Home বুনো মেঘের হাতছানি বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ১৬

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ১৬

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ১৬
ইসরাত জাহান দ্যুতি

ওদের মাঝের দূরত্ব শত ক্রোশ নয়‚ ছিল যেন কালের যোজন! কিন্তু সেই সব হিসেব এক লহমায় মুছে গেল কি? মারিশার বিদ্রোহী দু’ঠোঁটের ফাঁকে যখন আশফির ঠোঁটটা মিশল‚ মনে হলো যেন এক দীর্ঘ গ্রীষ্মের শেষে হঠাৎ এক পশলা বৃষ্টি নামল।
​বহুদিন পর উষ্ণ ভেজা ঠোঁটের ছোঁয়ায় ওরা অনুভব করল ওদের সেই প্রথম চুম্বনের মতোই বুকে ঝড় তোলা এক তীব্র অনুভূতি। আশফির মরুভূমির মতো রুক্ষ হৃদয় থেকে অতীতের সব বিচ্ছেদ-বেদনা ধুয়ে দিল তা। বদলে তার সমগ্র সত্তা নিমেষে দখল করে নিল পুরনো লাগামহীন‚ পাগলাটে ভালোবাসা। বেসামাল আবেগে ওরা ভেঙেচুরে ভালোবাসতে চাইলো একে অপরকে। না চাইতেও মারিশা সাড়া দিয়ে ফেলল সেই চুমুতে… চোখের পাতা ছুঁইছুঁই হয়ে এল দুজনের‚ আর হৃদয়ে যেন ফিরে এল ওদের হারানো প্রেমের পূর্ণিমা।

কোথায় হারিয়ে গেল আশফির সকল কঠিনতা‚ আর হোটেলের প্রথম রাতের সেই সংযম? সেদিন অনিয়ন্ত্রিত মারিশার এলোমেলো স্পর্শের কাছে হারতে হারতেও সে হারেনি৷ কিন্তু আজ কী হলো তার? যতটুকু দূরত্ব ছিল‚ সেটুকুও ঘুচিয়ে দিল মারিশাকে আকস্মিক টানে নিজের বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নিয়ে৷ তাতেই ​মারিশার হুঁশ ফিরল যেন৷ ঠোঁটের অন্দরে অন্দরে শুরু হলো তখন গোপন কথা৷ বলতে চেষ্টা করল মারিশা‚ “আমি একটুও নেব না তোমার চুমু। ছাড়ো…!”
সে মুহূর্তে একে অপরের জিভ ছুঁয়ে গেল ওদের মুখের ভেতরের জমি। তবে আশফি শুনতে পেল মারিশার কথাটা। কিন্তু অবাক কাণ্ড‚ সে পাত্তায় দিল না ওর অভিমানকে! উপরন্তু একরোখামি দেখাল। ঠোঁট ছাড়িয়ে মারিশার দু গালেও ভালোবাসার উষ্ণ তাণ্ডব ঘটাল৷ তারপর ওর নাকের ডগায়, ঠোঁটের কোণে‚ চিবুকে‚ আর…!
ঘুম জড়ানো চোখে তাঁবুর বাইরে সবাই জড় হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। ভড়কানো মুখশ্রী ওদের৷ চোখদুটো ডলতে ডলতে দিব্য বলল‚ “আচ্ছা‚ আমাকে ডাকল না মারিশা?”
হৃদয় জবাব দিল‚ “তাই তো শুনলাম। তোকে বাঁচাতে বলছিল বোধ হয়৷ কিন্তু আর তো কোনো সাড়াশব্দ নেই৷ ঘুমের ঘোরে মেয়েটার চেঁচামেচি করার অভ্যাস আছে না-কি?”
“দুঃস্বপ্ন দেখছিল হয়তো…”‚ দিলিশা যোগ করল।

তা শুনে সৌভিক দ্বিধাবিজড়িত মনে বলল‚ “কিন্তু আমি তো শুনলাম মনে হলো আশফিকে কী সব গালাগাল করছিল ইংরেজিতে। মাতালরা যেমন মাতলামো গলায় বলে আরকি!”
দিলিশা তখন ঝট করে আশফি আর পরাগের তাঁবুটার দিকে তাকাল৷ পরাগ ওদের সাথেই উপস্থিত৷ চেহারায় কেমন এক বিভ্রান্তি আর বিস্ময় তার৷ কিন্তু আশফি কোথায়? মারিশার চেঁচামেচিতে যেখানে ওদের ঘুম ভাঙল‚ সেখানে সদা সতর্ক থাকা আশফির ঘুম ভাঙল না? অবিশ্বাস্য!
“আশফি কই‚ পরাগ ভাই?” সন্দিগ্ধ মনে চকিতেই জিজ্ঞেস করল দিলিশা।
পরাগও চমকাল প্রশ্নটা শুনে। এমনকি বাকিদেরও সহসা খেয়াল হলো‚ আশফি কোথায়! পরাগের দিকে সকলে জিজ্ঞাসু চোখে চাইলে পরাগ কোনো কিছু না ভেবেই বলে দিল‚ “মারিশার তাঁবুতে।”
জবাবটা পেয়ে সকলেই হতভম্ব। একই সঙ্গে ঘাড় ফেরাল তারা মারিশার তাঁবুতে। ভেতরে তো একদম নিস্তব্ধ। আলোও জ্বলছে না৷ তাহলে দুজন এই মুহূর্তে কী করছে তাঁবুর মধ্যে?
প্রশ্নটা যেভাবে সবার মনেই জাগল‚ উত্তরটাও তক্ষুনি বুঝে গেল৷ ভীষণ অস্বস্তিবোধ করল সকলেই৷ সবার আগে সৌভিক সরে পড়ল। চঞ্চল পায়ে ফিরে গেল নিজের তাঁবুতে। তাকে অনুসরণ করল তারপর হৃদয়ও। কেবল স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল দিব্য আর দিলিশা।

ওদেরকে তখন ডাকল পরাগ‚ “কিরে… তোরা দাঁড়িয়ে থাকবি না-কি? ঘুমাতে যা।”
দিলিশার সম্বিৎ ফিরল যেন। চোখে পানি আর অন্ধকার মুখশ্রীতে সে মন্থর পায়ে ফিরে গেল নিজের তাঁবুতে। কিন্তু দিব্যর হাবভাব সুবিধার লাগল না পরাগের। চোখদুটো ছোটো ছোটো করে চেয়ে দেখছে সে মারিশার তাঁবুটা। পরাগ এগিয়ে এসে ওর কাঁধে একটা খোঁচা দিল‚ “ওদিকে কী দেখছিস তুই? যাস না কেন?”
“যাব‚ দাঁড়া। একটা কাজ সেরে আসি আগে।”
কথাটা বলেই সে মারিশার তাঁবুর সামনে এসে আচমকা চেঁচিয়ে উঠল‚ “এ আশফি… এই! এই শালা…! মেয়ে মানুষের টেন্ট ছাড়া তোর ঘুম আসে না? সব ক্যাম্পিঙেই তোর লুচ্চামি করা লাগে?”
কাজটা শেষ দিব্যর। এবার হেলেদুলে হাঁটতে হাঁটতে সে ফিরে গেল নিজের তাঁবুতে৷ তবে যাওয়ার আগে পরাগকে বলে গেল‚ “ছক্কা মারার আগেই চৌধুরীর পোলাকে আউট করে দিলাম। এখন যাই‚ ঘুমাই।”
পরাগ আহাম্মক বনে তাকিয়ে রইল ওর যাত্রাপথে। ঠিক সে মুহূর্তেই আশফিও বেরিয়ে এল তাঁবু থেকে৷ কেমন থমকে দাঁড়িয়ে রইল তারপর৷ পরাগকে খেয়ালই করল না। তাই পরাগ নিজেই এগিয়ে এল ওর কাছে৷ দিব্যর শয়তানি সফল হয়েছে দেখে সে কী প্রতিক্রিয়া দেবে‚ বুঝতেই পারল না।
কিন্তু আশফিকে ঠিক লাগছে না। ওকে পাথরমূর্তি মতো স্থির হয়ে থাকতে দেখে পরাগ ঝাঁকি মারল ওর বাহু ধরে‚ “কিরে‚ কী হয়েছে? বের করে দিয়েছে মারিশা?”

