মন পিঞ্জিরা পর্ব ২১+২২
শ্যামলী রহমান
নদীর স্রোতের মতো বয়ে চলে সময়।
সময় কি কারো জন্য অপেক্ষা করে থাকে?মিনিট, ঘন্টা সাথে দিন ও পেরিয়ে গেছে।আজ বৃহস্পতিবার সেই কাঙ্ক্ষিত দিনের এক অংশ। কেউ পাওয়ার আনন্দে হাঁসবে কেউ বা হারানোর বেদনায় কাঁদবে।বাড়ি ভর্তি মানুষ। কেউ কারো খোঁজ নেওয়ার সময় পাচ্ছে না। শার্লিন এদিক ওদিক তাকিয়ে কাউকে খুঁজছে কিন্তু সেই মানুষটিকে নজরে পড়ছে না। সেই বিকেলে দেখেছিলো ডেকোরেটরের মানুষদের সাথে হাতে হাতে কাজ করছিলো। অন্যান্য আয়োজনে ও তার কমতি নেই। মানুষ কতটা সহ্য ক্ষমতা নিয়ে জন্মালে ভালোবাসার মানুষ কে অন্য কারো হাতে তুলে দেওয়ার আয়োজন করে?এই সহ্য ক্ষমতা প্রহর ভাইয়ের আছে। কাজে মধ্যে ঠোঁটের কোনো হাঁসি সবার নজরে পড়ছে কিন্তু কয়জন বুঝছে তার ভেতর পুড়ছে?
শার্লিন ভীড় ঠেলে পাভেলের কাছে গেলো। আসিফ তাকে আসতে দেখে বলল,
“আবার কি বেয়াদবি করতে এসেছো?
শার্লিন তার কথার উত্তর দিলো না। আজ ফাজলামো করার মতো মানসিকতা তার নেই। ওদিক থেকে নবনী আর রিদিতা ডাকছে।তাদের ডাক উপেক্ষা করে পাভেল কে জিজ্ঞেস করলো,
“প্রহর ভাই কোথাই?”
পাভেল আশে পাশে তাকালো। উত্তরে বলল,
“ঘরে আছে।ঘরে না পেলে দেখো অন্ধকার ছাঁদে বসে আছে।আমাদের জোর করে এখানে পাঠিয়েছে।
শার্লিন উপরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ানোর আগে মোহনিয়া বেগম ডাক আসলো। শার্লিন ঘুরে ওই বাড়ি গেলো।এতো মানুষের মধ্যে মিথির কানে কানে কিছু কথা বলে দৌঁড় দিলো।মিথির দৃষ্টি এলোমেলো।গত দুদিন সে যেসবের সাথে পরিচিত হয়েছে সবকিছু তার অবিশ্বাস্য লাগছে। না পারছে বলতে, না পারছে সইতে। সে কেবল ঠাঁই বসে আছে।অনিমা পাশ থেকে কি বলছে তার কানেও যাচ্ছে না।
শার্লিন সিঁড়ি বেয়ে ছাঁদে উঠলো। আফছা অন্ধকারে মানুষটাকে দেখতে পেলো। তার দৃষ্টি সামনের বাড়িটার দিকে। প্রহর পায়ের আওয়াজ শুনে পিছনে তাকালো। শার্লিন কে দেখে আবার সামনে ঘুরলো। শার্লিন সেখান থেকে বলে উঠলো,
“এতো অনুভূতি,ভালোবাসা লুকিয়ে রেখে কি লাভ প্রহর ভাই?অনুভূতি প্রকাশ করতে হয়,ভালোবাসলে বলে দিতে হয়।
প্রহর ঠোঁট ভেঙে হাসলো। আকাশ পানে চেয়ে ঠোঁটের কোনো তীর্যক হাঁসি লেপে উত্তর দিলো,
“ সব অনুভূতির গন্তব্য হয় না প্রকাশ্যে। কিছু অনুভূতি রয়ে যায় আড়ালে।”
শার্লিন আশাহত হলো। প্রহর ভাইয়ের মুখপানে চেয়ে তার কষ্ট লাগলো। সে প্রেমে না পড়লেও বুঝতে পারে অনুভূতির ব্যথা। তাই তো আবারো অনুরোধ করে বলল,
“চেষ্টা করে দেখুন না। ভালোবাসা জয় করতে হলে লড়াই করতে হয়।
এবার প্রহর হো হো করে হেসে উঠলো। শার্লিন অবাক হলো মানুষ এতো কষ্ট নিয়েও হাঁসতে পারে?
