মন পিঞ্জিরা পর্ব ১
শ্যামলী রহমান
আমি বড় হয়ে তোমার বউ হবো প্রহর ভাই।তুমি কি আমায় বিয়ে করবে?লিলি বুবুর মতো বউ সাজিয়ে অলিন্দ নীড়ে নিয়ে যাবে?নাকি পঁচা চাচ্চুর মতো কষ্ট দিবে?জানো পঁচা চাচ্চুর জন্য বিনু ফুপু কাঁদে।আমাকে কোলে নিয়ে বলেছে বড় হয়ে যেন তার মতো ভুল না করি, এই অলিন্দ নীড়ের কারো হিয়ার সাথে যেন সন্ধি না করি।আচ্ছা প্রহর ভাই এই হিয়া আর সন্ধি কি?এসব কি খারাপ জিনিস?নিশ্চয়ই খারাপ নয়তো ফুপু বারণ করবে কেন?আর কাঁদবেই বা কেন?”
ছয় বছরের বাচ্চা মেয়ে মিথির মুখে এহেন কথা শুনে কপালে ভাঁজ পড়লো প্রহরের।সে ছাঁদে বসে কিছু লিখছিলো খাতা রেখে সবে দাঁড়িয়েছে এমন সময় পিছন থেকে মিথি কথাগুলো বলে উঠলো। প্রহর বুকের সামনে ভাঁজ করে রাখা হাতদুটো নামিয়ে তাকালো ছোট মেয়েটির দিকে।সে গালে হাত দিয়ে তারই দিকে চেয়ে আছে।বুঝা যাচ্ছে হিয়ার সাথে সন্ধি বিষয়টা নিয়ে বেশ ভাবুক সে।প্রহর ছাঁদের কিনারা হতে এগিয়ে আসলো তাকালো ছোট্ট মিথির পানে।হিয়ার মাঝে সন্ধি কি কিশোর বয়সে এতটুকু বুঝ তার হয়েছে। কিন্তু এই পুঁচকে মেয়েটাকে কি বুঝাবে?প্রহর বুকের মাঝে আবারো হাত ভাঁজ করলো। মিথির সামনে হাঁটু গেড়ে বস পড়লো।মিথির তুলতুলে গাল টিপে দিয়ে বলল,“ বড় হলে বুঝবি। এসব বড় না হলে কেউ বুঝেনা। আর তোকে এসব কে শিখিয়েছে?”
ছোট্ট মিথি ফিঁক করে হেসে দিলো। বাহির হয়ে আসলো ফোকলা দাঁতের পিড়ি। তা দেখে প্রহর নিজেও হাঁসলো।
মিথি আবার ভাবুক হয়ে ঠোঁট জোড়া উল্টিয়ে জানতে চাইলো,“তাহলে বলো আমায় বিয়ে করবে?”
প্রহর প্রসন্ন হাসলো।বাচ্চা মেয়ের বাচ্চামো কথায় মজার ছলে বলল,“ঠিক আছে করবো ছোট বউ।আগে বড় হ তার পর তো পর তো বিয়ে হবে।”
“উয়য়ে প্রহর ভাই আমায় বিয়ে করবে বলেছে ”
প্রহরের এক কথাতে মিথি পুরো বাড়ি আনন্দ নিয়ে বলে বেড়িয়েছিলো।সে প্রহর ভাই কে বিয়ে করবে,অলিন্দ নীড়ের বউদের মতো হবে। তার এই চাওয়া মূলত অলিন্দ নীড়ের সব বউদের দেখেই।
সকালে যখন সবাই মিলেমিশে রান্না কাজে ব্যস্ত তখন আগমন ঘটে মিথির।বাড়ির সবার বড় সায়েদা বানু।শমশের দেওয়ানের গিন্নি।তিনি রান্না ঘরে বসে আছেন।পাশে তিন ছেলের বউ আর ছোট মেয়ে মিলে রান্নার কাজ করছে।কেউ তরকারি কাটছে,কেউ চাল ধুয়ে আনছে,কেউ বা চুলায় রান্না চড়াচ্ছে।তখনই মিথি এসে সায়েদা বানুর কোলে গিয়ে বসে পড়লো।সবাই কে সে রোজ কাজ করতে দেখে, কত আনন্দ, হাসি মজায় সকল কে একসাথে কাজ করে।মিলেমিশে সংসার গড়ে।এসব দেখে তার ছোট অবুঝ মনে ইচ্ছে জাগে ভিন্ন।কোলে বসে সায়েদা বানু কে বলে, “ও দাদি আমিও চাঁচি,ফুপুদের মতো একসাথে থাকবো,কাজ করবো।
সায়েদা বানু মিথির মাথায় বিলি কেঁটে হেসে বলেছিলো, “তাহলে তো এই বাড়ির কোনো ছেলেকে বিয়ে করতে হবে।এই বাড়ির বউ হলে তবেই সবার সামনে থাকতে পারবি।নয়তো তোকে তো বড় হলো বিয়ে দিয়ে পরের ঘরে পাঠাতে হবে।সেখানের মানুষ কেমন হবে তা তো জানিনা বাপু।”
“তাহলে আমায় প্রহর ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে দিও দাদি।আমি এ বাড়িতে সকলের সঙ্গে থাকবো।প্রহর ভাই এ বাড়িতে তো থাকবে।”
সায়েদা বানুর সেই কথার পেক্ষিতে মিথির এমন প্রস্তাব।তাছাড়া সে কি আর এসব বুঝে নাকি?
