Home মন পবনে বৃষ্টি মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ১৭

মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ১৭

মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ১৭
তাসনিয়া নুর

কনকনে শীত । চারদিকে রাতের নিস্তব্ধতা। প্রকৃতির সাথে গ্রামও নিস্তব্ধ হয়ে আছে, আশেপাশে একটা কাকপক্ষী দেখা পাওয়া মুস্কিল। রাতের আধারে বিল দিয়ে হেঁটে আসছে তিনটি অবয়ব । মতলব মিয়ার বাড়ির সামনে এসে একে অপরের দিকে কিছু ইশারা করে।
মতলব মিয়ার বাড়ির চারদিক প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। বাড়িতে ঢুকতে গেলে অবশ্যই গেট দিয়ে প্রবেশ করতে হবে, কিন্তু এত রাতে নিশ্চই তাদের জন্য মতলব মিয়া গেট খুলে রাখবেনা।
আহির ফিস্‌ফিস্‌ কন্ঠে বলল,

— ভিতরে যেতে হলে দেয়াল টপকে যেতে
হবে। তোরা দাড়াঁ আমি আগে যাচ্ছি।
আহির নিজের হাতে থাকা জিনিসগুলো মাহিরের হাতে ধরিয়ে দিয়ে দেয়াল টপকানোর প্রস্তুতি নিল। আবইয়াজ আস্তে করে এগিয়ে এসে আহিরের কানে ফিসফিস করে বলে,
— সাবধানে । কেউ যেনো টের না পায়।
আহির মাথা নেড়ে আশ্বাস দেয়। আহির ভালোকরে সবকিছু স্কেন করে নিলো। না সব ঠিকঠাকই আছে। তাই আর দেরি করল না, প্রাচীর টপকে অপর দিকে চলে যায়। তার পর পর আবইয়াজ দেয়াল টপকে আহিরের কাছে চলে আসে। কিন্তু বিপত্তি ঘটে মাহিরের সময়। যেই লাফ দিবে অমনি তার জ্যাকেট আটকে যায় দেয়ালে থাকা পেরেকের মাঝে । মাহিরের পা রয়ে যায় উপরে আর শরীর মাটির দিকে ঝুলে গেলো। মাহির নিজের হাত ছোড়াছোড়ি করতে করতে বলল,

— এ ভাই আমাকে বাঁচা। আমি আটকে গিয়েছি।
আহিরের ইচ্ছে হলো মাহিরের মাথাটা দেয়ালে একটা বারি মারতে। কই তারাও তো টপকে এসেছে তারা তো আটকালো না। এই বলদ যে তার বড় ভাই কথাটা মনে পরলে মন চায় হারপিক দিয়ে কফি বানিয়ে খেয়ে মরে যেতে। আবইয়াজ চোখ পাকিয়ে বলল,
— তুই থাক এখানে ঝুলে । আমরা কাজ সম্পন্ন করে আসি।
মাহির আতকে উঠে । সে ঝুলে থাকবে মানে? না না কিছুতেই না। মাহির বলল,
— আরে ভাই আমাকে এখান থেকে বের কর প্লিজ । আমি এক অবলা পোলা।
আবইয়াজ আহির বিরক্ত হয়ে মাহিরকে সেখান থেকে নামায়।
পা টিপে টিপে সামনে আগায় । অবশেষে কাঙ্ক্ষিত জিনিসটা খুঁজে পেতেই হাসি ফুটে উঠে তিনজনের মুখে। এবার একে অপরের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসে। তাদের সামনে মতলব মিয়ার অতি আদরের ছাগল কাইল্লা, যাকে সামান্য স্পর্শ করলেও মতলব মিয়ার সহ্য হয় না।
আহির এবার মাহিরের দিকে তাকিয়ে কিছু ইশারা করে। মাহির হাতে থাকা ক্লোরোফর্মটা ভালোভাবে একটা রোমালে স্প্রে করে নেয়। ছাগল চুরি করার সময় যদি ‘মে মে’ আওয়াজ করে তাহলে ধরা পড়ে যাবে তাই এই পন্থা অবলম্বন।
মাহির স্প্রে করে রোমালটা উপর নিচ নেড়েচেড়ে দেখে। কিন্তু মনে সন্দেহ হচ্ছে যদি এটা কাজ না করে? তাই মাহির রোমালটা আবইয়াজের নাকে দিয়ে বলে,

