Home অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১০

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১০

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১০
সাজিয়া জাহান সুবহা

দীর্ঘ ৩ঘন্টা পর তৈরি হয়ে রুম থেকে বের হলো সায়েরী। তাদের প্রতিবেশী রিনি ভাবির সাহায্য নিয়ে নিজেকে অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি করেছে। খানিক উঁচু হিল জোড়া হাতে নিয়ে তাড়াহুড়ো করে রুম থেকে বেরিয়ে আসলো সে। জোর গলায় বেশ কয়েকবার ডাক দিলো আবরার-কে। সায়েরীর চিৎকার শুনে তার মা,কাকিয়া,আবরার সবাই একত্রে জড়ো হলো। কিছু বলতে গিয়েও কারো মুখ থেকে কথা বের হলো না সায়েরীকে দেখে। হা করে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করলো ঠিক কে দাঁড়িয়ে আছে তাদের সামনে!

‘ তোমাকে তো আমার মেয়ের মতো লাগছে দেখতে! কি নাম তোমার? ‘
নিজ মায়ের মুখে রসিকতার ভঙ্গিতে এমন কথা শুনে অস্বস্তি ও বিভ্রান্তিতে পড়ে গেলো সায়েরী। আবরারও সাই দিয়ে বললো,
‘ হ্যাঁ, কন্ঠটাও তো আমাদের সায়ু’র মতো শুনতে। তুমি কে বলতো? ‘
‘ উফফ্ ভাইয়া! চুপ থাকো। এজন্যই চাইনি আমি এটা পড়তে। ধ্যাৎ! আমাকে দিয়ে হবেই না এসব। এক্ষুনি চেঞ্জ করে আসছি। ‘

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

‘ আরে আরে! চেঞ্জ করতে বলেছে কে? সুন্দর লাগছে তো। ‘
‘ সত্যি বলছো তো! ‘
‘ হ্যাঁ মা আমার, সত্যি বলছি। ‘
‘ ঠিক আছে। ঠিক আছে। এবার আমার গাজরাগুলো দাও। দেরি হয়ে যাচ্ছে। ‘
‘ কিসের গাজরা! ‘
আবরারের হেয়ালি দেখে ভারী অবাক হলো সায়েরী।
‘ মানে কি ভাইয়া! আমি কাল বারবার করে বলে রেখেছিলাম সকালে ফ্রেশ বেলি ফুলের গাজরা নিয়ে আসার জন্য। তুমি এটাও ভুলে গিয়েছো! ‘
‘ আহ..না মানে…কিছুক্ষণ পরেই তো আমার ট্রেন। এসবের ঝামেলায় মনে ছিলো না। আচ্ছা তুই চিন্তা করিস না। একটা ব্যাবস্থা হয়ে যাবে। ‘

‘ ধ্যাৎ। একটা কিছু হবে না তোমাকে দিয়ে। বারবার করে বলেছিলাম তবুও ভুলে গিয়েছো। লাগবে না তোমার ব্যাবস্থা করার। গেলাম আমি। তুমি চট্রগ্রামেই পড়ে থাকো। ‘
আবরারকে বকতে বকতে হিল জোড়া পায়ে দিয়ে পার্স নিয়ে বেরিয়ে পড়লো সায়েরী। তার দিকে তাকিয়ে হতাশা ভরা নিশ্বাস ছাড়লো আবরার। ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিতে নিতে ফোন করলো কেউ একজনকে।
ভাগ্যক্রমে রাস্তায় এসে দাঁড়াতেই রিক্সা পেয়ে গেলো সায়েরী। স্বস্তির শ্বাস ফেলে দ্রুত উঠে বসলো সে। মনে মনে ভাবতে লাগলো আবরারের কথা। সেই ছোট্ট বেলা থেকে আবরারকে দেখে আসছে। বন্ধুদের জন্য দেওয়ানা সে। কলেজ লাইফে নীতি, রায়ান, মিহাদ, জিহান, ইরা আর আবরারের বন্ধুত্ব ছিলো চোখে পড়ার মতো। কলেজের পাশাপাশি ছুটির দিনে কারো না কারো বাসায় বসতো আড্ডার সমাবেশ। আবরারদের বাড়িতে এলেই সায়েরী আর মিনহার জন্য চকলেট, চিপস, আইস্ক্রিম নিয়ে আসতো হাত ভরে।

সব বন্ধু বান্ধবদের মধ্যে আবরারের ঘরে সায়েরী আর মিনহা ছিলো সবার ছোট। তাই তাদেরকে নিজেদের ছোট বোনের মতোই দেখে সবাই। কলেজ লাইফের শেষ দিকে এসে টেস্ট পরীক্ষার মাসখানেক আগে থেকে হুট বদলে যেতে লাগলো আবরার। হাসিখুশি থাকা চেহারাটা সর্বদা থাকতো আধাঁরে ঘেরা। সায়েরীর এখনো স্পষ্ট মনে আছে সেইদিনটার কথা, রায়ানের জন্মদিন উপলক্ষে তার বাসায় বন্ধুদের নিয়ে ছোট খাটো পার্টির আয়োজন ছিলো সেদিন। সবার আদুরে হওয়ায় রায়ানের আবদারে সায়েরীও উপস্থিত ছিলো পার্টিতে। এতো এতো আয়োজনের মধ্যেও আবরার ছিলো ভাবলেশহীন। অন্য সময়ের চেয়ে সেদিন যেনো আরো বেশি আপসেট ছিলো সে। পার্টি চলাকালীন সময়ে হুট করেই কাউকে কিছু না জানিয়ে সায়েরীর হাত টেনে নিয়ে ফিরে এসেছিলো সে। ১৪ বছরের সায়েরীর বোধগম্য হলো না কিছু। তার মন ভীষণ খারাপ হয়েছিলো পার্টি ছেড়ে চলে আসায়।