হ্যাঁ পারে। এই যে ভাব ছাড়া প্রহর ভাই। মুখে হাসি ঝুলিয়ে রাখলেও অন্তর তার পুড়ে যাচ্ছে ব্যথায়,এ কথা মিথ্যে নয়।
প্রহর ছাঁদ ত্যাগ করার জন্য সিঁড়ির কাছে এলো। কিছু মনে হতে দাঁড়িয়ে পড়লো। বলল,
“কিছু ভালোবাসা কেবল ভালোবেসে দূর থেকে দেখার জন্যই সৃষ্টি হয়,নিজের করে পাওয়ার জন্য নয়।
চলে গেলো,রেখো গেলো শার্লিনের ভাবনায় মত্ত চাহনি। না কিছু একটা করতে হবে। কিন্তু কি করবো? সব ঠিকঠাক এ মুহূর্তে কিছু করার যে নেই।বাহিরে গায়ে হলুদ হচ্ছে।কাল মিথি আর পিয়াস ভাইয়ের বিয়ে।পিয়াস ভাই মিথিকে পছন্দ করলেও প্রহরের মতো ভালোবাসতে পারবে না। মানুষটার সব থেকেও কেউ নেই, মা নেই, বাবা নেই, পরিবার থেকেও নেই।এর মধ্যে ভালোবাসা হারিয়ে ফেললে সে নিষ্য হয়ে যাবে।তাহলে কি মিথি কে সবটা বলে দিবো?কিন্তু সে-ই বা কি করতে পারবে? যতটুকু বলেছি সেটুকু সন্দেহ ভাজন হিসাবে মিথির কাছে উপস্থাপন করেছি এবং সে ওতটুকুই ভেবে নিয়েছে।সত্যি সেই যে প্রহর ভাইয়ের শুকতারা সে নিজে সিউর ভাবে এখনো জানেনা।তার মনে পিয়াস কিংবা প্রহর কারো জন্য ভালোবাসা নেই।পিয়াসের জন্য ভালোলাগা আছে সেটা স্বাভাবিক হিসাবে।তবে প্রহর ভাইয়ের অনুভূতির জন্য কিছু একটা টান আছে।যদি সে জানতো আগে তবে কিছু একটা হতেও পারতো। আকাশকুসুম ভাবনায় ভাটা পড়লো নিচ থেকে চিল্লানোর শব্দে। শার্লিন তাড়াতাড়ি করে ছাঁদ ত্যাগ করলো।
মিথিকে হলুদ শাড়ি পরিয়ে স্টেজে বসানে হয়েছে। আরেক পাশে স্টেজে পিয়াস কে।যেহেতু একই সাথে এ বাড়ি ওবাড়ি তাই স্টেজ বাহিরে ফাঁকা জায়গায় করা হয়েছে একসাথেই। সেখানে
গ্রামের বৃদ্ধারা নানান ধরনের গীত গাইছে।
তাদের পালা শেষ হলে বক্সে শুরু হচ্ছে গান সাথে রিতি ও নবনীর নাচ।প্রহর দূর থেকে তাকিয়ে আছে।একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো অনেকক্ষণ। হঠাৎ করে মিথির নজর পড়লো প্রহরের দিকে। একদৃষ্টিতে তার দিকেই চেয়ে আছে।গাঁয়ে হলুদ পাঞ্জাবি আর ঘাড়ে গামছা ঝুলিয়ে আছে।
“দেখ আপা পিয়াস ভাই তোর দিকে কেমন করে তাকিয়ে আছে।
রিতির ধাক্কায় মিথির নজর সরলো। ডানপাশে তাকালো।পিয়াস এদিকে তাকিয়ে আছে। ওই স্টেজে নবনী,শ্রাবনী আরো কয়েকজন আছে।
মিথির পাশে অনিমা,রিতিদা আর শার্লিন আছে।
রুহেল তাদের থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে অনিমা কে দেখছে।তখনই বিনু ফুফুর আগমন হলো।আজ সে মহা ব্যস্ত।কেনো মতো হলুদ দিয়ে ছুটলো। পথে প্রহর কে দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দাঁড়িয়ে গেলো।
“এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন আব্বা?ওদিকে যাও।ভাই বোনের বিয়ে আনন্দ করো।
প্রহর কেবল মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বললো সাথে ঠোঁটের কোনো হাঁসিটাও ফুঁটিয়ে তুললো।পাভেল আর আসিফ দাঁড়িয়ে দেখছে আর প্রহরের উপর রেগে যাচ্ছে।
“যা দেখ কি সুন্দর মানাচ্ছে। যা হলুদ দিয়ে আয়।
পাভেলের কথায় সত্যি সত্যি প্রহর গেলো। প্রথমে বসলো পিয়াসের কাছে। সে যেতেই পিয়াস বলল,
“কোথাই ছিলি বল তো?কতক্ষণ থেকে খুঁজছি।তোর মাথা ব্যথা কমেছে?
