মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ৮
ফারহানা নিঝুম
আজগর চৌধুরী সুদীর্ঘকাল যাবৎ এক সুবর্ণ সুযোগের প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছিলেন বাদশাহ পরিবারের সাথে ব্যবসায়ীক সমঝোতায় আবদ্ধ হওয়ার দুর্লভ সম্ভাবনা। সেই প্রেক্ষাপটেই জেসমিন বাদশাহ একদা অকপটে জানিয়েছিলেন যদি কোনো বাঙালি কন্যার উপযুক্ত বিয়ের প্রস্তাব প্রাপ্ত হয়, তবে যেন তা অবশ্যই তাদের অবগত করা হয়; কেননা বড় ছেলে আব্রাহামের বিয়ের বিষয়টি নিয়ে তিনি আর দেরি করতে অনিচ্ছুক।
এমন আশাব্যঞ্জক প্রস্তাবনা আজগর চৌধুরীর নিকট যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। বহুকাঙ্ক্ষিত সেই সম্ভাবনাকে তিনি কিঞ্চিৎও উপেক্ষা করেননি; বরং যথাসময়ে কৌশলগত প্রজ্ঞার আশ্রয় নিয়ে নিজের মেয়ে পিহুর প্রস্তাবই উপস্থাপন করেছিলেন জেসমিন বাদশাহর সম্মুখে। প্রত্যক্ষ সান্নিধ্যে পিহুকে দেখে জেসমিন বাদশাহর মনে একপ্রকার প্রশান্ত সন্তোষের সঞ্চার ঘটে। পছন্দ হয় পিহুকে।
তবে বিষয়টি যখন আব্রাহামের সম্মতি তখন তার উত্তর ছিল সুস্পষ্ট ও অনমনীয় সে কেবলমাত্র সেই নারীকে জীবনসঙ্গিনী রূপে গ্রহণ করবে, যাকে তার হৃদয় স্বতঃস্ফূর্তভাবে নির্বাচিত করবে। প্রত্যুত্তর জেসমিন বাদশাহ প্রসন্ন হয়েছেন।
অথচ বিধিলিপির নির্মম পরিহাসে, বিয়ের আয়োজনের ঠিক আসরে পিহু এক অভাবনীয় পরিস্থিতির ঘটিয়ে বসে, যা সমগ্র পরিবেশকে একপ্রকার বিপর্যস্ত ও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে নিমজ্জিত করে।
অন্যদিকে, সময়ের পরিক্রমায় বহু দিন অতিক্রম হলেও আজগর চৌধুরীর সাথে প্রত্যাশিত বিজনেস নিয়ে আলাপ-আলোচনা এখনো কোনো সুসংহত রূপ লাভ করেনি। প্রতিবারই যখন তিনি এই প্রসঙ্গ উত্থাপন করতে উদ্যত হন, আব্রাহাম কৌশলে তা স্থগিত রাখে বর্তমান সময়ে তা সম্ভবপর নয় বলেই তার দৃঢ় অবস্থান। কয়েক কোটি টাকার সুবিশাল প্রজেক্ট, তা যে হঠকারী সিদ্ধান্তে!
আব্রাহাম জুঁইকে নিয়ে একবার দেশে যাবে বলেছে। আপাতত অনুষ্ঠান নিয়ে ব্যস্ত সেগুলো সেরে তারপর বাকিটা আলোচনা করবে।
ক্লান্ত শরীরটা টেনে নিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে চলেছে আব্রাহাম। কদম ফেলে এসে থেমেছে ফেইরি ল্যান্ডের ঠিক সামনে।
সদর দরজার দিকে তাকিয়ে তপ্ত নিঃশ্বাস ছেড়ে কলিং বেল চাপল।
ভেতরে অবস্থানরত ব্যক্তি দ্রুতপদে বাহিরে উপস্থিত হতেই কেয়ারটেকার মিসেস ইয়েরিন দরজাটি খুলে দিলেন। মেইন ডোরের কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন যাওয়ার উদ্দেশ্যে , কিন্তু আব্রাহামের আকস্মিক উপস্থিতিতে পদক্ষেপ থমকে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তেই লিভিং রুম হতে উচ্চারিত হলো এক গম্ভীর আহ্বান।
“নুগা ওয়াসসোয়ো, ইয়েরিন শি?”
