Home বুনো মেঘের হাতছানি বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ১৮

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ১৮

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ১৮
ইসরাত জাহান দ্যুতি

“স্টপ দ্য বুলশিট!” চাপা কণ্ঠে ধমকে উঠল দিলিশা৷
মারিশা তখন ভ্রু সামান্য কুঁচকে, ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ একচিলতে হাসি টেনে কৌতূহলী সুরে জিজ্ঞেস করল, “তুমি হঠাৎ করেই আমার সঙ্গে এমন রুড হয়ে গেলে কেন, বলো তো?”
দিলিশার নীরবতার সুযোগ নিয়ে সে চেহারায় এবার কৃত্রিম ভাবনা আনল, আর চোখে বিদ্রূপের ঝিলিক, “শুরুতে তো বেশ সিনসিয়ার অ্যান্ড ফরমাল ছিলে! একদম রাতারাতিই যেন বদলে গেলে! বাই চান্স… তুমি কি এটা জেনে ফেলেছিলে, গতরাতে আশফি কী করেছিল আমার সঙ্গে? আর এর জন্যই কি নিজের স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করলে?”
কথার মাঝখানে ইচ্ছে করেই একটু থামল মারিশা। দিলিশার মুখের প্রতিক্রিয়া পড়ার চেষ্টা করল। তার চোখের চাউনি কঠিন হয়ে উঠেছে, চোয়ালের পেশি টানটান। মেয়েটাকে খেপাতে পেরে আরও বেশি মজা পেল সে। রগড় গলায় বলল, “এটাই যদি রিজন হয়, তোমার কিন্তু আমাকে হেইট না করে আশফিকে হেইট করা উচিত। তোমার জায়গায় আমি হলে এতক্ষণে আশফির মাথার একটা চুলও থাকতে দিতাম না।”

“আর এটাই তোমার আর আমার মাঝে পার্থক্য”, দর্পমিশ্রিত, আত্মবিশ্বাস পূর্ণ কণ্ঠে জবাব দিল দিলিশা, “আমি ওয়েস্টার্ন কালচারে বড়ো হলেও মনেপ্রাণে একজন বাঙালি। আর বাঙালি নারী কখনো স্বামীকে ডিজরেসপেক্ট করতে জানে না। আমি আশফিকে প্রচণ্ড রেসপেক্ট করি, তেমনই তোমার প্রতি ওর ফিলিংসকেও। আর তাই আমি বুঝেছি, ক্ষণিকের দুর্বলতা থেকেই তোমার দিকে সে ঝুঁকে পড়েছিল৷ কিন্তু নিজের ভুলটা বোঝার পরই সে নিশ্চয়ই তোমাকে সরি বলেছে? না বললেও নিশ্চয়ই বলবে। ও যদি তোমাকে আগের মতোই ভালোবাসত, তবে আজ সকাল থেকে কখনোই তোমাকে ইগনোর করত না। আর এই যে জোর করে তোমাকে ধরে আনাটা, এটা স্রেফ ওর দায়িত্ববোধ এবং মানবিকতাবোধ। তোমার জায়গায় যে-কোনো মেয়ে থাকলে তাকেও ও কখনোই এভাবে একা ছাড়তে রাজি হত না।”