“হ্যাঁ কিছুটা কমেছে। আসলে এই মাথা ব্যথা কিছু না।শুধু এইসব থেকে দূরে থাকার জন্য বাহানা মাত্র। সে হলুদ লাগালো পিয়াসের গালে। যে হলুদের অনুষ্ঠানের পরদিন তার প্রিয়শী হবে অন্যের পাশে।শেষ অবধি কি তা সহ্য করতে পারবে?শার্লিন ওপাশ থেকে পিয়াসের স্টেজের দিকে তাকিয়ে আছে। প্রহর উঠতে নিলে হুট করে সানিয়া প্রহরের গালে হলুদ লাগিয়ে দেয়। হাত খানা ধরে বলে,
“দেবরজী ভাবি কে হলুদ লাগাবে না? একমাত্র ভাবি এতটুকু তো দাবি।
প্রহরের মেজাজ খারাপ হলো।কিন্তু এতো মানুষের মধ্যে কিছু বলতে পারলো না।প্রহর হাত ছাড়িয়ে নিলো, বলল,
“আপনার বিয়ে নাকি?হলুদ মাখার ইচ্ছে থাকলে মিলন ভাই কে ডাকি?
পিয়াস চুপ করতে বললো।এই মহিলার ব্যবহার সেও কিছুটা জানে বুঝে কিন্তু তার সাথে বাড়াবাড়ি করার সাহস পায় না।প্রহর যেতে নিলে মিথির নানী হামিদা বানু কোথা থেকে এসে প্রহর কে টেনে নিয়ে গেলো। গীত গাইছে আর তার হাত ধরে নাঁচছে। প্রহর যেন বুঝতে পারলো না কি হচ্ছে। সে এসব নাচ পারেনা বা কখনো করেনি। কিন্তু বড় মানুষ তাই না করলো না।কেবল হাত ধরে থাকলো আর আনন্দ দেখলো।সবাই আনন্দে থাকুক এই তো চায়।
“প্রহর ভাই মিথি কে হলুদ লাগাবে না?
প্রহর থামলো।নাক বরাবর সোজা তাকালো।মিথি তখন হেঁসে হেঁসে অনিমা কে কি যেন বলছিলো।
প্রহর শার্লিনের প্রতিত্তোরে এগিয়ে গেলো,বলল,
“অবশ্যই।
সে স্টেজের একপাশে বসলো।মিথি সোঁজা হলো। দৃষ্টি রাখলো প্রহরের দিকে। প্রহর ও তাকালো।সবার সামনে হাঁসতে হাঁসতে গাঁদা তুলে হলুদ তুলে মিথির গালে ছোঁয়ালো।এই ছোঁয়ার অনুভূতি বেদনা দায়ক হলেও হাঁসতে হচ্ছে।ফুলটা আবার হলুদের বাটির উপর রাখলো। পাশে শার্লিন ছাড়া কেউ নেই।রিতি নাচছে এখন।অনিমা রুহেলের সাথে কি যেন কথা বলছে।প্রহর পকেট থেকে একটা ছোট কৌটো বাহির করলো।মিথির হাতে দিয়ে বলল,
“গায়ে হলুদ এবং বিয়ের উপহার।
“উপহার তবে বিয়ের দিবেন আজ কেন?
“ ভাবলাম যার জিনিস তাকে দেওয়া উচিত।যদি এতো মানুষের ভীড়ে হারিয়ে যায়।এ উপহার আমার টাকায় কেনা।যত্নে রাখিস,ভালো থাকিস।
মিথি শুনলো।তার বুকের মধ্যে কম্পন সৃষ্টি হলো।
প্রশ্নরা তাড়া করলো।
“আপনার শুকতারা সত্যি কে প্রহর ভাই?
