বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৯
ইসরাত জাহান দ্যুতি
গুগল ম্যাপের ওপর ভরসা করে বড়ো পথ ছেড়ে এক সরু গলির মধ্যে ঢুকল মারিশা। ম্যাপ দেখাচ্ছে এটাই নাকি সঠিক পথ! হেঁটে অনেকটা সামনে এগোনোর পর হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল ও। চোখেমুখে দ্বিধা আর চিন্তা। কোনদিকে এগোবে এবার‚ তার সঠিক নির্দেশনা দিতে পারছে না ম্যাপ। বুঝতে পারল‚ ওর ডিজিটাল দুনিয়া এই গ্রামের বাস্তবের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না আর। পথের মানচিত্রটি কেবল কিছু রেখা দেখাচ্ছিল। কিন্তু গ্রামের ভেতরে কোন পথটি বাঁক নিয়েছে বা কোথায় শেষ হয়েছে‚ তা স্পষ্ট নয়।
ভোরের আকাশ সবে ফরসা হচ্ছে৷ বলা চলে ধোঁয়াটে ফরসা। ও যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে‚ সে জায়গাটি গ্রামের ঠিক মধ্যিখান নয়। বরং যেন গ্রামের এক প্রান্ত থেকে আরেকটি প্রান্তে যাওয়ার সংযোগস্থল। দু’পাশে থাকা মাটির পুরনো বাড়িগুলোর ছায়া দীর্ঘ হয়ে পথের ওপর পড়ে আছে বলে পথগুলোকে আরও অন্ধকার ও রহস্যময় করে তুলেছে। তবে এখানে বাড়িগুলো কোনো নির্দিষ্ট সারিতে নয়‚ বরং এলোমেলোভাবে সাজানো। বেশিরভাগ বাড়িই পাথরের দেয়াল আর মাটির প্রলেপ দিয়ে তৈরি। যার ছাদে টিন বা খড়ের ছাউনি। কোথাও কোথাও কোনো বাড়ির রান্নাঘর থেকে কাঠের ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যাচ্ছে। ভেজা মাটি আর কাঠের উনুনের ওই পোড়া ধোঁয়ার এক অদ্ভুত মিশ্র গন্ধ ভেসে আসছে বাতাসে। গভীর নিস্তব্ধতা চারপাশে। কেবল কোনো কোনো বাড়ির ভেতর থেকে আসা কথোপকথনের ক্ষীণ শব্দ আর দূর থেকে ভেসে আসা গৃহপালিত পশুর ডাকাডাকি ভেসে আসছে মাঝে মাঝে।
মারিশা আশপাশে তাকাল। কোন পথ ধরে এগিয়ে গেলে আবার ভুল পথে চলে যাবে‚ এই আশঙ্কায় সামনে এগোনোর সাহস পেল না। কারও বাড়িতে গিয়ে কড়া নাড়ারও উপায় নেই। গ্রামের মানুষেরা এখনো তাদের উষ্ণ বিছানায় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ওর সামনে এখন তিনটি পথ—একটা ডানে‚ একটা বামে আর একটা সোজা। বাঁ দিকের পথটা সংকীর্ণ। যেটা দুই বাড়ির মাঝ দিয়ে এঁকেবেঁকে ওপরের দিকে উঠে গেছে। পথটির দুই পাশে ছোটো ছোটো ঝোপঝাড় আর তার শেষটা গিয়ে মিশে গেছে এক ক্ষেতের দিকে। পথটা দেখে মনে হচ্ছে এটাই হয়তো পাহাড়ে যাওয়ার পথ। কিন্তু নিশ্চিত হওয়ার কোনো উপায় তো নেই।
মাঝের পথটা সোজা সামনে চলে গেছে। এটা অন্য দুটি পথের তুলনায় কিছুটা চওড়া আর এর দুই ধারে কিছু পাথর দিয়ে সীমানা তৈরি করা। কিছু জায়গায় স্থানীয়রা পাথর বসিয়ে সিঁড়ির মতো ধাপ তৈরি করেছে‚ যাতে ওঠা-নামা সহজ হয়। এই পথটা গ্রামের আরও গভীরে প্রবেশ করেছে। যেখানে আরও কিছু ঘুমন্ত বাড়ি দেখা যাচ্ছে। পথটা দেখে প্রধান পথ মনে হলেও এর শেষ কোথায়‚ তা বোঝা যাচ্ছে না। আর তৃতীয় পথটা ডান দিকে বাঁক নিয়ে এক সবুজ অরণ্যে গিয়ে মিশেছে।
মারিশা ওর হাতের আইপ্যাডের দিকে তাকাল। উজ্জ্বল স্ক্রিনে শুধু একটি নীল বিন্দু কাঁপছিল। যেটা বোঝাচ্ছে সে ঠিক কোথায় আছে। কিন্তু কোন পথটা ওকে সঠিক গন্তব্যে নিয়ে যাবে‚ তা বোঝাচ্ছে না। গ্রামের এই নীরবতার মাঝে দাঁড়িয়ে রইল পথহারা মুসাফিরের মতো। আর পথের এই ত্রিভুজ তাকে এমন এক গভীর দ্বিধায় ফেলে দিল যে বুঝতে পারল না কোন পথটা তাকে এই অচেনা গোলকধাঁধা থেকে বের করে নিয়ে যাবে।
এদিকে ডেনিম প্যান্টের পকেটে কাঁপছে অন্য ফোনটা। অনেকক্ষণ ধরেই কাঁপছে—এক সেকেন্ড বিরতি না নিয়ে কল করেই চলেছে আশফি। অমন অপমানের পর তার হঠাৎ ওই সস্তা ফ্লার্টি কথাবার্তা বিরক্ত লাগছিল বলে ফোনটা কেটে দিয়েছিল তখন। কিন্তু প্রচণ্ড টেনশনে সব বিরক্তি উবে গেছে এখন৷ মারিশা ভাবছে‚ পথের নির্দেশনাটা নেবে না-কি একবার আশফির থেকে? কিন্তু জিজ্ঞেস করলেই তো জবান কাটারুটা আগে এমন সব কথা বলবে যে‚ শুনেই ওর চাঁদিতে আগুন ধরে যাবে। আসল কথা শোনার আর ধৈর্যই থাকবে না তখন!
এখন তবে উপায় কী? এভাবে মাঝ পথে দাঁড়িয়ে থাকলে তো বেগনাসকোটের চূড়া থেকে সূর্যদয়টাও দেখা হবে না‚ অন্নপূর্ণা রয়েল ক্যাম্পেও পৌঁছানো হবে না আজ। রাগের মাথায় রাত থাকতেই বেরিয়ে পড়াটা চূড়ান্ত বোকামি হয়েছে ওর। তা অবশ্য এখন বুঝে লাভ কী? এখন হয় নিজের ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে যে-কোনো একটা পথ বেছে নিতে হবে‚ আর নয়তো ফিরে যেতে হবে। বেলা হলে তারপর রওনা হতে হবে আবার। মিনিট দুয়েক ভাবনাচিন্তা শেষে হাতে থাকা ফোনের স্ক্রিনটা নিভিয়ে দিল সে। মনের ভেতরে জমে থাকা হতাশার কুয়াশা আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে। সামনে থাকা তিনটে অচেনা পথের দিকে তাকিয়ে থেকে আর লাভ নেই। ঠিক করল‚ ফিরেই যাবে। দ্বিতীয়বার হঠকারীর মতো না জেনেশুনে এগোনোর ভুলটা আর করতে চাইলো না৷ তবে রূপাকোট রিসোর্টে ফিরবে না সে। আশফির মুখোমুখি আর হবে না এ জীবনে।
যে পথ দিয়ে এসেছিল‚ সেই পথ ধরেই পা বাড়াল মারিশা। কয়েক কদম হাঁটার পরই তার চোখ পড়ল দূরের এক বাঁকে। আবছা আলোয় দেখতে পেল একটি ছায়ামূর্তি দ্রুত গতিতে এ পথেই এগিয়ে আসছে। প্রথমে সে ভাবল কোনো গ্রামবাসী হবে। কিন্তু মানুষটির হাঁটার ধরন আর তার গতিবেগ দেখে থমকে পড়ল ও। আস্তে আস্তে ছায়াটি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। বুকটা ধুকপুক করে উঠল ওর। এ তো আর কেউ নয়—আশফি! পরনে সেই চেনা ছাই রঙা টি-শার্ট। মুখটা দেখাল যেন চিন্তায় মাখা। সে কি ওর খোঁজেই বেরিয়ে পড়েছে? তার চোখে মুখে এক ধরনের তীব্র অনুসন্ধান দেখতে পেল। চিন্তায় ডোবা সেই অনুসন্ধানী দৃষ্টিজোড়া দেখে ওর মনে হলো‚ যেন পৃথিবীর শেষ প্রান্তে গিয়ে হলেও কাঙ্ক্ষিত মানুষটিকে খুঁজে বের করবেই সে।
সংকীর্ণ মাটির রাস্তার দুই ধারে চোখ বুলানো শেষে সামনে চাইলো আশফি। প্রশান্তিময় নীরব ভোরের আবছা আলোতে আচমকাই আবিষ্কার করল অদূরে‚ ফ্লোরাল প্রিন্ট ব্লাউজ পরনে এক মেয়েকে। চুলগুলো মেসি বান করা। পিঠে একটা বিরাট ব্যাগপ্যাক আর হাতে ধরা আইপ্যাড। মুহূর্তেই থেমে গেল আশফি। তার মুখে থাকা উদ্বেগের রেখাগুলো মিলিয়ে গেল এক নিমিষেই।
হৃদয়ে জমে থাকা ভয় আর হতাশা হঠাৎ করেই উবে গেছে মারিশারও। আশফি যে ওর খোঁজেই বেরিয়ে ফোন করছিল এতক্ষণ‚ তা আর বুঝতে বাকি নেই। তবে তার চোখে চোখ পড়ার আগেই সে হাঁটতে শুরু করেছে আবার৷ না‚ ফিরতি পথ নয়৷ সে মোটেও ওই নির্দয়টাকে বুঝতে দেবে না‚ ও পথ চিনতে পারছে না।
দীর্ঘ এক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল আশফি। মারিশাকে ডেকে থামাতে চাইলো একবার৷ কিন্তু কিছু একটা ভেবে হাঁটতে শুরু করল ওর পিছু পিছু। রাগারাগি করার চিন্তাটাও বাদ দিল। মিনিট দশেক পর দেখা গেল মারিশা নিজেই থেমে পড়েছে সেই ত্রিভুজ পথের সামনে। আশফিকে না দেখার ভান ধরে আইপ্যাডের স্ক্রিনে গুগল ম্যাপটা দেখছে দাঁড়িয়ে। পুরো ব্যাপারটাই একরকম অভিনয় আরকি। কেবল অপেক্ষায় আছে সে‚ কখন আশফি এসে ওর সামনে দাঁড়াবে আর তখনই সে রাগ দেখিয়ে তাকে কপট বকাঝকা করে যে-কোনো একটা পথে এগিয়ে যাবে। ভুল হলে আশফি নিশ্চয়ই খোঁচা মেরে সঠিক পথটার কথা বলবে সে সময়?
এগিয়ে আসতে আসতে কয়েকটা বাঁকা কথা সত্যিই বলতে ইচ্ছা করল আশফির। কিন্তু তার বদলে সে মারিশাকে অবাক করে দিয়ে মারিশার পাশ কাটিয়ে চলে গেল বাঁ দিকের পথটাই৷ যেন ওকে দেখতেই পায়নি সে!
তার কাছে পথটা অচেনা নয়। সে জানে‚ ট্রেইলটা গ্রামের বসতি পেরিয়ে পাহাড়ি ঢাল বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে তারপর বনাঞ্চলে গিয়ে ঢুকে পড়ে। নির্বিকারভাবে হাঁটতে হাঁটতে একবার ঘড়িতে সময় দেখল সে। ছ’টা বেজে গেছে ইতোমধ্যে। বেগনাসকোটের চূড়া থেকে যদি সূর্যদয় দেখার উদ্দেশ্যেই বের হয় মারিশা‚ তবে তা দেখার ভাগ্য ওর হবে না। আরেকটু বাদেই সূর্য উঠে যাবে। আর চূড়ায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে সময় লাগবে আরও তিন ঘণ্টার মতো৷ রাত একটাই রওনা হলে সম্ভব ছিল ছটার মাঝে চূড়াতে পৌঁছানোর৷ পাগলটা শুধু শুধুই রাতের ঘুম হারাম করল নিজেরও‚ আর তারও৷ পথিমধ্যে যদি কোনো বিপদ হত! কী হত তাহলে? এটা ভাবতেই ঠান্ডা করা মেজাজটা আবার চটে গেল তার৷ তাই একবারও পিছু ফিরে দেখল না বেয়াদবটাকে৷ গটগটিয়ে ওপরের দিকে উঠতে থাকল শুধু। আর খেপা মনে ভাবল‚ সূর্যদয় দেখার সাধ আজ জনমের মতো মেটাবে সে। চূড়ায় নিয়ে গিয়ে রোদে দাঁড় করিয়ে রাখবে এমনভাবে যে‚ পাখিরাও ওর মাথায় ডিম ভাজা শুরু করবে। আর বেয়াদবটা ছায়া খুঁজতে দৌড়াবে!
মাটির পথটা গ্রামের শেষ প্রান্ত থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে ঢালু হয়ে উঠে গেছে ওপরের দিকে। যেন কোনো ঘুমন্ত সাপের পিঠের মতো এঁকেবেঁকে ওপরে উঠছে রাস্তাটা। মারিশা কোনো কথা না বলে অনেকটা দূরত্ব রেখে আশফির পিছু পিছুই যাচ্ছে। পেছনে ফেলে আসছে গ্রামের চিহ্ন‚ আর সামনে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে সবুজ দিগন্ত। পথের দু’ধারে ঝোপঝাড়গুলো ভেজা‚ তাদের পাতায় লেগে আছে ভোরের শিশির। কিছু দূর এগোনোর পর শুরু হলো বিস্তীর্ণ ফসলের ক্ষেত। বসন্তের এই সময়ে বেশিরভাগ ক্ষেতেই সরিষা ফুল ফুটতে শুরু করেছে৷ আর কোনো কোনো জায়গায় গম বা ভুট্টার কচি চারা দেখা যাচ্ছে। এভাবে কিছুক্ষণ হাঁটার পর ক্ষেতগুলো এখন ছোটো আর খাড়া‚ যেন পাহাড়ের ঢাল বেয়ে সিঁড়ির মতো ওপরে উঠে গেছে।
গ্রামের বসতিগুলো এখন কমতে শুরু করল। আকাশটাও একেবারে পরিষ্কার হয়ে গেল এর মাঝেই। এরপর হঠাৎই দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করল। সূর্য উঠে গেছে আরও কিছুক্ষণ আগেই৷ তবুও হাঁটা থামাল না আশফি। মারিশাও চঞ্চলতা আর চাপা আনন্দ নিয়ে তাকে অনুসরণ করতে করতে ভুলেই গেছে‚ সে সূর্যদয় দেখার উদ্দেশ্যে বেরিয়েছিল।
সামনে শুধু সবুজের দেয়াল। পথের দু’পাশের খোলা জায়গাগুলো ক্রমেই ঘন হয়ে এল। আর ওদের মাথার ওপর গাছের ডালপালা মিলেমিশে এক ছায়াময় ছাদ তৈরি করল। মাটির পথ থেকে সরে এসে এখন ওদের পায়ের নিচে শুকনো পাতার নরম কার্পেট। ওরা প্রবেশ করেছে বনাঞ্চলের মাঝে। এই বনাঞ্চলটি পাহাড়ের ঢাল বরাবর অনেকটা জায়গা জুড়ে বিস্তৃত৷ তবে পুরোটা ঘন নয়। মাঝে মাঝেই ফাঁকা জায়গা। যেখান দিয়ে নিচের উপত্যকার দৃশ্য দেখা যায়। সূর্যের আলোর প্রথম রেখাগুলো যখন পাতলা হয়ে গাছের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিল‚ মারিশার হাঁটা থেমে গেল ঠিক তখনই। বোধোদয় ফিরল ওর। যদিও সূর্যের প্রখর আলো সরাসরি নিচে আসতে পারে না। কারণ‚ এখানে গাছগুলো খুব কাছাকাছি না থাকলেও তাদের পাতা এবং শাখা-প্রশাখা মাথার ওপরে ছায়া তৈরি করে রেখেছে।
একটু আগের সকল চঞ্চলতা মরে গেছে মারিশার। মাথা তুলে ওপরের দিকে চেয়ে দুঃখ কণ্ঠে বলল‚ “কপাল আমার সব কিছুতেই মন্দ দেখি! কিছুই ভাগ্যে জোটে না।”
মাত্র হাত পাঁচেক দূরত্বে ছিল আশফি। মারিশার কথাটা ভালোভাবেই কানে এল তার। এতক্ষণ বাদে ফিরে তাকাল সে পেছনে৷ একই সময়ে চোখ নামিয়ে সামনে তাকাল মারিশাও। দুজনের চোখাচোখি হতেই মারিশা কাঠিন্য মুখ করে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল৷ হাঁটতে লাগল আবার। আশফির কাছাকাছি আসতেই তারই মতো না দেখার ভান করে তাকে পাশ কাটিয়ে যেতে চাইলো সেও৷ কিন্তু হলো না৷ শিকারী বাঘের মতো খপ করে চেপে ধরল ওর বাহুটা। একটানে নিজের কাছে এনেই ক্ষিপ্ত গলায় বলল আশফি‚ “কোথায় যাচ্ছ? চেনো… চেনো কিছু? কার ভরসায়ই বা যাচ্ছ শুনি? গুগল ম্যাপ? তো দেখাও একটু। দেখি‚ কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তোমার ম্যাপ?”
