মন পিঞ্জিরা পর্ব ২৩+২৪
শ্যামলী রহমান
আনন্দময় বিয়ে বাড়ি মূহুর্তেই বিষাদের রুপ নিলো। অনেকের মধ্যে উত্তেজনা ছড়ালো। সবার জানার আগ্রহ কেন এমন হলো?শার্লিনের ঘরে রাখা চিঠিটা পেলেও বাড়ির লোকজন ছাড়া বাহিরেও কাউকে জানানো হয়নি। অনেকে স্তব্ধ সেই চিঠি পড়ে।বিশেষ করে পিয়াস এবং মিথি। পিয়াস, সুচরিতা,শাহানা আর সানোয়ার দেওয়ান শার্লিন কে নিয়ে গেছে উপজেলা শহর বিরামপুর হসপিটালে। মিথি সবার আড়ালে চিঠিখানা নিয়ে বসে আছে। একদিকে শার্লিনের জন্য চিন্তা আরেক দিকে অন্য ভাবনা।
“শার্লিন আপা কেন এমন করলো?চিঠিতে লেখা বিষয়ে কখনো তো বলেনি। হুট করে সব কেমন এলোমেলো হয়ে গেলো। তবে কি এজন্যই প্রহর ভাই কে নিয়ে আমার নাম মিথ্যে জড়িয়েছিলো?যাতে করে প্রহর ভাইয়ের সাথে যাই?কিন্তু না শার্লিন আপা এমন মিথ্যে বলার মানুষ না।
কেন এমন করলে আপা?আমায় সত্যিটা বলতে পারতে।অপ্রকাশিত অনুভূতির মূল্য দেওয়া যায় না কিন্তু তোমার অনুভূতির মূল্য পাওয়ার ব্যবস্থা ঠিকই করতাম।
এর মধ্যে আবার খোঁজ পড়লো।প্রহর এবং তার বন্ধুরা কেউই ঘরে নেই।কোথাই গেছে কেউ জানেনা।শমসের দেওয়ান আর সোলাইমান দেওয়ান ও মানিক সাহেব চিন্তিত হয়ে বসে আছে।
অরুনা যেন নিবর দর্শক। কে মরলো বাঁচলো তাতে তার কিছু যায় আসে না। সানিয়াও তাই বউ শাশুড়ীর মিল আছে বলতেই হবে। সায়েদা বানু হা হুতাশ করছে।নাতনীর যেন কিছু না হয় সেই প্রার্থনা করছে। মিলন বাহির করে ছুটে এলো।শমসের দেওয়ানের সাথে এসে বলল,
“দাদু পাশের বাড়ির এক লোক বললো প্রহর আর ওর বন্ধুদের নাকি বাড়ির পিছন দিক দিয়ে কোথাও যেতে দেখেছে।
শমসের দেওয়ান খানিকটা ভেবে বলল,
“ওর নাম্বারে কল দে।কোথাই গেছে এতো রাতে জিজ্ঞেস কর।
মালিন দৌঁড়ে ঘরে গেলো।সাহার দাঁড়িয়ে ছিলো সে মানিকের উদ্দেশ্য বলল,
“এবার কি করবি মানিক?
মানিকের থমথমে চেহারা। শমসের দেওয়ান এই সময় ছেলের এমন কথা পছন্দ হলো না।
“তুই চুপ করে থাক।পারলে ঘুমিয়ে পড়।
সোলাইমান মোটরসাইকেল বাহির কর বিরামপুরে যাবো।আর হ্যাঁ মানিক চিন্তা করবি না আমার উপর ভরসা আছে তো?
