Home শ্যামা সুন্দরী শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৩৯

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৩৯

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৩৯
সুরভী আক্তার

সকাল সকাল সুরবালার চুলের পেছনে পড়েছে শায়লা । মেয়েটার চুলগুলো কোমর ছড়ানো । তবে যত্ন নেয় না । বাপের বাড়ি থেকে কাল এসেছে । বউ মাকে দেখলো মাত্র একদিন পর । এতেই কলিজা শুকিয়ে গেছে তার । সুরবালা কাল তার কাছেই ছিলো । অংকুর বাড়িতে এসেই বেরিয়েছিল কোথাও । ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়েছে । শায়লার ঘরে , তার সাথে গল্প করতে করতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে টেরই পায় নি সে । শায়লা ও ঔষধ খেয়ে ঘুমিয়েছিলেন , অংকুর কখন ফিরেছে অজানা । দু’জনেই ঘুমে বিভোর ছিলো । অংকুর ফেরার পর কেউই টের পায় নি । সকালে ঘুম থেকে উঠে ঘরে গিয়ে ঘুমন্ত অবস্থায় অংকুর কে দেখেছে সুরবালা । ঘুম হতে দেরি করে ওঠার অভ্যাস তার , এই কদিনে সুরবালা বুঝেছে তা । তাই আর ডাকে নি । এমনিতেও ডাকতো না ।

বালার এলোমেলো চুল গুলো দেখে শায়লা ওকে টেনে বসিয়েছেন নিজের কাছে । বসার ঘরে বসে বালার মাথায় তেল দিয়ে দিচ্ছেন তিনি । জাহানারা সকালের নাস্তা তৈরিতে ব্যস্ত । আজ দেরি হয়ে গেছে । পাশের বস্তিতে তার ছোট্ট বাড়ি । আগে রাতটুকু এ বাড়িতেই কাটাতো , স্বামী বাচ্চা নিজের বাড়িতে । শায়লার দেখা শোনা থেকে শুরু করে সব তার দায়িত্বে । এখন সুরবালা এসেছে থেকে বাড়িতে একজন বেড়েছে । শায়লার কাছে থাকতে হয় না আর তাকে ।
শায়লা সুরবালার মাথায় তেল দিতে দিতে প্রশ্ন করলো , সুরবালার সম্পর্কে বেশি কিছু জানা নেই তার । জমিদার বাড়ির মেয়ের সাথে তার ছেলের বিয়ে হয়েছে , অথচ সেই জমিদারদের সম্পর্কে এখনো জানা হয়ে ওঠে নি ।

” সুরবালা ? তোদের বাড়িতে কে কে আছে ?
বালা চোখ বুজে অনুভব করছিলো । মাথায় আরাম লাগছে । চুলের ভাঁজে হাত বুলিয়ে দেওয়াতে ঘুম পাচ্ছে । চোখ বুজে ছিল ও , চোখ বুজেই উত্তর করলো…
” আমাদের বাড়িতে ? সবাই আছে !
মামা, মামি , ভাবি , সৈকত , মা , ভাইজান , শ্যামা আর সংগ্রাম জোয়ার্দার….
” সংগ্রাম জোয়ার্দার ? শুনেছি ওর কথা । অংকুর বলেছে । তোর মামাতো ভাই তো ?
বালা চুপ থেকে খানিক পরে বিবস স্বরে উত্তর করলো…

” হুম !
” বিয়ে হয়েছে ওর ?
” হুম !
” শ্যামা বউ ?
” হুম !
” তহুরা আর জবা গল্প করেছিল সেবার এসে , সংগ্রাম জোয়ার্দার নাকি খুব দাম্ভিক ?
” একটু !
” বউ পেয়েছে কেমন ?
” দাম্ভিক পুরুষ কে হার‌ মানানোর জন্য , যথেষ্ট তার বউ !
” খুব সুন্দর ?
” অনেক সুন্দর !
” তোর থেকেও বেশি ?
” হয়তো ! তাইতো সংগ্রাম জোয়ার্দারের নজর কেড়েছে ।
শায়লা চালু হাত থামালেন । বালার কাঁধে দুই হাত রেখে খানিক ঝুঁকে বললেন বালার মুখ পানে চেয়ে….

