Home বুনো মেঘের হাতছানি বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ১০

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ১০

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ১০
ইসরাত জাহান দ্যুতি

স্নিগ্ধ‚ সতেজ পাহাড়ি বাতাসে গা ভিজলেও মনটাতে গুমট সৃষ্টি হলো ওদের৷ আশফি খুব চেষ্টা করেছিল‚ ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা রাগ‚ দুঃখ‚ অভিযোগকে এখনো ঘুম পাড়িয়েই রাখতে। কিন্তু কে জানত‚ এখানে পৌঁছেই নস্টালজিয়ায় ডুববে সে? এবার যে মুখটা খুললেই মারিশার হৃদয় চূর্ণ-বিচূর্ণ করা বিষবাক্য ছুটবে শুধু। কিন্তু সে চায় না‚ পেছনে রেখে আসা ভালো-মন্দ কোনো কিছুই আবার নতুন করে জায়গা পাক ওর জীবনে। তাই যথাসম্ভব চেষ্টা করে গেল একটা শব্দও উচ্চারণ না করার।
মারিশাকেও দেখাল নিস্তব্ধ৷ গভীর মনস্তাপে তলিয়ে গেছে নিমেষেই। কতক্ষণ যেন পার করল দুজনই দণ্ডায়মান মূর্তির মতো দূর পাহাড়ের চূড়ায় দৃষ্টি হারিয়ে। এর মাঝে কেউ কারও দিকে তাকাল না‚ কিছু বলল না৷ যেন একে অপরের অস্তিত্ব ওরা শূন্য ভেবে নিয়েছে৷ তবে মৌনতার জাল ছিদ্র করে মারিশার কণ্ঠ বেজে উঠল একটা সময়।
জিজ্ঞেস করল আশফিকে‚ “মা বলেছিল সবটা? না-কি ভাই?”
গুরুগম্ভীরভাবে একটু সময় চুপ থেকে উত্তর দিল আশফি‚ “তোমার মা-ই বলেছিল একদিন।”

“কবে?”
এর কোনো উত্তর দিল না আশফি। তাই মারিশাও আর কিছু জিজ্ঞেস করল না৷ ভেতরে চেপে রাখা একটা কথা কিছুক্ষণ পর বলেই উঠল আশফি‚ “যে এজেন্সিকে বাঁচানোর জন্য বিয়েটা করলে‚ ডিভোর্স হওয়ার পর সেটার কী হাল তাহলে?”
মিনিটখানিকের মতো মারিশা থমকে রইল৷ জবাবের বদলে পালটা প্রশ্ন করল‚ “ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলো না?”
“না।”
“কেন? বাবার কাছে ফিরে আসার জন্য?”
আশফি উত্তর দিল না এ কথারও। তবে ওর কঠিন হয়ে ওঠা চোয়ালজোড়া দেখে বুঝতে পারল মারিশা‚ ওর বলা কথাটাই একমাত্র কারণ তবে মিরানের সঙ্গে আর যোগাযোগ না রাখার৷ সে বলল‚ “মাকেও ফিরিয়ে আনতে বলেছিল বাবা। বাবার চলাফেরার মতো সুস্থতা থাকলে বাবা নিজেই যেত মায়ের কাছে৷ আর মা চেয়েছিল বলেই তো ভাই ফিরে এসেছে৷ নয়তো আসত না৷ ওকে ভুল বুঝো না তুমি।”
“আমি এ ব্যাপারে কথা বলতে চাইছি না। প্রশ্ন করেছিলাম ভিন্ন কিছু। তবে খুব বেশি পার্সোনাল কুয়েশ্চন হয়ে গেলে উত্তর না দিতে চাইলেও আপত্তি নেই।”
“পার্সোনাল কুয়েশ্চন হবে কেন? ডেনিজের থেকে তো পাওয়ার অফ অ্যাটোর্নি রিভোক করে দিতে পেরেছি। এখন আর কোনো বিপদ নেই।”