মানিক মাথা নাড়ালো, বলল,
“আপনার উপর ভরসা আছে বড় আব্বা।
সব কথা পরে হবে আগে শার্লিনের সুস্থ হয়ে ফিরে আসাটা জুরুলি।
প্রহর আসিফ আর পাভেল এই রাত দুটোয় বিরামপুর রেল স্টেশনে বসে আছে। এতো রাতে ট্রেন নেই আছে একবারে ভোরে। আসিফের বাসে যাওয়া সমস্যা হয় বিধায় ভোর অবধি অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলো।প্রহর কপালে দুই হাত ঠেকিয়ে মাথা নিচু করে বসে আছে। প্রচন্ড মাথা ব্যথা করছে। অসহ্য যন্ত্রণায় যেন মাথা ছিড়ে পড়ছে এমন অবস্থা।মাঝে মধ্যে এমন হয় তবে আজই হতে হলো।
যন্ত্রণার মাঝে আরো যন্ত্রণা দেওয়া এটা বোধ-হয় প্রকৃতির নিয়ম।
“বাবা কয়টা টাকা দিবে?রাত্রে কিছু খাইনি।
প্রহর তাকালো।এক বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে আছে পরনে পুরনো জামা। চোখ মুখ শুকনো দেখে মনে হচ্ছে কিছু খায়নি। প্রহরের মায়া হলো।পকেট থেকে একশ টাকা বাহির করে দিলো।
এই একশ টাকা পাওয়াতে সেই বৃদ্ধার চোখ খুশিতে চিকচিক করে উঠলো। হাঁসি মিলে উঠলো শুষ্ক অধরে। প্রহরের মাথায় হাত রেখে বৃদ্ধা দোয়া দিলো।
“তোমার সব ইচ্ছে পূরণ হোক। আল্লাহ তোমার ভালো করুক।
দোয়ার বিপরীতে প্রহর হাঁসলো। মাথা ব্যথা খিঁচে রেখে বলল,
“জীবনে কোনো ইচ্ছেই তো মা। একটা ছিলো তা পূরণ হওয়া অসম্ভব।ভয়ংকর পথের দিশারি থাকলেও সে ইচ্ছে পূরণ হওয়ার কোনো পথ নেই।
“কি কও বাবা।আল্লাহ চাইলে সেকেন্ডে সব পরিবর্তন হইতে পারে। আচ্ছা যাই আমার খুব খিদে পেয়েছে।
বৃদ্ধা চলে গেলো। প্রহর এক পলক তাকিয়ে ভাবলো “এক সেকেন্ডে ভাগ্য পরিবর্তনের মতো এতো ভালো কপালে আমার জুটবে না।
তখনই পাভেল আর আসিফ ওইপাশ থেকে আসলো। প্রহর কে মাথা চেপে ধরে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলো,
“কি হয়েছে?আবার মাথা ব্যথা শুরু হয়েছে?
প্রহর উত্তর দিতে পারছে না।ব্যথা চোখে মুখে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে।আসিফ ওকে নিজের কাঁধে নিলো।পাভেল স্টেশনের দোকান থেকে একটা নবরন্ত তেল এনে মাথায় দিয়ে মালিশ করতে লাগলো।
সে চোখ বুজে আছে। হঠাৎ কি মনে হতে ফোনটা বাহির করলো। ফোন অফ করে রেখেছিলো বিধায় অন করলো।অন করতেই চোখ বিস্মিত হলো। বাড়ি থেকে এতো কল এসেছে কেন?মিলন,পিয়াস,বড় মামা,ছোট মামা সকলে কল করেছে।
প্রহর মাথা উঠালো।কল লাগালো পিয়াসের ফোনে। তার বুক ধুকপুক করছে কিছু হয়নি তো আবার?নাকি আমাকে খুঁজে না পাওয়াতে এতো কল?
