Home র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ১৫

র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ১৫

র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ১৫
ইয়ুশরা রিমু

বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। সারাদিনের আড্ডা, হাসাহাসি, খুনসুটি শেষে বাড়ির ভেতরেও এখন একটু গুছিয়ে নেওয়ার আবহ। ইরা উঠে দাঁড়ালো। ফোনে ওর মায়ের দু’বার কল এসেছে, আর দেরি করলে বাসায় ফিরেই মা’র খেতে হবে। এই বলে সে এমন মুখ করলো যে বেলা হেসে ফেলতে গিয়েও কেমন যেন নিজেকে সামলে নিলো।ইরা বেরোনোর আগে একে একে সবাইকে বিদায় জানালো। নাজনীন সুলতানার সঙ্গে জড়িয়ে ধরে বললো,

— আন্টি, আমি কিন্তু আবার আসবো। আপনার হাতের এতো ভালো সুস্বাদু রান্না করা খাবার খেয়েছি, এখন না এসে উপায় আছে?
নাজনীন সুলতানা হেসে বললেন,
— আসবি মা, যখন খুশি আসবি।
মমতাজ বেগমের দিকেও ভদ্রভাবে তাকিয়ে সালাম দিলো ইরা। তারপর বিহানের দিকে ফিরে বললো,
— আপনি কিন্তু আজকের দৌড়ে একদম লজ্জাজনকভাবে হেরেছেন। এটা আমি জীবনে ভুলবো না।
বিহান সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করলো,
— আমি হারিনি। আমি ইচ্ছে করে তোমাদের জিতিয়েছি।
ইরা মুখ বাঁকিয়ে বললো,
—জ্বী জ্বী, নিজেকে সান্ত্বনা দিতে থাকেন।
তারপর হঠাৎ বেলার হাত টেনে একটু পাশে নিয়ে ফিসফিস করে বললো,
— রাতে কিন্তু সব বলবি। বিশেষ করে কার দিকে তাকিয়ে তোর কালো হয়ে গেছিলো, সেটা।
বেলা সঙ্গে সঙ্গে কনুই দিয়ে গুঁতো মে’রে বললো,

— চুপ করে বাসায় যা।
ইরা দুষ্টু হেসে বললো,
— আচ্ছা, যাচ্ছি।
বেলা চোখ রাঙালো।
— ভাগ।
ইরা আবারও হেসে গেটের দিকে এগিয়ে গেলো। বেরোনোর আগে একবার হাত নেড়ে বললো,
— বাই সবাইকে!
ওর পেছন পেছন রুপসাও উঠে দাঁড়ালো। সে এতক্ষণ খুব স্বাভাবিকভাবেই সবার সঙ্গে গল্প করছিলো, কিন্তু যাওয়ার সময় আবারও খুব সুন্দর করে, ধীরে ধীরে সবাইকে বিদায় জানালো। নাজনীন সুলতানাকে বললো,
— আন্টি, আজকে খুব ভালো লাগলো। অনেকদিন পর এত সুন্দর একটা দিন কা’টালাম।
— ভালো লাগলে আবার এসো মা।
রুপসা মৃদু হেসে মাথা নাড়লো। তারপর মমতাজ বেগমের সঙ্গেও কথা বললো, বিহানকে হেসে বললো,
— তোমার নাটক কিন্তু সত্যিই কমে না।
বিহান গর্বিত ভঙ্গিতে বললো,
— এটা আমার প্রাকৃতিক প্রতিভা।
রুপসা হেসে মাথা নাড়লো। তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সায়রের দিকে তাকিয়ে বললো,

— আচ্ছা, আমি যাই তাহলে। আবার দেখা হবে।
সায়র তখন হাতে ফোন নিয়ে কী যেন দেখছিলো। মাথা তুলে একবার তাকিয়ে শান্ত গলায় বললো,
— ঠিক আছে। সাবধানে যাস।
এই ছোট্ট কথাটুকু কেন জানি বেলার কানে খচখচ করে বিঁধলো। সে সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকালো। নিজের এই বিরক্তিটা সে নিজেই সহ্য করতে পারছে না।
রুপসা এবার বেলার দিকেও তাকিয়ে হাসলো।
— বাই, বেলা।
বেলা ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি টেনে বললো,
— বাই।
তারপর রুপসাও গেট পেরিয়ে চলে গেলো।ওরা চলে যেতেই বাড়িটা কেমন যেন আচমকা শান্ত হয়ে গেলো। এতক্ষণ যে প্রাণখোলা কোলাহল ছিল, সেটা এক নিমিষে থেমে গিয়ে চারপাশে নরম একটা নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
বেলা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো বারান্দায়। বিকেলের আলো ততক্ষণে আরও ফিকে হয়ে এসেছে। আকাশের রঙ বদলাচ্ছে ধীরে ধীরে। বিহানও একসময় মুখে হাই তুলে বললো,

