মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ৭
ফারহানা নিঝুম
কলিং বেলের কর্কশ ধ্বনি যেন নিদ্রাভঙ্গের নিষ্ঠুর দূত হয়ে আছড়ে পড়ল কানে। অস্থিমজ্জা ভেঙে যাওয়ার ক্লান্তি বুকে নিয়ে একে একে সবাই সোফায় সোজা হয়ে বসল। আধো-নিদ্রিত দৃষ্টি মুছতে মুছতে শয্য বিরক্ত চোখে চারপাশে তাকাল।
গতরাতের দেরি করে ফেরা, তার উপর নিশীথের নির্জনতায় গেমিংয়ের উন্মত্ততা সব মিলিয়ে শরীর মন দুটোই আজ অবসন্ন। আর এই মুহূর্তে দরজার বাইরে দাঁড়ানো ব্যক্তিটির প্রতি তার বিরক্তি যেন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে অন্তরে।
ধীর, অনীহ পদক্ষেপে উঠে দাঁড়াল সে। আঙুল ছুঁয়ে গেল এলোমেলো উল্ফ কাট চুলে, আর ঠিক তখনই চুলের আড়াল ভেদ করে উন্মোচিত হলো ঘাড়ের মাঝখানে খোদাই করা প্রজাপতির ট্যাটু নীরব, রহস্যময় এক চিহ্ন, যা সাধারণত গোপনেই থাকে। ওই চুলগুলোর আড়ালে।
হিউন জে নিদ্রালস কণ্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়ল,
“এখন আবার কে এলো, ব্রাদার?
মেহবুব সময়ের দিকে ইঙ্গিত করে বলল,
“সম্ভবত আন্টি। দুপুর প্রায় গড়িয়ে গেল।”
ঘড়ির কাঁটার দিকে চোখ পড়তেই শয্যের ভ্রূকুটি গাঢ় হলো। দীর্ঘ, দমবন্ধ করা নিঃশ্বাস ফেলে দরজার দিকে এগোতে লাগল। পিছন থেকে জিয়ানের ছুঁড়ে দেওয়া কুশন পিঠে এসে পড়তেই বিরক্তির মাঝেও ক্ষীণ প্রতিক্রিয়া দেখাল সে ফিরতি আ’ঘাতে কুশনটা ছুড়ে মা’রল জিয়ানের দিকে। জিয়ানের ঠোঁটে খেলল দুষ্টু হাসি।
দরজা খুলতেই খাবারের প্যাকেটের আড়ালে লুকানো এক পরিচিত মুখ উদ্ভাসিত হলো।ঝুমঝুম। তার হাসিমাখা মুখের বিপরীতে শয্যের দৃষ্টি হয়ে উঠল আরও কঠোর, আরও শীতল। পরিচিত মুখটা দেখে গাম্ভীর্য ভাবটা আরো প্রগাঢ় হলো পুরুষের। শয্যের এলোমেলো উল্ফ কাট চুলগুলো দেখে মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,
“জংলি কোথাকার।”
শয্য ভ্রুদ্বয় আড়াআড়িভাবে কুঁচকে নিতেই ঝুমঝুম স্বাভাবিক গলায় বলল,
“গুড আফটার নুন, ভাইয়া।”
শয্য কোনো প্রত্যুত্তর না করে ‘ছু’ মেরে খাবারের প্যাকেটগুলো নিয়ে ঠাস করে দরজাটা বন্ধ করে দিলো মুখের উপর।
এহেন কান্ড ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল ঝুমঝুম।
“এটা কি হলো ? আমার আনা খাবার গুলো নিলো অথচ আমাকে ঢুকতে দিলো না?”
