বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ১১
ইসরাত জাহান দ্যুতি
আশফিদের মাউন্টেন ভিউ ভবনের সামনে যে খোলা আঙিনা‚ সেখানেই এখন উপস্থিত ওদের দলটা। রিসোর্টের রেস্তোরাঁ থেকে রাতের খাবার শেষ করে মাত্রই এসে দাঁড়াল ওরা সেখানে। খাবার খাওয়ার পর সিগারেট টানার অভ্যাস আশফি‚ সৌভিক আর দিব্যর। তাই তিনজনই এখন সুখ টানে ব্যস্ত। টানতে টানতে রেলিঙের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে সাদা বরফে ঢাকা অন্নপূর্ণা রেঞ্জের বিশাল পর্বতশ্রেণী দেখছিল ওরা চুপচাপ।
সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে হঠাৎ সৌভিক বলে উঠল হৃদয়কে‚ “এই হৃদয়‚ এবার ট্রিপে আসার জন্য যার সাথে ব্রেকআপ করলি‚ সে কি কোনো অভিশাপ টপিশাপ দিয়েছিল তোকে?”
এমন আজগুবি একটা প্রশ্ন শুনে হৃদয় বিরক্ত নিয়ে তাকাল সৌভিকের দিকে। কিন্তু সৌভিক ওর বিরক্তকে পাত্তা না দিয়ে বেশ গাম্ভীর্যতা নিয়ে বলল‚ “নিশ্চয়ই দিয়েছিল। নয়তো এবারের ট্রিপে কুফা কেন লাগল? সব আনএক্সপেকটেড ঝামেলার আগমন ঘটছে একের পর এক৷ কখন যেন আশফির দাদাও এসে হাজির হবে আর বলে বসবে…”‚ ব্যঙ্গ স্বর সৌভিকের‚ “আঁইও পাহাড়ে উঠিম! তোয়ারা আঁর হুতেরাত্তুন ঠেলা মারিতে থাইক্গি শুধু।”
হা হা করে হেসে উঠল সবাই। পরাগ তারপর বলল‚ “আমার বউটাইবা কী দোষ করল? টিকিট কাটতে বলে দিই না-কি?”
“তাহলে আমাদের জরিনা খালারও তো দোষ নাই। ওকেও ডাক”‚ হৃদয় বলল।
“ভালো কথা মনে করালি”‚ সৌভিক চঞ্চল স্বরে বলল‚ “জারিনকে কল দে তুই৷ দিয়ে ব্রেকিং নিউজ দুইটা জানা৷ শিরোনামেই গান গাইবি‚ ‘বিধি তুমি বলে দাও আমি কার‚ দুটি ফুলটুসি একটি হটডগের দাবিদার।’ টান টান উত্তেজনা ফিল নিয়ে ক্লাইম্যাক্স জানতে তোকে দৈনিক কল করতে থাকবে দেখিস৷ তাতে রথ দেখাও হবে‚ তোর কলা বেচাও হবে।”
“ওহ… কী একটা বুদ্ধি দিলি”‚ হৃদয়ের চোখদুটো ঝিলিক দিয়ে উঠল। “এক্কেরে শয়তানি বুদ্ধির গডফাদার তুই! দাঁড়া‚ এখনই দিই।”
অতি উত্তেজনা নিয়ে হৃদয় জারিনের হোয়াটসঅ্যাপে কল দিতেই যাবে‚ তখনই আশফি একটা লাথি কষল ওর হাঁটুতে৷ আর সৌভিক তো পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। মার খাওয়ার আগেই সে সরে পড়ল হাসতে হাসতে।
এই হাসি-তামাশার মাঝে পরাগ হঠাৎ গম্ভীর প্রশ্ন করল‚ “মাহিকে নিয়ে এখন তোর চাওয়াটা কী‚ আশফি?”