” তুই বেশি সুন্দর । আমার গোমড়া মুখো কেশবতীর নজর কেড়েছিস তুই । আমি তো ওকে নিয়ে মহা বিপাকে ছিলাম , ঐ ছেলে কোনো দিন এরকম একটা কান্ড ঘটাবে কে জানতো ? আমি তো ভাবিই নি , কোনোদিন তোর মতো এতো সুন্দর একটা বউ পাবে ও । আর আমাকে একটা এতো সুন্দর মিষ্টি বউমা উপহার দেবে ।
বালা নরম হাসলো । বাকি কথা ছেড়ে বললো ঠোঁটে হাসি রেখে….
” তোমার মুখে, গোমড়া মুখো কেশবতী ডাকটা শুনলে খুব হাসি পায় মা !
শায়লা আবার চুলে তেল লাগাতে লাগাতে বললেন….
” তোর হাসি পায় ? আর অংকুর রেগে যায় ! কি করব বলতো ? ও ছোট বেলা থেকেই এভাবে গম্ভীর । হাসে না একটুও , আগে যেওবা হাসতো একটু আধটু , ওর বাবা মারা যাওয়ার পর সেই একটু আধটু হাসি টুকু ও মুছে গেছে ।
শায়লার নির্মল স্বর । বালা ঘাড় ঘুরিয়ে পিছু তাকালো । শুধালো নরম কন্ঠে…

” বাবার কি হয়েছিল মা ?
তপ্ত শ্বাস ফেললেন শায়লা । বললেন অবস হয়ে….
” পনেরো বছর আগে দুটো বাস সংঘর্ষে এক্সিডেন্ট হয়েছিল , সেই দূর্ঘটনায় বাসের ছত্রিশ জন যাত্রীর মধ্যে ছয়জন নিহত । এর মধ্যে তোর শশুর একজন ।
বালার চোখের চাহনি আহত হলো । শায়লা হাসি ফুটিয়ে বললেন…
” কি দেখছিস ?
ঘাড় নাড়ালো বালা । শায়লা ওকে সামনে ঘুরিয়ে চুল আচড়ে দিলেন ।

আধো লম্বা চুলে বেনি গাঁথার মাঝেই সদর দরজায় কড়া নাড়লো কেউ । নয়টা পেরিয়েছে । এ বাড়িতে বাইরের লোক আসে না । অংকুর ও বাড়িতে । তাহলে কে ? শায়লা কপাল গুটিয়ে তৎক্ষণাৎ তাকালেন । জাহানারা আঁচলে হাত মুছতে মুছতে বেরোলেন রান্না ঘর থেকে । বসা থেকে শায়লা,সুরবালা উঠলো দু’জনেই । সবার নজর দরজার দিকে । জাহানারা দরজা খুলে দিতেই সামনে কতগুলো চেনা মুখ নজরে আসলো । অংকুরের বন্ধুরা । রিক্তা , আরশ , আলামিন , তহুরা আর জবা । ওদের দেখে গুটানো কপাল স্বাভাবিক হলো শায়লার । মুখে হাসি ফোটালেন তিনি । জাহানারা কে পাশ কাটিয়ে একসাথে দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলো সবাই । সুরবালা সব সুপরিচিত মুখ দেখে খানিক বিপাকে পড়লো । ও এখন নতুন পরিচয়ে এদের সামনে । মাথা নোয়ালো সে ।
রিক্তা সুরবালা কে দেখে সশব্দে ডাকলো , ওর দিকে এগিয়ে আসলো তড়িঘড়ি করে.

” সুরবালা !
এগিয়েই আচমকা জড়িয়ে ধরলো ওকে । তৎক্ষণাৎ ছেড়ে প্রফুল্ল স্বরে বলল….
” কেমন আছো ?
” জ্বি , আপনি ?
” ভালো ! ইশশ্ , কি সুন্দর বউ বউ লাগছে তোমায় ! একদম টুকটুকে নতুন বউ । তা বর কোথায় তোমার ? সে এভাবে চুপিচুপি বিয়ে করে ফেললো , আমাদের একটা বারও জানানোর প্রয়োজন বোধ করলো না ? কোই সে ?
সামনে আরশ আর আলামিন কে দেখে জড়তায় গুটিয়ে গেল সুরবালা । শাড়ির আঁচল কাঁধ জড়িয়ে নিলো । ওর ইতস্ততা বুঝে শায়লা উত্তর করলেন হাসি মুখে…

” অংকুর তো ঘুমেত্তে ওঠে নি এখনো । তোরা আসবি, ও তো আমাদের বললো না !
” ও আন্টি , আমরা তো অংকুর কে জানাই নি আমরা আসবো । হুট করে এসেছি । ও যেভাবে আমাদের বিয়ের কথা জানায় নি , আমরাও জানাই নি । আর ও এত বেলা অবধি ঘুমাচ্ছে ?
দাঁড়াও তো , দেখছি ওকে ।
আগে সুরবালা কে দেখে নেই । তা বলো সুরবালা , তলে তলে এতো কিছু করে ফেললে আমার বন্ধু টার সাথে ? বিয়েও করে নিলে এতো তাড়াতাড়ি ?
সুরবালা উত্তরে ইতস্তত । এসব কথা শুনতে মোটেও ভালো লাগছে না ওর । কেমন বিভ্রান্ত লাগছে । অপ্রস্তুত হয়ে পড়ছে সে । ও আরো বেশি মাথা নোয়ালো । চিবুক ঠেকালো গলায় । তহুরা তাড়াহুড়ো করে আসলো এবার…

” আরে , সুরবালা ? লজ্জা পাচ্ছো ? তোমার শাশুড়ি এখানে আছে বলে ? আরে , তোমার শাশুড়ি এসবে কিছু মনে করবেন না । তিনি অনেক মিশুক আমাদের সাথে , একেবারে বন্ধুর মতো । তুমি বলতো , কি করে এভাবে হঠাৎ বিয়ে করলে ? আমরা তো ফিরলাম সেদিন , এরমধ্যেই সম্পর্ক ও করলে , আবার বিয়েও করলে ?
সুরবালার বিরক্তির মাত্রা বাড়লো । দাঁত চেপে কোনো রকমে গিলে নিলো কথা গুলো । উত্তরে কিছু বলার রুচি জাগলো না । ওরা মশকরা করে বলছে কথাগুলো , তবে সুরবালার কাছে একটুও আনন্দদায়ক লাগলো না । এর মধ্যে তহুরার কথার মাঝে মেকি স্বরে বলে উঠলো আলামিন…
” আরে ভাই , ওরা সম্পর্ক করে বিয়ে করেছে , এটা তোকে বলতে হবে নাকি ? তলে তলে তলে সুতা কেটেছে আমাদের অংকুর । তাইতো সুরবালা রাণী আজ আমাদের ভাবি ! কি , ভাবি সব ঠিকঠাক তো ?
দম ফেললো বালা । বাঁকা চোখে শায়লার দিকে তাকালো । শায়লা সুরবালার অবস্থা খানিক ঠাহর করতে পেরেছে বোধহয় । তিনি বললেন…

” চুপ কর তো , ওর সাথে তোদের কি ? তোদের বন্ধু কে জিজ্ঞেস কর গিয়ে ? বেকার বেকার আমার বউমা কে জ্বালাবি না ।
” বাহ্ আন্টি , এতো তাড়াতাড়ি বউমার মোহে পাগল হয়ে গেছো দেখছি ! রুপে পাগল করলো তোমায় ? যেভাবে অংকুর কে করেছে ?
মাঝে ফোড়ন কাটল জবা । এবার ঝট করে দৃষ্টি তুললো বালা । অমনি মুখোমুখি হলো জবার কটমট দৃষ্টির । চোখ জোড়া কুঁচকালো বালা । এই মেয়েটা শুরু থেকেই কেমন উল্টো পাল্টা কথা বলে ! যা মূলত বালা কে খোঁচা দিয়েই ।
জবা আবার বললো সুরবালার চোখে চোখ রেখে…

” কি সুরবালা ? রুপে পাগল করেছো মা ছেলেকে ?
রিক্তা শ্বাস ফেলে খোঁটা দেওয়ার উদ্দেশ্যে বললো….
” রুপ তো তোরও কম ছিলো না জবা । কোই,তোর প্রতি তো পাগল হলো না অংকুর । যার উপর পাগল হওয়ার কথা তার উপরই হয়েছে ।
তুই অতো ভাবছিস কেনো ? রুপে পাগল হলেও তো , অবশেষে আমাদের অংকুর পাগল টুকু হলো । কেউ তো ঠাই পেলো তার জীবনে ।
রিক্তা এতক্ষণে গুরুভার হলো । কথা শেষ করে হাসলো মিহি । ওর কথা টুকু এ পর্যায়ে ভালো লাগলো বালার কাছে । একটু হাসি ফুটলো ঠোঁটের কোণে । হাসলেন শায়লাও । তিনি মুগ্ধ নয়নে তাকালেন সুরবালার দিকে । শুধু হাসলো না জবা । ভেতর ভেতর কটমট করলো ও । নাক ফুসছে । কাঁপছে তিরতির করে । জ্ঞাত চিনচিনে ব্যথায় বুকখানা খাক্ করে জ্বলে উঠলো । চোখ ছলছল করতেই মাথা নোয়ালো ও । নিজেকে সামলালো গোপনে । চোখ তুলে সুরবালার হাসি হাসি মুখ খানা দেখে ফের জ্বলে উঠলো তেলে বেগুনে । দাঁত পিষে পৈশাচিক হাসলো । ফন্দি এঁটে বললো কৃত্রিম হাসি ঝুলিয়ে মেকি স্বরে…