হতাশাপূর্ণ আর অসহায় অভিব্যক্তি ফুটল আশফির চেহারায়৷ পরাগের দিকে ধীর গতিতে ফিরে চাইলো‚ তারপর কেমন নিস্তেজ গলায় বলল তাকে‚ “ভুল করে ফেললাম বোধ হয়।”
কথাটা বলে আর দাঁড়ালই না সে। উদ্ভ্রান্তের মতো হেঁটে চলে এল তাঁবুতে। দিব্যর ডাকেই তখন জাগতিক হুঁশ ফিরেছিল তার৷ সেই মুহূর্তেই ঠিক যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ঠের মতো ছিটকে সরে এসেছিল মারিশার থেকে। কিন্তু তার ওই আচরণে মারিশা কতখানি আঘাত পেয়েছিল‚ তা বুঝলেও ওর সামনে দাঁড়ানোর মতো সাহসটা আর হয়নি। বরঞ্চ নিজের সঙ্গেই এক বোঝাপড়া করার তাড়া অনুভব করছিল সে৷ এবং এখনো অবধি বুঝে উঠতে পারল না‚ কেন আর কী করে আজ সে এতটা দুর্বল হয়ে পড়ল ওর কাছে?

সকাল হলো পাখির ডাকে। সূর্যের প্রথম সোনালী রশ্মিটা পড়ল ওদের তাঁবুগুলোর ওপরে৷ বনের ভেতরের শীতলতা কেটে গিয়ে চারদিকে এক অদ্ভুত সতেজতা। দ্রুত হাতে ওরা নাশতার আয়োজন সেরে খাওয়া-দাওয়া শেষ করেই তাঁবু গুটিয়ে পিঠে ব্যাগ চাপাল। গত রাতে ফায়ার ক্যাম্পের ছাইটুকু মাটির নিচে পুঁতে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে পড়ল সবাই। তারপর হাঁটা শুরু করল লো ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে।
প্রথম এক ঘণ্টা ওদের যাত্রা চলল আরও ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। যেখানে বুনো গন্ধরাজের মিষ্টি সুবাস ভেসে আসছিল। এরপর পথটা ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে শুরু করল। সবাইকে ফেলে আশফি সবার আগে আগে হাঁটছে। মাঝামাঝিতে পরাগ‚ সৌভিক আর দিলিশা। আর তারপরই হৃদয়‚ মারিশা‚ দিব্য।
ঘুম ভাঙার পর থেকে এই এতটা সময়ের মাঝে আশফি আর মারিশার মধ্যে চোখাচোখি পর্যন্ত হয়নি৷ এক অদৃশ্য দেয়াল টেনে দিয়েছে যেন ওরা নিজেদের মাঝে৷ যার ফলে একজন আরেকজনের কাছে একেবারে অদেখার মতো হয়ে আছে। অস্বাভাবিক এক গম্ভীরতা‚ একে অপরকে এড়িয়ে চলার অদম্য এক প্রচেষ্টা ওদের মাঝে। আর ওদের জন্য পুরো দলটাতেই নেমে এসেছে এক বিরক্তিকর নীরবতা। হৃদয় আর দিব্য কথাবার্তা চালালেও খু্ব বেশিক্ষণ জমল না গল্পগুজব৷ মারিশা কানে ইয়ারপড গুজে গান শুনছে৷ ওদিকে দিলিশা হয়ে আছে বিষণ্ণ। তাই একটা সময় সকলেই মৌনতা অবলম্বন করল৷

তবে মনে মনে ভাবতে লাগল সকলেই আশফি আর মারিশাকে নিয়ে—শেষ রাতটাতে তারা যা ভেবেছিল‚ তা বোধ হয় ভুলই ছিল৷ নয়তো সামান্য মুখ দেখাদেখিটা পর্যন্ত বন্ধ করে দিল কেন ওরা? কী এমন হয়েছিল তবে ওদের মধ্যে? উত্তরটা জানার আগ্রহ আর কৌতূহল মনে চেপে রইল সবারই৷
পাইন আর ওক গাছের সারি কমে আসতে আসতে এখন ওদের মাথার ওপরে রডোডেনড্রন ফুলের বিশাল ঝোপ। নিচু পাহাড়গুলো ক্রমশ ঢালু হয়ে বড়ো পাহাড়ের অংশ হয়ে উঠেছে। ​এখানকার পথ হাঁটার জন্য দারুণ। পায়ের নিচে ছোটো ছোটো পাথর আর নরম মাটি। বসন্তকাল হওয়ায় পথের ধারে কোথাও কোথাও গুরাসের হালকা লাল‚ গোলাপি ও সাদা ফুলগুলো এমনভাবে ফুটে আছে যে‚ প্রতিটি নিঃশ্বাসের টানে ফুলের মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছিল ওদের নাকে।