কয়েক সেকেন্ড পর রিসিভ হলো।শাহানসর কান্না প্রথমে কানে আসলো।তার বুকের ধুকপুক বাড়লো।
পিয়াসের উত্তরে সে আরো চমকে উঠলো।
“বিস্তারিত বলার সময় নেই কোথাই আছিস বিরামপুর সরকারি হসপিটালে আয় তার পর সব কথা হবে।
প্রহর ফোন রেখে হন্তদন্ত হয়ে ব্যাগ কাঁধে নিলো। আসিফ পাভেল কিছু বুঝতে পারছে না।
“কি হলো?উঠছিস কেন?কি বলবো পিয়াস ভাই?
“শার্লিন ঘুমের ঔষুধ খেয়ে আত্নহত্যা করতে গেছিলো। ওকে হসপিটালে ভর্তি করেছে তাড়াতাড়ি চল। প্রহরের পিছু পিছু ওরা দুজনেও ছুটলো। একটা রিকশায় উঠে পড়লো। স্টেশন থেকে হসপিটালের দূরত্ব খুব বেশি নয় তবুও যেন আজ রাস্তা ফুরচ্ছে না। এইজন্যই বোধ-হয় বলে,
“অসহায়ত্বে সময় ও দুটোই পথ দীর্ঘ হয়।
শার্লিন কে কেবিনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শাহানা সেই থেকে কেঁদে চলছে। সুচরিতা বেগম ডাকে শান্তনা দিচ্ছে।এতো রাতে হসপিটালে পাশ থেকে কুকুরের ডাক ভেসে আসছে। শাহানার বুক ধুক করে উঠলো।কান্নার রেশ বাড়লো।গ্রামে গুরুজনেরা বলে বিপদের সময় কুকুর ডাকা ভালো না।সেটাকে অশনিসংকেত হিসাবে নেয়। পিয়াস আর সানোয়ার ছোটাছুটি করছে মাঝে মাঝে উঁকি দিচ্ছে কেবিনে। তখনই প্রহর আর ওর বন্ধুূদের আগমন হলো।
“কি হয়েছে শার্লিনের?কোথাই ও?
“তার আগে বল তুই কোথাই গেছিলি?সবাই যখন চিল্লাচিল্লিতে ব্যস্ত তখন তোরা কেউ বাড়ি ছিলি না।
“পাভেলের একটা চাকরির পরীক্ষা পড়ে যায় এজন্য ওকে স্টেশনে রাখতে এসেছিলাম।
প্রহরের উত্তরে বাড়তি কথা আর কেউ বললো না।
এই সময় কেউ বেশি খেয়াল ও করলো না। তার মধ্যে শমসের দেওয়ান আর সোলাইমান দেওয়ান ও এসে হাজির হলো।
ডাক্তার কেবিন থেকে বেরোলো।সবাই ছুটে গেলো। শাহানা আগেই ঢুকলো কেবিনে।
“ডাক্তার সে এখন কেমন আছে?
“সে বিপদমুক্ত আছে।একবারে কয়েকটা ঘুমের ঔষুধ খাওয়ার জন্য এমন অবস্থা হয়েছে।ভাগ্য ভালো ওয়াশ করতে হয়নি।এখনো ঘুমেই আছে
স্যালাইন দিয়েছি শেষ হলেই নিয়ে যেতে পারবেন।
সকলের মন থেকে বিপদের শঙ্কাটা গেলো। হাপ ছাড়লো কেউ। সুচরিতা বেগম ও কেবিনে গেলো।শমসের দেওয়ান ও ছেলেরা বাহিরেই থাকলো।
পিয়াস কপালে হাত ঠেকিয়ে হসপিটালের বারান্দার বেঞ্চে বসে পড়লো।মনের মধ্যে তার তোলপাড় চলছে।প্রহর এখনো কিছু বুঝতে পারছে না। সে পিয়াসের পাশে বসলো। পিয়াস তার চোখে মুখে জানার আগ্রহ দেখে সত্যিটা বলে দিলো।
