জাহানারা পর্ব ১৬
জান্নাত মুন
বর্ষাকালের মাঝামাঝি সময়, আষাঢ় গিয়ে শ্রাবণ পড়েছে সবে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার বৃষ্টি হয়নি বললেই চলে। কদিন ধরেই ক্ষণে ক্ষণে উত্তর দিক দিয়ে ধমকা হাওয়া বইছে। মাথার উপর বিশালাকার নীল আকাশটা কখনো কালো মেঘে ছেয়ে যাচ্ছে তো কখনো আঁধার কাটিয়ে সূর্যের তীর্যক রশ্মি পৃথিবীতে আসছে। পর্যাপ্ত বর্ষণ না হওয়ার ফলে দেশের বেশ কয়েকটি অঞ্চলে খরা দেখা দিয়েছে। আকাশের ঘন কালো মেঘগুলো সবুজে ঢাকা প্রকৃতিটাকে লোভ দেখিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।
আসরের নামাজ পড়ে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছি।আজকাল অন্তরে বড্ড বেশি দহন হয়। যখনই আমার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করি তখনই আতংক ধরে যায়। আমার যখন সতেরো বছর চলছে তখন দাদি আমাদের সবাই কে ছেড়ে চলে যান। তবে মারা যাওয়ার আগে সবসময় বলতেন জাহান বুবুরে সাবধানে থাকিস। আমাগো বংশে কার জানি কু নজর লাগছে। এই যে দেখনা আমার ফুলের মতো একমাত্র মাইয়াডা অকালে ঝইরা গেল। দাদির কথাগুলোই এখন সত্যি মনে হচ্ছে। আমি আঠারো তে পা দেওয়ার সাথে সাথেই জীবনের মোড় পালটে যায়।আর তখন থেকেই সহজ জীবনটা দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায়। তার মধ্যে ইফান চৌধুরীর আগমনটা সবচেয়ে ভয়ংকর। লোকটাকে এতদিনে বিন্দু মাত্র বুঝে উঠতে পারলাম না। শুধু মনে হয় অনেক রহস্যই তার মধ্যে লুকিয়ে আছে যা আমার কল্পনার বাহিরে।
আয়নার সামনে দাড়িয়ে কোমর পর্যন্ত লম্বা ঘন কালো চুলগুলোকে লুজ করে আলগোছে খোপা করে, বাহুতে শাড়ির আচলটা তুলে নিলাম। গলায় বেশ কয়েকটি জায়গায় অ’স্বস্তিকর দাগগুলো এখনো দৃশ্যমান। আমি ফেইস পাউডার জায়গাগুলো তে লাগানোর সময় ভেসে উঠল সকালের দৃশ্যটি।ইফান নুলক চৌধুরী আর নোহার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেও পঙ্কজ ছেলেটার সাথে দেয়নি। বিধায় ছেলেটা নিজেই আমার দিকে হেসে হাত বাড়িয়ে দেয়।
–“হেই বিউটিফুল আ’ম পঙ্কজ। সবাই ভালোবেসে পঙ্কি বলে ডাকে। তুমিও না হয় ভালোবেসে প…”
বাকিটা আর উচ্চারণ করতে পারে নি, তার আগেই ইফান তার ঠোঁটে আঙ্গুল দেখিয়ে চুপ করিয়ে দেয়। অতঃপর বলে উঠে,
–“সসস প্রেম ভালোবাসা আমার আর আমার বউয়ের কারোর ডিকশনারীতেই নাই। আমরা দু’জনেই গভীর জলের মাছ ।এখন আবার তুইও ঐখানে ডুব দিতে আসিস না।”
এইটুকু বলে ইফান সবাই কে একবার আড় চোখে দেখে পঙ্কজকে হিসহিসিয়ে বলে,
–“বাই এনি চান্স ঐ সাহসটা যদি দেখাতে চাস, তাহলে তর এটা সারাজীবনের জন্য শুইয়ে দিবো। সো বি কেয়ারফুল।”
