Home মন পিঞ্জিরা মন পিঞ্জিরা পর্ব ২

মন পিঞ্জিরা পর্ব ২

মন পিঞ্জিরা পর্ব ২
শ্যামলী রহমান

প্রভাত হতেই কৃষকরা মাঠে ছুটছে ধান বুনার উদ্দেশ্য।গ্রামের মানুষ ভোরবেলা উঠে কাজে লেগে পড়ে।সূর্যদয়ের মাধ্যমে সকালের সূচনা ঘটে তবে কেউ তার আগেও উঠে পড়ে।সূর্য উঠছে সবে।সোনালি রং ছড়িয়ে পড়ছে পূর্ব আকাশে। পাখির কিচিরমিচির কলতানে ঘুম ভাঙে গ্রামের মানুষদের।পাখিরা উড়ে বেড়াচ্ছে নীল দিগন্তে।কৃষকরা কোদাল ঘাঁড়ে নিয়ে নিয়ে মাঠের পানে যাচ্ছে। কেউ ধান বুনছে,কেউবা আইল দিচ্ছে।বৃষ্টি হলে যেন আইল পথে হাঁটতে অসুবিধা না হয় সেজন্যে।
এমনই কিছু মুহূর্ত কেউ একজন ফোনের ক্যামেরার বন্ধি করছে।
ঠোঁটের কোনো হাঁসি লেপ্টে আছে।প্রভাতে উঠে সূর্যোদয় উপভোগ করার আনন্দ অন্য রকম।

‘আরেহ!প্রহর বাবা না?কেমন আছো?কতদিন পরে তোমারে দেখতাছি?বাড়িত আসো না -নাকি?”
প্রহর পিছনে তাকালো। ছবি তোলা বাদ দিয়ে ফোনটা পকেটে রাখলো।পরিচিত মুখ গফুর সাহেব কে দেখে হেসে উত্তর দিলো,
“ভালো আছি চাচা,আপনি কেমন আছেন?হাসান কেমন আছে?”
লোকটার বেজার কন্ঠ।ছেলের কথা শুনতে চাওয়াতে চোখ মুখ নিভে এলো,আফসোসের সুরে বলল,
“মুই ভালো আছি।তার কথা আর কি কমু কও।সারাদিন কই কই থাকে খোঁজ পাওন যায় না। তারে মানুষ করতে পারনু না। নেশা পাতি তার রুহ, ফুসফুসের সাথে মিশে গেছে। কিছু কইলে শুনেনা,মা বাপের সাথে খারাপ আচরণ করে।নেশার টাকা না পাইলে বাড়ি তছনছ করে দেয়।চাল ডাল অবধি চুরি করে নিয়ে গিয়ে নেশা করে।”
প্রহর শুনলো।একটু ভাবুক হয়ে চিন্তা ভাবনা করে ঠোঁটের কোনো তীর্যক হেসে রেখে বলল, “ চাচা ছেলেরে ছোট থেকে শাসন করলে তো এমন হতো না।ছোটবেলা থেকে দেখতাম আস্কারা দিতেন,চাচিরে বাজে ভাষায় বকা দিলেও যেন আনন্দ পাইতেন।তখন শাসন করলে কি আর এই দিন দেখতে হতো?এখন বুঝতে পারছেন কত বড় ভুল করছিলেন?কেমন ছেলেদের সঙ্গে মিশে সেদিক দেয়াল রাখলে আজ এমন হতো না।

আজকাল গ্রামে নেশার প্রভাব বেড়েছে।ছোট ছোট ছেলে গুলোও নেশার খপ্পরে পড়ে জঙ্গলের আড়ালে বসে নেশায় বুূদ হয়ে রয়।স্কুল যাওয়া বাদ দিয়ে ঝোপের আড়ালে বসে নেশায় আসক্ত হয়ে থাকে।
এসব হওয়ার পিছনে আশে পাশের কিছু স্বার্থলোভী মানুষেরা দায়ি।যারা টাকার লোভে হাতের নাগালে নেশার বন্দোবস্ত করে দিচ্ছে।তার পরে দায়ি আপনারা মা বাবা।সন্তান কোথায় যাচ্ছে কার সঙ্গে মিশছে এসব ছোট থেকে খেয়াল রাখা।’সৎ সঙ্গে স্বর্গ বাস, অসৎ সঙ্গে নরক বাস’ এই প্রবাদ বাক্যটি আছে না ঠিক তেমনই।
লোকটা শুনলো।চোখে মুখে অনুতপ্ত আর বিষাদের ছাপ। ঘাঁড়ের কোদলটা আবার ঘাঁড়ে নিয়ে আইল পথে হাঁটা ধরে মাঠের কাজের উদ্দেশ্য।

