Home বুনো মেঘের হাতছানি বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ১৯

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ১৯

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ১৯
ইসরাত জাহান দ্যুতি

“হ্যাঁ… বলেছে”‚ কাঁদতে কাঁদতে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল দিলিশা। গলা ভেঙে যাচ্ছিল, চোখে আতঙ্ক আর অভিযোগ একসঙ্গে।
আশফির দিকে তাকিয়ে আর্তনাদ করে বলল, “তুমি আমার কথা বিশ্বাস করতে পারছ না, আশফি? আমি কি মিথ্যে বলছি? ও আমাকে মেরে ফেলতেই চেয়েছিল … ও একটা খুনি।”
এই অতর্কিত অপবাদ আর সবার সামনে এমন লাঞ্ছনায় মারিশা হতবাক হয়ে প্রথমে পাথরমূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিল, আর তার ওপর আশফির বিস্মিত, প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টিটা … সব মিলিয়ে তারপর যেন মাথার ভেতর একটা ঘূর্ণি তৈরি হচ্ছিল ওর।

কিন্তু ‘খুনি’ শব্দটা কানে যেতেই হঠাৎ করে ওর অভিব্যক্তিতে এক অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটে গেল। শরীরের রক্তপ্রবাহে যেন কেউ জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি ঢেলে দিল ওর। মুহূর্তেই খুনে চোখে চাইল সে দিলিশার দিকে।
চারপাশে তখন কবরের নিস্তব্ধতা। ​সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে দুটো কণ্ঠস্বর একসাথে গর্জে উঠল। আশফি তার গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল, “দিলিশা, শান্ত হও! কথা বুঝেশুনে বলো। মাহি এরকম নয়।”
আর সেই একই মুহূর্তেই মারিশার ভেতরের আগ্নেয়গিরি ফেটে পড়ল।
​“তোমাকে খুন করতে চাইলে আমি কোনো পশুর ভরসায় থাকতাম না, দিলিশা”, মারিশার কণ্ঠ যেন কোনো শ্বাপদের গর্জন, “তোমাকে আমি নিজ হাতেই ছিঁড়ে ফেলতাম!”

দিলিশাও ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নয়। সে আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল, “নিজের হাতে পারোনি বলেই তো ওভাবে মারতে চেয়েছিলে। নয়তো কেন আমাকে জেনেশুনে রেড জোন এরিয়ায় পাঠালে? নিজে তো ঠিকই সেফ জোন ইউজ করেছ। মারার উদ্দেশ্য না থাকলে এমনটা কেন করলে? তুমি সত্যিই এক ভয়ঙ্কর খুনি, ঠান্ডা মাথার খুনি!”
এই শেষ শব্দটা প্রতিবারই বিষাক্ত তীরের মতো মারিশার মস্তিষ্কের গভীরে গিয়ে বিঁধছে। হঠাৎ করেই যেন চারপাশের জগতটা ঝাপসা হয়ে এল ওর। স্মৃতির ধুলোবালি সরিয়ে ভেসে উঠল একটা হাড়হিম করা দৃশ্য। স্মৃতিতে কিছুই নেই। তবু মাঝেমধ্যেই নিজের মানসপটে ঝাপসা ঝাপসা ভেসে ওঠে এই দৃশ্যটা, হাতে শক্ত করে ধরা একটা ক্রিকেট ব্যাট, আর সেটা দিয়ে সে উন্মত্তের মতো কাউকে আঘাত করে চলেছে। চারদিকে ছোপ ছোপ রক্ত, মেঝেতে লাল স্রোত আর সেই উষ্ণ রক্তে মাখামাখি তার নিজের শরীর।
ঠিক এই মুহূর্তেও সেই দৃশ্যটা তার মানসপটে ভেসে উঠল। একই সঙ্গে কানে বাজতে লাগল ডেনিজের ভাগনে, ছোট্ট এরেনের সেই বুকফাটা আর্ত চিৎকার, “কাতিল! ও … বির কাতিল! ও … আন্নেমি … ওলদুর্দু! আনেআন্নেমি দে … ওলদুর্দু … ও!”

একদিন হঠাৎ ওকে দেখেই ওর ফুপু আইলিন সুলতানের বুকে মুখ লুকিয়ে এভাবেই চিৎকার করেছিল ভীত এরেন, ওকে নিজের মা আর নানির খুনি দাবি করে।
মিরান আর আইলিন সুলতান পরবর্তীতে এরেনকে কী করে সামলেছিলেন, খুনের সমস্ত প্রমাণ, নিশানা কী করে মুছে ফেলেছিলেন, বাবা ওসমান বারিশ সুলতানের সঙ্গে ঠিক কী করেছিল সে, সেই ধোঁয়াশা ওর আজও কাটেনি।
জানার মতো তখন না ছিল ওর শারীরিক-মানসিক সুস্থতা, না ছিল পাশে এমন কেউ, যে তাকে সত্যিটা জানাবে। নিজেকে সে হঠাৎ করেই একদিন আবিষ্কার করেছিল লন্ডনে — দ্য হারলে স্ট্রিট ক্লিনিকের একটি ভিআইপি কেবিনে। বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, ডাক্তার উইলিয়ামের কড়া পর্যবেক্ষণে কেটেছিল দীর্ঘ কয়েকটি মাস। সময়টা যেন ঝাপসা। ঘুম, ওষুধ, থেরাপি আর অদ্ভুত একাকীত্বের মাঝে কেটেছে সেই দিনগুলো। পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠলে একদিন হঠাৎ করেই ফুপু আইলিন এলেন। সেদিন কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ দেননি তিনি। ওকে বিস্মিত করে দিয়ে আশফির কাছে ফেরার জন্য প্রয়োজনীয় সব বন্দোবস্ত সেরে ফেলেছিলেন। যাওয়ার আগে কেবল শান্ত, কিন্তু কঠিন কণ্ঠে এটুকুই জানিয়ে গিয়েছিলেন, “ভাই বেঁচে আছেন, আর সুস্থও হচ্ছেন৷ কিন্তু তুমি এই মুহূর্তে ইস্তাম্বুলে ঢুকবে না, সোনা৷ মিরান বহু কষ্ট করছে এটা প্রমাণের জন্য, তুমি খুনি নও৷ এবং শেষ কিছু মাস তুমি এখানেই ছিলে, ডক্টর উইলিয়ামের অবজারভেশনে ছিলে। আর জেনে রাখো, ডেনিজ পলাতক। ও নিশ্চয়ই খুঁজবে তোমাকে৷ মা-বোনের হত্যার প্রতিশোধ, কিংবা তাদেরকে খুনের মিথ্যা দায় থেকে মুক্তি পেতেই তোমাকে মরিয়া হয়ে খুঁজবে সে।”
সেদিন ডেনিজের পলাতক হওয়ার সংবাদটা থেকেও বেশি আতঙ্কিত করেছিল মারিশাকে অন্য এক সত্য, সে নাকি নিজ হাতে ওই দুটো মানুষকে খুন করেছে!

না… দুটো নয়। এমনকি নিজের বাবাকেও সে হত্যার চেষ্টা করেছিল! কিন্তু নিজের বিরুদ্ধে এমন ঘৃণ্য, এমন অসহ্য অভিযোগ এক বিন্দুও বিশ্বাস করতে পারেনি মারিশা … আর আজও পারে না।
ভীত এরেনের চিৎকার ধ্বনিতে খুনি বলে ওঠা, আর আজ একই সুরেই দিলিশারও সেই একই অভিযোগ, একদমই সহ্য হলো না মারিশার। কারণ, নিজেকে তখন এক হিংস্র পশুর মতো লাগে ওর, জাহান্নামী লাগে! এত বড়ো পাপী সে, এ সত্যটা কোনোভাবেই সে গ্রহণ করতে পারে না৷ এমনকি আশফিকেও কোনোদিন এ সত্য জানতে দিতে চায় না। দুনিয়ার সবার কাছে সে অপরাধী হোক, কিন্তু আশফির চোখে সে অন্তত খুনি হতে চায় না। আশফির ঘৃণা নিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যুও যে শ্রেয় ওর জন্য।
মারিশা তাই ভয় পেয়ে গেল খুব। যদি সত্যটা কোনোভাবে জেনে যায় আশফি? কিন্তু সে তো দিলিশাকে মারতে চায়নি! ​আর সে পরিষ্কার বুঝতে পারল, দিলিশা সুকৌশলে ওকে আশফির চোখে নিকৃষ্ট প্রমাণ করতে চাইছে। তদুপরি আশফিকে যেভাবে সে জড়িয়ে ধরে আছে, ওই ভঙ্গি আর তার বিষাক্ত অভিযোগ মারিশার সহ্যসীমা অতিক্রম করল। বুকের ভেতরে ঈর্ষা আর দহন দাবানলের মতো জ্বলে উঠল ওর। দিলিশার স্পর্ধা দেখে ওর হিতাহিত জ্ঞানটাও লুপ্ত হলো।

