মিহি পর্ব ৪০
রুপন্তী সরকার
মিহি আর কিছু বললো না। রিদ মিহির হাত ধরে ওকে সব খুলে বললো। মিহি সব কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করলো। এটা ওর ছোট থেকে অভ্যাস রিদ কোনো কথা বললে সেটা মনোযোগ দিয়ে শোনা। মিহি আজকে হুট করেই রিদ কে জিজ্ঞেস করলো
“তোমার নিশির কথা মনে আছে?”
“কোন নিশি?
” নাটক করো না পঁচালোক তুমি ওর সাথে প্রেম করেছো”
“ছি। ওর কথা মনে নেই। তবে শুনেছি ওর সাথে একটা টাকলু আঙ্কেলর বিয়ে হয়েছে।”
“ও তার মানে ওর খোঁজ ও রেখেছো? বাহ ভালো”
“তুমি তো ওর কথা জিজ্ঞেস করলা প্রিন্সেস। আর খবর টা আমাকে পাপা দিয়েছে”
মিহি মুখ ফুলিয়ে চলে গেলো। রিদ ওর পেছন পেছন ঘুরছে।
মিহি রিদ কে বললো
“অনেক দিন রামপ্রসাদ আঙ্কেলের কাছে যাওয়া হয় নি। আজকে চলো ঘুরে আসি”
রিদ বললো
“আচ্ছা রেডি হও। অভ্র কেও বলি”
“অভ যাবে না।”
“আচ্ছা তুমি আর আমিই যাই।”
ওরা দুইজন রওনা দিলো রামপ্রসাদ বাবুর বাড়িতে। ওদের বাড়ির সামনে আসতেই রিদের গায়ে কাটা দিয়ে উঠলো। প্রায় বহুদিন পর এই বাড়িতে আসা। কতো স্মৃতি জড়িয়ে আছে বাড়িটাই। ইশশ দিন গুলো কতো তাড়াতাড়ি চলে গেছে। রিদ বাড়িটার দিকে দেখে মিহির দিকে তাকিয়ে বললো
“আমি আমার ছোট্ট প্রিন্সেস টাকে খুব মিস করছি।”
মিহি হালকা একটা হাসি দিয়ে রামপ্রসাদের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলো। দরজা নক করতেই রামপ্রসাদ দরজা খুলে গেলো। মিহি আর রিদ কে দেখে উনি অনেক অবাক হলো সাথে ভিষণ খুশি হলো। আবেগে বেচারার চোখে জল চলে এসেছে। মিহির চোখ গেলো খাটে বসে থাকা মিষ্টির দিকে। বিধবাদের মতো সাদা রঙের শাড়ী পড়ে আছে। চোখের নিচে গারো কালো দাগ। মুখ টা মলিন হয়ে আছে। শুকিয়ে কঙ্কাল হয়ে গেছে। গায়ে কিছুই নেই। রিদের ও মিষ্টি কে দেখে মাথা ঘুরে যায়। মিহি আগে অনেক গুলুমুলু একটা মেয়ে ছিলো। এখন ওর কি অবস্থা। মিষ্টি মন মরা হয়ে বসে আছে। কপালেও সিঁদুর নেই। রামপ্রসাদ বাবু রিদ আর মিহির উদ্দেশ্য বললো
“ভেতরে আসো বাবা। এতোদিন পর এই বুড়ো বাপ কে মনে পড়লো? তোমরা যাওয়ার পর আমার বাড়ি টা শুন্য হয়ে গেছিলো।”
মিহি আর রিদ ভেতরে ডুকলো। রিদ রামপ্রসাদের সাথে কথা বলে। আর মিহি গুটিগুটি পায়ে মিষ্টির দিকে এগিয়ে গেলো। মিহি গিয়ে মিষ্টি কে জড়িয়ে ধরলো। মিষ্টি ও মিহি কে নিজের কাছে জড়িয়ে নিলো। মিহি আস্তে করে জিজ্ঞেস করলো
“কেমন আছো আপু?”
মিষ্টি কোনো কথা বলছে না চোখ দিয়ে অনবরত জল গড়িয়ে পড়ছে। মিহি মিষ্টি কে বললো
“কেঁদো না প্লিজ। দেখো তোমার ছোট্ট বুনু আজ কত বড় হয়ে গেছে”
মিষ্টি বোকার মত শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছে মিহি কে। মিহি মিষ্টি কে এটা ওটা জিজ্ঞেস করছে কিন্তু মিষ্টি কোনো কথা বলছে না। শুধু চেয়ে আছে। আর আেন মনেই ওর চোখ দিয়ে জল পড়ে যাচ্ছে। মিহি বুঝতে পারছে না মিষ্টির হয়েছে টা কি। রামপ্রসাদ বাবু মিহির কাছে এগিয়ে এসে বললো।
“মা রে আমার মেয়েটার জীবনে অনেক ঝড় বয়ে গেছে। ওর স্বামী এক্সিডেন্টে মারা গেছে। ১০ বছরের একটা ছেলে ছিলো সে ও আগুনে পুড়ে মারা গেছে মাস খানিক আগে। আমার মেয়েটা আর কথা বলতে পারে না। কোনো কথা বলে না। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে শুধু কান্না করে। কিছু বলতে পারে কতো ডাক্তার দেখিয়েছি কিন্তু কোনো লাভ হয় নি। মেয়েটা আমার সব সময় খাটের এই কোণা তে বসে থাকে”
কথাটা বলেই উনি কান্না করতে লাগলো। মিহি আর রিদ থ হয়ে গেলো। ওরাও কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেললো। রিদ বললো
“আন্টি কই গেছে আঙ্কেল? উনাকে দেখছি না যে।”
রামপ্রসাদ বাবু শার্টে চোখ মুছে বললো
“আমার গিন্নি সেই কবে আগেই মারা গেছে। এখন বাড়িতে আমরা বাপ বেটি থাকি।”
মিহি ও কান্না করে দিলো। রিদ মিহি কে বললো
“কান্না করো না প্লিজ তুমি কান্না করলে আমার বুকে মোচড় দেয় খুব। নিঃশ্বাস আটকে আসে।”
মিষ্টি চেয়ে চেয়ে রিদ আর মিহির দিকে তাকিয়ে আছে। মিহি রা অনেকক্ষণ রামপ্রসাদ বাবুর সাথে গল্প করলো। রামপ্রসাদ ববু সুজি রান্না করে দিলো সেরা ওরা সবাই মিলে খেলো। মিহি অনেক চেষ্টা করলো মিষ্টি কে কথা বলানের কিন্তু মিষ্টি কোনো ভাবেই কথা বলতে পারলো না। অনেক চেষ্টা করছিলো কথা বলার। বোবা দের মতো শব্দ করলো কিন্তু কথা বলতে পারলো না।
মিহি রা চলে আসলো। অভ্র বাড়িতে বসে আছে। মিহি এসেই কেঁদে কেঁদে অভ্র কে সব বললো। সবটা শুনে অভ্র পাথরের মতো বসে রইলো। কি বলবে ও? ওর কিচ্ছু বলার নেই। অভ্র যতই বলুক মিষ্টি কে ও ঘৃণা করে। আসলে যাকে ভালোবাসা যায় তাকে মন থেকে কখনো ঘৃণা করা সম্ভব না। মিষ্টি যেমনই হোক অভ্রর কাছে ও আজও এক পবিত্র ফুল। তবে অভ্র মিষ্টি কে ক্ষমা করবে না। কখনোই না। সে কাঁদিয়েছে অভ্রকে। প্রতি রাতে অভ্র ডুকরে ডুকরে কেঁদেছে। অনেক বার নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কথা ভেবেছে। কিন্তু ওর টুইংকেলের মুখের দিকে তাকিয়ে ওইসব করার সাহস পায় নি।
মিহি পর্ব ৩৯
অনেক কষ্টে নিজেকে স্বাভাবিক করেছে। অজান্তেই অভ্রর চোখ দিয়ে জল পড়তে শুরু করলো। অভ্র একটা মুচকি হাসি দিয়ে মিহির কাঁধে মাথা রাখলো। রিদ এসেও মিহির কাধে মাথা রাখলো। মিহি এক হাতে ভাইয়ের চুল বুলিয়ে দিচ্ছে আরেক হাতে স্বামীর। মিহির কাছে এই দুজনার বুক পৃথিবীর সব থেকে নিরাপদ স্থান। রিদ আর অভ্রর কাছেও মিহির কোল পৃথিবীর সব থেকে শান্তির জায়গা। মিহি হলো এই দুটো ছেলের অক্সিজেন। মিহি কে ছাড়া এই দুজন উন্মাদ হয়ে যাবে। ওদের বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ মিহি। তারা নিজে হাতে ওদের বাচ্চা পরিটা কে বড়ো করেছে। ওদের মন খারাপের ওষুধ মিহি।

porer episode ta taratari diben kinto apamoni