চলার পথে মাঝে মাঝে অন্যান্য ট্রেকারদের দেখাও পেল ওরা। একদল হাসিখুশি জাপানি ট্রেকার ক্যামেরা নিয়ে ছবি তুলছে। তাদের উৎসাহ দেখে সৌভিক আর পরাগও কটা ছবি তুলে নিল নিজেদের। কিছুক্ষণ পর দেখা হলো একাকী হাঁটতে থাকা এক ফরাসি ট্রেকারের সঙ্গে৷ যে শুধু নিজের মতো করে এগিয়ে চলেছে।
বেলা গড়াল প্রায় দুপুরে। পাহাড়ের একটি বাঁক ঘোরার পরই সামনে যেন এক নতুন জগত উন্মোচিত হলো ওদের। ওরা এসে পৌঁছাল লো ক্যাম্পে। টিলার ওপর তৈরি হওয়া কিছু বিচ্ছিন্ন টি-হাউসের ছোটো একটি সারিই হলো লো ক্যাম্প। এখানের কাঠের তৈরি লজগুলো খুব সাদামাটা৷ কিন্তু এখানকার দৃশ্য একদম শ্বাসরুদ্ধকর। আকাশ একদম পরিষ্কার। ​সামনে দিগন্ত জুড়ে মাছাপুছারের তীক্ষ্ণ‚ তলোয়ারের মতো চূড়া মেঘের ওপর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে৷ যার বরফে ঢাকা শরীর সূর্যের আলোয় ঝকঝক করছে।
​লো ক্যাম্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মেঘ। এই উচ্চতায় এসে মেঘগুলো আর আকাশমুখী নেই। বরং তারা ওদের পায়ের নিচে এক শুভ্র বিশাল সাগর তৈরি করেছে যেন। পাইন ও রডোডেনড্রন বনের মধ্য দিয়ে হাঁটার ক্লান্তি এবার যেন এক লহমায় মুছে গেল। ওরা একটা টি হাউজের কাঠের ডেকে বসল রোদ পোহাতে আর দুপুরের খাবারটা খেতে৷ সবাই যখন শুকনো খাবার আর চা-কফি দিয়ে মধ্যাহ্নভোজ সারতে ব্যস্ত হলো‚ আশফি তখন বলল‚ “গাটা বড্ড চটচটে লাগছে৷ গোসলটা না করলেই না।”
দিলিশা বলল‚ “গরম পানির ব্যবস্থা তো বোধ হয় সীমিত। পাবে কিনা সন্দেহ। ওয়েট ওয়াইপস দিয়ে মুছে নিতে শরীর।”

“না‚ গোসলই নিতে হবে আমার। ঠান্ডা পানি দিয়েই করব। তোমরা খাও‚ আমি গোসল করে আসি তাহলে।”
লো ক্যাম্পে কোনো লেকের ব্যবস্থা নেই। তবে টি-হাউজের মালিকেরা তাদের থাকার জায়গা থেকে দূরে ঝরনার জলে গোসলের ব্যবস্থা রাখে। সেদিকে যাওয়ার আগেই হঠাৎ খেয়াল হলো আশফির‚ মারিশা তো নেই৷ আশেপাশে তাকিয়ে খুঁজল ওকে৷ কোথাও দেখল না৷ কপালে ভাঁজ পড়ল তার। পাগলটা বসেছিল তো সবার সাথেই৷ তারপর অবশ্য আর খেয়াল করেনি সে। আর তাতেই কি ফড়িংয়ের মতো উড়ে চলে গেল কোথাও?
“এই দিব্য…”‚ চিন্তিত চেহারায় আশেপাশে চোখ বুলাতে বুলাতে আশফি জিজ্ঞেস করল‚ “মাহি কই? তোর পাশেই তো বসেছিল।”
“কেন দেখিসনি? তোর সামনে দিয়েই তো হেঁটে গেল”‚ কফিতে চুমুক দিতে দিতেই বলল দিব্য‚ “ঝরনার ওদিকে গেছে হাত-মুখ ধুতে মনে হয়।”

