বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৩০
ইসরাত জাহান দ্যুতি
‘গেম’ শব্দটা শোনামাত্র মারিশার ঘোরের ভেতর যেন কেউ এক বালতি বরফ-শীতল জল ঢেলে দিল। মুহূর্তকাল আগে শরীরের ভেতর যে উত্তপ্ত রক্তস্রোত বইছিল, তা যেন আচমকা এক হিমশীতল ধাক্কায় থমকে গেল। ওর দুচোখে এখন গাঢ় বিস্ময় আর মনে মনে দানা পাকানো প্রচ্ছন্ন বিরক্তি। এমন একটা নিবিড় মুহূর্তের মাঝখানে হুট করে খেলার প্রসঙ্গ আসবে কেন? অভিব্যক্তিতে ফুটে উঠল স্পষ্ট অস্বস্তি আর খটকাও। তবে সামান্য আড়ষ্টতা কাটিয়ে নিজেকে কিছুটা সামলে নিল সে। পিছিয়ে এল আশফির থেকে। ভ্রু যুগল কিঞ্চিৎ কুঁচকে ভারী গলায় জিজ্ঞেস করল, “প্রিয় গেম? কী গেমের কথা বলছ তুমি?”
আশফি যেন আকাশ থেকে পড়ল, এমন এক কপট বিস্ময় ফুটিয়ে তুলল চোখেমুখে, “আরে… তোমার নিজের প্রিয় গেমটাই তুমি ভুলে গেলে?”
তার এই হেঁয়ালিভরা আচরণে মারিশার ভেতরের বিরক্তিটা এবার চরমে পৌঁছাল, “তোমাকে যে মনে রেখেছি, সেটাই অনেক।”
এমন নিরাসক্ত উত্তর বোধহয় কল্পনাও করেনি আশফি। মারিশার চোখের দিকে কেমন শীতল দৃষ্টিতে তাকাল সে। সেই চাউনিতে অভিমান, নাকি ক্ষোভ — তা বোঝা গেল না।
কিন্তু তার এ অভিব্যক্তিকে পাত্তা দিল না মারিশা৷ উলটো কঠোর দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে তপ্ত গলায় বলল, “আদিখ্যেতা বন্ধ করে সোজাসুজি বলো তো ঠিক কী চাইছ?”
এবার আশফি ঠিক ততটুকু ব্যবধান কমিয়ে ওর কাছে এসে দাঁড়াল আবার, যতটুকু সে পিছিয়ে গিয়েছিল। হাত বাড়িয়ে যেই না ওর গালটা ছুঁতে গেল, অমনি মারিশা খপ করে তার হাতটা ধরে ফেলল। রাশভারী গলায় শাসন করার ভঙ্গিতে বলল, “এসব ছোঁয়াছুঁয়িও বন্ধ করো! একদম পয়েন্টে আসো বলছি।”
“আরে, এত রেগে যাচ্ছ কেন?” বলতে বলতেই মারিশার নিষেধ অগ্রাহ্য করে ওকে এক ঝটকায় বুকের খুব কাছে টেনে নিল আশফি।
ওর কোমরে হাত রেখে ঠোঁটের কোণে একটা ফিচেল হাসি ঝুলিয়ে সে বলল, “আমি তো তোমার সেই প্রিয় গেমটা খেলতে চাইছি। ওই যে, কাশ্মীরে টারসার মার্সার লেকের ধারে আমাদের শেষ ক্যাম্পিংয়ের দিন যেটা খেলেছিলে? আমাকে সিডিউস করে আমার মুখ দিয়েই প্রপোজ করাতে চেয়েছিলে। মনে পড়ে?”
