Home হৃৎস্পন্দন হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫৬

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫৬

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫৬
সাঞ্জেনা শাজ

আগামীকাল জুম্মার দিন, তালুকদার বাড়িতে দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। বাড়ির সকল প্রাণ একত্রিত হওয়ার বদৌলতে অনেকটা আমেজ প্রবন
উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে বৃহস্পতিবারের সন্ধ্যাটায়। সন্ধ্যে থেকেই চেনা বাড়িটি যেন এক নতুন রূপে সেজে উঠেছে। টুকিটাকি আত্মীয়-স্বজনদের কোলাহল, সাফি কে নিয়ে ছোটদের চঞ্চলতা আর বড়দের আন্তরিক ব্যস্ততায় পুরো বাড়ি জুড়ে এখন এক আনন্দঘন ও পবিত্র আবহ বিরাজ করছে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা সুগন্ধ আর সবার মুখের চওড়া হাসি মিলিয়ে পুরো তালুকদার বাড়িতে এখন এক পরম খুশির আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে যেন।
এতসব কিছুর মধ্যেও সোহানার মন কুঠোরিতে কালো মেঘের ভেলারা পুঞ্জিভূত হয়েছে। এতদিনের পরিক্ষার ব্যাস্ততা কেটে উঠতেই অবাধ্য মনটা আবার ভালোবাসা নামক মরণব্যধিরর জন্য তড়পাচ্ছে। বুক ভার হয়ে আসে, কণ্ঠনালী চেপে আসে বুকচেড়া বিরহে। অজান্তেই দু’চোখ বেয়ে গড়ায় বেদনা’শ্রু। শুভ্রতা ওর ফুলো ফুলো চোখ মুখ দেখে বার কয়েক জিজ্ঞেস করেও কোন সঠিক প্রতিউত্তর পায় নি। সে’ই দেয় নি।

যার কোন গন্তব্য নেই, তার পিঞ্জর মুক্তি হওয়ারও কোন অধিকার নেই। তার একপাক্ষিক ভালোবাসা দু পরিবারের মধ্যে অবাঞ্চিত দেয়াল তুলে দেক সে চায় না। আদনান যদি শান্তা কে ভালোবেসে থাকে, তাহলে সে গুমরে ম’রলেও তার ভালোবাসার ভালোবাসা জয়ী হোক।
এই যে সন্ধ্যা হতে মেহরাদের সাথে ছুটো ছুটি করছে আদনান, সোহানা একবারও লোকটার দিকে তাকায়নি। সামনেই পড়েনি। অবশ্য সে সামনে গেলো কি না গেলো, এত ব্যাস্ততার মধ্যেও কেউ নিশ্চয়ই খেয়াল করবে না! যাক এতেও স্বস্থি!

এতোক্ষন ধরে দৌড় ঝাপ করে ছুটোছুটিতে সকলে বেশ ক্লান্ত। সময়ের তালে তালে দ্বীপের সাথে আদনান, মেহরাদের সম্পর্ক বেশ গাঢ় হয়েছে। ওর পরিবারের সাথেও। এলাকার ছেলেও হলেও টুকিটাকি পরিচিত ছাড়া প্রথমে আহামরি তেমন সম্পর্ক ছিলো না। তবে, এখন নিজের ছোট ভাইয়ের মতোই ট্রিট করে দ্বীপকে আদনান, আর মেহরাদ। যেন তিন ভাই।
বেশ খানিকটা কাজ ধাজ আয়ত্তে আসতেই সকলে ড্রয়িং রুমে এসে বসলো একটু স্বস্থির শ্বাস টুকু ফেলতে। সুরাইয়া আর জাহানারা বেগম শান্তাকে ঠেলে ঠুলে কাজের ব্যস্ততার বাহানায় শরবত দিয়ে পাঠালো আদনানদের কাছে। শান্তা আবার ছোট বোনকে বগলদাবা করেছে। সে একা আসতে নারাজ আদনানের সামনে। শুভ্রতার তো পা’য়ের সমস্যা, ওঁকে এসব কাজটাজে ভুলেও কেউ ডাকে না। মেয়েটা চাইলেও কড়া করে নিষেধাজ্ঞা জাড়ি করা হয়। অজ্ঞাত শুভ্রতা এমনিই ঢেং ঢেং করে তার স্বামীটাকে দেখতে ড্রয়িং রুমে উঁকি দিলো।
ইশ! কি পরিশ্রান্ত দেখাচ্ছে সুদর্শন মুখটা! একটু ব্যাথিত হলো মেয়েটার কবুতরি নরম হৃদয়খানা। মেহরাদ চিনি ছাড়া শরবত খেতে পছন্দ করে এটা মনে পড়তেই চট করে আবারও কিচেন রুমের দিকে পা’বাড়িয়ে বানিয়ে নিয়ে আসলো স্বামীর জন্য আলাদা করে শরবত।

