বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ১২
ইসরাত জাহান দ্যুতি
নিয়মিত দিই আর অনিয়মিত‚ সব পাঠক পরে পড়ার অপেক্ষা ফেলে রেখেছে৷ যে কারণে দিনে দিনে রিয়্যাক্ট‚ কমেন্ট সবই কমছে। আমি আর তাই ❝মনাকাশে ধ্রুবতারা শেষে❞ পাণ্ডুলিপি শেষ না হওয়া অবধি আর কোনো পর্ব দেব না। কারণ কষ্ট করে দুটো লেখা এক সাথে চালাচ্ছি একদম অকারণেই। আর একটা পর্ব দিতে পারি৷ এরপর নভেম্বরের আগে প্লিজ আর কোনো পর্ব চাইবেন না কেউ।
আকস্মিক ঘটনায় মারিশা চমকাল ভালোই৷ আর দিব্যকে দেখাল কিংকতর্ব্যবিমূঢ়। তারপর হঠাৎই চটে গিয়ে আশফিকে ধমকে উঠল সে‚ “ওই‚ কী সমস্যা তোর‚ হ্যাঁ? এভাবে টান মারলি কেন? যেন আমি একটা চোর‚ কিছু চুরি করছিলাম ওর থেকে!”
মাথা আরও গরম হলো আশফির। নিজের অন্যায়কে ঢাকার জন্য এখন সে উলটো রাগ দেখানোর নাটক করছে বলে!
তাছাড়া দিব্য কখনোই নিজের অন্যায়কে অন্যায় বলে মনেও করে না। এই যে এ মুহূর্তেই আশফি এসে উপস্থিত না হলে দিব্যর পরবর্তী পদক্ষেপটা হত মারিশাকে আচমকা চুমু খেয়ে বসা! তারপর সেটাকে সরলভাবে প্রকাশ করত‚ সে আসলে সম্পূর্ণ ঘোরের মাঝে করে ফেলেছে! মাফ চাওয়ার একটা মিথ্যা অভিনয় চালিয়ে নিজেকে শেষে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করত। আর এ ধরনের ভণ্ডামিই ও করে থাকে সব সময়।
আশফি উত্তেজিত হতে হতেও পরিবেশ‚ পরিস্থিতি বিবেচনায় রাগকে দমাল। দিব্যর সাথে সম্পর্কটা আত্মীয়তার ছাড়া স্রেফ বন্ধুত্ব হলে এত কিছু আর বিবেচনা করত না। শীতল‚ অথচ চাপা উষ্মা নিয়ে দিব্যর দিকে চেয়ে রইল। নিচুস্বরে কঠোরভাবে বলল তারপর‚ “এক্ষুনি ওর সীমানা ত্যাগ করবি‚ যদি নিজের মান-সম্মান বাঁচাতে চাস।”
ভীষণ বেপরোয়া আর বেয়াড়া স্বভাবের দিব্য কথাটা শোনা মাত্রই ঝগড়া বাঁধিয়ে বসল‚ “কী করবি তুই? কী করেছি আমি‚ যার জন্য তুই আমার মান-সম্মান নিয়ে হুমকি দিচ্ছিস? যদি কিছু করেও থাকি‚ সেটা যার সঙ্গে করব সে বুঝবে। তোর সাথে তার আর কোনো লেনাদেনা আছে? একটু আগে না নিজেই বলে এলি‚ তোদের পথ আলাদা? আর কোনো সম্পর্ক তৈরি করবি না তুই? তাহলে এখন এসে পজেসিভনেস দেখাচ্ছিস কেন?”
“কারণ‚ ও আমার রেসপন্সিবিলিটি”‚ গর্জন সুরে বলল আশফি।
একটা মুহূর্ত সে দিব্যর ক্রুদ্ধ চোখে চোখ রেখে নীরব রইল। তারপর বলল‚ “তাতে না থাক ব্যক্তিগত সম্পর্ক। মিরান ওকে আমার দায়িত্বে‚ আমার ভরসাতে পাঠিয়েছে। তাই ওর জন্য যে বা যা হার্মফুল‚ ডেঞ্জারাস‚ সেটার থেকে আমি ওকে সেইফ তো করবই।”
বিস্ময়বিমূঢ় হয়ে দুজনের কাণ্ডকারখানা দেখতে দেখতে দুজনের শেষ কথাগুলোতে মারিশার চোখ-মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল সহসাই—কাঠিন্য হয়ে উঠল ওর মুখটা। দিব্য কিছু একটা করতে যাচ্ছিল‚ তা আশফির কথাতে কিছুটা বুঝেছে সে। কিন্তু আজকের পর থেকে ওর জন্য আশফি কোনো চিন্তা করুক‚ বা ওর নিরাপত্তা নিয়ে এভাবে ব্যস্ত হোক… হইচই করুক‚ এটা আর ও বরদাস্ত করবে না। তবে দিব্যর সামনে আশফিকে শক্ত কোনো কথাও শোনাতে চাইলো না।
তাই কেবল গম্ভীর গলায় বলল ওদের‚ “বাচ্চাদের মতো ঝগড়াঝাঁটি বন্ধ করো তোমরা। আর করার হলে নিজেদের রুমে গিয়ে করো৷ আমাকে কোনো ডিস্টার্ব কোরো না৷ গুড নাইট।”
আর দাঁড়াল না সে তারপর৷ কালো স্টিলেটোর টকটক আওয়াজ তুলে নিজের ঘরের দিকে এগোল৷
“হল্ট”‚ পেছন থেকে তখনই কর্কশ‚ গম্ভীর গলায় আদেশ করল আশফি‚ “আই হ্যাভ সামথিং টু সে… আফটার দ্যাট ইউ মে গো।”
মারিশা অটলতার সঙ্গে ফিরে তাকাল‚ আর চোখের চাউনিতে তীক্ষ্ণতা। ওকে দাঁড়াতে দেখে আশফি তারপর দিব্যর দিকে ফিরল। বলল সেই কর্কশ‚ তবে নিচুস্বরে‚ “আর তুই‚ ঘরে যাবি এখনই। ওর সাথে কথা শেষ করে এসে তোর সঙ্গে বোঝাপড়া হবে।”
জবাবে দিব্য চেঁচিয়ে উঠতে গেলেই এবার কণ্ঠের শীতলতায় বলল আশফি‚ “আমাকে উষ্কাবি না‚ দিব্য৷ নয়তো এখানে ফারহান আঙ্কেলকে জড়াব।”
হুমকিটা কাজে দিল। চলে যাওয়ার আগে আশফির প্রতি শেষ যে চাউনিটা ছুড়ে গেল দিব্য‚ তা ছিল‚ “ঘরে আয়। বোঝাপড়াটা ভালোভাবেই করব তারপর।”
দিব্য যেতেই আশফি এল মারিশার কাছে৷ বুকের ওপর হাত আড়াআড়িভাবে রেখে দাঁড়িয়ে আছে মারিশা। ওর অনমনীয়‚ গম্ভীর হওয়া মুখটাতে ঠান্ডা চোখে কতক পল দেখল আশফি। মারিশাও তার চোখে চোখ রাখল দৃঢ়ভাবে।
“কী হচ্ছে এটা?” শান্ত তবে হতাশাপূর্ণ স্বর আশফির‚ “ওর মোটিভ কি তুমি বুঝছ না?”
“বুঝছি। তো?”
“তো? ওকে সুযোগ দিতে চাইছ! কেন?”
“সুযোগ? কী ধরনের সুুযোগ?” ভ্রুজোড়া একটু কুঁচকাল মারিশা। অর্থাৎ ওর পছন্দ হয়নি আশফির কথাটা।
ছোট্ট করে প্রলম্বিত শ্বাস ফেলল আশফি‚ “আমি জানি‚ খেলতে ভালো লাগে তোমার দিব্যর মতো ছেলেদের নিয়ে। কিন্তু ও বেপরোয়া আর ধড়িবাজ। ও প্রচণ্ড ট্রিকি। সিম্পল ডেট বা কোনো ট্রিপে গিয়ে‚ বা কোনো প্রোগ্রামে‚ এমনকি হ্যাংআউটেও মুহূর্ত সময়ের মাঝে নানারকম সিচুয়েশন বানিয়ে টার্গেটের থেকে কাজ হাসিল করা ছেলে ও। যে সিচুয়েশনে কোনো মেয়েই কোনোদিন ওকে ক্রিমিনাল বলার স্কোপ পাবে না‚ সেভাবেই ও ট্রিক্স অ্যাপ্লাই করে। আমি কী বলতে চাচ্ছি‚ তুমি বুঝতে পারছ?”
দিব্য খুবই ধূর্ত‚ তা ভালোই বুঝতে পেরেছে মারিশা। আশফি যা বলতে চাইছে‚ সেটাও বুঝল ও৷ এতটাও অবশ্য চিনতে পারেনি সে দিব্যকে। কিছুটা শান্ত হলো তাই। তবে জিজ্ঞেস করল‚ “যার কাছে মেয়েরা কখনোই সেইফ না‚ সে তাহলে কী করে তোমার ভালো বন্ধু হতে পারল?”
“না‚ এটা ভুল। ও কোনো স্যাডিস্ট না‚ রেপিস্টও না৷ ও নিজের ক্লাসে বিলং করা মেয়ে ছাড়া মিডল ক্লাস ফ্যামিলির মেয়েদের পছন্দ করে না। ও ভাবে সেটা ওর সোশ্যাল প্রেস্টিজ নষ্ট করে। কখনো কারও সাথে জোরাজুরিও করে না৷ যার থেকে একটুখানি হলেও গ্রিন সিগন্যাল পায়‚ তাকেই কেবল পেতে চায়। কারও রিজেকশন পেলে ও তার আশেপাশেও ঘেঁষে না। আর তুমি যদি ওকে এভাবে প্রশ্রয় দাও‚ তা ও পজিটিভ সাইন বলেই ধরে নেবে।”
“বুঝলাম। তাহলে সে ডেঞ্জারাস নয়৷ বাট আই লাইক কানিং পিপল‚ ট্রিকি পিপল। তবে তুমি বলতে চাইছ…”‚ অবজ্ঞাপূর্ণ হাসল মারিশা‚ “আমি যেন ওকে ইগনোর করি?”
হাসিটা দেখে আশফি চুপ করে চেয়ে রইল ওর দিকে। সেই ফাঁকে মারিশা এবার বলল‚ “আচ্ছা আমি যদি ওকে পছন্দ করি‚ তুমি কি তা অপছন্দ করবে? মানে তোমার বন্ধুকে সিলেক্ট করাটা তুমি পজিটিভলি নিতে পারবে কি? সরাসরিই বলো। আমি কিছু মনে করব না৷ তোমার আপত্তি থাকলে আমি অবশ্যই ওকে ইগনোর করব।”
“তুমি তাকে সিলেক্ট করতে চাইছ?” স্থির চোখে চেয়ে জিজ্ঞেস করল আশফি।
মৃদু হেসে পালটা প্রশ্ন করল মারিশা‚ “যদি চাই?”
“তাহলে বলব‚ থার্ড টাইমও তুমি অযোগ্য কাউকে চুজ করছ।”
“থার্ড টাইম! সো ইউ আর সেইয়িং… ইভেন ইউ ওয়্যার আনওর্থি অফ মি?”
“সার্টেনলি। আমি অযোগ্য না হলে তুমি ডেনিজকে গ্রহণ করার সিদ্ধান্তটা নিতে? কিন্তু দুঃখজনক‚ সেও তোমার যোগ্য ছিল না। তাই বলছি‚ এবার আর কোনো তাড়াহুড়ো কোরো না। দিব্য তোমার জন্য সঠিক হলে আমি এতটা রিয়্যাক্ট করতাম না‚ মাহি।”
“ডেনিজকে সিভিল ম্যারেজ করার সিদ্ধান্তটা কেন নিয়েছিলাম…”‚ গমগমে গলায় বলল মারিশা‚ “তা তুমি জানো‚ আশফি।”
“জানি। তোমার বাবার এজেন্সিকে ফিরে পেতে এবং বাবার পরামর্শে ডেনিজকে বিয়ে করেছিলে। মাত্র চার মাসের সম্পর্কে আবদ্ধ হওয়া মানুষটা তো আর তোমার বাবার ইচ্ছা এবং তার এজেন্সি থেকে বড়ো হতে পারে না৷ কিন্তু তখন আমি যদি কোনো বিলিয়নার হতাম‚ তাহলে তোমার বাবা কি ডেনিজকে বিয়ে করতে বলত তোমাকে? না তুমি…!”
