Home মন পিঞ্জিরা মন পিঞ্জিরা পর্ব ৬

মন পিঞ্জিরা পর্ব ৬

মন পিঞ্জিরা পর্ব ৬
শ্যামলী রহমান

সকাল থেকে প্রচন্ড বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে।থেকে থেকে জোরে বাজ ও পড়ছে। হুট করে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামলো, ভিজিয়ে দিলো মাটির বুক। ঝড় হওয়ায় আঁচড়ে পড়ছে গাছের ডালপালা সাথে গাছের আম জাম। বৃষ্টির রেশ বেশি হচ্ছে তত আরো আনন্দে মেতে উঠছে কৃষক।কিছু দিন যাবত না বৃষ্টি হওয়াতে মাঠে পানি নেই।ধান ক্ষেত শুকিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা।সেঁচ ব্যবস্থা থাকলেও বৃষ্টি পানি বেশি উপকারি। মিথি ঘরের জানালা দিয়ে উঁকি দিচ্ছে ঝড় হওয়া থামছে কিনা। বাজ না পড়লে মিথি এতক্ষণে দৌঁড় লাগাতো বৃষ্টিতে ভিঁজতে। বিদ্যুৎ চমকালে মিথি প্রচন্ড ভয় পায় তাই বাঁধ্য হয়ে ঘরে বসে আছে। ঘর থেকে দেখছে বাহিরের তাদের আম গাছ থেকে অনেকগুলো আম পড়েছে। বাগানে নিশ্চয়ই আমে ভরে আছে। ঝড় আসলেই কত আম পড়ে থাকে লাভের থেকে ক্ষতি হলেও আবুঝ মনে সেটাই বড় আনন্দময় মনে হয়।
রিতি তাদের বারান্দা থেকে ডাকছে,“ মিথি আপাা।মিথি রিতির ডাক শুনে বাহির হলো বারান্দায়।মাথা উঁচু করে দেওয়ালের ওপাশে থাকা রিতির উত্তরে বলল,

“ হ্যাঁ বল।কি হয়েছে?
রিতি চেয়ারে উঠে দেওয়াল উপরে উঠে মিথিকে দেখতে পেলো। আশে পাশে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“চলো বৃষ্টিতে ভিঁজি আর আম কুড়িয়ে আনি। হামিদ চাচার আম বাগানের আমগুলো বেশি মিষ্টি কাল নাফিজ একটা চুরি করে এনে দিয়েছিলো।ঝাল ঝাল আম মাখা করলে বেশ জমবে।
মিথি মাথা বাড়িয়ে আকাশের দিকে তাকালো।বৃষ্টির রেশ কমেনি। বাজ না পড়লেও মাঝে মধ্যে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে।বাজ এবং বিদ্যুৎ চমকানো দুটোই ভয় পায় সে।তাই বলল,

“ আম্মা দেখতে পেলে তো যাইতে দিবে না। আগেরবার বৃষ্টিতে ভিজে কি জ্বর বাঁধালাম দেখিসনি?আম্মা কেমন বকেছিলে শুনিসনি?
তবুও যাবো কিন্তু বৃষ্টি একটু কমুক,ঝড় হওয়া স্থির হোক।একটু অপেক্ষা করি।
রিতি মাথা নাড়ালো।আবারো আগের মতো ধীরে বলল,“ ডাক দিও আমি এখানেই আছি।আম্মা যেন শুনতে না পায়।
“কি রে রিতি ওখানে কি করছিস?
রিতি তার মায়ের প্রশ্ন থতমত খেলো।মিথিকে বলল,
“আম্মা ডাকছে।আমি কিছু একটা বলে কয়ে আসি।
বলেই মিথি নেমে পড়লো।দৌঁড় লাগালো মায়ের ঘরে।
মিথি তার কান্ডে হাঁসলো।বয়সে ছোট হলেও একসাথে দুজনের সময় কাঁটে,কখনো পুকুর পাড়ে বসে,কখনো বা পুরো গ্রাম চষে।

প্রহর নিজের ঘরে বসে বই পড়ছে। প্রায় সকলে সকালের খেয়ে ঘুম দিয়েছে। এই বৃষ্টির মধ্যে কোথাই বা যাবে?বৃষ্টির দিনে ঘুম যেমন আরামের,তেমনই বই প্রিয় মানুষদের জন্য বৃষ্টির দিনে বই পড়াও একটা উপভোগের জন্য সময়। প্রহরের হাতে হুমায়ুন আহমেদের কেউ কোথাও নেই বইটি রয়েছে। এই বইটা সে কয়েকবার পড়েছে তবুও ভালো লাগে,তাই পড়ে।কোথাও একটা বাঁকের ভাইয়ের সাথে সে নিজের মিল পায়।বাঁকের ভাই যেমন পায়নি তার মুনা কে,হয়তো সেও পাবে না তার প্রিয় নামে ডাকা শুকতারা কে।বাঁকের ভাইয়ের ফাঁসি যেমন কাঁদিয়েছে সবাই কে, আমার মন কে কাঁদাবে কেবল সে।পার্থক্য শুধু এতটুকু বাঁকের ভাই মৃত আর সে জীবিত নামক হয়ে পৃথিবীতে রয়ে যাবে।প্রহর এবার বই খানা বন্ধ করলো।জানালা খোলা রেখেছে যার কারনে হওয়া এসে বইয়ের পাতা লন্ডভন্ড করে দিচ্ছে। বই বন্ধ করে দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লো। ঘরের কোনে থাকা তার মায়ের ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকলো।কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর নিজ মনে আওড়ালো,

“তুমি কেন চলে গেলে?তুমি থাকলে আমার জীবনটা আজ অন্য রকম হতো,কাউকে হারানোর ভয় তাড়া করে বেড়াতো না,কেউ সিমান্তের তারকাঁটা বিছিয়ে দিতো না।পরিবার হীন ছেলে হয়ে বাঁচতে হতো না।ভালোবাসার মিথ্যে জাঁলে ফাঁসতে হতো না।
পৃথিবী বড় নিষ্ঠুর মা।তুমি ব্যতীত কেউ নিঃস্বার্থ ভাবে ভালোবাসে না।
“প্রহর বাবা,আছিস?
প্রহর চোখের জল টুকু লুকিয়ে ফেললো।দুহাতে চোখের জল মুছে নিলো।দরজার কাছে সুচরিতা বেগম কে দেখে হাসিমুখে জানতে চাইলো,
“হ্যাঁ বলো মামি মা। কিছু দরকার?
“হ্যাঁ দেখনা বাবা তোর মামা জমির আইল কাঁটতে পাশেই মাঠে গেলো।ছাতা নিয়ে যায়নি বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর বাঁধাবে।
এই ছাতা টা দিয়ে আয় তো। কত করে বললাম ছাতা নিয়ে গেলো না। মানুষ টা কথা শোনোনা।পরে দেখবো অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকবে। তখন আমাকেই যত্ন করতে হবে।
প্রহর তাদের ভালোবাসা আর সুচরিতা বেগমের যত্ন দেখে মুগ্ধ হয়। ভালোবাসা আসলেই সুন্দর। মানুষটা সুন্দর মনের তাই তো সবাই কে আগলে রাখে, ভালোবেসে আপন করে নেয়।
প্রহর ছাতাটা নিলো।হেসে বলল,

“তুমি সেবা করো বলেই মামা অসুস্থ হয়ে যায়।ছাতা নিয়ে গেলে জ্বর বাঁধবে না, যত্ন পাবেনা তাই নিয়ে যায়নি বুঝছো?
সুচরিতা বেগম মুঁচকি হাসলো। মুখে আঁচল চেপে হাসি আড়াল করলো।প্রহর যেতে নিয়েও আবারো আসলো সুচরিতা বেগম আসতে দেখে বললো,
“কিছু বলবি?
প্রহর আশে পাশে তাকালো। কেউ নেই এটাই সময়।
“প্রীতি আপার সাথে কথা বলবে?
সুচরিতার চোখ চিকচিক করে উঠলো। কতদিন হলো মেয়ে কে দেখা তো দূর কথাও বলেনি। যেদিন সবার বিরুদ্ধে গিয়ে সে ছেলের হাত ধরে বেরিয়ে গেলো সেদিন থেকে তার নাম ও এ বাড়িতে কেউ নেয় না।শমসেরে দেওয়ান এবং তার সব ছেলেদের একই মত। যে মেয়ে বংশের নাম ডুবিয়েছে আবার একটা নিচু ঘরের ছেলের হাত ধরে চলে গিয়েছে তার নাম উচ্চারণ হবে না। সেই থেকে দশ বছর কেটে গিয়েছে মেয়ের সাথে যোগাযোগ হয়নি। সুচরিতা চকচকে অশ্রুসিক্ত চোখে বলল,

“তোর সাথে ওর যোগাযোগ হয়?
“হ্যাঁ আপা তো ঢাকায় থাকে। ভাগ্যের যেরে একদিন ভার্সিটি থেকে ফেরার পথে দেখা হয়েছিলো কিছু মাস আগে।তোমরা যাকে অবহেলা বেকার, নিচু ঘরের বলে মেনে নাওনি।সে আজ সরকারি চাকরি করে।প্রীতি আপা সুখে আছে তার স্বামী সন্তান নিয়ে। জানো পিচ্চিটা একদম আপার মতোই দেখতে। আপা যখন বলল আমি তার মামা হই।কি সুন্দর মিষ্টি কন্ঠে ডাকছিলো ‘মামা’ বলে।
সুচরিতা বেগম যেন আরো নরম হয়ে গেলো।চোখের কোনে টইটম্বুর করছে জল।ভয়ে কিছু বলতে পারেন না।চোরা চোখে ভয়ে আশে পাশে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“একবার কথা বলিয়ে দে।কতদিন কথা বলিনা মেয়েটার সঙ্গে।
“এখন না রাতে কথা বলাবো।এখন আমি যাই।
প্রহর তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেলো।

সুচরিতা বেগম খুশি হলো।আরেকটা কিছু বলার জন্য উদ্বত হলো কিন্তু প্রহর ততক্ষণে সিঁড়ি বেয়ে নামছে।তাই আর পিছু ডাকলো না চলে গেলো নিজের ঘরে।প্রহর নামতেই হুট করে সানিয়া ইচ্ছে করে ধ্বাক্কা দিলো।
কিছুটা গায়ে ঢলে পড়ার মতো হতেই প্রহর ছিটকে সরে আসলো। প্রহর বুঝতে পারলো সে ইচ্ছে করে ধ্বাক্কা দিয়েছে। রাগে দাঁত চেপে কিছু বলতে নিবে তার আগেই সানিয়া নেকামো করে বলতে লাগল,
“ দুঃখীত দেবরজি।আসলে দেখতে পাইনি। তুমি আবার অন্য কিছু মনে করো না।আমি কিন্তু তোমায় দেখতে পাইনি।এরকম আরো অনেক কথা বলে ভালো সাঁজার চেষ্টা করলো।প্রহরের ভ্রু কুঁচকে এলো।সানিয়ার চোরা দৃষ্টি লক্ষ্য করে বাম সাইডে তাকালো। দেখলো মিলন দাঁড়িয়ে আছে দৃষ্টি তার এদিকেই। এবার বুঝলো তার এমন নেকামোর অর্থ। মিলন তখনই উপস্থিত হলো, জিজ্ঞেস করলো,

“কি হয়েছে?
“তোমার বউকে জিজ্ঞেস করো। তোমার বউ যা ভদ্র আর এতো ভালো কি বলবো।কোথা থেকে পেলে এমন রমনী?
মিলন সানিয়ার দিকে তাকাতেই বলল,
“তেমন কিছু না। ভুল করে ধ্বাক্কা লেগেছিলো তাই। তুমি যাও প্রহর কোথায় যাচ্ছিলে।
প্রহর চলে গেলো সানিয়া মিলনের সাথে ঘরে যেতে যেতে একবার পিছনে তাকালো। প্রহরের দিকে হিংস্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মনে মনে কিছু কথা আওড়ালো যা সে ব্যাতিত কেউ জানলো না।
আজ বৃষ্টির কারনে মানিক সাহেব দোকানে যায়নি। অন্য কর্মচারীরা সব সামলাবে। মোহনিয়া বেগম আর মানিক সাহেব ঘরে বসে গল্প করছেন।পাশের আরেক ঘরে তার দাদি শুয়ে আছে। মিথি ফিসফিস করে রিতিকে ডাকলো,রিতি দৌঁড়ে আসলো।সে যেন এই ডাকের অপেক্ষায় ছিলো।মিথি তখন বলল,
“এখন চল।বৃষ্টির রেশ অনেকটা কমেছে আর বিদ্যুৎ তো চমকাচ্ছে না।
রিতি ঠিক আছে বলেই ছুটলো। মিথি নিঃশব্দে চোখ ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে গেলো।দরজা পেরিয়ে বাড়ির সামনে ফাঁকা খলায় আসতেই রিতির দেখা মিলল।মিথি আজ আগেই বলল,

“কোনোভাবে যদি আজ প্রহর ভাই কে দেখে আমাকে একা রেখে পালিয়েছিস তবে তোকে আজ ভর্তা বানানো। অবশ্য বৃষ্টির মধ্যে তিনি বেরোবেন না।
রিতি নাথা নাড়িয়ে পালাবে না বললো। দুজনে ছুঁটলো অন্যদের আম বাগানের দিকে।তাদের নিজের আম বাগানের আম ভালো লাগে না।অন্যের বাগানের জিনিস চুরি করে খেতে মজাই আলাদা।
যেতে যেতে পথে আরো কয়েকটা বাচ্চার দেখা মিললো।তারা আম কুড়াতে বাহির হয়েছে। একজন মিথি কে দেখেই বলল,
“মিথি বুবু মেলায় যাইবা না?
মিথি যেতে যেতে থেমে গেলো,জানতে চাইলো,
“আজ আবার কিসের মেলা?
“আজ তো সামনের গ্রামে মেলা আছে।আমরা যাবো তুমি যাবে?
মিথি একটা আম কুড়িয়ে নিলো পাশে থেকে।কামড় দিয়ে উত্তর দিলো,
“মেলায় যাওয়ার বয়স নেই।আব্বা আম্মায় একা যাইতে দিবে না।এখন বড় হয়ে গেছি যে।মেলায় কত রকমের মানুষ আসে।
মিথির কথা শেষ হতেই রিতি বলল,

“আপা তাহলে আমি যাবো।
“যা কাঁদা পানির মধ্যে তোরে কে নিয়ে যাবে।
“কেন পিয়াস ভাই নিয়ে যাবে।আগের বার যে নিয়ে গেছিলো। শোনো মিথি আপু পিয়াস ভাইয়ের সাথে তোমার বিয়া দিবো তাহলে পিয়াস ভাই যেখানে চাইবো নিয়ে যাবে।সে ছাড়া তো কেউ নিয়ে যায় না।
মিথি বাঁকা চোখে তাকালো।পা থামিয়ে চোখ ছোট করে রেগে তাকিয়ে বলল,
“কি বললি?
রিতি আমতা আমতা করে বলল,
“না কিছু না।
একটু পর আবার বলল,“ পিয়াস ভাইয়ের সাথে তোমার বিয়ে দিবো।বলেই দৌঁড় লাগালো। মিথিও তাকে ধরতে ছুঁটলো তার পিছু পিছু। রিতি তার থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আবারো বলল,

“ছোট বেলায় নাকি প্রহর ভাইয়ের বউ হতে চাইতে?
প্রহর ভাই ও মন্দ না কিন্তু কেমন চুপচাপ থাকে আর সবকিছুতে মানা করে।আমি তারে ভয় পাই একটু।
মিথি থামলো।রিতির প্রতিত্তোরে আনমনে উত্তর দিলো,
“ বাস্তবতা মানুষ কে চুপ থাকতে শেখায়।
তিনিও তেমনই বাস্তবতার জালে বন্ধি।নিজেকে ভাবেন একা,তাই তো নিঃসঙ্গ তাকে কুড়ে খায় যখন পায় দেখা।
মিথি আর রিতি ব্যাগ ভর্তি আম কুড়িয়ে নিয়ে আসছিলো।হুট করে রিতির চোখ যায় তাদের আম বাগানের দিকে। মিথির হাত ঝাকিয়ে বলল,
“ওটা প্রহর ভাই না?
মিথি তাকালো।তাদের থেকে একটু দূরে দেখলো হ্যাঁ প্রহর ভাই। কিন্তু তিনি এমন নিস্তব্ধ কাকতাড়ুয়ার ন্যায় ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বৃষ্টি কি উনার পছন্দ?তবে নির্জীবের মতো দাঁড়িয়ে থাকবে কেন?
রিতি তখনই হাত টানলো,বলল,
“চলো তাড়াতাড়ি।প্রহর ভাই দেখলে আবার বলবে কোথা থেকে আম নিয়ে আসলাম।মিথি গেলো না।ওকে বলল,
“তুই যা আমি আসছি।

রিতি কোনো কথা না বলেই ছুঁটলো।ভয়ের সামনে সে নেই। মিথি প্রহরের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে তার দিকে অগ্রসর হলো।হাতের ছাতাটা একটা বাচ্চা ছেলে তাকে দিয়ে ওই গ্রামে ভিজে গেলো।
প্রহর ঠাঁই দাঁড়িয়ে জীবনের হিসাব নিকাশ কষছিলো। হুট করে তার পাশে কারো অস্ত্বিত্ব টের পেয়ে পেয়ে ঘুরে তাকালো।
মিথি খানিকটা চমকে উঠলো। প্রহরের চোখ লাল হয়ে গেছে। মুখটা কেমন যেন লাগছে।
প্রহর এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে মিথির পানে। হাতের ছাতাটা শক্ত করে ধরে মিথি প্রশ্ন করলো,
“এখানে দাঁড়িয়ে ভিঁজছেন কেন?আমাদের জ্ঞান দেন কিন্তু নিজে মানেন না।হাতের আঙ্গুলের দিকে দেখুন কতক্ষণ থেকে ভিজছেন যে সাদা হয়ে গেছে।
প্রহর দৃষ্টি নামালো।একপলক চেয়ে মাঠের পানে তাকালো,উত্তরে বলল,
“বৃষ্টি তার ও প্রিয় তাই ভিঁজছি আর তাকে উপলব্ধি করছি।
বাস্তবে কি আর তার সাথে বৃষ্টি বিলাশের সুযোগ হবে?সে তো অন্য কারো ঘরের বৃষ্টি বিলাসীনি রানী হবে।

“কে সে?
“আশে পাশে থাকে যে।
বলেই চমৎকার হাঁসলো প্রহর।মিথির শরীর কেঁপে উঠল ঠান্ডায়। প্রহরের হাঁসি যেন শীতলতা আরো বাড়িয়ে দিলো। আশে পাশে বলতে কে? শ্রাবণী আপা নয়তো?এতটুকু ভাবতেই মিথি চমকে উঠলো।হ্যাঁ শ্রাবণী আপা হতে পারে কারণ তার কাল বাদে পরশু বিয়ে। তাকেই হারিয়ে ফেলবে একথা,সেদিনের বলা কথার সাথে সে মিলালো।
“বাড়ি যা ঠান্ডা লাগবে।
প্রহরের আদেশের সুরে বলা কথায় মিথি ভাবনা থেকে বেরোলো। বলল,
“আপনিও চলেন।এখানে থেকে কি করবেন?
প্রহর আবার তাকালো। ঠান্ডায় কাঁপতে থাকা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে হাঁসলো।কোনো কথা না বলে পা চালালো। মিথি চোখ তুলে তার চলা দেখে সেও দৌঁড়ে গিয়ে পাশে দাঁড়ালো।পাশাপাশি হয়ে পা চালালো একসাথে।মিথির দৃষ্টি অন্য দিকে থাকলেও প্রহরের দৃষ্টি তারই পানে।

“বৃষ্টি পছন্দ তাহলে কাঁপছিস কেন?
“ঠান্ডা লাগছে। বৃষ্টির পানি অনেক ঠান্ডা তবুও ভিজতে লাগে মজা।
“মেয়ে মানুষের মন বুঝা বড় দায়।নিজেও জানে না তারা কি চায়।
মিথি চকিত নয়নে তাকালো,থেমে জিজ্ঞেস করলো,
“আপনি কি চান বলুন তো?আপনাকে তো আমিও বুঝিনা।
“আমি চাই?
‘আমার হৃদয় আকাশে,বৃষ্টি হয়ে নামুক সে।’
দুপুর হতেই বৃষ্টি থেমে গেছে। এখন সময়টা বিকেল। চারদিকে কাঁদা পানি যা-তা অবস্থা। হাঁটতে গিয়ে কেউ পিঁচলে পড়ছে তা দেখে মিথি রিতি আর রুহেল গড়াগড়ি খাচ্ছে।তখনই আগমন হলো পিয়াসের। রিতি তাকে দেখেই আবদার জুড়লো।

“পিয়াস ভাই সামনের গ্রামে মেলা হচ্ছে নিয়ে যাবে না?
পিয়াস তাদের সামনে দাঁড়ালো।বলল,
“এই কাঁদা পানির মধ্যেও যাবি?
“ গ্রামের মধ্যে কাঁদা পাঁকা রাস্তায় তো আর কাঁদা নেই।
পিয়াস রাজি হলো।বলল,
“ঠিক আছে তৈরি হ। আমি একটু পর তৈরি হয়ে নিয়ে
যাবো।রিতি আনন্দে আত্মহারা হলো। পিয়াস হাঁসলো। মিথির দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“তোর জন্য কিছু আনবো?
মিথি খুশি হলো।হেসে বলল,

“কাঁচের চুড়ি আর আলতা এনো।
পিয়াস হেঁসে উঠলো। বলল,
“সব সময় শুধু চুড়ি?এতো চুড়ি দিয়ে কি করিস?
“কাঁচের চুড়ি ভালো লাগে। আপনি ছেলে মানুষ তা বুঝবেন না।
পিয়াস চলে গেলো। রুহেল হতাশ হয়ে বলল,
“আমারে কেউ জিজ্ঞেস করে না আমার জন্য কি আনবে।
মিথি রেগে তাকালো। বলল,
“তোর বোন কে তুই নিয়ে যাচ্ছিস না কেন?অন্য কারো কাছে আবদার করছে,কেমন ভাই তুই?
রুহেলের আবারো হতাশাময় উত্তর,
“আর মেলা!আমার জীবনটাই হয়ে গেছে খেলা।
মিথি আর রিতি সেখান থেকে উঠে গেলো। রুহেলের হাতাশাময় ফাজলামো কথা তাদের ভালো লাগছে না। রুহেল প্রহর কে দেখে বলল,

“প্রহর ভাই চলেন মেলাই যাই?
প্রহরের সোজা সাপ্টা উত্তর,
“ আমি মেলায় যাইনা।
এতটুকু কথা মিথির কানে পৌঁছালো। মিথি প্রহরের মুখের দিকে তাকালো।শ্যামলা মুখখানায় কিছুটা অসহ্য বেদনার ছাঁয়া। হয়তো শ্রাবনীর জন্য। ভুল ভাবনা নিয়ে সে চলে গেলো।
রিতি যেতে যেতে বলল,

মন পিঞ্জিরা পর্ব ৫

“প্রহর ভাই বাদ। সে মেলায় যায় না। বিয়ের পর তোমার জন্য চুড়ি আলতা ও এনে দিবে না।আমায় ও মেলায় নিয়ে যাবে না।তাই সে বাদ।পিয়াস ভাই ঠিক আছে,কত ভালো।তাকেই দুলাভাই হিসাবে মানতে রাজি।কত সুন্দর তোমার পছন্দ শোনে। আবদার ও রাখে। বড় আব্বাকে বলবো তার সাথে তোমার দিতে।
মিথি শুনলো তবে এবার আর কিছু বললো না।বলার ইচ্ছে করলো না,নয়তো বা অন্য কিছু কারণেও হতে পারে।এখন যাবে সে তার প্রিয় পুকুর পাড়ে।

মন পিঞ্জিরা পর্ব ৭