মিথির থেকেও শার্লিন বেশি আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে।যদি শেষ বেলায় ও বলে দেয়। কিন্তু তা আর হলো কই।প্রহরের উত্তর বরাবরের মতোই নিরাশ করলো।
“এতো জানার আগ্রহ কেন?আমাকে জানতে আসলে আঁধার ছাড়া কিছু পাবি না।সেই আঁধারে মাঝে মাঝে শুকতারার দেখা মিললেও এখন মিলবে কেবল আমাবস্যা। আর আমাবস্যায় তো শুকতারা দেখা যায় না। যদি কখনো জোছনা রাত আসে,ভোরের শেষে শুকতারার দেখা মিলে সেদিন না-হয় বলবো।
প্রহর চলে গেলো।সানোয়ার দেওয়ান তাকে ডাকছে।বাহিরে উনুন খোঁড়া হচ্ছে। রাতেই গরু জবাই করা হবে এবং ভোরে রান্না শেষ করে রাখবে। আসিফ আর পাভেল প্যান্ডেল থেকে বাহির হলো। হুট করে মানিক সাহেবের সামনাসামনি হলো।ওদের দিকে অসন্তোষ নজরে তাকালো। সেই শুরু থেকে কেন যেন ওদের পছন্দ করে না সেটা উনার চোখ দেখলেই বোঝা যায়।
মানিক সাহেব পাশ কাটিয়ে চলে গেলো। আসিফ পাভেল কে বলল,
“এই লোককে বাহির থেকে সহজ সরল মনে হলেও ভেতর থেকে আস্ত গিরগিটি আর বাদ লোক।
“এই লোকটার জন্য এমন হয়েছে।যদিও উনার ভাবনা কিছুটা সঠিক আবার ভুল ও। তার পরেও মানুষের দোষ দিয়ে কি লাভ?যেখানে প্রহর নিজে নিশ্চুপ।যদি সে মুখ খুলতো তবে মিথি রাজি হলেও হতে পারতো।মেয়েটার চোখে প্রহরের জন্য আকুলতা দেখি। হয়তো ভালোবাসার নয় কিন্তু ভালোলাগার তো বটেই।সেই ভালোলাগা থেকে ভালোবাসার সৃষ্টি হতে কতক্ষণ লাগতো?
আসিফের ফোন বেজে উঠলো।বাড়ি থেকে ফোন করেছে।কথা বলতে সামনের দিকে এগিয়ে গেলো। এদিকটায় সাউন্ডের জন্য কথা শোনা যাচ্ছে না। পাভেল জোরে দম ফেললো।
“জীবন এমন কেন?যারা সত্যি ভালোবাসে তাদের সামনেই কেন সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ পাড়ি দেওয়ার সমান বাঁধা আসে?জীবনে কি টাকাই সব?চলতে গেলে টাকার প্রয়োজন আছে তাই বলে অধিক ছাড়াও তো সুখে থাকা যায়।মানুষ কেন এটা বুঝোনা?
রাত বাড়লো।চারদিকের ভীড় ও কমে এলো।গ্রামের মানুষ যারা গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান দেখতে এসোছিলো তারাও চলে গেছে।আত্নীয় স্বজনদের
মধ্যেও অনেকে শুয়ে পড়েছে।শার্লিন মিথির পাশে বসে আছে।তার মাথায় একটাই চিন্তা ঘুরছে কি করলে কেউ একজন সুখের মুখ দেখবে?সে নিজেও বাবা ছাড়া বড় হয়েছে তার অভাব বুঝে, বাবা ছাড়া পৃথিবী কেমন সেটাও অল্পস্বল্প জানে।
মিথি শার্লিন কে চিন্তিত দেখে জিজ্ঞেস করলো,
“কি ভাবছো আপা?
শার্লিন ভাবনা থেকে বেরোলো। ওর দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোকে একটা সত্যি কথা বলবো?
মিথি আগ্রহ নিয়ে মাথা নাড়ালো। শার্লিন আশে পাশে তাকালো।মনে মনে ভাবলো দুঃখীত প্রহর ভাই আপনার কথা রাখতে পারলাম না।
রিতি পাশে ছিলো ওকে বাহানা দিয়ে সরিয়ে বলল,
“মিথি?প্রহর ভাইয়ের ডাইরিটা যে দিয়েছিলাম পড়েছিস তো পুরোটা?
