জাহানারা পর্ব ১৫
জান্নাত মুন
কাজের মেয়ে লতা গিয়ে দরজা খুলতেই প্রবেশ করে একজন মহিলা আর একটা ইয়াং মেয়ে ও ছেলে।সকলের হাতে ট্রলি বেগ আর চোখে কালো রোদ চশমা। মহিলাটা দেখতে অনেকটায় নাবিলা চৌধুরীর মতো। পরনে মেরুন কালার জামদানি শাড়ি। আর উনার পেছনে দাড়িয়ে থাকা মেয়েটা একটা জিন্সের হাফপ্যান্ট আর উপরে ব্রা পড়ে আছে। দেখতে বিদেশি মনে হলেও দেশিই হবে হয়তো। ছ্যা ছ্যা ছ্যা! কত বড় নি’র্লজ্জ হলে এসব পড়ে ঘুরাঘুরি করে তাও বিডিতে? মেয়েটাকে দেখা শেষ হতে না হতেই চোখ পড়লো ছেলেটার দিকে। সারা প্যান্ট ছেঁড়া ছেঁড়া, দেখে মনে হচ্ছে ব্লেড দিয়ে একেক জায়গায় কেটে কেটে দিয়েছে। হাতে কেমন গুন্ডা দের মতো বেসলেট গলায় মোটা গোল্ডেন চেইন।
সে যাই হোক আমার মাথায় তো শুধু এটাই ঘুরছে প্যান্টের সামনে যা অবস্থা পিছনে কি একই অবস্থা? একটাবার দেখলে মনের কৌতুহল মিঠতো। তবে আর বেশি ভাবতে পারলাম না। কিছু একটা পরে যাওয়ার শব্দ কানে আসতেই নাবিলা চৌধুরীর দিকে তাকালাম। উনার চোখমুখ খুশিতে চকচক করছে।ঠাস করে হাতের চায়ের কাপটা টি-টেবিলে রেখে ছুট লাগায়। অন্যদিকে শাহরুখ খানের মতো দু হাত মেলে ধরে মহিলাটি। আমি ছাড়া সকলেই হাসি মুখে এই সিনেমা দেখছে। মহিলাটিকে প্রায় জড়িয়ে ধরবে ঠিক সে সময়ই ঘটে বিপত্তি। শাড়িতে পা বেজে মুখ থুবড়ে পড়ে নাবিলা চৌধুরী। উনি পড়ে যেতেই সকলের মুখে হাত চলে যায়।
এদিকে উনি পড়তে দেরি হয়েছে কিন্তু আমি হো হা করে উচ্চ স্বরে হাসি আরম্ভ করতে দেরি করিনি। আমার হাসির আওয়াজ শুনে সকলে ভয়াতুর দৃষ্টি আমার দিকে তাক করে। পলি আমার পাশেই ছিলো সে আমার হাতে একটা চিমটি কাটে যাতে আমি হাসি থামাই। কিন্তু আমি তো খেক খেক করে হেসেই চলেছি। আমি বুঝতে পারছি না এত ফানি মোমেন্টেও কেউ না হেসে কিভাবে আছে?
আমার হাসির আওয়াজে উক্ত মহিলাটি অদ্ভুত দৃষ্টিতে একবার আমার দিকে তাকিয়ে তারপর নাবিলা চৌধুরী কে তুলে দাঁড় করায়। নাবিলা চৌধুরী উঠে দাড়িয়েই ঘাড় বাকিয়ে আমার দিকে কটমট করে তাকালেন। তবে বেশিক্ষণ রাগ প্রকাশ করতে পারল না তার আগেই মহিলাটি আদুরে বাক্য উনার কানে পৌঁছায়,
–“Are you ok? তোর লাগে নি তো নাবু?”
