যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ১৬
মুন্নি আক্তার প্রিয়া
ভয়ে জরাজীর্ণ হয়ে আমি এত জোরে রাহাতকে ধাক্কা দিয়েছি যে, কিছুটা দূরে সরে, কিছু সময়ের জন্য সে স্তব্ধ হয়ে গেছে। এখনো আমার দিকে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে। আমি ভয়ে তটস্থ হয়ে বললাম,
“মনে হয় বাইরে আমি চাচিমনিকে দেখেছি!”
রাহাত আমার চেয়েও অবাক হয়ে বলল,
“হোয়াট?”
“হ্যাঁ! সব শেষ। না জানি কী হবে এবার!”
রাহাত কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে আমার দু বাহু ধরে বলল,
“তুমি প্যানিকড্ হইও না। কিচ্ছু হবে না। আম্মু যদি দেখে থাকে তাহলেও সমস্যা নেই। আমি সব সামলে নেব।”
“কীভাবে সামলাবেন আপনি?”
“প্রয়োজনে সত্যিটা বলে দেবো। এমনিতেও তো একদিন না একদিন জানবেই। আজকেই না হয় জানুক।”
“আমার ভীষণ ভয় করছে!”
তিনি আমার দুগালে হাত রেখে বললেন,
“আমি থাকতে তোমার আবার ভয় কীসের? কিচ্ছু হবে না। ভরসা রাখো।”
আমরা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলাম, চাচিমনি দরজায় নক করে কিনা দেখার জন্য। কিন্তু কেউ নক করেনি। রাহাত এবার বলল,
“তুমি কি ঠিক দেখেছ?”
“জানিনা! কিন্তু আবছায়াভাবে মনে হলো আমি চাচিমনিকেই দেখেছি।”
“মা যদি দেখত তাহলে তো আসার কথা রুমে। মনে হচ্ছে তুমি ভুল দেখেছ। শোনো, দরজা খুলে বাইরে যাও একবার চেক দিয়ে এসো।”
“না, না আমি পারব না!”
“আরে ভয় পাচ্ছ কেন এত? এটা আমার রুম হলে আমিই যেতাম। শুধু চুপচাপ একবার রাউন্ড দিয়ে আসবে যাও।”
রাহাত অনেকবার বলে বুঝানোর পর আমি রাজি হয়েছি। ভয়ে কলিজাটা মনে হয় হাতে নিয়ে দরজা খুলেছি। কাঁপা কাঁপা পায়ে বাইরে গিয়ে দেখি কেউ নেই। একটু সাহস করে চাচিমনিদের রুমের সামনেও গেলাম। লাইট নেভানো। হালকা করে দরজায় ধাক্কা দিয়ে দেখলাম, দরজাও ভেতর থেকে বন্ধ। তাহলে বোধ হয় আমারই মনের ভুল!
রাহাতকে গিয়ে এসব বলতেই বেচারা প্রথমে জোরে নিঃশ্বাস নিল, যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। এরপর বলল,
“তুমি তো আমাকে ভয়ই পাইয়ে দিচ্ছিলে! সারাক্ষণ এসব ভাবো তাই জেগে জেগেও এখন ভুলভাল দেখো।”
আমি বললাম,
“আপনি কেন এত ভয় পেয়েছেন? আপনি তো চান-ই সবাইকে সত্যিটা জানাতে। তাহলে?”
রাহাত এবার হেসে ফেলল। কাছে এসে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“আরে আমার বাচ্চা বউটা! ভুল বোঝা ছাড়া কি আর কিছু করতে পারো না?”
“তাহলে সঠিকটা বোঝান।”
তিনি এবার আমাকে সামনে ঘুরিয়ে কোমর জড়িয়ে ধরে বললেন,
“দেখো আমি অবশ্যই সত্যিটা সবাইকে জানাতে চাই। তবে এভাবে না। এখন যদি সত্যিই আম্মু আমাদের এভাবে দেখে ফেলত তাহলে তোমাকে খারাপ ভাবত, ভুল বুঝত। আমি তো চাই না, কেউ আমার প্রিয়র দিকে আঙুল তুলুক, বাঁকা চোখে তাকাক। তুমি যে আমার অনেক শখের, প্রিয়!”
সকালে আমার ঘুম ভাঙল হৃদির ডাকে। ভোরের দিকেই রাহাত নিজের রুমে চলে গেছিল। আমি সকালে উঠে রেডি হয়ে নিলাম হোস্টেলে ফিরে যাওয়ার জন্য। ভয়ে ভয়ে ডাইনিং রুমে গিয়ে আড়চোখে চাচিমনিকে দেখছিলাম। দেখলাম, সব স্বাভাবিক। চাচিমনি সবার প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছে। আমাকে দেখে বলল,
“খেতে বোস।”
আমি কোনো বাক্যব্যয় না করে হৃদির পাশে বসলাম। চাচ্চু বলল,
“এত সকাল সকাল রেডি হয়েছিস যে?”
“হোস্টেলে ফিরে যাব তাই।”
চাচিমনি তখন বলল,
“আজ আর যেতে হবে না। হৃদিও বাসায় আছে আজ। এখানেই থাক। কাল চলে যাস।”
হৃদি এ কথা শুনে খুশি হয়ে গেছে। আমি যে খুশি হইনি বিষয়টা এমন নয়। কিন্তু একটু ভয়ও লাগছিল আবার। ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়। কথায় আছে না চোরের মন পুলিশ পুলিশ। আমার এখন হয়েছে ঐ দশা। তবে আমি আজ থেকে গেলাম। সকালের নাস্তা করে হৃদির সাথে গল্প করছিলাম, তখন রাহাত টেক্সট দিল,
“অফিসে যাচ্ছি, জান। একই বাড়িতে আছি আর যাওয়ার আগে বউয়ের মুখটা দেখব না তা কি হয়? রুমে আসো একটু।”
আমি লিখলাম,
“হৃদি আছে সাথে।”
“ম্যানেজ করে আসো দুই মিনিটের জন্য।”
পড়ে গেলাম এবার মহা মুসিবতে। হৃদিকে বললাম,
“রান্নাঘরে আচার আছে নাকি?”
“আছে তো। খাবে তুমি? আমি নিয়ে আসছি তাহলে।”
“তোর যেতে হবে না। আমি নিয়ে আসছি।”
হৃদিকে রুমে রেখে আমি এক প্রকার চোরের মতোই রাহাতের রুমে গেলাম। রাহাত তখন আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে শুরু করেছে। আমি তাকে আটকানোর চেষ্টা করে বললাম,
“কবে যেন আপনার জন্য আমি হার্ট-অ্যাটাক করে মা’রা যাই!”
“এত সোজা? আমায় রেখে কোথায় যাবে তুমি? তোমাকে কোথাও যেতে দিলে তো।”
“আর নাটক করতে হবে না। দেখতে চেয়েছিলেন, দেখা শেষ? এবার অফিসে যান।”
“উহুম!”
“আবার উহুম কী?”
“চুমু দাও।”
আমি দ্রুত তার দুই গালে দুটো চুমু দিয়ে বললাম,
“আচ্ছা এবার যাই আমি।”
“উহুম! আগে একটু বুকে আসো।”
এই আবদার আমি ফেলে দিতে পারি না, হয়তো কখনো পারবোও না। আমি যখন তার বুকে থাকি তখন মনে হয় সবচেয়ে শান্তির স্থানে আছি, যেখানে আমাকে কেউ ছুঁতে পারবে না, কষ্ট দিতে পারবে না। আমি বুঝিনা তার বুকেই কেন এত শান্তি খুঁজে পাই আমি?
রাহাত চলে যাওয়ার পর আমি রান্নাঘরে গেলাম আচার নিতে। নয়তো হৃদিকে আবার কী জবাব দেবো! চাচিমনিও তখন এঁটো চায়ের কাপ নিয়ে রান্নাঘরে এসেছে। আমাকে আচার নিতে দেখে বলল,
“চালতার আচারও আছে। খাবি? ছাদে দিয়ে এসেছিলাম রোদে।”
আমি বললাম,
“আচ্ছা তাহলে ঐটা পরে খাবনে।”
চাচিমনি অনেকক্ষণ কোনো কথা বললেন না। আমি তাই একটু আড়চোখে তাকালাম। দেখি আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। আমি ঘাবড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভয়ও পেলাম। চোরের মতো করছিলাম কেমন যেন!
হঠাৎ চাচিমনি বলল,
“তোর সবকিছু ঠিকঠাক চলছে?”
আমি আমতা আমতা করে বললাম,
“হ্যাঁ।”
“খাওয়া-দাওয়ায় কষ্ট হয় ওখানে?”
“না তো!”
“মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে।”
“না, ওদের খাবার ভালোই। আর তুমিও তো খাবার পাঠাও দুদিন পরপর।”
চাচিমনি আবারও কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,
“তোর কি এখনো আমার ওপর রাগ আছে?”
আমি হাসার চেষ্টা করে বললাম,
“আরে না! কী বলো এসব।”
চাচিমনি এবার আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“প্রিয়ু, তুই কি কিছু লুকাচ্ছিস আমার দিকে?”
আমার প্রাণ প্রায় ওষ্ঠাগত এবার। ফাঁকা ঢোক গিলে বললাম,
“না তো! কী লুকাব?”
চাচিমনি শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
“জানিনা। মনে হচ্ছে। আচ্ছা ঘরে যা।”
চাচিমনির সামনে আরেকটু দাঁড়িয়ে থাকলে হয়তো ভয়ে সব সত্যি বের হয়ে যেত। ভাগ্যিস চাচিমনি আর কথা বাড়ায়নি! কিন্তু হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন করল? চাচিমনি কি তাহলে গতকাল সত্যিই আমাদের একসাথে দেখেছিল?
সারাদিন চাচিমনি আমার সাথে খুব স্বাভাবিক ছিল তাই ভয়টাও আস্তে আস্তে দূর হয়ে গিয়েছিল আমার। হৃদির সাথে আড্ডা দিয়ে, গেইম খেলে সময় কেটে গিয়েছে। ঘড়ির কাটায় পাঁচটা বাজার পরই আমি অপেক্ষা করছিলাম রাহাতের জন্য। মনে হচ্ছে কত বছর ঐ মায়া মায়া মুখটা দেখি না!
প্রায় সাড়ে ছয়টা নাগাদ রাহাত বাসায় এসেছে। আসার সময় সবার জন্য আইসক্রিম নিয়ে এসেছে। আর সকলের অগোচরে পকেট থেকে একটা গোলাপ বের করে আমার হাতে গুঁজে দিয়েছে। হৃদি আমাকে আজ এমন জোকের মতো ধরেছে যে খাওয়ার টেবিল ছাড়া রাহাতের সাথে আলাদা করে আর দেখা করার সুযোগ হয়নি। এমনকি রাতেও হৃদি আমার সাথে ঘুমিয়েছে আজ। ঐদিকে বেচারা সারাক্ষণ ছটফট করেছে। কিন্তু কী আর করার!
সকালে ঘুম ভাঙার পর ফ্রেশ হয়ে খেতে গিয়ে দেখি, রাহাত নেই। রুমেও উঁকি দিয়ে দেখলাম নেই। ফোন হাতে নিয়ে দেখি, মেসেজ করেছে,
“গুড মর্নিং, বউ। অফিসের কাজে ঢাকার বাইরে যাচ্ছি।”
মনটাই খারাপ হয়ে গেল। একবার কি দেখা করে যাওয়া যেত না? রাহাত নেই বিধায় চাচ্চু আমাকে হোস্টেলে পৌঁছে দিয়ে গেল। রুমে ঢুকেই আগে আমি রাহাতকে কল করেছি। প্রথমবারে সে কল ধরল না। দ্বিতীয়বার ধরে বলল,
“হ্যাঁ জান, বলো?”
“আপনি একটাবার দেখা কেন করলেন না?”
“তুমি ঘুমিয়ে ছিলে তাই জাগাইনি।”
“কবে দেখা হবে আমাদের?”
“আমি ফিরে এলেই। রাখছি এখন ব্যস্ত আছি।”
আমি কিছু বলার আগেই সে কলটা মুখের ওপর কেটে দিল। এতে আমার মনটা আরো খারাপ হয়ে গেলেও তার পরিস্থিতি বুঝে মনকে শান্ত করলাম। কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে কলেজে গেলাম। বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে মন তখন অনেকটাই ভালো হয়ে গিয়েছিল। ক্লাস শেষ করে হোস্টেলে ফিরে তাকে টেক্সট দিলাম,
“হোস্টেলে ফিরেছি।”
এটা তার রুলস। প্রতিদিন কলেজে যাওয়ার সময় এবং হোস্টেলে ফিরে তাকে ইনফো করে রাখতে হয়। মেসেজ দেওয়ার সময় দেখলাম দুই ঘন্টা আগে একটিভ ছিল। হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজও ডেলিভারি হয়নি। আমি বেশি মাথা না ঘামিয়ে খেয়ে একটু ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় আমার ঘুমও আসছে না। কেমন যেন অস্থির অস্থির লাগছিল খুব। রাহাতের কথা মনে পড়ছিল বারবার। আমার এত কান্না পাচ্ছে আজ এতদিন পর আবার! রাহাতের নাম্বারে কল করলাম এবার। ফোন নাম্বার বন্ধ। এবার আমার দুশ্চিন্তা হতে লাগল। তার কোনো বিপদ হয়নি তো?
এরপর সেই যে সন্ধ্যা থেকে আমি বারবার কল দিচ্ছি আর বারবার নাম্বার বন্ধ পাচ্ছি। এদিকে তার বিপদের আশঙ্কায় আমার দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম। কীভাবে তার খোঁজ নেব কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। হৃদিকে হোয়াটসঅ্যাপ কল দিতে গিয়ে দেখি এরমধ্যেই আমার রাহাতকে পাঠানো অসংখ্য মেসেজগুলো ডেলিভার হয়েছে। এবং পনেরো মিনিট আগে একটিভও ছিল দেখাচ্ছে। তাহলে সে আমাকে রিপ্লাই করল না কেন? কলব্যাকও করল না!
আমি তৎক্ষনাৎ হৃদিকে কল করে স্বাভাবিকভাবে কথা বলার চেষ্টা করছিলাম। সবার খোঁজ-খবর নেওয়ার অজুহাতে বললাম,
“এই রাহাত ভাই যে আইসক্রিম আনলো সব খেয়ে ফেলছিস?”
হৃদি বলল,
“ওমা! কাল রাতেই তো সব শেষ হয়ে গেল। তুমিই তো খেলে বেশি।”
“ইশ! আচ্ছা তাকে বলিস আজ আবার এনে দিতে।”
“ভাইয়া তো আজ ফিরবে না।”
“কেন?”
“অফিসের কাজে নাকি ঢাকার বাইরে গেছে। একটু আগে ফোন দিয়ে আম্মুর সাথে কথা বলল।”
“একটু আগে ফোন দিয়েছিল?”
“হ্যাঁ।”
যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ১৫
আমি আর বলার মতোন কিছু পাচ্ছিলাম না খুঁজে। মনে, মাথায় অনেক প্রশ্ন কিন্তু উত্তর নেই। বাড়িতে কল দিয়ে কথা বলেছে মানে তার কোনো বিপদ হয়নি, সে ঠিক আছে আলহামদুলিল্লাহ। তাহলে কেন আমার মেসেজ, কলের কোনো রেসপন্স করল না?
ব্যস্ত আছে ভেবে পুরো রাত অপেক্ষা করেও তাকে কল দিয়ে, মেসেজ দিয়ে তার কোনো রেসপন্স পেলাম না। সারারাত দুচোখের পাতা এক করতে পারিনি। কাঁদতে কাঁদতে চোখ-মুখ ফুলে গিয়েছে। মনে শুধু একটাই প্রশ্ন, সে কেন এমন করছে আমার সাথে?