প্রহর নিজেও চমকালো।এমন তো হওয়ার কথা নয়।শার্লিন কি মিথ্যে বলছে নাকি সত্যিই মনের মধ্যে ছিলো সে?না তার মন অন্য কিছু বলছে।
সবার মুখে বিষাদ লেগে থাকলেও পাভেল আর আসিফ খুশি হলো।আশার আলো বোধ-হয় একটু দেখলো।শার্লিন কে পছন্দ না করা আসিফ ও তার ভালোর প্রার্থনা করলো।প্রহর বেঞ্চ থেকে উঠে পড়লো।পিয়াসের অবস্থা সে বুঝতে পারছে কিন্তু…। এই কিন্তুর উত্তর একমাত্র শার্লিন জানে।
এখন অপেক্ষা ওর জ্ঞান ফেরা।একবার হাত ঘড়ির দিকে তাকালো।সময় এখন দুটো চল্লিশ।প্রহর হসপিটাল থেকে বেরিয়ে গেলো কোথাও। আসিফ আর পাভেল ও তার পিছু নিলো। শমসের দেওয়ান এর মধ্যে ভুলে গেলো প্রহর কোথাই ছিলো এই প্রশ্নের কথা।
ভোর হতে চললো এখনো কারো চোখে ঘুম নেই। মিথি অনিমার কাঁধে মাথা রেখে বসে আছে।পাশে বিনু ফুফু তার মেয়েকে নিয়ে শুয়েছে মাত্র। মোহনিয়া বেগম ও বাড়ি গেছে ওদিকে কি হলো তা জানতে।অনিমা পিনপিন নিরবতা ভেঙে হঠাৎ করে ধীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“শার্লিন আপা সত্যি কি পিয়াস ভাই কে ভালোবাসে?
“চিঠিতে তো তাই লেখা আছে।আমার সাথে পিয়াস ভাইয়ের বিয়ে সে নিজের চোখে দেখতে পারছে না বলেই এমন করেছে।যদি আমায় আপা নিজে বলতো তবে আমিই এই বিয়ে ভেঙে দিতাম। শেষ সময়ে এসে এমন কেন করলো?
“হয়তো সাহসের অভাবে নয়তো বা অন্য কোনো কারণে।
“অন্য কারণটাই জানতে চাই।
“তোর কি হবে?এসব ঝামেলার মধ্যে মান সম্মান নিয়ে টানাটানি হবে।মানুষ তখন আঙুল তুলবে।চিনিস তো গ্রামের মানুষ কেমন?তারা সামান্য ভুল পেলেই সামনে এসে আঙ্গুল তুলে কথা বলবে।যাদের যোগ্যতা নেই পিছনে কথা বলার তারাও বলবে।
মিথি কাঁধ থেকে মাথা তুললো। অন্যসব ভাবনা মাথা থেকে ঝরে ফেললো।
“সকালের অপেক্ষা করছি।কিছু অনুভূতি আমায় তাড়া করছে,মনের ভেতরে তোলপাড় চলছে। কি করি বলতো?সহজ জীবনটা হঠাৎ এতো জটিল কিভাবে হলো?
অনিমা নিরুত্তর।কি’বা বলবে?আজ একসাথে এতোসব সত্যি নাকি মিথ্যা যাই হোক একসাথে প্রকাশ পেয়ে মতিষ্কে ভার দিচ্ছে।কোনটা সঠিক কেনটা ভুল তা বুঝা মুসকিল। অনিমা একবার বিনুর দিকে তাকালো। সে তার মেয়েকে ঘুম পাড়াতে গিয়ে নিজেও ঘুমিয়েছে।
“প্রহর ভাই যদি সত্যি ভালেবাসে তবে প্রকাশ করলো না কেন?