প্রহর ও হাঁটা ধরলো বাড়ির পথে। এই আইল থেকে অলিন্দ নীড় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তাকিয়ে থাকলো কিছুখন। হঠাৎ কিছু স্মৃতি মনে পড়তেই চোখ ভিঁজে উঠলো,কারো শূন্যতা গ্রাস করলো তাকে। এই শূন্যতা তাকে পোড়ায়,হৃদয় ক্ষত বিক্ষত করে দেয়। এই যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে মূলত গ্রামে কম আসে। তবুও স্মৃতি আর যন্ত্রণা তার পিছু ছাঁড়ে না।
কিছু স্মৃতি আর দুঃখ আজীবনের সঙ্গী হয়ে রয়।
যাকে এক কথায় বলা যায় ব্যক্তিগত দুঃখ।এই দুঃখের শেষ কোনোদিন হবে না।যার জন্য এই দুঃখ তাকে কোনোদিন দেখতে পাবে না।

বাড়ির কিছুটা সামনে আসতেই প্রহর থেমে যায়।
কোথাও থেকে ফিসফিসানি কন্ঠ ভেসে আসছে।প্রহর আশে পাশে তাকালো।নজরে তো কিছু পড়ছে না।আশে পাশে তো কেউ নাই তবে?শব্দের উৎস খুঁজতে একটু হেঁটে গেলো বাম দিকে আম,লিচু বাগানের দিকে।বাগানগুলো শমসের দেওয়ানের নামে আছে।
ফিসফিসানি শব্দ বন্ধ হলো।প্রহর তীর্যক চাহনিতে নজর বুলালো চারপাশে। তার মতিষ্কে মুহূর্তে ধরা খেল।পাতা নড়ার শব্দে গাছের উপরে তাকালো। গাছের উপরে নজরে আসতেই কপালে ভাঁজ পড়লো,চোখ মুখ কুঁচকে বিরক্তি নিয়ে বলল,“সাধ সকালে গাছে কেন উঠেছিস?হাত পা ভেঙে বিছানায় পড়ে থাকার সাঁধ জেগেছে?নাম তাড়াতাড়ি।”
মিথি ওমনেই বসে রইলো। গাছের উঁচু ডালে বসে আম খেতে খেতে বলল,

“আর কয়টা আম পেড়েই নামছি আপনি যান।”
প্রহর কপালের মধ্যখানে ভাঁজ করলো।দাঁত পিষে ভয় দেখাতে বলল,
“চাচিকে ডাকবো?দাঁড়া ডাকছি।”
“চাচি….
মায়ের নাম শুনতেই মিথি ভয় পেলো,কাচুমাচু হয়ে তড়িৎ গতিতে বলল, “ এই না না প্রহর ভাই দয়া করে আম্মাকে ডাকবেন না।আম্মা জানতে পারলে আস্ত রাখবে না। আমি এখুনি নামছি।
“রিতি বেরিয়ে আয়।”
গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকা রিতিও কেঁপে উঠল। গাছের আড়াল থেকে বলল,“আমি কিছু করিনি প্রহর ভাই।মিথি আপা আমাকে ডেকে এনেছে দয়া করে আম্মাকে বলবেন না।”
মিথি হা হয়ে গেলো।রিতির ভয়ে বলা মিথ্যে কথায় চোখ বড় করে তাকালো।বলল,