কথাটা শোনামাত্র স্বচ্ছ আয়নায় নিজেকে দেখার মতো চার বছর আগের সেই মুহূর্তটা মারিশার চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠল। স্মৃতির অতল থেকে ভেসে আসা মাদকতাময় সেই দিনগুলোর কথা ভাবতে ভাবতে ওর অজান্তেই ঠোঁটে একটুখানি লাজুক হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই ঘোর কাটল ওর। যেন কোনো এক ভয়ঙ্কর সত্যের মুখোমুখি হয়েছে। ঝটকা দিয়ে আশফির বাঁধন থেকে ছিটকে সরে এল সে। তীক্ষ্ণ গলায় বলে উঠল, “তোমাকে সিডিউস করতে চেয়েছিল কে? আজব! তুমি এতদিন ধরে এটাই ভেবে আসছ নাকি? আমি তো… আমি তো স্রেফ মজার ছলেই খেলেছিলাম সেটা।”
আশফি এবার একটু শব্দ করে হাসল, তবে সেই হাসিতে বিদ্রূপের ছোঁয়া স্পষ্ট। সে ধীরপায়ে এগোতে এগোতে বলল, “মজার ছলে খেলা তবে এমনও হয়! যে হারবে সে একটা একটা করে নিজের পোশাক খুলে ফেলবে? হুঁ… এমন অদ্ভুত, উত্তেজনাপূর্ন খেলা আসলে ওসমান বারিশের স্পয়েল্ড চাইল্ড মারিশা বারিশের পক্ষেই খেলা সম্ভব।”
‘স্পয়েল্ড চাইল্ড!’ তকমাটা কানে লাগামাত্রই মাথায় যেন রক্ত চড়ে গেল মারিশার। অপমানে ওর ফরসা মুখটা মুহূর্তেই লাল হয়ে উঠল, চোখ দুটো জ্বলে উঠল রাগে। আশফির বুকে একটা ধাক্কা লাগিয়ে ক্ষিপ্ত স্বরে বলল, “আমি স্পয়েল্ড চাইল্ড, না? তো এই স্পয়েল্ড চাইল্ডের প্রেমেই তো একদিন হাবুডুবু খেতে তুমি। ভুলে গেছ নাকি সেই দিনগুলো?”
আশফি তখনো হাসছিল৷ মারিশার রাগের বহিঃপ্রকাশটা সে বেশ উপভোগই করছিল।
কিন্তু তার সেই বাঁকা হাসিটা দেখে ক্ষিপ্ত মারিশা আরও খেপে গেল। চেঁচিয়ে উঠল সে, “আবার নির্লজ্জের মতো হাসছ!”
নাকটা একটু কুঁচকে সে যোগ করল, “ভাইয়া আমার জন্য ছেলে দেখছে শুনে যে ছেলেটা রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভাইয়ার কলার চেপে ধরেছিল, তার সেই বীরত্বগাথা আজও আমার মনে আছে! সেটা তো আর মারামারি ছিল না, ছিল প্রেমিকাকে ভাইয়ের হাত থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার এক মহান যুদ্ধ! আহা, কী বীরত্বপূর্ণ প্রেমিকই না ছিল আমার!”
একটু থেমে সে এবার তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে আশফির দিকে তাকাল, “আর এখন দেখো, সেই বীর পুরুষই কিনা আমাকে বলছে স্পয়েল্ড চাইল্ড! আবার উলটো আমার পারফিউমটা মেখে বেহায়ার মতো ঘুরেও বেড়াচ্ছে। লজ্জা করে না তোমার?”
ছিটিয়াল বউয়ের এই ঝগড়াটে মেজাজ আর কথাবার্তায় আশফি আর নিজেকে সামলাতে পারল না। এক হাত রেলিংয়ের ওপর রেখে অন্য হাত দিয়ে নিজের মুখের এক পাশ চেপে ধরে সে দীর্ঘক্ষণ হাসল। তার হাসির শব্দে এই নির্জন পাহাড়ের নিস্তব্ধতা যেন খানিকটা কেঁপে উঠল।
আর দুনিয়ার সবথেকে এই প্রিয় হাসিটাই আজ মারিশার কানে ঠেকল যেন বিষের মতো। সে আর একটা মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না, গটগট করে পা চালিয়ে ঘরে চলে এল। আশফির হাসির রেশ তখনো কাটেনি, কোনোমতে সেটা চেপেচুপে সেও ওর পিছু পিছু ঘরে ঢুকল।
তাকে দেখেই মারিশা রণচণ্ডী মূর্তিতে চেঁচিয়ে উঠল, “খবরদার! আমার পারফিউমে আর কক্ষনো হাত দেবে না। আর আমার রুমে তোমার কাজ কী? কার পারমিশনে এখানে ঢুকে বসে আছ তুমি?”