মিথি আবারো নাথা নাড়ালো।বলল,
“হ্যাঁ পড়েছি।কি তীব্র সব অনুভূতি।কিন্তু তার নাম লেখা নেই একটাতেও।শুধু লেখা শুকতারা।তুমি ইঙ্গিত কিছুটা দিলেও পুরোটা খোলসা নয়। যার জন্য উনার মনে এতো অনুভূতি সে জানলে নিশ্চিত ভালেবাসতো।প্রহর ভাই নিজেকে দুঃখী মানুষ বলে। তার জীবনে সুখ হয়ে শুকতারাও কেন ধরা দিলো না এই প্রশ্নটা উপর ওয়ালার কাছে মন জানতে চায়।
“প্রহর ভাইয়ের শুকতারা তুই মিথি।
মিথির নিচু দৃষ্টি তক্ষনাৎ উপর উঠলো।তাকালো শার্লিনের দিকে।সেও চেয়ে আছে।চোখে ভাসছে সত্যির প্ররোচনা।মিথি অনেকটা অবাক না হলেও কিছুটা হয়েছে।ডাইরিতে কারো নাম না লেখা থাকলেও এক জায়গায় লেখা ছিলো ‘যার প্রিয় গোধূলি,অক্টোবরের শিউলি,বসন্তের কৃষ্ণচূড়া, বর্ষার কঁদম।সেই পুরো মানুষটাই আমার প্রিয়।নেই শুধু পাওয়ার সৌভাগ্য।
এই কয়টা লাইন নিজের সাথে মিলেছিলো কিন্তু এমন পছন্দ অন্য কারোর ও তো হতে পারে। এই ভেবে ভাবেনি তেমন।তবুও সন্দেহ থেকেই সেদিন রুমাল দেওয়ার সময় জিজ্ঞেস করেছিলাম,আমি কি হিসাবে থাকবো?উত্তর পাইনি।
“মিথি কি ভাবছিস?
“অনুভূতি যেখানে লুকিয়ে থাকে,সেখানে ভালোবাসাও বন্ধি থাকে।আমি তো বন্ধি নই। বন্ধি করতে পারতো কিন্তু তিনি তা করেননি। তবে এখানে আমারি বা কি করার আছে? পুরুষ হয়ে যেখানে বলতে ভয় পেয়েছে,সবার সামনে বলেনি আমি তবে কি করি?এখন এই মুহূর্তে কি করার আছে?আব্বার মান সম্মান ভেঙে আমি কি যাবো?
এমন দিনের জন্য আব্বা আমায় মানুষ করেনি। যদি সব ঠিক হওয়ার আগে বলতো তবুও কিছু একটা চেষ্টা চলতো।শেষ পর্যায়ে এসে তুমি আমি কি করবো?সব এলোমেলো হয়ে গেলে সম্পর্ক নষ্ট হবে।একজন মেয়ের কাছে তার বাবার সম্মান সবার আগে।
“এই মিথি শার্লিন ঘরে আয় ঘুমাবি তো।
মোহনিয়া বেগম ডাকছে।বিনু ফুফু এদিকে আসছে।মিথি চোখের কোনে থাকা জলটুকু মুছে নিলো। সে অনুভূতি তার জন্য জানার পর কেমন যেন নিজের মধ্যে অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। তার জন্য কেউ সমুদ্র সমান ভালোবাসা পুষে রেখেছে কিন্তু পাওয়ার ভাগ্য হলো না।কেন প্রহর ভাই এমন করলেন?আপনি পেলেন না আমাকেও অনুভূতির সাথে পরিচিত করিয়ে অপরাধী বানালেন? ডাইরির পাতায় লেখা ছাড়াও কিছু অনুভূতি চোখের পলকেও বুঝতে পারতাম।তবে সেই অনুভূতির নাম জানতাম না।আজ যখন জেনেছি তখন সব অনুভূতি মনে হচ্ছে আমাকে জেঁকে ধরছে।
বিনু মিথিকে নিয়ে যাচ্ছে।শার্লিন ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো।আজকের দিন গেলেও আফসোস শেষ হবে না।শার্লিন দৌঁড়ে বাড়ির ভেতরে গেলো।কিছু লোকজন জেগে আছে তারা কাজে ব্যস্ত।
“কি করতে চাচ্ছিস প্রহর?
প্রহর ব্যাগ গোছাতে গোছাতে উত্তর দিলো,
“ঢাকায় ফিরে যাবো।
“কেন?সবাই কি ভাববে?