কথাগুলোই থমকাতে বাধ্য হলো মারিশা। প্রতিটি কথায় প্রচণ্ড সত্য লাগল ওর। গতরাতে আশফি তো সত্যিই তীব্র আদরগুলোকে ক্ষণিকের দুর্বলতা এবং তা ভুল বলেই স্বীকারোক্তি দিয়েছে ওকে। তাই এ মুহূর্তে সে আরও বেশি বিশ্বাস করতে বাধ্য হলো, দিলিশার সঙ্গে আশফি তবে আসলেই সম্পর্কে রয়েছে। নয়তো এতটা আত্মপ্রত্যয়ীভাবে কথাগুলো কি বলতে পারত মেয়েটা?
দিলিশার ঠোঁটের কোণে এবার যেন তিরস্কারপূর্ণ, আর বিজয়ীর হাসি প্রস্ফুটিত হলো৷ সে এ কদিনে ওদের দুজনকে লক্ষ করে ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে, দুজনের প্রতি দুজনের অগাধ ভালোবাসাটা এখনো জীবিত রয়েছে। কিন্তু তার ওপরে রাগ, ক্ষোভ আর অভিমানের একটা গাঢ় পরত জমে আছে। সেই সাথে আশফির চিরাচরিত অহংবোধের ব্যাপারটা রয়েছেই। এসব মিলিয়েই ওরা যেন নতুন করে দুজন দুজনের কাছাকাছি আসতে পারছে না।
গতকাল রাতে অনেক ভেবেচিন্তে সে এটাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, দুজনের মাঝের এই দ্বন্দগুলোর সুযোগ নিয়েই সে আশফির থেকে মারিশাকে চিরতরে দূরে সরিয়ে দেবে।
ভীষণ শীতল চোখে চেয়ে কটাক্ষের সুরে হঠাৎই প্রশ্নটা করে বসল মারিশা, “কিন্তু বাঙালি নারীরা তো লাজুক ধরনের হয়ে থাকে। বিয়ের আগেই তাহলে উডবিকে স্বামী বলে দাবি করতে পারে তারা?”

তবে দিলিশার জবাবের অপেক্ষা করল না। কণ্ঠে স্পষ্ট বিরক্তি বুঝিয়ে তাকে বলল, “আচ্ছা… যা খুশি বলো, আর যা খুশি করো। বাট গিভ মি সাম প্রিভেসি। আই ডোন্ট কেয়ার অ্যাবাউট ইউ অর ইওর ফিঅনসে।”
মুচকি হাসতে হাসতে মাথাটা সামান্য দুলাল দিলিশা, “জেনে ভালো লাগল।”
তারপর বিভ্রান্ত চাউনিতে আশপাশে দেখতে দেখতে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল মারিশাকে, “তুমি তখন ওয়াশরুমের কাজটা কোথায় গিয়ে সেরেছিলে? আশা করছি, এই হেল্পটা করতে হিংসা করবে না?”
শেষের খোঁচাটাই মেজাজটা একদমই তিক্ত হয়ে উঠল মারিশার। জোরপূর্বক হাসিটার মধ্যে সেই তিক্ততা আড়াল করে বলল, “তোমার লাভলি হাসবেন্ড থাকতে কেন আমার হেল্প নেবে?”
“কারণ, আমি শাই ফিল করছি”, বিরক্ত স্বরে বলল দিলিশা।
বেচারির চাপ বেড়েছে খুব, তা বুঝতে পেরে মারিশা আরও একটু মজা নিতে খোঁচা মারল, “কেমন স্বামী বানালে তাহলে, যে নরমাল একটা ইস্যু প্রকাশ করতেও লজ্জা এখনো?”
খোঁচাটাই চটে গিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল দিলিশা, “তোমার মতো লজ্জাহীন না আমি। তো তোমার বলতে আপত্তি, তাই তো? ও.কে ফাইন, বলতে হবে না।”
“বলতে আপত্তি করব কেন?” হালকা হেসে বলল মারিশা, “ওই যে, বড় পাথরের স্তূপটা দেখছ? ওটার আড়ালে যাও।”

দিলিশা অবশ্য মারিশার নির্দেশের তোয়াক্কা করল না। কিন্তু তাঁবুর পেছনের ওই বিশাল পাথরের স্তূপ, ওটা তার চোখে নিরাপদ আশ্রয় বলেই মনে হলো। দ্রুত পা ফেলতে ফেলতে সে তাঁবুর আড়াল ঘুরে পাথরের ঢাল বরাবর সামান্য নিচে নামল।
হিমালয়ের রাত তখন ভয়ংকরভাবে চুপচাপ। ঠান্ডা বাতাস যেন পাথরের গায়ে আছড়ে পড়ে শিস দিচ্ছিল, যেন অদৃশ্য কেউ ফিসফিস করে সাবধান করে দিচ্ছে। সে জানল না, ঠিক এই জায়গাটাই টি-হাউস আর গভীর বনের মাঝখানে থাকা এক অপ্রকাশিত বন্যপ্রাণীর করিডোর, যেখানে মানুষের ভুল পা মানেই মৃত্যু কয়েক ফুট দূরে। কারণ, আশফির কড়া সতর্কতার সময় সে ফোনকলে ব্যস্ত ছিল।
দাঁড়িয়ে সবে প্যান্টের মেটাল বোতামটা খুলতে শুরু করেছে দিলিশা, ঠিক তখনই পেছনে একটা চাপা, অথচ ভারী নিঃশ্বাসের আওয়াজ শুনল মনে হলো। ভ্রুজোড়া সামান্য বেঁকে গেল তার, ভাবল, “মানুষের নিঃশ্বাস কি এমন হয়?”
এটুকু ভাবতেই হাতটা জমে গেল যেন … বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটাও যেন এক লাফে গলায় উঠে এল …. আর মেরুদণ্ড বেয়ে বরফশীতল একটা স্রোত যেন নেমে গেল শরীরের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত। নড়তে পারল না একদম, নিঃশ্বাসটুকু নিতেও সে ভয় পেল।

খুবই ধীরে সে ঘাড়টা পেছনে ফেরাল। তারপর চাঁদের আবছা আলোয় যা দেখল, তা কোনো দুঃস্বপ্ন নয়, বরং তার থেকেও ভয়ংকর মনে হলো তার।
একটা বিশাল হিমালয়ান কালো ভালুক, পাথরের স্তূপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসেছে। কালো লোমে ঢাকা তার শরীর অন্ধকারে মিশে গেলেও ঠান্ডা, হিংস্র চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। প্রাণীটা দিলিশার থেকে মাত্র কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছে। এই ঢাল বেয়েই সে নামছিল, কিন্তু তখনই হঠাৎ মানুষের নড়াচড়া ওকে চমকে দেয়।
এরা সাধারণত অকারণে বা শুধু মানুষ দেখলেই আক্রমণ করে না। কিন্তু চলার পথে বাধা দিলে তখন ওরা নিজেকে অরক্ষিত মনে করে এবং আত্মরক্ষার জন্যই আক্রমণ করে বসে। আর দিলিশা খুব কাছ থেকে ভালুকটাকে চমকে দিয়েছে, যা ভালুকটার কাছে নিজের ব্যক্তিগত জায়গায় অনুপ্রবেশ বলে মনে হয়েছে।
মাত্র দু সেকেন্ড। তারপরই ভালুকটা ভারী থাবা মাটিতে ফেলে এক পা এগিয়ে এল। সেই মুহূর্তেই দিলিশার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল এক ভয়ংকর শব্দ … চারপাশ ছিন্নভিন্ন করা পশুর মতো এক তীক্ষ্ণ চিৎকার … প্রাণ বাঁচানোর করুণ আর্তনাদ। সেই আর্তনাদ হিমালয়ের গভীর নীরবতাকে চুরমার করে দিল।

ফায়ারক্যাম্পটা তৈরি করে মাত্রই আগুন ধরানোর বন্দোবস্ত করছিল আশফি। এত ওপরে শুকনো কাঠ পাওয়া অসম্ভব, তাই ফুয়েল ট্যাবলেট আর শুকনো ঝোপঝাড়ের শিকড় ব্যবহার করছিল আগুন ধরানোর জন্য। সেই মুহূর্তে উপত্যকার স্তব্ধতা খান খান করে দিলিশার কর্কশ, গলা-ফাটা চিৎকারটা কানে পৌঁছাল সবার। চমকে উঠে শরীরটা তখন এক ঝটকায় সোজা হয়ে গেল আশফির। বাকিরাও আঁতকে উঠে সেখানেই জমে গেল এক মুহূর্তের জন্য।
তবে এই বিস্ময়ের স্থায়িত্ব এক সেকেন্ডেরও বেশি রইল না। সকলের অভিজ্ঞ মন এক নিমিষে পরিস্থিতি বুঝে নিল, চিৎকারটা দিলিশার। আর এত উচ্চতার নির্জন প্রান্তে তার এমন চিৎকার কেবল একটা বিপদকেই বোঝায়, বন্য শিকারী! হিমালয়ান ভালুক, নয়তো চিতা।
আশফির পেশীগুলো মুহূর্তেই টানটান হয়ে এল। ভাবনার কোনো অবকাশ ছিল না। হাতে ধরা শিকড়গুলো ফেলেই সবার আগে সে-ই ছুটল চিৎকারের উৎসটাকে অনুসরণ করে। তার ট্রেকিং বুটগুলো পাথুরে জমিতে শব্দ করে উঠল। পকেট থেকে বিদ্যুৎ গতিতে বের করে নিল ট্রেকিং হর্ণ।
মারিশাও দিলিশার জন্য আতঙ্কিত হয়ে তাঁবু থেকে বেরিয়ে পড়েছে। ছোটার মুহূর্তে আশফি তা দেখেই কঠোর স্বরে চেঁচিয়ে উঠে ওকে নির্দেশ দিল, “একদম নড়বে না! ভেতরে যাও!”
প্রচণ্ড ভয়ে মারিশা সত্যিই নড়তে পারল না। ততক্ষণে পরাগ, সৌভিক, হৃদয় আর দিব্যও হাতে ট্রেকিং হর্ণটা নিয়ে ছুটতে শুরু করেছে।