আশফি কোনো জবাব না দিয়ে হাসতে হাসতেই বিছানার মাঝখানে নিজের শরীরটা এলিয়ে দিল। মাথার নিচে দু’হাত পেতে আয়েশ করে শুয়ে সে আলতো স্বরে বলল, “ডার্লিং, এটা শুধু তোমার একার রুম নয়। এটা আমাদের রুম। রাগটা কমিয়ে এবার কাছে এসো তো, আরেকটু আদর করে দিই। মাথাটা একদম ঠান্ডা হয়ে যাবে তাহলে।”
কথামতো মারিশা তেড়েমেড়ে ওর দিকে এল ঠিকই, কিন্তু আদর নিতে নয়। আশফির হাতটা ধরে রীতিমতো টানাটানি শুরু করল সে। ধমকাতে ধমকাতে বলল, “এটা আমার ঘর, শুধু আমার! ওঠো এক্ষুনি। যাও এখান থেকে। তোমার সাথে এক ঘরে থাকার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই আমার। অন্য একটা রুম বুক করো গে, যাও!”
ওঠার বদলে আশফি উলটো ওর হাতটা ধরে ফেলল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওকে এক ঝটকায় নিজের বুকের ওপর টেনে আনল সে।
আকস্মিক এ ঘটনায় তখন মারিশা একটুখানি থমকে গেল, কথাগুলো গলার কাছেই আটকে রইল ওর। সারা মুখে ছড়িয়ে থাকা ওর এলোমেলো চুলগুলো খুব নরম স্পর্শে সরিয়ে দিতে দিতে বিদ্রূপের সুরে বলল আশফি, “কত ঢং আমার বউয়ের! পুরোটা দুপুর তো এই বুকেই নাক ডেকে ঘুমালে। পারফিউমটাও তো তখনই আমার গায়ে মাখিয়ে দিয়েছ৷ সেটা তো আর মনে নেই।”
মারিশা এবার একটু অপ্রস্তুত হয়ে চোখ পিটপিট করে তাকাল। ওর কণ্ঠে হালকা বিস্ময় আর সংশয় মেশানো, “আমি দুপুরে তোমার বুকে ঘুমিয়েছি? কখন?”
ওর বিভ্রান্তি দেখে আশফি হাসল। টুপ করে ওর নাকের ডগায় ঠোঁটটা ছুঁয়ে দিয়ে বলল, “যখন তুমি লাউঞ্জ থেকে রুমে ফিরে এলে, ওদের সঙ্গে আড্ডায় আমারও আর মন টিকছিল না তখন। তাই তোমার কাছেই চলে এসেছিলাম। এসে দেখি, কী আরামছে ঘুমাচ্ছিলে! আর তোমাকে ওই অবস্থায় দেখে…”
কথার শেষটায় আশফির ঠোঁটে একটা চনমনে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল। ফিচলেমি সুরে বলল, “তোমাকে অমন সুন্দর করে ঘুমাতে দেখে আমার নিজেরও তখন ভীষণ ঘুম পেয়ে গেল। এপরর কী হলো জানো? ঘুমের ঘোরে তুমিই আগে আমায় শক্ত করে জড়িয়ে ধরলে। আর তারপর তো…!”
রহস্যময় একটা হাসি দিয়ে কথাটুকু মাঝপথেই ঝুলিয়ে রাখল সে। চোখের দৃষ্টিতে এমন এক গভীরতা বোঝাল, যেন বাকিটুকু কেবল সে একাই জানে।
তা দেখে নানারকম আশঙ্কায় মুহূর্তেই মারিশা আড়ষ্ট হয়ে উঠল। অসম্পূর্ণ বাক্যটা ওর মগজে হাতুড়ি পেটাতে শুরু করল প্রচণ্ড। হোটেলের সেই রাতের মতো আজও কি সে ঘুমের ঘোরে বড়ো কোনো লজ্জাজনক অঘটন ঘটিয়ে ফেলেছিল? নাকি আশফিই কিছু করেছিল ওর সঙ্গে?
চেষ্টা করেও বেচারি কিছুই মনে করতে পারল না। তাই অস্থির হয়ে আশফির মাফলার খপ করে চেপে ধরল, “অ্যাই, কথা শেষ করো! আর তারপর তো কী? থামলে কেন? আমি কি… আমি কি কিছু করেছি? নাকি তুমি করেছ? বলো বলছি!”
