Home মেজর ওয়াসিফ মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৩৩

মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৩৩

মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৩৩
ঐশী রহমান

‘ আমি এই পর্যায়ে এসে বলতে বাধ্য হচ্ছি, অতি দ্রুত আমাকে আমার বাবার পৈত্রিক সম্পত্তি ভাগ করে বুঝিয়ে দিন চাচা। আমরা দুই ভাই, যে যতটুকু পাবো, আপনারা বড়োরা তা হিসেব মতো ভাগাভাগি করে দিন’
কথাটা ভীষণ বিনীতভাবে বললো ওয়াসিফ। বসার ঘরে এই মুহূর্তে বাড়ির সকলে উপস্থিত। ওয়াসিফের দুই চাচা এবং মা, চাচিরাও সবাই শুনলো সেকথা। তাদের থেকে জবাব পাওয়ার আগেই ওয়াসিফ বলে।
‘ আমি আরো একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, মুমতাহিনা কে নিয়ে আমি ঢাকায় শিফট হবো। চাকরি নেই, ছেড়ে দিয়েছি, কিছু তো করে খেতে হবে’

ধারার বাবা ভদ্রলোক সকল কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার পর বললেন, ‘ ওর যা অবস্থা, তুমি একা কিভাবে সামলাবে ওকে? ওখানে গিয়ে তুমি তো বসে থাকবেনা ওয়াসিফ, তোমার কাজকর্মের জন্য বের হতে হবে’
ওয়াসিফ দৃষ্টি পায়ের পাতার উপর রেখেই বলে।
‘ এই পরিবেশটা মুমতাহিনার জন্য উপযুক্ত না, ওকে এখান থেকে বের করে যত তাড়াতাড়ি নেওয়া যায় ততই ওর জন্য ভালো, আর আমি এটাই করতে চাইছি’
ওয়াসিফের মেঝো চাচা, লুইপার বাবা, ভদ্রলোক বলেন।
‘ ঢাকায় গিয়ে কি করতে চাইছো?তোমার পরিকল্পনা কি? তুমি তো পরিকল্পনা ছাড়া এগোনো মানুষ না’
ওয়াসিফ নিরব দম ফেলে বলে।
‘ আপাতত গাজীপুরের দিকে একটা ফ্যামিলি বাসায় উঠতে চাইছি। আমার ছয় বছরের চাকরি জীবনে যতটুকু যা জমা করেছি তা একসঙ্গে করে বড়োসড়ো কোনো ব্যবসা হয়তো করতে পারবোনা, তবে ছোট থেকে কিছু একটা শুরু করতে চাইছি। ‘

শাহেনূর বলে।
‘ ধারার যা অবস্থা, তুই মেয়েটাকে নিয়ে ওতোদূর কেনো যেতে চাচ্ছিস? তুই একা পারবি ওকে সামলে উঠতে ‘?
‘ বিগত দেড় বছর একাই সামলাচ্ছি আম্মা, বাকিটাও পারবো। ভরসা করতে পারো’
শাহেনূর সহ বাকিরা এই একটা কথাতে একেবারে চুপ হয়ে গেলেন। ওয়াসিফের এই কথাটার উপর আর কারো কোনো কথাই পড়লোনা।
ধারার বাবা, মইনুল সাহেব চোখের চশমাটা ঠিক করে ওয়াসিফের দিকে তাকিয়ে বলেন।
‘ ভাইজান বেঁচে থাকতেই তার সকল সম্পত্তি সমান ভাবে ভাগ করে বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন বড় ভাবীর কাছে। আমাদের নতুন করে আর কিছু ভাগাভাগি করার নেই এখানে। তবে একটা কথা জিজ্ঞেস করবো? তুমি হঠাৎ এই ভাগ বুঝে নিতে চাইছো কেনো’?
ওয়াসিফ তাকায় চাচার দিকে, চোখে মুখে কোনো প্রকার সংশয় ছাড়াই বললো।

‘ এই সম্পদের একাংশ বেঁচে আমি আয়ের পথ খুঁজবো, এবং আমার ছয় বছরের চাকরির জমাকৃত টাকাটা আমার বৌয়ের চিকিৎসার পেছনে খরচ করবো। আর কিছু জানার আছে আপনাদের ‘?
বাড়ির সবাই একযোগে ওয়াসিফের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। নিজের চাকরি ছাড়ার পরও ওয়াসিফ গত দেড়বছরের একটা দিনও ধারাকে বিনা চিকিৎসায় রাখেনি। এবং সেই সকল ব্যয় নিজের কাঁধে বহন করেছে। ধারার বাবা, চাচা, কেউ এগিয়ে দুই পয়সা খরচ করতে চাইলেও ওয়াসিফ নেয়নি। জীবনের প্রতিটা পদে পদে নিজেকে এভাবে শক্ত রাখা মানুষটা কি আদৌও ভেতর থেকে শক্ত আছে এখনো?
পারিবারিক এক বিস্তার আলোচনা শেষ করে ওয়াসিফ পা বাড়ালো নিজের ঘরের দিকে, দোতলার সিড়ি ভেঙে উপরে উঠতে দেখলো রেলিঙ ধরে লুইপা দাড়িয়ে আছে। বোনকে দেখে ওয়াসিফ জিজ্ঞেস করে।
‘ মুখ শুকনো কেনো তোর? কি নিয়ে চিন্তা করিস সারাদিন ‘
বড়ো ভাইয়ের নরম কথায় চোখ বেয়ে নোনাপানি উপচে পড়তেই লুইপা সঙ্গে সঙ্গে তা মুছে ফেলে বলে।
‘ ও কবে সুস্থ হবে? ওকে এভাবে আর দেখা যায় না ভাইয়া’?
ওয়াসিফ সামান্য হেঁসে বোনের মাথায় আদর সুলভ হাত রেখে বলে।

‘ একটু সময় লাগবে, শকডটা অতিরিক্ত ‘
বলেই ওয়াসিফ পাশ কাটিয়ে চলে যেতে পেছন থেকে ডাকে লুইপা।
‘ ভাইয়া, সামির আসবে কাল’
ওয়াসিফ থেমে আবার ঘুরে দাঁড়ায়।
‘ ছুটি পেয়েছে ও’?
‘ হু’
‘ আচ্ছা, তাহলে তুই শশুরবাড়ি থেকে কিছুদিন ঘুরে আয়’
‘ তোমরা কি খুব তাড়াতাড়ি চলে যাবে ঢাকায়’?
‘ না, দিন পনেরো লাগবে, সবকিছু গোছগাছ করার একটা ব্যাপার আছে না’
‘ তাহলে আমি বরিশাল থেকে এসে তোমাদের পাচ্ছি’?
‘ তুই এলে তারপর যাবো আমরা, তুই নিশ্চিতে কয়দিন ঘুরে আয়’
ওদের ভাই বোনের কথোপকথন এতটুকু ই চলে। ওয়াসিফ নিজের ঘরে ঢোকে। ঘড়িতে রাত আটটা বাজে। ধারা গভীর ঘুমে। ওয়াসিফ সবে বিছানায় বসেও পারেনি এরমধ্যে ডাক্তার আফরোজার কল। ওয়াসিফ কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে আফরোজা বলেন।
‘ আমি তোমাদের সদরে এসেছি ওয়াসিফ, আজ নয়টার পরপরই ফিরে যাবো। আর্জেন্ট আসতে পারবে? মুমতাহিনার কিছু রিপোর্ট ছিলো, আমি সঙ্গে এনেছি’
‘ জি ম্যাম, আমাকে দশটা মিনিট সময় দিন’
কোনোরকম ফোনকলটা কেটেই গায়ের শার্ট পাল্টে লুইপাকে ডেকে ধারার পাশে রেখে ওয়াসিফ ছুটলো সদরের দিকে।