“কেন দেখাব তোমাকে?” শান্ত স্বরই মারিশার। “আমি যাচ্ছি বেগনাসকোটের চূড়াতে। তারপর আশপাশের কোনো একটা ক্যাম্পে যাব। আমি আমার মতো ট্রিপটা কাটাব। কিন্তু আমি কিছু চিনি বা না চিনি‚ তাতে তোমার কী? বরং প্রশ্ন তো আমার করা উচিত‚ তুমি কেন আমার পিছু নিয়েছ? প্লিজ‚ মিরানের বোন বলে এই সো কলড সম্পর্কের দোহাই দেওয়ার চেষ্টা কোরো না।”
“শাট ইয়োর ট্র্যাপ”‚ কঠিন এক ধমক দিয়ে উঠল আশফি। সেই স্বরেই বলল‚ “ফোন লাগাও মিরানকে! এক্ষুনি ফোন করো। ও কার ভরসায় তোমাকে এখানে পাঠিয়েছে‚ আমিও জানতে চাই।”
পকেট থেকে নিজের ফোনটাই বের করল আশফি। অফশোল্ডার টপ পরা মারিশার দিকে একবার তাকাল। ওর খোলা কাঁধজোড়ার ওপর বিভৎস রাগ নিয়ে দৃষ্টি বুলিয়ে মিরানের নম্বরটা খুঁজতে শুরু করল ফোনবুক থেকে। এক হাতে তখনো শক্ত করে ধরেই রাখল মারিশার বাহু। কিন্তু কল করার সুযোগটা দিল না মারিশা। ছোঁ মেরে ফোনটা কেড়ে নিল তার হাত থেকে। আগুন চোখে চাইলো আশফি৷ তা দেখে কাঁচুমাচু মুখে ইতিউতি করতে লাগল সে। আর ভাবতে লাগল‚ আপাতত আর চটানো যাবে না এই খ্যাপা ষাঁড়টাকে। ভাইয়ের কাছে ফোন গেলে ভাই তো আর এক মুহূর্ত দেরি করবে না ওকে নিতে আসতে। এখানে আসার জন্য বহু অশান্তি‚ কত ঝগড়া করে তারপর রাজি করাতে পেরেছিল ভাইকে!
এবং একমাত্র আশফির ভরসাতেই শেষমেশ রাজি হয়েছিল মিরান। কারণ সে খুব ভালোভাবে জানে‚ তার বোনের প্রতি যতই রাগ বা ঘৃণা থাকুক ওর‚ দায়িত্বের বেলাতে কোনোভাবেই অবহেলা করবে না ও মারিশাকে—সেটা তার জন্যই হোক‚ কিংবা নিজের ফুপুর জন্যই হোক। এখন যদি সেই দায়িত্বশীল মানুষটাই ফোন করে নালিশ করে তাকে‚ নেপালে আজকের দিনটাই হবে তবে শেষ দিন মারিশার।
কিন্তু এখন কীভাবে শান্ত করবে আশফিকে? এটা ভাবতে ভাবতেই মারিশা গম্ভীর গলায় বলল‚ “আমি কোনো স্ট্রেস দিতে চাইনি তোমাকে। খুব অস্থির লাগছিল রুমে৷ মন টিকছিল না আর ওখানে। তাই ভাবলাম সানরাইজটা দেখব বেগনাসকোট এসে৷ এর জন্য তো তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়তে হবে। আমি তোমাকে এই সময়েই জানাতাম ফোন করে‚ আমার চলে আসার কথাটা৷ আশপাশের কোনো একটা ক্যাম্পে গিয়ে থাকতাম তারপর। ওখানেরই কোনো একটা দলের সঙ্গে ট্রেকিঙে বের হতাম‚ ঘোরাফেরা শেষ হলে চলে যেতাম মায়ের কাছে। না না‚ এটা ভেবো না আবার‚ যে তোমার কাছাকাছি থাকার জন্য তোমার ফুপুর কাছে যাব৷ এখানে এসেছি জানার পর থেকে মা কান্নাকাটি করছে খুব। তাই যেতে হবে। টেনশন কোরো না একদম। আমি গেলে মা তোমাকে কখনোই ডাকবে না আমার কাছে আসার জন্য।”
“তোমার মায়ের কাছে তুমি যাবে‚ তা নিয়ে আমাকে কোনো কৈফিয়ত দিতে হবে না”‚ চড়া গলায় বলল আশফি‚ “আমার ফুপু ভালো করেই জানে‚ আমার সঙ্গে তার মেয়ের সম্পর্কটা শেষ। তাই তুমি চাইলেও আমার কাছে ঘেঁষতে পারবে না। সে নিজ দায়িত্বেই তোমাকে আটকাবে। সে তোমার মা হওয়ার আগে আমার ফুপু। তুমি তার কাছে মানুষ হওয়ার আগে আমি তার কাছে বড়ো হয়েছি। তোমার ওপর তার যতটা টান‚ ভালোবাসা‚ তার চেয়ে কিছু কম নয় আমার জন্যও। বরং তোমার থেকে বেশিই। তাই এসব ফালতু কথা বাদ দাও।”
“আচ্ছা বুঝলাম‚ এবার আমাকে ছাড়ো। ব্যথা পাচ্ছি।”
ছুড়ে ফেলার মতো হাতটা ছাড়ল আশফি। মারিশা রাগ‚ অভিমান‚ জেদ নিয়ে শেষবারের মতো তাকে দেখল। তারপর এগোল সামনের দিকেই। তা দেখে চেঁচিয়ে উঠল আশফি‚ “মাথার সাথে চোখও খারাপ হয়ে গেছে? ওদিকে আর কী জন্য যাচ্ছ? দেখতে পাচ্ছ না সূর্য উঠে গেছে?”
