মেজর কারদার পর্ব ২২
ফিনারা ঝুমুর
দিবালোকের তপ্ত সূয্যি তখন মধ্যগগনে অলস উঁকি দিচ্ছে। আষাঢ়-শ্রাবণের আকাশের অদ্ভুত স্বভাব এই সূয্যির তেজ কমছে, তো এই আবার তীব্র হয়ে বাড়ছে, মেঘ-রোদ্দুরের এই খেলায় কোনো বিশ্রাম নেই।
ক্লান্ত দেহে পরীক্ষার হল থেকে বের হলো মেঘ। দীর্ঘ সময়ের লেখালেখির ক্লান্তি ওর শরীরে ভর করলেও, মুখশ্রীতে তার বিন্দুমাত্র নেতিবাচক রেশ নেই। বরং ওর শ্যামলা মুখশ্রী জুড়ে এক প্রফুল্ল ও সতেজ আভা খেলা করছে; পরীক্ষাটা বেশ ভালো হয়েছে ওর। সেই প্রফুল্লচিত্তে গুণগুণ করতে করতে বাড়ি ফিরে সদর দরজা ঠেলে ভেতরে পা রাখতেই মেঘ পুরো থমকে গেল।
ও দেখল, ওর মা আলেয়া বানু চরম ব্যস্ত হয়ে এদিক-ওদিক অনবরত ছোটাছুটি করছেন। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে খাঁটি ঘিয়ে ভাজা গরম পোলাও আর মশলাদার মাংসের এলাহি সুবাস। বসার ঘর থেকে শুরু করে পুরো বাড়িতে একদম উৎসব-উৎসব পরিবেশ। মেঘ এক হাত গালে দিয়ে হা করে মায়ের এই হুটোপুটি দেখতে দেখতে উৎসুক গলায় বলে উঠল,
“এলাহি কাণ্ড! এত সব রাজকীয় আয়োজন কেন করছো মা? আমাদের বাড়িতে আজ কি বিশেষ কেউ আসবে নাকি?”
আলেয়া বানু চুলার ওপর থেকে তরকারির কড়াইটা নামাতে নামাতে এক মুহূর্তের জন্য দম নিয়ে বললেন,
“শীর্ষ আসবে।”
মায়ের মুখ থেকে একদম অতর্কিতে ওই ‘শীর্ষ আসবে’ নামটা শোনামাত্রই মেঘ যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, ঠিক সেখানেই যেন পাথর হয়ে জমে গেল! ওর বুকের ভেতরটা আচমকা এক তীব্র ঢেউ খেলে উঠল, রক্তের প্রতিটি কণিকায় যেন এক অজানা কামড়ে অলৌকিক তরঙ্গ সৃষ্টি হলো। হাত-পা কেমন যেন মৃদু কাঁপতে লাগল ওর। নিজেকে কোনোমতে স্বাভাবিক করে ও আমতা আমতা করে শুধাল,
“উ—উনি কেন আসবেন হঠাৎ?”
আলেয়া বানু এবার পোলাওয়ের হাঁড়ির ঢাকনাটা তুলে ওপর থেকে মুঠো মুঠো পেঁয়াজ বেরেস্তা ছিটিয়ে দিতে দিতে চরম হুটোপুটি করে বিরক্ত গলায় বললেন,
“ও কেন আসবে, তা জেনে তোর অত খাঁইখাঁই কামড়াকামড়ি করার কী দরকার হ্যাঁ? বেশি কথা না বাড়িয়ে নিজের এই জবুথবু রূপটা বদলে তাড়াতাড়ি ঘরে গিয়ে রেডি হতে যা তো দেখি! কাজের সময় এসে খালি খালি মেয়েটা কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করে জ্বালাতন করে। ফাজিল মাইয়া একটা!”