আশফি কোনো উত্তর দিল না, ঠোঁটের কোণে কেবল সেই রহস্যময় হাসিটা ধরে রাখল। ওর এই নীরবতা মারিশার ভেতরের অস্বস্তিকে যেন আরও উসকে দিল। কৌতূহল আর উৎকণ্ঠায় সে প্রায় দিশেহারা হয়ে আশফিকে রীতিমতো ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে অস্থির গলায় বলে উঠল, “এভাবে হাসবে না একদম! সোজাসুজি বলো ওই সময় কী হয়েছিল? নিশ্চয়ই তুমিই কোনো সুযোগ নিয়েছ। বলো, কী করেছ তুমি?”
আশফি এবার একটু শব্দ করে হেসে ফেলল। মারিশার অস্থিরতা উপভোগ করতে করতে বলল, “হ্যাঁ, যা করার তো আমিই করেছি। তুমি তো তখন একদম মাতালের মতো বেঘোরে ঘুমাচ্ছিলে!”
“ব্লাডি ক্রিপ”, মারিশা এবার প্রায় চিৎকার করে উঠল, “কী করেছ আমার সঙ্গে? বলো না কেন?”
ছটফট করতে থাকা জেদি বউটাকে আশফি এবার দুই হাতে জাপটে ধরে নিজের বুকের সাথে লেপটে নিল। চাপা হাসি নিয়ে ঠোঁটটা ওর কানে ঠেকিয়ে ধরল সে। তারপর খুব নিচু স্বরে, একদম ফিসফিসিয়ে কানে কানে কিছু একটা বলল।
সেই কথাটা শোনামাত্রই মারিশার শরীর যেন পাথরের মতো জমে গেল। পরক্ষণেই ওর ধবধবে ফরসা মুখটা মুহূর্তের মধ্যে টকটকে লাল হয়ে উঠল। লজ্জায় কান দিয়ে যেন গরম ধোঁয়া বের হতে শুরু করল ওর। গায়ের সমস্ত জোর খাটিয়ে এক ঝটকায় নিজেকে আশফির বাঁধন থেকে ছাড়িয়ে নিল সে। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে একটা বৃটিশ গালি ছুড়ে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। তীরের বেগে ওয়াশরুমের দিকে ছুটে পালাল।
পেছন থেকে আশফির অট্টহাসি তখন সারা ঘরে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। সে গলা চড়িয়ে ওয়াশরুমের দরজার দিকে তাকিয়ে বলল, “ফ্রেশ হয়ে জলদি এসো কিন্তু! আমি গেমটা খেলার জন্য সিরিয়াসলি ওয়েট করছি, মাহি।”
ভেতর থেকে কোনো উত্তর এল না। মিনিট দশেক পর তোয়ালেতে ভেজা মুখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে এল মারিশা। ওর চোখেমুখে তখন একটা কপট গাম্ভীর্যভাব আর চাউনিতে মেকি উষ্মা। পা ফেলে এগিয়ে এল বিছানার দিকে।
আশফি তখন বিছানার হেডবোর্ডে গা এলিয়ে পা মেলে বসে আছে। কানে ফোন ধরা। পাসাং কল করেছে ওদের খোঁজ নিতে। বিশেষ করে মারিশার শরীর এখন কেমন আছে, সেটাই জানতে চাইছিল সে।
আশফির মুখে নিজের নামটা শুনে মারিশা তখন কৌতূহল নিয়ে ওর পাশে এসে দাঁড়াল। তা দেখে কথা বলতে বলতেই আশফি এক হাত বাড়িয়ে ওর হাতটা ধরে টেনে নিজের পাশে বসাল। পাসাংয়ের সাথে কথা শেষ হতেই মারিশা ভারী গলায় প্রশ্ন করল, “তোমার এই ফ্রেন্ড তো আমাকে নিয়ে বেশ চিন্তিত দেখছি। তা… ওর কাছে আমার পরিচয় কী দিয়েছিলে? বউ?”