নাখোশ চিত্তে ড্রয়িং রুমে আসলেও বর্তমানে অনুভূতি শূন্য হয়ে স্থীর হয়ে আছে শান্তা। আদনানের পাশেই দ্বীপ। ছেলেটার আকুতিভরা ভিরা দৃষ্টি তার দিকেই নিবদ্ধ, ব্যাপারটা বেশ অনুভব করছে মেয়েটা। অবাধ্য মনটা বেহালার করুন সুরে নৃত্য করছে ভেতরে। যতই দূরে থাকতে চায় এই অসহ্য অনুভূতি থেকে ততই তা আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে তার নরম হৃদয়টাকে। ক্ষতবিক্ষত করে ওই দু ‘চোখের প্রগাঢ় চাউনিতে।
দ্বীপ খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছে শান্তাকে। তার মনে হলো তাকে দেখেই মেয়েটা স্থীর হয়ে জমে গেলেও, ভেতরের এক অদৃশ্য তোলপাড় তার প্রেয়সীকে আন্দোলিত করছে। এ তোলপাড়, আন্দোলন, সংকোচ সব কিসের জন্য! তার থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায়? সে কি বেশিই বিরক্ত করছে? কই না তো! সে কি এতই অভাগা? একটু কি ভালোবাসা প্রাপ্য না তার?
সোহানা সোফার হাতল ধরে ঠায় দাঁড়িয়ে। আদনানকে দেখার পর দ্বিতীয় বার আর চোখ তুলে তাকায়নি। তাকে এখানে আশা করে নি সে। বোনের বগলদাবায় আসতে হয়েছে কিছু না জেনেই। চারদিকের এতো হৈচৈ, তবুও বিরহের নীল ব্যাথায় মেয়েটার চোখমুখ খিঁচে আসতে চায়। অদৃশ্য ক্লেশানুভূতিতে ভেতরের হৃদযন্ত্রটা মুঁচড়ে উঠছে নাজুক অষ্টাদশীর।

আদনানের আপাতত অতো ধ্যান খেয়াল নেই। ক্লান্তির তাড়নায় সামনের গ্লাসের সবটুকু শরবত এক চুমুকেই গলাধঃকরণ করে প্রশান্তির শ্বাস ফেললো ছেলেটা। একে একে দ্বীপ মেহরাদ নিতে গেলেও শুভ্রতা ছোট ছোট কদমের গতি বাড়িয়ে আসতে আসতে মেহরাদের উদ্দেশ্যে ডেকে বলল,
“ওটা খাবেন না, মেহরাদ ভাই। এটা খান। ওটা তো চিনি দেওয়া…. ”
“আস্তে। ছুটছিস কেন তুই? ব্যাথা পাবি না!”
আশ্চর্য, মেহরাদ। মেয়েটার এ পা’য়ে ছুটে আসা দেখে। কঠিন চোখের দৃষ্টিপাত করে অবাধ্য কিশোরীর দিকে। এত বাড়ন করার পরও কোন ধ্যায়ান খেয়াল থাকে না মেয়েটার নিজের দিকে।
শুভ্রতা মিইয়ে আসে ওই কঠোর দৃষ্টির কবলে। অস্থির কদমের গতি কমিয়ে, ধীরস্থির পায়ে হেটে এসে হাতের শরবত টুকু এগিয়ে দিয়ে মিনমিনে বলে,

“ওটা তো চিনি দেওয়া। সকলের জন্য বানানো হয়েছিলো। আপনি তো খান না….”
বিরক্তির শ্বাস ফেলে মেহরাদ। চটে যাওয়া মেজাজে বলে,
“তাই বলে এভাবে ছুটে আসবি তুই? খেলে কি বা হয়ে যেতো ? আর তুই পা’য়ে ব্যাথা পেলে কি হতো? এখানে কষ্টটা কার হতো শুনি? তুই মা’র খেতে চাস আমার হাতে এ অবাধ্যতায়.? . ”
শুভ্রতা মুখ কাচুমাচু করে ফেলে। মাথা নত করতেই চটে যাওয়া মেজাজে লাগাম টেনে ধরলো মেহরাদ। অবুঝ মেয়ে একটা! তার মাথা আউট করে ছাড়ছে। চিকন হাতের আঁকড়ে ধরা শরবত গ্লাস টুকু নিয়ে চুমুক বসাতে বসাতে মেয়েটাকে বসতে আদেশ ছুড়লো। শুভ্রতাও বসে গেলো তৎক্ষনাৎ। একদম বাধ্য মেয়ের মতো। তার মতো বাধ্য কন্যা জগৎ জুড়ে অমিল। ড্রয়িং রুমে আপাতত তারা পরিচিত মানুষ জন’ই।
হুট করেই আলতো শব্দে কেশে উঠলো আদনান। চাপা কন্ঠে মেহরাদের উদ্দেশ্যে বলে,
“সারাক্ষণ মা’র খাবি, মা’র খাবি করিস, আদর টাদর আদও করিস তো? তোর বউ ঢাকে ভাই, তুই বউকে কথায় কথায় বলিস, মা’র খাবি….. কি ক্যামেস্ট্রি তোদের ভাই।” পাশে থাকা দ্বীপ শুনে হেসে ফেললো, চাপা হাসি।
মেহরাদ বিরক্তির দৃষ্টি ছুড়লো আদনানের দিকে। যখন তখন ফাজলামো! যত্তসব!
এর’ই মধ্যে সকলের চাপা হাসি ঠাট্টার জোয়ারে অতর্কিত ভাটা হয়ে আগমন ঘটালো বাড়ির ছোট গুনধর পুত্র, সাফি। সে নিজেকে উড়িয়ে উড়িয়ে এসে ধপ করে বসলো মেহরাদ আর আদনানের মাঝখানে। খুশ মেজাজে আদনানের উদ্দেশ্যে বলল,

“কি ব্যাপার হবু দোলা ব্রো??? শালাকে চিপস, চকলেট টকলেট দিয়ে পটাচ্ছেন না কেন? বোন কিন্তু দিবো না,হু?”
ওর কথায় মেহরাদ ব্যাতিত সকলের মধ্যেই চাপা অস্থিরতা ছেয়ে গেলো। সোহানা ঘার ঘুরিয়ে প্রস্থান করতে চায়। এ সকল খুনসুটিও তার বুকে তীরের মতো বিধতে শুরু করবে না-হয়। ঝাজড়া করবে বক্ষস্থল।
শান্তা নিস্প্রভ দৃষ্টিতে তাকালো দ্বীপের দিকে। দ্বীপ কিছুটা বিভ্রান্ত। হবু দোলা ভ্রো এর মানে সে বুঝলো না। তার জানা মতে আদনান সোহানাকে পছন্দ করে বোধহয়! কিন্ত এতো তাড়াতাড়ি সকলের জানাজানি হলো কখন! সে বিভ্রান্ত নিয়ে তাকিয়েও দেখলো সোহানাকে। মেয়েটা অস্তিত্ব বাকিয়ে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে। কেমন লুকিয়ে যেতে চাইছে!
“বোন দিতে না চাইলেও নিয়ে যাবো। জোর করে। তালুকদারদের থেকে শেখ রা’ও কম কিসে? হু?” আদনান হেসে বললো মজার ছলে। তার ধারণা শাফি ইঁচড়েপাকা, চঞ্চল প্রান। বুঝেছে বোধহয় তার অনুভূতি সোহানার জন্য। এ কারণনেই বলছে বোধহয় এ কথা।

শুভ্রতা আঁড়ে আঁড়ে তাকায় সোহানার দিকে। শান্তা আপুর বিয়ে কথা শুনলেই মেয়েটার মুখশ্রী জুড়ে কেমন
চাপা কষ্টের ছাপ ভেসে উঠে। শুভ্রতা চেয়েও সঠিক কোন তথ্য জানতে পারছে না। শুধু এতটুকু জানে খুব শিগগিরই আদনান আর শান্তার বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করা হবে। ব্যাস।
“উঁহু, আমি আমার বড়ো আপুকে দিবো না। সকলে আমি ছাড়াই অর্ধেক বিয়ের কথা সেড়ে ফেলেছে তোমাদের। আমি এ বিয়ে মানি না। হয় আমায় ঘোষ দাও না-হয় সব ক্যান্সেল। ”
শাফির কথায় যেন বিস্ফোরণ ঘটলো উপস্থিত দু মানবের মধ্যে। সোহানার নিশ্বাস আটকে আসলো কন্ঠতালুতে। তৎক্ষনাৎ স্থান ত্যাগ করলো ত্রস পায়ে। আর এক মূহুর্তও এদিকে থাকা সম্ভব নয়। কিছুতেই না।
শান্তার মুষ্টিবদ্ধ দু’হাত কাপছে অনবরত। এর চেয়েও বেশি কাপছে ভেতরটা। দ্বীপের অনুভূতি শূন্য, অবিশ্বাস্য দু’চোখ তীরের ফলার মতোই এফোড় ওফোঁড় করে দিচ্ছে হৃৎপিণ্ডটা। মেয়েটা তবুও ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো দ্বীপের অভিব্যক্তি দেখার আশায়। কেন বারবার বারন করা সত্তেও তাকে জড়ালো? কেন শিকলে আবদ্ধ মনটাকে মুক্তি দিতে বাধ্য করালো? মায়ায় পড়তে বাধ্য করলো? এখন কি হবে তাদের দুটো ভাঙা হৃদয়ের? এ ভালোবাসা বহিঃপ্রকাশেও যে মিলবে করুন লাঞ্চনা। কে মেনে নিবে সমাজের বহির্গত নিয়মের এ সম্পর্ক! এ যে এক নিষিদ্ধ টান।
দ্বীপ শান্তার দৃষ্টিতে দৃষ্টি রেখেই নিস্পৃহ স্বরে সাফিকে জিজ্ঞেস করলো,

“কাদের বিয়ে সাফি? ”
“কেন শান্তা আপু আর আদনান ভাইয়ার বিয়ে তো সেই কবে থেকেই ঠিক করা! তুমি জানো না ব্রো?” ছেলেটার চপল গলার জবাব।
দ্বীপ যান্ত্রিক যন্ত্রের ন্যায় উঠে দাড়ালো সোফা হতে। দু’পায়ের গতি টলমলে। নিজের ভারী অস্তিত্বটাকে কোনরকম টেনে প্রস্থান করলো তালুকদার বাড়ির ড্রয়িং রুম হতে। মেহরাদ পিছু ডাকলো, তবুও জমে যাওয়া পা দুটো টেনে প্রস্থান করলো ছেলেটা। তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। অক্সিজেনের স্বল্পতায় এই বুঝি লুটিয়ে পড়বে জনসমাগমের মধ্যে!
এদিকে সাফির কথা আর সোহানার প্রস্থানে যেন আদনানের মাথায় বাজ ভেঙে পরলো। তৎক্ষনাৎ মিলিয়ে ফেললো একে একে দুই। এ কারণেই মেয়েটা তাকে এড়িয়ে চলছে? এসব কখন হলো? সে তো জানেই না! অবিশ্বাস্য নয়নে মেহরাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“আমাদের বিয়ে কবে ঠিক হলো? আশ্চর্য! এ অকাজ কখন হলো? ”
মেহরাদ ভ্রু গোটালো। এঁদের একেকজনের রিয়াকশন সন্দেহজনক। শুভ্রতা হকচকিয়েছে বেশ। বড়ো বড়ো চোখে সকলের মুখশ্রী মতে দৃষ্টি ভোলাচ্ছে শুধু । মেহরাদ সন্ধিগ্ধ কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“তুই জানিস না? প্রায় মাস খানেক হয়ে যাবে। দুই পরিবারের ই ত জানা। তোকে জিজ্ঞেস করেই তো প্রস্তাব রেখেছে ওনারা। স্ট্রেঞ্জ….”
আদনান আশ্চর্যের শিয়রে,
” গড সোয়্যার, আমি কিচ্ছু জানি না। ইটস জাস্ট এন মিস আন্ডারস্ট্যান্ডিং ইয়ার! তুই একবার জিজ্ঞেস করবি না আমায়? আমি শান্তার জন্য প্রস্তাব রাখতে বলি নি। ইনফেক্ট কিছুই বলিনি এখনো। ওরা এর আগেই এসব বাধিয়েছে?? ”

এ যাত্রায় মেহরাদ গা টেনে বসলো। পরপর দাড়ালো টানটান ভঙ্গিতে। শুভ্রতাকে খোঁজার ব্যাস্ততা, তারপর, পাওয়ার পর এত সব কিছু হ্যান্ডেল করা, সব কিছুর জাতা কলে ভুলেই বসে ছিলো সে এটা।
তবুও চতুর মস্তিষ্কে বন্ধুর কথায় নাখোশি ভাব টেনে জিজ্ঞেস করে,
“তুই জানলে, কার জন্য প্রস্তাব রাখতে বলতি? এম আই গ্যাসিং রাইট? ”
“,ইয়েস! অভিয়্যাসলি! আই লাভ হার। বিয়ে করলে অবশ্যই ওঁকে করবো। ”
শান্তা ঢোক গিলছে বড়ো বড়ো। মস্তিষ্ক কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে ওর। দু’হাতের তালু শীতলতায় জমে যাচ্ছে অতিরিক্ত চাপের ধরুন। শুভ্রতা শুধু পলক ঝাপটাচ্ছে হা করে। সে যদি সঠিক হয়, আদনান ভাইয়া সোহানাকে ভালোবাসে, আর সোহানা? সোহানাও তার মানে ওনাকে ভালোবাসে! ইয়েস! এটাই হবে!
সোহানার মন খারাপের রহস্য উদঘাটন করতে পেরে এবং এর পূর্নতা উপলব্ধি করে শুভ্রতার চঞ্চল মনটা ইয়াহু বলে নেচে উঠলো। মেয়েটা তৎক্ষনাৎ সোফা হতে দাঁড়িয়ে উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বললে,
“আমার মনে হয় সোহানাও আপনাকে পছন্দ করে আদনান ভাইয়া! ”
আরেকটা ছোট খাটো বিস্ফোরণ ঘটলো ড্রয়িং রুমে জুড়ে। শুভ্রতার কথার আদনান তৎক্ষনাৎ সম্মতি জানিয়ে বলল,
“মেইবি! দয়াট মিনস, উই লাভড ইচ আদার! আমি ওঁকে এখনো কনফেশন ও করতে পারলাম না আর ফ্যামিলি গুলো কি কূটনীতি চালালো! আল্লাহ! আমাকে এক্ষুনি ওঁকে সব জানাতে হবে। এ কারণেই ও আমায় বিগতদিন গুলো থেকে এড়িয়ে চলছে! মাই গড!”
আদনান ছুটে সোহানার কাছে যেতে চায়। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ায় মেহরাদ। আদনানের বাহু টেনে তীর্যক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

“আমি এখনো দাঁড়িয়ে এদিকে। কোথায় যাচ্ছিস তুই? আমার বোনের সাথে আমায় কথা বলতে দে…. ”
নিজেকে মেহরাদের কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিলো আদনান,
” নো, মেহরাদ। আমায় ক্লিয়ার করতে দে সব আগে। খবরদার, একদম ভিলেন ভাই সাজতে আসবি না আমার ভালোবাসায়। আমার টা আমায় হ্যান্ডেল করতে দে। তোর ভালোবাসায় সব সময় সাপোর্টিব ছিলাম আমি, আমারটায় ভিলেন সাজতে আসবি তো, গুলি করে খুলি উড়িয়ে দিবো একদম বলে দিলাম! দাড়া, তোর টা পরে দেখছি। তোর বোনটাকে সামলে আসি আগে। তারপর বাড়ির সব গুলোকে তুলোধুনো করব। ”
বলেই ছুটলো সিড়ি বেয়ে উপরের দিকে।

মেহরাদ তাকালো শুভ্রতার দিকে ঘার বাকিয়ে। দু’চোখের দৃষ্টি সংকোচিত। শুভ্রতা ওই দৃষ্টিতে গাল ফুলোয়। তাকে আবার বকবে না-কি! মেয়েটা আগে বাগেই ফুলে উঠা মুখশ্রী নিয়ে বাধ্য বালিকার ন্যায় বলে উঠে,
“আমি কিন্তু আগে কিছুই জানতাম না! একদম ওভাবে তাকাবেন, হু। এই সবেই সব ঘটনার রহস্য উদ্ধার করলাম আমি। এখন আপনি আশ্চর্য হয়ে ভাবতে পারেন, এতো তাড়াতাড়ি? কিন্তু, এটাই সত্যি। ওতো বেশি সময় লাগে নি বের করতে, বুঝলেন? চালাক কি-না আমি! খুশি হন। আপনি একটা চালাক বউ পেয়েছেন। হুহ!”
মেহরাদ কপাল চেপে ধরে হাতের আঙুলে। পুরোষ্ঠ অধর বেকে আসে চাপা হাসির ঝিলিকে। এরকম একটা মোমেন্টেও তার বউ তাকে হাসতে বাধ্য করছে বোকা বোকা কথায়। কি কপাল তার! আগামীকাল একটা অনুষ্ঠান আর এরা এদিকে তামাশা লাগিয়ে বসেছে। ইচ্ছে করছে সব গুলোকে দফায় দফায় মাইর দিতে।

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫৫

শান্তা যেন স্বস্থির ঢেকুর তুলছে ভেতরে ভেতরে। আবার অবাকও হচ্ছে ছোট বোনের ব্যাপারটা ঠাহর করে। মেয়েটা এতদিন কতো কষ্টেই না ছিলো! সে একটুও বুঝলো না! অবশ্য বুঝবেই কি করে! সে নিজেই তো ভিন্ন গ্রহে ছিলো! তবুও স্বস্থি, এখন এই বিয়ের প্যারা থেকে তো মুক্তি অন্তত! পরক্ষণেই আবার ভেতরটা কেপে উঠে মেয়েটার, দ্বীপের ওই নিস্প্রান, ঘোলাটে দৃষ্টির তাড়নায় । ছেলেটা কোথায় গেলো ওভাবে? ভুলভাল কিছু করে ফেলবে না তো!
কিভাবে খবর টুকু নেবে! তার কাছে তো ছেলেটার নাম্বারও নেই! বুকটা জ্বলে উঠে অদৃশ্য এক অনুভূতির জোয়ারে।

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫৬ (২)