Home বুনো মেঘের হাতছানি বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৬

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৬

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৬
ইসরাত জাহান দ্যুতি

সরু‚ চিকন করিডরের প্রথম ঘরটাই ছিল মারিশার। একজন স্টাফ ঘরটা খুলে দেওয়ার পর সে ঢুকে পড়ল ভেতরে। ব্যাগপ্যাকটা টেবিলের ওপর ছুড়ে ফেলেই মারিশা বিছানায় চলে গেল। তার ঘরটিকে বলা হয় মাউন্টেন ভিউ ডিলাক্স রুম। বড়ো ঘরটিতে আছে টিভিসহ ড্রেসিং টেবিল‚ সেন্টার টেবিল‚ বিছানার পাশে দুটি চেয়ার ও টি টেবিল‚ আর আরও কিছু প্রয়োজনীয় ছোটো আসবাবপত্র।

বারান্দার কাচের দরজাটা খুলতেই পাহাড়ি শীতল হাওয়া এসে গায়ে ঝাপটে পড়ে। বারান্দাতেও দুটি চেয়ার আর একটি কফি টেবিল রাখা। রেলিং ধরে সামনে তাকালেই মনে হয় আকাশ আর পৃথিবী এক বিন্দুতে মিলেছে। উঁচু পাহাড়ের চূড়া থেকে ভেসে আসে মেঘের দল। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বিস্তীর্ণ উপত্যকা‚ যেন সবুজের এক ঘন গালিচায় মোড়া। সেই সবুজের বুকে শান্তভাবে শুয়ে আছে রূপা লেক। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা সবুজ ঢালগুলো লেকের কিনারে মিশে গেছে—ঠিক যেন কোনো নিপুণ হাতে সাজানো বাগান। দূর থেকে দেখলে মনে হয় লেকের সবুজ জল আর পাহাড়ের সবুজ ঢেউ মিলেমিশে একাকার।

কিন্তু প্রকৃতির এ অপার সৌন্দর্যের চেয়েও মারিশাকে বেশি আনন্দিত করত তার পড়শীর ঘর। যে ঘর ছদ্ম নামের পুরুষ শেহনানের। বারান্দা দুটো পাশাপাশি‚ চাইলে ছোটো রেলিং টপকে একজন অন্যজনের বারান্দায় চলে আসতে পারে। কিন্তু শরীর ও মনের ক্লান্তিতে মারিশা বিছানা থেকে উঠে সেসব কিছুই দেখতে পেল না।
রাত ইতোমধ্যেই অনেক হয়ে গেছে। অনেকক্ষণ শুয়ে থাকার পর ক্ষুধার চোটে খুব খারাপ লাগল যখন‚ মারিশা তখন বিছানা ছেড়ে খাবার অর্ডার করল। তারপর চলে গোসলের জন্য।
এদিকে পরাগরা সবাই খাওয়া-দাওয়া শেষ করে বারান্দায় বসে সিগারেট ফুঁকছে ও গল্পগুজব করছে‚ মারিশাকে কেন্দ্র করে। শেহনান বাদে ওরা চারজন একই ঘরে থাকছিল, কারণ বড় বড় দুটি বিছানা ছিল ওদের ঘরে।
কেবল শেহনানই রাতের খাবার শেষ করে বাইরে বের হয়েছে। ওর ঘরের সামনে সবুজ ঘাসের ছোট্ট খোলা আঙিনা‚ তার চারপাশে রেলিং। সেই রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে হিমালয়ের শীতল বাতাসে গা ভাসাচ্ছে আর সামনের সবুজ উপত্যকা ও রূপা লেকের শান্ত জলে চোখ বুলাচ্ছে। কিন্তু চোখে একটু আনমনা ভাবও দেখা গেল ওর। হঠাৎ পিছু ফিরল। দোতলার বারান্দার দিকে তাকাল একবার। না‚ নিজের ঘরের বারান্দায় নয়‚ পড়শীর বারান্দাতে। সেখানে এখন পর্যন্ত কারও আগমন হয়নি; কাচের দরজার পর্দাটাও সরানো হয়নি।

কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে ফোনে সময় দেখল‚ বারোটারও বেশি বাজছে রাত। ফোনটা নাইট প্যান্টের পকেটে পুরে চলে এল হোটেলের ভেতর। সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় সামনে একজন হোটেল স্টাফকে দেখল‚ নেপালি থালি আর ককটেল নিয়ে দোতলায় যাচ্ছে। করিডরে পৌঁছতেই সেই স্টাফ থেমে গেল মারিশার ঘরের সামনে। কলিংবেল বাজানোর আগেই শেহনান থামাল ছেলেটাকে। জিজ্ঞেস করল‚ “ম্যাডাম অর্ডার করেছে ককটেল?”
ছেলেটা মাথা নেড়ে উত্তর দিল। তারপর হঠাৎ শেহনানের পুরো অবয়ব লক্ষ করেই চকচক করে উঠল তার চোখদুটো। উত্তেজিত কণ্ঠে বলল‚ “হ্যালো স্যার‚ আপনি… আপনি…”
বেচারা শেহনানের নামটা ভুলে যাওয়ায় নাম ছাড়াই বলে গেল‚ “আমি আপনাকে ন্যাশনাল জিয়োগ্রাফিকে দেখেছি অনেকবার৷ আপনার ওয়াইল্ড লাইফ ডকুমেন্টারি ফিল্মটা খুব ভালো লেগেছিল।”
শেহনান মুচকি হেসে ধন্যবাদ জানিয়েই বলল‚ “এই ককটেলটা আমার চাই।”

থতমত খেল ছেলেটা। অন্য একজনের অর্ডার করা জিনিস এমন একজন খ্যাতিমান এক্সপ্লোরার হুট করে চেয়ে বসলে তো ভড়কে যাওয়ারই কথা। সে আমতা আমতা করে বলল‚ “স্যার‚ এটা তো এক গেস্টের অর্ডার। আমি আপনাকে আরেকটা ককটেল সার্ভ করছি কিছুক্ষণের মাঝেই।”
“আমার এটাই লাগবে”‚ বলেই স্টাফের কাছ থেকে ককটেলটা নিয়ে নিল সে। তারপরই একটা কথা ভাবল। এটা না পেলেই মারিশা এই স্টাফ বেচারাকে বকাঝকা করে আরেকটা অর্ডার করবে নিশ্চয়ই? তাই বলল‚ “আচ্ছা‚ আপনি খাবারটাও আমাকে দিয়ে চলে যান।”
“সরি স্যার?” এবার একটুই বেশিই ভড়কাল ছেলেটা।
তার মনের অবস্থা টের পেয়ে শেহনান জানাল‚ “শি ইজ মাই ফেলো ট্রাভেলার৷ আপনাকে কোনো সমস্যায় পড়তে হবে না।”

স্বস্তি পেল ছেলেটা। নয়তো এই বিখ্যাত লোককে মুখের ওপর না বলত কী করে? তবে খাবারটা শেহনানকে দেওয়ার আগে ওর সঙ্গে একটা সেলফি তুলে তারপর বিদায় নিল সে।
খাবার হাতে নিয়ে শেহনান একবার ভাবল‚ ককটেলটা দিব্যদের কাছে রেখে আসবে আগে৷ কিন্তু সমস্যা হলো‚ এটা নিয়ে আবার ওদের মাঝে ঠাট্টা-তামাশা শুরু হবে৷ আর তাতে ফিরতে দেরি হয়ে যাবে ওর। তাই আর গেল না। মারিশার দরজায় কড়া নাড়ল দুবার। কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে আরও দুবার টোকা দিল দরজাতে‚ কলিংবেলটাও বাজাল। কিন্তু দরজাটা সহজে খুলল না মেয়েটা। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর যখন খুলল‚ সামনে চাইতেই তখন দারুণ এক ঝটকা খেল সে।

গায়ে জড়ানো সাদা তোয়ালেটা মারিশার বুক থেকে হাঁটু ছুঁই ছুঁই‚ ভেজা চুলগুলো তার খোলা ঘাড়ের ওপর ছড়িয়ে‚ আর শরীর থেকে ভেসে আসছে মোহনীয় এক পারফিউমের ঘ্রাণ। কী আশ্চর্য! মেয়েটা কি পারফিউম মেখে গোসল করেছে? ধুরঃ! তার থেকেও বড়ো কথা‚ সে এই বেশে কী করে স্টাফের সামনে দাঁড়াতে পারে?
মুহূর্তেই চোখ-মুখ শক্ত হয়ে উঠল শেহনানের৷ ওর ইচ্ছা করল খাবারগুলো এখানেই ছুড়ে ফেলে চলে যেতে৷ কিন্তু কী ভেবে যেন শান্ত হয়ে গেল আবার৷ তারপর কোনো কথা ছাড়াই ঢুকে পড়ল ভেতরে৷ খাবারগুল টেবিলের ওপর রেখে নির্লিপ্ত চোখে ফিরে তাকাল মারিশার দিকে।
দরজাটা বন্ধ করে দিয়েছে মারিশা। কপালের ওপর থেকে ফ্রিঞ্জচুলগুলো সরাতে সরাতে সেও দেখতে লাগল ওকে৷ দেখতে দেখতেই চুপচাপ এসে বসল বিছানার ওপর‚ পায়ের ওপর পা তুলে। তাতে তার ঊরুর অংশটুকু দেখাল আরও খোলাখুলি। সেখান থেকে গম্ভীর চোখদুটো তুলতে তুলতে শেহনান তার সারা অঙ্গেই দৃষ্টি বুলাল। তারপর নীরবতার জাল ছিন্ন করল মারিশাই‚ “রেগে আছেন না-কি?”

রাগটা অবশ্য গিলে নিয়েছে শেহনান। কেননা সে বুঝে গিয়েছে‚ ডোরহোল থেকে ওকে দেখেই এমন পাগলামিটা করেছে মারিশা। তাই বলল‚ “অচেনা‚ অজানা কারও ওপর রাগ করতে যাব কেন? কী কারণে?”
কথাটা শুনে শীতল চাউনিতে তাকিয়ে রইল মারিশা। খুব করে চাইল‚ মাথাটা গরম না করতে৷ কিন্তু শেহনান বলল তখনই‚ “ভাবতে ভালোই লাগে আমার‚ কোনো তুর্কিশ বিউটি আমাকে সিডিউস করার চেষ্টা করছে প্রতিনিয়ত৷ তবে দুঃখজনক যে‚ আমি তার মাঝে কোনো অ্যাট্রাকশন খুঁজে পাচ্ছি না। মেবি ইটস ওনলি দ্যাট আই’ম ইউস্ড টু উইমেন ফার মোর অ্যাট্র্যাকটিভ দেন হার।”
শেষ বাক্যটাই যেন মারিশার মাথায় আগুন জ্বালিয়ে দিল। বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেই শেহনান প্রস্তুত হয়ে রইল‚ তার আক্রমণ সামলানোর। কিন্তু মারিশা ওকে পার করে টেবিলের কাছে গেল হঠাৎ। কৌতূহলী চোখে শেহনান দেখতে লাগল তাকে। ককটেলটা হাতে নিয়েই চোখের পলকেই বোতলের ক্যাপ খুলে মারিশা ঢকঢক করে সেটা খেতে আরম্ভ করল৷ শেহনান গিয়ে দ্রুত সেটা কেড়ে নিল বটে। মুহূর্তেই ধমকেও উঠল‚ “কোন সাহসে আবার ড্রিঙ্ক করছ তুমি?”

তারপরই বলল‚ “আমাকে নাজেহাল করলে আমি কিন্তু সত্যিই এখানে মিরানকে আসতে বাধ্য করব। আই উইল নট টলারেট অ্যানি অফ ইয়োর এক্সেসেস।”
মারিশা হঠাৎ ধাক্কা মেরে বসল ওর বুকে‚ “আমি বাড়াবাড়ি করছি শুধু? তুমি করছ না?” শেষ প্রশ্নটার পরই ওকে আবারও ধাক্কা মারল৷ পিছিয়ে বিছানার কাছে চলে এল শেহনান।
দাঁতে দাঁত চেপে মারিশা বলল তারপর‚ “প্রথমে আমাকে না চেনার ভান‚ তারপর নিজের ভুল নাম…”
“না চেনার ভান কে করেছিল আগে?” মারিশার কথার মাঝেই ব্যঙ্গ করে বলে উঠল শেহনান‚ “আপনার পরিচয়টা তো জানা হলো না‚ বাডি… থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ। এত চমৎকার করে আমার পরিচয়টা চেয়েছিলেন তখন! আমরা নিশ্চয়ই তাহলে অপরিচিত ছিলাম?”

“শুরুটা তুমিই করেছিলে। আমি অসুস্থ হয়ে কাতরাচ্ছিলাম যখন‚ তখন তুমি আমার অবস্থা দূরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলে। যেন চেনোই না আমাকে। তারপর দয়া হলো বোধ হয়৷ কিন্তু কাছে এসেও এমন এক আচরণ করলে‚ যেন আমি কোনো স্ট্রেঞ্জার। আবার বলছিলে‚ আমার সম্ভবত হালকা হাইপোগ্লাইসেমিয়া৷ ওহো… সেদিনের আগে তা জানতেই না তুমি! সেদিন আমাকে চিনতে চাওনি বলেই রাগ হয়েছিল আমার।”
দীর্ঘ বছর হারিয়ে যাওয়া কোনো আপন মুখ একদিন অকস্মাৎ এসে সামনে দাঁড়ালে যে অনুভূতি হয়‚ বিস্ময় আর অবিশ্বাসের‚ ঠিক তেমনই তো অনুভব হয়েছিল শেহনানেরও। পার্থক্য কেবল ওর আপন মানুষটা হারিয়ে যায়নি‚ ওকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল৷ বোকার মতো তবুও এক বছর… দু বছর অপেক্ষা করেছিল ও৷ ভেবেছিল ফিরে এসে সে বলবে‚ ও যা দেখেছে… যা শুনেছে‚ তার সমস্ত কিছু মিথ্যা। কিন্তু আর ফেরেনি সে৷ বিশ্বাস করে নিয়েছিল তাই‚ আর কোনোদিন সে ফিরবেও না৷ অথচ চার বছর পর ভিনদেশের মাটিতে এসে ওর মুখোমুখি হলো মেয়েটা এক অস্বাভাবিক বেশে৷ বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে কতক পল চেয়েই ছিল তাই৷ যখন বিশ্বাস হলো‚ ও ভুল দেখছে না… ওর ভ্রম নয় সে‚ তখনই তো এগোল কাছে। কিন্তু এত বছর পর ওর মুখোমুখি হলো কি সে অপ্রত্যাশিতভাবেই? না-কি পরিকল্পিতভাবে? তা বুঝে উঠতে পারছিল না। তাছাড়া যার ওপর আর কোনো অধিকার নেই‚ কোনো সম্পর্ক নেই‚ একার সিদ্ধান্তে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে যে স্বেচ্ছায় ছেড়ে গিয়েছিল‚ তাকে চিনবেই বা কেন?
ধীরস্বরে প্রশ্নটা করেও বসল শেহনান‚ “আমার কি চেনা উচিত?”

এক মুহূর্তের জন্য থমকাল মারিশা। জবাবটা দিতে চেয়েও দিল না। কারণ‚ মাথায় এল তখনই গাড়ির ভেতরের কথাগুলো৷ তেজি স্বরে বলল‚ “সে আলাপে না হয় পরেই যাই৷ কিন্তু গাড়িতে ওরা কী বলছিল? আমি তোমার কাঁধে মাথা রাখাতে বারবার আমাকে ঠেলে সরাচ্ছিলে এমনভাবে‚ অ্যাজ ইফ আই ওয়ার সাম ফিলথি থিং। অথচ কোন চাইনিজ মেয়েকে বুকে ঠিকই আগলে রেখেছিলে…”
রাগে অস্থির হয়ে পড়ে মারিশা হাঁপাতে লাগল৷ চোখ-মুখও তীব্র রক্তিম হয়ে উঠল তার। অতীতে সে চটচটে মেজাজের থাকলেও এতটা বেশিও রাগ ছিল না তার কখনোই। শেহনানের তাই একটু অস্বাভাবিকই লাগল তাকে৷ ওর মনে হলো‚ এই যে সহজেই এতটা রেগে যাওয়া‚ যেন তার মানসিক অসুস্থতার ইঙ্গিত এটা।
শেহনানের মৌনতার সুযোগে মারিশা চেঁচিয়ে উঠল হঠাৎ‚ “কীভাবে অন্য কোনো মেয়েকে জড়িয়ে ধরেছিলে তুমি? কীভাবে?”