কথাটা বলার সময় ইফান পঙ্কজের মেইন পয়েন্টে হালকা থাপড়ে বুঝায়। এটা কারো চোখে না পড়লেও আমার দৃষ্টি এড়ায় নি। কত বড় ব’জ্জাত লোক ভাবা যায়। অতঃপর ইফান পঙ্কজকে চোখ মেরে বাহুতে আলতো করে চাপরে ঠোঁট বাঁকায়। পঙ্কজের মুখটা কালো হয়ে গেলেও তৎক্ষনাৎ আবার হেসেও দেয়। কিছু বলবে তার আগেই ইফান এক হাত পেন্টের পকেটে ঢুকিয়ে আরেক হাত দিয়ে আমার কোমর ধরে শিস বাজাতে বাজাতে আমাকে রুমে নিয়ে চলে আসে।
অযাচিত কারণে লোকটা বড্ড বেশি রেগেছিল। সকালের সামনে প্রকাশ না করলেও আমাকে একা পেয়ে সব রাগ ঝেরেছে। রুমে নিয়ে এসেই শক্ত থাবায় আমার গলা চেপে ধরে। আমি কি বসে থাকার মেয়ে? নিউটনের তৃতীয় সূত্রের মতো বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে বসে থাকবো! আমিও শক্ত করে ওর ঘন সিকলি কালো চুলগুলো দু হাতে মুঠো করে নিই। আমার এমন কাজে সে কখনোই রেগে যায় না। এবারো তাই হলো, জিহ্বের ডগা দিয়ে গাল ঠেলে নিঃশব্দে হাসে। অতঃপর দেয়ালের সাথে আমাকে মিশিয়ে সেও আমার সাথে অবশিষ্ট দূরত্ব ঘুচায়।
–“স্বামীর সাথে রাতে জম্পেশ কালা পিরিতি করেছ এটা লোক দেখানো মন্দ না। বরং লোকে আমার ছোট ভাইয়ের বীরত্বের প্রশংসা করবে। কিন্তু পর পুরুষের সামনে টইটই করবে এটা আবার কোন বা’ল ফালানির কাজ বউ।”
আমিও ইফানের কথায় চোখ সুরু করে জিহ্বার ডগা দিয়ে গাল ঠেলে ওর মেইন পয়েন্টে তাকিয়ে চিন্তিত ভঙ্গিমায় বলে উঠলাম ,
–“আপনার ছোট ভাই আবার কোন জীবনে বীরত্বের কাজ করলো? ঐটা তো কাপুরুষের মতো কাজ করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না।”
ইফান আমার দৃষ্টি অনুযায়ী সেখানে তাকিয়ে আচমকা পেন্টের চেইন খুলে দিলো। আমি ওর এমন কান্ডে চরম আশ্চর্য । মুখের কথা শেষ না করে তৎক্ষনাৎ দৃষ্টি সরিয়ে ওর দিকে তাকাতেই দেখলাম ঠোঁট কামড়ে হাসছে।
–“অসভ্য।”
–“আরে বউ নিচে দেখ।”
ঠোঁট কামড়ে হাসার ফলে সমান তালে তরঙ্গায়িত হচ্ছে ইফানের প্রসস্থ ঢেউ খেলানো বুকটা।
–“কি হলো একবার দেখই না– ছোট ভাই কাল রাতের পর থেকে কেমন যেন গ্লো করছে।”
আমি কোনো দিক না ভেবেই বোকার মতো ঐখানে তাকাতেই হো হো করে হেসে উঠে। আমি হতবাক নয়নে ইফানের দিকে তাকিয়ে। এটা কি ধরনের মানুষ ভেবে পাচ্ছি না। ইফানের নির্ল’জ্জতার কোনো লিমিট নেই। হাসতে হাসতে আবার জিপার টেনে নিল।আমার কোমরের শাড়ির উন্মুক্ত ভাজে হাত ঢুকিয়ে তার সাথে চেপে ধরে। এই মূহুর্তে আমি বাকহীন।অবশ্য তেমন কিছু দেখি নি। ব্ল্যাক কালার জাঙ্গিয়াটা ছাড়া।
–“আজকেও কি ঐ দিনের মতো সোনার বাংলা দেখতে চেয়েছিলে বউ? ওকে তবে এখন সময় নেই রাতে এসে দেখাবো কেমন। আর হ্যা আসার সময় সান্ডার তেল নিয়ে আসবো কি বল ?”