“আশ্চর্য! হাত-মুখ ধুতে ঝরনায় যেতে হবে কেন?” মেজাজ খারাপ নিয়ে বলল আশফি‚ “নিষেধ করবি না তুই?”
মেজাজ দেখিয়ে বলল দিব্যও‚ “আমি নিষেধ করব কেন? আমি কি ওর এক্স? না ওর প্রেজেন্ট?”
তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল আশফি৷ একটু খটকা লাগল ওর দিব্যর মন্তব্যে। এত সহজে মারিশার পিছু ছেড়ে দিল না-কি সে? কেবল রাতের বেলা একই তাঁবুতে ওদের দুজনকে কিছু মুহূর্ত থাকতে দেখেছে বলে?
ব্যাপারটা বিশ্বাস হতে না চাইলো না ওর। তারপরই হঠাৎ খেয়াল হলো‚ ভোরবেলা তাঁবুর বাইরে থেকে শয়তানটা কী বলেছিল! সেটা বলেই বোধ হয় ভাবছে‚ মারিশা ওকে তবে ভুল বুঝে কথাবার্তা বন্ধ করে দিয়েছে। আর এখন তাই কোনো খাটুনি ছাড়াই তাকে জয় করতে পারবে! বন্ধুর এই ছেলেমানুষি ভাবনায় মনে মনে হাসিই পেল আশফির৷ যাক‚ এটা ভেবেও অন্তত মারিশার সঙ্গে ছ্যাঁচড়ামোটা বন্ধ করবে সে।
পাহাড়ের গা ঘেঁষে নিচে নেমে যাওয়া একটি সরু পথ ধরে এগিয়ে গেল আশফি। ঘন রডোডেনড্রন ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে আছে ঝরনাটা। এটা কোনো বিশাল জলপ্রপাত নয়। বরং বরফগলা জলের একটা তীব্র স্রোত‚ যা খাড়া পাথরের দেয়াল বেয়ে কয়েকটা ধাপে নিচে নেমে এসেছে। জলের রংটা কাঁচের মতো স্বচ্ছ৷ দেখলে মনে হয় যেন বরফ গুঁড়ো করে কেউ তরল করে দিয়েছে।

​ঝরনার ঠিক ওপরেই, বড়ো একটা লালিগুরাস গাছের ডাল ঝুলে আছে। যার হালকা গোলাপি ফুলগুলো তখনো ফোটেনি। ঝরনার জল যেখানে এসে পড়ছে সেখানে ছোটো ছোটো পাথরের মাঝে একটি প্রাকৃতিক জলাশয় তৈরি হয়েছে। জলাশয়ের চারপাশটা ভেজা শ্যাওলায় ঢাকা বড়ো পাথরে ঘেরা। বাতাসের কারণে ঝরনার জলের সূক্ষ্ম কণাগুলো আশপাশের সব কিছুকে শীতল আর সিক্ত করে রেখেছে। প্রকৃতির এই কোণটা একদম পুরোপুরি নির্জন। কেবল জলের অবিরাম গর্জন ছাড়া আর কোনো শব্দ সেখানে নেই৷ মানুষের আনাগোনাও নেই এখন পর্যন্ত। হয়তো কিছুক্ষণ বাদেই আসবে।

ঝরনার কাছে এসে দাঁড়াতেই আশফি দেখা পেল মারিশার। একটা শুকনো পাথরের ওপর তোয়ালে রেখে গেছে৷ তার মানে গোসলের উদ্দেশ্যেই এসেছে সে। কিন্তু জলাশয়ের গোড়ালি সমান পানিতে নেমে দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। ঠান্ডা পানির ছ্যাঁকা খেয়ে নিশ্চয়ই চিন্তাভাবনা চালাচ্ছে‚ ডুব দেবে কি দেবে না!
আশফিও চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল‚ ছিটিয়ালটার শেষ সিদ্ধান্ত কী হয় তা দেখার অপেক্ষায়। প্রায় দুটো মিনিট ধরে মারিশা পানিতে একবার নামতে গিয়ে আবার ফিরে আসতে লাগল৷ শেষমেশ আশফি নিজের অস্তিত্ব জানান দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল‚ “চোখে-মুখে পানি দিয়ে রোদে গিয়ে বসুন। ও পানি আপনার উপযোগী না।”
চমকে ফিরে তাকাল মারিশা। ওকে দেখা মাত্রই রাগের চোটে ওর শরীরের রক্ত টগবগিয়ে উঠল যেন। ইংরেজি এক খিস্তি দিয়ে জবাব দিল‚ “আমার পিছু পিছু আসার সাহস কী করে হলো তোমার? আমার আশেপাশেও ঘেঁষার চেষ্টা করবে না কিন্তু৷ চলে যাও আমার চোখের সামনে থেকে।”
রাগটা ঝেড়েই সে ঝাঁপিয়ে পড়ল জলের মধ্যে৷ অমনিই গলা দিয়ে এক চাপা চিৎকার বেরিয়ে এল ওর‚ “উহুহু…! ও আল্লাহ‚ এ কী ঠান্ডা!”