শেষ কথাটা শেষ করল না আশফি। কারণ‚ সেটা তিক্ত সত্য তার কাছে। যে সত্য কখনোই কোনো মানুষ সহ্য করতে পারে না। আর আশফি চায়ও না পুনর্বার মারিশাকে কোনো আঘাত করে কথা বলতে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ওর থমথমে মুখপানে চেয়ে সে বলল‚ “তুমি বরং দিব্যকে নিজেই জাজ কোরো। যেহেতু ওকে নিয়ে ভাবতে চাইছ।”
“ভাবতে চাইছি কি চাইছি না‚ সেটা পরের কথা”‚ যান্ত্রিক অভিব্যক্তিতে মারিশা বলল‚ “তবে আমি চাইছি না তুমি তোমার অধিকারের গণ্ডি পেরিয়ে আমাকে নিয়ে‚ আমার সেইফটি নিয়ে চিন্তিত হও৷ আমার ভাই তোমাকে ভরসা করে পাঠালেও আমার গার্ডিয়ান করেনি।”
“অল রাইট।” আশফির ঠোঁটের এক কোণে অদৃশ্য বেদনার হাসি ফুটল ধীরে ধীরে।
মৃদুস্বরে বলল‚ “যখন ছিল অধিকার‚ তখনই সেটা প্রয়োগের অধিকার পাইনি৷ অঘোষিতভাবে কেঁড়ে নেওয়া হয়েছিল। আর আজ তো নেই-ই কোনো অধিকার। সেখানে ঘোষণা করার পর কোনো প্রশ্নই আসে না ওই অধিকার দেখানোর।”
ঠোঁট কামড়ে ধরে ভেতর থেকে ছুটে আসা কান্নার বাঁধটা থামাল মারিশা। আশফি আর চেয়ে নেই ওর দিকে। নীরবে মাথাটা নুইয়ে নিজের পায়ের দিকে চেয়ে রইল সে। পুরনো ব্যথার উপশম ঘটেনি তার আজও৷ তাই মাঝেমধ্যেই সেই ক্ষত তাজ হয়ে ওঠে—কেউ তা বোঝেও না।
দুজনের মাঝে কয়েক মুহূর্ত মৌনতা বিরাজ করল। হঠাৎ নিঃশ্বাস ফেলল আশফি। যে নিঃশ্বাস ফেলাটা বোঝাল সব কিছু যেন ঝেড়ে ফেলেছে সে।
“ঠিক আছে‚ ঘরে যাও তাহলে। স্লিপ ওয়েল।”
মারিশা কোনো উত্তর দিল না। চুপচাপ চলে যেতে লাগল৷ পেছন থেকে ওকে নির্নিমেষ দেখতে দেখতে হঠাৎ কিছু মনে পড়ল আশফির৷ দ্রুত ওকে ডেকে উঠল‚ “মাহি‚ কাল ভোরবেলা বের হতে হবে৷ চারটায়।”
ফিরে তাকাল মারিশা‚ “ঠিক আছে‚ তাড়াতাড়ি জাগার চেষ্টা করব।”
“চিন্তা নেই। আমি কল করে ডেকে দেব।”
“থ্যাঙ্কস।”
আশফি বিদায় নিল না তখনো। দাঁড়িয়েই রইল‚ মারিশা চোখের আড়াল না হওয়া অবধি৷ আর মারিশা যেতে যেতে হঠাৎ থমকে গিয়ে ফিরে তাকাল আবার‚ উচ্চস্বরে জিজ্ঞেস করল‚ “আচ্ছা দিলিশাকে আমি কী ডাকব?”
“দিলিশাকে কী ডাকবে মানে?” ভ্রু‚ কপাল কুঁচকে ফেলল আশফি।
“ভাবি? তোমার বউ সম্পর্কে আমার ভাবি হবে না?”
“হোয়াট?” কথাটা শুনতেই বিস্মযোক্তি বেরিয়ে এল আশফির কণ্ঠ থেকে‚ “মাথার নাটবল্টু কি সবই খুলে গেছে?”
“ভাবি না?” মারিশাকে ভাবুক দেখাল‚ “মামার ছেলে তো ভাই-ই হয়‚ না? মামা ভাই না কী যেন? ওহ সরি সরি‚ মামাতো ভাই।”
সরল গলায় বলল তারপর‚ “তাহলে ভাইয়ের বউ তো ভাবিই হবে! ঠিকই তো বললাম।”
ভারী কদম ফেলে মারিশার কাছে এসেই ওর মাথায় জোরে একটা গাট্টা মারল আশফি‚ “মদ ছাড়াও মাতাল হও না-কি‚ হ্যাঁ?”
“আশ্চর্য…”‚ ব্যথা পাওয়া জায়গা চেপে ধরে রেগেমেগে চেঁচাল মারিশা‚ “এত কিছু বদলেছ আর আমার মাথায় মারার অভ্যাস তোমার যায় না?”
