মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ২৪
jannatul firdaus mithila
গায়ে জড়ানো হলুদ রঙা লং হাতার ফ্লোরাল ফ্রক! তরুণীর মাথাভর্তি কার্লি চুলগুলো হাওয়ার দোলে ভাসছে। গায়ের শালটা যে কোথায় পড়ল কে জানে! তরুণীর পায়ের গতি বড্ড জোরালো। হাতে একখানা কাঁচের গ্লাস! একটু আগ অব্দি যেখানে গ্লাসভর্তি পানি ছিলো, এখন সেথায় পানির পরিমাণ অর্ধেক। তরুণী উদ্ভ্রান্তের ন্যায় পানি নিয়ে ছুটে আসছে প্যালেসের বাইরে। ঠিক যেখানে মাহি’কে একা রেখে গিয়েছিল, সেথায় এসে দাঁড়াতেই ভ্রু গোটায় মিলা। হাঁপাতে হাঁপাতে ঘাড় বাকিয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে খুঁজতে থাকে সপ্তদশীকে। তবে নাহ! সপ্তদশী তো দূর, তার টিকি টা-ও তো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না কোথাও। মিলার বুক কেঁপে ওঠে অজানা আতঙ্কে। গলাটা শুকিয়ে কাঠ প্রায়। মনে মনে আওড়ায় —মেয়েটা আবার কোথায় গেল? এখানেই তো রেখে গিয়েছিলাম ওকে।
তরুণী ভয়ার্ত ঢোক গিলল বারকয়েক। তক্ষুনি পা বাড়াল প্যালেসের পথে। সদর দরজার দু’ধারে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে চারজন গার্ডস। মিলা হন্তদন্ত পায়ে ছুটে এসে হড়বড়িয়ে তাদের জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ আমার সাথে যে মেয়েটা বাইরে বেড়িয়েছিল সে কি আমার চলে আসার পর প্যালেসে এন্টার করেছে?”
গম্ভীর মুখো গার্ডরা মাথা নাড়ায় দু’ধারে। মুখাবয়বে বেশ গাম্ভীর্যের ছাপ ফুটিয়ে বলে ওঠে,
“ নো! সে ভেতরে ঢুকেনি।”
আশ্চর্য বনে গেল মিলা! মেয়েটা ভেতরে না গেলে কোথায় গেল? সে-কি আবার একা একা হাঁটতে গেল না-কি কোথাও? মিলা তৎক্ষনাৎ উদ্ভ্রান্তের ন্যায় ছুট লাগালো উল্টো পথে। এহেন তীব্র স্নোফলও আজ থামাতে পারছেনা তরুণীকে। সে যে আজ বড্ড বিচলিত, বড্ড অস্থির তার মুনলাইটের জন্য। মিলা দৌড়াচ্ছে প্যালেসের ডানদিকে। মেয়েটার তো আবার চেরি ব্লসম বড় পছন্দের, মিলার অবচেতন ধারণা — সে হয়তো সেদিকেই গিয়েছে। তাইতো মিলা পা বাড়িয়েছে সেথায়। উম্মুক্ত দু-পায়ের তালু অবশ হয়ে যাচ্ছে বরফের ঘর্ষণে। বুকের খাঁচায় লুকায়িত অঙ্গটা বুঝি লাফাচ্ছে রীতিমতো। মাথাভর্তি হাজারো চিন্তা। প্রায় মিনিট পাঁচেক পেরুলো বোধহয়, মিলা ততক্ষণে চেরি ব্লসম গার্ডেনে হাজির। চারদিকের অগণিত সারিবদ্ধ ল্যাম্পোস্টের আগায় জ্বলছে সফেদ রঙা নিয়ন আলোর বাতি। গার্ডেনের প্রতিটি কোণায় কোণায় পৌঁছাচ্ছে আলোর ছটা। কিন্তু ওমাহ! মেয়েটা যে কোথাও নেই। মিলার হাসফাস বাড়ল এপর্যায়ে। বৃহদাকার গার্ডেনটা পুরো একবার প্রদক্ষিন করতেই তার লেগে গেল পাক্কা বিশ মিনিট। তারপরও মাহির দেখা মিললো না! মিলা কাঁপছে, তা ভয়ে নাকি ঠান্ডায় কে জানে! মেয়েটা কাঁপা কাঁপা কন্ঠে কোনমতে চেঁচিয়ে ওঠে ডাকল —
“ মুনলাইট! ও মুনলাইট? কোথায় তুমি।”
প্রতিত্তোরে জবাব আসেনি। মিলার কান্না পাচ্ছে ভীষণ। মেয়েটা কোথায় গেল? আবার কোন অঘটন ঘটবে কে জানে। মিলা ভেঙে পড়ছে ভেতর থেকে। পাদু’টো ক্রমশঃ অবশ হয়ে যাচ্ছে তার। তরুণীর সাধ্যিতে কুলোয়নি আর দাঁড়িয়ে থাকতে। পাদু’টো আচমকা হাঁটু ভেঙে বসল বরফের পুরু আস্তরণের ওপর। গা ঝংকার তুলছে তরুণীর, চোখের কার্নিশ বেয়ে টুপ টুপ করে ঝরে পরছে অশ্রুদানা। মনটা বড্ড দোষাচ্ছে তাকে। মেয়েটা তবে তার দোষেই হারালো এবার? মিলা ফাঁপা ঢোক গিললো বারকয়েক। আনমনে কাঁদতে কাঁদতে হঠাৎ করেই মস্তিষ্কে তার কড়া নাড়ল এক ভিন্ন প্রশ্ন! মিলা থমকায়। কান্না ভুলে হতবিহ্বলের ন্যায় আওড়ায়,
“ সন্ধ্যা থেকে বারবার ট্রাকের কথা জিজ্ঞেস করা, ট্রাক কোথায় আছে সে তথ্য জানা। তারপর আবার এহেন গা হিম ধরিয়ে দেওয়া ঠান্ডার মধ্যে হাঁটতে বের হতে চাওয়া, হাঁটার মাঝে হুট করে পেট ব্যথা করা — সবটাই কি কাকতালীয় ছিল মুনলাইট? না-কি তোমার ইচ্ছাকৃত প্ল্যান?”
