মিহি শেষ পর্ব
রুপন্তী সরকার
৩০ মিনিট পর মিহি আস্তে করে চোখ খুললো। ওর গোলাপি রঙের শাড়ী টা রক্তে মেখে আছে। মিহি ওর কপালে হাত দিয়ে বুঝতে পারে কপাল টা ফেটে গেছে। ও আশপাশে তাকাতেই দেখতে পায় রিদ মাটিতে পড়ে আছে। মিহি ওর পেটে হাত দিয়ে ধিরে ধিরে রিদের দিকে এগিয়ে গেলো। রিদের কাছে বসে রিদের মাথাটা ওর কোলে নিলো। রিদের হাতে কতোগুলো কাচ গেঁথে রয়েছে। রিদের মাথা থেকে গলগল করে রক্ত বের হচ্ছে। মিহি রিদ কে বিরবির করে বললো
“পঁচালোক উঠো। তেমার অনেক খানি কেটে গেছে চলো ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো”
রিদের থেকে কোনো সাড়া এলো না। মিহি আবারো রিদ কে একই ভাবে ডাকতে লাগলো। রিদ কোনো উওর দিচ্ছে না। মিহি এবার পাগলের মতো হয়ে গেলো। মাটি খামছে কান্না শুরু করলো। হুট করেই পেটে প্রচন্ড ব্যাথা শুরু হলো। মিহি ওর পেটের উপর হাত রেখে কান্না শুরু করলো। চারিদিকে রাতের অন্ধকার নেমে এসেছে। হালকা মেঘ ডাকছে হয়তো বৃষ্টি নামবে। মিহি হাউ মাউ করে চিৎকার করে উঠলো।
“প্লিজ উঠো। আমি তোমাকে অনেক গুলো চুমু দিবো প্রমিস। আমাকে এভাবে ছেড়ে যেও না। আমাদের তো বাবু হবে তুমি ওর নাম রাখবে না? ওকে আদর করবে না? আমাকে এভাবে কাদিও না আমার পেটে খুব ব্যাথা হচ্ছে। আমাকে এভাবে একা রেখে পালিয়ে যেও না। প্লিজ উঠো না?”৷
রিদের কোনো সাড়া শব্দ আসছে না। এইদিকে মিহির পেটে প্রচন্ড পেইন শুরু হয়। মিহি পেট চেপে ধরে চিৎকার করে উঠে। ব্যাথা সহ্য করতে পারছে না। মিহি দেখে রিদের ফোন গর্তের ভেতর পড়ে গেছে। ওর হাতের কাছে একটা ডাল ভেঙে পড়ে আছে। ও এক হাতে পেট ধরে অন্য হাত দিয়ে ডালের সাহায্য ফোন টা তুলে। কান্না করতে করতে অভ্র কে কল দেয়। প্রথম বারে অভ্র রিসিভ করে না। মিহি আবারো কল দেয়। অভ্র এবার রিসিভ করে। অভ্র ফোন ধরতেই মিহি হাউমাউ করে কেঁদে উঠে। জীবনে এতটা অসহায় ও কখনো হয় নি। অভ্র মিহির কান্না শুনে ভয় পেয়ে যায়। কলিজা লাফিয়ে উঠে ওর।
মিহি কান্না ভাঙ্গা গলায় সবটা বলে। অভ্র ওর থেকে লোকেশন জেনে নেয়। এরপর ওকে একটু অপেক্ষা করতে বলে। তাটপর অ্যাম্বুলেন্সে কল করে দ্রুত বাসা থেকে বেরিয়ে যায়।
এইদিকে ঝুম বৃষ্টি নেমেছে। রিদের নিথর দেহ টা বৃষ্টির জলে ভিজে গেলো। গায়ে মেখে থাকা রক্ত বৃষ্টির জলের সাথে মিশে যাচ্ছে। মিহি ও ভিজে গেলো। শরীরে কোনে শক্তি পাচ্ছে না। মাথা ভিষণ ঘুরছে ওর। কোনোরকম টলমল করে উঠে দাড়ালো। হঠাৎ মিহির মনে হলো ওর পঁচালোক ভিজে যাচ্ছে। পঁচালোকের ঠান্ডা লাগবে। মিহি ওর আঁচল দিয়ে রিদ কে ডেকে দিবে। এই ভেবে দ্রুত এগিয়ে যেতে নিলো। সামনে একটা বড় পাথরের সাথে পা লেগে উবুড় হয়ে পড়ে যায়। সাথে সাথে মিহির রক্তপাত শুধু হয়। মিহি এতো রক্ত থেকে গগন কাঁপানো চিৎকার দিয়ে উঠে। আজকে মনে হয় সব শেষ।
মিহি আর রিদ কে হসপিটালে ভর্তি করানো হয়েছে।
ডক্টর রা বলেছে রিদের মাথায় আঘাত লাগার কারণে জ্ঞান হারিয়েছে। তবে চিন্তার কিছু নেই ২৪ ঘন্টার মধ্যে জ্ঞান ফিরবে। আর মিহির অবস্থা অনেক বেশি খারাপ। উনারা বলেছে বাচ্চা টা বাঁচবে কিনা এটা সিউর না।
অভ্র আর তিথী বাহিরে বসে আছে। অভ্রর হাত অনবরত কাঁপতেই আছে। তিথি অভ্রর হাতের উপর হাত রাখতেই অভ্র বাচ্চাদের মতো কেঁদে উঠলো। তিথি অভ্র কে জরিয়ে ধরে শান্ত হতে বললো।
“আমার টুইংকেলের কিছু হলে মারা যাবো আমি। ওর কিছু হবে না তো? ইশশ আমি কেনো আজকে ওর সাথে গেলাম না? আমি আসলেই একজন ব্যার্থ পুরুষ।”
তিথী অভ্রর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো
“শান্ত হও অভ্র টুইংকেল এবং ওর বাচ্চার কিছু হবে না।”
একটু পর ডক্টর বেরিয়ে আসলো। উনার মুখ টা মলিন হয়ে আছে।
অভ্র উঠে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো..