ওর রাগের ধার না ধেরে আশফি এবার ওর কান টেনে ধরল‚ “জীবনে কবে ভাই বলেছ আমাকে‚ হুঁ? মেনেছ কখনো ভাই? আর আমার বউকে ভাবি ডাকতে চাও কোন আক্কেলে? তার ছেঁড়া!”
“উফঃ…”‚ হাতটা ঝাড়ি মেরে সরিয়ে মারিশা চেঁচাল‚ “তাহলে কি সতিন ডাকব?”
“সতিনও শিখে গেছ?” ফিক করে হেসে ফেলল আশফি।
ফিচলেমো সুরে বলল তারপর‚ “হ্যাঁ‚ ক্যালকুলেশন এবার ঠিক আছে। তা সতিন খোঁজার দায়িত্বটা নেবে না-কি?”
“স্ট্রেইঞ্জ! থাকতে কেন খুঁজতে বলছ?” নীরস গলায় কথাটা বলেই মারিশা হনহনিয়ে চলে গেল।
ভোরের আলো তখনো ফোটেনি। কিন্তু আশফির পুরো দলটা ব্যাগপ্যাক গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। গাড়ির বনেটে দিলিশার ব্যাগপ্যাক রেখে আশফি ওকে জিজ্ঞেস করল‚ “তোমার আর কোনো ব্যাগ আছে এখানে রাখার মতো?”
“না‚ ট্রাভেলিঙে একগাদা জামাকাপড় টেনে আনে কেউ?”
“তুমি তাহলে ভেতরে গিয়ে বসে পড়ো। ঘুমিয়েও নিতে পারো।”
“সবাই এক সঙ্গেই উঠি। তোমার কাজিনের বোনটার জন্য সবাই অপেক্ষা করছে বোধ হয়৷ সে আসুক আগে।”
মারিশাকে করা সম্বোধনের ভঙ্গিমাটা একটু অপছন্দ হলো আশফির। মুহূর্তেই জানাল‚ “ওকে মারিশা বলতে পারো।”
“ও আচ্ছা… ঠিক আছে। মারিশা মিরান ভাইয়ার মতোই দেখতে অনেকটা‚ তাই না? মনেই হয় না তারা স্টেপ সিবলিংস।”
“হবেই বা কেন? ওদের বাবা এক। কেবল মা ভিন্ন।”
এসব কথাবার্তার মাঝেই হৃদয়রা এসে দাঁড়াল ওদের কাছে। সৌভিক সবাইকে তখন বলল‚ “ড্রাইভারের পাশের সিটটা আমি নিচ্ছি।”
কারও কোনো আপত্তি নেই শুনে সে উঠে পড়ল গাড়িতে। হৃদয় হাই তুলতে তুলতে ফোনে সময় দেখল। চারটা দশ বাজে৷ সবাই-ই উপস্থিত। কেবল মারিশাই এখনো আসেনি। আশফি একবার যেতে চেয়েছিল ওর হলো কিনা তা দেখতে৷ কিন্তু রাতের ওই বাক্য বিনিময় মুহূর্তটা মনে পড়তেই নিজের সীমাবদ্ধতা স্মরণে আসে ওর। তাই আর যায়নি মারিশাকে ডাকতে।
আরও পাঁচটা মিনিট পার হলে দিব্য আশফিকে বলল‚ “ওকে কল কর‚ নয়তো ডাকতে গেলাম।”
ঘুমের রেশটা তেমন কাটেনি বলে দাঁড়িয়ে থাকতে ভালো লাগছে না কারোরই। কিন্তু মেয়ে দুজন কোথায় বসতে চায়‚ তা দেখার পর তো সবাই বসবে। এজন্যই বাইরে অপেক্ষা করা।
কল করতেই যাচ্ছিল আশফি‚ এর মাঝে পরাগ বলল‚ “এসে পড়েছে।”
রিসোর্টটা একটি পাহাড়ি ঢালের ওপর তৈরি হওয়ায় গাড়ি সাধারণত রিসোর্টের মূল ভবনের ঠিক সামনে না এসে একটি নির্দিষ্ট পার্কিং এলাকায় দাঁড়ায়। রিসেপশনের দিক থেকে আসার পথটা ধরে মারিশা এগিয়ে আসছে। জলপাই রঙা স্লিম কার্গোর ওপরে কালো রঙা হাই নেক ট্যাঙ্ক টপস‚ টপসের ওপর বোতাম ছেড়ে দেওয়া ঢিলেঢালা সাদা শার্ট‚ হাতা কনুই অবধি গুটানো‚ আর পায়ে সাদা স্নিকার্স৷ রাতের মতোই মাথার ওপরের দিকের চুলগুলো হালকা করে টেনে খোঁপার মতো করে বাঁধা‚ আর পেছনের বাকি চুলগুলো খোলা। ওকে দেখতে গিয়ে দিব্যর ঘুম ঘুম ভাবটা একেবারে কেটে গেল। মনটার সাথে শরীরটা তার যেন একদম চনমনে হয়ে উঠেছে। তবে কেবল দিব্যই নয়‚ উপস্থিত সকলেই মনে মনে মুগ্ধ হলো ওকে দেখে।
কিন্তু আশফি বেশিক্ষণ আর চেয়ে রইল না। গাড়ির দরজা খুলে দিলিশাকে বলল উঠে পড়তে। ঠিক তখনই একটা ট্যাক্সি এসে থামল পার্কিং লটে। সবাই কৌতূহল নিয়ে তাকালে মারিশা এসেই পরাগকে বলল‚ “সরি‚ একটু দেরি করিয়ে দিলাম আপনাদের৷ আমার ট্যাক্সিটা আসতে দেরি করছিল বলে ড্রাইভারকে কলে তাড়া দিচ্ছিলাম৷ এজন্যই বের হতে দেরি হলো৷ এবার তাহলে সবাই উঠে পড়ি। আপনাদের জিপের পিছু পিছু যাবে আমার ট্যাক্সি।”
“মানে… আলাদা ট্যাক্সি কেন?” বেশ বিব্রত হয়ে বলল পরাগ‚ “আমাদের সাথে কি যেতে অসুবিধা আছে কোনো?”
গাড়ির দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আশফি তখন চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে আছে মারিশার দিকে৷ পরাগের প্রশ্নে কী জবাব দেয়‚ সেটা শোনার পর সে সিদ্ধান্ত নেবে কিছু বলবে কি-না!
আলাদা ট্যাক্সি বুক করায় সবার ধারণা কী হয়েছে‚ তা বুঝতে পেরেই মারিশা মুচকি হেসে পরাগকে আন্তরিকভাবে বলল‚ “আরে না না‚ ভাইয়া … আপনাদের জন্য আমার অসুবিধা হবে বলে ট্যাক্সি নিইনি৷ আমার জন্য আপনাদের অসুবিধা হবে বলে নিয়েছি। লোক সংখ্যা বেড়েছে না? সিট কম পড়বে তো। এতটা পথ! সবাই কী করে ম্যানেজ করবে? কষ্ট হয়ে যাবে খুব। আর আমি তো প্রায় উড়ে এসে জুড়ে বসেছি আপনাদের দলে। তাও সারাটা পথ কতটা কেয়ার করেছিলেন আমাকে! সেখানে আমি একটু আপনাদের জন্য ভাবব না?”
পরাগ কিছু বলতেই যাবে‚ তখনই ওর খেয়াল হলো‚ সিট সংখ্যা আসলেই কম হবে একজনের জন্য৷ ওরা সবাই শক্ত–সামার্থ্যবান শরীরের মানুষ। ঠাসাঠাসি করে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তা পারি দেওয়া আসলেই খুব কষ্টকর হবে। কিন্তু তাই বলে একা একা মেয়েটা ট্যাক্সি করে যাবে? কী বলবে বুঝে পেল না৷ সবার সাথে আলোচনা করা দরকার।
আলোচনা আর করতে হলো না অবশ্য। আশফি এগিয়ে এসেই মারিশাকে বলল‚ “আমি আর পরাগ যাব ট্যাক্সি করে। তুমি ওই গাড়িতে গিয়ে ওঠো‚ যাও।”
“আমার ট্যাক্সি করে যেতে একটুও সমস্যা নেই”‚ কপট মুচকি হাসিটা ধরে সে বলল‚ “ঘুমাতে ঘুমাতেই তো যাব। একা গেলে একটু আরাম করেই যাওয়া যাবে৷”
এরপর আর অপেক্ষা করল না সে আশফির জবাবের৷ নয়তো রাগারাগি‚ জোরাজুরি করে হলেও আশফি ওদের গাড়িতে উঠিয়ে ছাড়বে ওকে।
যেখানে আশফিই কিছু করতে পারল না‚ সেখানে আর কারোরই কিছু বলার রইল না। তবে ভেতরে ভেতরে প্রবল রাগে ফেটে পড়া আশফির মনের অবস্থাটা টের পেয়ে পরাগ ওর কাঁধে হাত চাপড়ে ইশারায় ঠান্ডা হতে বলল। কিন্তু আশফি তখনো ট্যাক্সিতে বসা মারিশাকে তীক্ষ্ণ চোখে দেখে যাচ্ছিল।
তবে তারপরই সানন্দে আশফির ক্রোধাগ্নিতে ঘি ঢালার কাজটা করল দিব্য। ট্যাক্সির জানালার কাছে এসে মারিশাকে জিজ্ঞেস করল‚ “ইফ আই জয়েন ইউ‚ আই হোপ আই ওয়োন্ট ডিস্টার্ব ইয়োর স্লিপ?”