“আমার সহ্য ক্ষমতা অসিম হলেও তাকে অন্য কারো নামে কবুল বলতে দেখার মতো ক্ষমতা হয়নি। চল তাড়াতাড়ি। এখন সবাই সামনের দিকে কাজে ব্যস্ত আমরা পিছনের দরজা দিয়ে বেরোবো।
দিন হলে যখন দেখতে পাবে না ফোন করলে কিছু একটা বানিয়ে বলবো।
পাভেল প্রহরের হাত থেকে ব্যাগটা কেড়ে নিলো। হুট করে ওকে জড়িয়ে ধরলো।
“এমন না করলেও পারতি।আজ না হোক বহুদিন পর চোখের সামনেই তো দেখতে হবে তখন কেমনে সহ্য করবি?
শক্ত প্রহর এবার নরম হলো।অবাঁধ্য কান্না দলা পাকিয়ে আঁটকে রইলো।একসময় সেই কান্না অশ্রু হয়ে ধরা দিলো। আসিফ তাকিয়ে দেখলো বাহিরে শক্ত জাহির করা মানুষটার ভেঙে পড়া।পুরুষ নাকি কাঁদেনা তবে প্রহরে কাঁদছে কেন?
প্রহর ঘড়িক পরেই পাভেলের থেকে সরে এলো। ওদের গুছানো ব্যাগ নিতে বললো। হঠাৎ তার ডাইরির কথা মনে পড়লো। চারদিকে খুঁজেও পেলো না। কোথাই গেলো? না এখন সময় নেই। তাকে নিয়ে আমার অন্তর জুড়েই রয়েছে,ডাইরির পাতায় লিপিবদ্ধ না থাকলেি চলবে।
“আমি বাহিরে দেখে আসছি কেউ আছে কিনা।
“আপনি কোথাই যাবেন প্রহর ভাই?
প্রহর দরজার কাছে যেতেই শার্লিন কে দেখতে পেলো।তার চোখ মুখ কেমন আঁধারে ঢাকা। প্রহর তার প্রশ্নে হাঁসলো। মেয়েটা তাকে বড় ভাই হিসাবে ভীষণ ভালোবাসে।এমন হয়তো আর কাউকে বাসেনা।
“ঢাকায় চলে যাচ্ছি। তাকে বঁধু রুপে দেখার সাঁধ ছিলো কিন্তু অন্য কারো বঁধু রুপে দেখার সাঁধ্য যে নেই।
প্রহর চলে গেলো।একটু পর আবার আসলো। ওদের দুজনকে বলল তাড়াতাড়ি বেরোতে। আসিফ কে আগে পাঠালো। প্রহর ছাঁদে উঠে ব্যাগ গুলো তাকে দিয়ে দিলো। তার পর দুজনেও বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো। বাড়ির পেছনে বাগান তার পরে আছে কবরস্থান।এদিকটায় বেশ অন্ধকার। কেউ তেমন আসে না রাতে। প্রহর একবার পিছনে তাকালো।রঙিন সাঁজ তার জন্য বিষাক্ত। পা বাড়ালো আর তাকালো না পিছন ফিরে।
সবাই ঘুমে আর কিছুজন তখন কাজে ব্যস্ত। তখনই হঠাৎ করে দুইতলা হতে শাহানার কান্নাভেজা চিৎকারের কন্ঠ ভেসে আসে। হঠাৎ কান্না আর গোলমেলে শব্দে বাড়ির ঘুমিয়ে থাকা মানুষ ও উঠে পড়ে। বাড়ির সব মানুষ দৌঁড়ে উপরে গিয়েছে। উপরে গিয়ে যা দেখলো তাতে সকলে স্তব্ধ। শার্লিনের মুখ দিয়ে সাদা ফেপড়া উঠছে। শরীর নিতেজ হয়ে পড়ে আছে।পাশেই খালি ঘুমোর ওষুধের প্যাকেট পড়ে আছে। সুচরিতা বেগম শার্লিনের শরীরে হাত দিলো।
মন পিঞ্জিরা পর্ব ১৯+২০
“এখনো শরীর গরম আছে তাড়াতাড়ি হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে।পিয়াস রমিজ কে ডেকে আটো গাড়ি নিয়ে আসতে বল।সকলের ছোটাছুটি চললো।মিথিও দৌঁড়ে আসলো। চোখের সামনে শার্লিনের নিতেজ শরীরটা ঘুমন্তের ন্যায় পড়ে থাকতে দেখতে পেলো।কিভাবে,কেন, কি কারণে হলো কেউই বুঝলো না বা এই সময়ে এসব ভাবার চেষ্টাও করলো না।