এই যে নেচে-গেয়ে বলে বেড়াচ্ছে সে প্রহরের বউ হবে।এই অলিন্দ নীড়ে সকলের সঙ্গে থাকবে।তার কান্ড শুনে সকলে হাসছে আর তার ছেলে মানুষী দেখছে।সেই হাসি আর মজা মিথির পিছু ছাড়লো না ছয় থেকে আজ তার বয়স ষোল। এখনো সেই দশ বছর আগের কথা বলে সবাই ওকে লজ্জা দেয়। সে কেবল ছুটে পালায় আর নিজেকে গালি দেয়।কেন সে ছোট বেলায় এমন কান্ড করেছিলো?বড় হয়ে তো প্রহর ভাইয়ের দেখা মিলে না, হৃদয়ে তার জন্য এখনো কোনো অনুভূতি ও বোঝেনা।
যাকে সে বছরের এই অলিন্দ নীড়ে দেখেনা,দেখলেও কথা হয় না তার বউ হতে চাওয়ার ব্যাপার টা এখন উঠলেই লজ্জায় নুয়ে যায় মিথি।সময় পেরিয়ে গেছে,সে বড় হয়েছে তবুও সে কথা আজো আছে।
সময়ের সঙ্গে অনেককিছু পরিবর্তন হয়েছে। অলিন্দ নীড় মিথির ভীষণ পছন্দের। বাড়িটির গেইটের সামনে সান বাঁধানো প্লেটে ছোট অক্ষরে লেখা অলিন্দ নীড়। গ্রামে এমন বাড়ি নেই বললেই চলে। এই বাড়ি কে মানুষ দেওয়ান বাড়ি নামে চিনলেও সায়দা বানুর মুখে অলিন্দ নীড় শুনে মিথিও তাই ডাকে।বাড়ির গেইটের একপাশে রয়েছে শিউলি ফুলের গাছ আরেক পাশে বাগানবিলাস।
এই শিউলি এবং বাগানবিলাস দুটোই মিথির ভীষণ প্রিয়। যদিও শিউলি একটু বেশিই প্রিয়। মিথির মতে শিউলি আর প্রহর ভাই একই।দুজনকে বছরে একবার দেখা পাওয়া যায়।বাকি বছর কোথায় হারিয়ে যায়।
অলিন্দ নীড়ের গায়ে রংচটা ভাব দেখা দিয়েছে। দুইতলা বিশিষ্ট রংচটা বাড়িটির মতো পরিবর্তন হয়েছে সবকিছু।সময়ের সঙ্গে আরো পরিবর্তন হয়েছে।আগের মতো আর কিছু নেই।না এই বাড়ি আর না এই বাড়ির মানুষগুলো।জীবন প্রবাহমান নদীর মতো।আর মানুষ হলো নদীর জল।আজ টলটলে জল তো কাল শুকিয়ে যাওয়া চর।
পরিবর্তন শুধু মানুষে নয় বয়সেও ঘটেছে।
মিথি ষোড়শী কণ্যা,প্রহরের বয়স বেড়েছে,হয়েছে তাগড়া যুবক। তার দেখা খুব একটা মিলে না। সেই যে স্কুল,কলেজ পেরিয়ে ভার্সিটিতে পড়ার জন্য পাড়ি জমালো শহরে।
বছরে দু একবার গ্রামে আসে।আবার দু একদিন থেকেই চলে যায়।তার নাকি টিউশন আছে, নিজের পড়াশোনা আছে।এই বাহানায় দিন কাঁটে।
প্রহর আসলেই মিথিকে ছোটবেলার কথা মনে করিয়ে দিয়ে ভাই বোনরা,বড়রা আরো বেশি ক্ষেপায়। সেজন্য প্রহর যখন আসে মিথি তখন অলিন্দ নীড়ের আশে পাশেও যায় না।লুকিয়ে থাকে ঘরের কোনো।সেখান থেকে মাঝে মধ্যে দেখা মিলে।ভয়ে দু একটা কথা বলেই যায় পালিয়ে।