প্রশ্নটা শুনে দিব্য ফিরে তাকাল আশফির দিকে। সে বলল‚ “আই থিঙ্ক তোরা আজ নিজেদের মাঝে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিস।”
মাথা নাড়ল আশফি‚ “হুঁ।”
“তা কী সিদ্ধান্ত নিলি তোরা?” কথাটা চারজনই একেকভাবে জিজ্ঞেস করে উঠল এক সাথে।
রেলিঙে হেলে দাঁড়ানো আশফি ঘাড় বাঁকিয়ে উদাস চোখে দূরের পাহাড়ে চাইলো। মুখ থেকে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে একটু সময় চুপ থাকল। যেন উত্তরটা দিতে সে ভাবনাচিন্তায় পড়েছে। একটা সময় পর বলল‚ “ও যা চাইছে তা আর সম্ভব নয়। সেটাই বুঝিয়েছি৷ আর ও তা মেনেও নিয়েছে।”
“তাহলে কি কাল চলে যাবে?” জিজ্ঞেস করল দিব্য।
“না৷ ও ভালো ট্রেকার ছিল আগে৷ অন্নপূর্ণা রয়েল ক্যাম্পে চলে যেতে চেয়েছিল আজ। সেখান থেকে নিজের মতো ট্রেকিং‚ ট্রাভেল করবে বলছিল৷ কিন্তু একা ছাড়ি কী করে! তাই বুঝিয়ে সুঝিয়ে নিয়ে এসেছি।
“এখন তোদের মাঝে সব নরমাল বলছিস?” জানতে চাইলো পরাগ।
“হ্যাঁ‚ নরমালই”‚ হালকা গলায় বলল আশফি‚ “ও যেটা করেছে তা ভোলা সম্ভব না সত্যি। কিন্তু কোনো রাগ-ক্ষোভ রাখারও ইচ্ছে নেই। অলরেডি আমাদের পথ আলাদা৷ ওর মতো ও জীবন কাটাক‚ আর আমার মতো আমি।”
ফোঁস করে লম্বা এক শ্বাস ছাড়ল দিব্য। যেন নিশ্চিন্ত সে। সিগারেটটা ফেলে দিয়ে পকেট থেকে একটা চুইংগাম বের করল। সেটা মুখে পুরে চিবাতে চিবাতে হঠাৎ চলে যেতে লাগলে তা দেখে সবাই অবাক হলো একটু।
হৃদয় পেছন থেকে ডেকে উঠল‚ “কিরে… ওই? কই যাস তুই?”
“যাই… একটু প্রকৃতি দেখতে”‚ না দাঁড়িয়ে‚ ফিরে না চেয়েই উত্তর দিল দিব্য।
সবাই তখন মারিশা আর দিলিশার প্রসঙ্গে ফিরলেও আশফির চোখ সরল না হেলেদুলে যেতে থাকা দিব্যর থেকে। কেমন একটু সন্দেহ নজরে চেয়ে রইল।
মারিশা অনুপস্থিতি বিকালের পর থেকেই৷ হঠাৎ করেই সে ভীষণ শান্ত হয়ে গিয়েছে। তখন ঘরে ফিরে গোসল‚ খাওয়া-দাওয়া শেষ করেই বিছানায় গা এলিয়ে দেয়৷ ঘুমিয়েও যায় খুব সহজেই। আশফি রাতের খাবার খেতে ডাকতে এসেছিল রাত আটটার দিকে৷ কিন্তু দরজা না খুলেই মারিশা তাকে জানিয়ে দিয়েছিল‚ সে পরে খাবে। এবং নিজের মতো খাবার অর্ডার করে নেবে। বাইরে গিয়ে খাবে না৷ তা শুনে আর কিছু বলতে পারেনি আশফি৷ ফিরে যায় সে।