মহিলাটির কথা শুনে সকলেই আমার দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে উনাদের দিকে রাখল। তবে আমার আড়ালে দু জোড়া নিষ্পলক চোখ তখনও আমারই দিকে তাক করা ছিলো। নাবিলা চৌধুরী মহিলাটির কথা শুনে কেমন আহ্লাদি হয়ে গেল। অতঃপর বলে উঠলো,
–“না দিভাই তেমন লাগে নি। লাগলে তো খুশি হওয়ার মানুষের অভাব ছিলো না।”
শেষ কথা আমার দিকে তাকিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে। আমি ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে অন্যদিকে তাকাতেই চোখ পড়ে সেই ছিঁড়া প্যান্ট পড়া ছেলেটার দিকে। কেমন অদ্ভুত ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে। আমার সাথে দৃষ্টি মিলতেই কেমন হালকা ঠোঁট প্রসারিত করলো। অদ্ভুত এই নতুন পাবলিক গুলো।
–“বিডি তে আসলে কবে? আমাকে একবার জানালেও না।”
নাবিলা চৌধুরী কথার উত্তর মহিলাটি দেওয়ার আগেই হাফপ্যান্ট পড়া মেয়েটি ঝড়ের বেগে এসে নাবিলা চৌধুরীর গলা জড়িয়ে ধরে বলে উঠলো,
–“তোমাকে সারপ্রাইজ দিবো বলেই মমকে জানাতে বারণ করেছিলাম।”
মেয়েটির নেকামির সাথে ছেলেটাও জয়েন হয়। এসব নেকামি আবার আমার সহ্য হয় না। আমি পলির কাছে ঘেষে দাড়ালাম। পলি আমার চেয়ে হাইটে একটু খাটো হওয়ায় হালকা মাথাটা নিচু করলাম।তারপর মেয়েটার কানের কাছে ফিসফিস করে শুধালাম ,
–“তুমি কি এই কাউওয়া গুলোরে চেন ?”
আমার বলা বাক্যটা পলির কানে পৌঁছাতেই সে একবার ঐদিকে তাকায়। তারপর গলা খাদে নামিয়ে বলেতে লাগল,
–“এসব কি বলছ ভাবি ? ঐ যে মহিলাটাকে দেখছ– ঐটা মা’র বড় বোন নুলক চৌধুরী। আর ঐ যে ছেলে মেয়ে দুটো– তারা আমাদের খালা শাশুড়ির ছেলে পঙ্কজ আর নোহা। আমাদের শাশুড়ীর চেয়েও সাংঘাতিক এই মহিলা। কাকিয়া বলেছে উনারা লন্ডন থাকেন তবে প্রতি বছরই কয়েকবার দেশে আসেন।আর এই বাড়িতে কয়েকদিন থেকে শাশুড়ি মাকে ভালো ট্রেনিং দিয়ে যায়। নুলক আন্টির সেই কি তেজ তুমিও বুঝতে পারবে। আর জানো না তো– নোহা এখানে আসলে আমাকে কিভাবে যে খাটায় মনে হয় আমি এ বাড়ির কাজের মেয়ে। আমার বিয়ের এক সপ্তাহ পরেই এখানে তারা আসে।তার পর সবাই মিলে আমাকে কত কথা শুনিয়েছে।আমি ছোটলোক তাদের বড় ঘরের ছেলেকে ফাঁ’সিয়েছি আরও কত কি।
–“তার মানে আমার কাজটা এত ইজি হবে না।”
আমি অস্পষ্ট ভাবে বললেও পলির কান পর্যন্ত পৌঁছায়। সহসা সে শুধায়,
–“কোন কাজের কথা বলছ ভাবি?”
–“নাথিং।”
এদিকে নুলক চৌধুরী ইকবাল চৌধুরী কে গিয়ে হালকা জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করে ,
–“কেমন আছ বড় ভাইয়া?”
ইকবাল চৌধুরী নুলক চৌধুরীর মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন,
–“আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। তুমি কেমন আছ?”