“এই রিতি তুই তো সেই পাল্টিবাজ রে।প্রহর ভাই আসতে ভয়ে পাল্টি খেয়ে গেলি?তুই না রাতে বললি সকালে যখন সবাই কাজে ব্যস্ত থাকবে তখনই আম চুরি করতে আসবো।
রিতি চুপ হয়ে গেলো।গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে দিলো দৌঁড়।
মিথি হা করে তাকিয়ে রইলো। বাঘের মুখে রেখে পালালো। আল্লাহ এর চেয়ে তো মীরজাফর ও ভালো ছিলো।
“তাড়াতাড়ি নেমে আয়।নয়তো…
বলাই সাথে সাথে মিথি হুড়মুড়িয়ে নেমে আসতে চাইলো।
তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে গাছের নিচু ডাল থেকে ধপ করে পড়ে গেলো।
“মা গো….
মিথির চিৎকারে প্রহর তাকালো।প্রহর তাদের থেকে একটু দূরেই দাঁড়িয়ে ছিলো।প্রহর যাওয়ার আগেই কোথা থেকে যেন দৌঁড়ে পিয়াস উপস্থিত হলো। মিথি কাঁদছে আর বলছে, “পা টা নিশ্চিত ভাইঙ্গা গেছে। আমি আর হাঁটতে পারবো না পিয়াস ভাই।”

“কিছু হয়নি চুপ থাক। তুই গাছে উঠতে গেলি কেন?আমাকে বলতি তাহলে পেঁড়ে দিতাম।”
দুঃখী মুখখানা নিয়ে বিষাদ কন্ঠে বলল,
“নিজে গাছে উঠে আম পেড়ে খাওয়ার মজা আলাদা,শুধু আম্মা না দেখতে পেলে।”
পিয়াস আর কিছু বললো না। পায়ে হাত দিয়ে পায়ের গোড়ালি উপর নিচ করে ঘুরিয়ে টান দিলো। মিথি ব্যথায় চোখ খিচে মাগো বলে চিৎকার দিলো।
পিয়াস একটু সরে গেলো,বলল,
“ঠিক হয়ে যাবে। পা মঁচকে গেছিলো এখন হেঁটে দেখ আর লাগবে না।”
মিথি উঠে পা বাড়াতে একটু ব্যথা অনুভব করলো।পড়ে নিতে চাইলেও পিয়াস কে ধরে।পায়ের ব্যথা অল্প আছেই।পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পায়ের মচকে যাওয়া স্থান কিছুটা ফুঁলে উঠেছে।মিথি ধীরে ধীরে হেঁটে পিয়াসের সাথে বাড়ির দিকে গেলো।
প্রহর কেবল চোখে তাকিয়ে দেখলো।যেভাবে দেখে চাঁদ। হাতের কঞ্চিটা ছুড়ে ফেলে দিলো।বাড়ি পথে যেতে যেতে আওড়ালো,
“চারদিকে ভালোবাসার গন্ধ পাই,কেবল আমি স্মৃতির আঁধারে হারিয়ে যাই। ভাগ্য খারাপ না ভালোই।
কপালে চাঁদের আলো না জুটলেও,আমাবস্যার আঁধার জুটছে,এই তো অনেক।

সকাল আর রাতে খাওয়ার সময়ে কাঁঠের টেবিলে সবার হাজিরা চাই। শমসের দেওয়ানের নিয়ম বলা যায়।সব ছেলে নাতি-নাতনীদের নিয়ে একসাথে খাবেন।এই নিয়ম সেই বিশ বছর হতে চলে আসছে।
সকালে খাওয়ার সময় হয়েছে।তিন ছেলে নাতী_নাতনীরা বসে পড়েছে কেবল প্রহর আসেনি।পিয়াস মাত্র এসে বসলো।মিলন অসুস্থ এজন্য তার বউ ঘরে খাবার নিয়ে গেলো। শ্রাবনী আর নবনী দুটোতে কি নিয়ে ঝগড়া করছে। সায়দা বানু বিরক্ত হয়ে বলল,
“তোরা দুটোতে চুপ করবি না?নাকি লাঠির বাড়ি খাবি?সারাদিন চুলোচুলি করিস। দেখতো শার্লিন কেমন চুপচাপ থাকে।ওর মতো চুপচাপ থাকতে পারিস না?”
ওরা দুজনে চুপ হয়ে গেলো।মুখ বাঁকালো আড়ালে।
শমসের দেওয়ান প্রহর কে আসতে না দেখে পিয়াস কে বলল,

“প্রহর কোথাই দেখ তো।খেতে ডেকে নিয়ে আয়।”
পিয়াস উঠলো কিন্তু যাওয়ার আগেই থেমে গেলো। অরুনা বিরক্তি চাহনি নিয়ে বলল,
“পেটে খুদা লাগলে আসতো। সে কি জানেনা সবাই একসাথে খায়।প্রতিবার আসলে এমন নাটক করে কেন?আমরা সব বসে থাকি তার নাটক দেখার জন্য।”
মেরিনা অরুনাকে চুপ করতে বললেন।সামনে শশুড় আছেন।তা সে ভুল বসলো যেন।তবুও সে সে মুখ বাঁকালো।কেন জানি প্রহর কে সে একদম পছন্দ করে না।
মেঝো বউয়ের কথায় শমসের দেওয়ান রুষ্ট হলেন।
চোখ মুখ শক্ত করে তাকালেন।মেঝো ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“এমন কথা পরবর্তী কখনো শুনলে এ বাড়িতে তোমার বউয়ের জায়গা হবে না সাহার। তাকে বলে দাও সেও এ বাড়ির একজন। যা পিয়াস প্রহর কে ডেকে নিয়ে আয়।”

পিয়াস উঠলো যেতে পা বাড়াতেই দেখলো তার মা সুচরিতা বেগম প্রহর কে নিয়ে আসছে। কি যেন বলছে আর হাসছে দুজনে। সুচরিতার সাথে প্রহরের বেশ ভাব ছোটবেলা থেকেই। তিনি ছেলের মতো ভালোবাসেন,আগলে রাখেন।এ বাড়িতে প্রহর কে মামিদেরর মধ্যে সুচরিতা বেগমের কাছে অধিক ভালোবাসা পেয়েছে।সায়েদা বানু প্রহর আর সুচরিতার এই মুহূর্ত দেখে বেশ খুশি হলেন।মা ছেলে যেকেউ দেখলে বলবে।
“আয় বস তো। না খেয়ে শুকিয়ে গেছিস।বাড়িতে আসিস না। কাছে হলে ভালো মন্দ রেঁধে পাঠাতে পারতাম কিন্তু অনেক দূরের পথ যে।
মাঝে মধ্যে একটি আসলে পারিস।বছরে একদুবার কেন আসিস বলতো?”

প্রহর হেঁসে বসলো।এমন ভালোবাসার অবদান সে এই জন্মেও শোধ করতে পারবে না।
বাড়ির বউরা সবাই কে খেতে দিলো। অরুনা ভেতরে ভেতরে ফুলে রইলো। মুখ ফুটে বলতে পারলো না কিছু। সামনে শমসের দেওয়ান রয়েছে।মেরিনা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে বরাবরের মতোই তার চোখে মুখে বিষাদের ছাপ। হাঁসে না, ঠিক মতো খায় না। সেলিম স্ত্রী’র পানে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনিও যে ভালো নেই।
সুচরিতা বেগম প্রহরের খাওয়ার তাবিদারি করছে। যেন তাকে একবারে সব খাইছে ছাড়বে।শতদিনের না খাওয়া একদিনে খাওয়াবে।

শমসের দেওয়ান বড় বউয়ের ব্যবহারে বরাবরের মতোই খুশি হলেন।সেই প্রথম এই দেওয়ান বড় বউ।যাকে পছন্দ করে দূর গ্রাম হতে ছেলের বউ করে এনেছিলেন। চালা হীন ঘরে দেখেছিলেন ছোট একটা মেয়ে বসে আছে।মলিন জামাকাপড় পরনে তার পরেও কি স্নিগ্ধ লাগছিলো তাকে।
বউ করে আনার পর কতজনের কত কথা!এতটুকু মেয়ে কি বুঝবে সংসারের?
সে মেয়ে আজ কত বড় হয়েছে,সন্তান সংসার সব আগলে রেখেছে।
বিকেল হতেই মিথি আর রিতি তাদের কাজের প্রস্তুতি নিলো। তবে সে কাজ কি তাদের সফল হলো?মিথি রিতিকে ডাকছে।

