Home বুনো মেঘের হাতছানি বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ১৭

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ১৭

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ১৭
ইসরাত জাহান দ্যুতি

লো ক্যাম্পের ঝরনার শীতলতার ধাক্কা সামলে দুপুর দুইটা নাগাদ ওরা সকলে হাই ক্যাম্পের দিকে যাত্রা শুরু করল।
এখন ওদের সামনে ৬৫০ মিটার উল্লম্ব চড়াই। সংখ্যায় ছোটো হলেও বাস্তবে এটা যেন এক দুর্ভেদ্য দেয়াল। এই ৬৫০ মিটার পথটাই ট্রেকিংয়ের সবচেয়ে কঠিন অংশ। তাই এখানে শুধু পা নয়, মনের জোরও প্রয়োজন।
প্রথম এক ঘণ্টা পথ চলল ঘন রডোডেনড্রন বনের মধ্য দিয়ে। এটা ছিল লালিগুরাসের শেষ সাম্রাজ্য। যদিও ফুল ফোটার আসল সময় চলে গেছে, তবুও বসন্তের শেষ বেলায় কয়েকটি গোলাপি, হালকা লাল এবং সাদা ফুল পথের ধারে সাহস করে উঁকি দিচ্ছিল, যেন তারা বিদায়ী অভিবাদন জানাচ্ছে। বনের মেঝে ছিল ভেজা এবং পাতাঝরা ডালে ঢাকা, আর পথটা ক্রমশ খাড়া হয়ে উঠেছে। ফলে প্রতিটি ধাপে পা ফেলার জন্য আগের চেয়ে দ্বিগুণ শক্তি খরচ হচ্ছিল ওদের। পাথর আর শিকড়ের ওপর দিয়ে যখন ওরা প্রথম ধাপটা ফেলল, তখনই যেন প্রকৃতির কঠোরতা অনুভূত হলো। নিছক হেঁটে যাওয়া নয়, যেন পাহাড়ের বিরুদ্ধে এক নিরন্তর যুদ্ধ করছে ওরা।
কেবল আশফি আর সৌভিককে দেখাল বেশ দৃঢ়। খুব একটা কষ্টের ছাপ ওদের মুখে নেই৷ মানসিক দৃঢ়তা যেমন অনেক বেশি, তেমনই ওরা অনেকটাই অভ্যস্ত পাহাড়ের এমন চড়াই অতিক্রম করে। মারিশাও ছিল একটা সময়। কিন্তু তা বছর চারেক পেছনের কথা।

রুটটা টি-হাউসের মূল, প্রশস্ত পথ থেকে সামান্য সরে গিয়ে পাহাড়ের খাড়া ঢালুর গা ঘেঁষে উপরে উঠেছে। এই পথের বৈশিষ্ট্য হলো এর অগাধ নীরবতা। গাছেরাও এখানে যেন নিশ্চুপ। ট্রেকারদের আনাগোনা কম হওয়ায় নির্জনতা এখানে গভীর, যেটা বন্যপ্রাণীর উপস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছিল। কোথাও পাথরের ঢাল, কোথাও ঘন ঝোপের আড়ালে নরম মাটি। ট্রেকিং পোল ছাড়া এই পথে ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন। কারণ, সামান্য ভুল মানেই একপাশের গভীর খাদে গিয়ে পড়া।
হাঁটতে হাঁটতে পেছন ফিরে একবার তাকাল আশফি। প্রতি দশ কদম হাঁটার পর দীর্ঘশ্বাস নিতে হচ্ছে বাকিদেরকে, যেন দেহের ভেতরের সমস্ত বাতাস জোর করে বাইরে টেনে আনতে হচ্ছে।
অক্সিজেনের অভাব ততক্ষণে ভালোভাবেই টের পাচ্ছিল মারিশা। হৃদস্পন্দন বেড়ে গেছে ওর, ফুসফুসটা যেন অতিরিক্ত বাতাস দাবি করছে। আসলে এতটাই খাড়া যে, কিছু জায়গায় মনে হচ্ছিল ওরা যেন হামাগুড়ি দিয়ে উপরে উঠছে।

