইন খুলবে কিনা, সেটাই বড়ো ভাবনা। শেষমেশ দ্বিধান্বিত মনটা নিয়ে সে ফিরে এল৷ পরাগকে ডেকে ঢুকে পড়ল নিজের তাঁবুতে। কিন্তু আপাতত ঘুমানোর কোনো পরিকল্পনা নেই। ব্ল্যাঙ্কেটে নিজেকে জড়িয়ে নিয়ে ফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখল। এ কয়েক ঘণ্টায় অনেক ভেবেচিন্তে শেষমেশ এ সিদ্ধান্তে এসেছে, চার বছরের সমস্ত ঘটনাগুলো আজ জানবে সে। আর তারপরই মারিশার সঙ্গে বেঁচে থাকা সম্পর্কটার ভবিষ্যত কী হবে, নির্ধারণও করবে তা আজই।
ইস্তাম্বুলে রাত এখন ১১ টা বেজে ১৫ মিনিট। অফিস থেকে বেরিয়ে আজ বন্ধুদের সঙ্গে নাইট ক্লাবে ঢুকেছিল মিরান৷ কিন্তু খুব বেশি সময় কাটায়নি। বাসায় ঢুকেছে একদম মাত্রই৷ গা থেকে খুলে রাখা কোটটা হাতে ঝুলিয়ে ক্লান্ত শরীরে লিভিং রুমে প্রবেশ করা মাত্রই ফোনটা বেজে উঠল তার৷ পকেট থেকে ফোন বের করে স্ক্রিনে নামটা দেখেই সমস্ত ক্লান্তি যেন ভুলে গেল নিমিষেই। বহুদিন বাদে আজ আশফি নিজে থেকে কল করল তাকে! মনটা প্রথমে চঞ্চল হয়ে উঠল তার। কিন্তু পরবর্তীতেই মারিশার চিন্তা জেঁকে ধরল হঠাৎই। কলটা এসেছে কি কোনোভাবে তার বোনকে নিয়ে অভিযোগ জানাতে? কপালে ভাঁজ ফেলে দ্রুত রিসিভ করল সে।
কোনো সৌজন্যতা বা আন্তরিকতা ছাড়াই ফোনের ওপাশ থেকে কথা শুরু করল আশফি, “তুই কি বিজি আছিস?”
কণ্ঠতেও গম্ভীরতা একটু বেশিই টের পেল মিরান। হাঁটতে হাঁটতে নিজের ঘরে ঢুকেই দরজাটা চাপিয়ে দিল আগে৷ তারপর জবাব দিল, “বাসায় এলাম এখন। ফ্রেশ হব আরকি৷ কেমন আছিস?”
বক্রোক্তি ছুড়ল আশফি, “ভালো থাকার আয়োজন করেছিস, ভালো থাকব না?”
“এভাবে বলছিস কেন?” মৃদুস্বরে একটু বিব্রতভাব ফুটে উঠল মিরানের, “মাহি কি খুব বিরক্ত করছে?”
ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল আশফি৷ তা স্পষ্ট শুনতেও পেল মিরান। মারিশাকে নিয়ে চিন্তাটা তাতে ধীরে ধীরে আরও গাঢ় হতে লাগল৷ কিছু বলতেই যাবে সে, তার আগেই আশফি কড়া স্বরে বলতে শুরু করল, “আমাকে ধোঁয়াশায় রেখে বোনকে আবার আমার সাথে সেটিং করে দিবি, আর আমিও খুশিতে নাচতে নাচতে সব কিছু ভুলে গিয়ে সংসার করতে শুরু করব — এটা খুবই আকাশ-কুসুম স্বপ্ন, মিরান। আমি এতটাও সহজলভ্য না। আমি এই মুহূর্তে সেই সব কথাগুলো জানতে চাই, যা গোপন রাখছিস তোরা। আর তারপরই আমি ফাইনাল ডিসিশন নেব, নতুন করে তোর বোনকে আমি অ্যাক্সেপ্ট করব কি করব না।”
কথাগুলোতে বেশ অপমানিত বোধ করল মিরান। আত্মসম্মানেও লাগল বেশ। নিজেকে আর মারিশাকে ভীষণ ছোটো মনে হতে লাগল আশফির কাছে৷ তাই থমথমে কণ্ঠে বলল সে, “ওয়েল… জানতে চাচ্ছিস, জানাব। কিন্তু তার আগে একটা কথা একটু ক্লিয়ার করে দিই তোকে৷ আমার বোনকে তোর কাছে পাঠিয়েছি মানে এই না, তোর ঘাড়ে ওকে চাপিয়ে দিতে চাচ্ছি। একটা সম্পর্কে তোরা এখনো বাঁধা আছিস, সেই সূত্র থেকেই তোর কাছে পাঠানো৷ যদি দুজনের মাঝে সবটা নরমাল হয় তবেই চেয়েছি তোরা নতুন করে সবটা শুরু কর। আর না হলে তো…”
“আমি এই আলাপ করার জন্য কল দিইনি”, মিরানকে কথার মাঝপথেই থামিয়ে দিল আশফি। জিজ্ঞেস করল তারপর, “তোর বোনের সঙ্গে কী হয়েছে? ওকে আমার কেন ঠিক লাগছে না?”