“ব্যাক আফ”‚ ধমকটা নিচু এবং ঠান্ডা স্বরে দিল শেহনান। শান্ত দৃষ্টিতে চেয়ে বলল সে‚ “ইউ আর নট এন্টাইটেল্ড টু প্রাই ইন্টু মাই পারসোনাল অ্যাফেয়ার্স। তাও আপনাকে অবগত করছি‚ বাই দ্যাট পয়েন্ট‚ শি ওয়াজ অলরেডি মাই গার্লফ্রেন্ড। আরও ভালো করে আপনাকে অবগত করছি‚ ডিউরিং দ্য পাস্ট ফোর ইয়ার্স‚ আই হ্যাভ এনগেজড ইন নিউমারাস রোমান্টিক রিলেশনশিপস। ইভেন নাউ‚ আই হ্যাভ আ ওন্ডারফুল গার্লফ্রেন্ড।”
“গার্লফ্রেন্ড!” শব্দটা ফিসফিসয়ে উচ্চারণ করল মারিশা। দৃষ্টিতে তার অবিশ্বাস আর চমক।
তা যেন বুঝতে পেরেই শেহনান বলল‚ “লাইফে যখন বেটার অপশন আসে‚ তখন আমার মুভ অন করাটা অসম্ভব কি? আমার জীবন আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। যার একটা মুহূর্ত আমি হতাশায় ভুগে পার করতে রাজি নই‚ কিংবা এক্সের অপেক্ষায়। বরং অপেক্ষা ব্যাপারটাই আমার কাছে অগুরুত্বপূর্ণ। এত ছোটো একটা জীবনে কত আনন্দ পাওয়া বাকি আমার… কত কিছু করার‚ কত কিছু দেখার বাকি। সেখানে আমি জীবনটাকে একটা জায়গায়‚ একটা অনুভূতিতে স্থির রাখব না কখনোই৷ আমার জীবনদর্শন‚ চিন্তাধারা আপনাকে ঠিকঠাক এক্সপ্রেস করতে পারছি তো? বুঝতে পারছেন আমি কী বলতে চাইছি?”
ইতোমধ্যে গালদুটো নীরব অশ্রুতে ভিজে গেছে মারিশার। বেপরোয়া রাগটুকু যেন ওই অশ্রুতেই শীতল হয়ে গেছে তার। শান্ত ভঙ্গিতে মাথাটা নাড়িয়ে “হুঁ” বলল।

“যাক ভালোই…” স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল শেহনান‚ “অল্প কথাতেই আপনাকে বোঝাতে পারলাম তাহলে। ভেবেছিলাম অনেক কথা খরচ করতে হবে। আমি কাল সকালেই বেরিয়ে যাব। আশা করছি আমার পিছু নেওয়ার আর কোনো প্রয়োজন নেই আপনার। তবে পূর্ব পরিচিত যেহেতু‚ তাছাড়া মিরানের একমাত্র বোন আপনি। সেহেতু একটা দায়িত্ববোধ আছে আমার। সেই দায়িত্ব থেকেই সারা পথ আপনাকে খেয়াল রাখতেও হচ্ছিল৷ আপনার ফিজিকাল স্টেট আর আগের মতো নেই। অন্তত ট্রেকিং করার মতো ক্ষমতা আর নেই আপনার। একা একা ট্রাভেল করাটাও উচিত হবে না। ইস্তাম্বুল ফিরে যান। আপন মানুষদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি করুন।”
“তোমার অ্যাডভাইজের জন্য থ্যাঙ্কস…”‚ বলে চোখের পানিটুকু মুছে সে হাসল একটু। তারপর বলল‚ “তুমি একজন বোল্ড অ্যাডভেঞ্চারার হতে পারো। কিন্তু তোমার ডিসার্নিং আই খু্বই দুর্বল। মানুষকে যাচাইয়ের জন্য তোমার আরও এক্সপেরিয়েন্স প্রয়োজন।”
“আচ্ছা?” ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল শেহনান।
মারিশা জিজ্ঞেস করল‚ “তুমি তো নিজের মতো কাউকে কামনা করতে। তোমার গার্লফ্রেন্ডও কি তোমার মতোই কেউ?”

“সব সময়ই পছন্দ‚ অপছন্দ একরকম থাকে না সবার। মানুষ বদলায়‚ মানুষের কামনাও বদলায়।”
“এত ঘুরিয়ে বলছ কেন? সে কী‚ কেমন‚ সরাসরিই বলো না!”
“এরপর সে দেখতে কেমন‚ কোথায় থাকে‚ কবে বিয়ে করব… এসবই তো জিজ্ঞেস করবে? অ্যাজ এভ্রি ফরমার পার্টনার ডাজ‚ অবভিয়াসলি”‚ বিরক্ত প্রকাশ করে বলল শেহনান।
তাতে বেশ চটেই গেল মারিশা‚ “বারবার এক্স‚ ফরমার পার্টনার বলে কী প্রমাণ করতে চাইছ? অ্যাম আই ইভেন ইয়োর এক্স? তোমার ক্ষমতা তো দূর‚ তোমার বাপের ক্ষমতা আছে আমার পারমিশন ছাড়া তোমাকে বিয়ে দেওয়ার?”
“নেই!” যেন খুব চমকাল শেহনান। কপট বিষণ্ণ সুরে বলল‚ “তাহলে কী হবে আমার? আমি কি তবে সারা জীবন আপনার পারমিশনের অপেক্ষায় বউ ছাড়া থাকব?”
“মজা করবে না বলছি!” ধমকে উঠল মারিশা। “নিজের নাম নিয়ে পর্যন্ত মজা করেছ তুমি। আর তুমি এখনো মিথ্যা বলছ আমাকে। কোনো গার্লফ্রেন্ড নেই তোমার।”

“কী সত্য‚ আর কী মিথ্যা‚ তা বিশ্বাস করানোর ইচ্ছা আর সময়‚ কোনোটাই আমার নেই। আর নাম নিয়ে মজা করেছি‚ তা যে আপনি বুঝতেই পারেননি‚ সেটা দেখে তো আমি নিজেই অবাক…”‚ তিক্তপূর্ণ হাসিতে বলল সে‚ “দেখেছেন‚ কতটা অবহেলিত ছিলাম আমি আমার এক্সের কাছে? সে আমার সম্পূর্ণ নামটা সম্পর্কেও অবগত ছিল না কখনো!”
মারিশা একটুখানি দমল বটে। কিন্তু এ কথাগুলোর জবাবও আছে তার কাছে। বলতেও চাইল তা৷ কিন্তু তখনই বিছানার ওপর পড়ে থাকা তার ফোনটা বেজে উঠল পাখির কিচিরমিচির রিংটোনে। কলটা এসেছে হোয়াটসঅ্যাপে। কলদাতার নামসহ ছবিটা ফোনস্ক্রিনে ভেসে উঠতেই দুজন একই সঙ্গেই দেখল সেটা। আঁতকে উঠল মারিশা সহসাই৷ আর শেহনানের চোয়ালদুটো শক্ত হয়েই ভাঁজ পড়ল ভ্রুজোড়ার মাঝে। দুজন এক সঙ্গেই পা বাড়াল সেদিকে। কিন্তু মারিশা ধরার আগেই তার হাতের নিচ থেকে ফোনটা ছোঁ মেরে তুলে নিল শেহনান। কলদাতার ছবিটা ভালো করে দেখে কঠোর চোখে একবার চাইল মারিশার দিকে।

“ফোনটা আমাকে দাও”‚ হাত বাড়িয়ে ফোন নিতে গেল মারিশা।
শেহনান দিল না৷ রিসিভ করতে গেলেই মারিশা ওর হাত ধরে টানাটানি শুরু করল‚ “কী হচ্ছে‚ আশফি?”
“ডোন্ট এভার কল মি আশফি”‚ কড়া গলায় সাবধান করল সে।
মারিশা আরও জেদি হয়ে বলল‚ “আশফি ডাকব না তো কী ডাকব? দাদা শেহনান ডাকব? আমি আশফিই ডাকব। প্রয়োজনে আশফি আনজার চৌধুরী বলে ডাকব। এখন আমার ফোন দাও। এটা আমার ফোন। তুমি নিচ্ছ কেন? দাও বলছি।”
“আর ফোন দেওয়া মানুষটা আমার ভাই…”‚ ধমক স্বরে বলল আশফি‚ “দিশানের সাথে তোমার যোগাযোগ কেন? কবে থেকে?”

উত্তরের অপেক্ষা করল না সে। রিসিভ করেই কানে ধরল ফোনটা। ওপাশ থেকে ভেসে এল চঞ্চল কণ্ঠের রসিকতা‚ “হ্যালো… দিজ ইজ দিশান ইবরাজ। ফ্রম বাংলাদেশ‚ মাহবুব ভিলা। থ্যাঙ্ক ইউ ফর আনসারিং মাই কল। মেই আই হ্যাভ আ ফিউ মোমেন্টস অফ ইয়োর টাইম নাউ‚ ভাবিজান?”
“না… সময় তোর ভাইয়ের হবে”‚ বজ্রগম্ভীর সুরে জবাব দিল আশফি।
অপ্রত্যাশিত ভাইয়ের গলা শুনে দিশান ভালোই চমকাল। ফোন কানে ধরেই বিড়বিড়িয়ে উঠল‚ “আনবিলিভেবল! আমি ভূমিকা রাখার আগেই মিলে গেল ওরা?”
“থাপ্পড়ে তোর কান ফাটাব আমি”‚ কঠিন এক ধমকে বলল আশফি‚ “ওর সঙ্গে তুই কার পারমিশন নিয়ে কথা বলিস? এত আস্পর্ধা তোকে কে দিল?”
“ও কে‚ ভাই? কার কথা বলছিস তুই? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।”
দিশানের নাটকে মেজাজ এবার সম্পূর্ণ হারাল আশফি‚ “ভাবিজান বললি কাকে? কে তোর ভাবি? তোর ভাইয়ের বউ আছে?”

“নাহ‚ আমার ভাইয়ের কোনো বউ নেই তো! বউ নেই বলেই তো সবাইকেই ভাবিজান বলে পটাতে চেষ্টা করি৷ যদি তোর কপালে লেগে যায় একটা।”
ধরা পড়েও শয়তানটা মজা নিচ্ছে দেখে আশফি আরেকটা ধমক লাগাল‚ “একটা লাথি মেরে তোর বদমাশি বের করব আমি! জানোয়ার! আজকে রাতেই তোর সবগুলো কার্ড ব্লক করার ব্যবস্থা করছি আমি! দাঁড়া!”
এবারে মশকরার ভূত পালাল দিশানের। রেগেমেগে বলল‚ “এই তোর সমস্যা কী? আমার কি বাকস্বাধীনতা নেই? আমার মুখ‚ আমি যাকে খুশি তাকে ভাবি ডাকব‚ দাদি ডাকব। ভাবি বললে সে যে তোরই বউই হয়ে যাবে‚ এটা কোথায় লেখা পেয়েছিস? আমি দাদাকে বিয়ে দিয়ে দাদিকে ভাবি ডাকব‚ তার প্র্যাক্টিস করছি। তোর সমস্যা তাতে? আর তোর কানেকশন ছাড়াও মাহির সাথে আমার আলাদা কানেকশন আছে‚ ওকে? সে আমার ফুপুর মেয়ে। আমি কথা বলতেই পারি ওর সাথে। তুই এত রাতে ওর ঘরে কী করছিস? মিরান ভাইয়ের পারমিশন নিয়েছিস? ফুপুর পারমিশন নিয়েছিস ওর ঘরে ঢোকার আগে? আবার আমাকে পারমিশনের বয়ান দিতে আসিস!”

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৫

“ফোন রাখ‚ কুত্তা”‚ চেঁচিয়ে উঠল আশফি‚ “দেশে ফিরে তোর হাল কী করব… বুঝতেও পারছিস না।”
যে’কজন পড়ছেন‚ তারা কাইন্ডলি গঠনমূলক মন্তব্য রাখার চেষ্টা কোরেন৷ নয়তো লেখার আগ্রহটুকু নষ্ট হবে‚ যেহেতু সময় নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে লিখতে হচ্ছে। সেই সময়টা আর দিতে মন চাইবে না ঠিকঠাক প্রতিক্রিয়া না পেলে।

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৭

1 COMMENT

  1. গল্প খুবই রোমাঞ্চকর হয়ে উঠছে ধিরে ধিরে বেশ interesting 👌

Comments are closed.