কে এসেছে মিসেস ইয়েরিন?
ইয়েরিন অতিশয় নম্র কন্ঠে বলল,
“সনসেংনিম, আব্রাহাম সনসেংনিম ওশোসসোয়ো।”
স্যার, আব্রাহাম স্যার এসেছেন।”
আব্রাহামের নামটি কর্ণ কুহুতে তীব্র ভাবে আ’ঘাত হানে শয্যের। চোখ বুঁজে নিজেকে সংযত করল অতঃপর আগের চেয়েও গম্ভীর গলায় বলল,
“কাসেয়ো।”
আপনি যান।
ইয়েরিন বিনা বাক্যব্যয়ে চুপচুপে প্রস্থান করলেন।
তৎক্ষণাৎ দরজার সম্মুখে এসে অবিচল ভঙিতে দাঁড়ালো শয্য।
দুই ভাই একে অপরের মুখোমুখি। সম্পর্ক ক্ষীণ উষ্ণতার হলেও দেহে একই বাবার র’ক্ত বইছে শিরায় উপশিরায়।
উভয়ের চক্ষু জোড়া দুটো একই হ্যাজেল রঙের আভায়।
শয্য গম্ভীর, অনমনীয় স্বরে বলে,
“কি চাই?”
আব্রাহামের অধরে মৃদু হাস্যরেখা ফুটে উঠল। সামান্য হাসলো। ছেলেটা বড্ড অবাধ্য। বেপরোয়া, উগ্র, তেজস্বী যখন যা খুশি তাই করে। নিজের ইচ্ছের বাইরে কিচ্ছুটি করেনা। কারো কথা শুনে না শুধুমাত্র জেসমিন বাদশাহর ছাড়া। একমাত্র উনার কথায় তার অনমনীয়তা খানিকটা প্রশমিত হয়। এই ছেলেটাকে ভালোবেসে আপন করতে চেয়ে ক্রমাগত হতাশায় নিমজ্জিত কন্যা ঝুমঝুম বাদশাহ।
আব্রাহাম তাকে ভাই মানে কিন্তু উগ্র ছেলেটা তাকে ভাই মানতে নারাজ!
আব্রাহাম দুষ্টু ভঙ্গিতে রসিকতা করে বলল,
“তুমি বুঝি তোমার ফ্যান ফলোয়ারদের ভেতরে আসতে দাও না?”
‘ফ্যান ফলোয়ার’ শুনে কপাল জুড়ে উদ্বেগের চিহ্ন দেখা দিলো। টানটান ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে সংশ্রয় মিশ্রিত কন্ঠে বলল,
“আপনি আমার ফ্যান ফলোয়ার? সিরিয়াসলি?”
আব্রাহাম হেসে উঠল। এই কাঠখোট্টা ছেলেটা একটুও হাসতে চায়না। কিন্তু আব্রাহাম যে হাল ছাড়তে নারাজ।
আব্রাহাম আগের ন্যায় হাস্যোজ্জ্বল কন্ঠে বলে,
“সিরিয়াসলি। আমি টিম আলফার বিশাল বড় ফ্যান।”
দীর্ঘ , দগ্ধ নিঃশ্বাস ছাড়ল শয্য। দরজার সামনে হতে সরে দাঁড়ালো অর্থাৎ ভেতরে আসার অনুমতি দেওয়া হলো।
আব্রাহাম হাসলো। ছেলেটা তবুও মুখে বলবে না।
আব্রাহাম দ্বিধাহীন চিত্তে ভেতরে প্রবেশ করল। ওইতো ভেতরে প্রবেশ করতেই দৃষ্টি আকর্ষণ করল মোনালিসার চমৎকার পেইন্টিংটি। চিত্রখানিতে এক রহস্যময়ী নারীর মৃদু, অস্পষ্ট অথচ গভীরতম অভিব্যক্তিসম্পন্ন হাসি যেন অগণিত না বলা অনুভূতির নীরব ভাষ্য। তার চাহনিতে লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত আকর্ষণ, যা দর্শকের মনকে অজান্তেই আবিষ্ট করে ফেলে। পটভূমির ধূসরাভ, স্বপ্নিল প্রাকৃতিক দৃশ্য যেন সেই হাসির রহস্যকে আরও গাঢ় করে তুলেছে। সূক্ষ্ম তুলির আঁচড়ে গড়ে ওঠা প্রতিটি রেখা, প্রতিটি ছায়া শিল্পীর নিপুণতার এক অনবদ্য নিদর্শন। এটাই সেই পেইন্টিং যা দেখে ঝুমঝুম সর্বক্ষণ বলে শয্যের বাড়িতে দারুণ মোনালিসার পেইন্টিং আছে।ওটা সে নিতে চায় কিন্তু যেখানে বাড়িতে ঢোকার পারমিশন নেই সেখানে ছবিটা পাওয়ার লোভ দুঃস্বপ্ন বৈ আর কি?
সোফার একপাশে গিয়ে বসলো আব্রাহাম। শয্য ডিরেক্ট চলে গেল কিচেন কাউন্টারের দিকে। সেখান থেকেই স্বর উঁচু করে সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো,
“টি অর কফি?”
আব্রাহাম আর স্থির থাকতে পারল না। জায়গা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো ,এগিয়ে গেল শয্যের নিকটে কিচেন কাউন্টারের পাশ ঘেঁষে দাঁড়ালো।
শয্য ইতিমধ্যে অভ্যস্ত দক্ষতায় হাতে এপ্রোন পড়ে নিল। আব্রাহাম সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকে আগাগোড়া সবটা পরোখ করে বলল,
“কফি।”
শয্য আর একটি শব্দও ব্যয় করল না। কফি মেইকারে চট করে বানিয়ে ফেলল ধোঁয়াটে দুকাপ কফি। শেষ রূঢ় কন্ঠে আবারো আগের ন্যায় শুধোয়,
“সুগার?”
আব্রাহাম মাথা দুলিয়ে না জানালো। দুই ভাইয়ের রুচিই বোধহয় এক। উভয়ের পছন্দ নিরামিষ। উইথ আউট সুগার।
আব্রাহামের দিকে একটি কাপ বাড়িয়ে দিলো শয্য।
অতঃপর নিজের কাপটায় চুমুক দিয়ে তাকালো আব্রাহামের দিকে চেয়ে।
আব্রাহাম প্রথম সিপে হাসলো।
“দারুন হয়েছে।”
শয্যের সংক্ষিপ্ত জবাব,
“থ্যাংকস।”
আব্রাহাম সময় ব্যয় করল না, মোদ্দা কথাটা বলেই বসলো।
“শয্য, আমার কিছু কথা আছে তোমার সাথে।”
শয্য নিরলসভাবে বলে ওঠে,
“বলুন।”