মিথিদের বাড়িটা অলিন্দ নীড়ের ঠিক সামনে।মাঝে একটু ফাঁকা জায়গা আছে বটে। মিথি আর প্রহরের দাদা ছিলেন আপন ভাই।সে হিসাবে মিথির সেই বাড়িতে আসা যাওয়া লেগে থাকে। ছোট থেকে বড় হওয়া দুই বাড়ি মিলিয়ে। তবে আগের মতো কি আর আছে ওই অলিন্দ নীড়?
না নেই। সকলে একসাথে থাকলেও কতজনের মনের পরিবর্তন এসেছে,মনে হিংসে জমা হয়েছে। সময়ের সাথে সম্পর্ক,মন সবই নাকি পরিবর্তন হয়? হয়তো সে জন্যই পরিবর্তন হয়েছে অলিন্দ নীড়ের মিলমিশের সম্পর্ক।উপরে মিলমিশ দেখা গেলেও ভেতরে আর আগের মতো নেই।সকালের হাঁড়ি আগের মতোই একই রয়েছে।তবে শুধু পরিবর্তন হয়েছে মানুষ।
আজ মিথি বুঝে তার বিনু ফুপুর বলা হিয়া আর সন্ধির মানে।বুঝতে পারে কেন বলেছিলো। তাই তো সে সব ছুটে চলেছে নতুন পথের খোঁজে। যদিও হিয়ার মাঝে নেই কোনো হিয়ার বন্ধন তার পর ও সচেতন থাকা নয় কো অবিলম্বন।
আজকাল অলিন্দ নীড়ে মিথি খুব একটা যায় না। কারণ সেখানে সেলিম চাচ্চু যাকে সে ছোট বেলায় পঁচা চাচ্ছু বলতো।।তার বউ মেরিনা খুব একটা পছন্দ করে না।কেউ না থাকলে মাঝে মধ্যে কথা শুনিয়ে দেয়।বিনু ফুপিকে নিয়ে কর্টাক্ষ করে কথাও বলে।মিথি শুনে কেবল চুপচাপ বেরিয়ে আসে।তার বেনু ফুপি ভালো আছে,স্বামী সংসার নিয়ে সুখে দিন কাঁটছে।অথচ এক সময় যাকে ভেবে অসুখে পুড়ছিলো সে আজ ভালো নেই খুব একটা।
অলিন্দ নীড়ের বড় কর্তা হলেন শমসের দেওয়ান।
তার চার ছেলে ও দুই মেয়ে।
বড় ছেলে সোলায়মান দেওয়ান। উনার এক ছেলে এক মেয়ে। বড় ছেলে পিয়াস,ছোট মেয়ের নাম প্রীতি।
মেঝো ছেলে সাহার দেওয়ান, তার এক ছেলে দুই মেয়ে। ছেলে মিলন আর জমজ মেয়ে শ্রাবণী আর নবনী।
সেঝো ছেলে সানোয়ার দেওয়ান। তার এক ছেলে এক মেয়ে। বউ আর ছেলে মেয়েকে নিয়ে তিনি শহরে থাকেন।চাকরি করে সেখানে।
আর সবার ছোট সেলিম দেওয়ান। তার কোনো সন্তান নেই,সেই সঙ্গে ঘরের নেই সুখ,শান্তি। হয়তো প্রকৃতির নীলা খেলা।অন্যকে কষ্ট দিয়ে কখনো সুখের মুখ দেখা যায় না,এটা বুঝাতে এমন লীলা।