প্রশ্নটা শুনে আশফি ক্ষণিকের জন্য একটু অপ্রস্তুত হলো। তবে সামলে নিয়ে নির্ভীকভাবেই অকপটে বলল, “না, ফিয়ানসে বলেছি। বউ বলাটা ওই মুহূর্তে একটু ঝামেলার ছিল।”
“ওহ, আচ্ছা!” মারিশা অস্বাভাবিক ঠান্ডা এক অভিব্যক্তি নিয়ে মাথাটা নাড়াল, “অলরাইট।”
কিন্তু মুখে ‘অলরাইট’ বললেও ওর মনের ভেতর যে মেঘ জমেছে, তা আশফির বুঝতে বাকি রইল না। পরিস্থিতিটা সহজ করতে সে এবার একটু বুঝিয়ে বলতে শুরু করল, “ট্যুরে এসে আমি আর আমার এক সঙ্গী ভালুকের কবলে পড়েছি, খবরটা তখন অলরেডি নিউজ চ্যানেলে চাউর হতে শুরু করেছিল। দেশে মাহবুব চৌধুরীর কানে সেই খবর পৌঁছাতেও একদম সময় লাগেনি। কারণ চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে দেশের নিউজ চ্যানেলগুলোতেও স্ক্রল চলে গিয়েছিল। সেখানে যদি হেডলাইন হতো, আমার সাথে আহত সঙ্গীটি আমার স্ত্রী, তবে একটা প্রলয়ঙ্করী টর্নেডোর সাক্ষী হতে তুমি।”
কথাগুলো বলে একটু থামল সে। মারিশার হাতের ওপর নিজের হাতটা রেখে নরম স্বরে যোগ করল, “চার বছর আগে যে বিয়েটা আমাদের লুকিয়ে করতে হয়েছিল, সেটা এভাবে হুট করে জানাজানি হওয়াটা আমাদের কারও জন্যই ভালো হতো না। আমি চাইনি কোনো বিপদে পড়ে দায় ঠেকানোর মতো করে তোমার পরিচয় সামনে আসুক। আমি চাই, আমার বউ হিসেবে তুমি সেদিনই সবার সামনে দাঁড়াবে, যেদিন আমি বিশাল আয়োজন করে সবাইকে জানিয়ে তোমাকে ঘরে তুলতে পারব।”
যুক্তিগুলো শুনে মুহূর্তকাল চুপ করে রইল মারিশা। পরিস্থিতিটা তখন কতটা জটিল হত, মনে মনে তা সে অস্বীকার করতে পারল না। সবচেয়ে বেশি ঝামেলা করতেন মাহবুব চৌধুরীর ওই শয়তান বাবাটা।
মাথা নিচু করে নিজের হাতের নখ খুঁটতে লাগল মারিশা, যেন কোনো গভীর ভাবনায় ডুবে আছে। কিছুক্ষণ নীরব থেকে তারপর হঠাৎ ধীর গলায় প্রশ্ন করল, “তোমার বাবা কি কোনোই রিয়্যাক্ট করেননি? হেডলাইনে তোমার ফিয়ানসে কথাটা দেখেও তো কিছুটা রিয়্যাক্ট করার কথা তার!”
প্রশ্নটা শুনে আশফির চাউনি এক পলের জন্য স্থির দেখাল। পরক্ষণেই সে মৃদু হাসল। বউটা তার বরাবরই বড্ড তীক্ষ্ণ আর বুদ্ধিমতী৷ একে ফাঁকি দেওয়া বেশ কঠিন। তবে এই মুহূর্তে সে একটা তথ্য ওর কাছে গোপন রাখার সিদ্ধান্ত নিল। গত চার বছরে সংবাদমাধ্যমের পাতায় তার পাশে বহু নারীর নাম উঠেছে। কাউকে তার প্রেমিকা, কাউকে বা হবু স্ত্রী হিসেবে রং চড়িয়ে বারবার খবর করা হয়েছে। মাহবুব চৌধুরী এসব দেখতে দেখতে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছেন যে, এখন এই গসিপগুলোকে তিনি স্রেফ ম্যাগাজিনের চটকদার শিরোনাম ছাড়া আর কিছুই ভাবেন না। তাই এবারের ঘটনাটাকেও তিনি বরাবরের মতো বিশেষ আমল দেননি।
কিন্তু পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে যেত যদি সেখানে মারিশার পরিচয়টা থাকত। চার বছর আগের সেই ধামাচাপা দেওয়া সত্যটা যদি আজ এভাবে টিভির পর্দা থেকে জানতেন মাহবুব চৌধুরী। তাহলে এই ঘটনা আক্ষরিক অর্থে এক প্রলয়ংকরী ঝড়েই রূপ নিত।
আশফির দাদা ওরফে আবু শাহনান চৌধুরীর একটি লৌহকঠিন সিদ্ধান্ত আজও এই পরিবারের দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয় — চৌধুরী বাড়িতে কোনো বাঙালি নারী ছাড়া কোনো বিদেশিনি কখনো বউ হয়ে ঢুকতে পারবে না। এই জেদের কারণেই তো একদিন মাহবুব চৌধুরীকেও তার জীবনের দ্বিতীয় ভালোবাসা আইলিনকে বিসর্জন দিতে হয়েছিল।
আর ওসমান বারিশ সুলতান? তিনি তো এই পরিবারের কাছে বিষের মতো বর্জ্য। যে মানুষটার জন্য এক সময় চৌধুরী বাড়ির মেয়ের জীবনটা তছনছ হয়ে গিয়েছিল, সেই ব্যক্তির মেয়েকে ঘরের বউ করার কথা মাহবুব সাহেব বা শাহনান সাহেব দুঃস্বপ্নেও ভাবতে চাইবেন না। ঘৃণা, প্রতিহিংসার এই পুরনো ইতিহাস এতটাই তেতো যে, সেই বিষবৃক্ষের ছায়াতলে দাঁড়িয়ে নিজেদের ভালোবাসার কথা স্বীকার করার সাহস থাকলেও সুযোগটা সেদিন হয়নি আশফির। তাই একমাত্র ফুপুর পরামর্শে সবার চোখের আড়ালে লুকিয়েই এই সম্পর্কটাকে একটা নাম দিতে হয়েছিল ওদের দুজনকে।
আশফির বুকের ভেতরটা হঠাৎ হাহাকার করে উঠল। দু পরিবারের পুরনো দ্বন্দ, লড়াইটা না হয় একপাশে সরিয়ে রাখা গেল৷ কিন্তু যখন তার বাবা আর দাদা জানবেন, বিগত চারটা বছর এক অসহনীয় বিচ্ছেদের দহনে পুড়িয়ে ওসমান বারিশের মেয়েটা তাদের ছেলেকে একা ফেলে চলে গিয়েছিল, তখন ওর প্রতি তাদের মনে যে বিষাক্ত ঘৃণা জন্ম নেবে, তা কি কোনোদিন মোছা সম্ভব? কীভাবে তাদের বোঝাবে সে? কোন যুক্তিতে বুক আগলে দাঁড়াবে সে মারিশার সামনে? তার কূল-কিনারা এখনো সে করে উঠতে পারেনি।
ভাবতে গিয়েই বুক চিরে একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তার। স্মৃতির পাতায় অতীতের দিনগুলো আজও রক্তক্ষরণ ঘটায়। যেদিন সে মারিশার হাতটা শক্ত করে ধরে অদ্যম সাহস নিয়ে বাপ-দাদার সামনে দাঁড়াতে চেয়েছিল, ঠিক সেদিনই তার হাতটা মাঝপথে ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে গেল মেয়েটা। আর আজ যখন সে ফিরেছে, তখন সত্যটা কবুল করার পথটা সহজ হওয়ার বদলে যেন আরও দুর্ভেদ্য পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মারিশার হাতের ওপর আশফির আঙুলের চাপটা হঠাৎ একটু তীব্র হয়ে উঠল। যেন অবচেতনেই সে মারিশাকে হারিয়ে ফেলার এক পুরনো ভয় থেকে ওকে আঁকড়ে ধরতে চাইছে। মারিশা তখন ভ্রু কুঁচকে ওর চোখের দিকে তাকাল। কিন্তু তার মাঝে লুকিয়ে থাকা গভীর বিষাদটুকু সে ধরতে পারল না। যেখানে অতীতের জমাটবদ্ধ অভিমান আর আগামীর অনিশ্চয়তা মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে।
পুনরায় দুজনের মিলিত হওয়ার আনন্দ আজ যতটা মধুর, এর পেছনের লুকানো সত্যটা যে ঠিক ততটাই বিষাদময়।
মারিশা একটু উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে? হঠাৎ এমন শক্ত হয়ে গেলে কেন? তোমার বাবা কি খুব বেশি রিয়্যাক্ট করেছেন?”
মুহূর্তেই নিজের ভেতরের ছাইচাপা হাহাকারটুকু আড়াল করে নিল আশফি। মুখে একটা আলগা স্বাভাবিকতা ফুটিয়ে তুলে মাথা নেড়ে বলল, “উঁহু, দিশান সামলে নিয়েছে সব। ওকে তো চেনোই, বাবাকে কী সব ভুজুংভাজুং বুঝিয়ে শান্ত করে রেখেছে। সেজন্যই আর ফ্লাইটে চেপে বসেননি। কিন্তু দেশে ফেরার জন্য রোজ ফোন করে করে মাথা খারাপ করে দিচ্ছে।”
একটু থেমে আধো-কৌতুক, আধো-অভিমানের সুরে যোগ করল, “তার মধ্যে তোমার তো আবার নতুন বায়না! এই পাহাড়-জঙ্গল ছেড়ে নাকি আরও পনেরো দিন নড়বে না এখান থেকে। এখন বাবাকে কী বলে ঠেকাব, বলো?”
“আমি কেন বলতে যাব? তোমার মামলা তুমি সামলাবে”, এক ঝটকায় কাঁধ ঝাঁকিয়ে বেশ নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল মারিশা। ওর চেহারায় এমন এক ভাব, যেন সব চিন্তা কেবল আশফির একার। তার এতে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই।
মারিশার এমন গা-ছাঁড়া ভাব দেখে আশফি আর কথা বাড়াল না। গাল ফুলিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মনের সব ভাবনাচিন্তা আপাতত ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করল সে। তারপর গলার স্বরে টানটান উত্তেজনা ফিরিয়ে এনে বলল, “ওকে, সব টপিক ক্লোজড। এখন আমরা গেমটা স্টার্ট করব। তুমি রেডি?”
বিরক্তি আর অনিচ্ছায় কপাল কুঁচকে ছোটো হয়ে এল মারিশার, “আমি এখন এসব গেম টেম খেলার মুডে নেই একদম।”
আশফি একটু বাঁকা হাসল। চোখের চাউনিতে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলল, “কেন? হেরে যাওয়ার ভয় পাচ্ছ?”
“কী এমন আহামরি প্রশ্ন করবে যে আমি হেরে যাব?” একটু তেতে উঠল মারিশা।
“সেটা তো খেলা শুরু হলেই টের পাবে”, ওর কৌতূহল উসকে দিয়ে রহস্যময় হাসল আশফি।
মারিশা এবার নিমরাজি হলো। নিজের আপত্তির জায়গাটা পরিষ্কার করে বলল, “ওকে৷ বাট আই ক্যান্ট টেইক মাই ক্লোথস অফ অ্যাট অল।”
বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ২৯
“রুলস আর রুলস, রাইট? কথাটা সেদিন খেলার শুরুতে তুমিই বলেছিলে। আজ নিজের রুল নিজেই ব্রেক করবে, সেটা তো মেনে নেওয়া যায় না”, বলেই আশফি বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। মন্থর পায়ে এগিয়ে গিয়ে ঘরের মূল আলোটা নিভিয়ে দিল সে। কেবল বারান্দার টিমটিমে আলোটা কাঁচের দরজার ওপাশ থেকে চুঁইয়ে ভেতরে আসছে। সেই আবছা আলো-আঁধারির মায়া বিছিয়ে আশফি ফিরে এল মারিশার কাছে।
ওর মুখোমুখি বসে ফিচলে একটা হাসি হাসল সে। তারপর নিচু স্বরে ফিসফিসিয়ে বলল, “নাও, লাইট অফ করে দিয়েছি। এখন এই আবছা অন্ধকারে তুমি আনক্লোথড হলেও খুব একটা লজ্জা করবে না। কারণ, আমিও তোমাকে খুব একটা স্পষ্ট দেখতে পাব না। তো, এবার শুরু করা যাক?”