মারিশাকে একটু আলাদাভাবেই লক্ষ করল আশফি। মুখটা লাল হয়ে উঠেছে, কষ্টটা তীব্রভাবে ফুটে উঠেছে ওর চেহারায়। স্থির পলকে কয়েক মুহূর্ত দেখার পর হঠাৎ একবার থামল সে, থামল অবশ্য মারিশার জন্যই। তবে সবাইকেই দাঁড়াতে বলে সে শিক্ষকের মতো উপদেশ দিল, “বাতাস কিন্তু এখন পাতলা হবে। তাড়াহুড়ো করলে দম ফুরিয়ে যাবে, আর তখন অ্যাকিউট মাউন্টেন সিকনেস শুরু হতে পারে। প্রতি এক ঘণ্টা পর পর আমরা পাঁচ মিনিটের জন্য থামব, ও.কে?”
উপদেশটা কানে তুলেই মারিশা আর দাঁড়াল না। ট্রেকিং পোল শক্ত করে ধরে আগের মতোই হাঁটতে শুরু করল সে। এই উল্লম্ব আরোহণে শারীরিক শক্তি দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল ওর। পেশীগুলোতে টান ধরছিল, কিন্তু চোখের সামনে মাছাপুছরের ক্রমবর্ধমান বিশালতা আর চূড়ার হাতছানিই যে ওকে থামতে দিচ্ছিল না।
প্রতিটি মোড় ঘোরার পর সবাই শুধু দেখছিল, পথ আরও উপরে উঠে গেছে, যেন এই চড়াইয়ের কোনো শেষই নেই।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করে নিজের পাশে আশফির উপস্থিতি পেল মারিশা। ফিরে তাকানোর আগেই গম্ভীর গলায় শুনতে পেল তার কণ্ঠ, “মাথা উঁচু করে শ্বাসটা নিতে হবে গভীরে। পা ফেলতে হবে ছোটো ছোটো করে, কিন্তু শরীরের ভারসাম্য থাকতে হবে পোলের ওপর।”

চোখে-মুখে রাজ্যের রাগ আর বিরক্তি দেখা গেল মারিশার, “তো আমি কি এসব জানি না? এত অ্যাডভাইজ চেয়েছে কে তোমার কাছে?”
বাঁকা চোখে তাকাল আশফি, “হুহ্! জানার তো কোনো নমুনাই দেখছি না।”
বলেই নিজের মতো ধীর, স্থিরভাবে হাঁটতে লাগল সে।
পাথর আর শিকড়ের ওপর দিয়ে যখন ওরা ধাপ ফেলতে শুরু করল, তখনই বোঝা গেল ৬৫০ মিটার উল্লম্ব পথ আরও কতটা কষ্টদায়ক। মারিশা হাঁপাতে হাঁপাতে একবার থামতে চাইল, আশফি তখন ওকে পাশ কেটে যেতে যেতে উচ্চ কণ্ঠেই বলে উঠল, অনেকটা তাচ্ছিল্যের সুরে, “ক্লাইম্বার হওয়া এতই সোজা?”
যেন কথাটা সে সবাইকেই বলল, অথচ মারিশা জানে, এই টিটকারিটা কেবল ওর জন্যই ছিল৷ তাই কষ্ট হলেও আর থামল না৷ বরং এবার সে আশফিকে অনুসরণ করেই প্রতিটি ধাপ ফেলতে লাগল তার মতোই তাড়াহুড়ো ছাড়া, ছোটো ছোটো পদক্ষেপে।