পিয়াসের পড়াশোনা শেষ।সে গ্রামের এক স্কুলে শিক্ষকতা করছে। অল্প কিছুদিন হলো স্কুলে ঢুকেছে। বাড়ির বড় ছেলে হিসাবে বাবা চাচাদের কাজে সাহায্য করে। তাদের জমিজমা অনেক।গ্রামের সবচেয়ে বেশি জমিজমা তাদেরই।মানুষ হিসাবে পিয়াস বেশ ভালো,শান্তশিষ্ঠ, ব্যক্তি সম্পূর্ন অন্যরকম মানুষ। মিথির সাথে তার বেশ ভাবসাব। আগে দেখলে পালাতো আর এখন পিছু ঘোরে,আবদার জোড়ে মেলায় নিয়ে যেতে,গাছের আম,জাম পেড়ে দিতে।তার যত আবদার পিয়াসের কাছে।
আগেরদিনের কথা ভাবনায় মাঝে ভাটা পড়লো। মোহনিয়া বেগম ডাক ছাড়লো মিথির নাম ধরে। মায়ের ডাকে মিথি ভাবুক দার্শনিক থেকে বেরিয়ে আসলো। খড়ের গাদার উপর বসে ছিলো,সেখান থেকে উঠে দৌঁড় দিলো।একবারে মায়ের সামনে গিয়ে হাফাতে লাগলো।মোহনিয়া বেগম রাগান্বিত চোখ তাকিয়ে আছে। মিথি কিছু বলার আগেই তিনি বলল,“তোর বাপরে কি বলছিস?”
“কোথায় কি বলেছি আম্মা?”
মিথির না জানার ভান রাগ বাড়িয়ে দিলো।
“তোর বাপরে বলেছিস আমি তোকে স্কুলে যেতে মানা করছি?”
“এই রে আব্বা বলে দিয়েছে?এবার আমার খবর আছে।এই কথা মনে মনে বললো।
মিথি ধরা পড়ে বাঁচতে বেচাঁরি ভাব নিলো।ওড়নার কোন গুটাতে,গুটাতে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল,
“পেট ব্যথা করছে এজন্য যাইনি আম্মা।তোমার নাম বলেছি যাতে বকা না খাই।তুমি আমার ভালো আম্মা না?”
মোহমিয়া বেগম মেয়ের ছলচাতুরী বুঝতে পেরে ঝাড়ু নিয়ে ছুটে গেলো। তার আগে মিথিও ভো দৌঁড়। এক দৌড়ে পাড়ি দিলো অনেকটা পথ। পিছনে তাকিয়ে দেখে তার মা আর আসেনি।সে বসে পড়লো কাঁচা রাস্তার একটি গাছের ছাঁয়ায়। তাদের গ্রামের ভেতর দিয়ে একটা কাঁচা রাস্তা আছে।মেঠো পথের
দুপাশে ইউক্যালিপটাস আর মেহগনি গাছ। যখন ভ্যান, আটো,সাইকেল কিংবা বাইকে যায় মনে হয় গাছ গুলো তার সাথে যাচ্ছে।এমন ভাবনা ছোটোবেলায় বেশি হতো এবং উপভোগ করতো।
হঠাৎ মিথি তার সামনে কারো পায়ের আঙ্গুল দেখতে পেলো।দৃষ্টি মেলে সামনে তাকালো।
“পিয়াস ভাই আপনি?”
“তুই এখানে কি করছিস মিথি?”
মিথি আসল কথা চেপে গেলো। কিছু একটা বানিয়ে বলল,
“এদিকটায় এমনি ঘুরতে এলাম পিয়াস ভাই।আপনি কোথাই গেছিলেন?”
“আমি একটু বাজারে গেছিলাম। আম্মা কিছু সদাই আনতে লিস্ট দিয়েছিলো। আসতে হুট করে এখানে আটোটা নষ্ট হলো এজন্য হেঁটে আসছি। চল বাড়ি যাবি না?”
মিথি মাথা ঝাঁকালো। উঠে পড়লো মাটির বুক থেকে। পিয়াসের সাথে পা চালিয়ে হাঁটছে।পিয়াসের হাতে বড় ব্যাগ দেখে শুধালো,
“এতো বাজার সদাই কিসের জন্য পিয়াস ভাই?”
পিয়াস দুহাতে বাজারের ব্যাগটা একটু রাখলো।বেশ ভারি হয়েছে।ব্যাগটা আবার হাতে নিয়ে উত্তর দিলো,
“কাল তো প্রহর আসবে।তুই জানিস না?”
মিথি থমকে গেলো।কি হলো জানা নেই তবে মনের মধ্যে কেমন যেন অনুভব হলো।নামটি শুনে মনে পড়লো শেষবার তার আগমন হয়েছিলো পাঁচ মাস আগে।মনে মনে ভাবলো,
“প্রহর ভাই আসবে?তাহলে তো ওই বাড়ি যাওয়া যাবে না। ভাগ্যিস পিয়াস ভাই বললো।”
“কি ভাবছিস?প্রহর আসবে বলে ও বাড়ি আর যাবি না তাই তো?”
পিয়াসের হাসির স্বরে বলা কথায় মিথি মুখ বাঁকালো।পিয়াস আবারো হেঁসে মজা নেওয়ার ফয়দা করে বলল,
“তোকে প্রহর আমাদের পাশের গ্রামের কাফেলা পাগলা আছে না?ওর সাথে নাকি বিয়ে দিবে।”
মিথি রাগ হলো।রাগে নাকের পাঁটা ফেঁপে উঠলো। ফুঁসে ওঠলো মুহূর্তে,বলল,
”কবে বলেছে এই কথা প্রহর ভাই?”
পিয়াস আড়ালে মুখ চেপে হাসলো।আবার স্বাভাবিক হয়ে না জানার ভান ধরে বলল,“আগেরবার যখন আসলো তখনই তো সবার সামনে বললো। তোকে কাফেলা পাগলার সাথে নাকি বেশ মানাবে।তুই আর সে একই ধাঁচের মানুষ। দুজনে আবোল তাবোল বকিস নাকি।”
মিথি যেন আরো রেগে গেলো। রাগে গিজগিজ করতে করতে ছুটলো হনহনিয়ে। পিয়াস অনেকটা পিছিয়ে পড়লো।মিথি এগিয়ে যেতেই পিছু ডাকলো কিন্তু সে আর শুনলো না।মজা লুটে হেসে উঠলো পিয়াস। ধীর কন্ঠে আওয়াড়লো,“মজাও বুঝে না। কি অবুঝ সে পাখি। তার পর হাফ ছাড়লো কিছু মনে করে আবার হাসলো সামনে তাকিয়ে। ততক্ষণে মিথির আর দেখা নেই। অতঃপর সেও তাড়াহুড়ো করে ভারি ব্যাগ নিয়ে ছুটলো।
ধরণীতে সন্ধ্যে নেমেছে। সূর্যাস্ত ডুবে গিয়েছে কিছুক্ষণ পূর্বেই। আকাশ রক্তিম বর্ণ থেকে আঁধারে নিমজ্জিত হলো। পাখিরা ফিরেছে নীড়ে। কৃষকরা ঘরে ফিরেছে অনেকে আবার কেউ ফিরতে আছে। গ্রামে এখন ধান লাগানোর মৌসুম। চারদিকে মাঠ ভর্তি ধানের ছোট চারায় ভরে উঠবে কিছুদিন বাদেই। মৌসুম বাদে সেই মাঠে চঞ্চল মিথি ছুটে খেলে বেড়ায় সঙ্গী নিয়ে।আইল পথে তার ছুটে চলা নিত্যকার চালচিত্র।
রাত হওয়াতে মিথি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে উঁকি ঝুঁকি মারছে। এখন তার বাবার উপশহর থেকে ফেরার সময়। মিথির বাবার বিরামপুর উপশহরে বড় দুখানা কাপড়ের মার্কেট আছে। সেখানে আরো কর্মচারী আছে।তিনি নিজেও সকালে যান রাতে ফিরেন। গ্রামেও কিছু জমিজমা আছে সব মিলিয়ে বেশ সুন্দর দিন কাটে।গ্রামে এরকম চলা হাতে গোনা কয়েটা সচ্ছল পরিবার আছে।তাদের মধ্যে মিথিরাও আছে। আবার তাদের থেকে আরো কয়েক জনের বেশি আছে।এক কথায় দিব্যি সুন্দর মতো দিন চলে যায়
না থাকুক সবার মতো।ছোট সংসারে সুখে থাকতে প্রয়োজনীয় অর্থ থাকলেই হয়।
তখনই বাইকের শব্দ ভেঁসে আসলো। দূর থেকে মিথির চিনতে অসুবিধা হলো তার বাবাকে।
মানিক সাহেব বাড়ির দরজার সামনে বাইক দাঁড়া করালেন।বাইক থেকে নামতেই মেয়ে ছুটে আসলো। মিথি হাত বাড়িয়ে দিলো।
তিনি বুঝতে না পেয়ে ইশারায় জিজ্ঞেস করলো, “কি?”