— দেখ তো এটা ঠিকঠাক কাজ করছে কিনা । গন্ধ পাস?
আবইয়াজ নাক টেনে ভালোভাবে শোঁকে বলে,
— মনে তো হচ্ছে ঠিকঠাকই আছে।
আহির এতক্ষণ ধরে আশপাশ পর্যবেক্ষণ করছিলো । হঠাৎ এই দৃশ্য দেখে দৌড়ে আবইয়াজ ও মাহিরের কাছে গেলো। আবইয়াজের কাছে দুনিয়া কেমন ঝাপসা লাগতে আরম্ভ করে । কান কেমন ভোঁ ভোঁ শব্দ করছে।মুহূর্তেই আবইয়াজ নিচে ঢলে পড়ে । আহির কপাল চাপড়ে ফিস্‌ফিস্‌ কন্ঠে,
— ওরে বলদ রে। তোর মতো বলদ আমি আমার এই একজীবনে একটাও দেখিনাই । তুই তো বলদের চেয়ারম্যান। সামনের বছর তোরে ইলেকশনে বলদমন্ত্রী পদে দাঁড় করাব । আর তোর মার্কা হবে গাধা।
এখন এই আস্ত একটা হাতিরে সামলাবে কে হ্যাঁ? যা এখন এরে কোলে নিয়ে ঘুরে ঘুরে গান গাইতে থাক আর উম্মা খা ।
মাহির এবার অসহায় চোখে ভাইয়ের পানে চাইল।তার কি দোষ? সে তো শুধু চেক করছিল সব ঠিকঠাক কাজ করছে কিনা। এই আবহাওয়া যে বেহুশ হয়ে যাবে সে কিভাবে বুঝবে।
মাহির আহিরের দিকে তাকিয়ে বলল,

— আমি না হয় বলদ কিন্তু এই আবহাওয়ার বাচ্চা বলতে পারেনাই? বাদ দে এখন কি করব?
ফিরে যাব?
আহির ভ্রু নাচিয়ে বলল,
— ফিরে যাব মানে? কিছুতেই না। তোর পাছার প্রতিশোধ না নিয়ে আজকে বাড়ি ফিরছিনা।
— চুপ থাক এত পাছা পাছা করিস কেনো সুন্দর ভাষায় বলা যায়না?
আহির এবার জ্যাকেটের কলারটা টেনে বলল,
— আমি আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থী বলদমন্ত্রী। দাঁড়ান আমি কথাটা আপনাকে সুন্দর ভাষায় বলছি। যেহেতু পেয়ারা চুরি করার অপরাধে আপনার সম্মানিত পাছায় পেটানো হয়েছে তাই আমরা এখন প্রতিশোধ নিতে এসেছি। তা না নিয়ে কিছুতেই বাড়ি ফিরব না। এবার ঠিক আছে?

— তুই কি ভালো হবি না?
— না।
সোজা প্রতিত্তর আহিরের । মাহির হতাশ স্বরে বলল,
— ঠিক আছে তবে আগে ছাগলটাকে বেহুশ করতে হবে। তারপর আমার কিছু হিসাব বাকি রয়েছে ওগুলো নিতে হবে। কিন্তু এই আবইয়াজের কি করব?
আহির একটু ভেবে বলল,
— আপাতত এখানে থাকুক, আমরা বাকি কাজ গুলো করি তারপর দেখা যাবে।
আহির এবার ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে ছাগলের মুখে রোমালটা দিয়ে দেয়। শেষ আর ভয় নেই, আহির প্রস্থ হাসে । পাশে থাকা একটা বস্তা পরে থাকতে দেখে আহির সেটাকে হাতে নিয়ে নেয়। অতপর দুজন মিলে ছাগলটাকে বস্তার ভিতর পুড়ে নিল।
মাহির এবার আহিরকে একটু দাঁড়াতে বলে মতলব মিয়ার ঘরের দিকে পা বাড়ায়। কিন্তু ভিতরে কিভাবে ঢুকবে? বিষয়টা নিয়ে মাহির যখন চিন্তিত হঠাৎ তার চোখে পড়ে ঘরের একটা জানালা খুলা। যার মধ্যে কোনোরূপ নিরাপত্তা নেই। অনায়াসে চোর ঢুকে পরতে পারবে।

