Home মাটির পিঞ্জর মাটির পিঞ্জর পর্ব ১৬

মাটির পিঞ্জর পর্ব ১৬

মাটির পিঞ্জর পর্ব ১৬
নূরায়েশা মাহনূর

– আসবো দৃষ্টি আপু?
ইশিতার স্বর কানে যেতেই ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল দৃষ্টি। খাটে আধশোয়া অবস্থায় বসে আছে সে। চোখ নিবদ্ধ ছিলো ফোনের আলোর দিকেই। কি যেনো গভীর অনুসন্ধান চলছিলো তার চোখের পাতায় । ইশিতার ডাকে বাস্তবে ফিরে এসে দ্রুত ফোনটা হাতের আড়ালে ঠেলে রাখলো সে।

– ইশু পাখি! আসো আসো৷
– এই যে, তোমার জন্যে ফুলের ব্যুকেট।
ইশিতা ব্যুকেটটা বাড়িয়ে দিলো। চমকে উঠলো দৃষ্টি। তার দৃষ্টি স্থির হলো ইশিতার হাতে ধরা সেই অপরিচিত অথচ চেনা বস্তুর দিকে। না, এ তো অপরিচিত নয় এ যে সেই লাল ব্যুকেট! মনে পড়ে গেল ইমনের পাঠানো ছবিটার কথা। নিখুঁতভাবে মিলছে একে একে সব। অথচ, কী করে বুঝলো তারা এইটিই তার পছন্দ?বিভ্রান্ত দৃষ্টি ডুবে যেতে চাইল প্রশ্নের গভীরে, ঠিক তখনই ইশিতা ব্যুকেটটা এনে রাখলো তার কোলের উপর।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

– এখন আবার প্রশ্ন কোরো না, কে পাঠিয়েছে। সাইফ ভাই ছাড়া আর কারো পক্ষে এমনটা ভাবাও যায়?
বলেই একচিলতে দুষ্টু হাসি নিয়ে দৃষ্টির পাশে বসে পড়লো ইশিতা। তার চোখেমুখে চিরচেনা উচ্ছ্বাসের ঝলক।
– এমন একটা লাভার বয়কে তুমি কী করে এভাবে এভয়েড করো, আপু? আমার জন্য যদি কেউ এমন করতো, আমি তো আনন্দে পাগল হয়ে যেতাম!

ইশিতার কথায় দৃষ্টির ভাবনার সুতো ছিঁড়ে গেলো। গাঢ় চিন্তার পাতার ভাঁজ বন্ধ করে এবার তাকালো মেয়েটার দিকে। অনেকদিন পর দেখা তবুও চেনা অভিব্যক্তির কোনো ব্যত্যয় নেই। এবার অনেকটা দিন ছুটিতে কেটেছে ওদের। তবে আসার পর এখনই দেখা হয়েছে। আসার খবর পেয়েছিলো আগেই, তবু শরীরের ক্লান্তি আর জড়তা মিলিয়ে বাইরে বের হওয়া হয়নি আর।দৃষ্টিকে নিরব থাকতে দেখে আবারো বলে উঠলো,

– আহ্, যদি আমার ভাগ্যটাও তোমার মতো হতো আপু…
বলতে না বলতেই দৃষ্টি ঝাঁপিয়ে পড়লো। একঝটকায় ইশিতার মুখ চেপে ধরলো নিজের হাতের তালুতে। চোখে ফুটে উঠলো অব্যক্ত এক কান্নার দীপ্তি। সেই ডাগর আঁখিপল্লবের গভীরে ছিল হাহাকার, এক নীরব চিৎকার। মাথা নেড়ে বারবার না সূচক ইঙ্গিত দিলো সে। তারপর ধীরে ধীরে হাতটা সরিয়ে আনলো, অশ্রুত অভিশাপ থামিয়ে দেওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টায় নিমগ্ন সে।
ইশিতার চুলের উড়ে যাওয়া গোছা গুলো কানের পেছনে আলতো করে গুঁজে দিলো। তারপর দুহাতে তুলে নিলো ইশিতার নিস্পাপ গালজোড়া। তার চোখে চোখ রেখে বলে উঠলো,