— আমি একটু রেস্ট নেই। এত আনন্দ করাও কষ্টের কাজ।
বেলা শুধু হুঁ বলে নিজের রুমের দিকে চলে গেলো।
ঘরে ঢুকেই দরজাটা ঠেলে বন্ধ করে সে বিছানায় গিয়ে বসলো। তারপর ধীরে ধীরে শুয়ে পড়লো। কিন্তু শরীর ক্লান্ত হলেও মাথাটা একটুও শান্ত নেই। চোখ বন্ধ করলেই আজকের ছোট ছোট মুহূর্তগুলো ভেসে উঠছে। ইরার খুনসুটি। রুপসার বারবার সায়রের আশেপাশে থাকা। আর সায়রের সেই স্বাভাবিক, নির্বিকার মুখ।সবচেয়ে বিরক্তিকর ব্যাপার হলো।সে নিজেই বুঝতে পারছে, এসব তার মাথায় এতটা জায়গা নেওয়ার কথা না। তবু নিচ্ছে।একসময় সে উঠে বসে ফোনটা হাতে নিলো। ফেক আইডির চ্যাটটা খুলে আবার বন্ধ করলো। সকালের সেই মেসেজটা এখনও মাথায় ঘুরছে। কিন্তু আজ আর মেসেজ দিতে ইচ্ছে করলো না। বরং ফোনটা পাশে ছুঁড়ে রেখে সে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলো।

সন্ধ্যা নামতে নামতে বাড়িটা আরও চুপচাপ হয়ে গেলো। দূরের মসজিদ থেকে আজানের সুর ভেসে এলো। আকাশের রং গাঢ় হতে লাগলো। আর ঠিক তখনই খবর এলো সায়র ডাকছে, পড়তে যেতে।বেলার ভ্রু সঙ্গে সঙ্গে কুঁচকে গেলো।আজকে তার পড়তে যাওয়ার একদমই ইচ্ছে নেই। বিশেষ করে সায়রের সামনে গিয়ে বসতে। কিন্তু না গেলেও বিপদ। তাই অনিচ্ছায় বই-খাতা গুছিয়ে সে রুম থেকে বের হলো।
করিডোরে তখন হলদে আলো জ্বলছে। বাড়ির ভেতরটা একেবারে শান্ত। বেলা ধীরে ধীরে সায়রের রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।দরজাটা খানিকটা খোলা ছিলো। বেলা হালকা নক করতেই ভেতর থেকে গলা এলো,
— আয়।

বেলা ভেতরে ঢুকলো।ঢুকতেই প্রথমেই তার নাকে এলো সেই পরিচিত, হালকা গভীর সুগন্ধ। সায়রের পারফিউমের ঘ্রান। সবসময় যেমন তীব্র না, আজ কেমন যেন একটু নরম, একটু উষ্ণ। ঘরটাও আগের মতোই পরিপাটি। টেবিল ল্যাম্পের আলোয় পুরো রুমটা শান্ত আর গুছানো লাগছে। বুকশেলফে বই, টেবিলের ওপর খাতা আর কিছু কাগজ, পাশে সোফায় ফেলে রাখা একটা কালো শার্ট। সায়র সে টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো। আজ তার পরনে কালো ট্রাউজার আর গাঢ় ধূসর টি-শার্ট। বেলাকে দেখে কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তাকিয়ে রইলো। সেই দৃষ্টিটা এমন না যে খুব স্পষ্ট কিছু বোঝা যায়, কিন্তু এতটুকু যথেষ্ট।বেলার বুকের ভেতরটা আবারও অকারণে ধক করে উঠলো। বেলা দ্রুত মুখ ফিরিয়ে টেবিলের সামনে গিয়ে বসলো। ব্যাগ খুলে খাতা বের করতে লাগলো। এমন ভাব, যেন সে এখানে শুধু পড়তেই এসেছে, এর বাইরে একটাও বাড়তি কথা বলার ইচ্ছে নেই।সায়র সেটা খেয়াল করলো। ধীরে ধীরে টেবিলের দিকে এগিয়ে এসে তার সামনে একটা গ্লাস দিয়ে বলে,