“তুমি একাই মোকাবেলা করেছ ওদের?” নির্বিকার মুখভঙ্গি হলেও কণ্ঠে বিস্ময় প্রকাশ পেল আশফির।
আর তা দেখে একপেশে হাসল মারিশা। যেন শ্লেষমিশ্রিত তা৷ বলল‚ “একাই তো ছিলাম। সব থেকে বেশি দায়িত্ব ছিল যাদের‚ তারা কেউ-ই তো আসেনি আমার পাশে দাঁড়াতে।”
“এটা আমাকে বললে না তো?” ভ্রুদ্বয়ের মাঝে ভাঁজ ফেলে তাকাল আশফি।
মারিশা জবাব দেওয়ার আগেই সে বলল তারপর‚ “আমি তোমার লাইফের পার্ট অ্যান্ড পার্সেল ছিলাম না কখনো। তুমি তোমার লাইফের সব থেকে ইম্পর্ট্যান্ট ডিসিশন একার মতো নিয়েছিলে। ডিসিশন নেওয়ার আগে জানানো প্রয়োজন আমাকে‚ এমন গুরুত্বপূর্ণই আমি ছিলাম না‚ রাইট? আর আমি তোমার কাছে বেস্ট চয়েজ না হতে পারি‚ না পেতে পারি প্রায়োরিটি৷ কিন্তু আমার কাছে আমার মূল্যায়ন আছে। আই উইল নেভার কনসেন্ট টু কম্প্রোমাইজ মাই সেন্স অফ সেলফ-রিসপেক্ট। সেখানে আমাকে কী করে আশা করতে পারো তোমার হোমল্যান্ডে?”
মুখে কিছু এল না মারিশার। কারণ ওর বিচারে বরাবরই যে আশফি আশফির জায়গা থেকে সঠিক। এরপর নীরবতা নেমে এল আবারও ওদের মাঝে। শেষ মুহূর্তে আশফি ফিরে দাঁড়াল মারিশার দিকে৷

“মাহি…”‚ রোদের তেজে চোখদুটো কুঁচকে চেয়ে খুব স্বাভাবিকভাবেই বলল সে‚ “পুরনো কথাগুলো ভাবলেই আমি খুব ডিস্টার্বড ফিল করি। তুমি একজন সন্তান হিসেবে যেটা করেছিলে তোমার বাবার জন্য‚ সেটা নিঃসন্দেহে জাস্টিফায়েবল। চার মাসের সম্পর্ক থেকে বিশ বছরের স্নেহ‚ ভালোবাসা আসলেই বড়ো হওয়া উচিত৷ সেক্ষেত্রে আমাকে তোমার রিজেক্ট করাটা আমার জন্য কষ্টকর হলেও সন্তানের ভূমিকা থেকে তুমি সঠিক করেছিলে৷ কিন্তু এটা তো অস্বীকার করা সম্ভব নয়‚ রিজেকশনটা আমার জন্য খুব…”
একটু থামল আশফি। চোখে-মুখে স্বাভাবিকতা বজায় রাখলেও অন্তর চুরমার হওয়া অতীতের যাতনাটা তাকে খোঁচাচ্ছে‚ তা সহজেই বুঝতে পারল মারিশা। তীব্র অপরাধবোধ থেকে ওর চোখে চোখ রাখতে পারল না সে৷ দৃষ্টি নুইয়ে ফেলতেই আশফি বলে উঠল‚ “মেনে নেওয়াটা কঠিন ছিল আরকি৷ বাট ওই জায়গা থেকে আমি কাম ব্যাক করতে পেরেছি৷ আমি তোমাকে আর ডেনিজকেও মেনে নিতে পেরেছি৷ যদিও এখন তোমরা বিচ্ছেদে। তবে সেটা আমাকে খুশিও করেনি‚ দুঃখও দেয়নি। তো আমার আসলে তোমার জন্য ওই ফিলিংসটা আর নেই‚ সেটাই বলতে চাচ্ছি৷”

এদিক-ওদিক চেয়ে চোখের পানিটুকু আড়াল করতে চাইলো মারিশা। পারল না। আশফির খারাপই লাগল তা দেখে৷ এতটা স্পষ্ট করে না বললেও হত বোধ হয়—ভাবল সে। মারিশার কাছে এগিয়ে এসে কোমল সুরে বলল‚ “আমি জানি‚ কথাটা জেনে তুমি হার্ট হচ্ছ খুব৷ কিন্তু সত্যটা মেনে নেওয়া তো উচিত‚ তাই না?”
তারপরই ওর চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল‚ “দুর্বলতা না থাকলেও তোমার জন্য আমার মনে একটা সফ্ট কর্নার আছে‚ মাহি৷ এটাও আমি অস্বীকার করতে পারব না৷ ভালোবাসাটা আমার জীবনে প্রথম তোমাকেই দিয়েছিলাম কিনা! সেটা আর না থাকলেও তোমার প্রতি আমি কোনো ঘেন্নাও রাখিনি৷ আমি আসলে এই ভালোবাসার ব্যাপারটাতেই আর ঢুকতে চাই না৷”

“তো কখনো কি পার্টনার বানাবে না তুমি?” শান্ত সুরে বলল মারিশা।
ওর প্রশ্ন চোখে চেয়ে আশফি নির্দ্বিধায় উত্তর দিল‚ “যদি কখনো কাউকে দেখে প্রয়োজন অনুভব করি একজন লাইফ পার্টনারের‚ সেদিনই সিদ্ধান্ত নেব। কিন্তু তোমার সঙ্গে এটা আর সম্ভব নয়‚ মাহি। আমার মনের ব্যাপারটা ঠিক কীভাবে তোমাকে বোঝাব বুঝতে পারছি না৷ না চাইলেও বলতে বাধ্য হলাম‚ তোমার প্রস্থানের মুহূর্ত বা তার পরবর্তী মুহূর্তগুলো আমার জন্য ভালো ছিল না। আমাকে বিধ্বস্তপ্রায় করে রেখেছিল সময়গুলো৷ আমি বোধ হয় তোমাকে ক্লিয়ার করতে পারছি না আমার অতীতের সম্পর্কটাকে নতুন করে সুযোগ না দেওয়ার সমস্যাটা।”
“না‚ আমি বুঝতে পারছি তুমি কী বলতে চাচ্ছ”‚ কণ্ঠটা কেঁপে গেল মাহির‚ “আমি তোমাকে একদম ফোর্স করব না‚ আশফি। তুমি প্লিজ স্ট্রেস নিয়ো না আর এ নিয়ে।”
কথাটা বলে চোখের পানিটুকু এবার সে নিজেই মুছে নিল। মুখটা শক্ত করে স্বাভাবিকতা বজায় রাখতে চাইলো চেহারায়৷

সস্নেহে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে তখন বলল আশফি‚ “মাহি‚ আমি তোমাকে ইগনোর করতে পারব না কখনো৷ তুমি মিথ্যে আশা রেখে কষ্ট পাবে‚ এটাও আমার ভালো লাগবে না। আমরা পুরনো সম্পর্কটা ঝালাই না করে তার চেয়ে বরং নতুন কোনো সম্পর্ক গড়তে পারি। উই ক্যান বি ক্লোজ ফ্রেন্ডস অ্যাট দিস পয়েন্ট‚ অ্যান্ড আই সিনসিয়ারলি ওয়ান্ট দ্যাট। ইউ উইল অ্যাকসেপ্ট আওয়ার ফ্রেন্ডশিপ‚ ওন্ট ইউ?”
প্রস্তাবটা এত বেশি জঘন্য লাগল মারিশার‚ ওর মনে হলো আশফির সামনে আর না এলেই বুঝি ভালো হত। এক সময়ের অতি আপন মানুষটা না-কি এখন শুধুই ভালো বন্ধু হবে? এর বেশি কিছু আর আশা করা উচিত হবে না ওর? এ কি ওর জন্য মেনে নেওয়া সম্ভব? যতটা সহজে বলল আশফি‚ ততটা সহজ যে ওর জন্য নয়‚ তা তো আর ভেবে দেখার প্রয়োজনবোধ করল না সে৷ অবশ্য না করারই কথা৷ কারণ সে যে নিজেকে সামলে নিয়েছে‚ অতীতকে একেবারে মুছে জীবনে এগিয়ে গেছে।