পাথরের ভাঁজে পৌঁছাতেই দৃশ্যটা আশফির সমস্ত রক্ত ঠান্ডা করে দিল যেন। বিশাল কালো ভালুকটা তখন দু’পায়ে উঠে দাঁড়িয়েছে, ভারী শরীরটা সামনের দিকে ঝুঁকে আছে। থাবা দুটো তুলে আছে আক্রমণের ভঙ্গিতে, আর ওর তীক্ষ্ণ, বক্র নখগুলো চাঁদের আলোয় এমনভাবে ঝিলমিল করছে, যেন ধার দেওয়া অস্ত্র। রাতের অন্ধকার ফুঁড়ে আসা প্রাণীটাকে দেখে মনে হলো যেন তা পাথর আর ছায়ার তৈরি।
দিলিশা পাথরের গায়ে লেপটে আছে। চোখ খোলা, অথচ দৃষ্টি শূন্য। তার সমস্ত চেতনা যেন ভয়ের ভারে জমাট বেঁধে গেছে।
আশফি আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। ভালুকটা শ্বাসরুদ্ধকর, চাপা গর্জন শুরু করতেই সে তার জ্বলজ্বলে চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে হর্ণের লিভার চেপে ধরল।
তার পরের মুহূর্ত ছিল কেবলই বিশৃঙ্খলা। হৃদয়রাও একই সময়েই লিভার চেপে ধরল। তাতে এক ভয়ংকর, ধাতব শব্দ উপত্যকায় আছড়ে পড়ল, এত তীব্র যে মনে হলো কানের পর্দা ফেটে যাবে। পাহাড়ের বুক কেঁপে উঠল, আর সেই কর্কশ শব্দের প্রতিধ্বনি দিক-দিগন্তে ছুটল।
ভালুকটা তখন তীব্রভাবে চমকে উঠল। এত কাছ থেকে, এত উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির শব্দের জন্য সে প্রস্তুত ছিল না। তার আক্রমণ থামিয়ে দিল … এই আকস্মিক, অস্বাভাবিক শব্দ তার শিকারের প্রবৃত্তি ভেঙে দিল। মাথা ঘুরিয়ে বিভ্রান্তিতে কান খাড়া করল, আর ঠিক সেই বিভ্রান্তির ছেদবিন্দুতেই বেহিসাবি আশফি তার জীবন বাজি রাখল আজ আরও একবার।