— আগে পানি খা।
বেলা খাতার দিকে তাকিয়েই বললো,
— লাগবে না।
— বিকেল থেকে কিছু খেয়েছিস?
বেলা এবার মুখ তুলে তাকালো। ভ্রু কুঁচকে গেলো। তারপর বেলা ঠাণ্ডা গলায় বললো,
— আমাকে নিয়ে এত ভাবার দরকার নেই।
সায়র গ্লাসটা টেবিলের ওপর একটু তার দিকে ঠেলে দিয়ে শান্ত স্বরে বললো,
— দরকার আছে কি নেই, সেটা আমি বুঝে নেবো। আগে পানি খা।
বেলা এবারও গ্লাসে হাত দিলো না। ব্যাগ থেকে কলম বের করে বই খুলে বসলো। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে সে আজ কথা বাড়াতে চায় না। সায়র কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর খুব ধীরে চেয়ার টেনে সামনে বসলো।

— আচ্ছা, শুরু কর।
পড়া শুরু হলো। কিন্তু শুরু থেকেই বোঝা গেলো বেলার মন একদমই নেই। সায়র একটা জিনিস বুঝিয়ে দিচ্ছে, আর সে খাতায় অন্য কিছু লিখে ফেলছে। সায়র কয়েক সেকেন্ড ওর দিকে তাকিয়ে থেকে বললো,
— এইটা কী করেছিস?
বেলা চমকে খাতার দিকে তাকালো।
— কী?
— আমি এক জিনিস করতে দিলাম, তুই আরেক জিনিস লিখলি কেন?
বেলা ঠোঁট চেপে বললো,
— ভুল হয়ে গেছে।
— ভুল না, মন নেই।
বেলা সঙ্গে সঙ্গে বললো,
— মন আছে।
— না, নেই।
— আছে।
সায়রের ঠোঁটের কোণে খুব হালকা, চাপা একরকম হাসি ফুটে উঠলো।

— তোর এই জেদটা না…
বেলা মুখ গোমড়া করে খাতার দিকে তাকিয়ে বলে,
— জেদ না।
— তাহলে?
— কিছু না।
সায়র চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলো। কিছুক্ষণ চুপচাপ বেলার দিকে তাকিয়ে থেকে বললো,
— সারাদিন ধরে মুখটা এমন গোমড়া করে রেখেছিস কেন?
বেলা খাতায় কলম চালাতে চালাতে বলে,
— আমার মুখ, আমি যেমন খুশি তেমন রাখবো।
— রাখবি, তাতে সমস্যা নেই। কিন্তু এই মুখ নিয়ে পড়তে বসলে সমস্যা আছে।
বেলা এবার বিরক্ত হয়ে তাকালো,
— আপনি পড়া পড়ান।
সায়র ভ্রু তুললো,
— আমি তো সেটাই করছি। কিন্তু ছাত্রী যদি পড়ার বদলে রাগ পুষে বসে থাকে, তাহলে আমার ভালো লাগে বল?
বেলা তীক্ষ্ণ গলায় বললো,
— আমি রাগ করিনি।
— তাই নাকি?
— হ্যাঁ।
— তাহলে আমার দিকে তাকাচ্ছিস না কেন?
এক মুহূর্তে বেলা থেমে গেলো। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো। সে তাড়াতাড়ি মুখ নামিয়ে বললো,

— আপনার দিকে তাকিয়ে কথা বলতেই হবে এমন কোনো নিয়ম আছে?
সায়র একদম শান্ত গলায় বললো,
— নিয়ম নেই। তবু তুই ইচ্ছে করেই না তাকানোর চেষ্টা করছিস।
বেলা বিরক্ত হয়ে বইয়ের পাতা উল্টালো।
— আপনি বেশি ভাবেন।
সায়র খুব ধীরে বললো,
— হুম। তোকে নিয়ে
কথাটা এমনভাবে বললো, যেন এর মধ্যে আলাদা কিছু নেই। অথচ বেলার হাতের আঙুল কেমন শক্ত হয়ে গেলো। সে কলমটা আরও জোরে চেপে ধরলো।
— আমাকে নিয়ে না ভাবলেও চলবে।
— না, চলবে না।
বেলা এবার স্পষ্টই থমকে গেলো। মুখ তুলে তাকাতেই দেখলো, সায়রের মুখে সেই স্বাভাবিক গম্ভীর ভাবই আছে, কিন্তু চোখদুটো কেমন অদ্ভুত মা’দকতা। যেন খুব সাধারণ একটা কথার ভেতরেও অন্য কিছু লুকিয়ে আছে।বেলা তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে বলে,
— আপনি আজকে খুব বিরক্তিকর আচরণ করছেন।
সায়র মৃদু গলায় বললো,
— তুই গতকাল থেকে এমন আচরণ করছিস, তাতে আমিও বিরক্ত হচ্ছি।
বেলা এবার খাতাটা একটু জোরে উল্টে বললো,

— আমি ঠিক আছি।
— না, ঠিক নেই।
— আছি।
সায়র আর কিছু না বলে কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর টেবিলের ওপর পড়ে থাকা একটা ছোট্ট হেয়ার ক্লিপ তুলে নিয়ে বললো,
— এটা লাগা।
বেলা তাকিয়ে বললো,
— কেন?
— চুলগুলো বারবার চোখে পড়ছে। লিখতে গিয়ে বিরক্ত হচ্ছিস।
— হচ্ছি না।
— হচ্ছিস।
বেলা হাত বাড়িয়ে ক্লিপটা নিয়ে টেবিলে রেখে দিলো।
— লাগবে না।
সায়র ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
— আমার কথা শুনতে এত কষ্ট হয়?
— সব কথা শুনতে হবে নাকি?
— সব না। দরকারি কথা শুনলেই হবে।
বেলা এবার সোজা হয়ে বসল।
— কী দরকারি?
সায়র একটু ঝুঁকে এসে খুব শান্ত গলায় বললো,

— তুই নিজের যত্ন নিতে জানিস না। তাই মাঝে মাঝে বলে দিতে হয়।
বেলার বুকের ভেতরটা কেমন থেমে গেলো এক মুহূর্তের জন্য। এই লোকটা এত স্বাভাবিকভাবে কেন এমন সব কথা বলে? যেন ওর খেয়াল রাখা, ওর দিকে নজর রাখা।এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক ব্যাপার।বেলা সঙ্গে সঙ্গে গলাটা শক্ত করলো,
— আমার যত্ন আমি নিজেই নিতে পারি।
সায়র তাকিয়েই রইলো।
— পারিস?
কথাটার ভেতরে এমন একরকম নরম খোঁচা ছিলো যে বেলার আরও রাগ হলো।
— হ্যাঁ, পারি।
সায়র খুব আস্তে মাথা নাড়লো।
— তাহলে বিকেল থেকে কিছু না খেয়ে বসে থাকতিস না।
বেলা থমকে গেলো।
— কে বলেছে আমি কিছু খাইনি?
— আমাকে বলে দিতে হয় না। তোর মুখ দেখলেই বুঝি।
বেলা এবার সত্যি সত্যিই আর উত্তর খুঁজে পেলো না। সে শুধু বিরক্ত মুখে খাতার দিকে তাকিয়ে রইলো। সায়র গ্লাসটা আবারও তার দিকে এগিয়ে দিলো।

— পানি খা।
বেলা না করতে গিয়েও শেষমেশ গ্লাসটা হাতে নিলো। এক চুমুক খেয়ে টেবিলে নামাতেই সায়রের ঠোঁটের কোণে খুব ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠলো,
— এই তো। এতক্ষণ ধরে সেটাই বলছিলাম।
বেলা চোখ রাঙালো,
— আপনি সবকিছু নিয়ে বাড়াবাড়ি করেন।
সায়র একটুও দেরি না করে বললো,
— তোর ক্ষেত্রে করি।
আবারও সেই একই ধরনের কথা। এত স্বাভাবিক, অথচ অদ্ভুতভাবে ভেতরটা কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো। বেলা এবার আর কিছু বললো না। শুধু বইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকার ভান করতে লাগলো। কিন্তু সে নিজেই বুঝতে পারছে, একটা শব্দও মাথায় ঢুকছে না।সায়র সেটা বুঝলো বলেই হয়তো খাতাটা নিজের দিকে টেনে নিলো।
— এই লাইনটা আবার লিখ।
বেলা লিখতে শুরু করলো। লিখতে লিখতে টের পেলো, সায়রের দৃষ্টি এখনও তার ওপরেই। এতে তার মনোযোগ আরও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সে হঠাৎ কলম থামিয়ে বললো,

— কী?
সায়র শান্ত গলায় বললো,
— কিছু না। দেখছি।
— কী দেখছেন?
সায়র ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি টেনে বললো,
— তুই যখন রাগ লুকাতে চাস, তখন আরও বেশি বোঝা যায়।
বেলা সঙ্গে সঙ্গে বললো,
— আমি রাগ করিনি।
— করেছিস।
— করিনি।
সায়র এবার চেয়ার থেকে সামান্য এগিয়ে এলো। দু’জনের মাঝের দূরত্বটা কমে গেলো একটু। তার গলাটা নিচু, ধীর।
— আচ্ছা, তাহলে এমন মুখ ভুতুম পেঁচার মতো করে আছিস কেন?
বেলার গলা শুকিয়ে এলো। তবু মুখ শক্ত রেখেই বললো,
— আমার ইচ্ছে।
— তোর কি আমার ওপর রাগ হয়েছে ?
— কার ওপর সেটা আপনাকে বলতে হবে?
সায়র কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর খুব আস্তে, এমন এক গলায় বললো যেটা না চাইলেও বুকের ভেতর নরম কিছু নামিয়ে দেয়,
— তোর এই মুখটা আমার একটুও ভালো লাগে না।
বেলা থমকে গেলো।সায়র থামলো না। একই নরম স্বরেই বললো,