কিন্তু সম্ভব না হলেও ওকে মানতে হবে—ভেবে নিল মারিশা‚ জোর করা বা অধিকার আদায়ের চেষ্টাটা আর সে করবে না আজ থেকে৷ সবটাই ছেড়ে দেবে সৃষ্টিকর্তার ওপর। এবার তিনিই নির্ধারণ করে দেবেন ওর তকদির।
প্রলম্বিত শ্বাসটা ফেলে মেকি হেসে বলল সে‚ “সো‚ ফ্রম নাউ অন‚ উই উইল জাস্ট বি ফ্রেন্ডস। এখন তাহলে তোমার ফেরা উচিত। শুধু শুধুই আমার জন্য কষ্ট করলে৷ আমি বেস ক্যাম্পে পৌঁছেই তোমাকে আপডেট দেব। চিন্তা কোরো না আমাকে নিয়ে৷ কোনো সমস্যায় পড়লে নিশ্চয়ই জানাব।”

“তোমার মনে হয়‚ আমি তোমাকে একা ছাড়ব?”
“ভাইয়ার সাথে আমি কথা বলে নেব।”
“তোমার ভাইয়ার সাথে তুমি কথা বলো বা না বলো‚ তাও আমি একা ছাড়তে পারব না তোমাকে৷ যদি এখানে উপস্থিত না থাকতাম‚ সেটা একরকম কথা ছিল৷”
“আরে আমি এরপর গাইড নেব। ওই সময়ে গাইড ম্যানেজ করতে পারলে গুগল ম্যাপের হেল্প নিতাম না-কি?”
আশফি স্থির চোখে ওকে দেখল কিছুক্ষণ। তারপর জিজ্ঞেস করল‚ “সত্যিই ট্রেকিঙে যেতে চাও? ফিরবে না তুমি?”
“আমি বন্দিত্ব থেকে বেরিয়ে এসেছি‚ আশফি”‚ শুকনো ঠোঁটদুটো ভিজিয়ে মারিশা সরল চোখে চাইলো‚ “ঘরে ফিরলেই আমার প্রচণ্ড সাফোকেশন ফিল হবে৷ এখানে আসার লক্ষ্যটা কেবল তুমিই ছিলে না৷ আমি আমার নিঃশ্বাসটুকুকে বিশুদ্ধ করতেই ছুটে এসেছি।”
আশফি সন্দিগ্ধ চোখে ওকে আগাপাছতলা দেখে নিয়ে বলল‚ “কিন্তু আমি তোমার মাসকুলার পাওয়ার নিয়ে শঙ্কিত।”

মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে গেল মারিশা। তা দেখে ছোটো করে প্রলম্বিত শ্বাসটা ছাড়ল আশফি‚ “ঠিক আছে৷ দেখতেই তো পাবো সামনে৷ তখনই ডিসিশন নেওয়া যাবে। চলো তাহলে৷”
পাহাড় থেকে নামতে শুরু করল ওরা৷ নামতে নামতে মারিশাকে বলল সে‚ “আমার খিদে পেয়েছে খুব৷ ডায়বেটিক পেশেন্ট হয়ে তুমি কী করে ঠিক আছ?”
“গ্রামের ভেতর চায়ের দোকান আছে৷ ওখান থেকে কিছু খেয়ে নিয়ো৷”
“তুমি কি সেখান থেকেই পেট ঠান্ডা করে নিয়েছিলে?”
“হুঁ।”
সংক্ষিপ্ত উত্তরটা দেওয়ার পর থেকে মারিশা কথা খুব কমই বলল। গল্পগুজব যা করার তা আশফিই করল সারা পথ।
ওরা রিসোর্টে যখন পৌঁছাল তখন প্রায় বিকাল৷ মারিশা যে ঘরটা ছেড়ে দিয়েছিল‚ সেটাই বুকিং করতে চাইলো। কিন্তু ইতোমধ্যেই সেটা বুকিং করে নিয়েছে অন্য কেউ। আশফিদের মাউন্টেন ভিউ বিল্ডিংয়ে আর কোনো ঘরই ফাঁকা পেল না সে৷ আশফি তখন একটু ভাবনায় পড়লে মারিশা জানাল‚ সে লেক ভিউ বিল্ডিংয়ে যাবে। সেখানেরই একটা ঘর পেয়ে গেল সে। চাবিটা ও হাতে নিতেই হঠাৎ পেছন থেকে ডেকে উঠল কেউ‚ “আশফি?