মিথি চোখের পলক ফেলে বলল,
“আমার চুড়ি দাও। তোমাকে আনতে বলেছিলাম যে?”
মানিক সাহেব নেমে বাড়ির ভেতরে যেতে যেতে বলল,“ দুঃখীত আম্মা! ভুলে গেছি।কাল নিয়ে আসবো ঠিক আছে? ”
বলেই মাথায় হাত রেখে জিভ কাটলো।
মিথি রাগ হলো।বুকের সাথে দুহাত ভাজ করে মুখ গোমড়া করলে দাঁড়ানো একপাশে।বলল,
“তোমার সাথে কথা নেই আব্বা।”
মানিক সাহেব মেয়ের কান্ডে হাঁসলো।
চুড়ির প্যাকেট খানা চুপিচুপি বাহির করলো। মিথির গোমড়া মুখের সামনে ধরতেই, মিথি হেসে উঠে খপ করে নিয়ে নিলো।
“আমার ভালো আব্বা। আমি জানতাম তুমি ভুলে যাওয়ার নও।”
মিথি দৌঁড়ে ঘরে গেলো। মানিক সাহেব মেয়ের আনন্দে আনন্দিত হয়ে আরো হাসলো। মোহনিয়া বেগমকে হাক ছেড়ে ডাকলো।
“মিথির মা এদিকে শোনে যাও।”
মিথি পড়তে বসেছে। সামনে তার ম্যার্টিক পরীক্ষা। মোহনিয়া বেগম জোর করে পড়তে বসিয়ে দিয়েছে। পাশে রিতিও আছে। তাকেও তার মা পড়তে পাঠিয়েছে নয়তো তার পড়তে ভালো লাগে না মোটেও।রিতি সবে ক্লাস সেভেনে পড়ে। যতটুকু পড়ে যেন ফেল না হয় এই ভয়ে।তার মতে এতো পড়ে কি হবে?দাদি চাচিদের কথায় সেই তো বিয়ে করে থালাবাসনই মাজতে হবে।এই কথা মিথি যতবার শোনো ততবারই হাঁসিতে ফেটে পড়ে।
গ্রামের মূলত ক্লাস সিক্স থেকে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া শুরু করে। গ্রামের মানুষদের মতে মেয়েদের এতো পড়িয়ে কি হবে? মেয়েদের তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দিবে ঝামেলা শেষ।অনেকে স্কুলের গন্ডি পেরোতেই পারেনা। যারা একটু ভালো চলে,বুঝে তারাই মেয়েদের পড়ায়। গ্রামে মিথির সমবয়সী অনেকের বিয়ে হয়ে গেছে কেউ তো বাচ্চার মা হয়ে গেছে।মিথি খারাপ ছাত্রী না তবে পড়তে চায় কম, তবুও জোর করে হলেও পড়ে মোটামুটি রেজাল্ট আসে।কিন্তু তার মায়ের কথা ভালো ফলাফল করতে হবে। বাবার স্বপ্ন কলেজ পর্যন্ত পড়াবে।চাইলে ভার্সিটির কথা ভেবে দেখবে।
মিথি প্রথমে একটু পড়লেও এখন খাতায় আঁকিবুঁকি করছে আর বিরক্ত হচ্ছে।আজ যেন পড়ায় মন বসছে না। রিতি তো একটু অক্ষরও পড়ছে না।দুজনে ভাবছে কিভাবে পড়ার টেবিল থেকে ওঠা যায়। রিতি ছোট বেলায় তো পড়ার নাম বললেই নাকি তার ঘুম আসতো এবং সত্যি সত্যি ঘুমিয়ে পড়তো।এসব তার মা,চাচিদের থেকে শোনা গল্প।
মিথি আর রিতির পড়া থেকে মুক্তির পথ বোধহয় আসলো। শার্লিন দৌঁড়ে তার ঘরে উপস্থিত হলো।শার্লিন সম্পর্কে ফুফুতো বোন হয়, দেওয়ান বাড়ির নাতনী সে। সে মিথিরও বড়।সে এবার কলেজে উঠেছে। শার্লিন হাঁফাতে হাঁফাতে দরজার কাছে থেকে বলল,“তোকে নানু ডাকছে মিথি।
ব্যাস ওকে আর পায় কে? তড়িৎ বেগে ছুট লাগালো।রিতিও পড়া থেকে মুক্তি পেয়ে আনন্দিত হয়ে উঠলো।মোহনিয়া বেগম পিছন থেকে চিল্লিয়ে বলল, “তাড়াতাড়ি আসবি।
সে কি আর কারো কথা শোনে?
তার দৌঁড় থামলো গিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে শমসের দেওয়ানের গান ঘরের সামনে। তিনি মিথিকে দেখে চমৎকার হাসলেন, কাছে ডেকে বললেন,“আয় দাদু। তোকে ছাড়া গান জমছে না। মিথি গিয়ে বসলো তার পাশে। সামনে রাখা হারমনিয়াম আশে পাশে গানের বাদ্যযন্ত্র আরো অনেককিছু আছে। শমসের দেওয়ান বেশ রসিক মানুষ বটে।বয়স বাড়লেও তার গানের প্রতি ভালোবাসা যায়নি।ছোট বেলা থেকে গানের প্রতি প্রবল ভালোবাসা ছিলো। উনার কন্ঠ বেশ সুন্দর।
যুবক বয়সে আরো সুন্দর কন্ঠের অধিকারী ছিলো। স্বপ্ন গায়ক হওয়ার থাকলেও গ্রামের গন্ডি পেরিয়ে এতো জমিজমা সবকিছু দেখাশোনার ভার কাঁধে পড়লে তা আর সম্ভব হয়নি। তাই তো তিনি সখ গুলো একটি ঘরের মধ্যে বন্ধি করে রেখেছে। মাঝে মধ্যে নিজেকে আনন্দে রাখতে গান গায়।সঙ্গী হিসাবে মিথিকে রাখে কারণ মিথির ও গান পছন্দ এবং সুন্দর গাইতে পারে। তিনি হারমোনিয়াম বাজান কখনো মিথিও গায়। আজও শমসের দেওয়ান মিথি কে বলেন, “ আজ তুই একটা গান গা তো?মন খানা ভালো নেই।তোর গান শুনে একটু ফুরফুরে হই।”
মিথি মুখ বাঁকালো।মজা করে বলল, “বুড়োর সখ কত? আমি তোমারে গান শোনামু কেন?তোমার বুড়িকে ডাকো না।সে এসে গান শোনাবে।
শমসের দেওয়ান ও মজা করে জানতে চায়,
“তুই কাকে গান শুনাবি,শুনি?”
মিথি ভাবসাব নিয়ে উত্তর দিলো, “আমি শুনাবো আমার মানুষ কে।তোমার মতো বুড়োকে নয়,বুঝছো?”
শমসের দেওয়ান হেঁসে উঠলো। তিনি জানেন মিথি মজা করতে এসব বলছে। তার সাথে বেশ সুন্দর সম্পর্ক।মিথির দাদা ছোটবেলায় মারা যাওয়ার কারণে তাকেই দাদা বলে ডাকে এবং মানেও বেশ।
মিথি ইশারায় হারমোনিয়াম বাজাতে বলল। হারমোনিয়ামের সুর শুরু হতেই তার প্রিয় গান খানা গাইতে শুরু করলো,
অলিরও কথা শুনে বকুল হাঁসে, কই তাহার মতো তুমি আমার কথা শুনে হাঁসো না-তো।ধরার ও ধূলিতে যে ফাগুন আসে কই?তাহার মতো
তুমি আমার কাছে কভু আসো না-তো….!
“নানা কেমন আছো?”