আর ​দিলিশা, সে তখনো বিষোদ্গার করছিল, “তোমরা জানো ও কেন এমনটা করেছে? আজ ট্রেকিং থেকে শুরু করে টেন্টে আসার পরও আমার সঙ্গে ও ঝগড়া করেছে। কারণ, আশফির আশেপাশেও ও আমাকে সহ্য করতে পারছে না৷ ও হিংসা আর রাগে উন্মাদ হয়ে আমার মৃত্যু চেয়েছে।”
দিব্য, হৃদয় আর সৌভিক তখন দ্বিধায়৷ দিলিশার কথাগুলো কিছুটা বিশ্বাস হচ্ছিল ওদের। কেবল পরাগ আর আশফি মারিশার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। আশফি অপেক্ষায় আছে, মারিশার জবাবটুকু শোনার জন্য।
কিন্তু পরমুহূর্তে যা ঘটল, তা ছিল কল্পনাতীত। আশফি যেন তার নতুন এক ‘মাহিকে’ আবিষ্কার করল আজ।
দিলিশার বলা শেষ বাক্যটাই যেন বারুদে অগ্নিসংযোগ করেছে। মারিশা আর স্থির থাকতে পারল না। ঝড়ের গতিতে এগিয়ে এসেই সে দিলিশার চুলে মুঠি শক্ত করে চেপে ধরল। আশফির বুক থেকে তাকে যেন এক লহমায় উপড়ে আনল সে। এরপরই কানের নিচে সপাটে মারল এক থাপ্পড়!
এহেন আক্রমণ দেখে ​সবাই যখন পাথরের মতো জমে গেল, তখন মারিশার হুঙ্কার শোনা গেল, “হি’জ স্টিল মাই হাসব্যান্ড! আই’ভ লেফ্ট হিম, বাট হি স্টিল হ্যাজেন্ট ডিভোর্সড মি। হু দ্য হেল আর ইউ? তুমি কী করে সাহস পেলে আমাকে মিথ্যে ব্লেইম করার? ঠান্ডা মাথার খুনি কেমন হয়, দেখেছ? দেখতে চাও?”
রাগের চরম শিখরে পৌঁছে দ্বিতীয় চড়টা মারার জন্য সে যেই হাত তুলল, তখনই পেছন থেকে আশফির বজ্রকণ্ঠ শোনা গেল, “মাহি, থামো বলছি…!”