সিঁড়ির দিক থেকে এগিয়ে এল পরাগরা সবাই-ই। কিন্তু আশফিকে ডাকল একজন মেয়ে। তাকে ওদের সঙ্গেই আসতে দেখা গেল। আর মেয়েটিকে দেখে আশফিকে মনে হলো একটু অবাকই হয়েছে৷
মারিশা ওকে কিছু জিজ্ঞেস করবে কিনা‚ তা ভাবতেই হঠাৎ মেয়েটা দ্রুত এসেই বলে উঠল আশফিকে‚ “কোথায় গিয়েছিলে তুমি? ওরা সবাই টেনশনে ছিল সারাদিন। নো ওয়ান কুড ইভেন রিচ ইউ অন দ্য ফোন।”
“দিলিশা! তুমি… প্ল্যান ছিল না-কি?” অবাক হওয়াটা প্রকাশ করেই বলল আশফি‚ “জানাওনি তো?”
আচমকা ওর হাত ধরে রিসেপশন ডেস্কের সামনে থেকে টেনে নিয়ে পরাগদের কাছে চলে গেল দিলিশা৷ তারপর কী কথা বলতে লাগল সে‚ তা কানে পৌঁছালেও মারিশাকে দেখাল কিছুই বুঝতে পারছে না সে। বাকহারা এক স্থির মূর্তি যেন। আশফির জন্য মেয়েটার উদ্বিগ্নতা‚ আশফির হাত ধরে ওর পাশ থেকে টেনে নিয়ে যাওয়া‚ পুরো ব্যাপারটাতে এতখানি স্তম্ভিত হলো সে‚ কখন দিব্য এসে ওর পাশে দাঁড়াল‚ তা টেরই পেল না।

গায়ের রংটা মেয়েটার উজ্জ্বল ফরসা। মুখের গড়ন ডিম্বাকৃতি‚ নাকটা উঁচু ও সরু‚ ঠোঁটদুটো ভরাট। সেখানে হালকা গোলাপি ছাপ। বাদামি মণির দুটো বিড়াল চোখে ঘন কৃত্রিম চোখের পাপড়ি। তবে কালো সোজা চুলগুলো কোমর পর্যন্ত লম্বা আর ঘন। চমৎকার সুন্দরী মেয়েটা। পরনে তার নরম নীল রঙা টপ আর গাঢ় জিন্স—একহারা শরীরকে বেশ ফুটিয়ে তুলেছে পোশাকটা। হাতে চিকন ঘড়ি‚ কানে ছোটো হীরার দুল আর পায়ে উঁচু হিল৷ তবে এমনিতেও উচ্চতা বেশ আছে। কথা বলার ভঙ্গিমায় খুব নম্রতা আর হাসিটা পরিমিত।
পরাগ‚ সৌভিক আর হৃদয়ের সঙ্গেও কথা বলছিল সে অনেকটা খোলামেলাভাবে। বোঝায় যাচ্ছিল‚ বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তার ওদের সাথে। কিন্তু আশফির দিকে চাইতেই মেয়েটার চোখের চাউনি কেমন বদলে যাচ্ছে৷ গভীর সেই চাউনি৷ ওই চাউনির অর্থ কী‚ তা ভালোই বোঝে মারিশা৷ আজও যে সে ওই একই চাউনিতেই দেখে যায় আশফিকে।
আশফিকে কী যেন বলতে বলতে পরিমিত হাসিটাও এক পলের জন্য মুছে গিয়ে ধীরে ধীরে একটু অভিমানের ছাপ পড়ল মেয়েটার চেহারাতে। তারপর আশফির এতটা কাছে এসে দাঁড়াল আর এমন ভঙ্গিমাতে দাঁড়াল সে‚ যেন ওদের মাঝে যে সম্পর্ক রয়েছে‚ সেটা খুব কাছের‚ তা খুব স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিতে চাইলো লবিতে থাকা সকলকে।
“কী অবস্থা? কোথায় চলে গিয়েছিলে তুমি?” ফোনের স্ক্রিনে কিছু একটা করতে করতে জিজ্ঞেস করল দিব্য।
তার প্রশ্নেই যেন সম্বিৎ ফিরে পেল মারিশা৷ কিন্তু জবাবটা দিল না সে।