“অনুভূতির মূল্য পাবে না তাই।
“প্রহর ভাই কে তো সবাই খুঁজলো।তিনি হয়তো দূরে যেতে চেয়েছিলেন তোকে অন্যের হতে দেখতে পারবেন না বলে।
“শার্লিন এখন ঠিক আছে। চোখ ও খুলেছে। স্যালাইন শেষ হলেই সকালে নিয়ে আসবে।
মোহনিয়া বেগমের কথায় মিথি শান্তি পেলো।সবকিছুর উর্ধে হলো শার্লিন আপা সুস্থ হওয়া।
বিনুর ঘুম ছুটে গেলো।উঠে পড়লো তখনি।
“মানুষ জানাজানি হচ্ছে এর পর কি হবে ভেবেছে বড় ভাই?
মোহনিয়া বেগম প্রতিত্তোরে বলল,
“যা হবার তা হয়ে গেছে আর ভেবে বা বলেই কি হবে?এখন যা হবে তাই মেনে নিতে হবে। বড় আব্বা
ভাইরা আছে তারা কিছু একটা সিদ্ধান্ত নিবে।
সবাই যখন শার্লিনের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে পিয়াস কেবল বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে। শমসের দেওয়ান আপাতত নিশ্চুপ।কেবিনে যখন গেলেন শার্লিন ভয়ে ছিলো। শমসের দেওয়ান এ বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করেনি।শুধু জিজ্ঞেস করলো,
“এখন কেমন লাগছে?
মাথা নাড়িয়ে উত্তর দিলো।প্রহর আসার আগেই আগেই পিয়াস আসলো। শাহানা এবং সুচরিতা বেগম কে বাহিরে যেতে বলল।শার্লিনের সাথে তার একা কথা আছে। পিয়াস কেবিনে আসতেই শার্লিন মাথা অন্য পাশে করলো।চোখ বন্ধ রেখে উত্তর খুঁজছে এখন কি বলবে?জীবনের রিস্ক নিতে পারলে প্রশ্নের কেন ভয় পাচ্ছিস?
নিজের সত্তা উত্তর দিলো। সাহস যুগিয়ে চোখ খুললো তাকালো পিয়াসের দিকে।সেও অধির আগ্রহে তাকিয়ে আছে।
“কেন করলি এরকম?আগে বলতে পারতি।কখনো তো মনে হয়নি আমায় পছন্দ করিস।জানিস তো মিথি কে পছন্দ করি।তুই আরো সাথে সাথে থাকতি ভাবতাম সবই জানতি উৎসাহ দিতি।
শার্লিনের কথার বাধ ভাঙলো।চুপ থাকার সময় আর নেই।
“আপনি শুধু মিথিকে পছন্দ করেন বাড়ি থেকে ওর সাথে বিয়ে দিবে বলেছে বলে। কিন্তু আপনি কি জানেন আপনার থেকে শতগুণ বেশি কেউ একজন তাকে ভালোবাসে?তাকে না পাওয়ার যন্ত্রণায় প্রতিনিয়ত পোড়ে।আপনার অনুভূতি সামান্য তার অনুভূতি আর ভালেবাসার কাছে।এর পরেও তার ভালোবাসা অবহেলিত কেবল প্রকাশ না করাতে আর আপনার মতো বাবা,মা পরিবার, ক্যারিয়ার আর মোস্ট ইম্পরট্যান্ট হলো ধন সম্পত্তি না থাকার কারণে।আপনি মিথিকে পছন্দ করেন শুনে সে তার অনুভূতি ব্যক্ত করেনি।বাড়ির সকলে আপনার সাথে মিথির বিয়ে হোক বলে সে চুপ থেকেছে।
ভালোবেসে এতো স্যাকরিফাইস কে করে পিয়াস ভাই?আপনি তাকে সাধনা ছাড়াও পেয়ে যাচ্ছিলেন অথচ কেউ একজন কত-শত দিন চেয়েও পায়নি।
মানিক মামা সব জেনেই তোমার সাথে মিথির বিয়ের কথা আগে বলেছে।যাতে সে এগুতে না পারে।
পিয়াস নিস্তব্ধ হয়ে শার্লিনের কথা শুনেছে। সবটুকু শোনার পর বিস্ময় নিয়ে চেয়ে আছে। কথারা যেন গলায় আঁটকে আছে।
“কে সে?
“প্রহর ভাই।
পিয়াস খানিকটা চমকে উঠলো।পিছিয়ে গেলো দু কদম।মতিষ্কে এই কথাগুলো সহ্য করতে পারছে না। সে কি শুধু পছন্দ করে?পছন্দ ও একদিন ভালোবাসা রূপ নেয়। যেদিন সুচরিতা বেগম বলেছিলো মিথির সাথে বিয়ের কথা তার পর থেকে মনে মিথির জন্য অনুভূতি জমিয়েছিলো। এটা কোনো অন্যায় নয়,যে মাস হোক বা বছর পর তার হবে অনুভূতি সৃষ্টি করা সম্পর্কের জন্য ভালোই ছিলো।কিন্তু এতোকিছু তো সে জানতো না।
প্রহরের বিষাদ মুখের কারণ তবে এই?
পিয়াস আর কোনো প্রশ্ন করতে পারলো না।
“পিয়াস ভাই আপনি দয়া করে মিথি কে বিয়ে করবেন না।প্রহর ভাই জীবনে কিছু পায়নি শুধু হারিয়েছেই।এইবার অন্তত সামান্য সুখটুকু তার নামে করে দিন।আপনার সব আছে এক ব্যথা মুছতে শত জন আপনার পাশে দাঁড়াবে কিন্তু তার পাশে কে দাঁড়াবে?
প্রহর দরজার কাছে দাঁড়িয়ে শুনলো। এক পলক তাকিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলো।শার্লিন অসহায়ের ন্যায় তাকিয়ে থাকলো।শেষ পর্যন্ত মিল হবে তো?
“কেন করলি এরকম?আমি যা ভাবছি তা কি ঠিক?
আচমকা প্রহরের প্রশ্নে শার্লিন ঘুরে তাকালো।
তার দিকে তাকিয়ে হেঁসে বলল,
“ফিরে আসলেন?যাক এবার না হয় জোড়া নিয়ে ফিরবেন একেবারে।
“ভনিতা ভালো লাগছে না।জীবন কি ছেলেখেলা?
এসব করার দরকার ছিলো কিছু?
“আপনি বুদ্ধিমান এব বিচক্ষণ মানুষ বুঝতে পরেছেন যখন তখন আর কি বলার আছে?
আপনি ভালো মানুষ এজন্য ভালোবাসা ত্যাগ করে মহান হতে চেয়েছিলেন আমি তাতে বাঁধা দিলাম।
জীবন তো ছোট বেলায় বাঁচিয়েছিলেন সেই জীবন বাজি রেখে আপনার মুখে হাঁসি ফুঁটলে ক্ষতি কি?
ভালোবাসা ত্যাগ করে মহান হওয়া যায় না।
আপনি কি তা জানেন?আপনি কারো মন ভাঙতে চাননি আমি না হয় খারাপ হয়ে মন ভাঙলাম।
খারাপ হলে যদি ভালো কিছু হয় তবে ক্ষতি কি?
প্রহরের রাগ লাগছে আবার খারাপ ও লাগছে।
মেয়েটা তার জন্য জীবন বাজি রেখে এসব সাজিয়েছে কিন্তু তার কিছু হয়ে গেলে তখন কি হতো?ভালোর পরিবর্তে আরো অপরাধী বানিয়ে যেত।
সকাল আটটা।হসপিটাল থেকে শার্লিন কে নিয়ে বাড়ি আসলো মাত্র।এর মধ্যে আত্নীয়, গ্রামের মানুষ সকালের মধ্যে কৌতুহল কাজ করছে। একে অন্যের কানে ফিসফিস করছে। আলোচনা সমালোচনা এড়িয়ে শার্লিনের ঘরে বৈঠক বসলো।
ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলো।ঘরের ভেতরে বাড়ির পুরুষরা,মানিক, মিথি,শার্লিন ও শাহানা রয়েছে।
মিথি শার্লিনের পাশে বসে।প্রহর দাঁড়িয়ে আছে নিশ্চুপ।মিথি একবার তাকালো। পিয়াস খেয়াল করলো সবকিছু।সকলেই শার্লিনের চিঠি পেয়েছে বিধায় আপাতত তাকে আর জিজ্ঞেস করেনি কিছু।যা জানার হসপিটালে জেনে নিয়েছে।পিয়াস ও বলেছে তার বক্তব্য।শমসের দেওয়ান বলে উঠলো,
“এখন একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। মানিক বলো কি করবে?পিয়াসের সাথে আলাদা কথা হয়েছে তার মত মানলেই মনে হয় ভালো হবে।
মানিক উত্তর জানতে চাইলো,
“কি বিষয়ে?
“শার্লিন যেহেতু চায় পিয়াস কে তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি শার্লিনের সাথে পিয়াসের বিয়ে দিবো।
আর মিথির সাথে প্রহরের। তাহলে এতে কোনো ঝামেলা থাকলো না।বড় বউমার কথাও থাকলো মিথি এই বাড়ির বউ হবে।
প্রহর স্বাভাবিক আছে। এসবের পর এমনকিছু হবে আগেই ভেবেছিলো।
মানিকের এই মত পছন্দ হলো না। সে উঠে পড়লো। সিদ্ধান্ত কে ভুল প্রমাণ করতে বলল,
“দুঃখিত বড় আব্বা আপনার সব কথা মানলেও এই কথা রাখতে পারছি না। পিয়াসের সাথে শার্লিনের বিয়ে দেন সমস্যা নেই।আমি আমার মেয়েকে তার সাথে বিয়ে দিতে রাজি নয়।
ঘরে উতপ্ততা ছড়ালো। মিথি আর শার্লিন শুনছে।
শমসের দেওয়ান প্রশ্ন করলো,
“কেন?প্রহর খারাপ কিসে?কোনো খারাপ কিছু দেখেছো?
“র*ক্ত কথা বলে বড় আব্বা।এই কথাটা আপনি না মানলেও আমি মানি।যার বংশ যেমন সে তেমন হবে না তার কি গ্যারান্টি?যেমন বাপ তেমন ছেলেও হতে পারে। তাছাড়া আমি বাবা হয়ে মেয়েকে বেকার কারো হাতে তুলে দিবো না নিশ্চয়ই?যেখানে ব্যবসায়িক,চাকরিজীবী পাত্রের সন্ধান আসে।
মানিকের কথায় প্রহর ব্যাঙ্গাত্মক হাঁসলো।যে মানুষটার সাথে তাকে জড়াচ্ছে নিজেও সেই ব্যক্তিকে ঘৃণা করে।
মন পিঞ্জিরা পর্ব ২১+২২
“পরিস্থিতি এখন এমন নেই মানিক।এটা মান সম্মানের প্রশ্ন। বিয়ে না হলে মেয়ের দিকে আঙ্গুল তুলবে।
শমসের দেওয়ানের প্রতিত্তোরে কিছুক্ষণ ভেবে উত্তর দিলো,
“যদি তাই হয় তবে রুহেলের সঙ্গে মিথির বিয়ে দিবো। আমি ছোট জনের সাথে কথা বলে আসছি।
মানিক ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।শমসের দেওয়ান ভাবছে বসে।বাকি সবাই দর্শক। পিয়াস একবার প্রহর আর মিথির দিকে তাকিয়ে বাহির হয়ে গেলো।
শার্লিন অসুস্থ শরীর কাঁপছে।মায়ের গায়ে হেলান দিয়ে ভাবলো,তবে কি এতো চেষ্টা করেও শেষটা সুন্দর হবে না?