হঠাৎ অনাকাঙ্ক্ষিত কন্ঠে শুনে মিথি চমকে উঠলো।তার গাওয়া গান মাঝপথে থেমে গেলো।তড়িৎ গতিতে তাকালো দরজার পানে।তার বুক কাঁপছে,মন চাইছে পালাতে।কারণ মুখে চমৎকার হাসি ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক পুরুষ,গাঁয়ের রঙ তমাটে শ্যামলা,উচ্চতা অনেকটা লম্বা,চুলগুলো স্বল্প বড়,সব মিলিয়ে এক দেখায় সকলের পছন্দ এমন গড়ন।
নাম তার প্রহর।যা কে সে প্রহর ভাই ডাকে।ছোটবেলায় ভুলে বউ বানানোর প্রস্তাব দিয়েছিলো।চোখে মোটা ফ্রেমের চমশা যোগ হয়েছে।
কই আগে তো ছিলো না?এখন কি চোখের সমস্যা হয়েছে?
মিথির আকাশকুসুম ভাবনার মাঝে শমসের দেওয়ান হেসে বলে উঠলো, “নে মিথি তোর না হওয়া সোয়ামি এসে গেছে।খেদমত শুরু কর।”
মিথি নিজের ধ্যান থেকে ফিরে আসলো।আবারো শুরু হলো সবার এককথা।কিছুটা লজ্জা পেলো সাথে বিরক্ত হয়ে উঠে পড়লো।জড়তায় কিছু বলতে পারছে না।মাথা নিচু করে রইলো।শমশের দেওয়ান মজার ছলে হাঁসছে।মিথি ইতস্তত করে কিছু বলতে মুখ খোলার পূর্বেই অপরপ্রান্ত হতে প্রহরের নিজস্ব উত্তর এলো,
“সে হতে চেয়েছিলো এই বাড়ির বউ। আমি তো এই বাড়ির ছেলে নয়।সুতারং এই কথা বলে তাকে অসস্থি আর আমায় দ্বিধায় ফেলার কোনো দরকার নেই নানু।”
মিথি সবে বাহিরে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েছিলো।প্রহরের কথা শুনে তার পা জোড়া থেমে গেলো।তার একটু আগে বলা কথাটা বারবার কানে বাঁজতে থাকলো,“ সে এই বাড়ির ছেলে নয়।”
মিথি একবার পিছনে তাকালো। প্রহরের ঠোঁটের কোনে স্মিত হাসি।দৃষ্টি উদাসীন।শমসের দেওয়ানের মুখ গম্ভীর।বুঝা গেলো প্রহরের কথায়। প্রহর এগিয়ে গিয়ে শমসের দেওয়ানের কাঁধ জড়িয়ে নিলো।পেটে কাতুকুতু দিয়ে বলল,
“মুখ গোমড়া করো না।চলো তোমার বউ তোমার অপেক্ষায় আছে।কখন তুমি তার কাছে যাবে,নিজ হাতে তেল মালিশ করবে বুড়ো কোমরে।
প্রহরের ঠাড্ডা কথায় শমসের দেওয়ান গললো না।হাঁসির বদলে থমথমে গলায় শুধালেন,“তুই ঠিক হবি না প্রহর?”
প্রহর বেরিয়ে গেলো।থামলো দরজার কাছটায়।মিথি এখনো দাঁড়িয়ে আছে। মিথির দিকে এক পলক নজর বুলিয়ে আবার নজর দিলো নিজ হাতে থাকা ঘড়ির পানে।তার পর বলে উঠলো,
“ আগে না বুঝলেও সময়ের সাথে অনেককিছু বুঝলাম। তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো, আমার অবস্থান। আমি ভেসে আসা এক কচুরিপানা, যার অবস্থান পুকুর থেকে নদীতে হলেও সে ভুলেনি তার আগের স্থান।”
কথাটুকু বলে আর এক মূহুর্ত দাঁড়ালো না।
প্রহর সে স্থান ত্যাগ করলো।মিথি বুঝার চেষ্টা করলো তার কথার মানে,তবে বুঝতে পারলো না।এতো কঠিন বাক্যের অর্থের সাথে সে পরিচিত নয় এখনো। তবে শমসের দেওয়ান ঠিকই বুঝতে পারলেন।হতাশ হয়ে ভাবনায় ডুবে গেলেন।তখনই মনে পড়লো এক বিভৎস দিনের ঘটনা।