বিছানায় এসে বসল মিরান। গভীর চিন্তার ছায়া ভেসে উঠেছে তার চেহারায়। কিছু একটা ভাবল যেন৷ ভাবা শেষ করে সে পালটা প্রশ্ন ছুড়ল, “ওর গায়ের স্পটগুলো খেয়াল করেছিস তো, না?”
“স্পট? ওই হাতের স্পটের কথা বলছিস?”
“হুঁ। শরীরের আরও কিছু জায়গাতেও আছে।”
সামান্য ভাবনায় পড়ল আশফি। কাঠমান্ডুতে প্রথম রাতেই তো মারিশার বাহুতে আর গলার নিচে একদম হালকা কিছু দাগ চোখে চোখে পড়েছিল ওর। পাহাড়ে চড়া আর শিকারের অভ্যাস যেহেতু আছে মেয়েটার, তাই সে ভেবে নিয়েছিল কেটে যাওয়ার চিহ্নগুলো সেসব থেকেই তৈরি হয়েছে হয়তো। তাছাড়া রাগ, অভিমান থেকে সে রাতের পর আর গুরুত্ব সহকারে দেখেওনি সে ওই দাগগুলোকে। তাই সন্দেহও হয়নি, দাগগুলোর কারণ ভিন্ন কিছুও হতে পারে!
মিরান আর অপেক্ষা করল না। ডেনিজের সাইকোপ্যাথিক চরিত্র, ডেনিজের পরিবারের সদস্যদের দ্বারা মানসিক আর শারীরিকভাবে মারিশার নির্যাতিত হওয়ার গল্প, সবটা বলতে লাগল সে। বলতে বলতে এক পর্যায়ে কণ্ঠটা যেন ভেঙে এল মিরানের। তবু থামল না, বলে গেল সে, “নিজের স্বার্থ হাসিল না হওয়ায় আড়াইটা বছর ধরে ডেনিজ ওকে তিলে তিলে ধ্বংস করার প্ল্যান করেছিল। ওকে প্রতিনিয়ত অ্যালকোহল, বেনজোডায়াজেপিন্স, কেটামিন, জিএইচবি, স্কোপোলামিনের মতো ড্রাগস খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়াত ওরা। সেটা একটাবারও টের পায়নি ও৷ যার ফলে ধীরে ধীরে ড্রাগ ইনডিউস্ট অ্যামনিশিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে। শর্ট টার্ম মেমরি লস থেকে টেম্পোরারি মেমরি লস, ব্ল্যাকআউট, কনফিউশান, ইমোশন কন্ট্রোলে সমস্যা, এমনকি অতীত স্মৃতিও ঝাপসা হতে লাগল ওর, বিশেষ বিশেষ মানুষগুলোকেও ভুলে যেত। ডেনিজ চেয়েছিল, ওর থেকে যদি কোনোভাবে মাহি মুক্তি পেয়েও যায়, কিন্তু কোনোদিন যেন সুস্থ না হতে পারে আর সুস্থবেশে তোর কাছেও পৌঁছানোর সুযোগটা না পায়।”
গল্প থামল না এরপরও৷ ডেনিজের চল্লিশ বছর বয়সী বড়ো বোন সেলিনের সৌন্দর্যে বশ হয়ে যাওয়ায় ছিল ওসমান বারিশের প্রথম ভুল। আর সেই ভুল থেকেই তার মতো লোভী এক কুচক্রী নারীকে বিশ্বাস করাটা ছিল তার চূড়ান্ত ভুল৷ ঠিক একইভাবে ডেনিজের মতো সাইকোপ্যাথ পুরুষটাকেও তিনি ভরসা করে নিজের সর্বোচ্চতম সর্বনাশটা করে ফেললেন৷ ধীরে ধীরে একটা কাঠের পুতুল বনে গেলেন যেন৷ সেলিনের কথা, সেলিনের পরামর্শই সব সময় গ্রহণযোগ্যতা পেত তার কাছে৷ এবং সেলিনের কথা দ্বারা প্রভাবিত হয়েই নিজের একমাত্র বোন আইলিনকে ভুল বুঝে তাকে এজেন্সি থেকে বের করে দেন৷ এবং তার পরিবর্তে জায়গা দেন ডেনিজকে৷
একের পর এক ঘটনাগুলো শুনতে শুনতে আশফির মনে হলো মাথাটা ভনভন করে ঘুরছে ওর৷ সব কিছু ছাপিয়ে ওর মস্তিষ্কে সুচের মতো বিঁধতে লাগল কেবল মারিশার দুর্বিষহ অবস্থাটাই৷ কিন্তু সব থেকে বড়ো ধাক্কাটা খেল সে কথার শেষ মুহূর্তে, যখন জানাল মিরান, “ডেনিজ শুধু ড্রাগসের মাধ্যমেই ক্ষতিটা করতে চায়নি৷ মাঝেমধ্যেই ওর নিষ্ঠুর, পাশবিক আচরণের শিকারও হয়েছে। সঙ্গে ওর মা আর দুই বোনের টর্চারগুলো তো ছিলই৷ এসব থেকে ট্রমাটাইজ, ড্রাগের এফেক্ট, প্যারালাইজড বাবাকে ওদের থেকে মুক্ত করা আর এজেন্সিটাকে ফিরে পাওয়ার চিন্তা থেকে অত্যধিক স্ট্রেস, সব মিলিয়ে একটা সময় ওর মধ্যে ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিসঅর্ডার দেখা দেয়।”
প্রচণ্ড চমকাল তখন আশফি, “কী বললি?”
ছোটো একটা শ্বাস ফেলে মিরান আস্বস্ত করল, “ডোন্ট বি কনসার্নড। একটা বছর সেটার ট্রিটমেন্ট চলেছে। আর এখন ও এদিক থেকে অনেকটাই সুস্থ৷ তবে এই পুরো ঘটনায় আমার বোন সব থেকে বড়ো চমক দিয়েছে কী করে জানিস? ড্রাগসের কারণে যখন থেকে ও নিজের দৈনন্দিন কাজে এসব অসুবিধা ফেইস করতে লাগল, তখন থেকে ও ভয়েস নোট রেকর্ড করতে লাগল সব ঠিকঠাক মনে রাখার জন্য৷ ওর টেবিলে রাখা প্ল্যানার আর টাইমস্ট্যাম্পের হিসেব ওকে খেই হারাতে দিত না। দশ মিনিটের জন্য চেতনা হারিয়ে ফেললেও ডায়েরির চেকলিস্ট ওকে মনে করিয়ে দিত ও কোথায় দাঁড়িয়ে আছে। ওর শরীর তখন যেন এক প্রোগ্রাম করা রোবট৷ সকাল নটার মিটিং বা রুটিন কাজগুলো ওর অবচেতন মন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেরে ফেলত, স্মৃতি না থাকলেও অভ্যাস ওকে টেনে নিয়ে যেত। বিশ্বস্ত দু-একজন সহকর্মীকে ঠিক করল, ওর হারাতে থাকা মেমরির ব্যাকআপ দেওয়ার জন্য। আর ডেস্কে সাঁটানো রঙিন স্টিকি নোট আর অ্যালার্মের সংকেত ওকে বর্তমানের সাথে কানেকশন করিয়ে দিত আবার। যখন ড্রাগের প্রভাব তুঙ্গে থাকত, তখন এ জটিল কাজ এড়িয়ে হালকা রুটিনে মন দিত। প্রতিটি ফাইল বা ইমেইল পাঠানোর আগে ও পুরনো নোট মিলিয়ে নিত৷ এভাবেই আর কিছু ব্যবসায়িক শুভাকাঙ্ক্ষীদের সাহায্যেই এজেন্সিটাকে অবশেষে রক্ষা করতে পেরেছে ও।”
ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে ফোনের ওপাশ থেকে মারিশার চারটা বছরের চিত্রগুলো তুলে ধরল মিরান৷ কথা শেষে ক্লান্ত, আহত, ক্ষুব্ধ মনটা নিয়ে আশফি স্লিপিং প্যাডে দেহটা এলিয়ে দিল৷ যে মেয়েটার নিবাস হওয়ার কথা ছিল ওর ঘরে, ওর বুকে, থাকার কথা ছিল সবার আদরে আর আহ্লাদে, পরিচিত হওয়ার কথা ছিল ওর স্ত্রীর পরিচয়ে — সে কিনা দিনের পর দিন অন্যায়, নির্যাতন সহ্য করেছে পর এক পুরুষের ঘরে৷ এত জেদ… এত কঠিন হৃদয় সেই মেয়ের, যে একটাবারের জন্যও ওকে স্মরণ করতে চায়নি! কেন চায়নি? এই প্রশ্নের জবাব ওকে দেয়নি মিরান। আরও কিছু প্রশ্নের বিপরীতেও নীরব ছিল সে৷ বেশ বুঝতে পেরেছে ও, আরও অনেক কিছু ওর থেকে লুকিয়ে গেছে মিরান। যাক, সেসব প্রশ্নের জবাব থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ওর কাছে এই প্রশ্নটাই — এজেন্সিকে রক্ষা করতে, বাবাকে রক্ষা করতে বহু পর মানুষের সহায়তা নিলেও কেন নিজের স্বামীকে মেয়েটা ভুলে থাকল? স্বামী হয়েও কেন সে স্ত্রীর পাশে দাঁড়ানোর অধিকারটা পেল না?
ক্ষুব্ধ আর অভিমানী মনটা ভেবে রাখল ওর, দিনের আলো ফুটতেই এই প্রশ্নের জবাব সে নিয়েই ছাড়বে।
সকাল ছটা৷ প্রকৃতির ক্যানভাস সম্পূর্ণ বদলে গেছে। সূর্যের তেজটা এখন সরাসরি পাহাড়ের বরফচূড়াগুলোতে আছড়ে পড়ছে। মাছাপুছরের সেই ধারালো চূড়াটা এখন আর কেবল পাহাড় নেই, সেটা যেন এক প্রকাণ্ড জ্বলন্ত তরবারি হয়ে আকাশকে বিদ্ধ করছে। বরফের ওপর সূর্যের প্রতিফলিত আলো এতই তীব্র যে, খালি চোখে সেদিকে তাকানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। পূর্ব দিকের আকাশ এখন পুরোপুরি পরিষ্কার। সূর্যের বাঁকা আলো যখন খাড়া পাহাড়ের গায়ে পড়ছে, তখন তৈরি হচ্ছে কেমন দীর্ঘ, কুচকুচে কালো ছায়া। পাথুরে ঢালের একপাশে আগুনের মতো উজ্জ্বল রোদ, আর ঠিক তার কয়েক ইঞ্চি পাশেই ছায়ার নিচে জমে আছে হাড়কাঁপানো অন্ধকার। এই আলো-ছায়ার বৈপরীত্যই বুঝিয়ে দিচ্ছে হাই ক্যাম্পের রুক্ষতা কতখানি।
সবার আগে আজ ঘুম ভাঙল সৌভিকের। হাই তুলতে তুলতে তাঁবু থেকে বেরিয়েই সামনে এগিয়ে পাথরের আড়ালে বসল প্রাকৃতিক কাজটা সারার জন্য। ঠিক তখনই বেখেয়ালিভাবে চোখটা গেল আশফিদের তাঁবুর পাশের ফাঁকা জায়গাটায়। সঙ্গে সঙ্গে আলস্য আর ঘুম ঘুম ভাবটা ছুটে গেল ওর৷
“কী ব্যাপার! ওর টেন্টটা কোথায় গেল?” চমকিত আর বিস্মিত কণ্ঠে বিড়বিড় করতে করতে সৌভিক ছুটে এল মারিশার টেন্টের জায়গাতে। যে জায়গাটা এখন একদম ফাঁকা।
কিছু একটা বুঝে যেতেই এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে গলা ছেড়ে ডেকে উঠল আশফিকে, “এই আশফি, এই! জলদি বের হ! আশফি…?”
বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ১৯
শেষ রাতে ঘুমিয়েছিল আশফি। দেহমন বেজায় ক্লান্ত থাকায় এক ডাকে আজ আর ঘুম ভাঙল না তার। কিন্তু পরাগ জেগে গেল। দ্রুত তাঁবুর চেইন টানতেই সৌভিক হুড়মুড়িয়ে ভেতরে অর্ধেক শরীরটা ঢুকিয়ে দিল, আর চেঁচিয়ে বলল, “আশফি, ওঠ জলদি। মারিশা নেই!”