মারিশার উত্তোলিত হাতটা মাঝপথেই থামল ঠিকই, কিন্তু ওর আঙুলগুলো তখনো রাগে কাঁপছিল। আশফি এগিয়ে এসেই ওর কবজিটা শক্ত করে ধরে একটানে দিলিশার কাছ থেকে সরিয়ে আনল।
মৃত্যুভয়টা স্মৃতি থেকে মুছতে না মুছতেই মারিশার আক্রমণে দিলিশার শরীরটা তখন অনবরত থরথর করে কাঁপছিল৷ অভাবনীয় থাপ্পড়ে তার গালটা মুহূর্তেই লাল হয়ে ফুলে উঠেছে, নাক দিয়ে একটুখানি রক্তও গড়িয়ে এসেছে। সে ভয়ে আর বিস্ময়ে বড়ো বড়ো চোখে ওর দিকে তাকিয়ে ছিল। ভাবতেও পারেনি, শান্তশিষ্ট দেখতে মেয়েটা এমন রণচণ্ডী মূর্তিতে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে, আর একটা মেয়ের হাতের থাপ্পড় এতটাও শক্ত হবে।
কান্নার স্বর দিলিশার এখন আর্দ্র থেকে আর্তনাদে পরিণত হলো৷ যা দেখে যে কেউ তাকে চরম ভুক্তভোগী মনে করবে। হলোও তাই৷ হৃদয় এগিয়ে এল তার কাছে৷ রক্ত দেখে সৌভিকও দাঁড়িয়ে রইল না৷ পকেট থেকে চটজলদি টিস্যুটা বের করেই তাকে বাড়িয়ে দিল। তবে দিব্যর ঠোঁটের কোণে চোরা একটা আত্মতুষ্টির হাসি ফুটল, যা কারও নজরে পড়ল না৷ পকেটে হাত পুরে নির্বিকার ভঙ্গিতেই দাঁড়িয়ে থাকল সে৷ কিন্তু মারিশার প্রতি স্থির রইল তার প্রশংসায় পরিপূর্ণ একজোড়া চাউনি।

আর আশফি! সে মোটেও ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারল না ওর এই উগ্রতা। হাতের মুঠোয় ধরা ওর কব্জিটা ছেড়ে দিলেও সে কড়া ধমকে বলল, “কী করলে তুমি এটা? কী করতে চাইছিলে ওর সঙ্গে? আদৌ নিজের মধ্যে আছ তুমি? ও মরতে মরতে বেঁচে ফিরেছে, মাহি! এখনো সেই ভয়টাই কাটেনি। রাগের মাথায় উলটোপালটা বকাটাই নরমাল। তাই বলে তুমি অ্যাগ্রেসিভ হয়ে যাবে … অ্যাটাক করে বসবে? এটা কোনো মানুষের মতো আচরণ করলে, হ্যাঁ?”
দিলিশার জন্য এত উদ্বিগ্নতা, তার জন্য এত প্রতিবাদ দেখে মারিশা আরও বেশি ক্ষুব্ধ হলো, আর কষ্ট তো পেলই৷ কিন্তু তা আর প্রকাশ করল না সে৷ বরং পালটা প্রতিবাদে শীতল গলায় বলে উঠল, “ইয়েস, আশফি৷ রাগের মাথায় যা খুশি তাই বলতে পারে ও৷ বকাঝকা করতে পারে। কিন্তু বারবার আমাকে খুনি বলতে পারে না। এটা কত বড়ো অপবাদ, সেটা একবার ভাবলে না তুমি? সেটা শুনে তোমার একটুও প্রোটেস্ট করতে মন চাইলো না?”

কথাটা শেষ হতে না হতেই আশফির তীক্ষ্ণ স্বর বেজে উঠল, “আমাকে কথা বলার সুযোগ দিয়েছ তুমি? আর এভাবে একটা মানুষকে মারধর করাটা তোমার ভাষাতে প্রোটেস্ট? এটাই যদি তোমার প্রতিবাদের ভাষা হয়, তাহলে আমার দৃষ্টিতে সেটা তোমার চরিত্রের অধঃপতন, তোমার অমানুষিকতা। ও তোমাকে খুনি বলেছে বলে তুমি কি সত্যি খুনি রূপ ধারণ করতে চেয়েছিলে? যেভাবে ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে, আমার তো সেটাই মনে হলো।”
অসন্তোষ নিয়ে মাথাটা একবার নাড়াল আশফি, হতাশ গলায় বলল, “ঠিক করোনি একদম। আমি হয়তো তোমাকে নতুনভাবে চিনছি, মাহি। কিংবা ঠিকমতো কখনো চিনতেই পারিনি। ওর কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল তোমার৷ কিন্তু আমি জানি, তুমি নিজের অন্যায়কে অন্যায়ই ভাবছ না৷ ক্ষমা চাওয়া তো তাই দূরের ভাবনা।”
“আমি ওকে কোনোদিন ক্ষমা করবও না, আশফি”, হেঁচকি তুলে কাঁদতে কাঁদতে বলল দিলিশা, “তুমি ওকে আসলেই চিনতে পারোনি। আমি শতভাগ নিশ্চিত হয়েই বলছি, ও প্ল্যান করেই আমাকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছিল৷ নয়তো ও কেন মিথ্যে বলল, সেটা একবার জিজ্ঞেস করো। ও কিন্তু ঠিকই সেইফ প্লেস ইউজ করেছিল।”
“ব্যাপারটা কিন্তু আসলেই প্রশ্ন করার মতো, মারিশা”‚ সন্দিগ্ধ গলায় বলল হৃদয়, “তুমি কেন জেনেশুনেও ওকে ভুল পথের নির্দেশনা দিলে?”