রাত এখন দশটার কাছাকাছি। লম্বা এক ঘুম দিয়ে রাতের খাবার খেল সে মাত্রই। খাওয়া শেষে একটু হাঁটাহাঁটি করতে এল ওর লেক ভিউ ভবনের সামনের খোলা আঙিনায়। দিনে এই আঙিনা থেকে নীল আকাশের নিচে উপত্যকার সবুজ আর লেকের জল দেখা যায়৷ কিন্তু রাতের রূপ সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাতের বেলা রিসোর্টের শান্ত‚ মায়াবী পরিবেশে চারপাশের সবকিছু কেমন স্বপ্নলোকের মতো লাগে যেন। আঙিনার রেলিং ধরে দাঁড়াতেই মারিশার চোখে পড়ল এক চোখ জুড়ানো দৃশ্য। নিচের উপত্যকা আর লেকের চারপাশের গ্রামগুলোতে ছোটো ছোটো আলোর বিন্দু জ্বলে উঠেছে। দেখতে লাগছে যেন কালো মখমলের ওপর হাজার হাজার হীরার কণা ছড়িয়ে রাখা। সেই আলোগুলো লেকের শান্ত‚ গভীর জলে প্রতিফলিত হয়ে এক অদ্ভুত দ্যুতি তৈরি করছে। মাথার ওপর তারকাখচিত আকাশ আর নিচের এই আলো ঝলমলে জোনাকির মেলা‚ দুটি মিলেমিশে একাকার যেন। মনটা ভালো করার জন্য এমন কিছুর দর্শন পেলে আর কি কিছু লাগে?
“হাই!”
হঠাৎ করে পুরুষ কণ্ঠ এল পেছন থেকে। মারিশা হালকা চমকে উঠে ফিরে তাকাতেই আবিষ্কার করল দিব্যকে৷ হাতে দুটো কোল্ড কফি তার। মুখে হাসি টেনে এগিয়ে এসে নির্দ্বিধায় একটা বাড়িয়ে দিল ওকে‚ “উড ইউ কেয়ার টু অ্যাক্সেপ্ট?”
চোখে কৌতুক নিয়ে এক পল চেয়ে থেকে কফিটা নিল মারিশা‚ “থ্যাঙ্কস।”
“অলওয়েজ অ্যাট ইয়োর সার্ভিস”‚ বলেই এক চুমুক দিল সে কফিতে৷ তবে হাসিমুখর দৃষ্টিজোড়া স্থির রইল মারিশাতেই৷
মারিশার প্রতি তার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু অবশ্যই ওর সৌন্দর্য। কিন্তু এই সৌন্দর্যের মাঝে সে যেন কী এক আলাদা আকর্ষণ অনুভব করছে সব সময়। দীর্ঘ ও সুঠাম মেয়েটার দেহ। যেখানে অপ্রয়োজনীয় কোনো ভাঁজ নেই। বাহুগুলো চিকন ও মসৃণ‚ আর পা দু’টি লতার মতো সরু ও লম্বা‚ যেন এক অপার্থিব সাবলীলতা। এই যে পরনে এখন গাঢ় কালো রঙা স্লিভলেস জাম্পস্যুট ওর! এমন পোশাক তো অনেক সুন্দরীকেই পরতে দেখেছে সে৷ কিন্ত ওর দীর্ঘ‚ ছিপছিপে শরীরকে একটু বেশিই আকর্ষণীয় করে তুলেছে পোশাকটা। মেয়েটার চালচলন থেকে শুরু করে যে-কোনো পোশাকেই শরীরে প্রতিটি ভাঁজে যেন আভিজাত্যের ছোঁয়া পায় সে।
জামার কাঁধের দিক থেকে নেমে আসা ঢেউ খেলানো রাফেলগুলো মৃদু বাতাসের ছোঁয়ায় সামান্য কেঁপে উঠছে। তাই হঠাৎ সেদিকে চোখ গেল দিব্যর। তখনই একটু চমক খেলে গেল তার চোখে৷ কোমল‚ মসৃণ বাহুজোড়াতে মনে হচ্ছে কাটাকাটির সূক্ষ্ম কিছু দাগ রয়েছে মারিশার৷ অনেকটা ব্লেড বা ছুরি দিয়ে কাটা দাগের মতো। কাছ থেকে দেখলেই কিছুটা বোঝা যায়। কৌতূহলী চোখে তা দেখতে দেখতে হঠাৎ মারিশার চোখে চোখ পড়ল তার। মুহূর্তেই একটু অপ্রস্তুত হলো সে৷ কফিতে চুমুক দিতে দিতে চোখে কেমন ধূর্ত হাসি নিয়ে মারিশা চেয়ে আছে তার দিকেই৷ সে যে এতক্ষণ ওর শারীরিক গড়ন খুঁটে খুঁটে পর্যবেক্ষণ করছিল‚ তা সবটাই খেয়াল করে যাচ্ছিল মারিশা।
তবে ব্যাপারটা সামলে নিল দিব্য চট করেই। সাবলীল ভঙ্গিমায় মারিশার পাশে এসে দাঁড়াল সে৷ রাখঢাক না রাখা স্বভাবটা দিব্যর সারা জীবনই। মানুষকে আচমকা ভড়কে দিতে‚ বা অপ্রস্তুত‚ অথবা বিব্রত করতেই হুটহাট বেমানান কথা বলে বসে সে। সামনের মানুষটাকে জুবুথুবু পরিস্থিতিতে পড়তে দেখাটা সে আসলে উপভোগ করে খুব৷ মারিশাকেও তেমনভাবে দেখতেই সরাসরি জিজ্ঞেস করে বসল‚ “তোমার দু হাতেই মনে হলো কিছু স্পট। অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল না-কি?”
যদিও সে জানে‚ দাগগুলো কোনো অ্যাক্সিডেন্ট থেকে সৃষ্টি হওয়ার মতো নয়। মারিশাকে অপ্রস্তুত বা বিব্রত করাই আসলে মূল উদ্দেশ্য।
তবে মারিশাকে মোটেও তেমনটা দেখাল না৷ মেসি হাফ বান করা চুলের এক গুচ্ছ আঙুলে নাড়াচাড়া করতে করতে কফিতে চুমুক দিল। তারপর হঠাৎ বিদ্রূপপূর্ণ হাসল‚ “আপনি স্পট চিনতে খুব আনাড়ি দেখি।”
হাসিটা ধরেই কেমন রহস্যঘন গলায় বলল‚ “আমি রিস্কি গেইম খেলতে ভালোবাসি৷ যে গেইমে প্রতিবার হারা মানে প্রতিবার নিজেকে নিজেই পানিশড করা। আর অবশ্যই সেটা হিটম্যানস কিট দ্বারা। খেলেছেন কখনো এরকম কিছু?”
আকস্মিক কথাগুলোতে দারুণ থতমত খেল দিব্য। সরু চোখে মারিশাকে দেখতে লাগল চুপচাপ। একটা পর্যায়ে কী যেন ভেবে হঠাৎ সে ফিক করে হেসে ফেলল আর হাসতেই থাকল৷ সেই হাসি স্থির চোখে কতক্ষণ দেখতে দেখতে একটা মুহূর্তে ও-ও হাসল নিঃশব্দে।
“আমি এবার বুঝতে পারছি‚ কেন তোমার প্রতি আমার দিনে দিনে কৌতূহল শুধু বেড়েই চলেছে৷” হাসিটা একটু থামিয়ে ফ্লার্টি সুরে বলল দিব্য‚ “এক্সেপশোনাল কিছু তো আছে তোমার মধ্যে৷ আর সেটাই আমাকে টানছে সব সময়।”
মারিশা ঠোঁটের কোণে হাসি নিয়ে উপত্যকার দিকে এবার চোখ ফেরাল। মজাই লাগে ওর দিব্যর প্রচেষ্টাগুলো৷ ওর জাম্পস্যুটের প্যান্টের অংশটি বেশ ঢিলেঢালা‚ সোজা৷ দেখতে ওয়াইড-লেগ প্যান্টের মতো‚ আর দুই পাশে দুটো পকেট রয়েছে। ডান পকেটে হাত পুরে রেলিঙে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল সে।
কিন্তু ওর এই পকেটে হাত ঢোকানো আর ক্রসড-লেগ পোজ দিয়ে দাঁড়ানোটা দিব্য খেয়াল করল খুব৷ অনেকটা পুরুষ ভঙ্গিমা খুঁজে পেল যেন সে। কিন্তু প্রথম দুদিনে হৃদয়ের মতো তারও মারিশাকে লেগেছিল সরল‚ শান্ত এক রূপসী নারী। বেশ বুঝল দিব্য‚ মেয়েটার মাঝে চমক পাওয়ার মতো অনেক কিছুই রয়েছে—ওকে ভালোভাবে চেনা বাকি আছে এখনো। এটা ভাবতেই আরেকটা ব্যাপার মাথাতে ক্লিক করে গেল তার৷ আশফি বরাবরই সরল‚ সাধারণ‚ সংসারী গোছের মেয়ে থেকে পছন্দ বেশি করে সাহসী‚ চটপটে‚ বুদ্ধিদীপ্ত আর বলবান মেয়েদের। অনেকটা নিজের ব্যক্তিত্বের কাছাকাছিই কাউকে চাইত ও সব সময়। এজন্য একটা সময় পর্যন্ত সহজে কোনো মেয়ে ওর কাছে ভিড়তে পারেনি। আর মারিশা ছেড়ে যাওয়ার পর থেকে ও যতজনকে সুযোগ দিয়েছে‚ তারা সবাই-ই কোনো না কোনোদিক থেকে খুব স্মার্ট আর খ্যাতিসম্পন্ন ছিল নিজ নিজ পেশাতে। তবে মারিশাও নিশ্চয়ই তাদের ব্যতিক্রম নয়! বরং তাদের থেকে হয়তো একটু বেশি কিছুই খুঁজে পেয়েছিল আশফি ওর মাঝে৷ যে কারণেই এখনো কেউ মারিশার মতো করে জায়গা করতে পারেনি আশফির জীবনে। যে জায়গাটা করে নিতে পেরেছিল মারিশা চোখের পলকেই‚ আশফির ছাব্বিশ বছরের প্রেমশূন্য জীবনে।
আর দিব্য! সে তার ত্রিশ বছরের জীবনে এসে এই প্রথমবার একটা মেয়েকে বিছানাতে আগে পাওয়ার থেকেও বেশি আগ্রহী মেয়েটাকে আগে পুরোপুরি আবিষ্কার করাতে৷
ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নিয়ে টুকটাক অনেক গল্পই চালাতে লাগল দিব্য। মারিশাও তা আগ্রহ নিয়ে শুনতে লাগল৷ গল্পের কোনো অংশে হাস্যকর বিষয় এলে দিব্যর সঙ্গে হাসতেও লাগল সে স্বাভাবিকভাবে৷ তা দেখে গল্প শেষে দিব্য হঠাৎ বলল‚ “আমি ভেবেছিলাম দিলিশার ব্যাপারে জানার পর তোমাকে খুব আপসেট হতে দেখব।”
“আচ্ছা… আপনি তাহলে এটা ভেবেই এসেছিলেন আমাকে সিম্প্যাথি জানাতে?”
বলা শেষে গা-ছাড়া একটা নিঃশব্দ হাসি দেখা গেল মারিশার ঠোঁটে।
দিব্যও বক্র ভঙ্গিতে হাসতে হাসতে বলল‚ “তোমার খারাপ লাগেনি বলতে চাচ্ছ?”
“না‚ এটা বললে মিথ্যা হবে”‚ হালকা গলায় বলল মারিশা।
“আমি যেহেতু আশা নিয়ে এসেছিলাম। সেখানে রিজেকশন পেয়েছি‚ এবং অন্য কেউ এখন আশফির জীবনে আছে তা জানতে পেরেছি‚ এটা নিশ্চয়ই কষ্টের৷ আমি তো চার বছর পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ছিলাম আশফির থেকে৷ কিছুই জানতাম না ও কেমন আছে‚ কী করছে! তাই একটা আশা নিয়ে ছিলাম‚ আমার কাজ শেষে আমি ওর কাছে ফিরে আসার সুযোগ পাবো৷ কিন্তু ও মুভ অন করেছে। অন্য কাউকে সিলেক্ট করে ফেলেছে। যেটা খুবই নরমাল৷ আর আজকের পর থেকে আমি নিজেও ওই আশাটা নিয়ে দিন কাটাব না৷ প্রশ্নই আসে না৷ কষ্ট পেলেও তা সামলে ওঠাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। কষ্টের সাগরে ডুবে থাকাটা কোনো বাস্তবতা নয়। এতে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়টাই নষ্ট শুধু৷ একজনের উপস্থিতির ওপর আমার ভালো থাকাটা নির্ভর করবে‚ এটা আমি কখনো ভাবিই না। এতটা নির্ভরশীলতা আমি পছন্দও করি না। এটা আমার দ্বারা পসিবলও না। আশফিও কিন্তু এমনই ভাবে। ওর সঙ্গে আমার মেন্টালিটি ম্যাচ করে খুব৷ এজন্যই খুব স্বল্প দিনে আমরা একে অপরকে চিনে গিয়েছিলাম‚ বুঝে গিয়েছিলাম। ভালোবাসতেও দেরি হয়নি৷ হ্যাঁ‚ এটা সত্য যে‚ আমি চেয়েছিলাম ও একটু ছাড় দিক আমার অপরাধকে। কারণ আমার পরিস্থিতিটাও তো জটিল ছিল৷ আর কষ্ট আমি ওকে যতটা দিয়েছিলাম‚ বিনিময়ে আমিও অনেকটা সাফার করেছি৷ কিন্তু ওর পক্ষে যেহেতু সম্ভব নয় সম্পর্কটাকে আর ঝালাই করা‚ আর আমার জন্য ফিলিংস তৈরি করা‚ সেখানে আমি জোর করতে পারি না ওকে। এটা অন্যায়। আর আমার ইগো সেল্ফ সেটা কখনো অ্যালাও করবে না। যেমনটা আমার থেকে পাওয়া চরম যন্ত্রণাদায়ক রিজেকশন আশফির মন আর ইগো‚ দুটোই সহ্য করতে পারেনি।”
“কিন্তু পরাগকে একটা কথা বলতে শুনি‚ শুদ্ধ ভালোবাসার মাঝে ইগোইজমের কোনো জায়গা নেই। আমি এসব ভালোবাসা টাসা বুঝি না। তাই জানতে চাচ্ছি‚ পরাগের কথাটা কি তাহলে ভুল? না-কি তোমাদের ভালোবাসাতে ছিল খাদ‚ যে এখানে ইগো ঢুকে পড়ল?”
“না‚ সে ভুল বলেনি”‚ মৃদুস্বরে কথাটা বলল মারিশা‚ একটা চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে।
দিব্যর প্রশ্নটা বিদ্ধ করেছে ওকে তীব্রভাবে৷ সত্যিই তো‚ খাঁটি ভালোবাসাতে কি কখনো অহংবোধ জায়গা পায়? আশফিকে ছেড়ে ডেনিজকে গ্রহণ করাটা আশফির অন্তরকেই শুধুই আঘাত করেনি‚ করেছিল তার অহং সত্তাকেও। আর তা করার মতোই ধারাল বাক্যবাণ ছুড়েছিল সে আশফিকে। কিন্তু আজ তো আশফি ওর পরিস্থিতি শিকারের গল্পটা সবই জানে। তবুও সে ওর জন্য আর কোনো অনুভূতি রাখতে চায় না… ভুলতে পারে না ওর দেওয়া আঘাতটাকে৷ কারণটা ওই যে‚ আঘাতটা তার অহং সত্তাকে ক্ষিপ্ত করেছে!
যেমনটা আজ সকালে ক্ষিপ্ত করেছে আশফি ওর অহমকেও৷ ওর অপরাধবোধ আশফির অভিমান যখন ভাঙাতেই পারল না‚ ববং বারবারই আশফি প্রকাশ করে গেল তার জীবনে ওর অবস্থানটা আর গুরুত্ব বহন করে না‚ সে সময় কঠিনভাবে ওর মনকে যতখানি ক্ষতবিক্ষত করল‚ ঠিক ততখানিই আবার শক্তও করে তুলল ওর অহংবোধটাই৷ প্রতিজ্ঞাও করে বসল ওই অহং সত্তাই‚ আর কখনোই সে ভালোবাসার আকুতি নিয়ে দাঁড়াবে না আশফির সামনে।
কিন্তু ওদের দুজনের মাঝে এই অহংবোধ কী করে স্থান পেল? কারণ কি এটা‚ ওরা কেউ-ই সামাজিক মর্যাদা আর যোগ্যতার দিক থেকে সমান বইকি কম নয়? আশফি একজন দুঃসাহসিক অভিযাত্রী ও ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণকারী হিসেবে বিশ্বের কাছে পরিচিত। তেমন অল্প বয়সে নিজের তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা আর সাহসিকতার জোরে মারিশা তার বাবার সারাজীবনের পরিশ্রমে গড়া এজেন্সিকে রক্ষা করে একজন চতুর ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত আজ। তাহলে যোগ্যতার মাপকাঠিতে ওরা কে কার থেকে কম? আর এই অহংকারই তবে আজ ওদেরকে মিলিত হতে দিল না? ভালোবাসাতে সত্যিই তবে খাদ ছিল? নাহ‚ মারিশার বিশ্বাস হলো না ওর ভালোবাসাতে কোনো খাদ ছিল। আশফিও মনে যতই রাগ‚ অভিমান পুষে রাখুক‚ কিন্তু আজও সে ওর জন্য একটুখানি হলেও কোমল… ওর প্রতি যত্নশীল৷ ভালোবাসাটা ছিল বলেই সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো জীবিত আছে তার মাঝে।
তাই দৃঢ় স্বরে বলল মারিশা‚ “কোনো খাদ ছিল না আমাদের অনুভূতিতে। হয়তো কমতি ছিল৷ যতখানি ভালোবাসা হলে এভাবে বিচ্ছেদটা ঘটত না আমাদের‚ ততখানি ভালোবাসতে পারিনি আমরা। না না… ঠিক পারিনি নয়। ভালোবাসার সুযোগটা পাইনি।”
“তার মানে বলতে চাচ্ছ‚ তুমিও মুভ অন করতে চলেছ?”
“চলেছি না‚ করে ফেলেছি”‚ মুচকি হেসে তাকাল মারিশা‚ “আশফি ওর জীবনে দিলিশা বা যাকেই চুজ করুক‚ ওর জন্য সব সময় আমার বেস্ট উইশেস থাকবে। যদিও একটু সময় লাগবে ব্যাপারটা পুরোপুরি মানিয়ে নিতে। কিন্তু আর কোনো সমস্যা হবে না‚ সেটাও আমি জানি।”
প্রশংসার ভঙ্গিতে ঠোঁটের দু কোণ বাঁকিয়ে হাসল দিব্য‚ “ভালো লাগল তোমার বোল্ডনেস। ইম্প্রেসিভ পার্সোনালিটি!”
“কাল তাহলে আপনারা ট্রেকিং শুরু করতে চাচ্ছেন কোথায়? এ ব্যাপারে তো কোনো কথা বলার সুযোগ হলো না।”
“মার্ডি হিমাল ট্রেকিং রুট। জানো এটা নিয়ে?”
“সুযোগ হয়নি এখনো। ঘরে গিয়েই দেখব রুটটা।”
“আমার সঙ্গে দেখতে আপত্তি আছে না-কি?”
কফিতে চুমুক দিয়ে বাঁকা হাসল মারিশা৷ নির্বিকার চেহারায় শ্রাগ করল‚ “নো ইস্যুজ!”
পকেট থেকে ফোনটা বের করে মার্ডি হিমালের সমস্ত ট্রেকিং রুটের কিছু ছবি দেখাতে শুরু করল দিব্য। ছবি দেখতে দেখতে আর কথা বলতে বলতে ওরা দুজন বেশ কিছুটা কাছাকাছি দাঁড়াল।
এর মাঝেই দিব্যকে খুঁজতে বেরিয়েছিল আশফি৷ ওর মন বারবার সঙ্কেত পাচ্ছিল‚ মারিশার কাছেই হয়তো এসেছে সে! তবুও আগে আশপাশ খুঁজল। না পেয়ে তারপর এল মারিশার ভবনের দিকে৷ আর তখনই আঙিনার চারধারে থাকা স্পটলাইটের ঝকঝকে আলোয় চট করেই ওর চোখে পড়ে গেল কাঙ্ক্ষিত বন্ধুকে৷ কিন্তু মারিশার অতটা কাছে দিব্যকে দেখার পরই ও থমকে পড়ল। গম্ভীর দেখাল ওকে নিমিষেই। কপালে ভাঁজ ফেলে ওদেরকে দেখতে দেখতে ভাবল‚ কী এমন জিনিস দেখছে ওরা ফোনের মধ্যে‚ যার জন্য দুজনের কারোরই কোনো খেয়াল নেই আশেপাশে কে কী করছে? শ্লথ গতিতে হাঁটতে হাঁটতে এগোল ওদের দিকে।
তবে মারিশা সত্যিই একদম ডুবে গেছে দিব্যর ফোনে। সারা রুটের খণ্ড খণ্ড ছবিগুলো দেখায় যখন মগ্ন ও‚ তখন দিব্য ওর কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বিভোর হয়ে আছে ওর মাঝে। চাউনিতে ওর কামুকতা‚ না-কি প্রেমাতুরতা‚ তা জানতেও পারল না মারিশা। হিমেল হাওয়ায় ওর পিঠের ওপর ছড়িয়ে থাকা খোলা চুলগুলো থেকে শ্যাম্পুর ঘ্রাণ নাকে এল দিব্যর। ঘ্রাণটাও ওকে এতটা আকৃষ্ট করল যে‚ নাকটা একটুখানি ছোঁয়াল মারিশার চুলের মাঝে। আর তারপরই ছাড়াল নিজের সীমাটুকু। নাকটা আরেকটু ডুবিয়েই সে ঘন স্বরে বলল‚ “দ্যাট স্মেল’স কাইন্ডা সিডিউসিং মি‚ মারিশা! আই অ্যাম ইনোসেন্ট।”
বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ১০
“দিব্য…!” বজ্রকঠিন গলায় চিৎকার করে উঠল আশফি‚ দিব্যর কথাটা শেষ হতে না হতেই।
মারিশাও তখনো প্রতিক্রিয়া দেখানোর সুযোগ পায়নি‚ যতটা দ্রুত আশফি কোথা থেকে এসেই চেঁচিয়ে উঠে তেড়ে এল‚ দিব্যর কাঁধের কাছে শার্টটা চেপে ধরে টান মারল তাকে! চেপে ধরেই গলা নামিয়ে চিড়বিড়িয়ে বলল‚ “কী করছিলি তুই? কোন সাহসে ওর কাছে গিয়েছিস?”