আবরারের সাথেও অভিমান করে কথা বললো না রাতভর। কিন্তু অন্যসময়ের মতো আবরার সেদিন তার অভিমান ভাঙ্গাতে আসলো না। এমনকি মাঝরাত অবধি ঘরের বাইরে ছিলো সে। মধ্যরাতে অপরিচিত একজন আবরারের বাবাকে ফোন করে জানালো নেশা করে রাস্তায় মারপিট করেছে আবরার। পুলিশ এসে সবাইকে থানায় নিয়ে গেছে। এখবর শুনে বিষ্ময়ে হতভম্ব হয়েছিলো সকলে। মহল্লার সবচেয়ে শান্ত,ভদ্র উপাধি পাওয়া ছেলেটার এই রূপ হজম হচ্ছিলো না পরিবারের কারোরই৷ থানায় গিয়ে আবরারের টলমল শরীর থেকে ভেসে আসা বিশ্রী গন্ধ আর পুলিশের করা অপমানগুলো সহ্য করতে না পেরে সেদিন প্রথম বার আবরারের গায়ে হাত তুলেছিলো তার বাবা। নিজের মা, চাচির কান্না এবং আবরারের গায়ে হাত তুলতে দেখেই ভয়ে কেঁদে ফেলেছিলো সায়েরীও। অথচ আবরার ছিলো নিশ্চুপ৷ মাথা পেতে নিয়েছিলো বাবার সব অভিযোগ। তারপর টলমল শরীরটা নিয়ে ঢুকে পড়েছিলো রুমে।

সায়েরী বুঝে উঠতে পারছিলো কি হয়েছিলো তার ভাইয়ের। কেনো হঠাৎ এমন পরিস্থিতির স্বীকার হলো সকলে। সোফার এককোনায় পড়ে থাকা আবরারের ব্লেজারের ভেতর থেকে মোবাইলের রিংটোন কানে আসতেই সেটা তুলে নিয়েছিলো সায়েরী। কে ফোন করেছে না দেখেই ফোন তুলে নিলো কানে। উপাশ থেকে ভেসে এসেছিলো পুরুষালি কন্ঠের রাগান্বিত স্বর। ” আবে কোথায় তুই! এতো ঘন্টা জার্নি করে একরাতের জন্য পার্টিতে এসেছি সবার সাথে দেখা করবো বলে। অথচ তুই আমি আসার আগেই কেটে পড়লি! কথা বলছিস না কেনো! হ্যালো! আবরার!!!!”
উপাশের মানুষটার এরূপ বাক্য শুনে ফুঁপিয়ে উঠলো সায়েরী। তার কান্নার আওয়াজ শুনে নিরবতা ছেয়ে গিয়েছিল অপর প্রান্তে। কয়েক সেকেন্ড পেরুতেই মানুষটা গম্ভীর কন্ঠে ধমকে উঠলো, ‘এই মেয়ে কাঁদছো কেনো? আবরার কোথায়? ‘

কান্নারত কন্ঠে সায়েরী থেমে থেমে বলেছিলো,
‘ পুলিশ বলেছে ভাইয়া কিসব খেয়ে মারপিট করেছে। বড় আব্বু ভাইয়াকে মেরেছে। ভাইয়া রাগ করে রুমে ঢুকে গেছে…ভাংচুর করছে। আম্মু,কাকিয়া কাঁদছে। সবাই কাঁদছে৷ ‘
সায়েরীর কথাগুলো বোধহয় উপাশের মানুষটার বোধগম্য হতে খানিক সময় নিলো। যখন মাথায় ঢুকলো ঠিক কি ঘটেছে, তখনই “আমি আসছি” বলেই কল কেটে দিলো সে। সায়েরীও মোবাইলটা সেই অবস্থাতে সোফায় রেখে গুটি গুটি পায়ে তার কাকিয়া’র কাছে গিয়ে বসলো। ছেলের অবস্থা দেখে প্রেশার হাই হয়ে গিয়েছিল উনার। কিছু সময় অতিক্রম হতেই আবারো ভাংচুরের শব্দ আসতেই সাহস জুগিয়ে আবরারের রুমের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলো সায়েরী। ভাগ্যক্রমে রুমের দরজা লক ছিলো না।