“আমি সেটাই দেখব৷ তোমার সমস্যা?” না থেমে চেঁচিয়েই উত্তরটা দিল মারিশা। তারপর এও জানাল‚ “আমার গন্তব্যে আমি যাচ্ছি। তুমি তোমার পথে হাঁটো।”
আশফির তখন খেয়াল হলো—একটু আগেই সে বলছিল ক্যাম্পে গিয়ে থাকার কথা‚ আর সেখান থেকেই নাকি ট্রেকিঙে বের হবে কোনো দলের সাথে! ব্যাপারটা নিয়ে আপাতত কিছু বলল না। ওর পিছু নিল চুপচাপ। বনের ভেতর পথটা মোটেও সমতল না৷ বেশ উঁচুনিচু আর পাথুরে। কোথাও বড়ো বড়ো গাছের শিকড় মাটির উপর বেরিয়ে এসে সিঁড়ির মতো ধাপ তৈরি করেছে‚ আর কোথাও ভেজা মাটির পথ ঢালু হয়ে নিচের দিকে নেমে গেছে। হালকাভাবে পিচ্ছিলও সে পথ। প্রতিটি পদক্ষেপেই তাই সতর্ক থাকতে হচ্ছিল আশফিকে৷ না‚ নিজের জন্য নয়। এক হাত সামনে চলা পাগলটার জন্য। ওরা একে অপরের সঙ্গে কোনো কথাই বলছিল না। কারণ শুধু নিজেদের মাঝের রাগ‚ অভিমান আর আক্রোশই নয়। এই নীরব বনের ঐশ্বরিক পরিবেশ ওদের কথা বলার প্রয়োজনই কেড়ে নিয়েছে যেন।
পায়ে পায়ে ওরা বনের আরও গভীরে প্রবেশ করল যখন‚ তখন ফুটে উঠল বনের অসাধারণ রূপটা। বড়ো বড়ো ওক‚ পাইন‚ দেবদারু গাছের কাণ্ডে লেপটে আছে শ্যাওলার সবুজ নরম চাদর। কিছু কিছু ওক গাছ অনেক পুরনো এবং আকারে বিশাল। যা এই অঞ্চলের প্রাচীন বনভূমির পরিচয় বহন করে। নিচে ডালপালা আর ফার্নের মতো গুল্ম ছড়িয়ে ছিটিয়ে। আর বাতাসটা এখানে তুলনামূলকভাবে শীতল আর আর্দ্র। ভেজা মাটির গন্ধ‚ শ্যাওলা পড়া পাথরের সুবাস আর দূর থেকে ভেসে আসছিল এক অজানা পাখির গান। মনের ভারটা ধীরে ধীরে দুজনেরই হালকা হয়ে আসছিল। বহুদিন পর মারিশা প্রকৃতির আপন জগতে এল৷ ওকে তাই একটু বেশিই প্রাণোচ্ছল দেখাচ্ছিল।
বসন্তের এই সকালে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করছিল মারিশাকে গুরাস ফুলগুলো। ঘন সবুজ পাতার মাঝে হঠাৎ হঠাৎ জ্বলে উঠেছে সাদা আর হালকা গোলাপি রঙের ফুলের ঝাড়‚ ফুলের চারপাশে নানা রঙের প্রজাপতি‚ আর কিছু কিছু ডালে মৌমাছির ঝাঁক দেখা গেল। তা দেখতে দেখতে মারিশার মনে হলো‚ এটা কোনো শিল্পীর রং তুলিতে আঁকা ক্যানভাস৷ আর সেই ক্যানভাসের মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে ও। সকালের প্রথম আলোয় ফুলগুলো আর ফুলের চারপাশে রঙিন প্রজাপতির উড়াউড়ি দেখতে এত ভালো লাগল যে‚ প্যান্টের পকেট থেকে ফোনটা বেরই আশফির দিকে ছুড়ে মারল সে। চঞ্চল গলায় বলল‚ “স্ন্যাপ টু লাভলি শটস ফর মি‚ ইয়াহ?”
আশফির উত্তর শোনার প্রয়োজন মনে করল না৷ সঙ্গে সঙ্গেই ছবি তোলার জন্য দাঁড়িয়ে পড়ল একটা গাছের নিচে৷ চুলটা একটু নেড়েচেড়ে ঠিকঠাক করে টপের বেলুন স্লিভটা কাঁধের ওপরে উঠে আসায় টেনে আরেকটু নিচে নামাল। তারপর বলল‚ “আমার পায়ের নিচ থেকে একদম গাছের মাথার ওপর অবধি ছবিতে আসবে‚ সেভাবে তুলবে। অবশ্য তোমাকে বলার প্রয়োজন নেই। সরি!” বলা শেষে ওপরে মুখ তুলে ফুলগুলো দেখতে লাগল৷ এমন ভঙ্গিতেই ছবিটা তুলবে সে।
ফোনটা হাতে নিয়ে গাম্ভীর্যপূর্ণ‚ শীতল দৃষ্টিতে ওকে দেখে যাচ্ছিল আশফি। হঠাৎ আমুদে গলায় বলে উঠল সে‚ “স্লিভ আরও খানিকটা নিচে নামাবে‚ ইয়াহ?”
মারিশা চোখ নামিয়ে তাকালে আশফি তখন ঠোঁটের দু কোণ বাঁকাল প্রশংসার ভঙ্গিতে‚ “আই সুএয়ার‚ তোমার ক্লিভেজে পুরো ভিউটাই ব্লাডি মাস্টারপিস হয়ে যাবে… ফরেস্টও হাত তালি দেবে!”
সূক্ষ্ম ব্যঙ্গটা ধরতে একটুও সময় লাগল না মারিশার। ধমকে উঠল তাকে‚ “একদম সার্কাজম করবে না! বেশি কথা বললে খুলেই ফেলব কিন্তু!”
“ওয়াও… “‚ চোখ বড়ো বড়ো করে ফেলল আশফি‚ “ইট উইল বি হিট ডিফ্রেন্ট।” যেন খুশিই হয়ে গেল সে।
“প্লিজ খোলো…”‚ কপট প্রলুব্ধ কণ্ঠে বলল‚ “আমার অভাগা চোখদুটো তাহলে আরও একবার সুযোগ পাবে তোমার টিটেড টপ প্রপারলি দর্শনের!”
ফোনের মধ্যে তেমন কিছু মনে না হলেও এভাবে সরাসরি কথাটা শুনতেই বিশম লজ্জা পেল মারিশা। সুন্দর করে দুটো ছবি তুলে দিলেই হয়। অথচ তা না‚ কী বিচ্ছিরি করে বিদ্রূপ করছে ওকে শয়তানটা! খেপাটের মতো পায়ের নিচ থেকে একটা নুড়ি পাথর কুড়িয়েই সেটা ছুড়ে মারল সে আশফিকে। মাথায় এসে লাগার আগেই মাথাটা দ্রুত ডানে সরাল আশফি।
চেঁচিয়ে বলল তখন মারিশা‚ “ছবিই তুলব না তোমার থেকে!” ভারী ব্যাগপ্যাকটা আবার কাঁধে চড়িয়ে পাতার ওপর মচমচ শব্দ তুলে হাঁটতে শুরু করল জোরে জোরে৷
চোখে চোরা হাসিটা নিয়ে আশফি আবার পিছু নিল। হঠাৎ পেছন থেকে ওর মেসি বানটা ধরে টান দিয়ে বলল‚ “বেকুব! পাহাড়ের ট্রেকিং রুট এদিকে না। ওদিকে…” বলেই ওকে ঘুরিয়ে দিল ডান দিকের পথে।
তার চুল ধরা হাতটা ঝাড়ি দিয়ে ফেলে সেদিকে হাঁটতে শুরু করল মারিশা। কিছু বুঝে ওঠার আগে আবার আশফি এগিয়ে এসে পেছন থেকে ওর টপের স্লিভ টেনে উঠিয়ে দিল কাঁধের ওপর। ক্রুদ্ধ হয়ে মারিশা ফিরে তাকাতেই সে নির্বিকারভাবে হেঁটে চলে গেল ওকে পার করে৷
হাঁটতে হাঁটতে কিছু দূর এসে হঠাৎ আশফি হাতের ইশারায় ওকে থামিয়ে দিল। রডোনডেনড্রন গাছের ডালে ফুলের থোকার মাঝে বসে আছে একটি পাখি। সেটাকে আঙুলের ইশারায় দেখাল সে৷ জিজ্ঞেস করল নিচুস্বরে‚ “চেনো ওই পাখিটাকে?”
তার ইশারা অনুসরণ করে মারিশা দেখল‚ পাখিটির মাথা আর গলা কুচকুচে কালো। কালো মাথার পেছনে ঘাড়ের কাছে একটি সাদা ছোপ‚ ঠোঁট আর পা’টা উজ্জ্বল হলুদ। পাখিটার পুরো শরীর গাঢ় নীল রঙের। ডানাগুলোও নীল ছিল‚ যার মাঝে মাঝে সাদা ও কালো ছোপ দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু পাখিটার সবচেয়ে অদ্ভুত জিনিসটা হলো তার লেজ। শরীরের তুলনায় লেজটা অস্বাভাবিক লম্বা‚ আর সেই লেজটা হালকা বাতাসে মনের সুখে নাড়িয়ে যাচ্ছে সে। মারিশা মুগ্ধ হয়ে পাখিটির দিকে তাকিয়ে রইল। পাখিটা অচেনাই। এই সুন্দর পাখিকে এত কাছ থেকে এর আগে কখনো দেখেনি সে।
“কী পাখি ওটা? ওয়াট আ স্টানার!” আশফির মতোই মৃদুস্বরে বলল।
“হিমালয়ান ব্লু পাইট বা ব্লু ম্যাগপাই”‚ জানাল আশফি‚ “নেপাল আর হিমালয় অঞ্চলের জাতীয় পাখি।” বলতে বলতে আবার হাঁটা শুরু করল সে।
মারিশাও আর দাঁড়াল না। পথিমধ্যে দুয়েকটা বানরও দেখতে পেল সে। তবে যা দেখল না তা হলো ওক গাছের একটা নিচু ডালে ঝুলতে থাকা বড়ো এক সাপ। সাপে কিছুটা ফোবিয়া কাজ করে ওর৷ সাপটা দেখে আড়চোখে ওকে দেখল আশফি। যাতে খেয়াল না করে‚ তাই আরও দুয়েকটা অচেনা পাখি চেনাতে লাগল ওকে।
এক পর্যায়ে গাছের সারি যখন পাতলা হতে শুরু করল‚ তা দেখে জিজ্ঞেস করল মারিশা‚ “যাত্রা কি শেষের পথে?”
কোনো উত্তর দিল না আশফি। একটু পর বনের ছায়া সরে যেতেই বেলা বেড়ে যাওয়ায় প্রখর রোদ সরাসরি এসে গায়ে পড়ল ওদের। বনাঞ্চলের ভেতরের পথটি শেষ। সামনে এখন দিগন্তবিস্তৃত উন্মুক্ত এক দৃশ্য। বনের শান্ত শীতল বাতাস এক নিমেষে বদলে গেল সতেজ‚ তীব্র বাতাসে। সামনের পথটা এবার পাথুরে আর খানিকটা ঢালু। এখানে আর গাছের সারি নেই। আছে কেবল ছোটো ছোটো ঝোপ আর রুক্ষ ঘাস। পথটা যেন এক অদৃশ্য রেখা ধরে সরাসরি আকাশকে ছুঁতে চাইছে। পায়ের নিচে শুকনো পাতা আর মাটির বদলে এখন শুধু নুড়ি পাথরের ঘষা লাগছে। কিছু কিছু জায়গায় পাথরগুলো আলগা। তাই সাবধানে হাঁটতে হয়।
মারিশা বিমুগ্ধ চোখে শুধু সামনে চেয়ে হাঁটছে দেখে আশফি টিটকারি মেরে বলল‚ “হাঁ টা বন্ধ করে একটু নিচে তাকাও। নিচে তাকিয়েও হাঁটো।”
বিরক্ত হয়ে ফিরল মারিশা তার দিকে‚ “হাঁ করে আছি কোথায়?”
“ওই হলো… কানার মতো একদিকে না চেয়ে নিচে দেখেও হাঁটতে হয়।”
বলার পর হাত ঘড়িতে সময়টা দেখল আশফি৷ বেলা বাজে ন’টা। কী ধীরে ধীরে এসেছে তাহলে ওরা! রোদের তেজও বেড়ে গেছে দেখে খু্বই বিরক্ত লাগল তার। এদিকে ক্ষুধাও লেগে গেছে৷ তখন ফিরে না গিয়ে এই রোদের মধ্যে চূড়াতে যাওয়ার কী দরকার ছিল? ফিরতে ফিরতে তো দুপুর গড়িয়ে যাবে। আজকের দিনটাই একদম মাটি! এত রাগ হলো আশফির‚ ইচ্ছা করল মারিশাকে কটা কঠিন ধমক দিয়ে কথা শুনাতে। তারপর ঘাড় ঠেসে ধরে রিসোর্টে ফেরত নিয়ে যেতে। এত বেয়াড়া বেয়াদবটা!
মারিশা নিজেও টের পাচ্ছিল আশফির রাগ আর বিরক্তি। কিন্তু তাতে ওর কী? ও তো আর বলেনি সঙ্গে আসতে! যদিও কাঁধের ভারী ব্যাগপ্যাকের কারণে একটু ক্লান্তই লাগছে ওর। তবুও সে স্বতঃস্ফূর্তভাবে হাঁটতে লাগল। যত উপরে উঠছিল‚ ততই ওদের পেছনে ফেলে আসা উপত্যকার দৃশ্য স্পষ্ট হতে শুরু করল। চারপাশে খোলা বাতাস আর মাথার ওপরে বিস্তৃত আকাশ। পায়ের কাছে মাটির সঙ্গে নিজেদেরকে আঁকড়ে ধরে রাখা ঝোপগুলোর ফাঁকে ফাঁকে ফুটে আছে কিছু বুনো ফুল। তাদের কোনো পরিচিত নাম নেই। ছড়িয়ে থাকা গাঢ় বেগুনি‚ উজ্জ্বল হলুদ আর সাদা নাম না জানা ফুলগুলো যেন রোদের ঝলমলে আলোতে ছোটো ছোটো তারার মতো জ্বলজ্বল করছে। তাদের স্নিগ্ধ সুবাসে বাতাস ভরে উঠেছে।
অবশেষে চূড়ার শেষ ধাপে পৌঁছাল ওরা। পায়ের নিচে এখন মাটির বদলে এক নরম‚ ঘাসময় চত্বর। পাহাড়ি হাওয়ায় দুলে যাচ্ছে তা। চোখ নামিয়ে বাম দিকে তাকাতেই মারিশা দেখতে পেল সেই বিখ্যাত রূপা লেক। লেকটির জল এত শান্ত ছিল যে মনে হচ্ছিল এটা উপত্যকার বুকে শুয়ে থাকা এক বিশাল আয়না। তার উলটো দিকে ডান পাশে দেখা গেল বেগনাস লেক‚ রূপা লেকের মতোই উজ্জ্বল নীল। এই উচ্চতা থেকে লেক দুটিকে দেখতে মনে হয় যেন পৃথিবীর চোখ। আর তার চারপাশে সবুজের নরম গালিচার মতো বিছিয়ে আছে ফসলের ক্ষেত। কোথাও সরিষা ফুলের হলুদ গালিচা‚ কোথাও গমের কচি সবুজ চারা‚ আর কোথাও ভুট্টার চারাগুলো নতুন জীবনের বার্তা দিচ্ছে। এই ক্ষেতগুলোর মাঝে মাঝে গ্রামের ছোটো ছোটো ঘরগুলো ছড়ানো ছিটানো বিন্দুর মতো দেখাচ্ছিল।
মুগ্ধতার আবেশে দেখতে দেখতে অস্ফুটে কিছু একটা বলে উঠল মারিশা। আশফিরও কিছুটা ভালো লাগছে এখন। মারিশার কাছ ঘেঁষেই গম্ভীর মুখে পকেটে হাত পুরে দাঁড়িয়ে দেখছিল প্রকৃতির এই ঐশ্বরিক সজ্জা৷ দৃশ্য যে কেবল শুরু। চোখ যখন আরেকটু ওপরে উঠল ওদের‚ তখন দেখা গেল সবকিছুর উপরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই চিরন্তন সৌন্দর্য—হিমালয়ের চূড়া। সাদা বরফে ঢাকা চূড়াগুলো আকাশের সঙ্গে মিশে আছে। সূর্যের আলো সেই চূড়ায় পড়ে এক স্বর্গীয় আভা তৈরি করেছে। সবচেয়ে কাছে ছিল তীক্ষ্ণ শিখরওয়ালা মাছাপুছরে। এই পুরো উপত্যকার অভিভাবক সে। তার পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল অন্নপূর্ণা পর্বতমালা। যেখানে অন্নপূর্ণা এক‚ অন্নপূর্ণা সাউথ এবং হিমচুলির মতো চূড়াগুলো মাথা তুলে আছে। তাদেরই একটি অংশ হলো লামজং হিমাল৷ যে তার পিরামিডের মতো আকৃতির জন্য সহজেই চোখে পড়ে। আবহাওয়া পরিষ্কার হওয়ায় সুদূর দিগন্তে ওরা দেখতে পেল ধৌলাগিরি পর্বতমালাকেও। যে তার বিশালতা নিয়ে হিমালয়ের অন্যান্য চূড়া থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এক উচ্চতায় দাঁড়িয়ে আছে।
“ভোরবেলা পৌঁছাতে পারলে ভিউটা অন্যরকম সুন্দর দেখাত‚ তাই না?” ঘোর চোখে চূড়াগুলো দেখতে দেখতে ফিসফিস করে উঠল মারিশা।
আশফি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল তখন ওর দিকে। হঠাৎ করে তার মানসপটে ভেসে উঠল‚ ওদের দুজনের প্রথম দেখা হওয়ার দিনটা। এমনই এক চূড়াতেই দাঁড়িয়ে দিনের প্রথম আলোয় ওকে দেখতে দেখতে কিছু একটা হয়ে গিয়েছিল তার সেদিনই৷ একে একে আরও অনেক ফেলে আসা স্মৃতি ধরা দিল আশফির কল্পনায়৷
অন্নপূর্ণার বরফ চাদরে মোড়া চূড়াতে চেয়ে ঠিক তখনই মারিশা ঘন স্বরে স্বগতোক্তি করল‚ “আমি কি চার বছর আগে হারিয়ে যাচ্ছি?”
কথাটা কানে পৌঁছাতেই নস্টালজিয়া থেকে বেরিয়ে এল আশফি৷ কিছু একটা ভেবে মুহূর্তেই চোয়ালদুটো শক্ত হয়ে উঠল তার। অনেকটা সময় পর আচমকা কড়া স্বরে বলে উঠল‚ “কী জন্য ডিভোর্স করেছ তোমার কাজিনকে? শুধুই আমার কাছে ফেরার জন্য?”
এমন সময়ে অকস্মাৎ এ প্রশ্নে মারিশা চমকে উঠে চাইতেই আশফি ওর চোখে চোখ রেখে একইভাবেই জিজ্ঞেস করল‚ “কিন্তু চার বছর পরই কেন ফিরতে ইচ্ছে হলো‚ মাহি?”
বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৮
“তোমাদের বাংলাতে একটা কথা আছে‚ আশফি। মিথ্যার চেয়ে বেশি ভয়ঙ্কর হলো অর্ধ সত্য”‚ মৃদুস্বরে বলল মারিশা‚ “আমার ফেরার পথ চার বছর পর খুলেছে বলেই আজ ফেরা।”
“বন্ধ ছিল বলছ?” শ্লেষাত্মক হেসে চোখ ফিরিয়ে সামনে চাইলো আশফি‚ “থাক‚ আর কিছু বোলো না।”
“কীই বা বলব? যখন সবটা জেনেও…” কথাটা আর শেষ করল না মারিশা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিছুক্ষণ চুপ থাকল।
বেগনাসকোট পৌঁছাতেই ওদের এত সময় লাগল যে সামনে আর এগোতে পারলাম না। আমার ঘনঘন মুড সুয়িং করার মতো গল্পের স্টোরিলাইনও সুয়িং করেছে। আরও কয়েকটা পর্ব পরে গিয়ে অতীতে ঝাঁপ দেব৷