“এই রিতি তাড়াতাড়ি আয়।”
রিতি আসতেই তারা যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো। দরজার সামনে যেতেই প্রহরের মুখোমুখি হলো।
প্রহর সবে তাদের বাড়িতে ঢুকছিলো। দুজনকে একসাথে হন্তদন্ত হয়ে যেতে দেখে প্রহর ভ্রু কুঁচকালো,জিজ্ঞেস করলো,
“কোথাই যাচ্ছিস?হাতে কি?”
মিথি টপ করে হাত পিছনে লোকালো। মাথা নাড়ালো,মুখে কিছু বলার আগেই রিতি ভয়ে আগেই বলে দিলো,
“আমি কিছু জানিনা প্রহর ভাই। সব মিথি আপু জানে বলে দিলো ভোঁ দৌঁড়। মিথি তাকিয়ে রইলো। দাঁত কিড়মিড় করে ধীরে আওড়ালো,“ সব সময় মেয়েটা আমারে ফাঁসিয়ে দিয়ে যায়। মীর জাফরের বংশধর।
থুক্কু শুধু মীর জাফর হবে। বংশধর হলে তো আমি নিজেও। আম্মার এককথা শুনতে,শুনতে আমিও তেমন বলা শুরু করেছি। আম্মার মতে আমার বাপের বংশ মীর জাফরের বংশ আর তার বাপের বংশ সাধু বংশ। এটা সব পরিবারের মায়েদের কথা।
“কি হলো কোথাই যাচ্ছিলি?”
মিথি কেঁপে উঠলো, ভয় পেলো না তবে কথা কাঁটাতে বাহানা বানাতে এক মিনিট সময় নিলো।একটু ভেবে বলল,

“গ্রামের ওই পাশে যাচ্ছিলাম।
“কেন?”
“ওদিকে নাকি জাদু খেলা দেখায় লোক এসেছে, এজন্য দৌঁড়ে যাচ্ছিলাম যাতে শেষ না হয়ে যায়। কিন্তু মাঝখানে আপনি এসে সব ভেঁস্তে দিলেন।”
প্রহর শুনলো। গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।মিথি দৃষ্টি লক্ষ্য করলো।মনে মনে ভাবছে,“ আমার কথা কি বিশ্বাস করলো না-নাকি?”
“আরেহ প্রহর!ওখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন?আসো ভেতরে আসো।”
প্রহর এগিয়ে আসলো মিথি ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো।মোহনিয়া বেগম বসতে দিলো। কি যেন গল্পে মাতলো।এর মধ্যে মোহনিয়া বেগম
মিথি কে উদ্দেশ্য করে বলল,

”তোর দাদি কে ডেকে আন তো। প্রহরের সাথে কিজানি কথা আছে বলেছিলো।”
মিথির রাগ লাগলো। একে কাজ হলো না তার মধ্যে এখন যেতে হবে ডাকতে। মিথির বিরক্তি দেখে প্রহর মনে মনে হাসলো।মিথি বোধ-হয় তা খেয়াল করলো। কাকে যেন মনে মনে বকতে বকতে তাড়াতাড়ি করে বাহিরে চলে গেলো।প্রহর শুধু দেখলো তার পর আবারো গল্পে মেতে উঠলো।
প্রহর সিঁড়ি বেয়ে উঠে নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছিলো। সামনে কেউ একজন আসাতে হুট করে থেমে গেলো,সামনে নিলো নিজেকে।
“প্রহর কেমন আছো?কালকে আসলে অথচ ভাবির সাথে দেখা ও করলে না কি ব্যাপার? ভাবিকে কি ভালো লাগে না?দেবর ভাবির সম্পর্ক হয় কত মধুর অথচ তুমি…
সানিয়া এগুতেই প্রহর পিছিয়ে গেলো।
প্রহর সানিয়ার কথায় বিরক্ত প্রকাশ করলো সাথে রাগ ও হলো।কথা না বলে পাশ কেঁটে যেতে নিলো।সানিয়া আবার পথ আটকালো। প্রহর এবার রেগে দাঁত চেপে বলল,