একসময় রডোডেনড্রনের জঙ্গল পুরোপুরি শেষ হয়ে গেল। গাছগুলো আর বিশাল মহীরুহের মতো নয় এখানে। তাদের আকার ক্রমশ ছোটো হতে হতে এখন তারা ঝোপের মতো বেঁটে হয়ে গেছে। এত উঁচুতে মাটির গভীরতা কম হওয়ায় গাছপালা উপরে বাড়তে পারেনি, বরং অনুভূমিকভাবে নিজেদের বিস্তার করেছে।
চারপাশে শুধু পাথরের স্তূপ, ক্ষয়প্রাপ্ত শিলা, আর পাহাড়ি ঘাস। পথের ধারে কিছু শক্তপোক্ত গুল্ম আর খর্বাকৃতির বাঁশঝোপ চোখে পড়ছিল। নিচু নিচু এই শক্ত গুল্ম এবং কাঁটাওয়ালা উদ্ভিদ ছাড়া আর কোনো গাছই নেই। এই পরিবর্তনই বলে দিচ্ছিল, ওরা এবার ট্রি-লাইন পার করতে চলেছে।
রডোডেনড্রনের সাম্রাজ্য পেরিয়ে ট্রি-লাইন পার হতেই প্রকৃতি যেন তার সমস্ত সবুজ আবরণ সরিয়ে নিল। শুরু হলো দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ঘণ্টার কঠিন আরোহণ। এবার শুধুই পাথর আর হিমেল আকাশের এলাকা।
​এখন ট্রেকিং রুটটা পাহাড়ের উন্মুক্ত গা বেয়ে উঠেছে। পথের দু’পাশে আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পাথরের স্তূপ, হিমবাহের ঘর্ষণে তৈরি হওয়া বিশাল বিশাণ বোল্ডার, এবং যুগ যুগ ধরে ক্ষয়প্রাপ্ত শিলা। শিলাগুলোর রং ধূসর আর গাঢ় কালো, যা কোটি বছরের পুরনো এই অঞ্চলের আদিমতা আর স্থিরতা প্রকাশ করত। ওদেরকে হাঁটতে হচ্ছে এই অসমতল পাথরের ওপর দিয়ে, যেখানে সামান্য ভুল পদক্ষেপেই গোড়ালি মচকে যেতে পারে।
​এখানে আর কোনো গাছের অস্তিত্ব নেই। পথটা পুরোপুরি উন্মুক্ত ছিল, ফলে বাতাস আরও বেশি হিমেল এবং তীব্র। খোলা প্রান্তরে বাতাস কোনো বাধা না পেয়ে যেন সরাসরি শরীরের ভেতর ছুরি বসাচ্ছিল, বিশেষত মুখের অনাবৃত ত্বকে। বাতাসের অবিরাম শোঁ শোঁ শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দই নেই। বাতাসের এই তীক্ষ্ণ শব্দই অন্য সব শব্দকে গ্রাস করছে।

শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য ওদেরকে আরও বেশি মনোযোগ দিতে হচ্ছিল। আশফি বারবার গভীরভাবে নিঃশ্বাস নিচ্ছে, আর কেবল মারিশার জন্যই এ উপদেশটাও দিচ্ছে বারবারই। কারণ, অক্সিজেনের অভাবই এই পথে সবচেয়ে বড়ো শত্রু।
পেছনে না ফিরেই সে চলতে চলতে হঠাৎ সবাইকে জানাল, “এই নির্জন পাথুরে অঞ্চলটাই বন্যপ্রাণীর জন্য আদর্শ পথ। সন্ধ্যা নামার সময় বরেলিমুখী কিছু বন্যপ্রাণী লাইক হিমালয়ান ভালুক বা চিতাবাঘের দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।”
মারিশা ওর পিছু পিছুই ছিল। ভ্রু কুঁচকে সে হঠাৎ জিজ্ঞেস করে উঠল, “এটার মানে কী?”
এক মুহূর্তের জন্য ফিরে তাকাল আশফি, “কোনটার মানে কী?”
“এই যে, যেটা বললে…”, কিছুটা বিভ্রান্ত সুরে বলল মারিশা, “ব–রে–লিমুখী! এমনই কিছু তো বললে মনে হয়। আগে কখনো শুনিনি ওয়ার্ডটা।”
“আমিও, আমিও….” পেছন থেকে কৌতুক গলায় বলে উঠল হৃদয়, “আমিও শুনিনি। এটার মানে কী গো, আনজার ভাই?”
বন্ধুর মশকরাকে পাত্তা না দিয়ে আশফি নির্লিপ্ত স্বরে জানাল মারিশাকে, “দিনের শেষে উঁচু অঞ্চলের নির্জনতা ব্যবহার করে বা বিচরণ করে যেসব প্রাণী, সেটাকে বলেছি বরেলিমুখী।”
কথাটা বলেই সে পকেটে তার ট্রেকিং হর্ণটা প্রস্তুত রাখল। সতর্কতার সঙ্গে চারপাশের বুনো শব্দগুলোর প্রতি মনোযোগ দিয়ে এগিয়ে চলল সামনে।
এরপর খুব একটা কথাবার্তা হলো না ওদের মাঝে। কেবল চুপচাপ, সাবধানী পদক্ষেপে পথটা শেষ করার তাগিদ সকলের মাঝে।