আশফির তির্যক চোখে চোখ রেখেই মারিশা শান্ত, কিন্তু অভিমানী ও একরোখা সুরে জবাব দিল, “আনফরচুনেটলি, ওই মুহূর্তে আমার মাথাতে ছিলই না আশফির সতর্কতা। ইনটেশনালি আমি পাঠাইনি দিলিশাকে৷ ব্যাস, এটাই সত্য। আর কোনো জবাবদিহিতা করার নেই আমার৷ কেউ বিশ্বাস করলে করো, না করলেও আমার কিছু যায় আসে না।”
মারিশা থামতেই ওর কথার ফাঁকটুকু ধরিয়ে দিল দিলিশা, “কিন্তু কীভাবে মাথাতে থাকতে পারে না, মাত্র দশটা মিনিটের ব্যবধানে? সে তো ঠিকই নিরাপদ জায়গায় খুঁজে নিয়েছিল। আর আমার বেলাতে ভুলে গেল? এটা আসলেই বিশ্বাস করছ তোমরা?”
সঙ্গে সঙ্গেই ধমক গলায় বলে উঠল মারিশা, “দশ মিনিট কেন, পাঁচ মিনিটের ব্যবধানেও একটা মানুষ বেখেয়ালি হতেই পারে।”
সব কথা ছাপিয়ে আশফির মনে কেবল এই একটা বাক্যই জোরালোভাবে বিঁধল। তীক্ষ্ণ, সন্দিগ্ধ চোখে চাইলো সে। চকিতেই বলে উঠল, “এমন একটা বিপজ্জনক পরিবেশে কোনো অ্যাডভেঞ্চারার উদাসীন থাকে না, যে সে পাঁচ মিনিটেই বেখেয়ালি হয়ে পড়বে৷ যদি না বড়ো কোনো কারণ থাকে।”
থমকাল মারিশা। কয়েক মুহূর্তের জন্য আশফির সন্দেহপূর্ণ দৃষ্টিজোড়ায় চেয়ে রইল কাতর চাউনিতে। এইতো … এইতো, আশফিও ওকে খুনি ভাবছে! যে ছিল ওর সারাজীবনের শ্রেষ্ঠতম, মহামূল্যবান প্রাপ্তি, সেই মানুষটাও ওকে আজ খুনি বলে সন্দেহ করছে। আর কী বাদ রইল তবে? এখন সারা পৃথিবীই-বা ওকে খুনি ভাবলে কী? একটু একটু করে দুর্বল হতে লাগল ওর সবটুকু মানসিক শক্তি।
কিন্তু সে মুহূর্তে আশফি এটা জানার অপেক্ষায় ছিল, খুব অল্প সময়েই সে বারবার বহু কিছু ভুলে যাচ্ছে কেন? এই সমস্যাটার কারণ কী? তবে সঠিক জবাবটা পেল না।