অনাসয়ে রুমে পড়েছিলো সে। মেট্রোস থেকে শুরু করে রুমের প্রতিটা জিনিস এলোমেলো, বিধস্ত অবস্থায় ছড়িয়ে ছিলো ফ্লোরে৷ জায়গায় জায়গায় কাচের টুকরো ছিটানো। বেডের সাথে হেলান দিয়ে মাথার চুল টেনে বসে ছিলো আবরার। একবুক সাহস জুগিয়ে সাবধানে পা ফেলে আবরারের কাছে গিয়ে বসেছিলো সে। তার অবুঝ মনে একটা কথায় বাজছিলো। যে তার ভাইয়া কখনোই তার সাথে রাগারাগি করবে না। করতে পারেই না। ভাইয়া কত্তো ভালোবাসে তারা দু’বোন কে। এখন নিশ্চয় ভাইয়ার মন খারাপ বলে রুমে ভাংচুর করেছে। সে বললে অবশ্যই প্রতিবারের মতো তার কথা শুনবে। কিন্তু সায়েরী ভুল ছিলো। আবরারের বার বার বারণ সত্ত্বেও যখন সায়েরী রুম থেকে বের হচ্ছিলো না তখন রাগের মাথায় সায়েরীর ধরে রাখা হাতটা ছুড়ে ফেললো সর্ব শক্তি দিয়ে। তাল সামলাতে না পেরে ছিটকে গিয়ে ফ্লোরে জমে থাকা কাচের টুকরো গুলোর উপর গিয়ে পড়েছিলো সে।

ব্যাথায় আর্তনাদ করে উঠেছিলো সায়েরী। ফিনকি দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছিলো হাতের তালু দিয়ে। ঠিক তখনই দরজা দিয়ে হতদন্ত হয়ে ঢুকলো কেউ। দ্রুত এসে টেনে তুললো সায়েরীকে। ব্যাথায় কাতর সায়েরী তখন কান্নার জন্য আশেপাশে নজর দিতে পারলো না। শুধু অনুভব করেছিলো তার ছোট্ট শরীরটাকে কেউ বুকের সাথে মিশিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছিলো৷ সেই সাথে হাতে বিধে থাকা কাচের টুকরোটা টেনে বের করেছিলো সে। সাথে সাথেই চিৎকার করে উঠেছিলো সায়েরী। সেই চিৎকার শুনেই ছুটে এসেছিলো তার মা। সেদিন রাতে মায়ের সাথে আবরারের রুম থেকে বেরিয়ে আসার সময় আবরারের মুখ থেকে ভাঙ্গা কন্ঠে একটা কথায় শুনেছিলো, “আমাকে আমার হালে ছেড়ে দে সাফওয়ান। বেরিয়ে যা এখান থেকে। যা!!”

এরপর বদ্ধ রুমের ভিতরে দু বন্ধুর মধ্যে কি কথা হলো কেউ জানতে পারলো না। দুদিন যাবত মারাত্মক জ্বরে ভুগেছিলো সায়েরী। দুদিন পার হওয়ার আগের রাতে আবরার নিজ থেকে তাকে এসে দেখে গিয়েছিলো। সরি বলতে তার পছন্দের চিপস আর আইসক্রিম এনেছিলো অনেকগুলো৷ সেই থেকে সায়েরী বুঝতে পেরেছিলো তার ভাই বদলাচ্ছে৷ কিন্তু এই বদল টা আগের আবরার হয়ে ফিরে আসার নয়। নতুন এক আবরার হিসেবে গড়ে উঠার। সত্যি সত্যিই একটা রাতের মধ্যেই ভীষণ বদলে গিয়েছিলো আবরার। কমে গিয়েছিলো বন্ধুদের সাথে আড্ডা৷ বাড়ছিলো গম্ভীরতা আর পড়াশুনা। কলেজ শেষ করে সব বন্ধুরা একই ভার্সিটিতে ভর্তি হলো। কিন্তু আবরার পাড়ি জমিয়েছিল চট্টগ্রামে। তার বাবা মা মোটেই রাজি ছিলো না এতদূর ছেলেকে পাঠানোর জন্য।

কিন্তু শেষমেশ আবরারের জেদের কাছে হার মেনে নিয়েছিলো সকলে। সেই থেকে আজ তিনবছর হলো আবরার বছরের অর্ধেক সময় চট্টগ্রামেই কাটায়। খুব পরে হলেও সবাই বুঝতে পেরেছিলো। এই শহর নয়, বরং শহরের নির্দিষ্ট কিছু মানুষ থেকে দূরে থাকতে চাচ্ছে আবরার। এবং দূরেই আছে সে। আজ হঠাৎ কথাগুলো সায়েরীর মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো কারণ বেশ অনেক যাবত সাফওয়ান বাদে বাকি বন্ধুরা মিলে আবরারকে রিকুয়েস্ট করছে আজকের অনুষ্ঠানে আসার জন্য। অথচ আজকেই আবরার ফিরে যাচ্ছে চট্টগ্রাম। কি এমন পিছুটান তার! কেনো এতো লুকোচুরি!

‘ আপা, আপনে কি নামবেন না? ‘
রিক্সা ওয়ালার ডাক শুনে ভাবনার জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরলো সায়েরী। তাকিয়ে দেখলো কলেজ গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে রিক্সা। ভাড়া মিটিয়ে ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকলো সে। কলেজটা বেশ সুন্দর করে সাজিয়েছে৷ চারিদিকে চেনা অচেনা মুখগুলোর নতুন নতুন রূপ। আশেপাশে তাকিয়ে হাটছিলো বলে হুট করেই কারো সাথে ধাক্কা লাগলো তার।
‘ সরি সরি আমি খেয়া… ‘
নুহাশের হতভম্ব মুখখানা থেকে থমথম খেয়ে গেলো সায়েরী। তাকে আগাগোড়া চোখ স্ক্যান করে চোখ উল্টে পড়ে যাওয়ার অভিনয় করলো নুহাশ। ভয় পেয়ে নুহাশকে দুহাতে ধরে ফেললো সায়েরী। তার মুখের দিকে তাকিয়ে নুহাশ আশ্চর্য কন্ঠে বললো,

‘ পিচ্ছি রে! তুই সত্যি সত্যিই আমাদের সেই পিচ্ছি তো? তোরে পিচ্ছি পিচ্ছি লাগছে না কেনো রে! তুই তো তিন ফুট ছিলি রে। এমন পাঁচ ফুট হয়ে গেলি কীভাবে হঠাৎ? (একটু থেমে) এই এই তুই তো আমাদের পিচ্ছি হতেই পারিস না। আমাদের পিচ্ছি তো এমন মহিলাদের মতন কাপড় পড়ে না। (চোখ রাঙিয়ে) সত্যি করে বল কোথায় লুকিয়ে রেখেছিস সায়ুর বাচ্চা কে? তুই ওর মুখ নকল করেছিস ক্যামনে? সাফারে! দেখে যা কি হয়ে গেলো। ওই আয়ান! দেখ দেখ এই মহিলা আমাদের পিচ্ছিরে কিডন্যাপ করে ফেলছে। তোরা কোথায় আছিস? শীগগির আয়! ‘
বিষ্ময়ে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে গেলো সায়েরী। নুহাশের হট্টগোলে মুহুর্তেই ছুটে আসলো বাকি পাঁচজন। অন্যদের মতো তারাও প্রথমে অবাক দৃষ্টিতে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলো সায়েরীর দিকে। ছয়জনের গোলগোল দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে অস্বস্তিতে গা কাঁটা দিয়ে উঠলো সায়েরীর। হঠাৎ করেই নুহাশ বাদে বাকি পাঁচজন এক সুরে বলে উঠলো “মাশা আল্লাহ”। হকচকিয়ে গেলো সায়েরী। সবার এমন অদ্ভুত ব্যবহার দেখে এবার যেনো কান্না পেয়ে গেলো তার। সায়েরীর কাঁদোকাঁদো মুখটা দেখেই হু হা করে হেসে ফেললো সকলে। সাফ্রিন শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো সায়েরীকে। গাল টেনে দিয়ে বললো,

‘ এতো বড় সারপ্রাইজ দিবি জানতাম না তো! ‘
সায়েরী গাল ফুলিয়ে বললো,
‘ কিসের সারপ্রাইজ! সবাই কেমন কেমন করে তাকাচ্ছে। আমাকে কি এলিয়েন এর মতো লাগছে নাকি? আগে দেখেনি কখনো? ‘
ঠোঁট উলটে কথাটা বলতেই মুচকি হেসে তার গাল টেনে দিয়ে আয়ান বললো,
‘ হ্যাঁ দেখেছে সবাই। কিন্তু সবাই দেখে এসেছি সবসময় জিন্স, টপ পড়া পিচ্ছি সায়ুকে। এই প্রথম অন্য বেশে দেখলাম। একদম বড় বড় লাগছে। ‘
তোহাও সায় জানিয়ে বললো,
‘ শাড়িতে তোকে এত্তো সুন্দর লাগবে জানলে তো আরো আগেই জোর করে পড়াতাম। ‘
‘ সে তো তোরাও পড়েছিস। কিন্তু সবাই মজা করছে আমাকে নিয়ে। ধ্যাৎ! ‘
নাজরাত বললো,

‘ আরে, মজা করলাম কই। আর আমরা তো এর আগেই কতোবার পরেছি শাড়ি। আমাদের দেখতে দেখতে অভ্যস্ত সবাই। ‘
সায়েরী মাথা নেড়ে বললো,
‘ হয়েছে হয়েছে। আর তেল মারতে হবে না। এবার চল। ‘
সবাই একত্রে পা বাড়ালো ক্যাম্পাসের দিকে। অন্যমনস্ক ফায়াজকে হঠাৎ করেই ল্যাং মারলো আয়ান। আবার নিজেই বাঁচালো পরে যাওয়া থেকে।
‘ কি করলি এটা! পরে যেতাম এখনই। ‘
‘ এখনো না পরে ঝুলে আছিস! আমি তো ভেবেছি পরে গিয়ে প্রেমসাগরে হাবুডুবু খাচ্ছিস। যেভাবে তাকিয়ে আছিস আসার পর থেকেই। ‘
মাথা চুলকে হেসে ফেললো ফায়াজ। তার অবস্থা দেখে আরো খোচাতে লাগলো আয়ান। দূর থেকে সায়েরীর হাস্যজ্জল মুখখানার দিকে তাকিয়ে হতাশায় ভরা শ্বাস ফেললো ফায়াজ৷ আয়ান আরো কিছু বলতেই তার পেটে পাঞ্চ মেরে ফায়াজ বললো,

‘ চুপ কর। বাজে বকিস না। ‘
‘ আমি নাহয় বাজে বকছি। কিন্তু তুই কতদিন আর চুপ থাকবি? এবার বলেই দে। ‘
‘ নাহ রে। তুইও জানিস সায়ু অন্যসব মেয়েদের মতো না। আবরার ভাইয়ের স্নেহে খুব নাজুকভাবে বড় হয়েছে সে। এই যুগের অন্যসব মেয়েদের মতো এসব প্রেম ভালোবাসা সায়ু নিজের জন্য সহজভাবে নিবে না। আমাদের তুলনায় তার বয়স আর বুদ্ধি দুটোই কম, জানিস তো। আর মেয়েটা ভীষণ সেনসিটিভ। আমি জানি সায়ু আমাকে বন্ধুর বাইরে কখনোই কিছু ভাবেনি। তাই আমি হঠাৎ করে ওকে প্রেমনিবেদন করে বসলে সে ভুল বুঝবে। আর আমি চাই না আমার একপাক্ষিক অনুভূতির জন্য আমাদের বন্ধুত্বটা নষ্ট হোক। ‘

‘ সায়ু প্রেম ভালোবাসা বুঝে না কারণ তার সামনে কখনো কেউ সেসব উপস্থাপন করেইনি। তোহা, সাফা, নাজ তিনজনই আমরা তিনজন ছাড়া অন্য কোনো ছেলের সাথে সেভাবে মিশেইনি কখনো। বান্ধবীরা যেখানে এসব থেকে দূরে ছিলো সেখানে সায়ুর মনে প্রেম ভালোবাসা নিয়ে দ্বিধা থাকাটা ভুলের কিছু না। আর তুই কখনোই ওকে বন্ধুর বাইরে অন্যভাবে ট্রিট করিসনি যে তোকে নিয়ে ওর মনে একটা আলাদা সফট কর্নার জন্ম নিবে। একবার বন্ধুর খোলস থেকে বাইরে এসে ফায়াজ হয়ে দেখা। সায়ু কোমল একটা কলি মাত্র। যেখানে তোর একটু প্রচেষ্টাই যথেষ্ট ওর মনে ফুল ফোটানোর জন্য। (একটু থেমে) সায়ুকে বোঝার জন্য সময় দিতে গিয়ে এতো বেশি সময় দিয়ে ফেলিস না যে সায়ুর অবুঝ মনটা অন্য কারো দখলে চলে যায়। সময় থাকতে নিজেরটা নিজে বুঝে নিতে শিখ। ‘

আয়ানের কথাগুলো মন দিয়ে শুনছিলো ফায়াজ। শেষের কথাটা শুনেই বুকের ভিতরটা ধক করে উঠলো তার। সেই স্কুল লাইফের শেষ দিক থেকে সায়েরীকে পছন্দ করে সে। কলেজে উঠার পর পছন্দটা ভালোবাসায় রূপ নিয়েছে। একমাত্র আয়ান ব্যাতিত আর কেউ অবগত নয় এই ব্যাপারে। ফায়াজ চাইও না কেউ ভুল বুঝুক তাকে। একটা সঠিক সময়ের অপেক্ষায় সে। সায়েরী মেয়েটা ভীষণ বাচ্চা স্বভাবের। কলেজে দ্বিতীয় বর্ষের স্টুডেন্ট হয়েও তার বুদ্ধি আর বোঝ ক্ষমতা যেনো এখনো স্কুলে পড়ুয়া অবুঝ বালিকাদের মতো। সেখানে কি করে ফায়াজ বলবে নিজের মনের কথা! দেখা গেলো ফায়াজের কথা শুনে উলটা পালটা ভেবে কেঁদে কেটে বন্ধুত্বটাই নষ্ট করে ফেললো। নাহ! এতো বড় রিস্ক নেওয়া যাবে না। বরং আয়ানের কথা মতোই এবার থেকে বন্ধু নয়, ফায়াজ হয়েই ধীরে ধীরে নিজের অনুভূতিগুলো প্রকাশ্য আনবে সে।

সাদিফের দেওয়া নীল শাড়িতে নিজেকে সাজিয়েছে নাজরাত। অভিমানী মন একবার ভেবেছিলো পড়বেই না এই শাড়ি। কিন্তু আবার ভাবলো সাদিফ দিয়েছে আজকের দিনে পড়ার জন্যই। তার অবচেতন মন বলছে আজ সাদিফ আসবে তার সাথে দেখা করতে। উফফ্!! ভেতরটা অস্থিরতায় ফেটে যাচ্ছে। আবার একটু রাগও হচ্ছে কাল সারাদিন সাদিফ একবারের জন্যও খোঁজ নেয়নি বলে। আজ আদো সাদিফ আসবে তো! এবার কি একটু সে ফোন করে দেখবে নিজ থেকে! পরক্ষণে আবার ভাবলো নাহ, ফোন করার দ্বায়িত্ব সাদিফের। অনার্স ভবনের বিশাল বারান্দার এককোনায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিলো সায়েরী, তোহা এবং সাফ্রিন। পাশেই রিলিং এর সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে সাদিফকে নিয়ে এসব ভাবছিলো নাজরাত।

নাজরাত ব্যাতিত বাকি তিনজনের গায়ে লাল সাদা কম্বিনেশনের শাড়ি। কিন্তু সাফ্রিনের গায়ের শাড়িটা যে খুব ভালো মানের তা দেখেই বুঝা যাচ্ছে। সাফওয়ানের চেয়েও অত্যাধিক ফর্সা গায়ের রঙ সাফ্রিনের। গোলগাল মুখটা রোদের তাপে রক্তিম হয়ে আছে। মেদহীন শরীরটা যে কারো নজর কেড়ে নিতে বাধ্য। কিন্তু সেই দুঃসাহস দেখানোর সাহসটুকু নেই কারোরই। হবেই বা কি করে! তুখোড় রাজনীতিবিদ নওশাদ খানের একমাত্র মেয়ে বলে কথা। যার দিকে চোখ তুলতেও সবার হাটু কেঁপে উঠে, সেখানে খারাপ নজর তো নিজের জীবন বাজি রাখার মতোই কাজ৷ সাফ্রিনের কাছের বন্ধু বান্ধব হওয়ার সুবাদে অনেকেই এড়িয়ে চলে সায়েরীদের।

আবার অনেকে নিজেদের ইমেজ হাই করতে যেচে এসে ফ্রেন্ডশিপ করে যায়। একমাত্র সাফ্রিন আছে বলেই এই বন্ধুমহলের অন্য কোনো মেয়ের দিকে হাত বাড়ায় নি ছেলেরা। সর্বদা এড়িয়ে গেছে নিজের জীবন রক্ষার্তে৷ তাই তো, প্রেম ভালোবাসা সম্পর্কে খুবই অনভিজ্ঞ সায়েরী, তোহা, সাফ্রিন এবং নাজরাত। এজন্যই কিশোরী বয়সের শেষ ধাপে এসে নাজরাতের জীবনে সাদিফের আগমন ছিলো প্রণয়নের বিশুদ্ধ বাতাস সরূপ। সাদিফ নামক মানুষটার সাথে অল্প সময়েই গভীরভাবে জড়িয়ে গিয়েছে নাজরাত। তাই তার সদ্য প্রেমে পড়া মনটাই অভিমানটাও ধরা দিলো গাড়ো রূপে।

“দায়িত্ব” শব্দটা ছোট হলেও এর অর্থটা হারে হারে ঠের পাচ্ছে অনার্স ফাইনাল ইয়ারের স্টুডেন্ট-রা। যেখানে ইন্টার প্রথম বর্ষ থেকে শুরু করে সব ইয়ারের ছেলেমেয়েরা সেজেগুজে ইচ্ছেমতো ক্যাম্পাসের আনাচেকানাচে ঘুরে বেরাচ্ছে। সেখানে সিনিয়ররা ব্যাস্ত প্রোগ্রামের সব আয়োজন সামাল দিতে। সাদা আনারকলি ড্রেসের উড়নাটা কাঁধ থেকে কোমরের একপাশে এনে গিট দিয়ে অনুষ্ঠান হোস্ট করার জন্য রেডি করা রেডি করা কাগজগুলো একে একে সাজাতে লাগলো নীতি৷ হোস্ট করার দায়িত্ব যদিও জিমনের। কিন্তু কনসেপ্ট রেডি করেছে নীতি। জিমন আর রায়ান মিলে জুনিয়র কিছু ছেলেদের কি সব বুঝিয়ে দিচ্ছে। দেখা নেই একমাত্র মিহাদের। নীতি চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে পূণরায় কল করলো মিহাদকে। এবারেও সংযোগ দেওয়া সম্ভব হলো না।

রাগে মাথার ভিতরে ধপ ধপ করতে লাগলো নীতির। এই মিহাদটা সবকিছুতেই খামখেয়ালি করে। বিরক্ত হয়ে কাঁধ অবধি ঠাই পাওয়া চুলগুলো পেছিয়ে খোপা করে ফেললো সে। এতো কিছুর মাঝে হঠাৎই মনে হলো সে ভীষণ একা। মনের কোণে উঁকি দিলো একটা নাম। ইরা। চোখ ছলছল করে উঠলো নীতির। কতোগুলো দিন হয়ে গেলো বেস্ট ফ্রেন্ড নামক মানুষটার সাথে দেখা হয়না, কথা হয়না। আজ অবধি কলেজের প্রত্যেক স্পেশাল অকেশনে তারা দুজন ম্যাচিং করে শাড়ি পড়তো। নীতি বরাবরই একটু টম বয় টাইপের মেয়ে। আর ইরা ছিলো সহজ সরল একেবারে বাঙালিয়ানা মেয়ে। কতো বছরের বন্ধুত্ব তাদের। অথচ আজ! আজ নীতি জানেও না বেস্ট ফ্রেন্ড নামক মানুষটা কোথায় আছে। আদো বেঁচে আছে কি….আচমকা মিহাদের উপর রাগটা তীব্র হলো নীতির। সব কিছুর জন্য এই ছেলেটাই দায়ী। এই লুস ক্যারেক্টার ছেলেটার জন্যই আজ মেয়েটা হারিয়ে গিয়েছে স্ব-ইচ্ছায়।

‘ সাফওয়ান কোথায় গেলো হঠাৎ! অনুষ্ঠান শুরু হতে তো বেশি সময় নেই। ‘
কথাটা বলতেই ব্যস্ত ভঙ্গিতে ঘড়ি দেখলো রায়ান। সব কাজ মিটিয়ে তারা নেমে আসলো স্টেজের দিকটাতে। সারি সারি চেয়ার বসানো হয়েছে স্টুডেন্টস দের জন্য। বিশাল মাঠ হওয়ায় অনাসয়ে ঠাই পেয়ে গেলো সকলে। বান্ধবীদের রেখে একটু রিহার্সাল রুমে গিয়েছিলো সায়েরী। সেখান মিহাদকে না পেয়ে তাড়াহুড়ো করে সিড়ি বেয়ে নামতে গিয়ে শাড়িতে পা আটকে হোচট খেলো সে। সেই সাথে আবারো খেলো তার বিশ্ব বিখ্যাত ধাক্কা। সায়েরীর মনে হলো এই বুঝি সব শেষ। এই বুঝি পড়লো সে সিড়ি থেকে গড়াগড়ি খেয়ে। কিন্তু না! সে তো আটকে আছে। শক্ত কিছুর সাথে শরীরটা এঁটে গেছে যেনো। পড়ে যাওয়ার ভয়ে বুকের ভিতরটা ধুপধুপ করছিলো তার। যখনই অনুভব করলো সে বেঁচে গিয়েছে এই যাত্রায়, তখনই পিটপিট করে চোখ তুলে তাকালো সে। তার মুখের অতি নিকটে দেখতে পেলো সেই চিরপরিচিত গম্ভীর মুখশ্রী। অন্যসময় হলে সাফওয়ান বিরক্তমুখে দ্রুত দূরে সরিয়ে দিতো সায়েরীকে। কিন্তু আজ সায়েরী স্পষ্ট দেখতে পেলো সাফওয়ানের চোখে বিষ্ময়ের রেশ। তার অবাক দৃষ্টি সায়েরীতে নিবদ্ধ হলো বেশ কিছু সেকেন্ডের জন্য। কিন্তু সাফওয়ানের উপস্থিতি বুঝতে পেরেই চট করে দূরে গেলো সায়েরী। চমকে উঠলো সাফওয়ান। কিন্তু তার চেয়ে দ্বিগুণ চমকালো সায়েরী। যখন দেখলো সাফওয়ানের পেছনে নীতি, রায়ান ও জিমনের উপস্থিতি। চার জোড়া চোখের অবাক দৃষ্টি তার পানে। ভারী অস্বস্তিতে পড়লো সায়েরী। আজ কার মুখ দেখে যে সকালে উঠেছে! বারবার এই অসহ্যকর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে।

অন্যদিকে নীতিসহ উপস্থিত বাকি তিনজন অবাক হয়ে গেলো তাদের বহু দিনের চেনা সায়েরীর হঠাৎ পরিবর্তিত রূপ দেখে । লাল পাড়ের সাদা শাড়িতে ভীষণ মায়াবতী মনে হচ্ছিলো সায়েরীকে। কপালের দুপাশে ছোট ছোট কিছু চুল বেরিয়ে আছে। বাকি চুলগুলো খোপায় আটকানো। কানে শুভা পাচ্ছে ছোট্ট একজোড়া ঝুমকা। শ্যামবতী মুখশ্রীটাতে একরাশ মায়া তার। আজ যেনো বাঙালি সাজে সেই মায়া বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। অন্য মেয়েদের মতো হরিণী টানা চোখ নয় সায়েরীর। তার চোখজোড়া ডাগরডাগর। এই চোখগুলোই যেনো বিশেষত্ব সায়েরীর সৌন্দর্যের। আজ সেই গোল গোল চোখজোড়াতে লেপ্টে আছে চিকন রেখার কাজল। সবসময়ের লালছে ঠোঁটজোড়াতে আজ চিকচিক করছে রেড লিপগ্লস। নীতি মেয়ে হয়েও অবাক, বিষ্ময়ে হা হয়ে গেলো। এমন নয় যে সায়েরীকে কোনো অপ্সরী কিংবা রূপকথার গল্পের পরীদের মতো সুন্দর লাগছে। কিন্তু তাদের চেনা মিষ্টি মুখের শ্যামবতী বাচ্চা মেয়েটাকে যে শাড়িতে এমন যুবতী লাগবে তা ভাবতে পারেনি কেউই। হ্যাংলা পাতলা শরীরটাতে শাড়িটা ভীষণ মানিয়েছে সায়েরীকে।

চার জন সিনিয়র সামনে পথ আটকে দাঁড়িয়ে। সায়েরী শত ইচ্ছা স্বত্তেও পারলো না এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে ছুটে পালাতে। সেই যে চোখ তোলে একটাবার তাকিয়ে ছিলো সবার দিকে, এরপর আর সাহস হয়ে উঠেনি তাকানোর। কিন্তু এবার যেনো ধর্য্যের বাঁধ ভাঙ্গতে লাগলো তার। আড়চোখে একবার সাফওয়ানের মুখের দিকে তাকালো সে। কপালে ভাঁজ ফেলে আগের চেয়েও দ্বিগুণ গম্ভীরমুখে তাকিয়ে আছে সাফওয়ান। সায়েরীর চোখে চোখ পড়তেই খানিক নড়েচড়ে দাঁডিয়ে বাকিদের দিকে তাকালো বিরক্তমুখে। এরপর সায়েরীকে পাশ কাটিতে ধুপধাপ পা ফেললো উপরের সিড়ির দিকে। সাফওয়ান সরে যেতেই খালি স্থান দিয়ে দ্রু পা চালালো সায়েরীও। কিন্তু বেশি দূর আগানোর আগেই হঠাৎ শুনতে পেলো সেই ভরাট কন্ঠের ডাক, ‘এই মেয়ে! ‘

থমকে গেলো সায়েরী। ঘাড় উঁচু করে তাকালো সাফওয়ানের দিকে। সাফওয়ান পকেট থেকে কাগজে মোড়ানো কিছু একটা বের করে হুট করেই ছুড়ে মারলো সায়েরীর দিকে। ভয় পেয়ে মুখের উপর দুহাত রাখতেই সেই হাতের উপর এসে পড়লো জিনিসটা। সেদিকে একনজর তাকিয়ে চলে গেলো সাফওয়ান। অবাকের চেয়েও কষ্ট বেশি লাগলো সায়েরীর। না জানে সাফওয়ানের কোন পাকা ধানে মই দিয়েছে সে। যার জন্য সবসময় তার সাথে এমন বাজে আচরণ করে এই ছেলে। এইযে একটু আগেও তার দিকে কপাল কুঁচকে বিরক্ত মুখে তাকিয়ে ছিলো সাফওয়ান। এমনভাবে তাকিয়ে কি বুঝাতে চেয়েছিলো সে? সায়েরীকে দেখতে খারাপ লাগছে সেটা! লাগলে লাগছে। সায়েরী তো বলেনি তার দিকে তাকিয়ে থাকতে। তবে নিজ থেকে তাকিয়ে আবার বিরক্তবোধ করার কি দরকার?

‘ সায়েরী!’
নীতি ডাকলো মিষ্টি কন্ঠে। সে বুঝতে পারছিলো সায়েরীর মন খারাপের কারণটা। তাই কাছে গিয়ে থুতনিতে হাত রেখে অবাক হওয়ার ভান করে বললো,
‘ ইশশ! আমার তো বিশ্বাস করতেই কষ্ট হচ্ছে যে তুমি আবরারের সেই পুচকি বোনটা।কেমন বড় বড় লাগছে!’
‘ বাজে বকো না তো নীতি আপু। ভালো লাগছে না আর এসব। ‘
বেজার কন্ঠে কথাটা বলতেই জিমন বুকে হাত দিয়ে বলে উঠলো,
‘ হায়েএএ….আজ ওই গুমরা মুখটাও কি মায়াবী লাগছে! ইশ!! কেনো যে তুমি আবরার ব্যাটার বোন হতে গেলে! নাহলে তো আজ আমার রাস্তা ক্লিয়ার থাকতো। (হতাশ কন্ঠে) আজ বুঝতে পারলাম কেনো বন্ধুর বোনকে গোলাপের কাটা বলা হয়।
নীতি আর মিহাদ শব্দ করে হেসে উঠলো জিমনের কথা শুনে। সায়েরীও হাসলো ঠোঁট চেপে। জিমনের দুষ্টুমি দেখে সে হাসি মুখে জানতে চাইলো,

‘ কেনো বলা হয় ভাইয়া?’
‘ এই দেখো না, আমার সামনে সদ্য ফুটা সাদা গোলাপ দাঁড়িয়ে আছে। অথচ আমি তাকে ছুঁতে পারছি না।বুকে বিধছে আবরার নামক কাঁটা। উফ!! ‘
ব্যথা পাওয়ার ভান করে শেষের কথাটা বললো জিমন। তার অভিনয় দেখেই হেসে ফেললো বাকিরা। সায়েরী টাট্টা করে বললো,
‘ নিচে আরো একটা গোলাপ আছে ভাইয়া। একেবারে টুকটুকে লাল গোলাপ। নাম জানেন তো কি? সাফ্রিন সাফা খান। ”
চোখ বড় বড় করে আশেপাশে তাকিয়ে ঢোক গিললো জিমন। ভীতু গলায় বললো,

‘ মাফ চাই বোন। এতো বড় অপবাধ আমার কাঁধে দিওনা। আমি তো মজা করে বলেছি। কিন্তু এই সাফওয়ানের বাচ্চা শুনতে পেলেই আমার খেলা খাতাম করে ছাড়বে।’
‘ সে নাহয় আমি চুপ করলাম। কিন্তু আগে বলুন মিহাদ ভাইয়া কোথায়? ‘
মিহাদের নাম শুনেই একটা জগন্য গালি দিলো নীতি। সেই সাথে বললো,

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৯

‘ জাহান্নামে যাক ওই বান্দর। আর কেউ খবর নিবিনা ওর। কান্ড জ্ঞান কিছু নেই এই বেদ্দপের মাথায়। আসুক আজকে। ওর অবস্থা যদি নাজেহাল করে না ছাড়ি তবে আমার নামও নীতি না। ‘
অবস্থা বেগতিক দেখেই কেটে পড়লো জিমন এবং সায়েরী। রায়ান বেচারা আটকে রইলো প্রেমিকার ভয়ংকর রাগের একমাত্র নিরব দর্শক হয়ে।

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১১