–“আলহামদুলিল্লাহ তোমাদের সকলের দোয়ায় ভালো আছি।”
তারপর ইরহাম চৌধুরী আর মনিরা বেগমের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে। মনিরা বেগম কিচেনে আর ইতি দৌড় লাগায় দাদির ঘরের দিকে। তারা চলে যেতেই নাবিলা চৌধুরী উনাদের সোফায় বসতে বলেন।এদিকে আমি আর পলি আগে থেকেই সেখানে দাঁড়িয়ে। উনারা এদিকে আসছেন যে সোফাটায় বসবে সেখানেই তাড়াতাড়ি নিজের জায়গা নিয়ে পায়ের উপর পা তুলে বসে পড়ি। আমার এমন কান্ডে সকলেই ক্ষিপ্ত হলেও আমি চিল মুডে। আমার কাজেই তো তাদের জ্বা’লানো। ওনারা এদিকে আসতেই পলি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলে নুলক চৌধুরী মৃদু হাসলেন, তবে কথা বলার প্রয়োজন মনে করলো না। তিনি আমার সামনের সোফাটায় বসলেন ঠিক আমার মতো করে পায়ের উপর পা তুলে। আমার দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে আছে মনে হচ্ছে আমি ওনার প্রতিদ্বন্দ্বী। তখনই পঙ্কজ নামক ছেলেটা আমার পাশে সোফায় বসে।এমন ভাবে বসেছে যে আরেকটু হলে আমার শরীরের সাথে লেগে যাবে। আমি চোখ গরম করে সেদিকে তাকাতেই দেখলাম এমন ভাবে সোফায় শরীর হেলিয়ে বসে আছে যেন পাশের মানুষটাকে দেখতেই পাচ্ছে না।
–“হোয়াট দ্যা হ্যাল?”
আমি আচমকা দাড়িয়ে চোয়াল শক্ত করে বাক্যটা বললাম। লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট প্রসারিত করে বললো,
–“নাইস।”
আমি লোকটার দিকে আঙ্গুল তুললাম, কয়েকটি অ’শ্রাব্য কথা শুনানোর জন্য মুখটা ফিসফাস করছে। কিছু বলতে যাব তার আগেই নোহা মেয়েটা আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। চোখের সানগ্লাসটি নাকের ডগায় এনে দু হাত বুকে ভাজ করে আমাকে উপর থেকে নিচ একবার পরখ করে । তারপর চোখের সানগ্লাসটা চোখ থেকে খুলে সোফায় ছুড়ে ফেলে দেয়। বিদঘুটে হেসে নাবিলা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলে,
–“মিমি সি ইজ জা হা না রা?”
নাবিলা চৌধুরী কিছু বললেন না তিনি তার বড় বোনের দিকে তাকালেন। অতঃপর তারা দৃষ্টি বিনিময় করে নিঃশব্দে হাসল। আমি সব কিছু লক্ষ করছি।নাবিলা চৌধুরীর সাথে দৃষ্টি মিলতেই চোখ উল্টে অন্য দিকে তাকালো। আমি মনে মনে ভাবতে লাগলাম, আমাকে দেওয়া ইনফরমেশনই ঠিক। নাবিলা চৌধুরীর দলটা একটু বড়ই। হোয়াট এভার সব জায়গায় দল দিয়ে কিছু হয় না। মগজটাও একটু খাটাতে হয়। এরই মাঝে নোহা সকালের মাঝ থেকে দৌড় লাগায়। অনেকক্ষণ ধরে উপর থেকে এসব নাটক দেখছিলো ইফান চৌধুরী। ফরমাল ড্রেসে মনে হচ্ছে কোথাও বের হচ্ছিল সবে। নিচে নামতেই নোহা তাকে দেখে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে।
–“বেইবি, আই ক্যান্ট বিলিভ উইয়ার মিটিং আফটার সো লং!”