জলের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে। আশফির কথাই ঠিক হলো৷ এখানের জল ওর জন্য সত্যিই উপযোগী না। যদিও তা আগেই টের পেয়েছিল। কিন্তু আশফি তখন কথাটা না বললে সে জীবনেও নামত না গোসলে৷ তাই রাগটা আরও বাড়ল ওর আশফির ওপর। ফিরে তাকিয়ে দেখল‚ বাঙালি জংলিটা এখনো দাঁড়িয়েই আছে। নির্লজ্জের মতো তাকিয়ে দেখছে আর চোরা হাসি হাসছে।
খেঁকিয়ে উঠল মারিশা নিমেষেই‚ “তুমি আমাকে দেখছ কেন? চরিত্রের এতটুকুও বেঁচে থাকলে খবরদার দেখবে না আমাকে! আই সেড‚ স্টে আউট অব মাই বাউনড্রিজ।”
“আমার চরিত্র মরল কবে?” ভ্রু কুঁচকে তাকাল আশফি।
ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে তীব্র বক্রোক্তি করল মারিশা‚ “দুশ্চরিত্রের আবার চরিত্র বলে কিছু থাকে? জানো না বুঝি? এক্স‚ প্রেজেন্ট‚ সবার মধুই চাই তোমার। ইউ ফিলদি পার্ভাট!”
“আর একটা বাজে কথা বলবে না‚ মাহি”‚ মুহূর্তেই রেগে গেল আশফি‚ “ফারদার আমাকে গালি-গালাজ করলে আর বস্তির মেয়েদের মতো কথাবার্তা বললে খুব খারাপ হবে বললাম!”
“আমার মুখ‚ আমি যা খুশি তাই বলব”‚ একগুঁয়ের মতো চেঁচিয়ে বলল মারিশা‚ “আর যে যেমন‚ আমি তার জন্য তেমন ভাষায়ই প্রয়োগ করব।”

হাতে ধরা কাপড়চোপড় আর তোয়ালেটা ছুড়ে একটা পাথরের ওপর ফেলল আশফি। তারপরই তড়তড়িয়ে নেমে এল জলে। আর জলের প্রথম স্পর্শেই সারা শরীরে যেন বিদ্যুতের ঝলক খেলে গেল ওর৷ অত্যধিক ঠান্ডা! কিন্তু ঠান্ডার কামড়কে গ্রাহ্য না করে মারিশার কাছে চলে এল৷ জল দাঁড়াল ওর পেটের ওপরে৷ একদম ওর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বলল‚ “ভোর রাতের জন্যই তো এত বাজে কথা শোনাচ্ছ? আমি না হয় পার্ভাট। তুমি তাহলে শুরুতে কিস ব্যাক করলে কেন? তারপর শেষে গিয়েইবা আমাকে জড়িয়ে ধরলে কেন? আমি না ছাড়লে তো তোমার ছাড়ার আগ্রহও ছিল না।”
দু হাতে নিজের দুই বাহু ধরে কাঁপছিল মারিশা। দাঁতে দাঁত বাড়ি খাচ্ছিল বেচারির৷ কিন্তু আশফির কথা শুনেই তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল সে। চেঁচিয়ে উঠল আবার‚ “তুমি আমাকে সিডিউস করেছিলে‚ রাক্ষস একটা!”
কথাটা শুনেই হাসি পেল আশফির৷ মুহূর্তেই রাগ ভুলে বিস্ময়ের ভান করল‚ “হোলি কাউ! রাক্ষস সিডিউসও করতে জানে? আবার অত আদর করে চুমুও খেতে পারে!”
দুষ্টুমির ঢঙে বলল তারপরই‚ “রাক্ষস দেখতে তাহলে কী লেভেলের হট ছিল‚ মাহি‚ যার জন্য একেবারে হিপনোটিক হয়ে গিয়েছিলে রাক্ষসটার চুমুতে?”