আব্রাহাম কফির কাপে দ্বিতীয় চুমুক বসিয়ে ধীরে কাপটা রেখে দিলো। লম্বা নিঃশ্বাস টেনে নিজেকে খানিকটা প্রস্তুতের ভঙিতে দাঁড়িয়ে বলল,
“আজ রাতে রিসেপশন পার্টি রয়েছে। তুমি তো জানো বিয়ের কথা। বাড়ির সকলে চাইছে তুমি যাতে ওই পার্টিতে উপস্থিত থাকো। তুমি যদি…
সম্পূর্ণ বাক্যটি সমাপ্ত করার পূর্বেই তার মুখের কথাটুকু কেড়ে নিলো পুরুষটি।
“আই অ্যাম সরি , আমি থাকতে পারব না।”
মুখের উপর এমন প্রত্যাখ্যানে অভ্যস্ত নয় সামনের বাদশাহ পরিবারের বড় ছেলেটি। উজ্জ্বল মুখশ্রী জুড়ে বিষন্নতার কালো মেঘ নেমে এলো। ধীরে ধীরে ছেয়ে গেল আদল জুড়ে।
আব্রাহাম নিজেকে সংযত রেখে মৃদ্যু হাস্যরেখা ফুটিয়ে বলল,
“মামুনি চাইছে তুমি থাকো। তাছাড়া আমিও চাই তুমি থাকো। সবার ভালো লাগবে,শয্য।”
শয্য এবারে দক্ষ হাতে পেঁয়াজ, টমেটো কুচি কুচি করে,আপাতত নুডুলস রান্না করবে।মিসেস ইয়েরিনকে বলেছিল রাঁধতে কিন্তু তার পূর্বেই আব্রাহাম এলো তাই আর তাকে থাকতে দিলোনা শয্য। কা’টতে কা’টতে জবাবে বলে,
“কার ভালো লাগলো, না লাগলো তাতে আমার কিছু এসে যায় না। আই ডোন্ট কেয়ার। আমার কিসে ভালো লাগল সেটাই ফ্যাক্ট।”
আব্রাহাম তবুও চেষ্টা করল বেপরোয়া,ঘাড় ত্যাড়া ছেলেটাকে মানাতে।
“অ্যাটলিস্ট একটা দিন ভাবো? প্লিজ রিকোয়েস্ট করছি, বড় ভাইয়ের এটুকু রিকোয়েস্ট রাখো!”
ব্যস্ত হাতটি থেমে গেল শয্যের। বড় ভাই শব্দটি মস্তিষ্কে আঘা’ত হা’নে তার। চোখের কার্নিশ লাল বর্ণ ধারণ করে। ব্যথাতুর নয়নে তাকালো ছেলেটা। ভেতরের হাজার টুকু কষ্ট সে কাউকে বুঝতে দেয়না। অন্তর্নীলের ব্যথাটুকু গিলে নেয় ক্রমশ।
“কেন করছেন এসব? কি বুঝাতে চান আমি ওই পরিবারের সন্তান? আপনি আমার ভাই?”
আব্রাহাম নিরুত্তর। শয্য ক্রমশ ক্রোধের অগ্নিতে জ্ব’লছে! বেদনার নীলচে স্রোত বয়ে যাচ্ছে হৃদয় জুড়ে,। কন্ঠরুদ্ধ হয়ে আসছে যান্ত্রিক পুরুষটির।
আব্রাহাম শয্যের ডান হাতটি টেনে নিলো। ভরসার হাত ওইটা। তাকে আশ্বস্ত করতে চায়। আব্রাহাম ভালোবাসে এই উগ্র ছেলেটাকে। খুব ভালোবাসে।
“ভালোবাসা বুঝো শয্য? আমি তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি ব্রাদার। তুমি মানো আর না মানো আমি তোমার বড় ভাই। আর আমি সবসময় সেটাই করব যেটা করলে তোমাকে সকলের কাছে রাখা যায়।”
নিজের হাতটি এক ঝটকায় ছাড়িয়ে নিলো শয্য। কিচেন কাউন্টার থেকে বেরিয়ে এলো তৎক্ষণাৎ। অসহ্য যন্ত্রনা হচ্ছে অন্তর্নীলে। দমবন্ধকর এই অনূভুতি হতে পালাতে চায় সে।
আব্রাহাম পিছন থেকে তার বাহু দৃঢ় ভঙিতে টেনে ধরে শুধোয়,
“ঘৃণা করো আমায়?”
শয্য ওই চোখে চোখ রাখেনা। অজানা সত্যি ধরা পড়ে যাবে বলে নাকি নিজেই সেই সত্যি থেকে পালাতে চায় বলে?
“আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলো,শয্য! তুমি কি ঘৃণা করো আমায়?”
শয্য প্রত্যুত্তরে অনমনীয় স্বরে বলে ওঠে,
“আমি জুনেদ শয্য বাদশাহ, কাউকে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নই।”
আব্রাহামের ঠোঁটের কোণে স্নিগ্ধ হাসির রেখা প্রস্ফুটিত হয়। ওই হাসিটুকু বড় প্রশয়ের হাসি। বাইরের দিকে কদম ফেলতে ফেলতে আব্রাহাম বলে ওঠে,
“আমি অপেক্ষায় থাকব শয্য তোমার আসার। তাছাড়া মামুনিকে কথা দিয়েছি। প্লিজ আমাকে মিথ্যেবাদী প্রমাণ করো না। আই অ্যাম ওয়েটিং।”
আব্রাহাম বেরিয়ে গেল। শয্য ঠায় দাঁড়িয়ে আছে, তাকিয়ে আছে আব্রাহামের যাওয়ার পথে! মানুষ বড় অদ্ভুত জীব! শয্য তো তাকে ভাই বলে ডাকে না তবে কেন এতটা ডেস্পারেট এই যুবক?
অতিথিদের আগমন শুরু হয়েছে ধীর গতিতে। জেসমিন বাদশাহ, রাজিব বাদশাহ দুজনে অতিথিদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করে চলেছেন।
রুমের ভেতরটা অস্থির হয়ে আছে। সাজসজ্জা নিয়ে ব্যস্ত নারীরা। পার্লারের একের পর নারীরা রিমঝিম, জুঁই, ঝুমঝুমকে সাজিয়ে তুলতে বড্ড ব্যস্ত।
পরণে সফেদ রঙা একটা চমৎকার গাউন। গাউনে মুক্তোর কাজ করা। নিচের দিকটা মেলে আছে। গাউনটি দারুণ মানিয়েছে রমণীকে।
রিমঝিম অপলক দৃষ্টিতে অবলোকন করে চলেছে জুঁইকে। লাজুক রমণীকে আজ কোনো পরী থেকে কম নয়।
রিমঝিম সযত্নে তার চিবুক স্পর্শ করে বলল,
“কি সুন্দর দেখাচ্ছে তোমায় ভাবি। একদম পরী।”
এক বাক্যের এই প্রশংসা টুকু শুনে লজ্জালু হাসল জুঁই। সত্যি সুন্দর দেখাচ্ছে বুঝি তাকে? এই গাউনটি তো ওই জাঁদরেল পুরুষটি তাকে দিয়েছে। যেতে যেতে বলে গিয়েছে,
“আমার জন্য তৈরি হও জুঁই ফুল। শুধু মাত্র আমার জন্য।”
ওই কথাখানা স্মরণে আসতেই সর্বাঙ্গ প্রবলভাবে ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল কন্যার। অন্দর মহলে প্রলয়ঙ্কারী ঝড় আঁচড়ে পড়ছে। বোকা জুঁই এটুকু বুঝতে সক্ষম সে এই ঝড় তাকে ডুবিয়ে দেবে।
তৎক্ষণাৎ রুমে উপস্থিত হলেন তারা বাদশাহ। বরাবরের ন্যায় আজকেও উনি গম্ভীর হয়ে আছেন। জুঁই এবং রিমঝিমের মনোযোগ আকর্ষণ করতে বললেন,
“তোদের শেষ হয়েছে? আপা ডাকছে। জুঁইকে নিয়ে যা।”
রিমঝিম জুঁইকে একপল দেখে চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল,
“কিন্তু মাশা? ওকে তো এখনো তৈরি হয়ে আসতে দেখলাম না।”
তারা বাদশাহ হতাশ হলেন, সঙ্গে রাগের স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠল। বিরক্তিকর ভঙ্গিতে বলেন,
“এই মেয়েটা সবকিছুতেই এমন করে। অসহ্য!”
মা’কে এমনভাবে রেগে যেতে দেয় রিমঝিম দ্রুত এগিয়ে এলো। পরিস্থিতি সামাল দিতে জোরপূর্বক অধরকোণে হাসি টেনে বলে ওঠে,
“তুমি ভাবিকে নিয়ে যাও মা,আমি এখুনি ঝুমঝুমকে নিয়ে আসছি।”
তারা বাদশাহ কোনো রূপ মন্তব্য করলেন না আর। জুঁইয়ের হাতটা টেনে ধরলেন। ভয়ে কেঁপে উঠল কন্যা। এমনিতেই এখানে আসার পর থেকে জেসমিন বাদশাহ যতটা সহজ আচরণ করেছে তার সাথে,ঠিক ততটাই রূঢ় আচরণ দেখিয়েছেন তারা বাদশাহ। জুঁই কাউকে পাল্টা উত্তর দিতে কোনো কালেই পারেনা। নিজের নাজুক সত্তাকে ভালোবাসে সে। মা বেঁচে থাকাকালীন তাকে এটাই শিখিয়েছে সকলের সাথে নম্র,ভদ্র ব্যবহার করাই মেয়েদের বৈশিষ্ট্য।
মুখে মুখে দুটো কথা বলে দিলে, তর্ক করে ফেললেই বড় হওয়া যায়না! তারা বাদশাহর সঙ্গে বিনা বাক্যব্যয়ে চলে গেল জুঁই।
রিমঝিম ত্রস্ত পায়ে ছুটে গেল ঝুমঝুমের রুমের সম্মুখে। দরজায় নক করে বিচলিত হয়ে ডেকে উঠল,
“মাশা?এই মাশা কি রে এতক্ষন লাগে তৈরি হতে?”
রিমঝিম দ্বিতীয় দফায় ডাকতে তার পূর্বেই খট করে দরজাটা খুলে গেল। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো তরুণী। রিমঝিম স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ। বিস্ময়ে অক্ষিকৌটা বড় আকৃতির হয়ে উঠেছে।
পরণে সোনালী এবং, খয়েরী রঙের মিশ্রণে পরা ঘাগড়া সেট। ব্রাউন কার্ল করা চুলগুলোকে স্টপ বেনী করে পিছনের দিকে গাজরা গেঁথে দেওয়া হয়েছে। কোমড়ে ঝুলছে কোমর বন্ধনী। একদম নর্থ সাউথ ইন্ডিয়ানের মতো সেজেছে কন্যা।হাত ভর্তি দারুন বাহারী চুড়িগুলো। শব্দ ভান্ডার ফুরিয়ে এলো রমণীর রূপের প্রশংসা করতে গিয়ে। রিমঝিম বিস্ময়াবিভূত কন্ঠে বলে ওঠে,
মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ৭
“মাশা,এটা কি করেছিস তুই?”
ঘাবড়ে গেল কন্যার হৃদয়। ভয়ার্ত চোখে তাকায় রিমঝিমের মুখপানে। জড়ানো, সংশয়মিশ্রিত কন্ঠে শুধোয়,
“কেনো? ভালো লাগছেনা আপ্পি?”
রিমঝিম চিন্তিত বটে। ঝুমঝুমকে খারাপ দেখাচ্ছে মোটেও না! উল্টো তাকে অসম্ভব দেখাচ্ছে। আজকের মধ্যমণি বুঝি জুঁই আর ঝুমঝুম হতে চলেছে। কিন্তু ভয়টা তো তারা বাদশাহকে নিয়ে। এমন একটা রিসেপশন পার্টিতে তিনি কি মেনে নেবেন এসব?
দ্বিধাদ্বন্দ্বে জর্জরিত হৃদয়। কি ঘটতে চলেছে আন্দাজ নেই রিমঝিমের।