মায়ের এমন তীব্র বকুনি আর মুখের ওপর ফাজিল মাইয়া ডাক শুনেও মেঘের মনের কোণে আজ একটুও রাগ বা দুঃখের উদয় হলো না; বরং ওর ঠোঁটের কোণে উপচে পড়া এক চিলতে লাজুক হাসির রেখা আরও গাঢ় হলো। মায়ের অলক্ষ্যে নিজের ছোট্ট লালচে জিবটা একটুখানি বের করে আলতো করে একখানা ভেঙচি কেটে ও চটজলদি পা বাড়াল নিজের রুমের দিকে।
গোসল সেরে ঘরের ভেজা মেঝেতে পা রাখতেই মেঘের হাঁটু সমান দীঘল চুল থেকে বৃষ্টির মতো টুপটুপ করে পানি ঝরে পড়তে লাগল। মেঘ চটজলদি মাথার সেই ভেজা চুলের পানিটুকু তোয়ালের সাহায্যে আলতো করে ঝাড়িয়ে নিয়ে প্রায় ছুটে চলে যায় নিজের প্রিয় ওয়ারড্রবটার কাছে। সেখানে হাতড়ে হাতড়ে কাপড় ওলটপালট করে শেষমেশ বেছে বেছে বের করে আনে একখানা ডার্ক মেরুন রঙের সিল্কের শাড়ি। গতবার ওর একমাত্র বড় ভাই নোমান এটা ওকে ওর জন্মদিনে পরম আদরে গিফট করেছিল, এতকাল বড্ড যত্নে তুলে রাখা ছিল এই শাড়িটা।
মেঘ অতি যত্ন আর সূক্ষ্ম নিখুঁত টানে নিজের পাতলা গড়নের দেহে শাড়িটা জড়িয়ে নেয়। সতেরো বছর পেরিয়ে সদ্য আঠারোয় পা রাখা কুমারী যেমন প্রথম প্রথম একা শাড়ি পরার অদ্ভুত এক রোমাঞ্চ অনুভব করে, মেঘও ঠিক তেমন আবেশে ধীরলয়ে শাড়ি পড়ে সাজতে বসে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ও গলায় জড়িয়ে নেয় একখানা পার্ল আর স্টোনের সিকুয়েন্সের অত্যন্ত সিম্পল, মায়াবী নেকলেস; কানে পরে সেই নেকলেসের সাথে মিলিয়ে মানানসই সুন্দর ইয়ারিং। দুই হাতের চিকন আঙুলে গলিয়ে নেয় রুপোলী ফিঙ্গার রিং, আর বাম হাতে জড়িয়ে নেয় একটা সিলভার চেইন সিস্টেমের চমৎকার ব্রেসলেট যার ঠিক মাঝখানে চমৎকার বাটারফ্লাইয়ের এন্টিক কাজ করা।
নিজের সেই বাঁধনহারা, দীঘল কুন্তলরাশিকে পিঠের ওপর আলগা ছড়িয়ে দিয়ে কপালের একদম মাঝবরাবর বসিয়ে দেয় একটা মেটে খয়েরি অর্ধচন্দ্রের কালারশেডের টিপ। সবশেষে আলতো করে ঠোঁটের ওপরে গাঢ় লিপস্টিকের ছোঁয়া দিয়ে সাজ কমপ্লিট করে এ রূপবতী রমণী। আজ যেন ওর রূপ থেকে আষাঢ়ের স্নিগ্ধ বৃষ্টি ঝরে পড়ছে। কাজলটানা চোখের চাহনি আর খয়েরি সিল্কের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা এই মায়াবী রূপ দেখে আজ কার সাধ্যি যে বলবে ওর মাত্র দশ দিন পূর্বেই জীবনের আঠারোতম বসন্ত পূর্ণ হয়েছে?
সাজগোজ শেষ হতেই মেঘের ভেতরের অস্থিরতা আর বুকের ধুকপুকানি যেন আরও শতগুণ বেড়ে গেল। ও নিজের রুমের এদিক থেকে ওদিক অবিরত পায়চারি করতে শুরু করে। শাড়ির কুঁচিগুলো এক হাতে ধরে ও কৌতুকী মনে আয়নায় নিজেকে বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে থাকে।
“আমায় কি সত্যিই আজ ভালো লাগছে? ওনার–ওনার কি আমাকে একটুও পছন্দ হবে?”