কথাটা বলেই চোখ মা’রলো। আমি ইফানের হাতের বাঁধন ছাড়াতে ছাড়াতে দাঁত কটমট করে আওড়ালাম,
–“শালা খা”ইষ্টা।”
ইফান বাহিরে যাওয়ার আগে আমার ঠোঁটে গাঢ় চুম্বন এঁকে দেয়। অতঃপর কড়াভাবে বলে যায়– সে আসার আগে যেন রুম থেকে না বের হই। তার দৃষ্টি নাকি সবসময় আমার উপর থাকবে। আমি বুঝতে পারি না ও আসলে কি চায়? কেন আমার সাথে এত সহজ। কিন্তু আমি তো জানি সে যা দেখায় তা না, তাহলে?
এসব ভেবে ভেবেই এতগুলো দিন এই বাড়িতে কেটে গেল। মনের ভিতর হাজারো চিন্তা ঘুরপাক করে। যতই সমীকরণ মিলাতে বসি অতঃপর সেই একই জায়গায় আটকা পরে যাই। তখনই ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসে। আমার এই জটিল সমীকরণ না মিললে আজীবন আটকা পড়ে থাকতে হবে শ্বাসরুদ্ধকর এই কাল কুঠুরিতে।
ইফান চলে যাওয়ার পর আমি আর রুম থেকে বের হইনি। আজ ভেবেছিলাম ভার্সিটি যাবো। তা আর হলো কই? কোথা থেকে কতগুলো কাউয়া উড়ে এসে জুড়ে বসেছে আমার রাতের ঘুম হারাম করার জন্য।
দুপুরে আমাকে নিচে নামতে না দেখে পলিই রুমে এসে খাবার দিয়ে যায়। বেশ কিছুক্ষণ সে আমার রুমে ছিল। তখন জানতে পারি নুলক চৌধুরী আর নাবিলা চৌধুরী ইকবাল চৌধুরীর চাচাতো বোন ছিলেন। তখন আমি পলিকে শুধাই,
–“ওমা আমি এখানে এতদিন ধরে আছি একবারো তো বললে না কেউ?”
–“তুমি তো জিজ্ঞেসই করনি কখনো তাই আরকি বলা হয়নি।”
পলির কথাতেও যুক্তি আছে। এই বাড়ির মানুষগুলোর সাথে আমিই সেইসব নিয়ে কখনো কথায় বলি নি। কিন্তু অনেকবার মনে প্রশ্ন এসেছে নাবিলা চৌধুরী কিভাবে ইকবাল চৌধুরী কে বিয়ে করেছিলো। এখন কাজিন জানার পর, জানার ইচ্ছেটা আরো প্রবল হলো।
–“আচ্ছা পলি তুমি কি জান কিভাবে মা আর বাবার বিয়ে টা হয়েছে?”
–“আমার বিয়ের সাত কি আট মাস হয়েছে। তুমি তো জানই বিয়ে টা একটা দূ’র্ঘটনা ছিলো। তাই অন্যদের মতো এতটা স্বাভাবিক ভাবে এখানো সবার সাথে মিশতে পারি নি। ঐজন্যই কাউকে কখনো কিছু জিজ্ঞেস করে উঠতে পারি না। তবে জান ভাবি আমারো জানার খুবই ইচ্ছে। কিভাবে কি হলো।”
অনেকক্ষণ আমরা গল্প করি। তারপর পলি চলে যায় নিচে। সকালে ইতি গিয়ে দেখে দাদি অসুস্থ। এর পর থেকেই দাদিকে নিয়ে সকলে ব্যস্ত দিন পার করছে।নুলক আর নাবিলা চৌধুরী সকাল থেকেই দাদির কাছে আছে। আমারও মন চাচ্ছিলো না তাদের সামনে যাবার। আবার ইফানও কড়াকড়ি বলে গেছে সে আসার আগে নিচে যেন না যাই। আমি তো তার বাধ্য বউ নই যে তার কথা শুনবো।