মাহিরের মনে প্রশ্ন জাগে মতলব মিয়া কি জানালা খুলে রেখেছে চুরের জন্য? যেনো নিজ থেকে বলছে চুর মামা আসো আমার বাসা থেকে সব নিয়ে পালাও। যাই হোক তারই সুবিধা হয়েছে।
মাহির জানালা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করে। ঘরে ঢুকার সময় পাশে একটা মোটা লাঠি দেখেছিল ওটা সাথে করে নিয়ে এসেছে। প্যান্টের পকেট হাতড়ে কিছু একটা বের করে । ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় মতলব মিয়ার মাথার কাছে। ঠিক সেই মুহূর্তে মতলব মিয়া চিৎকার দিয়ে বলেন,
— ওই কেডারে কেডারে। চিনছ আমারে আমি গোলামের পোত, হাড্ডি ভাইংঙ্গা লটকাইয়া রাখুম।
মাহির দৌড়ে জানালার ধারে যায়। কিন্তু তখনই মতলব মিয়ার নাক ডাকার শব্দ শুনতে পায়। বেটা যে ঘুমের ঘুরে কথা বলছে মাহিরের বোঝা হয়ে গিয়েছে। বোকটা এখনো কেমন ধরফর করছে। মাহির বিড়বিড় করে বলল,

— বেটা তোকে যা ও কম মারতাম এখন আমাকে ভয় দেখানোর অপরাধে ডাবল মাইর দিব।
মাহির আবারো পা টিপে টিপে মতলব মিয়ার মাথার কাছে দাঁড়ায়। ক্লোরোফর্মের রোমালটা মতলব মিয়ার মুখে চেপে ধরে । তারপর আস্তে আস্তে বাকি কার্যক্রম আরম্ভ করে । প্রথমে মতলব মিয়ার মুছের এক অংশ কেটে ফেলে দিল। পকেট থেকে মার্কার পেন বের করে সারা মুখে কি যেনো আঁকিবুকি করল । শেষমেষ হাতের লাঠিটা দিয়ে ইচ্ছে মতো পশ্চাৎপদে মারা আরম্ভ করে।
কিন্তু তাতে ও যেনো মাহিরের মন ভরেনি। এবার মতলব মিয়ার চুলের এক অংশে হাত লাগায়।
এদিকে মাহিরের জন্য কখন থেকে অপেক্ষা করছে আহির। মনে মনে শঙ্কা জাগছে আবার কোনো ঝামেলা পাকালো না তো?
খানিক সময় পরে আসে মাহির। চোখ মুখে তৃপ্তির ঝলক ।
আহির তাড়াহুড়ো করে বলতে থাকে,

— তারাতারি বের হতে হবে এমনি অনেকটা দেরি হয়ে গিয়েছে। এক কাজ কর আবইয়াজকে এক হাতে ধর অন্য হাতে ছাগলটাকে নে।
— আমি কেনো একসাথে এত কিছু নিব?
আহির কোমরে হাত দিয়ে বলল,
— আমরা প্রতিশোধ নিতে এসেছি কার জন্য?
— আমার জন্য ।
আহির আবারো জিজ্ঞেস করে,
— আবইয়াজকে বেহুশ কে করেছে?
মাহির মাথা নেড়ে উত্তর দেয়,
— আমি ।
আহির এবার ভ্রু নাচিয়ে বলে,
— তাহলে সবকিছু নেবে কে?
মাহির ফট করে বলে ফেলে,
— আমি ।

ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সাথে সাথে মুখ চেপে ধরে মাহির । তার এই গ্রামে আসাটাই উচিত হয়নি। হতাশ হয়ে এক হাতে ছাগলের বস্তাটা নেয় কাঁধে আবইয়াজকে ধরে । আহির আবইয়াজের অপর হাত নিজের কাঁধে নিয়ে নেয়।
গেটের সামনে আসতেই বাঁধে আরেক বিপত্তি এখন বাহিরে কিভাবে যাবে? দেয়াল টপকানো তো সম্ভব না। আহির গেটটা চেক করতে গিয়ে চারশত চল্লিশ ভোল্টের ঝটকা খায় । একি গেট যে খুলা, তারা তাহলে এতো কষ্ট করে দেয়াল টপকাল কেনো?
আহির মাহিরের কাছে এসে বলে,

মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ১৬

— গেট খুলা ছিল অথচ আমরা..।
মাহির তড়াক করে আহিরের দিকে তাকিয়ে বলল,
— তাহলে হুদাই এতো কষ্ট করলাম। একবার চেক করলে আমাকে এভাবে ঝুলতে হতো না ।
আহির, মাহির আবারো আবইয়াজকে ধরে বেরিয়ে পরে। কিছুদূর যেতেই তারা খেয়াল করে সামনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
মাহির শুষ্ক ঢোক গিলে বলল,
— এবার কি হবে?

মন পবনে বৃষ্টি পর্ব ১৮