রাগে ফোঁস ফোঁস করছে রমণী। নাসারন্ধ্রের উপরি ভাগ লালচে আভায় সিক্ত! মনে কষ্টের স্রোত বয়ে যাচ্ছে। একটুখানি সান্নিধ্যের আশায় কত অপমান হজম করে নিচ্ছে সে। কিন্তু তবুও শয্যের মনে জায়গা করে নিতে পারছেনা কন্যা। রাগ হয় মাঝে মাঝে, মন চায় লোকটাকে কষিয়ে দুটো কথা শুনিয়ে চলে যেতে।আর কখনো ফিরবে না কিন্তু যখনই মনে পড়ে লোকটা একা, তার কেউ নেই। কেউ আপন হতে চাইলে কাছে আসতে দেয়না!তখন ভেতরটা কেঁদে উঠে ঝুমঝুমের। সে জানে বাদশাহ পরিবারের জন্যেই তার এমন অবস্থা। সে সবার থেকে দূরে ছিলো বলেই তার এতটা রাগ, এত বেপরোয়া, উগ্র। শুধু জেসমিন বাদশাহ আর টিম আলফা ছাড়া কারো সাথে মন খুলে টু শব্দটি পর্যন্ত করেছে এই পুরুষ। তপ্ত, নিগূঢ় নিঃশ্বাস ছাড়ল ঝুমঝুম।
টিম আলফা তার প্রাণ। মাঝে মধ্যে তাদের সাথে দুষ্টুমি করা ভিডিও গুলো ভাইরাল হয়, ফ্যানরা সেগুলো দেখে মজা পায়। ঝুমঝুম নিজেও তাদের হাজারবার দেখে। তখন ভাবে কি সুন্দর করে লোকটা হাসছে, তাহলে বাকিদের সাথে কেন গম্ভীর মুখ করে রাখে?
মস্তিষ্ক জুড়ে দুষ্টু বুদ্ধি ঘুরপাক খাচ্ছে কন্যার। স্মাইলি স্টিকার দেওয়া ভ্যানিটি ব্যাগটা থেকে ফোনটা বের করে পোষ্ট করল টিম আলফার পাবলিক ফ্যান গ্রুপে।
“কে এসেছিল?”
মেহবুবের কণ্ঠস্বর নীরবতার আবরণ ভেদ করে ভেসে এলেও, শয্য কোনো প্রত্যুত্তর করল না। নিঃশব্দ উদাসীনতায় সে খাবারের প্যাকেটগুলো সেন্টার টেবিলের উপর রেখে দিল।
হিউন জে খাবারের উপস্থিতি লক্ষ্য করতেই একপ্রকার উৎফুল্লতায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল, ত্বরিত ভঙ্গিতে প্যাকেটগুলো উন্মোচনে ব্যস্ত হয়ে পড়ল সে। শয্য নির্বিকার পদক্ষেপে এগিয়ে গিয়ে জিয়ানের পার্শ্বে সোফায় বসল।
এই সময় জিয়ান হঠাৎ মোবাইল ফোনটি উন্মুক্ত করে উচ্ছ্বাসভরা কণ্ঠে উচ্চারণ করল,
“ব্রো, হাই-ফাইভ ভিডিওটা সম্পূর্ণরূপে ভাইরাল হয়ে গেছে। ফ্যানরা ভীষণভাবে পছন্দ করেছে।”
বাক্যসমূহ উচ্চারণ করতে করতে তার ওষ্ঠে প্রসারিত হলো প্রশস্ত হাসি। ভিডিওটি চালু হতেই শয্যের অধরেও অনিচ্ছাকৃত এক ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটে উঠল এক মুহূর্তের জন্য যেন তার কঠোরতা স্তিমিত হলো।
কিন্তু সেই স্বল্পস্থায়ী প্রশান্তি আকস্মিকভাবে বিঘ্নিত করল মেহবুব। সে ভ্রূ কুঞ্চিত করে ফোনের পর্দা সামনে ধরল, কণ্ঠে স্পষ্ট বিস্ময়ের ছাপ,
“হোয়্যাট ইজ দিস? শয্য?”
শয্য তখন সবে পিৎজায় দাঁত বসিয়েছিল। কিন্তু পর্দায় ভেসে ওঠা পোস্টটি ঝুমঝুমের করা সেই দুঃসাহসিক প্রকাশ তার দৃষ্টিতে পড়া মাত্রই মুখমণ্ডলের অভিব্যক্তি মুহূর্তে রূপান্তরিত হলো। ভ্রূরেখা সংকুচিত, চক্ষুপ্রান্ত কঠোর, অন্তর্লীন ক্রোধ যেন দপদপ করে জ্বলে উঠল।
ভেতরে, হাসি আড্ডার আবহে হঠাৎ সেই পোস্ট যেন বজ্রপাত হয়ে আঘা’ত হানল। শয্যের দৃষ্টি দপদপ করে জ্বলে উঠল।
অশ্রাব্য গালিটা কন্ঠ ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো,
“ফাক!”
রোষে হনহনিয়ে আবারো মেইন ডোরের কাছে গিয়ে দাঁড়াল সে।
উন্মত্ত হয়ে দরজা খুলে, ওমনি ঝুমঝুমকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। সে ঝুমঝুমকে টেনে ভেতরে নিয়ে এলো। হঠাৎ টানে ব্যথায় কুঁকড়ে গেল কন্যা, তবুও মুখে কোনো শব্দ আনল না।
ঘরের ভেতর নেমে এলো এক অদ্ভুত নীরবতা ঘন, ভারী, শ্বাসরুদ্ধকর।
শয্য সোফায় পা তুলে বসে আছে, পাশে মেহবুব; জিয়ান ও হিউন জে বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে ঝুমঝুমের দিকে। ঝুমঝুম লক্ষ্য করল শয্যের ঠিক পেছনের দেয়ালে কি সুন্দর করে একটা মোনালিসার পেইন্টিং টাঙানো আছে। কিন্তু এই মূহুর্তে তার দিকে দৃষ্টিপাত করল না কন্যা। অন্য সময় হলে শয্যের কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করে বলতো তাকে এই পেইন্টিংটা দিয়ে দিতে!
মেয়েটি যেন জীবন্ত পুতুল নির্ভীক অথচ অস্থির। হঠাৎ ব্যাগ থেকে উঁকি দিল পিউনিও, তার আদরের কাঠবিড়ালী। জিয়ান বিস্ময়ে লাফিয়ে উঠল। ভয়ার্ত কন্ঠ ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো,
“ওটা কী!”
ঝুমঝুম নির্লিপ্ত স্বরে বলল,
“পিউনিও বেবি। আমার কাঠবিড়ালী।”
কিন্তু সেই হালকা মুহূর্তও স্থায়ী হলো না। শয্যের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো,
“পোস্টটা ডিলিট কর।”
“নপ।”
ঝুমঝুমের জবাব দৃঢ়, নির্ভীক।
নাক মুখ কুঁচকে নিলো ঝুমঝুম। তৎক্ষণাৎ মেহবুব ক্যাপ্টেন হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালনে বলল,
“লিসেন,প্রীটি লেডি। তুমি যদি আমাদের ফ্যান হও তাহলে তো আগে বলা উচিত ছিলো। হয়তো শয্য বুঝতে পারেনি।”
ঝুমঝুম ছটফটে গলায় বলল,
“মোটেও নয়। শয্য ভাইয়া ইচ্ছে করে আমার মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিয়েছে।”
“শয্য ভাইয়া?”
একত্রে সবগুলো ছেলে চেঁচিয়ে উঠলো। মানেটা কি?
হিউন জে এতক্ষন ধরে নিরব দর্শক ছিলো তবে এবার বলেই বসল,
“ওয়েট ওয়েট,শয্য ভাইয়া মানে? শয্য এই মেয়েকে তুই চিনিস?”
শয্য নাকচ করল,
“নো। ও আমার কেউ না।”
চিড়বিড়িয়ে উঠল ঝুমঝুম। এভাবে সকলের সামনে তাকে অপমানিত করছে? অস্বীকার করছে?
ঝুমঝুম মোটেও চুপ থাকার মেয়ে নয়। কানে ঠিক কয়েক ইঞ্চি নিচে থাকা চমৎকার বাটারফ্লাই ট্যাটুটি দেখিয়ে বলল,
“মিথ্যে বলবেন না আপনি। এইযে এই দেখুন আমার ঘাড়ে একটা বাটারফ্লাই ট্যাটু। এটা ওনারও ঘাড়ে আছে। আর হ্যাঁ আমি আপনাকে আমাদের ফ্যামিলি ফোটো দেখাবো। গুলুমুলু শয্য বাদশাহর?”
ত্রস্ত হাতে ফোন বের করে গ্যালারি থেকে একের পর এক ফ্যামিলি ফোটো বের করে দেখালো ঝুমঝুম।
অবিশ্বাস্য নয়নে সকলে তাকিয়ে আছে। শয্য বলেছে সে তার মায়ের সাথে থাকে। তার পরিবারের সাথে কোনোরকম সম্পর্ক নেই। কিন্তু জলজ্যান্ত ঝুমঝুম কে দেখে মেহবুব চওড়া হেসে বলল,
“হাউ সুইট। তুমি তো দারুন সুন্দর করে কথা বলো। শয্য,তুই তো বলিস নি তোর এত সুইট একটা বোন আছে!”
কথাটা বলতে বলতে এগিয়ে গেল মেহবুব। ওমনি পিছন থেকে ওর হাতটা টেনে ধরল শয্য। চোখ পাকিয়ে শাসালো। মেহবুব থতমত খেয়ে গেল। ঝুমঝুম আবেগে আপ্লুত হয়ে আমোদিত চিত্তে বলল,
“থ্যাংক ইয়্যু।”
শয্য সামনে এগিয়ে এলো,তাকে এগুতে দেখে দু কদম পিছিয়ে গেল কন্যা। পিউনিও কাঠখোট্টা লোকটাকে দেখে আবারো টুক করে ব্যাগের ভেতর লুকিয়ে গেল। শয্য থমথমে গলায় বলল,
“তোর সমস্যা কি,মাশা? কেন এমন করছিস?”
মুহূর্তেই উত্তেজনা ঘনীভূত হলো। মেহবুব পরিস্থিতি সামলাতে এগিয়ে এল, কিন্তু ঝুমঝুম তার অভিযোগ স্পষ্ট করে দিল । শয্য ইচ্ছে করেই তাকে অপমান করেছে।
ঝুমঝুম শুষ্ক ঢোক গিলল, বুকের উপর ধকধক করছে কন্যার। শরীর কাঁপছে হৃদয়। দৃষ্টি এলোমেলো হচ্ছে।এতটা কাছে আসাতে নিঃশ্বাস রুদ্ধ হচ্ছে কন্যার।
ধিমি আওয়াজে বলে,
“আমি.. আমি চাই.. আপনি আমার উপর খুশি হয়ে যান।”
খুশি হওয়ার কথায় চোখ বুঝে নিজেকে সংযত করল শয্য। গম্ভীর কন্ঠে হিসহিসিয়ে বলল,
“তুই খুশি হওয়ার মতো কিছু করেছিস?”
ঝুমঝুম হকচকালো। হৃদয় স্পন্দন বেগতিক হচ্ছে। আমতা আমতা করে বলল,
“এক মিনিট। এখুনি আসছি।”
ঝুমঝুম হঠাৎ বাইরে ছুটে গেল, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে এলো একটি পোর্ট্রেট নিয়ে। চওড়া হেসে বলল,
“আপনাকে খুশি করতে আমি অনেক কিছু করেছি।
কাঁপা হাতে কভার সরাতেই নিঃশ্বাস থমকে গেল সকলের টিম আলফার নিখুঁত প্রতিচ্ছবি, এমনকি শয্যের সেই বিরল কোমলতাও ফুটে উঠেছে সেখানে।
“এটা আপনার জন্য। এখন কি আমার ওপর খুশি হবেন?”
পোট্রেট যখন শয্যের মুখের সামনে ধরল ঝুমঝুম। শয্য হাত বাড়িয়ে ওটাকে ছুঁয়ে দিলো। সাইন করা জায়গাটা নজর বুলিয়ে দেখে। ঝুমঝুম (মাশা)।
মেহবুব এগিয়ে এসে বিস্মিত কন্ঠে বলল,
“ওয়াও,এটা মারাত্মক।”
ঝুমঝুম পুলকিত কন্ঠে বলল,
“তাই না? আমি পেইন্টিং করেছি।”
জিয়ান সটান দাড়িয়ে নিজেও এসে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। তবে কাঠখোট্টা পুরুষের ভাবান্তর দেখা গেলনা আর। অকস্মাৎ পোট্রেটা হাতে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলল ফ্লোরে। ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব সকলে। ভীতি সশস্ত্র কন্যা পিছিয়ে গেল তৎক্ষণাৎ। কম্পিত হলো হৃদয় স্থল।
এক মুহূর্তের জন্য শয্যের কঠোর মুখশ্রী নরম হয়ে এলো।
কিন্তু পরক্ষণেই সবকিছু ভেঙে চুরমার। তার কণ্ঠে বি’ষ, দৃষ্টিতে ক্রোধের উষ্মা প্রকাশ পাচ্ছে!
“আই হেইট ইউ। আমার জীবন থেকে দূরে চলে যা! জাস্ট লিভ মি অ্যালন।”
কথাগুলো ছু’রির মতো বিদ্ধ করল ঝুমঝুমের হৃদয়। ঝুমঝুম ছলছল চোখে তাকায় শয্যের দিকে। লোকটার চোখের কার্নিশ লাল হয়ে আসছে। এতগুলো মানুষের সামনে এভাবে অপমান করায় কিশোরী মন হুহু করে কেদে উঠল তার। লম্বা নিঃশ্বাস টেনে দুর্বল হাতে পোট্রেট তুলে নিল! ফের উঠে দাঁড়ালো শয্যের সম্মুখে! টুপ করে একপ্রস্থ অশ্রু গড়িয়ে পড়ল কোমল গালে! বিনা বাক্যব্যয়ে কন্যা বেরিয়ে গেল। পিছনে ছেড়ে গেল বিস্মিত লোকগুলোকে।
শয্য ও বের হতেই সোফায় লাথি বসালো।
হিউন জে, জিয়ান এবং মেহবুব সকলেই আঁতকে উঠে।
জিয়ান চেঁচিয়ে উঠলো,
“এটা কি করলি তুই শয্য? ওকে এভাবে কেন হার্ট করেছিস? মেয়েটা তোর বোন। তোকে খুশিতে করতে….
বজ্রনিনাদের মতো গর্জে উঠল শয্য,
“স্টপ জিয়ান।জাস্ট স্টপ। ও আমার কেউ নয়। নাথিং।”
হনহন পদক্ষেপে ভেতরে চলে গেল শয্য। হিউন জে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। মেহবুব ,হিউন জে, জিয়ান বিস্ময়াবিভূত হয়ে স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
একাকী রুমে হাউমাউ করে কাঁদছে কন্যা। কিচ্ছুটি ভালো লাগছেনা তার। মনোজগত যেন এক বিষন্ন মরূভূমি। যেখানে স্নিগ্ধতার লেশমাত্রও অবশিষ্ট নেই।
অশ্রুসিক্ত আঁখি পল্লবে জমেছে অপমান, বঞ্চনা আর অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা অব্যক্ত আর্তি। যাকে আপন করার প্রয়াসে কত না আত্মনিবেদন করে চলেছে কিন্তু তাতেও বিশেষ লাভ হচ্ছে না। তবুও প্রতিদানে পেয়েছে তাচ্ছিল্যের নির্মম অ’গ্নিবাণ।
সেই মানুষটির অপমান পদে পদে গোগ্রাসে গিলে নিচ্ছে কন্যা। কিন্তু আজ তার সহিষ্ণুতার প্রাচীর ভেঙে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেছে। অন্তর্দহন আজ অসহনীয় রূপ ধারণ করেছে।
খুব কন্যা পেয়েছে কন্যা। হৃদয় বিদীর্ণ বাক্যগুলো প্রতি পদে পদে মেনে নিয়েছে।
অতিশয় যত্ন, মমতা ও শিল্পমগ্ন নিষ্ঠায় নির্মিত সেই পোর্ট্রেট যার প্রতিটি তুলির আঁচড়ে লুকিয়ে ছিল অনুভবের কোমলতা আজ যেন পরিণত হয়েছে বিষাদময় যন্ত্র’ণার এক জাদুকোষে। যা উন্মোচন করলেই দৃশ্যমান হয় কেবলই বেদনাবিদ্ধ স্মৃতিরা।
পিউনিও, ক্ষুদ্র কাঠবিড়ালীটি, দীর্ঘক্ষণ ধরে কন্যার সেই ভগ্নচিত্ত অবস্থা অবলোকন করে অবশেষে স্নেহাতুর তাড়নায় এগিয়ে এলো। নতজানু হয়ে, তার পায়ের সন্নিকটে এসে যেন নিঃশব্দ সান্ত্বনা দিতে চাইল। কিন্তু অন্ত’র্লীন ক্ষো’ভে প্রজ্বলিত কন্যা তাতে আরও উত্তেজিত হয়ে উঠল। কর্কশ কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল
“একদম বিরক্ত করিস না, পিউনিও। দূরে সরে যা!”
ঠিক সেই মুহূর্তে কক্ষদ্বারে প্রতিধ্বনিত হলো মৃদু করাঘাত। বাইরে থেকে রিমঝিমের স্নিগ্ধ কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
“মাশা? মাশা ঘুমিয়ে পড়লি নাকি?”
ঝুমঝুম নাক টানছে, কাঁদছে কন্যা। রিমঝিম ফের ডেকে উঠল,
“মাশা? এই মাশা খাবি না?”
এবেলায় খ্যাঁকিয়ে উঠল কন্যা।
“একদম বিরক্ত করবেননা আপ্পি। খাবো না আমি।”
এমন রূঢ়, তীক্ষ্ণ উচ্চারণে মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল রিমঝিম। এই কন্যা তো স্বভাবতই কোমল, সংযত আজ তবে কোন অদৃশ্য দুঃখ তাকে এমন অ’গ্নিমূর্তি ধারণে বাধ্য করেছে?
আরো কয়েক দফা ডাকা সত্বেও জবাব এলোনা!
নৈশ্য নিস্তব্ধতায় টিকটিক শব্দ তুলছে ঘড়ির কাঁটা। সবে মাত্র বারোটা ছুঁয়েছে কাঁটা। রাত্রি তার গাঢ়তম আবরণে আবিষ্ট। অকস্মাৎ জানালার দিয়ে কেউ একজন বাতাসের গতিবেগে লাফিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল।
পুরুষের পরণে ওভারসাইজ কৃষ্ণবর্ণের হুডি। সতর্ক , অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি বুলিয়ে আশপাশটা দেখল। বাচ্চাদের ঘরের মতো করে সাজানো ঘরটি দেখে বোধহয় মৃদু হাসলো সে।
কিন্তু পরমুহূর্তেই তার দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো বিছানার দিকে আর তখনই স্থবির হয়ে পড়ল তার আঁখিপল্লব। হ্যাজেলবর্ণ নয়নযুগলে ছড়িয়ে পড়ল এক অনির্বচনীয় মুগ্ধতা, যেন সে কোনো অতুলনীয় দৃশ্যের সম্মুখীন হয়েছে।
বিছানার প্রান্তে, নতশিরে মাথা এলিয়ে, সম্পূর্ণ নির্ভার নিশ্চিন্ততায় নিদ্রামগ্ন কন্যা তার প্রশান্ত মুখচ্ছবিতে ছড়িয়ে আছে নিষ্কলুষ সৌম্যতা। গভীর নিদ্রার আলিঙ্গনে আবদ্ধ সে, আর তার সেই নিরাবেগ, শান্ত অবয়ব মুহূর্তেই পুরুষটির অন্তর্লোককে এক অদ্ভুত নীরব বিস্ময়ে আচ্ছন্ন করে তুলল।
ধীর কদমে এগিয়ে গিয়ে ঠিক তার সম্মুখে বসল পুরুষটি।
হ্যাঁ পুরুষটির নাম জুনেদ শয্য বাদশাহ। তৎক্ষণাৎ নজরে এলো কাঠবিড়ালী পিউনিও। ওইতো গুটিসুটি মেরে কাঠবিড়ালীটা ঘুমোচ্ছে।
তন্দ্রায় মায়ায় নিমগ্ন কন্যার এলো কেশ যোগল আলতো হাতে ছুয়ে দিলো। সরিয়ে দিলো মুখের উপর থেকে। গালে বৃদ্ধা আঙ্গুল দিয়ে টোকা দিয়ে ক্ষীণ স্বরে বলে ওঠে,
“খুব বড় হয়ে গেছিস জান। আমাকে পাগল করার মতো বড় হয়ে গেছিস। যত চাই তোকে দূরে রাখতে ঠিক ততটাই কাছে চলে আসছিস।”
শয্য নিজেও মাথা এলিয়ে দিলো বিছানায়। গা থেকে নির্গত পারফিউমের ঘ্রাণ নাসারন্ধ্রে টেনে নিচ্ছে কন্যা। আবেশে নিজেকে আরো খানিকটা গুটিয়ে নিয়েছে।
এই কন্যাকে যদি কেউ ঘুমন্ত অবস্থায় নিয়ে চলে যায় তবুও দিন দুনিয়ার খেয়াল থাকবেনা তার।
শয্য হালকা হাসলো। সটান দাড়িয়ে আলগোছে কোলে তুলে নিল কন্যাকে। সন্তর্পণে শুইয়ে দিলো বিছানায়। ঝুঁকে এলো ঝুমঝুমের মুখ পানে। একপল দেখল ওই গোলাপী ওষ্ঠোদ্বয়। ভেজা চোখের পাতা হতে একটা পাপড়ি গালের উপর পড়ে আছে। শয্য এটা তুলে নিলো হাতে। দেখল কয়েক মূহুর্ত। অতঃপর দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিবদ্ধ করল সামনে টেবিলের উপর রাখা পোট্রেটের দিকে। সামান্য ওষ্ঠো বাঁকিয়ে মোহাচ্ছন্ন কন্ঠে বলে ওঠে,
মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ৬
“তুই ঠিকই বলেছিস ঝুম, আমি খুশি হয়েছি। খুব খুশি হয়েছি। এতটাই খুশি হয়েছি যে তোকে খুব করে কাঁদাতে ইচ্ছে করছে।”
দৃষ্টি ঘুরিয়ে ফের ওই ঘুমন্ত ঝুমঝুমের দিকে তাকালো শয্য। আঙ্গুল বাড়িয়ে টোকা দিলো নিচের ঠোঁটে। হিসহিসিয়ে বলল,
“আর আমি কাঁদালে ঠিক কিভাবে কাঁদাবো তোর আইডিয়া নেই, জান।”