পৃথিবীর সবচেয়ে আনন্দদায়ক খবরগুলোর মধ্যে অন্যতম আনন্দের খবর বোধহয় কোনো পুরুষ যদি নিজের কানে শুনতে পায় এই পৃথিবীতে তার একটি অংশ প্রাণরুপে আসছে। ঠিক তেমনই একটি খবর রিপোর্টে ছেপে আছে।
ওয়াসিফ থ হয়ে বসে আছে চেয়ারে, স্থির চোখে তাকিয়ে আছে হাতের মুঠোয় চেপে রাখা রিপোর্ট গুলোর দিকে। আফরোজা খেয়াল করছে ওয়াসিফ কে। ইতিমধ্যে একটা মাঝবয়সী ছেলে দু’কাপ চা এনে টেবিলে রেখে সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে গেলো। আফরোজা কাশি দিয়ে ওয়াসিফের মনোযোগ পেতেই বলে।

‘ তোমাকে ভীষণ আপসেট দেখাচ্ছে ওয়াসিফ, তুমি বাবা হচ্ছো, তুমি কি খুশি নও খবরটিতে’?
ওয়াসিফ এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে আশেপাশে তাকিয়ে নিজের ভেতরের অস্থিরতা দমিয়ে রেখে বলে।
‘ আপনি তো আমার ভেতর বাহির সবটাই জানেন ম্যাম। গত দেড়বছরের সকল পরিস্থিতি আপনি জানেন। যেখানে মুমতাহিনার হেল্থ কনডিশন ভালো না সেখানে নয়মাস একটা বেবি ক্যারি করা ওর পক্ষে আদৌও কি সম্ভব ‘?
‘ গত দেড়বছরের পরিচিতি থেকে যদি বলি, তবে তুমি সেই সেরা সাপোর্টটিভ একজন হাসবেন্ডের মধ্যে অন্যতম, তুমি চাইলে অবশ্যই মুমতাহিনা পারবে। এমনকি আমিও এটাও বিশ্বাস করি, এই বেবিটা হয়তো মুমতাহিনাকে তার সুস্থ জীবন ফিরিয়ে দিতে বিশাল একটা প্লাস পয়েন্ট হবে। আমার মেডিকেল লাইফের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি বেবিটাকে রেখে দেও ওয়াসিফ, তোমাদের প্রথম সন্তান মায়ের জন্য নতুন জীবন হয়ে আসুক’
ওয়াসিফ দৃষ্টি নামিয়ে হাঁটু উপর রাখা রিপোর্টগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। আফরোজা চায়ের কাপটা ওর সামনে এগিয়ে দিয়ে বলে।

‘ তোমাকে একটা ঘটনা বলি, বলার কারণ যাতে তুমি মনে একটু বল পাও। বছর তিনেক আগে আমার কাছে এমনই এক পেশেন্ট আসে, তবে মুমতাহিনা আর সেই মেয়েটির ট্রমার কারণ একটু ভিন্ন, ঐ মেয়েটির একমাত্র সন্তান চোখের সামনে ভয়াবহ এক অগ্নিকান্ডে মারা যায়, সেই থেকে মেয়েটা বাস্তবিক সবকিছু ভুলে অন্য এক জগতে চলে যায়। বলতে গেলে মুমতাহিনার থেকে ঐ মেয়েটার খারাপ অবস্থা হয়েছিলো, অনেক ডাক্তার পালটে দেখাচ্ছিলেন উনার হাসবেন্ড, এরপর এলেন আমার কাছে, আমার কাছে চিকিৎসা চলাকালীন দুইমাসের মধ্যে জানতে পারি উনি কনসিভ করেছেন। পরিবারের লোকজন চাইলেন এই পরিস্থিতিতে বাচ্চা নষ্ট করে ফেলতে কিন্তু একমাত্র উনার হাসবেন্ড ই মোচড় দিয়ে বসলেন, এই বাচ্চা তিনি রাখবেন। ভদ্রলোক একটা প্রাইভেট জব করতো, বাচ্চা আর বাচ্চার মায়ের জন্য চাকরি ছেড়ে বাড়িতে পরে রইলো ওয়াইফের কাছে। ভদ্রলোক চাচ্ছিলেন তার ওয়াইফের শূন্য কোলটা আবারও পরিপূর্ণ হোক। এবং পরিশেষে ভদ্রলোক জিতেও গেলেন, উনার জেদ জিতে গেলো, উনার চাওয়া জিতে গেলো। এবং আল্লাহর অশেষ রহমাত, উনার ওয়াইফ এখন পুরোপুরি সুস্থ, গতবছর জুনে জমজ জমজ দুটো ছেলে হয়েছে। এরমাঝে একবার এসেছিলেন আমার চেম্বারে, অনেক কথা হলো। মা তো, সন্তান কে হয়তো ভুলতে পারেননি, তবে ট্রমা কাটিয়ে সুস্থ হয়েছে’

ওয়াসিফ পুরো ঘটনাটি মনোযোগ দিয়ে শুনলো, আফরোজা চা খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলো।
‘ এতোক্ষণ তো আমিই সবকিছু বললাম, তোমাকে বোঝালাম, এবার বলো তোমার কি সিদ্ধান্ত ‘?
ওয়াসিফ দৃষ্টি স্থির করে তাকিয়ে আছে হাঁটুর উপর চেপে রাখা রিপোর্ট গুলোর দিকে, জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে ভীষণ নরম আর ধীর কন্ঠে বলে।
‘ আল্লাহর দেয়া রহমাত নষ্ট করা বা এড়িয়ে যাওয়ার মতো শক্তি বা সাহস দুটোর কোনোটাই আমার নেই ম্যাম। আমি উপরওয়ালার এই অশেষ দান আনন্দসহিত গ্রহন করলাম, পরিস্থিতি আমাকে হয়তো বারবার নাজেহাল করে ছাড়বে তবে আমি শক্ত থাকবো’
আফরোজা নিশ্চিত মনে ছোট করে দম ফেলে বলে।
‘ আমি জানি তুমি পারবে ওয়াসিফ, আগামীকাল একজন গাইনী ডাক্তার তোমার বাড়িতে পাঠাবো, আমার আপাতত এক সপ্তাহ সেমিনার চলছে, এরপর আমিই যাবো, নিয়মিত মুমতাহিনার চেকাপ চলবে’
এইটুকু বলে আফরোজা ফের বলে।

‘ ভ্রুণের বয়স, সপ্তাহ, সবকিছু রিপোর্টে লেখা আছে ‘
ওয়াসিফ এতক্ষণ বসে বসে খুঁটে খুঁটে দেখেছে সব, ম্যামের কথা মনোযোগ দিয়ে সব শুনেছেও। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়াতে দাঁড়াতে ওয়াসিফ বলে।
‘ ফোনে খবরটা আগে দিলে আমি আপনার জন্য মিষ্টি আনতাম ম্যাম, এখন তো সম্ভব না…’
আফরোজা ওয়াসিফকে থামিয়ে হাসতে হাসতে বলে।
‘ মিষ্টি তো অবশ্যই খাবো, তাড়াহুড়ো করতে হবেনা, অনেক সময় আছে, দীর্ঘ নয়মাস’
কথা শেষ হয়, ওয়াসিফ নমনীয়তার সঙ্গে বিদায় নিয়ে সদর হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যায়।

মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৩২

মানুষের জীবনে কখনো কখনো এমন অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু জিনিস আসলেই ঘটা দরকার, তাহলে হয়তো ভেতরে ভেতরে শেষ হয়ে যাওয়া কিছু প্রাণ পুনরায় আরো একটিবার নিজের সজীবতা কে ধরে রাখতে আরো একটিবার ঘুরে দাঁড়াবে। নতুন করে বাঁচতে চাইবে কোনো এক নতুন প্রাণের আগমনে।
ওয়াসিফ টের পাচ্ছে, ওর পা জোড়া সামনে এগোতে চাইছে না,জড়িয়ে যাচ্ছে বারবার। বুকের ভেতর এ কেমন এক অস্থিরতা? এটা কি সব পুরুষের জন্য সেম হয়? যখন তারা প্রথম বারের মতো শোনে তারা বাবা হচ্ছে? নাকি শুধু ওয়াসিফের একারই হচ্ছে?

মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৩৪