“মেয়েটা কে?” স্থির‚ কঠোর দৃষ্টিতে ওদের দেখতে দেখতে দিব্যকে জিজ্ঞেস করল ও।
দিব্যর মন-মেজাজ বেশ চড়া হয়ে ছিল কেন যেন। বিরক্তের সঙ্গে ফোনের স্ক্রিনে আঙুল বুলাচ্ছিল। মারিশার প্রশ্নে চোখ তুলে ওর দিকে একবার চেয়ে আরেকবার আশফিদের দিকে চাইলো।
“কে আবার…”‚ বিদ্রূপ সুরে বলল ওকে‚ “আশফির হটি‚ ভিক্সেন কাজিন গার্লফ্রেন্ড। সাত সমুদ্দুর তেরো নদী পার করে সারপ্রাইজ দিতে এসেছে‚ দেখছ না? এবার আমাদের ফ্রেন্ডস ট্রিপ কম‚ রোমান্টিক ট্রিপ দেখা হবে বেশি।”
খুব ধীরে ফিরে তাকাল মারিশা দিব্যর দিকে। “কাজিন গার্লফ্রেন্ড?” মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করল সে।
তেরছা ঠোঁটে হাসল দিব্য‚ “ওর ছোটো চাচার মেয়ে৷ চেনো না?”

“নাহ”‚ অনুচ্চস্বরে জবাবটা দিয়েই দিলিশা আর আশফির দিকে তাকাল মারিশা।
স্বগতোক্তির মতো বিড়বিড় করে বলল‚ “কাজিনের সঙ্গে? কই‚ দিশান তো বলল না এটা?”
দিব্য শুনতে পেয়েই জানাল‚ “কারণ‚ ওদের রিলেশনটা কমপ্লিকেটেড৷ আশফির ছোটো চাচি তো মানুষ ভালো না৷ সম্পর্ক ভালো না ওর চাচির সঙ্গে। সেখানে চাচির মেয়ের সঙ্গে আদৌ এগোনো উচিত কিনা‚ তা নিয়ে কনফিউজড ও৷ বাট ওর চাচা একদম ভাতিজা ভক্ত৷ দিলিশার হঠাৎ আগমন মানে মনে হচ্ছে ব্যাপারটা পজিটিভ দিকে এগিয়েছে। হয়তো কোনো ফাইনাল ডিসিশন জানাতেই এসেছে সে।”
মনে পড়ল মারিশারও‚ চাচির সঙ্গে আশফির সম্পর্কের অবনতির ব্যাপারে টুকটাক কথাবার্তা শুনেছিল সে দিশানের থেকে৷ কিন্তু দিলিশার ব্যাপারে কখনো কোনো কথা হয়নি আশফি‚ দিশান‚ কারো সঙ্গেই।
দিলিশার কথা শোনা শেষ করে আশফি এখন পরাগদের সঙ্গে কথা বলছে৷ মুখটা দেখে বোঝা যাচ্ছে না‚ প্রসঙ্গ খু্ব গুরুত্বপূর্ণ‚ না-কি হালকা। কিন্তু ওর কাছ ঘেঁষেই দাঁড়ানো মেয়েটার চোখে-মুখে প্রাণবন্ত হাসি৷ মাঝে মাঝে কথা বলতে লাগল সেও।

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৯

বেশ কিছুক্ষণই মারিশা দেখল ওদের দুজনকে৷ কপালের ভাঁজটা মসৃণ করে হঠাৎ মুচকি হাসল দিব্যর দিকে ফিরে‚ “আমি তাহলে আমার রুমে যাই৷ প্রচণ্ড টায়ার্ড। পরে কথা হবে সবার সাথে।”
“কিন্তু তোমার রুমটা তো দিলিশা বুকিং করেছে।”
কথাটা সাধারণ৷ কিন্তু মারিশার বুকের ভেতরে তীক্ষ্ণ এক খোঁচা অনুভব হলো। ওর কাছ থেকে আশফিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার মুহূর্তটা স্মরণে এল কথাটা শুনতেই৷ তবে শান্ত স্বরে বলল দিব্যকে‚ “সমস্যা নেই৷ আমি লেক ভিউ রুম বুকিং করেছি।”
দিব্যর জবাব শোনার অপেক্ষাটুকুও করল না তারপর৷ তবে মুখে হাসি টেনে দিব্য চেয়ে রইল ওর যাত্রাপথে।

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ১১