“তোমার লজ্জা হওয়া উচিত এর জন্য…”‚ দাঁতে দাঁত চেপে বলল মারিশা‚ “সরি বলা উচিত। আর তুমি সেখানে মশকরা করছ? দিলিশার কথাও ভাবছ না‚ কেমন লেগেছে ওর! প্লেয়ার হয়ে গেছ না-কি? এভাবেই তাহলে চারটা বছর ধরে এক সঙ্গে মেইনটেইন করেছ গার্লফ্রেন্ড! তো তোমার আর দিব্যর মধ্যে কী এমন তফাৎ‚ হ্যাঁ?”
“আমার আর দিব্যর মধ্যে কী তফাৎ‚ তা বলার প্রয়োজনবোধ করছি না৷ যা খুশি ভাবো৷ কিন্তু দিলিশার ব্যাপার আসলো কোত্থেকে? ওর ফিলিংস নিয়ে ভাবব কেন? আমি কি ওর সঙ্গে কমিটেড? আজব! আর সব থেকে ইম্পর্ট্যান্ট পার্ট হলো তোমাকে সরি বলা। আসলেই এটা বলা উচিত আমার৷ কিন্তু নিজের অপরাধটার জন্য লজ্জা হচ্ছিল ভীষণ। তাই কীভাবে মাফ চাইব‚ সেটা বুঝতে পারছিলাম না। অস্বস্তি হচ্ছিল তোমার সামনে দাঁড়াতেও৷ কিন্তু জড়তা আর অস্বস্তিটা এখন কেটে গেছে।”

কথাগুলো বলেই আশফি গাল ফুলিয়ে একটা নিঃশ্বাস ছাড়ল। তারপর দৃষ্টিজোড়া নুইয়ে অপরাধী বেশে বলল‚ “আই নেভার ইম্যাজিন্ড আই উড লুজ কন্ট্রোল লাইক দ্যাট। কীভাবে করে ফেললাম যে…! আমি সত্যিই জানি না কী হয়েছিল আমার! ঝোঁকের বশে তোমাকে ভীষণ কষ্ট দিয়ে ফেললাম। প্লিজ‚ ডু ফরগিভ মি!”
অথচ মারিশা ওই মুহূর্তগুলোতে ভেবেই নিয়েছিল‚ আশফি আবারও ভালোবেসে ফেলেছে তাকে। সেই ভালোবাসার কাছেই হার মেনেছে ওর সকল রাগ‚ কষ্ট আর অভিমান। তাই তো নিজেকেও তখন ধরে রাখতে চায়নি সে‚ ওর আদর আর ভালোবাসা থেকে৷ কিন্তু দিব্যর ডাক পড়তেই তাকে যেভাবে প্রত্যাখ্যান করে চলে গেল—একটাবার আর ফিরেও তাকাল না তার দিকে! এ কদিনের সব কষ্ট ভুললেও ওই মুহূর্তটা কোনোদিনও ভুলবে না সে!
কোনো জবাবই দিল না আশফিকে৷ চুপচাপ উঠে এল ঝরনা থেকে। গায়ে তোয়ালেটা জড়াতেই হঠাৎ আগমন ঘটল দিলিশা‚ দিব্য‚ সবারই৷
দিব্য কপালে চোখ তুলল ওকে ভেজা দেখে। চরম বিস্ময় নিয়ে বলল‚ “মাই গুডনেস! তুমি কী রে‚ ভাই! কীভাবে পারলে গোসল করতে?”

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ১৫

“কীভাবে আবার…”‚ নির্বিকার গলায় বলল মারিশা‚ “লাফাতে লাফাতে করেছি৷ এত আরাম! আমার তো উঠতেই ইচ্ছে করছিল না।”
“সিরিয়াসলি!” সন্দিগ্ধ চোখে তাকাল হৃদয়।
জবাবে প্রশংসার ভঙ্গিতে ঠোঁট বাঁকাল মারিশা‚ “যেমন ভয় পাচ্ছ তোমরা‚ অমন কিছুই না৷”
তারপর হঠাৎ নাক কুঁচকে আশফিকে দেখিয়ে বলল‚ “শুধু ওই বুনো ষাঁড়টা এসে দুর্গন্ধ না ছড়ালে আরও আরাম পেতাম।”

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ১৭