সৌজন্যতা বা ভদ্রতা রক্ষার্থে মারিশা যে না বলতে পারবে না‚ এটুকু আত্মবিশ্বাসটা নিয়েই দিব্য প্রস্তাবটা রেখেছে। কিন্তু একটু পরই ওর আত্মবিশ্বাসে চির ধরল। মারিশাকে মোটেও সাগ্রহে সম্মতি দিতে দেখা গেল না। সৌজন্যসূচক একটু হাসলও না। তবে গাম্ভীর্যতা বজায় রেখে সবিনয়েই বলল‚ “আই হোপ ইউ ওয়োন্ট ডু অ্যানি সিলি থিংস‚ লাইক স্মেলিং মাই হেয়ার‚ দ্যাট কুড ডিস্টার্ব মাই স্লিপ।”
দিব্যর হাসি হাসি মুখটা একটা মুহূর্তের জন্য অপ্রস্তুত দেখাল। কিন্তু সে যেন মারিশাকে জয় করতে সকল আত্মসম্মান আপাতত ভরে রেখেছে নিজের ব্যাগপ্যাকে।
“অ্যাসিউর্ডলি‚ মাই মাজেসটি…”‚ বুকে হাত চেপে নড করে সে বলল‚ “দিব্য তার বেসামাল মনকে লৌহকঠোর শৃঙ্খলায় বেঁধে রাখবে।”
তার নাটকীয়তা দেখে অদূরে থাকা বন্ধুরা বিরক্তের চোটে আর দাঁড়িয়ে থাকল না৷ সবার আগে গাড়িতে চড়ে বসল আশফি‚ একদম পেছনের সিটটাতে। দিলিশা ছিল সামনের সিটে। পেছন ফিরে ওর কঠিন হয়ে থাকা মুখটা দেখে বেশ অবাক হলো সে। কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেল না৷ একে একে সবাই-ই উঠে এল। কেউ-ই ওকে ঘাঁটাল না। দিব্যও ততক্ষণে উঠে পড়েছে মারিশার ট্যাক্সিতে।
রূপাকোট রিসোর্টের শান্ত পরিবেশ ভেদ করে ওদের গাড়িদুটো গর্জন করে উঠল। ঘড়িতে চারটে বিশ। রূপাকোট থেকে ওদের গাড়ি আঁকাবাঁকা পথ ধরে এগিয়ে চলল পোখরার দিকে। চারপাশের নীরবতা ভেঙে গাড়ির হেডলাইটের আলো অন্ধকার পথ চিরে দিচ্ছিল। মারিশা চোখ বুজে পড়ে আছে সিটে মাথা এলিয়ে। দিব্য ভাবল‚ সে ঘুমিয়ে। তাই ঘণ্টাখানিকের জন্য নিজেও ঘুমিয়ে নিল।
সকাল পাঁচটা বেজে বিশ মিনিট। তারা এসে পৌঁছাল ফেওয়া লেকের পাড়ে। এখনো সূর্য পুরোপুরি ওঠেনি। তবে পূব আকাশে হালকা কমলা আর গোলাপি রঙের আভা দেখা যাচ্ছে। সবাই একটা টি-শপের সামনে গাড়ি দুটো থামাল। ছোট্ট সেই টি-শপ থেকে চায়ের মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছিল। গরম চায়ের কাপ হাতে নিয়ে লেকের পাড়ে গিয়ে দাঁড়াল সবাই৷
লেকের জল তখন আয়নার মতো শান্ত। হালকা কুয়াশা জলের ওপর ভাসছে‚ আর লেকের পাড়ে সারি সারি বাঁধা রঙিন নৌকা। সেগুলো দেখতে লাগছে যেন হাতে বানানো কোনো রঙিন কাগজের নৌকা। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আশফি চুপচাপ দেখছিল লেকের সৌন্দর্য। কিন্তু আদতে সে অন্যমনস্ক৷ পাশেই দিলিশা দাঁড়িয়ে। সে সবটাই বুঝতে পারছে। কিন্তু পরাগ‚ সৌভিক‚ হৃদয় আর দিব্যও পাশে থাকায় একাকী কথা বলার সুযোগ পাচ্ছে না সে। তাই কিছু জানতেও পারছে না‚ হঠাৎ করে কী হলো আশফির? কোনোভাবে যে মিরানের বোনটা দায়ী‚ তা সে বুঝতে পারছে। কিন্তু মেয়েটার সঙ্গে কবে‚ কী করে আর কতটা গাঢ় বন্ধুত্ব গড়ল ওর‚ যে বন্ধুর আলাদা ট্যাক্সিতে যাওয়া নিয়ে এতটা সময় ধরে রেগে থাকবে ও? সন্দিগ্ধ আর অসন্তুষ্ট মনেই সে গল্প করার চেষ্টা করল সবার সাথে।
ওদের থেকে একটু দূরেই দাঁড়িয়ে ছিল মারিশা। হাতে তার চায়ের কাপ থাকলেও সে খেতে পারছে না সেটা। মুখের ভেতরটা তেঁতো হয়ে আছে এমনিতেই। রাতে হঠাৎ করেই জ্বর এসেছিল। সঙ্গে সঙ্গে ওষুধ খেয়ে দিলেও জ্বরটা এখনো ছাড়েনি৷ চাটা ভীষণ তিতকুটে লাগছে তাই৷ বরং মুখটা আরও বেশি তেঁতো হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে পকেট থেকে নিকোটিন মুক্ত ভেপটা বের করল। ফল আর হালকা মিষ্টি একটা স্বাদ ছড়িয়ে দেয় মুখের ভেতর। তবে চিনি ছাড়া। ভেপটা ঠোঁটে নিয়ে ধীরে ধীরে নিশ্বাস টেনে নিল সে।
সাদা ধোঁয়াটা ওর মুখ থেকে বেরিয়ে ভোরের স্নিগ্ধ‚ নির্মল বাতাসের মাঝে মিশে গেল নিমিষেই৷ ঘুরতে ঘুরতে একটা সময় হারিয়ে গেল তা। প্রায় প্রতি রাতেই জ্বর কাবু করে নেয় ওকে৷ এ কারণেই মুখের বিস্বাদ থেকে মুক্তি পেতে বছরখানিক হলো ভেপের শরণাপন্ন হয়েছে সে।
এর মাঝেই হঠাৎ সূর্যের প্রথম সোনালি রশ্মি লেকের জলের ওপর পড়ে মুহূর্তেই জলের রং পালটে গেছে। লেকটা যেন ঘুম থেকে জেগে উঠেছে৷ আর দূর থেকে মাছাপুচ্ছ ও অন্নপূর্ণার চূড়াগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ওই চূড়াগুলো দেখতে দেখতেই এতটা গভীর মনোনিবেশে ভেপ টানছে মারিশা‚ যেন এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ এ মুহূর্তে আর কিছুই হতে পারে না৷ তাই খেয়ালও করল না‚ একটু দূরে দাঁড়ানো পরাগদের দলটা কেউ কৌতূহল চোখে‚ কেউ বিস্ময় নিয়ে হাঁ করে দেখছে ওকে৷ তারা তো আর জানতে পারছে না‚ ওটা নিকোটিন মুক্ত। যেমনটা জানল না আশফিও৷
বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ১১
মারিশাকে প্রথমে মদ্যপায়ী‚ তারপর আজ ধূমপায়ী হিসেবে আবিষ্কার করে মনের কোথাও ওর প্রতি এক মিশ্র অনুভূতি জন্ম নিল আশফির—রাগ‚ ক্ষোভ‚ তিক্ততা‚ এবং পাশাপাশি এই পরিবর্তনগুলোর কারণ কী‚ তা জানার সামান্য কৌতূহল।