– এমন কথা আর কখনও মুখে এনো না ইশু। আমার মতো ভাগ্য এ পৃথিবীর কারো না হোক। আল্লাহ সে সকল মানুষদের মৃত্যু দিক তবুও আমার মত ভাগ্য না দিক। তুমি… তুমি খুব ভাগ্যবতী ইশু। আমি জানি, তোমার কপালে শান্তির অর্ঘ্য রেখেছেন আল্লাহ। একদিন সব আসবে… সবটাই। ইনশাআল্লাহ।
ইশিতা হঠাৎ করেই ঝাঁপিয়ে পড়লো দৃষ্টির বুকে। দুই বাহু জড়িয়ে ধরে মুখটা গুঁজে ফেললো তার বুকের মধ্যে।
– কেনো তুমি তোমার ভাগ্যকে এত ভয় পাও, আপু? তুমি দেখতে ঠিক একেবারে রূপকথার পরী, আর সাইফ ভাইয়ের মতো এমন একজন স্বামী পেয়ে গেছো, যে তোমাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে। তাহলে ভয় কিসের এত?
দৃষ্টির চোখে ক্লান্ত এক কোমলতা ছড়িয়ে পড়লো। ইশিতার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে শান্ত কণ্ঠে বললো,
– সবকিছু জানতে নেই ইশু পাখি। কিছু কিছু কথা সময়ের জন্য তোলা থাক। তুমি আর একটু বড় হও তখন না হয় যেনো।

– আর কত বড় হবো আপু? আমার তো এখন ১৮ পেরিয়ে গেছে! তাও তোমার চোখে আমি বাচ্চাই রয়ে গেলাম। অথচ তুমি নিজেই সবে ২১! কিন্তু তোমার কথাবার্তা শুনলে মনে হয় শতবর্ষী কোনো দাদি-নানি কথা বলছে।
গাল ফুলিয়ে কথাটা বলে মুখ ঘুরিয়ে বসে রইলো ইশিতা। দৃষ্টির ঠোঁটে অল্প একটু হাসির রেখা টলটল করে উঠলো। ইশিতা অভিমানী মুখ ঘুরিয়ে সরে যেতেই, দৃষ্টি এগিয়ে গিয়ে ফুলের ব্যুকেট থেকে বেছে নিলো দুটি গোলাপ। কোমল যত্নে, ভালোবাসার অনিবার্য স্পর্শে সেগুলো গুঁজে দিলো ইশিতার কানে।
– ভারী মিষ্টি লাগছে তোমাকে, ইশু।
ইশিতা একটুও সময় নষ্ট না করে ব্যাকুল হাতে আরেকটি গোলাপ তুলে নিলো। তারপর সেটি গুঁজে দিলো দৃষ্টির কানে। মুচকি হেসে বললো,

– তোমার থেকে কম।
দুজনেই ফিক করে হেসে দিলো।
– উজান ভাইয়ের সঙ্গে তোমার দেখা হয়েছে, আপু?
– হ্যাঁ, হয়েছে।
– তোমার বিয়ের ব্যাপারে জানে?
– আমি কিছু বলিনি। জানে কিনা ঠিক বুঝতে পারছি না।
ইশিতা মুহূর্তখানেক চুপ করে থাকলো, ভেতরের কোনো অদৃশ্য হিসাব-নিকাশ করছে। তারপর হঠাৎই দাঁড়িয়ে পড়লো।

– আচ্ছা তুমি থাকো, আমি পরে আসছি। আর হ্যাঁ… ফুলের সঙ্গে একটা চিঠিও এসেছে। পড়ে লজ্জায় লাল-নীল হয়ে যেও। আমি বরং এখনই যাই ।
বলেই খিলখিলিয়ে হাসতে হাসতে দরজা পেরিয়ে মিলিয়ে গেলো ইশিতা। তার চলে যাওয়া মাত্রই দৃষ্টি হাত বাড়িয়ে তুলে নিলো চিঠিটা। নীল খামে মোড়া ভাষা বহন করে আনা কাগজখণ্ড। আঙুলের ডগায় তার কাঁপুনি স্পষ্ট, তবুও খামটা খুলে ফেললো। ভেতরে গুটানো কাগজের ভাঁজ খুলে ধীরে চোখ রাখলো তার উপর।
“বিষচন্দ্রিমা”
” সে যে মোমের আলোয় আপনার অপ্সরা তুল্য চেহারাটা দেখেছি এরপর এতদিনেও আর সৌভাগ্য হয়নি সেই বদনখানি দেখার। সেই রাত আমাকে কতটা জ্বালিয়েছে জানেন? ঘুম নয়, নিদ্রাহীন ছটফটে প্রহরগুলো কেটেছে শুধু আপনার মুখ ভেবে।

মোমের ম্রিয়মাণ আলোয় আপনার অবয়ব আমাকে নিঃস্ব করেছে। সেই দীপ্তি, সে রূপ আমার ভেতরে বি”ষ ঢেলে দিয়েছে। এই যে আপনার চোখের সামনে রাখা ফুলগুলো দেখতে পাচ্ছেন? এই টুকটুকে ফুলগুলোও আমার চোখে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। কারণ, আমার কাছে আসল ফুল তো আপনি। আপনার রাঙা গাল, নবফুস্পটিত গোলাপের কুঁড়ির চেয়েও বেশি স্নিগ্ধ আর কোমল।
একবার, শুধু একবার দেখা দিন। আমি যে তৃষ্ণার্থ! আপনার দর্শনেই হয়তো কিছুটা শান্ত হবে আমার উন্মাদ অন্তর। আপনি কি জানেন, রূপ তৃষ্ণা সবচেয়ে বিষাক্ত উপবাস! একটুখানি দেখা দিয়েই যদি সেই বিষ ভাঙাতে পারেন, তবে এ প্রাণ আপনার পায়েই সঁপে দিবো। একটুখানি দেখা দিন, শান্তি দিন আমার তৃষ্ণার্ত অন্তরটাকে।

ইতি
আপনার বিষপিপাসু..! ”
চিঠির প্রতিটি শব্দ দৃষ্টির গালদুটোয় আগুন ধরিয়ে দিলো। লজ্জা, আবেশ আর এক অজানা উত্তাপে টকটকে লাল হয়ে উঠলো তার মুখ। অথচ, চোখ নামলো না কাগজ থেকে। আনমনা হয়ে একবার, দু’বার নয়, নিরবধি পড়তে লাগলো সেই চিঠি।
এই লোকটাকে খুব একটা খারাপ লাগে না দৃষ্টির। বরং… ভালোই লাগে। তবে সে স্বীকার করতে চায় না কিছুই। নিজের কাছে না, অন্য কারো কাছেও না। আর ভালোলাগাটা কি সত্যিই শুধুই ভালোলাগা? নাকি… লুকানো কোনো ভালোবাসা? সেটাও জানে না সে।

তবে দৃষ্টির মন জানে, এই সুখ তার জন্য নয়। এই একটা মানুষকে সে কখনো কষ্ট দিতে চায় না। দৃষ্টির মনে হয় এই মানুষটার কাছে গেলেই মানুষটা কষ্টে থাকবে আর তাই সে সবসময় দূরে থাকার চেষ্টা করে।
দৃষ্টি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। হাতে ধরা চিঠিটা নিয়ে গেলো পুরনো একটা বক্সের কাছে। বক্সটা প্রায় উপচে পড়ছে চিঠির ভারে, স্মৃতির ভারে, ভালোবাসার ভারে। পাঁচ বছরের অগণন চিঠি, প্রতিটিতে সাইফের উন্মাদ ভালবাসার ছাপ। বেহিসেবি, বেপরোয়া এক ভালোবাসা। চোখ নামলো বক্সের গায়ে, তারপর চুপচাপ সেই চিঠিটা রেখে দিলো ভিতরে।

এরপর ফুলগুলোর দিকে তাকালো। দৃষ্টিতে অদ্ভুত এক কোমলতা, অভিমান মেশানো মায়া। ফুলগুলো হাতে তুলে আনলো, একেকটা পাপড়ির দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। তারপর বুকের কাছে টেনে এনে নাকের কাছে ধরলো। এক দীর্ঘ, গভীর নিঃশ্বাসে সাইফের সমস্ত উন্মাদ ভালোবাসা শুষে নিতে চাইলো নিজের ভেতর।
সে জানে এই মানুষটার ভালোবাসা কোনো মানদণ্ডে ধরা দেয় না। এটা কোনো ওজনের পাল্লায় মাপা যায় না। এই ভালোবাসা… উন্মাদ! যন্ত্রণার মতো গভীর, শান্তির মতো আশ্রয়দায়ী। এতটা ভালোবাসা মানুষ কেমন করে দেয় দৃষ্টি আজও বোঝে না। শুধু বোঝে, সে মানুষটার কাছ থেকে নিজেকে দূরে রেখেও… মুক্ত নয়, ছিল না কোনোদিন।

আকাশের অতলে চোখ ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে আছে উজান অপলক, অনর্গল নিরবতায়। মনে হচ্ছে, জগতের রথচক্র হঠাৎ থমকে গেছে কেবল তার বুকের ভেতরকার ব্যবস্থাকে উল্টে দিতে। সব কিছুই এলোমেলো, অজানা ঘূর্ণিপাকে আটকে নিজেকেই আর চিনতে পারছে না সে। হঠাৎ তার ভিতরে এক অদ্ভুত টান, প্রবলভাবে টানছে তাকে পাঁচ বছর আগের অনুতপ্ত দিনের দিকে। ইচ্ছে হচ্ছে সবটা মুছে দিয়ে, গ্লানির রেখাগুলো ছিঁড়ে ফেলে আবার নতুন করে আঁকতে জীবনচিত্র। আবার ফিরে যেতে সেই ৫ বছর আগের সময়টায়। কিন্তু সময় তো অনড় সে তো আর ফেরে না।
সেদিন উজান সত্যিই উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল। হৃদয়ের রণক্ষেত্রে আবেগ আর অভিমানের দ্বন্দ্বে সে নিজেই হয়ে উঠেছিল তার সর্বনাশের নায়ক। তবে আজকের অনুশোচনার কেন্দ্রে শুধু তার ভুল কিংবা দুঃখ নয়, সবচেয়ে বেশি যে ক্ষতটা তাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাচ্ছে তা হলো দৃষ্টির পাশে থাকতে না পারা। মৃদু ভালো লাগা একদিন মোহে পরিণত হয়েছিল। আজকের দৃষ্টি স্বয়ং জ্যোৎস্নার প্রতিমা! এতটা অপরূপ, এতটা অপার্থিব, এই সুন্দরে যে পুরুষ মোহিত হবে না, স্বাভাবিক ভাবেই সে পুরুষের পুরুষত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।

সৌন্দর্যের শীর্ষচূড়ায় দাঁড়িয়ে দৃষ্টি এক জীবন্ত প্রতিমা, যার দিকে তাকিয়ে পুরুষ মাত্রই হার মানে; মোহাচ্ছন্ন না হয়ে উপায় নেই । উজান জানে এই মুগ্ধতা স্বাভাবিক, কিন্তু এই মুগ্ধতার আড়ালেই কি সে নিজের অপরাধ ঢাকতে চাইছে? না কি রূপের গভীরতায় ডুবে গিয়েই আজ তার অনুতাপ জেগে উঠেছে? সবকিছুর ঘেরাটোপে হৃদয়ের ব্যাখ্যাও আজ অস্পষ্ট। নিজেকেই আর বোঝা যাচ্ছে না তার।
– উজান ভাই, এই নাও… তোমার কফি।
ভাবনার অন্তঃস্তলে নিমগ্ন উজান চমকে উঠলো। ইশিতা এগিয়ে দিলো ধোঁয়া ওঠা মগটা, তারপর এসে দাঁড়ালো তার পাশে। ছাদখোলা বারান্দায় নিস্তব্ধ বিকেল। উজান চোখ সরালো আকাশ থেকে, এক ঝলক চেয়ে দেখলো ইশিতার মুখ। ভদ্রতাজনিত এক ম্লান হাসি, কফির মগটা হাতবদল হলো।

– মন খারাপ নাকি উজান ভাই? আসার পর থেকে দেখছি কেমন গম্ভীর হয়ে আছো।
– না তেমন কিছু না। তোর পড়াশোনা কেমন চলছে?
– হুম, চলছে তো ভালোই।
মৃদু এক চুমুক দিলো কফিতে ইশিতা। হাওয়ার মাঝে কফির সুবাস মিলিয়ে গেলো পাকা জামরুল পাতার ঘ্রাণে।
– আচ্ছা উজান ভাই, এতদিন কোথায় ছিলে? সেদিন তো বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিলে, তারপর?
– ইন্ডিয়া গিয়েছিলাম।
– তার মানে এতদিন ওখানেই ছিলে?
– না…
– তাহলে?
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো উজান। কফির তলদেশে তাকিয়ে থেকে সময়কে ছেঁকে তুললো চোখে, তারপর দূরের দিকে চেয়ে বললো,

– আড়াই মাস ছিলাম ইন্ডিয়ায়। তারপর সেখান থেকে পাড়ি জমিয়েছিলাম জার্মানিতে। মাস্টার্স শেষ করে কাজ ধরলাম। ব্লু কার্ড হাতে পেয়েই দেশে ফিরে এসেছি।
– আমাদের একটুও মিস করো নি? কীভাবে পারলে বলো তো!
প্রশ্নটা হৃদয়ের তীর হয়ে বিঁধলো। উজান স্থির হয়ে গেলো। এক মুহূর্তের জন্য হলেও ভেতরে কিছুটা কেঁপে উঠলো। কিন্তু মুখে আসলো না কোনো স্বীকারোক্তি। সত্যিটা কুড়োতে গেলে বেরিয়ে আসবে, সে আসলে কেবল একজনকেই মিস করেছিল, অরুণা। বাকিরা কোথায় ফিকে হয়ে গিয়েছিল তার ক্যারিয়ারের ক্যালকুলেশন-ভরা অংকে। জব, পড়াশোনা মান-অভিমান এসবের মাঝে সে কাউকে মিস করার সময়ই পায়নি।

– করো নি জানি। তবে আমরা কিন্তু করেছি। হুহ্!
স্নিগ্ধ অভিমানে দূরে সরে গিয়ে দাঁড়ালো ইশিতা। উজানের ঠোঁটের কোণে হাসি খেলে গেলো।
– তাই বুঝি? কতটা মিস করেছিস শুনি?
– তুমি যাওয়ার পর এই বাড়ি নিঃস্ব হয়ে গেছিলো, বুঝলে? প্রতিটা কোণায় তোমার অভাব অনুভব করতাম। অথচ তুমি! একটিবারও খোঁজ নিলে না। একটা কল, একটা বার্তা পর্যন্ত না… কেমন করে পারলে বলো? তোমার সাথে কোনো কথাই নাই।
বলে ফেলেই রাগে নাকের পাটা লাল হয়ে উঠলো ইশিতার। ভ্রূ কুঁচকে উল্টো দিকে পা বাড়াতেই, আচমকা তার কবজি চেপে ধরলো উজান। সাবলীল টানে এনে আবার নিজের পাশে দাঁড় করালো।
– ভাবা যায় এত রাগ! ছোট্ট ইশুটা এত বড় হয়ে গেলো কবে?
বলতে বলতেই আদরে ইশিতার নাক টেনে দিলো উজান। তাতে রাগ টুকু ভেসে গেলো সজীব এক হাসির ঢেউয়ে। ফিক করে হেসে উঠলো ইশিতা…

রাত নিঃস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন। ঘড়ির কাঁটা নিস্তরঙ্গ নৈঃশব্দ্যে কেবল টিক-টিক করে সময়ের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে, রাত ১২টা ৪৫। সদ্য বই বন্ধ করে রেখেছে দৃষ্টি। পর্দার আড়াল থেকে চাঁদের আলো তার পড়ার টেবিলে অপার্থিব ছায়া ফেলে রেখেছে। পরীক্ষার প্রাক্কালে চাপটাও একটু বাড়িয়েই বসেছে কাঁধে। ক্লান্ত চোখে ফ্রেশ হয়ে নিয়ে নিজেকে প্রস্তুত হচ্ছে গভীর রাতের অমলিন ঘুমের জন্য।
ঠিক তখনই দরজায় বেজে উঠলো চাপা শব্দ। চোখ দুটো কুঁচকে উঠলো দৃষ্টির। এ সময় আবার কে? ধীর পায়ে এগিয়ে এল সে দরজার দিকে। আবার…
ঠকঠক! ভেতরে একরাশ কৌতূহল আর হালকা উদ্বেগের ঢেউ।

– কে?
স্বরে হালকা আতঙ্কের ছোঁয়া, কিন্তু অপর প্রান্ত শূন্য। মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেলো দৃষ্টি, তারপর আরও একবার কড়া নাড়ার শব্দ।
এবার আর নিজেকে থামাতে পারলো না। চৌকাঠে সরাসরি হাত বাড়িয়ে খুলে দিলো দরজার ছিটকিনি। তখনই…এক ঝাঁক অন্ধকার হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়লো ঘরের ভেতর। দৃষ্টি কিছু বোঝার আগেই এক লম্বা, তীব্র আকৃতি দরজা বন্ধ করে দিলো। পেছন থেকে চট করে ছিটকিনি তুলে দিলো ভিতর থেকে।
হাতদুটো নিমিষে পেছনে মুড়ে ধরা হলো। মুখ চেপে ধরা হলো শক্ত করে। দৃষ্টি পুরোটা হিম হয়ে গেলো। এক হাতে চেপে ধরা মুখ, অন্য হাতে পেছনটা বাঁধা, শরীরটা ঠেলে ধরা হলো দেয়ালে। চোখ দুটো বিস্ফারিত, শ্বাস প্রশ্বাস অবরুদ্ধ, আতঙ্কের গন্ধে জ্যামিতিক বিস্ফোরণ তার শরীরে। তবু কোনোভাবে চোখ সরিয়ে চাইলো মুখের দিকে…আর তখনই হৃদয়টা থমকে গেলো এক ঝটকায়,সাইফ!

দৃষ্টির ডাগর চোখের গভীরতায় স্থির হয়ে গেছে সাইফ। সেই দৃষ্টির চাহনিতে ডুবে সে ডুবে যাচ্ছে কোনো অতল নীল সমুদ্রে, যেখানে ওঠার চেয়ে তলিয়ে যাওয়াটাই স্বস্তিকর। আনমনে সাইফের হাতের বাঁধন আলগা হয়ে এলো। সেই ফাঁকেই চওড়া এক কামড় বসিয়ে দিলো দৃষ্টি তার হাতে! ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে পিছিয়ে গেলো সাইফ। যন্ত্রণায় মুখটা বিকৃত করে উঠলো সে।
দৃষ্টি ইতিমধ্যে নিজের শরীরের এলোমেলো কাপড় গুছিয়ে নিচ্ছে, চোখে তীব্র ক্রোধের ঝলক। সেই চোখে চোখ পড়তেই গলা শুকিয়ে এলো সাইফের। গলাটায় এক চুমুক শুষ্ক ঢোক। তারপর হোঁচট খাওয়া কণ্ঠে অসহায় স্বরে বলেই ফেললো,

– এইভাবে তাকাবেন না দৃষ্টি… আমি ভয় পাই… একটু রহম করুন।
দৃষ্টি থেমে থাকেনি। দিক থেকে খানিক এগিয়ে এসে বজ্র ভঙ্গিমায় দাঁড়ালো,
– এখানে করছেন টা কী আপনি? এত রাতে চোরের মতো মেয়েমানুষের ঘরে ঢুকে পড়েছেন! ডাকবো সবাইকে?
সাইফের মুখের রেখায় কুটিল এক দৃঢ়তা ফুটে উঠলো এবার। সে উঠে দাঁড়িয়ে জবাব ছুড়ে দিলো ধাতব গলায়,
– আপনি আমার বউ। ভুলে যাচ্ছেন নাকি? নিজের বউয়ের কাছে আসবো, তাতে কার কী? কে কি করবে শুনি?
দৃষ্টি চোখ কুচকে বলে উঠলো,

মাটির পিঞ্জর পর্ব ১৫

– কেনো এসেছেন শুনি?
গলার চাদরটা হালকা উছিয়ে একরাশ আবেগে সাইফ মৃদু স্বরে বললো,
– আমার বউকে দেখতে!

মাটির পিঞ্জর পর্ব ১৭