“দি–লি–শা! রান! নাউ! টু দ্য টেন্ট!” হর্ণের তীব্রতা ছাপিয়ে ওর আদেশ দিলিশার কানে প্রবেশ করল।
তখন সে যেন মৃত্যুর হাত থেকে ছিনিয়ে নেওয়া প্রাণ নিয়ে এক লাফে, অমানুষিক গতিতে দৌড় লাগাল তাঁবুর দিকে।
আশফি হর্ণটা মাটিতে ফেলে দিল। তারপর দ্রুত একটা বড়ো শিলাখণ্ড তুলে নিল। ওর ভেতরে মোটেও কোনো আদিম ক্রোধ কাজ করছিল না। ভালুকটাকে হত্যার এক বিন্দুও ইচ্ছা নেই ওর। কেবল ভয় দেখাতেই সে পাথরটা ছুড়ে মারল। এমনভাবেই ছুড়ল যে, সেটা ভালুকের শরীর লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে তার পাশেই মাটিতে প্রচণ্ড শব্দ করে আছড়ে পড়ল।
এইটুকুই যথেষ্ট। ভালুকটা আর ঝুঁকি নিল না। সে দ্রুত তার ভারী শরীর নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল, এবং পাথুরে ঢাল বেয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। তার চলে যাওয়ার পর কেবল রয়ে গেল ভয়, রয়ে গেল বুনো গন্ধ, আর হিমালয়ের বাতাসে লেগে থাকা মৃত্যুর দীর্ঘ, ঠান্ডা এক অপার্থিব স্পর্শ।
এদিকে, দিলিশা যখন হাঁপাতে হাঁপাতে তাঁবুর দিকে পৌঁছাল, তার প্রথম দৃষ্টি পড়ল মারিশার উপর। সে ভয়ে কাঁপছিল, কিন্তু ওকে দেখা মাত্রই চোখে রাগ, ঘৃণা আর অভিযোগের তীব্র আগুন জ্বলে উঠল যেন। কান্না জুড়ে চিৎকার করে উঠল, “তুমি! তুমিই আমাকে ওখানে পাঠিয়েছ! তুমি জানতে না, ওটা বন্যপ্রাণীর বিচরণ পথ? তবু তুমি যেতে দিয়েছ! যার মানে তুমি চেয়েছিলে আমার কিছু হোক … আমি মরে যাই … তোমার রাস্তা পরিষ্কার হোক! কতটা নির্দয়, জঘন্য মানুষ তুমি!”

মারিশা যেন হতভম্ব​। এ অভিযোগের আকস্মিকতায় বিমূঢ় হয়ে পড়ল সে। বুঝতে পারল না, কীভাবে ওর দেওয়া একটা সাধারণ নির্দেশনা এমন ভয়ঙ্কর পরিণতি আনতে পারে। ওর তো উদ্দেশ্য ছিল শুধু দিলিশাকে টি-হাউসের মূল ভিড় থেকে দূরে একটা নিরিবিলি জায়গা দেখানো।
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সে ভুলে গিয়েছিল যে, আশফি নিজেই বলেছিল সেই বিশাল পাথরের স্তূপের ঢাল বরাবর পথটা বন্যপ্রাণীর অপ্রচলিত বিচরণ পথ। তাছাড়া তখন দুজনের রেষারেষির কারণেই সে সচেতনভাবে স্থানটা নির্বাচন করতে পারেনি। যে কারণে অজান্তেই দিলিশাকে সে ঠেলে দিয়েছিল ঝুঁকিপূর্ণ পথে।
ব্যাপারটা ধীরে ধীরে পরিষ্কার হলো মারিশার কাছে। নিমিষেই প্রচণ্ড অপরাধবোধ ফুটে উঠল ওর চোখে। মাথাটা মৃদু নাড়াতে নাড়াতে দিলিশার অভিযোগকে নাকচ করে ক্ষীণস্বরে বলল, “ভুল বুঝছ, দিলিশা। আমি তোমার কোনো ক্ষতিই চাইনি।”

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ১৭

কিন্তু দিলিশা তা বিশ্বাসই করল না। সে একইভাবেই চিৎকার করে বলল, “মিথ্যে বলবে না এখন। তুমি ইচ্ছে করেই আমাকে ওখানে পাঠিয়েছিলে, অমানুষ একটা!”
তার কান্নাকাটি আর চিৎকার ধ্বনি শুনেই আশফি আর পরাগরা আবার দ্রুত ছুটে এল। আশফিকে দেখা মাত্রই দিলিশা আকুল হয়ে কেঁদে উঠল। ওর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়েই মারিশার প্রতি সমস্ত অভিযোগ উগড়ে দিল৷
কিন্তু অভিযোগটা শুনে আশফিকে যতখানি বিস্মিত দেখাল, ততখানিই ওর চোখে খেলে গেল অবিশ্বাসও। দিলিশাকে আগলে রেখেই সে প্রশ্ন চোখে চাইল মারিশার দিকে। বিস্ময় সুরে বলে উঠল, “মাহি, তুমি… সত্যিই বলেছিলে ওকে?”

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ১৯