মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ১০
ফারহানা নিঝুম
আমরা যা কল্পনা করিনা মাঝে মধ্যে বাস্তবে তাই ঘটে। চক্ষু সম্মুখে বাস্তবতা ঘুরে বেড়ায় অথচ তা দেখতে আমরা ব্যর্থ। যখন বাস্তবতা দেখতে পাই তখন হৃদয় হারিয়ে যায় অজানা ঘোরে!
কল্পনা আর বাস্তবতায় ঝুলতে থাকা ঝুমঝুম চমকে তারা বাদশাহর অতর্কিতে টেনে ধরা কব্জিতে হাতের স্পর্শে। ভয়ার্ত চোখে তাকায় মা জননীর মুখ পানে।
কপাল সঙ্কুচিত করে তাকিয়ে আছেন তিনি। চোখ দুটো থেকে যেন ঝরে পড়ছে আগুন। এ যেন অগ্নি’গিরির অ’গ্নুৎপাত! অন্তর্লোক ভয়ে তটস্থ!
চিবুক নুইয়ে এলো কন্যার। আচম্বিতে শ্রবণেন্দ্রিয়তে ধেয়ে এলো কর্কশ কন্ঠস্বর,
“এসবের মানে কি? তুই কি চাইছিস মাশা?”
এহেন প্রশ্নবানে আতংকিত হয়ে উঠে হৃদয়! নিজেকে আরো গুটিয়ে নেয় তরণী। কম্পিত ওষ্ঠো পল্লব বহু কষ্টেসৃষ্টে বলে ওঠে,
“কে..কেন মা? আমি কি করলাম?”
তারা বাদশাহ রুষ্ট হলেন, তীব্র ক্ষোভ দেখিয়ে তর্জনী তুলে শাসিয়ে বললেন,
“এরকম সেজে নিজেকে কি প্রমাণ করতে চাইছ? তোমাকে এই বাড়ির কেউ ভালোবাসে না?কেউ ঠিকঠাক ভাবে অনুষ্ঠানে কি পড়তে হয় তা শেখায়না? এগুলোই বুঝাতে চাইছো?”
মস্তকে বাজ পড়ল ঝুমঝুমের। কস্মিনকালেও যা কল্পনা করেনি তাই বলে চলেছেন তারা বাদশাহ! এটা ওনার নিতান্তই মনের ভুল বৈ আর কিচ্ছুটি নয়। বিচলিত দেখালো ঝুমঝুমকে। সামান্য সাহস সঞ্চয় করে বলল,
“তুমি ভুল ভাবছো মা! আমি ওরকম কিছু ভেবে…
“চুপ করো।”
রামধমকে কম্পিত হলো তরণীর সর্বাঙ্গ! আড়ষ্ট হলো লজ্জায়! চিবুক ফের নুইয়ে এলো বুকের কাছে। চোখে জমেছে আর্দ্রতা! নিজেকে সংযত করল কন্যা। মাশা তো কাঁদে না, সর্বদা হাসে।সেও হাসবে।তার জন্য কান্না বারণ আছে!
“তোমার এসব ন্যাকামি অন্যরা সহ্য করলেও আমি একদম বরদাস্ত করব না,মাশা। কথাটা মাথায় রেখো।”
হনহন পদক্ষেপে স্থান ত্যাগ করলেন তারা বাদশাহ। দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস বক্ষ গহবর চিরে বেরিয়ে এলো ঝুমঝুমের। হৃদয় বিদীর্ণ কথাগুলো তাকে আর ছুঁতে পারল না। সে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল মুর্তির ন্যায়। অকস্মাৎ অনুভূত হলো কেউ তাকে গভীরে নয়নে পরোখ করে চলেছে। দৃষ্টি ফেরাতেই অবয়ব লুকিয়ে পড়ল। ঝুমঝুম বিচলিত হয় বটে। এ কেমন অদ্ভুত দহন?
চপস্টিক নামক দুর্বোধ্য জিনিস দিয়ে আজ পর্যন্ত কখনো খাবার খায়নি জুঁই। ফলস্বরূপ আজ তাকে নিদারুণ বিড়ম্বনার সম্মুখীন হতে হয়েছে । রিমঝিম নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে তার করতলে একটি প্লেট ও যুগল চপস্টিক গুঁজে দিয়ে প্রস্থান করেছে বটে , অথচ একবারের জন্যও অনুসন্ধিৎসু হয়নি জুঁই আদৌও এই লাঠিদ্বয় পরিচালনায় সক্ষম কি-না! লাঠি? না বরং ক্ষুদ্রাকৃতির দন্ড বললেই অধিক যথার্থ হ্যাঁ। দীর্ঘ সরু অনভ্যস্ত দুইখানি দন্ড।
নববধূটি ক্রমাগত দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করছিল। ক্ষুধার তীব্রতায় উদর যেন বিদ্রোহে ফেটে পড়ছে, অথচ চারপাশে উপস্থিত সকলে যখন নিপুণ ভঙ্গিতে চপস্টিক পরিচালনা করে খাচ্ছে সকলে, সেখানে সে কি করে হাতে খাবার খাবে?
অতিথিমণ্ডলীর সঙ্গেই তাকে খাবার খেতে বসানো হয়েছে। এদিকে জেসমিন বাদশাহ ও রাজিব বাদশাহ আমন্ত্রিত ব্যবসায়িক অংশীদারদের সঙ্গে নানাবিধ বাণিজ্যিক আলোচনায় নিমগ্ন।
জুঁই করুণ, সহায়তাহীন দৃষ্টিতে জেসমিন বাদশাহর দিকে তাকাল। ক্ষণিকের জন্য প্রবল ইচ্ছা জাগ্রত হলো তাকে ডেকে নিজের অসুবিধার কথাটি ব্যক্ত করবে। কিন্তু পরমুহূর্তেই সংকোচ তার চেতনাকে আচ্ছন্ন করল। এভাবে সকলের সম্মুখে নিজের অদক্ষতা স্বীকার করা নিঃসন্দেহে দৃষ্টিকটু প্রতীয়মান হবে। অতঃপর নতনয়না কন্যাটি নীরবে প্লেটখানি নিজের নিকট হতে খানিক দূরে সরিয়ে রাখল।
মুখাবয়বে বিষণ্নতার গাঢ় আবরণ নেমে এলো। থাক, না হয় আগামীকালই খাবার খাবে সে।
হঠাৎই জুঁই অনুভব করল কেউ একজন তার সম্মুখস্থিত প্লেটটি নিজের দিকে টেনে নিয়েছে। বিস্মিত দৃষ্টিতে পাশ ফিরতেই তার নয়ন স্থির হলো সদ্যপ্রাপ্ত স্বামীর মুখাবয়বে।
পুরুষটি অনায়াস ভঙ্গিতে চপস্টিক পাশে রেখে দিয়ে,হাতে করে খাবার তুলে নিল। অতঃপর সেই গ্রাস জুঁইয়ের মুখের সম্মুখে এগিয়ে দিয়ে মৃদু কণ্ঠে উচ্চারণ করল,
“বোকা জুঁইফুল, সামান্য এক বিড়ম্বনায় খাবারই খাবে না বলে বসে আছো?”
লজ্জাবনত হলো জুঁই পুনরায়। তার অধরকোণে নিঃশব্দ কম্পন, আর হৃদস্পন্দনে অকারণ এক স্নিগ্ধ অস্থিরতা।
তবুও কন্যা ভাঙতে নারাজ। নিজেকে সামলে নিয়ে কাঠখোট্টা কন্ঠে বলল,
“খিদে নেই আমার।””
আব্রাহাম থমকালো ক্ষণিকের জন্য। নিম্নাষ্ট চেপে অসহায় চোখে চেয়ে রইল লাজুক রমণীর পেলব কপোলদ্বয়ের দিকে। প্লেটটা রেখে কপাল ছুঁয়ে দিলো। ঠান্ডা হাতের স্পর্শে কপাল যেন শিরশির করে উঠলো কন্যার।
“জুঁই, তুমি খাবে নাকি এইখানে চুমু খাবো?”
চকিতে ফিরে তাকালো জুঁই। চক্ষু জোড়া বিস্ময়ে অক্ষিকৌটা ছেড়ে বেরিয়ে আসবে বুঝি? ধকধক করে উঠল বক্ষ গহ্বর।
“কী?”
আব্রাহাম প্লেট তুলতে তুলতে বলল,
“জ্বি। এখুনি হা করো নয়তো সকলের সামনে চুমু দেব,পরে দোষ দিও না।”
ক্রোধে বেলুনের ন্যায় ফুঁসে উঠল জুঁই।তবে সেই বেলুন ধোপে টেকেনি, ফোঁস করে ফেটে গেছে। জুঁইয়ের গাল চেপে হা করতে বাধ্য করল আব্রাহাম। জোরপূর্বক মুখে গুঁজে দিলো।
“তোমার শক্তি প্রয়োজন জুঁই।”
গ্রাস টুকু চিবোতে চিবোতে জুঁই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,
“কেন?”
“আমাকে সামলানোর জন্য।”
থমকে গেল জুঁই। বরফ খন্ডের ন্যায় জমে গেল হৃদয়। স্পন্দন হলো বেগতিক। ওই ভয়ার্ত মুখখানি দেখে পেট ফাটা হাসি বেরিয়ে আসতে চাইল জুঁইয়ের।তবে তা হলো না।টুপ করে হাসিটুকু গিলে নিলো আব্রাহাম! এই লাজুক রমণীকে লজ্জায় ফেলতে দারুন লাগে তার।
খাবার প্লেট হাতে শয্যের সম্মুখে এসে দাঁড়ালো ঝুমঝুম। হাস্যছটা লেগেই আছে অধরপ্রান্তে। স্বভাব সুলভ উচ্ছ্বাসে বলে ওঠে,
“এটা আপনার জন্য আমি সাজিয়েছি।”
খাবার প্লেট বাড়িয়ে দিলো ঝুমঝুম। শয্য একবার খাবারের প্লেট দেখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরক্ষণেই ঝুমঝুমের উজ্জ্বল মুখপানে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল। কপটতা দেখিয়ে বলল,
“তোকে বলেছি আমি খাবো?”
ঝুমঝুম অবরোধ ন্যায় কৃষ্ণবর্ণের পল্লবদ্বয় ঝাপটিয়ে বলল,
“কেন খাবেন না? খাবার টা দারুন মজা হয়েছে!”
শয্য দুহাত ভাঁজ করল , তীক্ষ্ণ হলো দৃষ্টি। অনমনীয় স্বরে বলল,
“ফার্স্ট, ইউ ইট ওয়ান স্পুনফুল।”
কথার অর্থটি বুঝল না ঝুমঝুম, সংশয় প্রকাশ কন্ঠে শুধোয়,
“হুঁ?”
“আই সেড, ইউ ইট ওয়ান স্পুনফুল ফার্স্ট অ্যান্ড সি। কে বলতে পারে কিছু মিশিয়ে দিসনি?”
তীরের ফলার ন্যায় হৃদয়ে এসে বিদ্ধ করল বাক্যটুকু। আঁখিপুট ঝাপসা হয়ে এলো তরণীর। ম্লান মুখটায় তাকিয়ে আছে শয্য। ভ্রু নাচিয়ে ফের বলল খাওয়ার কথা। ঝুমঝুম ভেতরে ভেতরে র
ক্রোধে ক্রমশ জ্বলছে,তবে মুখে কিচ্ছুটি প্রকাশ করল না।
প্রথম এক চামচ মুখে দিলো কন্যা। মনে মনেই ধিক্কার জানিয়ে বলল,
“আপনি ভীষণ নির্বোধ শয্য ভাইয়া, নয়তো আমার এঁটো খাবার খেতে চাইবেন?”
মনে মনে কুটিল হাসলো ঝুমঝুম। শয্যের দুর্বোধ্য চাহনিতে আত্মা সুদ্ধু কম্পিত হয় কন্যার।
শুষ্ক খরখরে ওষ্ঠো জোড়া সামান্য ভিজিয়ে প্লেটটা ফের এগিয়ে দিতেই শয্য বাজখাঁই গলায় ধমকে ওঠে,
“আউট।”
হাত দুটি সহসা স্থির হলো কন্যার। রমণীর হৃদয় হয় ভারাক্রান্ত! শয্যের নির্লিপ্ততা বলেই দিচ্ছে সে খেতে ইচ্ছুক নয়ে। মনে মনে নিজেকে আচ্ছা করে শাসাচ্ছে ঝুমঝুম। কি দরকার ছিলো প্লেট সাজিয়ে আনার? নিজের দায়িত্বে এসেছি অপমান হজম করতে!
ক্রোধাগ্নিতে জ্বলতে থাকা ওই হ্যাজেল চক্ষুদ্বয়ের দিকে ভীতু নয়নে একপল দেখে অতঃপর প্লেটটা পাশের টেবিলের উপর রেখেই প্রস্থান করল ঝুমঝুম।
ঝুমঝুম যাওয়ার মাত্রই কাল বিলম্ব না করে প্লেটটা তুলে নিল শয্য। ঝুমঝুমের ঠোঁট স্পর্শ করা ওই চামচটা দিয়েই এক চামচ খাবার তুলল মুখে।
ভেতরের পরম এক শান্তি অনুভব করছে বেপরোয়া পুরুষটি। আবেশে আঁখি বুঁজে আসে আপনাআপনি। পরপর দুই চামচ খেয়ে মোহাচ্ছন্ন কন্ঠে বিড়বিড়াল,
“তুই আমার উন্মাদনার কারণ হচ্ছিস, ঝুম। ট্রাস্ট মি যখন পুরোপুরি আমার হবি তখন এই চামচ নয়। আমি তোর তুলতুলে নরম ঠোঁট দুটো ছুঁয়ে দেব।”
খাবারের পর্ব শেষ হওয়া মাত্রই নিজ বরাদ্দকৃত কক্ষে কন্যা ছুটে গেল বিদ্যুৎ বেগে।
রিমঝিমের মন আকাশে ততক্ষণ ঘণীভূত হয়েছে বিষন্নতার কৃষ্ণমেঘ । হৃদয় কাঁদতে তার নীরবে, এই বুঝি সোনালী আঁখিপল্লব ভেদ করে অশ্রুবর্ষণ নেমে আসবে অবিরাম।
আজ সে মেহরিমা এবং রাকিবকে ভীষণ মিস করছে। বাদশাহ পরিবারের ঐশ্বর্যমন্ডিত এতবড় পার্টিতে সেই দুটি মানুষ নেই।
মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ৯
নিজের অন্তর্নীলের ব্যথাটুকু গলাধঃকরণ করল রিমঝিম। তার সাহস নেই রাজিব বাদশাহকে গিয়ে তাদের কথা বলবার,তাই তো যখন ঝুমঝুম চেয়েছিল সেই কথাটা বলতে তখুনি রিমঝিম নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। অথচ আড়ালে সে কেঁদে চলেছে!
হঠাৎ বুকচেরা এক ফুঁপিয়ে ওঠা স্বর নিস্তব্ধতাকে বিদীর্ণ করে উচ্চারিত করল,
“ভালোবাসা কি পাপ?”