আশানুরূপ জবাবের বদলে মারিশা নির্লিপ্ত স্বরে তখন বলল, “যে যা ভাবার … ভেবে নিতে পারো।”
শ্রাগ করল আশফির দিকে চেয়ে, “আর্মড পুলিস ফোর্স ডাকবে কেউ? তাও ডাকতে পারো।”
এই বলে সে আর দাঁড়ালও না৷ ঘুরে দাঁড়িয়ে নিজের তাঁবুর দিকে রওনা হলো।
দিলিশা তখন আরও সুযোগ পেয়ে গেল। নিজের অভিযোগকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে উত্তেজিত স্বরে বলতে লাগল, “দেখেছ? দেখেছ সবাই? ওর বিহেভিয়ার, ওর এই বেপরোয়া অ্যাটিটিউড বলে দিচ্ছে না, ও যা করেছে তা সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে করেছে? একটুখানি অনুতাপ, অনুশোচনা দেখতে পাচ্ছ ওর মাঝে? কারণ, ও সত্যিই আমাকে মারার প্ল্যানটা করেছিল। দ্যাট গার্ল’স আ সাইকো কিলার! আই সোয়্যার!”
কথাটা কানে পৌঁছানো মাত্রই মারিশা দাঁড়িয়ে পড়ল, জ্বলন্ত চোখে ফিরে তাকাল অবিলম্বেই৷ দিলিশাকে অপছন্দ হওয়ার কারণটা এ কদিনে টের না পেলেও আজ সে ভালোভাবে বুঝতে পারল, এই মেয়েটার ভেতরটা আসলে মিথ্যা, ছল, অনৈতিকতা, অসৎ আর দূষিত মানসিকতায় দূষণ। দাঁতে দাঁত চেপে সে হুমকি দিয়ে বসল, “আর একবার আমাকে খুনি বলেছ তো, সব থেকে খারাপটা করব তোমার সঙ্গে।”
“একশোবার বলব, হাজারবার বলব”‚ তীব্র চিৎকারে বলল দিলিশা, “একটু আগেও তুমি আরও একবার আমাকে মারতে চেয়েছিলে। মেরেই ফেলতে, যদি না এরা সবাই থাকত।”
সীমা ছাড়া রাগে না চাইলেও মারিশা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল আবার। তেড়ে যাওয়া ভঙ্গিমায় দু’পা এগিয়েও গেল দিলিশার দিকে।

কিন্তু ওর এই অচেনা, নিয়ন্ত্রণহীন রাগ, হিংস্র আচরণে আশফি যতটা অবাক হলো, তার চেয়েও বেশি এবার রেগে গেল৷ ওর এমন মারমুখী আচরণ সে মানতেই পারছে না, দীর্ঘ চার বছর পর ফিরে আসা আদুরে প্রিয় মানুষটাকে খুঁজেই পাচ্ছে না সে এই মারিশার মাঝে৷ এই ব্যক্তিত্বের মারিশাকে সে তো কোনোদিনও ভালোবাসেনি। কেন এমন হয়ে গেল ও? নিজেকে এতটা অমানুষ রূপে কেন বানিয়েছে? তার অসহ্য লাগছে ওর এই রূপকে! ক্ষণিকের আপনতম স্ত্রী হলেও মনটা তো আজও এই মেয়েটাকেই তার জীবনসঙ্গিনী, তার আত্মার সঙ্গী বলেই চিরকালের জন্য দাবি করে৷ কিন্তু সেই মানুষটা আজ তার সম্পূর্ণ বিপরীত এক ব্যক্তিরূপ যেন।

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ১৮

কেবল মারিশার এই পুরোদস্তুর পরিবর্তনটাই ধৈর্যহীন করে তুলল তাকে, রাগিয়ে তুলল বেসামালভাবে। মারিশা এগিয়ে আসার মাঝেই সে হুঙ্কার ছাড়ল, “ওর গায়ে আর একটা আঁচড়ও যেন না পড়ে, মাহি! থেমে যাও ওখানেই৷ নয়তো আমার সব থেকে খারাপটাও আজ দেখবে তুমি।”
কথা দিয়েও নিয়মিত দিতে পারছি না বলে লজ্জায় রিয়্যাক্ট, কমেন্টও চাইলাম না। পড়া শেষে যদি মন চায়, তবে একটুখানি গঠনমূলক মন্তব্য করার চেষ্টা করবেন।

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ২০+২১