হাঁটতে হাঁটতে একটা সময় হৃদয় আর দিব্যর বদলে হঠাৎ দিলিশাকে নিজের পাশে পেল মারিশা। তাকে দেখে ঠোঁটে সৌজন্যসূচক আলতো হাসিটা টানল সে। দিলিশাও বিনিয়মে একটুখানি হাসি ফিরিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপই চলতে লাগল ওর পাশাপাশি। এরপর মৌনতা ভঙ্গ করল তখন, যখন মারিশা পরাগ আর সৌভিকের দিকে এগোচ্ছিল। আসলে দিলিশার প্রতি রাগ বা ক্ষোভ না থাকলেও মেয়েটাকে সে কোনোভাবেই পছন্দ করতে পারছে না।
যেটা দিলিশাও টের পেয়েছে বলেই সে আচমকা কটাক্ষ ভরা হাসিতে বলে বসল, “কোনো এক্সই বোধ হয় প্রেমিকের প্রেজেন্টকে সহ্য করতে পারে না, তাই না?”
প্রশ্নটা কানে বাজতেই ঘাড়টা আলগোছে ঘোরাল মারিশা, সরু চোখে চাইল তার দিকে। এক পল স্থির চেয়ে তাকে দেখার পর শান্ত সুরেই পালটা জিজ্ঞেস করল, “এক্স কে, আর প্রেজেন্ট কে? প্রেমিকটাই বা কে?”

“এমা! আমি ভেবেছিলাম, তুমি খুব স্ট্রেইটফরোয়ার্ড স্বভাবের মানুষ”‚ হাসতে হাসতেই দিলিশা কটাক্ষটা করল, “ভুল ভেবেছিলাম বোধ হয়? আমি কিন্তু ভীষণ স্পষ্টবাদী। একদম আশফির মতোই৷”
“তাই?” সামনে, আশফির দিকে একবার তাকাল মারিশা। দিব্য আর হৃদয়ের সঙ্গে কথাবার্তা চালাচ্ছে সে।
দেখা শেষে নির্বিকার দৃষ্টিজোড়া ফেরাল দিলিশার দিকে। তারপর হঠাৎ মুচকি হেসে জবাবে বলল, “তোমরা তো ভাই-বোন৷ একই রক্ত৷ স্বভাব তো একটু আধটু এক হবেই।”
মুহূর্তেই হাসি মুখটাই গম্ভীরতা ধারণ করল দিলিশার। কথাটার মধ্যে প্রচ্ছন্ন বিদ্রূপটা টের পেল সে৷ এতগুলো ঘন্টা কষ্টের সঙ্গে সামলে রাখা মেজাজের লাগামটা তার এবার ছুটেই গেল। বিষ ঝরা এক চাউনিতে তাকাল সে মারিশার দিকে… খুব অধিকার পূর্ণ কণ্ঠে অকপটে জানাল, “সেই সম্পর্কটা দ্রুতই বদলে যাচ্ছে, ঠিক আছে? আশফির সঙ্গে এখন আমার সম্পর্কটা শুধু কাজিনই নয়, উই আর গেটিং ম্যারিড সুন৷ বাবা আর কাকু সব কিছু পাকাপাকি করে ফেলেছে। জেনে একটু চমকাবে বা কষ্ট পাবে হয়তো। তবুও বলি, এখান থেকে ফেরার পরই আমাদের এঙ্গেজমেন্ট হয়ে যাবে, আর তার এক মাসের মাঝেই বিয়ের ডেটও ফাইনাল৷ এই সারপ্রাইজটা দিতেই আমার এখানে আসা।”
বুকের মধ্যেখানে যেন সহস্রাধিক বিষাক্ত তিরের ফলা এসে বিঁধল মারিশার… নিঃশ্বাসটা আটকে রইল গলাতে। দিলিশের দিকে বিমূঢ় বেশে চেয়েই রইল সে কতক পল। তার মানে দিব্যর কোনো কথায় ভুল ছিল না? আর ওদের গতরাতের মুহূর্তটুকু! সেটা বুঝি ক্ষণিকের মোহে ডুবে গিয়েই ওকে কাছে টেনেছিল আশফি? ওর জন্য সত্যিই তবে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই আশফির হৃদয়ে?

এই সত্যিটা তো সে মেনে নিয়ে নিজেকে শক্ত করার চেষ্টা করছিলই। তবু যেন দিলিশার মুখ থেকে কথাগুলো জানার পর বুকের মধ্যের দুর্দমনীয় যন্ত্রণাটা সামাল দিতে পারছে না একটুও।
ঠিক এমন সময়েই দিলিশা আবারও সেই উদ্ধত, কঠিন স্বরে বলে উঠল, “আমি তোমাকে খুব একটা জানি না, চিনিও না। কিন্তু গত দুদিনে তোমাকে অবজার্ভ করে যতটুকু বুঝেছি, তুমি দৃঢ় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মেয়ে। আর তাছাড়া তুমি তোমার হোমল্যান্ডে একটা ওয়েল সেটেল্ড ফ্যামিলিতে বিলং করো। শুনেছি, তুমি নিজেও একজন স্ট্যাবলিশড বিজনেস উইম্যান। তাহলে কী কারণে তুমি দীর্ঘ চার বছর পর সেই সম্পর্ককে জোড়া লাগাতে ছুটে এসেছ, যে সম্পর্ক তুমি নিজে হাতে ছিন্ন করে দিয়ে গিয়েছিলে? আর… আর কীভাবেই-বা আশা করো, সবটা ভুলে আশফি তোমাকে আগের মতোই অ্যাকসেপ্ট করে নেবে? কেবল ও টিপিকাল এক বাঙালি ছেলে বলেই ভেবে নিয়েছ, ওকে তুমি যে কষ্টটা দিয়ে গেছ, যেভাবে অপমান করেছ, সেসব ও কিছুই মনে রাখবে না তোমাকে আবার পেয়ে?”
উত্তরে মারিশা নীরবতা ছাড়া আর কিছুই দিতে পারল না। সেই সুযোগেই দিলিশা আরও মরিয়াভাবে ছুড়ল তার তীক্ষ্ণ বাক্যগুলো, “তুমি যখন চলে গিয়েছিলে, সেই সময়গুলোতে ও কতটা এলোমেলো হয়ে পড়েছিল, অ্যাডভেঞ্চারে বেরিয়ে কতবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছিল, সেসব কি তুমি জানো? ওর খারাপ সময়গুলোতে আমি সব সময় ওর পাশে থেকেছি, ওকে মানসিকভাবে প্রতিটা মুহূর্ত সঙ্গ দিয়েছি। আর আজ যখন ও মুভ অন করে নিয়েছে, তখন তুমি ফিরে এসেছ নতুন করে ওর পুরনো কষ্টগুলো জাগিয়ে তুলতে!”

“যথেষ্ট বলেছ, দিলিশা!” নিচু স্বরটাই যেন ধমক সুরে বেজে উঠল মারিশার।
প্রলম্বিত একটা শ্বাস টেনে নিয়ে সে কঠিন গলায় বলল, “দিশান যদি আমাকে একবারও বলত তোমার বিষয়ে, তাহলে আমি কখনোই আশফির সামনেও আসতাম না। এমনকি গতকাল রাতেও যখন আশফি আমার সঙ্গে…”
অস্বস্তি আর কষ্টে থেমে গেল মারিশা। কথাটুকু অসমাপ্ত রেখে সে রুক্ষ গলাতে বলল, “আমাদের মাঝে নতুন করে তৈরি হচ্ছে না কিছুই। আমি চলে যাব কালই। তবে তোমার উচিত, তোমার উডবির মোরালিটি যাচাই করা, অথবা চোখে চোখে রাখা, যেন যখন তখন এক্সের প্রতি উইক হয়ে তার কাছে আসার চেষ্টা না করে।”
আশফির পক্ষে সাফাই গেয়ে নির্দেশ গলায় বলল দিলিশা, “এক্সের প্রতি উইকনেস থাকতেই পারে। কিন্তু এক্সের উচিত নিজেকে সামলে রাখা, এবং নিজের কাছে আসার মতো সুযোগটা না দেয়া।”
অদৃশ্য রাগ, প্রচণ্ড কষ্ট আর অপমানে মারিশার পুতুল পুতুল মুখটা সহসাই কঠোর হয়ে উঠল৷ আর একটা কথা শুনতেও মন চাইল না, বলতেও মন চাইল না ওর৷ চুপচাপ এগিয়ে গেল সামনে, হৃদয়দের কাছে।
দীর্ঘ তিন ঘণ্টার অবিরাম চড়াই শেষে যখন বিকেল গড়িয়ে শেষ আলোটুকু প্রায় ম্লান, তখন ওরা হাই ক্যাম্পে পৌঁছাল। এই ক্যাম্পটা একটি সংকীর্ণ শৈলশিরার ওপরে অবস্থিত। দুই পাশে খাড়া ঢালু হয়ে নিচে নেমে গেছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় এটা বুঝি মেঘের রাজ্যে ভাসমান একটি ছোট্ট গ্রাম। এখানে বাতাস আরও ধারাল, কানের পাশ দিয়ে শোঁ শোঁ করে বেরিয়ে যাচ্ছে।