এই বাড়িতে নাবিলা চৌধুরীই আমাকে দেখতে পারতো না। আর বাকি সবাই আমার সাথে সহজ ছিল। সবার থেকে দাদি একটু বেশিই। তিনি সব সময় আমাকে এটা সেটা বুঝায় কিভাবে সংসারের হাল ধরতে হয়। মোট কথা যথেষ্ট স্নেহ করেন। তাই নিচে যাওয়ার ইচ্ছে না থাকলেও দাদির জন্য রুম থেকে বের হলাম। এই চৌধুরী বাড়িটা বিশাল বড়। বাড়ির নিচ তলায় দাদি আর নাবিলা চৌধুরীর রুম। আর বাকি সবাই দু তলায় আর তিন তলায়। নাবিলা চৌধুরীর রুম আর তিন তলায় চাচা শ্বশুরের দুই ছেলে মেয়ের রুমে কখনো যাওয়া হয়নি। তাদের সাথে অবশ্য এখনো সামনাসামনি দেখায় হয়নি।পড়াশোনার জন্য ইউএস এ থাকে।
আমি সিঁড়ি দিয়ে নামছি ঠিক তখনই পঙ্কজ ছেলেটার সাথে মুখোমুখি হই। আমি এক পলক তাকিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিলাম। লোকটার তাকানোটা একটা মেয়ের জন্য ভীষণ অস্বস্তিকর। আমি সাইট দিয়ে চলে যেতে নিলে রাশভারি পুরুষালী কন্ঠ কানে আসে,
–“এইভাবে তাকালে কিন্তু কারো কারো রাতের ঘুম হারাম হয়ে যেতে পারে, ভাবি জান।”
আমি পিছন ফিরে একবার লোকটার মুখের দিকে তাকালাম। পঙ্কজ মুচকি হেসে হেসে চুইংগাম চিবাচ্ছে। আমি এরকম অচেনা লু’চ্চা টাইপের লোকের সাথে কথা বলতে চাইলাম না। বিয়ের পর থেকে মুখটা কেমন জানি আস্তাগফিরুল্লা মার্কা হয়ে গেছে। ভালো কথা বের হতেই চায় না। মুখের আর দোষ কি? লোক বুঝেই মুখ নিজেই খুলে যায়। কিন্তু এখন মুখ খারাপ করলে চলবে না। একটু আগেই নামাজ কালাম পড়ে এসেছি। আমি একটা সিঁড়ি নামতেই আবার পঙ্কজের গলার স্বর ভেসে আসে,
–“ইফান কি এখনো রুমে?”
আমি আবার থামলাম। ঘাড় ঘুরিয়ে সুক্ষ্ম নজরে তাকাতেই পঙ্কজ বলে উঠলো,
–“না মানে তোমার রুমের দরজা বন্ধ ছিলো তো তাই।”
আমাকে লু’চ্চা চাউনি দিয়ে স্কেন করতে করতে বাক্যটি আওড়ায়। আমি এবার শিউর শা’লা বিশাল বড় খা’ইষ্ঠা। ভালো ব্যবহার এদের আবার শরীর চুলকায়। আমি মুখ না খুললে তো লাই পেয়ে বসবে।
–“আরে ভাবি তুমি,,,”
জাহানারা পর্ব ১৫
রান্না ঘর থেকে দুধের গ্লাস হাতে নিয়ে বোধহয় দাদির রুমের দিকে যাচ্ছিল পলি। আমাকে সিঁড়ি তে দেখেই এদিকে আসে। তবে এখানে পঙ্কজ ছেলেটাও আছে তা আশা করে নি। কেমন অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো মেয়েটা। পলির উপস্থিতিতে পঙ্কজ আমার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পলিকেও স্কেন করে নিল। যা আমি লক্ষ করে পলির কাছে গেলাম। ওকে নিয়ে দাদির রুমের দিকে যাবো তার আগে আবার পিছনে তাকালাম। লোকটা একই ভাবে চুইংগাম চিবাতে চিবাতে এদিকেই তাকিয়ে শ’য়তানের মতো হাসছে। আর সময় নষ্ট না করে পলির সাথে যেতে যেতে ছাড়লাম এক অ’শ্রাব্য গালি,
–“আমার কুড়ি বছরের অবিজ্ঞতায় এমন বাইনচো”দ দেখি নি।”