এক অজানা সংশয়ে মেঘ নিজের বড় বড় নখগুলো দাঁতের সাহায্যে কামড়াতে কামড়াতে চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলে। পরক্ষণেই লজ্জায় লাল হয়ে মাথা নিচু করে একা একাই মিটিমিটি হেসে বিড়বিড় করে বলতে থাকে,
“আমি কি– আমি কি সত্যিই ওই তপ্ত পাথর মানবটার প্রেমে পড়ে গেছি? উনি স্রেফ আমাদের এই বাড়িতে আসার কথা শুনেই আমার পেটের ভেতর কেন জানি হাজারটা রঙিন প্রজাপতি ডানা ঝাপটে উড়ে বেড়াচ্ছে! ধুর, কেন জানি আমার ধেই ধেই করে নাচতে ইচ্ছে করছে আজ!”
নিজের এই আনকোরা লাজুক ও অবাধ্য মনটাকে লুকাতে মেঘ ধীরপায়ে চলে যায় ঘরের এক কোণে থাকা বড় জানালাটার পাশে। একতলা এই সুন্দর বাড়িটার এই জানালাটা একদম সদর ফটকের মুখোমুখি। মেঘ জানালার গ্রিলটা দুই হাতে শক্ত করে ধরে, আনমনা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে গেটের বাইরের পিচঢালা সড়কটার পানে চেয়ে।
কালো রঙের গাড়িটা ধুলো উড়িয়ে রাস্তার এক পাশে জুতসই করে পার্কিং করে মাত্রই নামল মেজর শীর্ষ কারদার। পরনে নেভি ব্লু ক্যাজুয়াল শার্ট আর অফ-হোয়াইট প্যান্ট । কপালে এসে পড়েছে দুই-একটা অবাধ্য ভেজা চুল। হাতের ঘড়িটা ঠিক করতে করতে ও যখন ওদের কাঠের তৈরি সদর ফটক দিয়ে ধীরপায়ে ভেজা মাটির ওপর দিয়ে বাড়ির অভিমুখে পা বাড়াল, ঠিক তখনই ওনার অলস, আনমনা চোখ দুটো হঠাৎ করেই চলে গেল সেই একতলার পরিচিত জানালাটার দিকে।আর ঠিক ওখানেই থমকে গেল জাঁদরেল মেজরের পায়ের গতি! এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে গেল ওনার চারপাশের চলমান দুনিয়াটা!
জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকা ওই অপরূপা কন্যাকে দেখে শীর্ষর চোখের মণি জোড়া যেন আর নড়তেই চাইল না। এ কী দেখছে ও! খয়েরি রঙের কাঁচা সিল্কের শাড়ির ভাজে ভাজে লেপ্টে থাকা শরীর, পিঠময় ছড়িয়ে থাকা কুচকুচে কালো দীঘল কুন্তলরাশি আর কপালে ওই আধখানা চাঁদের ছোঁয়া!
“কী সেজেছে এ মেয়ে আজ? আমায় আজ বাগেরহাটের মাটিতে জ্যান্ত কবর দেওয়ার পুরো প্ল্যান ফেঁদে বসেছে নাকি ও?”
চরম এক বুক কাঁপানো অনুভূতিতে শীর্ষ নিজের বাম পাশের বুকের ওপর ডান হাত দিয়ে শক্ত করে খামচে ধরল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন হুহু করে জ্বলে উঠছে ওর। এই তপ্ত পাথুরে বুকেও যে এত তীব্র সুনামি উঠতে পারে, তা ও নিজেই আজ প্রথম বুঝতে পারছে।
এদিকে মেঘের ধ্যান তো অন্য কোথাও ছিল, তাই ও তখনও নিজের কাঙ্ক্ষিত মেজর সাহেবকে উঠোনে ঢুকতে দেখেনি। ঠিক তখনই ওপাশ থেকে আলেয়া বানু রান্নাঘর থেকে তীব্র গলায় হাঁক ছাড়তেই মেঘ সচকিত হয়ে জানালার গ্রিল ছেড়ে এক ঝটকায় দৌড় লাগাল ভেতরের দিকে।
শীর্ষের তৃষ্ণার্ত চোখ দুটো যেন মেঘের ওমন হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়াটা সহ্য করতে পারল না। ও মেঘের যাওয়ার পথের দিকে আনমনা আর পুরো হা-ভাতেদের মতো চেয়ে চেয়েই পা বাড়িয়ে সামনের দিকে হাঁটতে লাগল। আর তাতেই ঘটল মোক্ষম বিপত্তি! বর্ষার টানা বৃষ্টিতে উঠোনের সবুজ ঘাসগুলো তখন পুরো পিচ্ছিল হয়ে ছিল। সেই ভেজা শ্যাওলাযুক্ত ঘাসের ওপর পা পড়তেই এক্কেবারে মারাত্মকভাবে পিছলা খেল দেশের বীর সেনা, মেজর শীর্ষ কারদার!
“ওরে বাবা রেএএএ!”
নিজের সমস্ত আর্মি গাম্ভীর্য এক লহমায় বিসর্জন দিয়ে কড়া এক মৃদু চিৎকার করে উঠল শীর্ষ। হাত-পা ছুড়ে কোনোমতে নিজের দেহের ভারসাম্য সামলে ধড়ফড় করে এক প্রকার যুদ্ধ করেই যেন ও সোজা হয়ে দাঁড়াল। এতক্ষণে ওর মাথায় চেপে বসা রোমান্টিকতার সেই রঙিন ঘোরটা ভাঙল। এই আঠারো বছরের মেয়েটা তো ওকে আক্ষরিক অর্থেই পুরো পাগল বানিয়ে ছেড়েছে!
বুকের ভেতরের ধুকপুকানি সামলে নিয়ে এবার বড্ড সাবধানী হয়ে আরেকটা পা বাড়াতে গেল ও। কিন্তু হায়! ‘ভাগ্যের লিখন, না যায় খণ্ডন!’ পা বাড়াতেই এবার একদম ধরাম করে দ্বিতীয় বারের মতো পিছল খেয়ে আছাড় খেল ও!
পতনের তীব্রতায় শীর্ষর বাম হাতে থাকা সুন্দর করে মোড়ানো সতেজ অর্কিড আর হোয়াইট-পিংক কালারের মিক্সড ফ্লাওয়ার বুকেটি ছিটকে ধুলো-কাদামাখা ঘাসের ওপর আছড়ে পড়ল। তবে বাহবা দিতে হয় ওনার দীর্ঘদিনের সামরিক ট্রেনিংকে! দ্বিতীয় আছাড় খাওয়ার চক্করেও ও নিজের কাঁধে ঝুলতে থাকা সাইড ব্যাগ আর ডান হাতে থাকা সুস্বাদু মিষ্টি ও মালাইদার রসমালাইয়ের প্যাকেটগুলো মাটিতে পড়তে পড়তে কোনোমতে অসম্ভব কায়দায় বাঁচিয়ে নিল। মিষ্টির গায়ে এক ফোঁটা কাদা লাগতে দেয়নি ও!
“আহহহহ! উফফফ–”
কোমরের আর পায়ের তীব্র ব্যথায় ভেতরে ভেতরে কঁকিয়ে উঠল জাঁদরেল মেজর। শরীরের কোনো হাড় ভাঙেনি তো? শীর্ষ নিজের বা পা টা সামান্য টেনে টেনে ল্যাংড়াতে ল্যাংড়াতে দরজার গোড়ার শুকনো মেঝেটার দিকে এগিয়ে গেল। ভাগ্যিস, পিচ্ছিল ঘাসের ওপর আছাড় খেলেও ওর শার্ট বা প্যান্টে কাদা লাগেনি, জিপসের সুবাদে পোশাকটা পুরোপুরি বেঁচে গেছে। কিন্তু কোমর আর পায়ে যে বেশ ভালো রকমের চোরা ব্যথা পেয়েছে ও, তা ওনার কুঁচকে যাওয়া মুখ দেখেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
দরজায় দাঁড়িয়ে অত্যন্ত চোরের মতো সতর্ক নজরে ও প্রথমে নিজের আশেপাশে আর রান্নাঘরের জানালার দিকে তাকাল কেউ এই মেজরের স্লাইডিং শো তথা চরম লজ্জাজনক ডাবল আছাড় খাওয়াটা দেখে ফেলেনি তো? যাক বাবা! আল্লাহর অশেষ রহমতে এবারও ওনার মান-সম্মানটুকু বেঁচে গেছে, আশেপাশে কেউ ছিল না!
শীর্ষ নিজের ডান হাত দিয়ে কোমরের এক পাশটা চেপে ধরে চাপা ও অত্যন্ত করুণ গলায় বিড়বিড় করে উঠল—
“শেষ! আজ আমি এক্কেবারে শেষ! বাগেরহাটের এই সর্বনাশী মেয়েটা তো আমায় কোনো অস্ত্র ছাড়াই জ্যান্ত মেরে ফেলল গো! উফফফ, আমার কোমরটা রে–!”
দরজায় মৃদু টোকা দিতেই কড়া খোলার ক্যাঁচক্যাচ শব্দ হলো, আর চোখের নিমেষেই ওপারে ভেসে উঠল সেই কাঙ্ক্ষিত মায়াবী মুখখানা। শাড়ির খয়েরি আঁচলে আবৃত মেঘালয়াকে এই মাত্র দুই হাত দূর থেকে সামনাসামনি দেখে শীর্ষর বুকের ভেতরের হৃদযন্ত্রটা যেন কোনো সুস্থ মানুষের মতো স্পন্দন করা ভুলে গেল। ওর বুকের ধুকপুকানি তখন মিনিটে ঠিক কত বিট পার করছে।এতই তীব্র আর ফাস্ট হয়ে উঠেছে ওটা!সে কোমরের ব্যথা ভুলে অবচেতন মনে নিজের সেই অধিকার খাটানো ভারাক্রান্ত গলায় ফিসফিসিয়ে ডাকল,
“ব–উ!”
নিজের বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে একেবারে সামনাসামনি ওমন বুক কাঁপানো ‘বউ’ ডাক শোনামাত্রই মেঘের দুই কানের লতি মুহূর্তেই লজ্জায় ও আতঙ্কে গরম হয়ে লাল হয়ে গেল। ও চোখ দুটো বড় বড় করে চোর চোর নজরে একবার পেছনে তাকিয়ে অত্যন্ত সাবধানী ও ফিসফিসানি কণ্ঠে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
“একদম চুপ! আপনি কি এই ভরা দুপুরে আমারে মায়ের হাতের ঝাঁটাপেটা খাওয়াতে চান নাকি? খবরদার! আর একবার যদি ওই বউ শব্দ মুখ থেকে বের করেছেন, তবে বঁটি দিয়ে ঠোঁট কাইট্টা ফালামু এক্কেবারে, হুহ!”
নিজের ছোট্ট মুখখানা বড্ড চনমনে ও বোতা করে রাগে গজগজ করতে করতে মেঘ ভেতরে যাওয়ার জন্য রাস্তা ছেড়ে দিল।
ঠিক তখনই রান্নাঘরের পর্দা সরিয়ে গামছা দিয়ে হাত মুছতে মুছতে ব্যস্ত পায়ে ড্রয়িংরুমে পা রাখলেন আলেয়া বানু। শীর্ষকে দেখেই ওনার মুখখানা খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল,
“আসো বাবা আসো, ভেতরে এসো! পথঘাটে বানের পানিতে আসতে কোনো সমস্যা হয়নি তো বাবা তোমার? আহা, এই ফাজিল মাইয়া তুই দরজায় ওভাবে কাঠপুতুলের মতো দাঁড়াই আছোস কেন হ্যাঁ? যা, জলদি ভেতরে যা, শীর্ষ বাবার জন্য ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা শরবত নিয়ে আয়!”
মেঘকে কড়া চোখে এক দফা রাঙিয়ে দিয়ে আলেয়া বানু এবার পরম স্নেহে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন লম্বা চওড়া মেজরকে নিয়ে। শীর্ষ মিষ্টি আর রসমালাইয়ের প্যাকেটগুলো টেবিলের এক কোণে সাবধানে রাখল। মুখের সেই লাজুক চপলতা এক লহমায় লুকিয়ে ও অত্যন্ত ভদ্র ও অমায়িক গলায় শুধাল,
“ভালো আছেন, আন্টি? আঙ্কেল আর অভ্র ওরা সবাই কোথায়? কাউকে দেখছি না যে?”
“আমরা সবাই ভালো আছি বাবা। তোমার আঙ্কেল তো একটা জরুরি শিক্ষক প্রশিক্ষণের কাজে গত পরশুই বাইরে গেছেন। আর অভ্র ও তো এখনও রাজশাহীতেই আছে, পড়াশোনার কাজে ওখানেই আটকে। তুমি বোসো বাবা, সোফায় এসে বোসো।”
শীর্ষ নিজের সাইড ব্যাগটা একপাশে রেখে কোমরের চোরা ব্যথাটা কোনোমতে আড়াল করল। তারপর বলল,
“আন্টি, ওয়াশরুমটা ঠিক কোন দিকে? দীর্ঘ জার্নি তো, আমি একটু ফ্রেশ হয়ে আসতাম।”
“মেঘ! এই মেঘ! কোথায় গেলি তুই? জলদি এদিকে আয় তো!”
রান্নাঘরের অভিমুখে মুখ করে বেশ জোরেই ডাক পাড়লেন আলেয়া বানু।মায়ের ডাক শুনে হাতের ট্রেতে শরবতের গ্লাস নিয়ে দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বের হয়ে ওনাদের সামনে এসে দাঁড়াল মেঘ। শাড়ির কুঁচি সামলাতে সামলাতে ও উৎসুক চোখে ওনার দিকে তাকাল।
“শীর্ষ বাবাকে তোর ঘরের লাগোয়া ওয়াশরুমটায় নিয়ে যা তো মা। ও একটু হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হবে।”
মেঘ মায়ের কথা শুনে বাধ্য মেয়ের মতো আলতো করে মাথা নাড়াল। তবে আড়চোখে একবার শীর্ষর সেই তপ্ত স্টিল গ্রে চোখের দিকে তাকিয়ে গলার স্বর খাঁটি ঠান্ডা করে বলল,
“আসুন আমার সাথে।”
করিডোরের নির্জনতায় পা ফেলতেই শীর্ষ ঘাড় ঘুরিয়ে একদম মেঘের কানের কাছে মুখটা নিয়ে এল। ওর তপ্ত নিশ্বাসের ছোঁয়ায় মেঘের সারা শরীর যেন বিদ্যুতের মতো কেঁপে উঠল। শীর্ষ চোখের ইশারায় শাড়িতে মোড়ানো মেঘকে জরিপ করে ফিসফিস করে বলল,
“ইউ লুকিং সো বিউটিফুল। লাইক আ কিলার গার্ল।”
শীর্ষর এই সরাসরি প্রশংসায় মেঘের চিত্ত লজ্জায় পুরো কুঁকড়ে গেল। ওর মুখ দিয়ে কথা সরছে না, কী বলবে ভেবে না পেয়ে সে যেন হাসফাস করে উঠল। নিজের আড়ষ্টতা ঢাকার জন্য মিনমিন করে বলল,
“চুপ বেলাজ পুরুষ! ওয়াশরুমে যান।”
বলেই একটা ধাক্কা দিয়ে শীর্ষকে ওয়াশরুমের দিকে ঠেলে দিল।
ওয়াশরুমে ঢোকার মুখেই আবার সেই পিচ্ছিল দশা! পা ফেলার জায়গা না পেয়ে শীর্ষ বেসিনটা খামচে ধরে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিল। পড়ার হাত থেকে তো বাঁচল, কিন্তু মেজরের ইজ্জত তখন বাঘে খাচ্ছে! সে তখন মনে মনে বিড়বিড় করে মহান আল্লাহর কাছে করুণ বিচার দিল,
“আল্লাহ হয় এই মাইয়ার রূপ কমাও, নয় আমার ধৈর্য্য বাড়াও। এমনে এই মাইয়ার শাড়ি পরনের রূপ দেইখা বার বার পিছলা খাইয়া পড়লে, আমার ইজ্জত পাগলা মসজিদে গড়াগড়ি খাইবো বাতাসার মতন। ওরে আল্লাহ! আমারে বাঁচায়ায়ায়ায়ায়ায়া! এহেহ এহ–!”
নিজের এই বেহাল দশা ও মনে মনে বিচার আউড়ানি বন্ধ করে সে গায়ের শার্টটা খুলে ফেলল। চোখেমুখে ঠান্ডা পানি ছিটিয়ে কিছুটা শান্ত হয়ে হাঁক দিল,
“মেঘালয়া?”
ওপাশ থেকে মেঘের আড়ষ্ট কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
“বলুন!”
শীর্ষ বলল,
“ব্যাগে দেখো শার্ট আর জিন্স রয়েছে। একটু দাও তো।”
মেঘ ইতস্তত করে বলল,
“আমি?”
শীর্ষ বিরক্তির স্বরে বলল,
“উফফ! দাও।”
মেঘ আড়ষ্ট হয়ে কাঁপাকাঁপা হাতে শীর্ষর কাঁধব্যাগটা খুলল। ভেতর থেকে কালো রঙের একটা শার্ট আর প্যান্ট বের করে দরজার ফাঁক দিয়ে দ্রুত হাতে এগিয়ে দিল। তারপর নিজে যেন আগুনের ওপর পা দিয়েছে, এমনভাবে মুহূর্তের মধ্যে সেখান থেকে শটকে পড়ল!
শীর্ষর পরনের সেই নেভি ব্লু শার্ট আর অফ-হোয়াইট শার্ট বদলে হুট করে কালো শার্ট আর জিন্স পরে বের হতে দেখেই আলেয়া বানুর চোখ কপালে উঠল। তিনি বেশ অবাক হয়ে শুধালেন,
“একি বাবা! কাপড় চেঞ্জ করলে যে?”
শীর্ষ একটু অপ্রস্তুত হাসল। বাথরুমের ভেতরের পিছলে পড়ার ধকল সামলে নিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
“আসলে দীর্ঘ জার্নি করে বাহির থেকে এসেছি তো আন্টি, তাই শরীরটা কেমন যেন আঠালো লাগছিল। ফ্রেশ হয়ে ভাবলাম এগুলোই পরে নিই।”
আলেয়া বানু আর কথা না ঘেঁটে স্নেহের সুরে বললেন,
“আচ্ছা আচ্ছা, বেশ করেছ। এবার জলদি এসো দেখি, টেবিলে সব খাবার সাজানো। ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে সব।”
রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা সুবাসে চারপাশটা ম ম করছে। শীর্ষ কিছুটা লজ্জিত মুখে বলল,
“কিন্তু এসব এত আয়োজন কেন করেছেন আন্টি? না করলেও তো হতো।”
“কী যে বলো বাবা! তুমি আমার বাড়িতে প্রথম এলে আর আমরা একটু আপ্যায়ন করব না? তা কখনও হয় নাকি? এসো, এসো।”
এই বলে আলেয়া বানু একপ্রকার জোর করেই শীর্ষর হাত টেনে নিয়ে গেলেন ডাইনিং টেবিলের দিকে। দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে মায়ের এই শীর্ষকে নিয়ে বাড়াবাড়ি দেখে মেঘ মুখটা বাঁকিয়ে এক বিশ্রী ভেঙচি কাটল। মনে মনে গজগজ করে উঠল ও
“হুহ! আপন পেটের মাইয়ার পাতে ঠিকমতো ভাত দেয় না, আর পরের ঘরের পোলারে দেখলেই দরদ এক্কেবারে উথলাইয়া পড়ে! খাচ্চর মা একটা, হুহ!”
ডাইনিং টেবিলের ওপর সাজানো খাবারের বহর দেখে এবার খোদ মেজরের পেটের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল। টেবিলের ওপর বীরদর্পে শোভা পাচ্ছে খাঁটি সরিষার তেলে কড়া করে ভাজা ইলিশ মাছ, ভাপা চিংড়ি, কালো হয়ে যাওয়া গরুর মাংসের কালা ভুনা, সুগন্ধি ঘি-র সুবাস ছড়ানো চিকেন রোস্ট, শামী কাবাব, বাসমতি চালের ঝরঝরে পোলাও, ঘন ডাল আর ডিম ভুনা। আর ঠিক মাঝখানে কাঁচের বাটিতে সাজানো প্রায় পাঁচ-ছয় পদের হরেক রঙের ভর্তা!
“এসব কী আন্টি? এত খাবার!”
শীর্ষ প্রায় চোখ কপালে তুলে ফেলল।আলেয়া বানু হাসিমুখে বেশ গর্বের সাথে বললেন,
“আর বলো না বাবা, সামান্য একটু দুপুরের খাবারের আয়োজন আর কী! বেশি তো কিছু করতে পারলাম না।”
শীর্ষ বারবার চমকে চমকে উঠছে। ও আর্মি ডায়েট মেনে চলা মানুষ, এত তেল-ঝাল-মশলার রাজকীয় খাবার একসাথে দেখে ও রীতিমতো ঘামতে শুরু করেছে। বিশেষ করে ওই লাল-সবুজ বাটিগুলোর দিকে ইশারা করে ও জিজ্ঞাসা করল,
“ওগুলো ঠিক কিসের কিসের ভর্তা, আন্টি?”
“ওগুলো? ওগুলো হলো লাউ পাতার ভর্তা, চিনাবাদাম ভর্তা, সাদা তিলের ভর্তা, আমাদের এই অঞ্চলের বিখ্যাত পুঁটি চ্যাপা শুঁটকি ভর্তা, কাঁঠালের বিচির ভর্তা আর ঝাল ঝাল ডাল ভর্তা। দাঁড়িয়ে আছ কেন বাবা? তাড়াতাড়ি চেয়ার টেনে খেতে বসো দেখি!”
শীর্ষ নিরুপায় হয়ে কাঠের চেয়ারটা টেনে ধীরপায়ে বসল। ডিশগুলোর দিকে ও এমন আড়ষ্ট চোখে তাকিয়ে রইল যেন ও কোনো ডাইনিং টেবিলে নয়, বরং মস্ত বড় কোনো যুদ্ধক্ষেত্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে!
ওদিকে দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে শীর্ষর এই অসহায় আর ভয়ার্ত মুখের এক্সপ্রেশন দেখে মেঘ নিজের এক হাত পেটে চেপে ধরে মিটিমিটি হাসতে লাগল। শীর্ষর এই বোবা কান্না ও খুব ভালো করেই টের পাচ্ছে।মেজর সাহেব টেবিলের দিকে চেয়ে মনে মনে দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে আকুল আর্জি জানালেন,
মেজর কারদার পর্ব ২১
“হে আল্লাহ! আজই কি আমার ওপর এত বড় ফাঁড়া লিখলা তুমি? বাপের জন্মেও তো আমি এত পদের খাবার একসাথে খায়নি! এখন আমায় না চিনে, স্রেফ আত্মীয়র ছেলে ভেবে ওনারা যেভাবে জান কবজ করা আদর শুরু করছেন, না জানি আসল সত্যটা জানলে আমারে জোর করে খাওয়াইতে খাওয়াইতে ডাইনিং টেবিলেই মাইরাই ফেলাইবেন! কানে ধরতেছি খোদা, জীবনে আর কোনোদিন এই শ্বশুরবাড়িমুখী হব না আমি! এক দিনেই আমার জামাই আদরের স্বাদ মিইট্টা গেছে এক্কেবারে!”