মিলার মসৃণ ললাটে ভাঁজ পড়ল তৎক্ষনাৎ। ভ্রু-দ্বয় কুঁচকে গেল সামান্য। মুখাবয়ব থেকে এতক্ষণের কান্না কান্না ভাবটা প্রায় সরে যেতে লাগল, সেথায় এবার ভীড় জমালো একরাশ ভয়! মেয়েটা তবে ফের বোকামি করেছে? ঐ ভয়ানক জঙ্গলে একা একা… বাকিটা ভাবার সময় হলোনা তরুণীর। গায়ে পেয়েছে অদ্ভুত জোর। সে তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ায় বসা ছেড়ে। অতঃপর এক দৌড়ে ছুটে যায় প্যালেসের বা-দিকে। বিদঘুটে অন্ধকারে নিমজ্জিত জঙ্গলের আদ্যপ্রান্ত। মিলার আবার এহেন অন্ধকার নিয়ে খুব একটা ভয়-ডর নেই। চোখেমুখে একরাশ উদ্বিগ্নতা নিয়ে তরুণী কেমন পা বাড়ালো অন্ধকার পথে….
অদূর থেকে ভেসে আসছে খেকঁ শেয়ালের হাঁক-ডাক! রাতের পেঁজা গুলো বোধহয় আশেপাশের বড় বড় ওক গাছের ডালে বসে থেকে গুটগুট শব্দ তুলছে। চারিদিকের সুনশান নিরবতা ভেঙে হুটহাট ধেয়ে আসা এহেন হাঁক ডাকে গা কাঁপুনি দিচ্ছে মিলার। অন্তর কাঁপছে ওমন ভয়ানক জঙ্গলের ভেতর প্রবেশ করতে। তবে এছাড়া যে আর পথ নেই তার কাছে! বোকা মেয়েটা নিশ্চয়ই তার কথা শুনে এ পথ দিয়ে পা বাড়িয়েছে। তাও হয়তো একা একা! কথাগুলো ভাবতে গিয়েই মিলা কাঁদছে কেমন! দু’হাত বুকের কাছে জড়সড় করে ঠেকিয়ে রেখে হেঁচকি তুলছে বারংবার। একবুক আর্তনাদ নিয়ে বিড়বিড়িয়ে বলে,
“ কেনো এমন বোকামি করতে গেলে মুনলাইট? কেনো করলে? আমিতো তোমায় বলেছিলাম, এখানে সাধারণের প্রবেশ করা মানে — স্বয়ং মৃত্যুর সাথে আলিঙ্গন করা। সেখানে তুমি কেন এ পথে গেলে মুনলাইট? কেন গেলে? এবার আমি তোমায় কোথায় খুঁজব মুনলাইট? কি জবাব দিব মনস্টারকে? কিভাবে বলব — আমার সামান্য অবহেলার জন্য তুমি আজ পালাতে সক্ষম হলে।”
তরুণীর কান্নাভেজা চোখদুটো অন্ধকারে দিশা হারাচ্ছে। পাদু’টো রয়েসয়ে এগুচ্ছে সম্মুখ পানে। মনে মনে বারবার জপে যাচ্ছে সৃষ্টিকর্তার নাম! ভয়াতুর তরুণী কয়েক কদম এগিয়েছে বোধহয়, ঠিক তখনি পেছন থেকে একখানা শক্তপোক্ত হাত এসে খপ করে চেপে ধরে তরুণীর ডানহাতের কনুই। মিলা থমকায়! ভয়ার্ত কন্ঠে চিৎকার দেবার আগেই এক হেঁচকা টানে তাকে পেছনে ঘুরিয়ে নেয় শক্তপোক্তের হাতের মালিক। মিলা চোখদুটো কুঁচকে নিয়ে চেঁচাচ্ছে এবার। গলা ফাটাচ্ছে আতঙ্কে! এরইমধ্যে সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা গম্ভীর মুখো যুবক, চোখেমুখে একরাশ বিরক্তি নিয়ে দাঁত খিঁচে দিল এক ধমক!
“ শাটআপ গ্লুপায়া!”
কর্ণকুহরে পরিচিত কন্ঠ পৌছাঁতেই রয়েসয়ে পিটপিট করে তাকায় তরুণী। আধো আধো দৃষ্টিতে দেখতে পায় — সম্মুখে সটানভাবে দাঁড়িয়ে আছে গম্ভীর মুখো এডউইন। হাতে জ্বলছে টর্চ লাইট! যুবকের চোখেমুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ। সে কেমন ঝাঁঝ দেখিয়ে ফের বলল,
“ হোয়্যার দ্যা হেল আর ইউ গোয়িং? হুটহাট ম’রার এতো শখ জাগলো কেন তোমার?”
ফাঁপা ঢোক গিললো মিলা। কণ্ঠনালী উপচে কান্না বেরুনোর যোগাড় যেন। মেয়েটা কেমন ফোপাঁতে ফোপাঁতে আওড়াল,
“ এডউইন! আমার মুনলাইট!”
ভড়কায় এডউইন! কপালে দ্বিরুক্তির ভাঁজ টেনে শক্ত কন্ঠে শুধায়,
“ কে মুনলাইট?”
মিলা কাঁদছে অনবরত। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কান্না আটকানোর সে-কি ব্যর্থ প্রয়াস তরুণীর। এডউইনের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বরাবরের ন্যায় আজও নিখাঁদ ভাবে পরোখ করছে মেয়েটাকে। তার অবচেতন মনটা এক-আধবার বেহায়া প্রস্তাব ছুঁড়েছে তার নিকট। বারবার তাকে উত্যক্ত করছে — সে যেন একটু এগিয়ে এসে মেয়েটার পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। নিজ হাতে তরুণীর মসৃণ কপোল বেয়ে ঝরে পড়া অশ্রুকণা গুলো মুছে দেয়! কিন্তু গম্ভীর স্বভাবের কঠোর এডউইন নিজের মনের কোণে উত্থাপিত হওয়া এহেন বেহায়া প্রস্তাবের ধার ধরলো না মোটেও। উল্টো চোখেমুখে কপট রাগী ভাব টেনে গমগমে গলায় বলল,
“ মুখে জিভ নেই? কথা বলছো না কেন?”
কান্নারত মিলা, বারংবার হেঁচকি তুলছে কেমন। এডউইনের সাধারণ কথাও বড্ড ধমকের সুরে শোনায় তার নিকট। মেয়েটা কেঁপে কেঁপে উঠছে কান্নার তোড়ে। এডউইনের মেজাজ চটলো এবার। মেয়েটার এহেন নিরবতা বড় বিষাক্ত ঠেকে তার নিকট। তা কেন? কে জানে! এডউইন তক্ষুনি হাতের জোর বাড়ালো। চেপে রাখা মিলার ডানহাতের কনুই ধরে টানতে টানতে মেয়েটাকে নিয়ে পা বাড়ালো প্যালেসের দিকে। এদিকে মিলা না চাইতেও হাঁটছে! এডউইনের জোরালো পায়ের গতির সঙ্গে পা মিলাতে গিয়ে বড় হিমশিম খাচ্ছে বেচারি।কোনমতে নাক টেনে টেনে বলে ওঠে ,
“ মা-মাহি! আমার মুনলাইট, ও পালিয়ে গেছে এডউইন।”
তৎক্ষনাৎ থামল এডউইনের ব্যস্ত পাদুকা। কানের পাশ কাটিয়ে মাত্রই যেন ভো শব্দ তুলে বোলতা উড়ে গেল। থমকানো যুবক ঘাড় বাকিয়ে তাকায় পেছনে। হতবাক দৃষ্টিতে দৃঢ় চোয়ালখানা নাড়িয়ে ধীমি স্বরে বলে,
“ কিহ?”
মিলা এবারেও ঢোক গিললো সামান্য। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ওপর নিচ মাথা নাড়িয়ে জানালো — সত্যি! এডউইনের তখন কি হলো কে জানে! গম্ভীর যুবকের দৃঢ় চোয়ালখানা শক্ত হয়ে ফুটে উঠেছে পরক্ষণে। চোখদুটোতে লেপ্টে গেল অদৃশ্য আগুন। নিজ হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে যুবক আচমকা চেপে ধরে মিলার কন্ঠা। মিলা হকচকায়! নিশ্বাস ফেলার যোগাড় নেই তার। এডউইন কেমন কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে চিড়বিড়িয়ে বলল,
“ কিভাবে পালালো ও? তুই কোথায় ছিলি? উত্তর দে গ্লু পায়া!”
মিলার কন্ঠরুদ্ধ! চোখের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে নোনাধরা। হাতের জোর বাড়াচ্ছে এডউইন! চোয়াল কাঁপছে থরথর করে। অসহায় মিলার ছটফটানি বাড়ছে ক্রমশঃ। চোখদুটো প্রায় বুঁদে আসছে তরুণীর। এডউইনের ক্রুর দৃষ্টি হঠাৎ গিয়ে আটকাল তরুণীর ছলছল চোখ পানে। মুহুর্তেই নিজের সম্বিতে ফিরল যুবক। মুখাবয়ব থেকে পরমুহূর্তেই সরে গেল রূঢ়তার ছাপ। সে কেমন তড়িঘড়ি করে ছেড়ে দিলো মিলার কন্ঠা। ছাড়া পেতেই হাঁপাচ্ছে মিলা! দু-হাত বুকে চেপে, বড় বড় নিশ্বাস ফেলছে তরুণী। এডউইন নিজের উপচে পড়া রাগ সংবরণে ব্যস্ত! চোখদুটো খানিকক্ষণ বুঁজে রেখে, ঠোঁট গোল করে নিশ্বাস ফেলে তক্ষুনি ছুটলো প্যালেসের দিকে। হাঁক ছেড়ে ডাকল,
“ গার্ডস!”
মনস্টারের ডানহাত বলে কথা! ক্ষমতার থোড়াই অভাব আছে তার? যুবকের একডাকে একঝাঁক গার্ডস এসে হাজির। এডউইন শক্ত মুখে এগোয় তাদের দিকে। অতঃপর বলা নেই, কওয়া নেই, আচমকা সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক গার্ডের ঘাড় চেপে ধরে একহাতে। দাঁতে দাঁত চেপে কঠিন গলায় হুংকার ছুঁড়ে বলে,
“ ইউ ব্লাডি বা*স্টার্ডস! প্যালেস জুড়ে এতো এতো গার্ডস থাকা স্বত্বেও ঐটুকুন পুঁচকে একটা মেয়ে পালায় কি করে? উত্তর দে স্কাউন্ড্রেলস!”
ভয়ার্ত ঢোক গিলছে সবাই। তারা তো নিজ দায়িত্বে যথেষ্ট তৎপর। সে-তো মনস্টারের হুকুম ছিলো — মেয়েটার দিকে ভুলক্রমেও যেন কারো চোখ না পড়ে। সেজন্যই তো তারা ওমন চোখ নামিয়ে রেখেছিল! তারা থোড়াই জানতো মেয়েটা পালাবে? এডউইনের রাগ বাড়ছে তরতর করে। সম্মুখের গার্ডের ঘাড়ের ওপর হাত চেপে রেখেই, বেচারাকে ছুঁড়ে ফেলল বরফের কোলে। অতঃপর কঠিন গলায় হুংকার ছুঁড়ে বলল,
“ গার্ডস! এজ সুন এজ পসিবল — মাইল্ড ফরেস্টে তল্লাশি দে। ফরেস্টের প্রতিটা আনাচে-কানাচে খুঁজে দেখ মেয়েটা কোথায় আছে। এতে যদি হিংস্র পশুদের কবলে পড়তেও হয় তাহলে পড়বি! ম’রে গেলে যাবি, কিন্তু ভুলক্রমেও খালি হাতে ফেরার দুঃসাহস করবি না। যেভাবেই হোক, দরকার পড়লে আকাশপাতাল এক করে হলেও মেয়েটাকে খুঁজে বের কর। আদারওয়াইজ — নিজেদের মৃ’ত্যুর পয়গামের জন্য অপেক্ষা কর।”
বসফরাসের ধারে দাঁড়িয়ে আছে বিখ্যাত ক্যাসিনো — দ্য ব্ল্যাক টিউলিপ! পাঁচ তলা সুউচ্চ ভবনটিতে কেবলমাত্র এলিটদের প্রবেশ কাম্য। আধুনিক কারুকার্যে নির্মিত ভবনটি বাইরে থেকে দেখতে ঠিক যতটা শান্ত, ভেতরকার পরিবেশ তার একদম উল্টো! চকচকে রং-বেরঙের পাথরের ওপর কারুকাজ খচিত প্রতিটি দেয়াল, নিচতলার সম্পূর্ণটা জুড়ে পোকার গেম এবং রুলেটের আসর। দোতলায় রয়েছে ভিআইপি ফ্লোর! বাদবাকি ফ্লোরে বিভিন্ন অজানা নিষিদ্ধ কাজের আসর। ইস্তাম্বুলের এ-ই ক্যাসিনো সাধারণত কালো টাকা ক্লিন করার অন্যতম বুথ হিসেবে কাজ করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিভিন্ন বড় বড় গ্যাংস্টার কিংবা মাফিয়াদের কালো টাকা এখান থেকেই ক্লিন হয়ে বাইরে বের হয়। ব্ল্যাক টিউলিপের একদম টপ ফ্লোরে ব্যাংক রুম। যেথায় অসংখ্য বড় বড় লকার! টাকার স্তুপে আচ্ছাদিত সব!
সকালের প্রথম কিরণ এসে গলগলিয়ে ঢুকছে ব্ল্যাক টিউলিপের ভিআইপি স্যুটে! মখমলের বিছানায় উদোম গায়ে গদগদ ভঙ্গিতে শুয়ে আছে — সুলতান হিশাম নাহিন, ক্যাসিনোর চেয়ারম্যান। আধবুড়ো মহাশয়ের দু’পাশে দু’জন বিদেশিনী! একই চাদরের নিচে আচ্ছাদিত প্রত্যেকের ন’গ্ন দেহ। নিষিদ্ধ কজে বুদঁ হয়েছে তারা। প্রহর কেটেছে বহু! তিনটে দেহ কেমন হাঁপাচ্ছে একে-অপরকে জড়িয়ে। আধবুড়ো মহাশয় দু-তরুণীর মাঝে বসে খিলখিল করছে কেমন। নিজস্ব ভাষায় কিসব বলছে কে জানে! তরুণীরা মুচকি মুচকি হাসছে তার কথায়। চারপাশের পরিবেশ তখনো বড্ড শান্ত! তবে কিয়তক্ষন পার হতে না হতেই ঘটলো আরেক কান্ড। আকাশের বুক চিঁড়ে নামছে কিছু! ভবনের খুব কাছ থেকে বোধহয় উড়ে যাচ্ছে তা। হিশাম কেমন হকচকিয়ে উঠলেন এরূপ বিকট গর্জনধ্বনিতে। বেচারা কোমরে একখানা তোয়ালে পেঁচিয়ে তড়িঘড়ি করে উঠে এলেন বিছানা ছেড়ে। গটগটিয়ে এগিয়ে এসে জানালার থাই সরিয়ে সামান্য উঁকি দিতেই দেখলেন — ভবনের সম্মুখে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে বেশকিছু ব্ল্যাক মার্সিডিজ। গাড়ি থেকে একে একে সশস্ত্র লোকজন বেরিয়ে এসে তার ক্যাসিনোতেই ঢুকছে। হিশাম একমুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেথায়। কপালে ফেলেছে গোটাকতক চিন্তার ভাঁজ। গাড়ি ভর্তি ওতো লোকজন তার ক্যাসিনোতে ঢুকছে কেনো? আর ভবনের ওপর দিয়ে ওভাবে হাঁক তুলে কার জেট-ই’বা উড়ছে? চিন্তায় হাসফাস করছে হিশাম। শরীর ঘুরিয়ে পেছনে ফিরলেন পরক্ষণে। বিছানায় অপেক্ষারত দু-তরুণী, তার পানে চেয়ে থেকে আবেদনময়ী হাসছে। চিন্তায় জর্জরিত হিশাম সেদিকে বিন্দুমাত্র উদ্বেগ দেখালো না কেন যেন। নিচের ঠোঁট কামড়ে কিছু একটা ভাবছে সে, আর ওমনি ল্যান্ডলাইনের ফোনটা কেমন কর্কশ শব্দে বেজে উঠল! হিশাম তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এসে ফোনখানা তুলে কানে ঠেকিয়ে যে-ই না কিছু বলবে ওমনি ফোনের ওপাশ থেকে রিসেপশনিস্ট তরুণী কেমন ভয়ে ভয়ে আমতা আমতা সুরে আওড়াল,
“ স-স্যার! সামওয়ান ইজ লুকিং ফর ইউ!”
ললাটে ভাঁজ পড়ল হিশামের। মুখটা হলো গম্ভীর। আধবুড়ো মহাশয় গলার স্বরে কর্কশ ভাব লেপ্টে জিজ্ঞেস করলেন,
“ হু ইজ দিস?”
ওপাশ থেকে তৎক্ষনাৎ প্রতিত্তোর আসেনি তেমন। শোনা যাচ্ছে তরুণীর ঘনঘন নিশ্বাস ফেলার শব্দ। প্রায় মিনিট খানেক পেরুনোর পর তরুণী কেমন হাসফাস করতে করতে শুধালো,
“ দা গার্ডস এড্রেসেস হিম এজ শ্যাডো মনস্টার!”
কানদুটো ঝা ঝা করে উঠল হিশামের। গাঁ-টা বুঝি ঝাঁকিয়ে উঠল তৎক্ষনাৎ। কাঁপা কাঁপা হাতের ফাঁক গলিয়ে অজান্তেই পড়ে গেল ফোনখানা। সে-ই সাথে টুট টুট টুট শব্দ তুলে কেটে গেল কল। হতভম্ব হিশাম আনমনে বিড়বিড় করল,
“ মনস্তার? কিন্তু কেনো?”
এদিকে ফোন কেটে গিয়েছে ল্যান্ডলাইনের। তরুণী ভয়ে জড়সড় ভাব নিয়ে দু-হাত কানের কাছে তুলে দাঁড়িয়ে আছে কেমন। মেয়েটার সারা গা বরাবর তাক করে রাখা বন্দুকের লৌহনল! চারিদিকে দাঁড়িয়ে আছে বেশ ক’জন কালো পোশাকধারী গার্ডস। কেউ কেউ আশেপাশের গেম সেকশনে বসে থাকা লোকজনদের মাথা বরাবর রাইফেল তাক করে রেখেছে, তো আবার কেউ কেউ দাঁড়িয়ে আছে রিসেপশনিস্টদের অভিমুখে। ক্যাসিনোর সুউচ্চ সম্মুখ দুয়ারের দ্বারে সটানভাবে দাঁড়িয়ে আছে মনস্টার। গায়ে বিশাল কালো ক্লোক, মাথায় ফেডোরা টুপি। আজও মুখখানা তার ঢেকে রাখা কালো রঙা ফুল মাস্কে। যুবকের ডানহাতে স্পষ্ট চক্ষু গোচর হচ্ছে — তার সিগনেচার শ্যাডো মনস্টার ব্রেসলেট। যুবক নিজের দাম্ভিক কদমে ভেতরে পা রাখতেই একজন গার্ড তখন ছুটে এসে নতমুখে দাঁড়াল মনস্টারের কাছ থেকে বেশ কিছুটা দুরত্ব বজায় রেখে। গলার স্বরে ব্যপক আনুগত্য ঢেলে আওড়াল,
“ মনস্তার! চেয়ারম্যান পেছনের রাস্তা দিয়ে পালিয়েছে।”
পিয়ার্সিং করা বাদামী ঠোঁটখানা পিষে হাসল বোধহয় যুবক। তবে সুদর্শন মুখখানা তার মাস্কের আড়ালে লুকিয়ে থাকায় সে হাসি চক্ষু গোচর হয়নি কারো। যুবক কেমন রয়েসয়ে ঘাড় ঘোরালো এদিক-ওদিক। কটমট শব্দে ঘাড়ের রগ ফুটিয়ে গমগমে গলায় আওড়াল,
“ নাইস!”
এহেন ঠান্ডা উত্তরে তটস্থ গার্ডস। কেননা তারা তো জানে, মনস্টারের এহেন ঠান্ডা উত্তর কোনো না কোনো ঝড়ের অশনি সংকেত হিসেবে কাজ করে। মুগ্ধ নাম বলিষ্ঠ পুরুষ তৎক্ষনাৎ পা ঘোরালো পেছনে। ধুপধাপ জোরালো পায়ে পথের ধুলো উড়িয়ে বাইরে বেরোতেই বাদবাকি গার্ডসও কেমন লেজ গুটিয়ে চলে আসে বাইরে। অদূরেই দাঁড় করিয়ে রাখা রেঞ্জ রোভার ব্র্যান্ডের কার! মুগ্ধ সেদিকে পা বাড়িয়েও হঠাৎ থেমে গেল মাঝপথে। কিয়তক্ষন চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে আচমকা গার্ডদের উদ্দেশ্যে আদেশ ছুড়ঁল,
“ আই ওয়ান্ট আ বাইক! দু’মিনিট দিলাম, যেখান থেকে পারিস নিয়ে আয়। আদারওয়াইজ…”
বাকিটা আর বলতে হয়নি যুবকের। তার আগেই আদেশ পেয়ে তড়িঘড়ি করে এদিক ওদিক ছুটেছে গার্ডস। কয়েক কদম এগুলেই চৌরাস্তা। সবাই গিয়ে রাইফেল উঁচিয়ে পথ আটঁকে দাঁড়িয়েছে কেমন! ওদিকে পথের মাঝে ওমন হুটহাট রাইফেল ধারীদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পথচারী থেকে শুরু করে যানবাহনের মালিক অব্ধি হকচকিয়েছে বেশ! হুটহাট কষেছে গাড়ির ব্রেক। কোনো কোনো গাড়িতো ব্রেক কষতে গিয়ে উল্টে পরেছে রাস্তার একপাশে। ইশশ! একমুহূর্তেই সম্পূর্ণ রাস্তায় জ্যাম লেগে একাকার অবস্থা হয়েছে। গার্ডস এই সুযোগে রাইফেল তাক করে করে এগুচ্ছে বাইকারদের দিকে। হাতের কব্জিতে বেঁধে রাখা ঘড়ির কাঁটা যেন রীতিমতো দৌড়াচ্ছে আজ। গার্ডদের মধ্যে প্রত্যেকের ললাট বেয়ে দরদরিয়ে ঝরছে ঘাম। এরইমধ্যে একজন গার্ডের নজরে পড়ল একখানা কালো-লাল মিশেলের স্পোর্টস বাইকের দিকে। বাইকটা দেখে মনে হচ্ছে নিউ মডেলের! বোধহয় নিউ স্পোর্টস কালেকশন। গার্ড তক্ষুনি ছুটলো সেদিকে। অতঃপর কোনরূপ বলাকওয়া ছাড়া বাইকারের পেছনের সিটে উঠে বসলেন ভয়ার্ত জনাব। হাতের রাইফেলটা স্পোর্টস বাইকারের মাথায় তাক করে কঠিন গলায় হুকুম ছুঁড়লেন,
“ মুভ!”
বাইকার নিরীহ মানুষ। আদেশ পেয়ে ত্বরিত স্টার্ট বসায় বাইকের ইঞ্জিনে। তারপর একটানে বাইক এনে থামালো ক্যাসিনের অভিমুখে। গার্ড তড়িঘড়ি করে নিজের বা-হাতের কব্জি উল্টে সময় দেখল। যাক বাবা! দু’মিনিট হতে এখনো ২০ সেকেন্ডের মতো বাকি। স্বস্তিতে বড় একখানা নিশ্বাস ফেলল গার্ড মহোদয়। তক্ষুনি বাইকারের পেছন থেকে নেমে এসে ছুটে গেল অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা মনস্টারের দিকে। ক্যাসিনোর শেষ সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে আছে মুগ্ধ। দু’হাত ক্লোকের পকেটে গুঁজে রাখা, মুখটা আড়াল করা টুপির ছত্রছায়ায়। গার্ড মহোদয় মাথা নুইয়ে দাঁড়ালেন মনস্টারের সম্মুখে। অত্যন্ত বিনয়ের সাথে ডানহাতের তর্জনী উঁচিয়ে পেছনে তাক করে দেখালেন — তিনি বাইক এনেছেন। মুগ্ধ খুশি হলো কি-না কে জানে! দাম্ভিক পুরুষ গুনে গুনে পা ফেলে এগিয়ে গেল বাইকের দিকে। বাইকার বেচারা ভয়ে তক্ষুনি মাথা থেকে হেলমেটটা খুলে বাইকের ওপর রেখেই নেমে দাঁড়ালো আলগোছে। জড়সড় ভাবে দু-কদম পিছিয়ে গিয়ে দাঁড়াতেই কোত্থেকে এক-দুজন গার্ড এসে বেচারার ঘাড় চেপে ধরে মাথাটা নুইয়ে ফেলল আচমকা! কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলল,
“ ডোন্ট ইউ ডেয়ার টু পয়েন্ট ইউর আইস অন হিম।”
বাইকার শুনল। অসহায় মুখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। কি যে আজ হচ্ছে তার সাথে কে জানে! ওদিকে মুগ্ধ খানিকক্ষণ বাইকটাকে দেখে-টেখে আচমকা গা থেকে ওভার ক্লোকটা একটানে খুলে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলল অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডের মুখপানে। মুহুর্তেই দৃষ্টি গোচর হলো যুবকের বলিষ্ঠ দেহখানা! গায়ে একখানা কালো রঙা শিফনের ফিনফিনে শার্ট! যা কি-না বেহায়ার মতো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে বলিষ্ঠদেহী পুরুষের গায়ে। ইশশ্! ফুলেফেঁপে থাকা মাসেলগুলো বুঝি এক্ষুণি শার্টের হাতা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে! দু’জন বডিগার্ড রয়েসয়ে একখানা কালো রঙা দামী কোট নিয়ে এসে আলগোছে বাড়িয়ে দিয়েছে মুগ্ধের পানে। যুবক কোনরূপ কালবিলম্ব ব্যয় না করে তক্ষুনি গায়ে জড়ালো কোটখানা। হাত বাড়িয়ে মাথার ওপর থেকে ফেডোরা টুপিটা নামিয়ে ধরিয়ে দিলো গার্ডের হাতে। অতঃপর বাহাতে গায়ের শার্টখানার প্রথম কয়েকটা বোতাম খুলতে খুলতে গিয়ে বসল বাইকের ওপর। মুখ থেকে মাস্কটা সরিয়ে সঙ্গে সঙ্গে হেলমেট জড়ালো মাথায়। দক্ষ হাতে বাইকের ইঞ্জিনে স্টার্ট বসিয়ে ঘাড় বাকিয়ে তাকালো বাইকারের পানে। আচমকা ডানহাতের দুআঙুল উঁচিয়ে ঠোঁটের কোণে শিষ বাজিয়ে ঢাকলো বাইকারকে। বাইকার বেচারা দোটানায় পড়ল যাবে কি যাবেনা! ঘাড় বাকিয়ে আড়দৃষ্টিতে তাকায় গার্ডের মুখপানে। বেচারা বোধহয় বুঝতে চাইছে যাবে কি-না। গার্ড কি বুঝল কে জানে! বেচারাকে উত্তর দেওয়ার পরিবর্তে তক্ষুনি তার ঘাড় চেপে তাকে ছুঁড়ে ফেলল মনস্টারের পায়ের কাছে। ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকায় বাইকার। তড়িঘড়ি করে শোয়া ছেড়ে উঠে বসল হাঁটু মুড়ে। মাথাটা ঠায় নুইয়ে রাখা তার। মুগ্ধ তাকে দেখে বাঁকা হাসল কেন যেন! ভারী কন্ঠে শুধু একবার বলল,
“ চেক!”
তৎক্ষনাৎ একজন গার্ড হাতে একখানা চেকবুক নিয়ে এগিয়ে এলেন মনস্টারের পানে। অত্যন্ত বিনয়ের সাথে একহাঁটু গেঁড়ে মেঝেতে বসে চেকবুকটা উঁচিয়ে ধরল। মনস্টার হাত বাড়িয়ে নিয়ে নিলো চেকবুকটা। সেখান থেকে একখানা সাইন করা চেক ছিঁড়ে এনে ছুঁড়ে ফেলল বাইকারের মুখের ওপর। বাইকার হকচকায়। তড়িঘড়ি করে চেকটা হাতে নিতেই শুনতে পায় অচেনা যুবকের কাঠকাঠ কন্ঠ!
“ মনমতো সংখ্যা বসিয়ে নিস!”
চোখ উঠেছে কপালে বেচারার। দৃষ্টি ঠায় চেকের দিকে। মনমতো সংখ্যা বসাবে সে? কত বসাবে? ১ মিলিয়ন? চেক বাউন্স করবেনা এতো নিলে? যুবকের মনে তখনও একরাশ প্রশ্ন। ওদিকে ইঞ্জিনে স্টার্ট পড়েছে ফের। বাইকার খানিক হকচকিয়ে দক্ষতা দেখিয়ে জানালো,
“ স্যার! এটা স্পোর্টস বাইক। এর গতিবেগ সাধারণ বাইকের তুলনায় তিনগুণ। তাই একটু সাবধানে চালাতে হবে!”
আলগোছে ঘাড় বাকায় মুগ্ধ! হেলমেটের আড়ালে সুদর্শন যুবক ঠোঁট পিষে হাসল বোধহয়। একটানে রাস্তার ধূলো উড়িয়ে বাইকটাকে ঘুরিয়ে এনে বলতে লাগলো,
“ তুই যে-ই কলেজের নতুন ছাত্র, আমি অলরেডি ঐ কলেজের প্রফেসর হয়ে বসে আছি কিডো!”
বলেই যুবক টান বসিয়েছে বাইকে। তাও আবার ফুল স্পিডে! পেছন থেকে হতবিহ্বলের ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে বাইকার। মুখটা কেমন হা হয়ে গেছে তার। এতো স্পিডে? তাও আবার এমন একটা ব্যস্ত রাস্তায়? কিভাবে সম্ভব?
“ হেলো? হেলো? দিস ইজ ফ্রম কন্ট্রোল রুম। হেলো!”
রাস্তার চেকপোস্টে দাঁড়িয়ে আছেন ট্রাফিক পুলিশ। ওদিকে গাড়ির ভেতর একাধারে ওয়াকিটকি বাজছে তার অথচ সেদিকে আদৌও খেয়াল করেছেন তিনি? অফিসার ব্যস্ত যাত্রীদের চালান কাটতে। এদিকে গাড়ির পাশ কাটিয়ে কনস্টেবল মহাশয় মাত্রই যাচ্ছিলেন বুঝি, ওমনি শুনতে পেলেন ওয়াকিটকির শব্দ। তড়িঘড়ি করে হাত বাড়িয়ে ওয়াকিটকিটা নিয়ে এসেই অফিসারের কাছে ছুটলেন তিনি। ব্যস্ত কন্ঠে জানান দিলেন,
“ স্যার! দেখুন, কন্ট্রোল রুম থেকে কল এসেছে।”
তড়াক মাথা ঘোরায় অফিসার। হাতের কাজ সম্পূর্ণ অব্যহত রেখে তড়িঘড়ি করে ওয়াকিটকিটা কানের কাছে ঠেকিয়ে সালাম ঠুকে বললেন,
“ জ্বি স্যার!”
ওপাশ থেকে ভয়ার্ত কন্ঠ শোনালো কন্ট্রোল রুম অফিসারের। তিনি খানিক দোনোমোনো করে ব্যতিব্যস্ত কন্ঠে জানালেন,
“ লিসেন টু মি কেয়ারফুলি অফিসার। আর কয়েক মিনিটের মধ্যে আপনার চেকপোস্ট হয়ে ঝড়ের বেগে ছুটে যাবে এক স্পোর্টস বাইকার। ইফ ইউ ওয়ান্না লিভ সো ডোন্ট ইউ ডেয়ার টু স্টপ হিম!”
ভড়কায় অফিসার! খানিকক্ষণ হতবুদ্ধির ন্যায় ওয়াকিটকির পানে তাকিয়ে থেকে প্রশ্ন ছুড়ঁতে গেলে আচমকাই তার নজর গিয়ে আটকায় রাস্তার শেষ প্রান্তে। চারপাশে ধূলোর আস্তরণ উড়িয়ে ছুটে আসছে এক বাইক। চোখের পলকে সামনে দিয়ে চলে গেল তার। অফিসার হা হয়ে গেল কেমন! পাশ থেকে কনস্টেবল মহাশয় চেঁচিয়ে বলল,
“ স্যার! কত স্পিডে বাইক চালাচ্ছে দেখলেন? একে আটকানো উচিত!”
অফিসারের হতভম্বতা কাটতে গিয়েও কাটলো না যেন। সে কেমন হতবাক কন্ঠে ওয়াকিটকি উঁচিয়ে বলল,
“ বাট এমন একটা ব্যস্ত রাস্তা দিয়ে ওমন ঝড়ের বেগে বাইক চালিয়ে ছুটছে কে স্যার?”
ওপাশ থেকে তৎক্ষনাৎ ভেসে এলো ঝাঁঝাল কন্ঠ!
“ কে আবার? তোর আর আমার বাপ! দ্যা শ্যাডো মনস্টার।”
মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ২৩
সেইন্ট পিটার্সবার্গে রাত এখনো চলমান! আকাশে গুড়গুড় শব্দ তুলছে বেশ। বারেবারে দিচ্ছে বিদ্যুৎ ঝলকানি! চারিদিকের বিদঘুটে অন্ধকার ক্রমশ গাঢ় হচ্ছে। অদূর থেকে ধেয়ে আসা জন্তুদের আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। দূর্বল মাহি হতবাক চোখে তাকিয়ে আছে সম্মুখে। মস্তিষ্কটা বড্ড ফাঁকা লাগছে তাঁর। চোখদুটো কেমন আশ্চর্যান্বিত ভাবে তাকিয়ে আছে! সম্মুখে দু-হাটুঁ গেঁড়ে বসে আছে যুবক। ছলছল চোখদুটো তার একমাত্র মাহিতে নিবদ্ধ। যেন তারা চিৎকার দিয়ে জানাচ্ছে অনেককিছু। তবে অদক্ষ মাহি! পড়তে পারেনি চোখের ভাষা। অবোধের ন্যায় হতবাক কন্ঠ ফুঁড়ে অস্ফুটে বলল,
“ আপনি? আপনি সিদ্ধার্থ না?”
ভেজা চোখে হাসল যুবক। দৃষ্টি ঠায় বজায় রেখে ক্ষুদ্র উত্তরে বলল,
“ হুম!”