নোহা ইফানের বুকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে বলতে থাকে।আমি অনুভূতিহীন ভাবে সেদিকেই তাকিয়ে। ইফানও আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তার ঠোঁটের কোণে সেই ক্রুর হাসি। ইফান কোনো উত্তর করলো না বরং নোহায় আবার তাকে ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। অভিমানী সুরে বলে,
–“ডু ইউ নো, বেইব– হাউ মাচ আই ওয়াজ মিসিং ইউ? উই হ্যাভেন্ট মেট ফর দ্য লাস্ট থ্রি মান্থস। এভরিথিং ফেল্ট বোরিং উইদাউট ইউ।”
নোহার কথা শুনে ইফান আমার দিক থেকে চোখ সরিয়ে নোহার কানের কাছে ফিসফিস করে বলে উঠলো ,
–“আই নো বেইবি, হাউ মাচ ইউ মিসড মি। সেই জন্যই তো এভরি ডে বারে গিয়ে ছেলেদের সাথে রুম ডেট করতে।”
ইফানের কথায় মেয়েটা হেসে উড়িয়ে দিলো।মেয়েটাও তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলে উঠলো ,
–“বাট নো ওয়ান কুড গিভ সার্ভিস লাইক ইউ, ডার্লিং।”
অতঃপর দুজনেই হো হো করে হেসে দিলো। তাদের হসার কারণ আমরা কেউ বুঝিনি। ইফান নোহার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আমার দিকে তাকালো। তখনও আমি নিস্প্রভ ভাবে তার দিকে তাকিয়ে। সে আমাকে চোখ মে’রে ঠোঁট গোল করে চুম্মা দেখালো। আমি আর এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না এসব লু’চ্চামি দেখার জন্য। তাই চলে যেতে নিলাম। সিঁড়ি দিয়ে যাওয়ার সময় কাঁধ দিয়ে নোহাকে ধাক্কা মা’রলাম। কারণ পুরো সিড়ি তাঁরাই দখল করে ছিল।তাদের কে যখন ক্রস করে গেলাম তখনই হাতে টান অনুভব করি। ঘাড় কাঁধ করে পিছনে তাকাতেই দেখলাম ইফান আমার হাত ধরে রেখেছে। এদিকে নোহা চোখ সরু করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে যেন ইফান থাকায় কিছু বলতে যেয়েও পারছে না। অযাচিত কারণে রাগে সারা শরীর জ্ব’লছে। চোয়াল শক্ত করেই রেগে ইফানের দিকে তাকালাম। ইফান হালকা হেসে আমাকে আবার সবার মাঝখানে নিয়ে দাঁড় করালো। নুলক চৌধুরীর কাছে যেতেই তিনি হালকা হেসে জিজ্ঞেস করলো,
–“হাউ আর ইউ বেটা? কয়েকমাস ধরে তো তোমাকে খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছিলো না। এন্ড সো, আমার মেয়েটা অস্থির হয়ে থাকতো অলটাইম।”
–“রিয়েলি আন্টি! তাই বুঝি মেয়েকে স্থির করতে ক্লাবে পাঠাতেন?”
ইফান হেসে হেসে কথাটা বললেও নুলক চৌধুরীর মুখটা চুপসে যায়। ইসস চেহারাটা দেখার মতো ছিল। আমি ঠোঁট চেপে হাসতে গিয়েও গলা দিয়ে আওয়াজ বেরিয়ে আসে, তখনই আবার উনার সাথে চোখাচোখি হয়। অদ্ভুত মহিলা, চোখে কিছু একটা তো আছেই যা ভিষণ অস্বস্তিকর, তবে প্রকাশ করলাম না। ইফানের আরেকটি হাত ধরে আছে নোহা। অতঃপর নোহা আর তার মাকে দেখিয়ে বলে,
জাহানারা পর্ব ১৪
–“বাই দ্যা ওয়ে, লুক সি ইজ মাই ঝাঁঝওয়ালি থুরি ঘরওয়ালি জাহানারা শেখ। আমার দশটা না পাঁচটা না একটা মাত্র তেজি টুশটুশে বউ।”
তারপর আমায় নোহাকে দেখিয়ে বললো,
–“এই হচ্ছে আমার মিমি নুলক চৌধুরীর মেয়ে, মানে তোমার না হওয়া সতিন।”
তারপর আমার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলে উঠলো,
–“ননদিনী ভেবে একদম ভুল করো না জান। ঐ শালি তোমার পেয়ারের স্বামীর খাওয়া জিনিস।”