” ঠাঁই পেয়েছে ভালো কথা । তা বউকে ঠাঁই দিয়ে সে কোথায় লুকিয়ে আছে ? দেখি তাকে । বিয়ের পর তো সুরবালা কে বউ বউ লাগছে , ওকে বর বর লাগছে কি না দেখি ! ঘুমাচ্ছে ও ? আচ্ছা তোরা বস , আমি ওকে ঘুম থেকে উঠিয়ে টেনে আনছি এক্ষুনি ।
বলতে বলতে সিঁড়ির দিকে এগোতে গেলে বাঁধা দিলো আরশ….
” তোকে যেতে হবে কেনো ? সুরবালা তো আছে , ও যাক ।
” আমি কি খালি আজ যাচ্ছি নাকি ওর ঘরে ? বিয়ে হয়েছে বলে কি ওর ঘরে যেতে পারবো না ? কতদিন ঘুম থেকে নিজে ডেকে জাগালাম ওকে । আজ না হয় আর একবার জাগিয়ে আসি । সুরবালা তো রোজ জাগাবে ।
বলেই কারোর পরোয়া না করে উঠলো সিঁড়ি বেয়ে । ওর বাড়াবাড়ি টুকু দেখে প্রচন্ড বিব্রত হলো রিক্তা আর আরশ । সুরবালা সুক্ষ্ম নেত্রে জবা কে উঠতে দেখলো নিজের ঘরে ।

দুপুর গড়িয়েছে । শ্যামা সবে গোসল সেরে বেরোলো কলপাড় থেকে । সংগ্রাম একটু আগেই ফিরেছে বাড়িতে । বলে গেছে বিকেলের দিকে এসে নিয়ে যাবে ওকে । বলেছে.. এভাবে মাঝরাতে শশুর বাড়িতে এসে বেইজ্জতি হতে ভালো লাগে না । বউকে ছাড়াও ভালো লাগে না । জমিদার পুত্র , বেইজ্জতি হওয়া মানায় না । তবে বউয়ের সাথে মানায় । বউকেই সই । বউটাকেই বেছে নেবে সে । দুই দিনের জায়গায় বউ না হয় একদিন বাপের বাড়িতে থাকবে ।
শ্যামা হেসেছিল কথা শুনে । এই লোকটা দিন দিন কেমন উদ্ভট হয়ে যাচ্ছে । সংগ্রাম চলে যাওয়ার পর পরই গোসলে ঢুকেছিল শ্যামা । অলকা নামাজে বসেছেন । যাওয়ার আগে অলকার সাথে আলাদা করে কথা বলেছে সংগ্রাম । সেটা সম্পর্কে অজ্ঞাত শ্যামা ।

সংগ্রাম অলকাকে সতর্ক করে গেছেন । দেউড়ির খিড়কি যেন আটকানো থাকে সবসময় । ঘাটের দিকের খিড়কি ও তাই । কেনো বলেছে অলকা জিজ্ঞেস করেন নি । তিনি খিড়কি আটকেছেন সংগ্রাম যাওয়ার পর । মোখলেছ আসলে একেবারে বিকেলে আসবেন । তার সামনেও যেন শ্যামা না পড়ে,এটাও বলে গেছে সংগ্রাম ।
শ্যামা গোসল সেরে ভেজা চুল গুলো গামছায় আটকে আঙ্গিনার দড়িতে কাপড় মেলে দিচ্ছিল । দুপুরের মিঠে রোদ ভালো লাগছে ভীষণ । সূর্য ঠিক মাথার উপর ।
শ্যামা ভেজা শাড়ি খানা মেলে মাথা থেকে গামছা খুললো । ভেজা চুল গুলো মুছতে লাগলো আলতো হাতে আলগোছে । সংগ্রাম বরাবর বলে , শ্যামার চুল গুলো ওকে আকৃষ্ট করে ভীষণ । শ্যামার মনে একথা আসতেই নিজের মাঝে মুচকি হাসলো শ্যামা ।

হাঁটু ছড়ানো চুল থেকে টুপটাপ পানি ঝড়ছে ।
ওর চুল মোছার মাঝেই খিড়কিতে কড়া নাড়লো কেউ । সচকিতে আঁতকে উঠলো শ্যামা । আচমকা শব্দে ধক্ করে উঠলো । বুকে থুতু দিয়ে হাঁফ ছাড়লো পরমুহূর্তে ।
দেউড়ির দিকে তাকালো । কে এসেছে কে জানে ? আম্মা নামাজে । শ্যামার খিড়কি খোলা ঠিক হবে না । সে খুলবেও না । শ্যামা ফের চুলে গামছা পেঁচিয়ে নিলো । ছোট ছোট ভেজা চুল লেপ্টে গালে কপালে । ঘরের দিকে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো শ্যামা । আম্মার নামাজ হয়েছে কিনা দেখতে হবে । তারপর না হয় আম্মা খিড়কি খুলে দেবে । শ্যামা দুই কদম এগোতেই কানে ভেসে আসলো চিকন মেয়েলি কণ্ঠ….

” আম্মা ?
অমনি থমকালো শ্যামা । সংকিত হয়ে ফিরলো পেছন । চোখ দুটো চিকচিক করে উঠলো ওর । ও অস্ফুটে উচ্চারণ করলো…
” ময়না ?
হ্যাঁ তো , এতো ময়নার স্বর । মুহুর্তেই সব ভুলে খুশিতে আত্মহারা হয়ে পড়লো শ্যামা । বাড়ানো দুই কদম পিছিয়ে উল্টো পথে ছুটলো । নিজেকে স্বাভাবিক না করেই খিড়কির বাঁধন আলগা করে খুললো তড়িঘড়ি করে । সামনে ময়না দাঁড়িয়ে । ফিক করে উজ্জ্বল হাসলো শ্যামা । এক মুহুর্তেই বুকে জড়ালো বোনকে । চোখ বুজে বোনকে অনুভব করে হাঁসফাঁস করে উঠলো…

” ময়না ! কেমন আছিস বোন ? ভালো আছিস ? কতদিন পর দেখলাম তোকে ?
ময়নার হাত জোড়া অবস । সে শ্যামা কে জড়ালো না । বোনের প্রতিক্রিয়া বা উত্তর না পেয়ে জড়িয়েই চোখ খুললো শ্যামা । সামনে আফতাব । একেবারে দৃষ্টির সম্মুখে । আঁতকে উঠলো শ্যামা । সোজাসুজি শ্যামার পানেই অপলক চেয়ে সে । চোখের চাহনি স্থির গোল । ছ্যাত করে উঠলো শ্যামার বুক খানা । ঝট করে ময়না কে ছেড়ে দূরে ছিটকে আসলো ও । শ্যামা ছাড়তেই ময়না তড়িতে পিছন ফিরলো আফতাবের প্রতিক্রিয়া দেখার উদ্দেশ্যে । নিজের বড় বোনের পানে নিজের স্বামীকে স্থির দৃষ্টিতে থমকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বুক খানা কেঁপে উঠলো ষোড়শী কন্যার । মুহুর্তেই দৃষ্টি ফেরালো ও । চোখ আড়াল করতেই সজল হয়ে উঠলো সেই দুচোখ । ওর তো কিছুই অজানা নয় । আজ মনে হচ্ছে , অজানা হলেই হয়তো ভালো হতো । অন্তত খারাপ লাগতো না এই অপ্রস্তুত, অপ্রত্যাশিত মুহূর্তে ।
শ্যামা নির্বাক । হাঁটু কাঁপছে ওর । সাথে বুকটা । ও আর এক মুহূর্ত সময় পার করলো না । নিমিষেই শাড়ির আঁচল টেনে ঢেকে ফেললো নিজেকে । ঘোমটা টানলো গলা অবধি । গলা শুকিয়ে কাঠ । ও ঢোক গিলে গলা ভেজানোর চেষ্টা করলো । বুকটা কেমন ধড়ফড় করছে । চোখ বুজে বড় শ্বাস টেনে নিজেকে ধাতস্থ করার চেষ্টা করলো শ্যামা ।

শ্যামা ঘোমটা টানতেই চোখ বুজলো আফতাব । ঢোক গিলে গলা ভেজালো নিজেও । অধর যুগল ও ভেজালো । এই পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে , কে ভেবেছিল ?
আজ সে দ্বিতীয় বার দেখলো শ্যামা নামক এই মেয়েটা কে । দ্বিতীয় বার তো নয় , তৃতীয় বার । মুখটা তো দেখলো দ্বিতীয় বার । প্রথম বার দেখেছিলো , নিজের বউ হিসেবে কল্পনা করে ।
আর আজ দেখলো , অন্যের বউ হওয়ার পর প্রাপ্ত নব্য জৌলুসে । দ্বিতীয় বার যেদিন শ্যামা কে দেখতে এবাড়িতে আসলো আফতাব , সেদিন এই মুখখানা দেখার ভীষণ তৃষ্ণা জেগেছিল । ইচ্ছে হয়েছিল এক পলকের জন্য এই শ্যামলা মুখশ্রীর পানে তাকাতে । কিন্তু ভাগ্য সহায় হয় নি । অসহায় আবদার করেও দেখা মেলে নি । আজ মিললো আকস্মিক । কিন্তু আফতাব সেভাবে দেখার জন্য প্রস্তুত ছিল না ।
শ্যামা নিজেকে সামলে নিলো কোনো রকমে । আফতাব চোখ নামিয়ে নত করেছে । নিজের মনে খাপ খাচ্ছে না । অবাধ্য চোখের উপর রাগ হচ্ছে ভীষণ । কেনো দেখতে গেলো ও ? দেখা তো উচিত হয় নি ।
শ্যামা কম্পিত কন্ঠে বলল….

” ভেতরে আয় ময়না !
বলেই তড়িৎ বেগে বাড়ির ভেতরে ঢুকলো । ঢুকে এক মুহুর্ত থেমে আবার বলল…
” ভেতরে এসে খিড়কি আটকে দিস ।
কথা শেষ করে আর থামে নি । ছুটেছে ঘরে । ময়না আফতাব ঠায় দাঁড়িয়ে । কম্পিত দৃষ্টি তুলে আফতাবের দিকে তাকালো ময়না । আফতাবের অবস্থা টুকু একটু হলেও আন্দাজ করতে পারছে সে । জোর পূর্বক ঠোঁটে হাসি টানার চেষ্টা করলো ময়না । বললো…
” ভিতরে চলেন !
ময়না ঢোকার পরেও আফতাব ভেতরে ঢুকতে সময় নিলো । পা কাঁপছে ওর । চোখ তোলে নি আর । ময়নার দিকে ও না । ময়না খিড়কি আটকে দিলো কথা মতো । এতক্ষণে অলকার নামাজ শেষ । তিনি ঘর হতে বেরিয়েছেন ঝটপট । মেয়ের ডাক নামাজ রত অবস্থায় কানে পৌঁছেছে তার ।
আম্মা কে দেখে হাসি প্রসারিত করলো ময়না …
ক্ষিণ স্বরে বলল…

” আম্মা ?
” ময়না ! তুই ? কেমন আছিস মা ?
” আমি ভালো আছি আম্মা ? তুমি ?
” ভালো !
অলকা নত জানু আফতাবের পানে তাকালেন । অবস্থা ঠাহর করতে অসুবিধা হলো না মোটেও । তিনি বললেন নরম গলায়…
” কেমন আছো ,বাবা ?
” ভালো আম্মা !
নিরস ক্ষিণ উত্তর । শ্যামা অলকার ঘরে ঢুকেছে । আফতাব কে নিয়ে আরেক ঘরে ঢুকলো ময়না । এ ঘরেই কাল ছিল শ্যামা সংগ্রাম । শ্যামার শাড়ি খাটের উপর ভাঁজ করে রাখা । পাশেই সংগ্রামের একটা পাঞ্জাবি । সেটা অগোছালো । ও সকালে কাপড় পরিবর্তন করে বাড়ি ফিরেছে । আফতাবের নজর কাড়লো পাঞ্জাবি টা । শাড়ির পাশে পাঞ্জাবি । পাঞ্জাবি ওয়ালাও নিশ্চয়ই পাশেই ছিলো ?
হাসলো আফতাব । এটাই হওয়ার নয় কি ? অলকা ময়নার সাথে টুকটাক কথা বলে বেরিয়েছেন । ঢুকেছেন নিজের ঘরে । শ্যামা খাটের পাশে স্তম্ভের ন্যায় দাঁড়িয়ে । অলকা ডেকে শুধালেন….

” কি হইছে ?
শ্যামা অপ্রস্তুত হলেও উত্তর করলো…
” কিছু না আম্মা ।
” আফতাব ময়নার স্বামী !
আকস্মিক অলকার কথায় ঝট করে চাইলো শ্যামা । সংকিত অবিশ্বাস্য বৃহৎ নয়ন । সে তো‌ জানে না কিছু । এটাই হবার ছিলো । শ্বাস ফেলে খাটের পাশে বসে সবটা ধীরে সুস্থে খুলে বললেন অলকা ।
সবটা শুনে শ্যামা থম মেরে রইলো । পা দুখানা অবস হয়ে আসতেই ধপ করে বসে পড়লো অলকার পাশে । ময়না টার সাথেও এতো কিছু ঘটে গেছে ? মানতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে শ্যামার । চোখ সজল হয়ে আসতেই অলকা ধমকালেন….

” কইছি না , সব বিষয়ে কান্দবি না । অভ্যাস যায় নাই এহনো ?
” আম্মা , আম্মা ময়না ?
” ময়না সুখে আছে এহন । অসুখ হইতে মুক্তি পাইছে । আফতাব রে চিনোস তুই , হেয় কেমন একটু হইলেও জানোস । ময়নারে মাইনা নিছে হেরায় ।
” কিন্তু !
” কিন্তু কিসের ? ময়নার জীবনে কিন্তু নাই এহন !
” ওরা ময়নারে মারতো ?
অলকার কন্ঠ কাঁপলো…
” হ ।
” তুমি সব শুইনা এমনে শান্ত আছো আম্মা ?

” এইগুলা তো এহনকার কথা না । যখন শুনছিলাম , তখন ও শান্ত আছিলাম । কি করার আছিলো আমার ? তোর বাপ তো সব নষ্টের গোড়া । হের লাইগাই তো হইছে সব । হেয় বাপ হইয়াও কিছু করতে পারে নাই । প্রশ্রয় দিয়া আইছে সব । আমি কি করতাম ?
” আমি যদি ময়নার জায়গায় থাকতাম ? তাইলে …..
” শ্যামা ! তুই ময়নার জায়গায় থাকতি না কোনো দিন । তোর থাকার কথা যেইখানে , সেইখানেই আছোস তুই । এহন আর ভাবিস না এই নিয়া । তোরে জানানোর দরকার আছিল , জানাইলাম ।
অলকা বেরিয়ে গেছেন । একটু আধটু নাস্তার ব্যবস্থা করেছেন ছোট জামাইয়ের জন্য । ময়না আফতাবের সামনে সব রেখে ধীরে দূরত্ব বজায় রেখে পাশে বসলো । মুখ খোলার সাহস হলো না । আফতাব গম্ভীর স্বরে বলে উঠলো ও বসতেই….

” বই খাতা গুছিয়ে নাও । বাড়ি ফিরবো ।
” আইজ থাকতে দিতে চাইছিলেন ।
” প্রয়োজন নেই থাকার । হাতে সময় নেই । যেভাবে এসেছো সেভাবেই বাড়ি ফিরবে ।
” থাকি আইজ ? আপাও আছে …
” আমার কথা বলতে ভালো লাগছে না ময়না । তাড়াতাড়ি গুছিয়ে নাও সব । নয়তো বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে যাবে ।
ময়না মলিন মুখে মাথা নত করলো । আফতাব অবস্থা দেখে বললো একই স্বরে….
” পরীক্ষার পর নিয়ে আসবো । যতদিন খুশি থেকো তখন । এখন যাও , সব গুছিয়ে নেবে ঠিকঠাক ।
উঠে দাঁড়ালো ময়না । টেবিলের উপর সব বই খাতা । ও ঠোঁট উল্টে সব গুছিয়ে একটা বড় ব্যাগে ভরলো । আফতাব কোনো এক দিকে চেয়ে এক ধ্যানে । সব গোছানো শেষে ব্যাগটা টেবিলের উপর থেকে নিচে নামাতে চাইলো ময়না । ভীষণ ভারী হয়েছে বইয়ের ভারে । ও জোর খাটালো । ভারী ব্যাগ কোনো রকমে টেনে দখলে নিতেই ভার সামলাতে না পেরে ধপ করে মাটিতে পড়লো ব্যাগটা । আকস্মিক ব্যাগের ভারের সাথে কোমড় চড়কে হেলে পড়লো ময়না । মৃদু কুকিয়ে উঠলো সে । অমনি ঝট করে চাইলো আফতাব । বসা থেকে এক ধাক্কায় উঠে চেঁচিয়ে উঠলো…

” ময়না !
এগোলো তড়িতে । ময়না কোমরে হাত ঠেসে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই ঝাড়ি মারলো আফতাব…
” একটা থাপ্পর মারবো , যা করতে পারো না করতে যাও কেনো হ্যাঁ ? এক্ষুনি কোমর ভাঙ্গলে কি হতো ?
অলকা ছুটে এসেছেন । তার উপস্থিতি বুঝেও থামলো না আফতাব…
” বেশি বাড়াবাড়ি তোমার ? সব গুছিয়ে নিতে বলেছিলাম শুধু ! এটা নামাতে বলেছে কে তোমায় ?
” কি হইছে বাবা ?
” আপনার মেয়ে কথা শোনে না আম্মা । এক্ষুনি কোমর ভাঙ্গতে বসেছিল সে …
অলকা ফাঁকা টেবিল দেখে ব্যাগের দিকে তাকালেন । শুধালেন….
” বই খাতা কি করবা ?
ময়না বাচ্চাদের ন্যায় ঠোঁট উল্টালো । ভীষণ বলতে ইচ্ছে করলো , এই লোকটা ওকে জোর করে পড়াশোনা করাবে আবার । পরীক্ষাও দেওয়াবে । কিন্তু পারলো না বলতে । বললো আফতাব…
” আপনার মেয়ের পরীক্ষা কদিন বাদ । পরীক্ষা দেবে সে । তাই সব বই পত্র নিয়ে যাচ্ছি । এসবই নিতে এসেছি আজ….
অলকা হা বনে চাইলেন ময়নার পানে । পরমুহূর্তে শুধালেন….

” আজই চইলা যাইবা ?
” এক্ষুনি ?
” কি কও বাবা.. কেবলই তো আইলা ।
” সময় নেই আম্মা । আপনার ফাঁকিবাজ মেয়ের অনেক পড়া বাকি ।
” রান্না করি তাইলে , কিছুই তো খাইলা না !
” খেলাম তো । পেট ভরে গেছে আজ । যে উদ্দেশ্যে আসা সেটা সেরেই চলে যাই । বই গুলো নিতে এসেছিলাম । আপনার মেয়ে কে নিয়ে আসলাম আপনাকে একপলক দেখানোর জন্য । দেখলেন তো , এবার যাই ? নয়তো ফিরতে দেরি হয়ে যাবে…
অলকা বাঁধা দিতে পারলেন না আর । চাইলেন না দিতে । তিনি বুঝলেন আফতাবের উহ্য অবস্থা টুকু ।
বাইরে ভ্যান দাঁড়িয়ে । বইয়ের ব্যাগটা ভ্যানে তুলে দিয়ে বাইরেই দাঁড়িয়ে আফতাব । ময়না অলকার ঘরে ঢুকেছে একটু । শ্যামা আর বেরোয় নি ঘর থেকে । সে বসে জানালার পাশে । ময়না ডাকলো…
” আপা !

চকিতে ফিরলো শ্যামা । ময়না কে দেখে উচ্ছাস জাগলো না । বরং এবার ভালো ভাবে নজর বোলালো বোনের দিকে । উঠে দাঁড়ালো সে । ময়না এগিয়ে বললো…
” চইলা যাইতাছি আপা ! তহন তো আমারে জিগাইলা , আমি কেমন আছি ! উত্তর তো শোনো নাই । আমি ভালো আছি আপা । তুমি ভালো আছো ?
উত্তর করলো না শ্যামা । ও ময়নাকে দেখতে ব্যাস্ত । ওর ওটুকু বোনটা ভেতরে ভেতরে লুকাচ্ছে কতকিছু । ময়না আবার বললো উত্তর না পেয়ে….
এবার বিবস স্বরে….

” দেখো আপা , তোমার ভাগ্য টা দুই দুই বার আমার হইলো । আজব না ?
একবার দূর্ভাগ্য , আর এবার..
” এবার কি ময়না ?
এবার কি ? ময়না তো নিজেও জানে না । তবুও বললো…
” সৌভাগ্য !
জানো আপা , আমি পরীক্ষা দিমু ! চইলা যাইতাছি , দোয়া কইরো কেমন ?

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৩৮

” আমার দোয়া কাজে লাগবো ?
” তুমি তো আমার আপা , লাগবো না আবার ?
” তাইলে দোয়া করি , দুনিয়ার সব সুখ তোর হোক । সুখি হ তুই ।

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪০