মন পিঞ্জিরা পর্ব ৭
শ্যামলী রহমান
তখন সন্ধ্যা। সূর্য ঘোমটা দিয়েছে কিছুক্ষণ আগেই। কৃষকেরা ঘরে ফিরেছে। বাচ্চারা পড়তে বসেছে। মায়ের ব্যস্ত হয়েছে রান্নার কাজে।মাঠ ঘাট পানিতে টইটুম্বুর হয়ে গেছে।পুকুরের কানায় কানায় হয়ে গেছে একদিনের বৃষ্টিতে। এখন প্রবল বাতাস বইছে
মাঝে মাঝে কোলা ব্যাঙের ডাক ভেসে আসছে।
মিথি দুপুরের আম গুলো কেঁটে রেখেছে ঝাল পুড়িয়েছে মাখবে বলে। অপেক্ষা করছে শুধু রিতি আসার। সে মেলায় গিয়েছে এখনো আসেনি।
মানিক সাহেব তখনই বাহির থেকে আসলেন হাতে ছোট জাল। যেখানে কতগুলো মাছ গেঁথে আছে।
পুঁটি,কই,টাকি,টেংরা এসব মাছ। গ্রামে বর্ষার সময় মাঠে কত মাছ পাওয়া যায়। সেসব মাছ পুকুরের চাষ করা মাছের থেকে বেশি সুস্বাদু। বিশেষ করে মিথির ছোট মাছ বেশি পছন্দ। এতোগুলা মাছ দেখে মিথি দৌঁড়ে উঠোন থেকে আসলো। মোহনিয়া বেগম রান্না বসিয়েছে তাই সে বাবার সাথে মাছ জাল থেকে ছাড়াচ্ছে।
“আব্বা এতো মাছ কই পেল?
“আমাদের জমির ওদিকটায় পানির স্রোত যাচ্ছে পাশে বিল এজন্য এতো মাছ পাইলাম। রাতে আবার জাল ফেলে আসবো সকালে বেশি পড়বে।
মিথি খুশি হলো। মোহনিয়া বেগম তখনই রান্না ঘর থেকে বেরোলো এতো মাছ দেখে বলল,
“এতো মাছ রিতিদের একটু দিয়ে আয়।
মানিক সাহেব বলল,
“ছোটজন ও মাছ ধরেছে। পারলে ওই বাড়ি দিয়ে আসো। বড় আব্বা ছোট মাছ পছন্দ করেন।
মোহনিয়া বেগম একটা বালতিতে করে কিছু মাছ নিলেন। মিথিকে বললো,
“মাছগুলো বড় ভাবিকে দিস।
মিথি মাথা নেড়ে বালতি নিয়ে ছুঁটলো।
অলিন্দ নীড়ে প্রবেশ করতেই দেখলো মেরিনা আর অরুণা বসে আছে উঠোনে। মিথি থমকে দাঁড়ালো।মেরিনার দৃষ্টি তার দিকে তবে আজ স্বাভাবিক আছে কিছু বললো না। অরুণা বলল,
“হাতে কি?
“ছোট মাছ আম্মা পাঠালো। বড় মা কোথাই?
„বড় ভাইয়ের জ্বর এসেছে। ঘরে জলপট্টি দিয়ে দিচ্ছে।
“ওহ। তাহলে মাছ গুলো কাকে দিবো?
অরুণা সানিয়া কে ডাকলো। সানিয়া দৌঁড়ে আসলো। মিথির দিকে তাকালো।হাতে মাছের বালতি দেখে ডাকার কারণ বুঝতে পারলো।মিথির দিকে বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে অরুণা কে বলল,
“ হ্যাঁ আম্মা বলুন।
“মাছগুলো নিয়ে গিয়ে আনিসের মা’কে দাও।
সে একা পারবে না তুমিও হাত লাগিও। আমরা রান্না যোগাড় করবো।
সানিয়া কিছু বললো না। মিথির হাত থেকে ঝটকা দিয়ে বালতিটা নিলো।ভেতরে ভেতরে রাগলেও মুখে প্রকাশ করলো না। চলে গেলো কলপাড়ের দিকে রাখতে।মিথি আশে পাশে একবার তাকালো।কাউকে দেখা গেলো না।শ্রাবণী আর নবনী ঘর থেকে বেরোয় না।শার্লিন তখন নিচে নামলো।মিথি তাকে দেখে বললো,
“আপা চলো আম মাখাবো তুমি খাবে না?
আম মাখার কথা শুনতেই তার জিভে জল আসলো।ঝটপট বলল,
“খাবো না মানে?এখনি চল।
শার্লিন মিথির সাথে হাঁটা দিলো। গেইট পেরোতেই বাইকের শব্দ আর আলো ভেসে আসলো। দুজনে থেমে গেলো। রিতির কন্ঠ শোনা যাচ্ছে। তার মানে মেলা থেকে এসেছে। বাইক থামতেই রিতি নেমে দৌঁড়ে আসলো। পিয়াস ও নেমে আসলো পিছনে দেখা মিললো নবনীর। রিতি তো সেই খুশি মেলায় যেতে পেরে। মিথি ভাবছে নবনী আবার কখন গেলো?দেখলাম না তো।
নবনী নামতে গিয়ে পায়ে কাঁদা লেগেছে বিধায় সে বাড়ির ভেতরে গেলো। পিয়াস মিথির সামনে দু ডর্জন লাল-নীল কাঁচের চুড়ি আর আলতা টানিয়ে ধরলো। মিথি খুশিতে যেন নেঁচে উঠলো,হাতে নিয়ে বলল,
“ধন্যবাদ পিয়াস ভাই।
পিয়াস হাঁসলো মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো।প্রিয়জনের মুখের হাঁসি যে তৃপ্তি দেয় কেবল আমি জানিই।তখনই শার্লিন পাশ থেকে বলল,
“আমার কই?পিয়াস ভাই আমার জন্য কিছু আনোনি?
পিয়াস আরেক হাত থেকে ওর চুড়ি দিলো। বলল,
“সবার জন্য এনেছি।
এগুলো নিয়ে যা মিথি।
বলেই জিলাপি, খাঁজা বাতাসার প্যাকেট বের করে দিলো। মিথি নিলো শার্লিন কে নিয়ে বাড়িতে গেলো। রিতিকে ডাক হাকলো একটু পর আসতে।
সবাই যখন স্থান ত্যাগ করলো দূর থেকে দেখে কেউ একজন ফিঁচেল হাঁসলো।দাঁড়িয়ে রইলো আঁধারে হারিয়ে যাওয়া শুভ্র মেঘের পানে,যার রঙ এখন কালো বেশে সেঁজেছে। দিনে যে আকাশে চকচক করে, রাতে সে আঁধারিতে নিমজ্জিত হয়ে পরিবর্তন হয় তার রুপের।
মিথি আর শার্লিন সবে উঠোনে উঠতে যাবে তখনই পা পিছলে ধপ করে পড়ে গেলো। ধপাস শব্দের সাথে ব্যথ্যাতুর চিতকারে দৌঁড়ে এলো মোহনিয়া বেগম। এসে দেখে মিথি পড়ে গেছে হাতে থাকা কাঁচের চুড়িগুলো ভেঙে হাতে গেঁথে গেছে। হাত থেকে গলগল করে র*ক্ত পড়ছে। মোহনিয়া বেগম মেয়ের হাতে শাড়ির আঁচল চেপে ধরলো। তখনই প্রহরের আগমন হলো। বলল,
“কি হয়েছে?মিথি চিতকার করলো নাকি?
কথাটুকু বলতেই নজর গেলো মিথি মাটিতে বসে আছে হাত থেকে রক্ত পড়ছে। মোহনিয়া বেগম ততক্ষণে ঘরে গেছেন ঔষুধ আনতে।শার্লিন হাতে গেঁথে যাওয়া চুড়ির টুকরো বাহির করতে গেলে মিথি ব্যথায় চোখ বন্ধ করে মৃদু চেঁচাচ্ছে।
প্রহর বসে পড়লো। শার্লিন কে সরিয়ে নিজে মিথির হাতটা ধরলো। অশ্রু টলমলে চোখের দিকে একবার তাকিয়ে আলতো করে চুড়ির টুকরো গুলো বাহির করলো।যেন ব্যথ্যা না পায়।মিথি চোখ বন্ধ করে আছে। প্রহর এবার বলল,
“চোখ খোল।
মোহনিয়া বেগম ততক্ষণে ভায়োডিন আর তুলো এনেছে। প্রহর তুলো দিয়ে রক্ত পরিষ্কার করে ভায়োডিন দিয়ে দিলো। ব্যান্ডেজ না থাকায় নতুন কাপড়ের টুকরো দিয়ে বেঁধে দিলো।ক্ষত গভীর না হলেও অনেক জায়গায় কেটেছে। প্রহরের হাতেই এখনো মিথির হাত। অনুভূতির থেকে তীব্র ব্যথা অনুভব করছে সে। যার সাথে হবে না সন্ধি,তার হাত খনিকের জন্য ধরা বড়ই কষ্টকর। মিথি চোখ খুলে হাতের দিকে না তাকিয়ে ভাঙা চুড়ি গুলো তাকাচ্ছে।প্রহর ধীরে বলল,
“ব্যথ্যা বেশি করছে?”
ধীর কন্ঠে মানুষটার শীতল কণ্ঠ শুনে মিথি তাকালো। চোখে চোখ পড়লো। অজানা অনুভূতির বয়ে গেলো দুজনের মনে। এই অনুভূতি কেউ অনুভব করে,কেউবা নামহীন অনুভূতি ভেবে উড়িয়ে দেয়।মিথি মাথা নাড়িয়ে বলল,
“অল্প। সমস্যা হবে না।বলেই উঠে দাঁড়ালো কিন্তু পায়েও ব্যথা অনুভব করে পড়ে যেতে নিলো। পড়ে যাওয়ার আগেই প্রহর দু’হাতে আগলে নিলো মিথির হাত।আবার সেকেন্ডে ছেড়ে দিলো। মিথি ততক্ষণে দাঁড়ালো।মোহনিয়া বেগম মিথিকে নিয়ে ঘরে এলো। প্রহর দাঁড়িয়ে রইলো।যে অনুভূতি তার মধ্যে প্রবাহিত হচ্ছে তা কেবল যন্ত্রণা বাড়াবে। শার্লিন চুপ করে এতক্ষণ দেখলো। প্রহরের দিকে তার ভিন্ন দৃষ্টি ছিলো। প্রহর বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসলো পিছু পিছু শার্লিন ও আসলো। পিয়াস সবে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে তখনই শার্লিন আর প্রহর কে মিথিদের বাড়ি থেকে বেরোতে দেখে জিজ্ঞেস করলো,
“দুজনে এক সাথে মিথি কই?
শার্লিন জবাব দিলো,
“মিথি পড়ে গিয়ে হাতে কাঁচের চুড়ি ভেঙে গেঁথে গেছিলো। এতটুকু শুনতেই পিয়াস তাদের বাড়ির দিকে এগোলো। শার্লিন চেয়ে রইলো তার পানে। প্রহর নিশ্চুপ একবার তাকালো তার পর অলিন্দ নীড়ে প্রবেশ করলো। কিছুক্ষণ নিজের সাথে অংক কষলো। হিসাব মিলছে না তাই পা বাড়ালো তার নীড়ে।
শমসের দেওয়ান ছেলেদের নিয়ে বৈঠক বসিয়েছেন। নাতনীর বিয়ের সব আয়োজন নিয়ে, কাকে কাকে দাওয়াত দেওয়া বাকি সেগুলো হিসাব করছে। সাহার দেওয়ান বলছেন সব মেয়ের বিয়েতে কিছু ত্রুটি রাখবেন না। সোলায়মান দেওয়ান জ্বরে গায়ে শাল জড়িয়ে চুপ করে শুনছে।
পিয়াস তখনি আসলো। শমসের দেওয়ান তাকে দেখে বলল,
“ডেকোরেটর সব ঠিকঠাক?সানোয়ার কবে আসবে সিহাব কিছু বলেছে?
“হ্যাঁ সব ঠিক করা আছে কালকে সকালে এসে সাঁজাবে সব। আর সিহাব বললো আজ রাতে গাড়িতে উঠবে কাল ভোরে আসবে। চাচ্চুর ছুটি মাত্র চারদিন দিয়েছে। শাকিলার স্কুল আছে চাচির ও কাজ আছে এজন্য বলেছে বেশিদিন থাকতে পারবে না।
শমসের দেওয়ান এবার সেলিম কে বলল,
“বিনু আসলে তোমার বউকে বলবে যেন বাড়াবাড়ি না করে।তোমাদের ভাগ্য খারাপ সেখানে অন্যের দোষ দিয়ে লাভ নেই। সে অথিতি হিসাবে আসবে।
সেলিম মাথা নাড়ালো। উঠে গেলো তখনিই।
বিনু সেলিম কে ভালোবাসতে এটা সবাই জেনেছিলো, সেলিমের সাথে বিয়ে দিতেও চেয়েছিলো কিন্তু ভালোবাসতো মেরিনা কে। তাই তো তাকেই বিয়ে করেছিলো। বিনু সেদিন কেঁদে কেঁদে বলেছিলো যদি আমায় প্রশয় না দিতে তবে ভালোবাসা তৈরি হতো না। যদি পছন্দ নাই করতে তবে প্রেমের কথা বললে হাসতে কেন?কেন বলতে না আমি অন্য কাউকে পছন্দ করি?
এর জবাব সে দিতে পারেনি। সে মজা ভেবে উড়িয়ে দিতো সিরিয়াস ছিলো তা বুঝেনি।যখন বুঝেছে তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। বিনুর অশ্রুসিক্ত চোখ তার মন গলাতে পারেনি সেখানে বসত ছিলো অন্যজনের।সেই অশ্রুর মূল্য হয়তো দিতে হচ্ছে অসুখী জীবন দিয়ে।
ভোরবেলা মিথির ঘুম ভাঙলো। আড়মোড়া দিয়ে উঠলো। এখনো সূর্য উঠেনি। হাতের দিকে তাকালো ব্যথা স্বল্প আছে কিন্তু তার কাছে গুরুত্বহীন। এমন ব্যথা খেলতে ছুটতে গিয়ে কত পেয়েছে। তবে তার খারাপ লাগা তার পছন্দের চুড়ি ভেঙেছে বলে।
মন খারাপটা ভালো করতে জানালা খুললো। ভোরের হাওয়া খেতে।উপরের দুটো জানালা খোলা থাকে।শুধু নিচের জানালার পাকা দুটো খোলার সঙ্গে সঙ্গে দক্ষিণা হওয়া মন ফুরফুরে করে দিলো।মিথি চোখ বন্ধ করে অনুভব করলো।ভোরের দমকা হাওয়ায চুল উড়িয়ে দিচ্ছে সাথে শরীর মন দুটোই শীতল করছে। চোখ খুললো মুরগের ডাকে। সূর্য ঘোমটা তুলছে সবে। হঠাৎ তার চোখ পড়লো জানালার উপরে। দেখতে পেলো জানালার শিকে কিছু একটা বাঁধা।মিথি আগ্রহ নিয়ে সুতোয় বাঁধা একটা প্যাকেট টা নিলো।কি আছে বুঝতে পারছে না এবার এখানে এই অবস্থায় কেন?কি কি রাখলো?দেখার আগ্রহে খুললো।খোলার সাথে চোখ আনন্দের ঢেউ খেললেও মন ভাবনায় পড়লো।প্যাকেটের ভেতরে আরেকটা খবরের কাগজে মোড়ানো দুই ডর্জন কাঁচের চুড়ি আর ছোট একটা চিরকুট। খুলে দেখলো লেখা আছে ‘ হাঁসি মুখে বিষাদ মানায় না। সব সময় হেঁসো,দুঃখ আসলেও গিলে নিয়ে আমায় একটু বলিও।
মিথির ঠোঁটে লেগে থাকা হাসি টুকু সিথিল হলো।
মন পিঞ্জিরা পর্ব ৬
বিস্ময় নিয়ে ভাবতে লাগলো, তবে কি পিয়াস ভাই রেখেছে? রাতে তো বললো আবার এনে দিবে। তবে কি রাতের মধ্যে এনেছে? হয়তো। তিনি ছাড়া আর কেউবা আনবে?আর কেউ তো মেলায় যায়নি। আপন মনে ভেবে নিলো সে।তার পর
চুড়ি গুলো হাতে পরলো। হাত ঝাঁকিয়ে রিনিঝিনি আওয়াজ তুললো।নিজ মনে খিলখিলিয়ে হেঁসে উঠলো।সামান্য জিনিস যেন তার সুখের কারণ।যে সুখ দামি জিনিস দিয়েও অনেকে পায় না।