“ডক্টর কেমন আছে টুইংকেল?”
ডক্টর একটু গলা কাশি দিয়ে বললো।
“দেখুন আমরা চেষ্টা করেছি মা এবং বেবি দুজনকে বাঁচানোর তবে সেটা সম্ভব না। দুজনের মধ্যে একজন কেই বাঁচাতে পারবো। এখন আপনারাই বলুন কি করবো। আর হ্যাঁ একটু তাড়াতাড়ি জানান। যত দেড়ি হবে ততই পেশেন্টের জন্য ক্ষতি।”
অভ্র বলে
“আ…আপনি আমার টু..টুইংকেল কে বাঁচান। প্লিজ ডক্টর আমার টুইংকেলর যেনো কিচ্ছু না হয়। আর আপনি আমাকে কথা দিন ও যেনো একটু ও ব্যাথা না পায়। ওকে একটুও ব্যাথা দিবেন না। আমাকে কথা দিন আপনি”
এই বলেই অভ্র ডক্টরের হাত জড়িয়ে ধরে। অভ্রর পাগলামি ডক্টর খুব অবাক হয়। সাথে খুশি ও হয়।
“আপনি পেশেন্টের কে হন?”
“ওর ভাই ওর বাবা আপনি যা ভাবতে পারেন এখন আমাকে প্রমিস করুন আমার টুইংকেল কে ব্যাথা দিবেন না?”
ডক্টর মুচকি হেসে অভ্রর হাত ধরে বলে
“আচ্ছা বাবা আমি তোমার মেয়ে কে একটু ও ব্যাথা দেবো না প্রমিস এখন একটু শান্ত হও ওর জন্য দোয়া করো”
এই বলেই ডক্টর চলে গেলো…
মিহি পিটপিট করে চোখ খুলে। পাশেই এক হাত অভ্র আরেকহাত রিদ ধরে আছে। আর তিথী মিহির পায়ের কাছে বসে আছে। রিদের চোখ টকটকে লাল হয়ে আছে। অভ্রর চোখ মুখ ফুলে গেছে। অতিরিক্ত কান্নার ফলে এমন টা হয়েছে। মিহি আস্তে করে উঠে
“আ..আমার বাচ্চা আমার বাচ্চা কই? আমি ওকে দেখতে চাই কোথায় আমার বাবু?”
রিদ মিহির দিকে তাকিয়ে আছে। পাথরের মতো হয়ে গেছে কোনো কথা বলার শক্তি পাচ্ছে না।
তিথী মিহি কে শান্ত করার জন্য বলে
“তুমি এতে উত্তেজিত হয়ো না মিহি বাবুর কথা পরেও ভাবা যাবে। এখন একটু চুপ করে ঘুমাও”
মিহি তিথির কোনো কথা শুনতে নারাজ। ও ওর মতো চিৎকার করেই যাচ্ছে। কি আজব কথা ওর বাবু হয়েছে ও দেখবে না? মিহি রিদের দিকে তাকিয়ে বলে
“তুমি তুৃমি দেখো নি আমাদের বাবু কে? আচ্ছা আমাদের কি বাবু হয়েছে?”
রিদ কোনো কথা শুনতে পেলো নাকি কে জানে। ও একভাবে মিহির দিকে তাকিয়ে আছে। মিহি রিদের থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে আবারো চিৎকার করে বললো
“আজব তো আমার বাবু কই? আমি দেখতে চাই ওকে”
মিহি কে কোনোভাবেই শান্ত করা যাচ্ছে না। এক পযার্য়ে তিথি বলে দেয় বাবু কে বাঁচানো যায় নি। মিহি থ মেরে বসে থাকে। কোনো কথা বলার শক্তি পাচ্ছে না। হাত পা অবশ হয়ে গেলো নিমিষেই। এর মধ্যে নার্স রা ঘরে ডুকলো। মিহি কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলো
“আমার কি বাচ্চা হয়েছিলো?”
নার্স মিহির দিকে তাকিয়ে বললো
“মেয়ে বাবু”
“আপনারা ওকে বাঁচালেন না কেনো?”
নার্স বললো
“যেকোনো একজন বাঁচানো যেতো আমরা আপনাকে বাচিয়েছি”
মিহি এবার চিৎকার করে বললো
“কেনো বাচিয়েছেন আমাকে? আমার বাবু কে কেনো বাঁচালেন না? ও তো ছোটো নিষ্পাপ শিশু ওকে বাচাতেন”
নার্স মিহির হাতে ইনজেকশন পুশ করতে যাবে তখন মিহি নার্স কে ধাক্কা দেই। ইনজেকশন গেঁথে যায় হাতের ভেতর। মিহি পাগলের মতো আচরণ করতে থাকে। রিদ ওকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো।
“কেনো এমন করছো জান?”
মিহি কেঁদে উঠলো
“আমার বাচ্চা টা কে ওরা মেরে ফেলেছে।”
নার্স এসে মিহির হাতে ইনজেকশন পুশ করলো। মিনিটের মধ্যে মিহি ঘুমিয়ে পরলেো।
“দেখুন উনাকে এখন উত্তেজিত করবেন না। আপনারা বাহিরে যান”
সময় চলে তার নিজ গতিতে। দেখতে দেখতে দুটো বছর কেটে গেছে। রিদ মিহির একবছরে মাথায় একটা ছেলে বাবু হয়েছে। রিদের নামের সাথে মিলিয়ে নাম রাখা হয় “ঋষভ” বাবুর বসয় এখনল ১ বছর হয় নি। এইদিকে অভ্রর ও একটা ছেলে বাবু হয়েছে নাম রাখা হয়েছে “শুভ্র”। ঋষভ দেখতে হুবহু রিদের মতো হলেও চোখ গুলো হয়েছে মিহির মতো। তবে মিহির চোখের মণি নীল আর ঋষভের টা নীলের মধ্যে বেগুনীর আভা।
রিদ অনেক খুশি। তবে মিহির প্রথয় বাবু নষ্ট হওয়ার পর থেকে কারো সাথে তেমন কথা বলে না। আগের থেকে অনেকটা চুপ হয়ে গেছে। বাবু মারা যাওয়ার পেছনে সব সময় নিজেকে দোষ দেয়। কিন্তু রিদ মিহি কে সব সময় বুঝিয়েছে এটা তাদের ভাগ্য লিখা ছিলো।
মিহি বাবু কে ঘুম পাড়িয়ে বেলকুনি তে গিয়ে দাড়ালো। আজকে বড্ড মা কে মনে পড়ছে। মিহি তো ওর মায়ের চেহারা ও কখনো দেখে নি। তবে মনে মনে মা কে কল্পনা করে সাজিয়েছে। আজকে মামা কেও খুব মনে পড়ছে। তবে এতোগুলো বছর হয়ে গেলো মামা বাড়ি থেকে কোনো খোঁজ নেই নি। রিদ পেছন থেকে এসে মিহির কোমর জড়িয়ে ধরলো। মিহির গলায় মুখ ডুবিয়ে দিলো। মিহি রিদ কে বললো
” খাবার খেয়েছো?”
“না খাইয়ে দাও”
“একা একা খেয়ে নাও বাবু ঘুমিয়ে আছে। যখন তখন উঠে যাবে”
“আমিও বাবু আমি জানি না খাইয়ে দাও আর চুমু দাও”
মিহি রিদের গালে টুপ করে চুমু দিলো।রিদ মিহির ঠোঁটে চুমু দিলো..
মিহি রিদ কে বললো
মিহি পর্ব ৪১
“আমাকে বিয়ে করা তোমার জীবনে ভুল ছিলো। তাই না? পরজনমে একটা ভালো মেয়ে কে বিয়ে করে নিও”
রিদ মিহির বাচ্চা বাচ্চা কথায় হেসে দিলো। মেয়েটা দিন দিন অবুঝ হয়ে যাচ্ছে। প্রথম বাবু টা মারা যাওয়ার পর মাঝে মাঝেই এমন কথা বলে। রিদ অনেক বুঝিয়েছে কিন্তু এই পিচ্চি বুঝতেই চাই না। রিদ মিহির কাঁদে মাথা রেখে বললো
“পরজনমে তুমি আবারো আমার কাছে “ভুল” হয়ে এসো, আমি আবারো তোমাকে “ফুল” ভেবে কুড়িয়ে নেবো”
সমাপ্ত

I’m from India aapi. It’s a fabulous….Ei upponas ta porar somoy ami sudhu injoy korechi and sad moment gulo bastobota futiye tuleche sotti sotti khub sundor hoyeche . Ei upponas ta theke onek kichu sikhechi, kichu monusotto ja mon chuye giyeche … Patle etar second part tao deben please… 🥰🥰🥰💝💝💝☺️☺️
আমার জীবনের বেস্ট উপন্যাসের মধ্যে এটি একটা। প্রতিটা পর্ব আমার কাছে দারুণ লেগেছে। এরকম আরো সুন্দর সুন্দর উপন্যাস দিও। তোমার জন্য দোয়া রইল।🥰