“মিলন ভাই কে বলবো?আপনার এমন বিরক্তিকর আচরণের জন্য আমার কথা বলতে রুচিতে বাঁধে।সময় থাকতে ভালো হন।নয়তো এ বাড়িতে টিকতে পারবেন না। প্রহর চলে গেলো রেখে গেলো ক্ষিপ্ত চাহনি। সানিয়া রেগে চলে গেলো আর বলল,
“নাই চালচুলো আবার দেমাগের শেষ নেই।সময় আসলে শেষ দেখা যাবে।কে টিকতে পারবে আর কে পারবে না।
গ্রাম মানেই রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যাওয়া। রাত দশটা বাজতেই গ্রামের মধ্যে কেমন সুনশান পরিবেশ।শহরের মতো মধ্য রাত পর্যন্ত কেউ জাগে না,রাতে ভেঁসে আসে না যান্ত্রিক আওয়াজ।
সবাই ঘুমিয়ে গেছে নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। অলিন্দ নীড়ের প্রায় সকলে গভীর ঘুমে।কেবল জেগে আছে দু একজন। তার মধ্যে একজন প্রহর। হাত ঘড়িতে টাইম দেখলো এগারোটা বাজে। ছাঁদে থাকা কাঁঠের চেয়ারটা টেনে বসলো। আজ আকাশটা ভীষণ সুন্দর।আকাশে সুন্দর একখানা অর্ধ চাঁদ উঠেছে। জোছনা রাত যেন চারপাশে ঝিকঝিক করছে।থেকে থেকে মাঠ থেকে কোলা ব্যাঙের ডাক ভেঁসে আসছে।প্রহর চোখ বন্ধ করলো। দুঃখের সাথে সন্ধি করতে তার এইখানে আসা। জীবনে সুখের চেয়ে দুঃখের পরিমাণ বেশি,যতটুকু সুখ ছিলো তা অসুখে পরিনত হয়েছিলো সেদিন। তার পর থেকে আর তার জীবনে বিরাট সুখের দেখা মিলেনি,মিলেছে কেবল দুঃখের যন্ত্রণা। সুখ দুঃখের হিসাব মিলাতে গিয়ে একাকিত্ব বাড়লো। হুট করে প্রহর অনুভব করলো কেউ তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তড়িৎ গতিতে চোখ খুললো।
অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষটিকে দেখে একটু অবাক হলো।তার হাতে থাকা জিনিসটির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“কি এসব?কবে থেকে চলছে?”
“যেদিন থেকে অশ্রু ঝরানোর অভিশাপে পুড়েছি।
কাউকে কাঁদিয়ে সুখে থাকার চিন্তা করেছি,সেদিন থেকে আরো অ-সুখে মরেছি।বাঁচতে গিয়ে যেখানে হিমশিম খাচ্ছি, সেখানে সুখ ধরতে চাওয়া বিলাসিতা। তাই খনিকের সুখ নাকি উল্লাস তা জানিনা তবে খনিকের জন্য হলেও অ-সুখ থেকে মুক্তি মেলে।
প্রহর কেবল শুনলো। মুখের ভঙ্গিমা দেখে বোঝা মুশকিল তার মনের মধ্যে কি চলছে।কেবলই আকাশ পানে চেয়ে বলল,

মন পিঞ্জিরা পর্ব ১

“সুখ সবাই চায় কিন্তু পায় কয়জন?
অ-সুখ কেউই চায় না তবুও পিছু ছাড়েনা।
সুখ আনন্দ দেয়,অ-সুখ দেয় যন্ত্রণা,
সেই যন্ত্রণার অনলে পুড়ে মানুষ হয় দিশেহারা।”

মন পিঞ্জিরা পর্ব ৩