তাপমাত্রা দ্রুত হিমাঙ্কের দিকে নেমে যাচ্ছিল, আর ওদের নিশ্বাসের ধোঁয়া যেন দ্রুত জমাট বেঁধে বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছিল। এখানে হাতেগোনা কয়েকটা টি-হাউস আছে। প্রায় একইরকম দেখতে, কাঠের তৈরি।
অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদটা পরিপূর্ণ পেতে ​ভিড় থেকে দূরেই থাকতে চাইছিল আশফির দলটা। তাই টি-হাউসগুলো থেকে প্রায় ৫০ মিটার দূরে, পাহাড়ের একটা অপ্রচলিত শৈলশিরার ভাঁজে জায়গা খুঁজে নিল। স্থানটা খুবই নির্জন, যেন কোনো গোপন শিবির। এই জায়গাটা একদিকে বিশাল একটা পাথরের স্তূপ দ্বারা সুরক্ষিত, যেটা দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে আসা তীব্র হাওয়ার গতি কমিয়ে দিচ্ছিল। তবে স্থানটা যথেষ্ট প্রশস্ত। সহজেই পাঁচটা তাঁবু খাটানো সম্ভব। যদিও এটা নির্জন, কিন্তু তবুও এই ঢালু পথটাই হলো বন্যপ্রাণীর বিচরণ পথ। অবশ্য জেনেশুনেই এমন ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাটাই বাছাই করেছে ওরা৷ তবে তার আগে আশফি মারিশা আর দিলিশাকে বেশ কবার বুঝিয়েছিল, যেন ওরা দুজন টি-হাউসে গিয়ে থাকে। কিন্তু তাতে মোটেও রাজি হয়নি দিলিশা।
আর মারিশা জবাবে থমথমে গলায় বলেছিল, “আমাকে নিয়ে কাউকে ভাবতে হবে না। আমি একেবারেই আলাদাভাবে ট্যুরটা শেষ করতে চাই। তোমরা তোমাদের মতো যেখানে ইচ্ছে সেখানে ক্যাম্পিং করতে পারো৷ আমি আর যাচ্ছি না তোমাদের সঙ্গে।”

তবে কথাগুলো শেষ করা মাত্র যেই না মারিশা অচেনা কিছু পর্যটকদের দিকে পা বাড়াল, অমনি আশফি ছুটে এসেই খপ করে ওর কব্জিটা চেপে ধরল, আর মস্ত এক ধমক বসিয়ে দু্টো বাঁকা কথা শুনিয়ে দিল।
কিন্তু তবুও মারিশা কোনোভাবেই আর থাকতে চাইছিল না ওদের সঙ্গে। ওর এই একগুঁয়েমি আর জেদি আচরণে এক সময় আশফি অধৈর্য হয়ে ওঠে, রেগেও যায় খুব। তারপর শেষমেশ কোনো কথা ছাড়াই ওকে টানতে টানতে নিজের সঙ্গে করে নিয়ে যায় সে।

কাঁধ থেকে ব্যাগপ্যাক নামিয়েই ​দ্রুত তাঁবুর ভিত্তি তৈরির কাজে নেমে পড়েছে সবাই। মারিশা তখনো অবিচল মুখভঙ্গিতে একপাশে দাঁড়িয়ে। ভঙ্গিটা প্রকাশ করছে, কোনো তাঁবুই খাটাবে না সে। আর আশফিও তা বুঝতে পেরে ওর তাঁবুটাই আগেভাগে তৈরির কাজ শুরু করেছে। যেটা দিলিশা এক বিন্দুও সহ্য করতে পারছিল না। বারবার তার কল্পনায় ভাসছিল ওই মুহূর্তটাই, যখন আশফি এক আলাদা অধিকারবোধ দেখিয়ে মারিশার হাতটা সারা পথ জোর করে ধরে রেখেছিল নিজের হাতের মুঠোয়। মারিশার গালি-গালাজ, চেঁচামেচি, কোনো কিছুই গায়ে মাখছিল না সে একবারের জন্যও৷ অথচ এই মানুষটা অহেতুক চেঁচামেচি আর গালাগাল সারাজীবনই অপছন্দ করে এসেছে৷ এমনকি এ কারণেই ওর মাকে সে ছোটোবেলা থেকেই সহ্য করতে পারে না। কিন্তু তার সব নিয়ম যেন কেবল মারিশার বেলাতেই বদলে যায়।
শৈলশিরার মাঝখানে বিধায় জায়গাটা পুরোপুরি সমতল না। তাই তাঁবুর মেঝে সমান করা কঠিন হচ্ছিল বেশ। শেষে কোদাল দিয়ে মাটি আর নুড়ি পাথর সরিয়ে সমতল করার চেষ্টা করল। তীব্র ঠান্ডার মধ্যে দ্রুত হাতে তাঁবুটা খাটানোর পর আশফি তাঁবুর চারদিকে পাথর দিয়ে এক ধরনের অস্থায়ী বেষ্টনী তৈরি করতে লাগল। এর মাঝেই সে চিহ্নিত করে দিল সবাইকে, বন্যপ্রাণীর বিচরণের পথগুলো৷ সেদিকে যেন ভুল করেও কেউ না যায়, সেটাও বারবার সাবধান করে দিল।

তিনটা তাঁবু খাটানো প্রায় শেষ। মারিশা প্রাকৃতিক কাজটা সেরে এসে নিজের তাঁবুর মুখে এসে বসল সবেই।
দিলিশা তখন সাহায্য করছিল আশফিকে। সবাই-ই ব্যস্ত। মারিশাকে বসতে দেখে এই ফাঁকে ওকে আরও কিছু কথা শোনানোর ইচ্ছা হলো তার। যাতে আশফির যত্নগুলোকে গুরুত্ব না দেয় সে, এবং কাল সকালেই যেন ওদের দলটাকে ছেড়ে চলে যায়।
একটু পরই চলে এল সে মারিশার কাছে৷ তাকে দেখেও মারিশার মাঝে কোনো হেলদোল দেখা গেল না৷ বরঞ্চ ফোনের স্ক্রিনে ব্যস্ততা দেখানোর চেষ্টা করল। পরোক্ষভাবেই সে বোঝাতে চাইল, তার উপস্থিতি পছন্দ করছে না একদমই।

আর তা বুঝতে পেরেই যেন ভেতরে ভেতরে রাগে ফেটে পড়ল দিলিশা৷ তবে বাইরে থেকে নির্বিকার থাকার চেষ্টা করল। দু’হাতের তালু একত্র করে ঘষতে ঘষতে হঠাৎ ওকে তিরস্কার করে বলে উঠল, “তাঁবুর উষ্ণতা ছেড়ে বুঝি আর বের হতে মন চাইছে না? এত আরামপ্রিয় মানুষ কি অ্যাডভেঞ্চারার হতে পারে?”
ফোন থেকে চোখদুটো তুলল মারিশা বিরক্ত ভঙ্গিতে। তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, “পারি বা না পারি, তা জেনে তোমার নিশ্চয়ই কোনো উপকার হবে না, দিলিশা?”
“না, আমার কোনো উপকারে তোমার প্রয়োজন নেই। ছেলেগুলো খুব খাটাখাটুনি করছে, কিছু সাহায্য করে উপকারটা ওদের করতে পারতে কিন্তু।”

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ১৬

আশফি পাথর দিয়ে একটা ক্যাম্পফায়ার তৈরি করছিল, আর বাকিরা তাঁবু খাটাচ্ছিল একে অপরের। তা একবার দেখে নিয়ে মারিশা একটা ঠান্ডা হাসি ফুটিয়ে বলল, “আমি এখানে গেস্ট মনে করছি নিজেকে। যেহেতু জোর করেই তোমার হবু বর আমাকে এনেছে। তাই আমার কাউকে কোনো সাহায্য করার আগ্রহ নেই। তবে তোমার কোনো হেল্প লাগলে বলতে পারো। আমাকে জোর করে ধরে আনায় মাথা গরম হয়ে আছে মনে হয়?”

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ১৮