— হাসলে তোকে বেশি ভালো লাগে।
এক মুহূর্তে বেলার বুকের ভেতরটা পুনরায় ধক করে উঠলো। চোখ তুলে তাকাতেই দেখলো, সায়রের মুখে বাড়তি কোনো ভাব নেই। খুব স্বাভাবিক, শান্ত। অথচ তার চোখে একটা অদ্ভুত নরম টান জমে আছে। যেন কথাটা ভেবেই বলেছে।বেলা দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিলো।
— তাহলে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকেন।
সায়রের ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি ফুটলো।
— চেষ্টা করছি। কাজ হচ্ছে না।
বেলা এবার সত্যিই আর কী বলবে বুঝলো না। লোকটা মাঝে মাঝে এমনভাবে কথা বলে যে রাগ করতে গিয়েও অকারণে গাল গরম হয়ে আসে। তাই সে তাড়াতাড়ি বইয়ের দিকে তাকিয়ে বললো,
— পড়া শেষ?
— না। আজ এতো তাড়াতাড়ি পালাতে চাচ্ছিস কেন?
— আমি পালাচ্ছি না।
— তাহলে ঠিকমতো পড়।
এরপর আরও কিছুক্ষণ পড়া চললো। কিন্তু সায়রের খেয়াল রাখা থামলো না। কখনো বলছে,
— এত ঝুঁকে লিখিস না।কখনো খাতা সোজা করে দিচ্ছে।
কখনো কোনো লাইনে ভুল হলে বকছে, আবার পরের মুহূর্তেই নিচু গলায় বলছে,

— ধীরে কর। তাড়াহুড়ো করিস না।
এইসব খুব ছোট ছোট ব্যাপার। বাইরে থেকে দেখলে সাধারণই লাগতো। কিন্তু বেলার কাছে প্রতিটা জিনিসই আলাদা করে ধরা পড়ছিলো। আর সে ইচ্ছে করেই সবকিছু অগ্রাহ্য করে যাচ্ছে। যেন কিছুই টের পায়নি।প্রায় একঘণ্টা পর সায়র খাতা বন্ধ করে বললো,
— আজ এতটুকুই।
বেলা যেন বাঁচলো। দ্রুত খাতা-কলম গুছিয়ে ব্যাগে ঢোকাতে লাগলো। তারপর উঠে দাঁড়াতেই সায়রও উঠে দাঁড়ালো।বেলা দরজার দিকে পা বাড়াতেই পেছন থেকে সে ডাকলো,
— বেলা।
বেলা থামলো, কিন্তু ঘুরে তাকালো না।
— কী?
সায়র কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বললো,
— কালকে আসার সময় এই গম্ভীর মুখটা নিয়ে আসিস না।
বেলা এবার ঘুরে তাকালো। ভ্রু কুঁচকে আছে।

— কোন মুখ?
সায়র টেবিলের ওপর থেকে সেই ক্লিপটা তুলে হাতে ঘুরাতে ঘুরাতে বললো,
— এই যে, সারাদিন ধরে যেটা নিয়ে ঘুরছিস।
বেলা ঠোঁট চেপে বললো,
— আমি এমনই।
— না, তুই এমন না।
কথাটা এত নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে বললো যে বেলা থমকে গেলো। সায়র ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এসে ক্লিপটা বাড়িয়ে দিলো।
— এটা ফেলে যাচ্ছিস।
বেলা ক্লিপটা নিতে হাত বাড়ালো। ঠিক তখনই সায়রের আঙুল খুব হালকা করে ছুঁয়ে গেলো তার আঙুলে। ছোঁয়াটা এক সেকেন্ডেরও কম, তবু বেলার বুকের ভেতরটা কেমন কেঁপে উঠলো।সায়র খুব নিচু গলায় বললো,
— আর রাগ করলেও খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করবি না।
বেলা সঙ্গে সঙ্গে বললো,

— আমি রাগ করিনি।
সায়র শান্ত গলায় বললো,
— আচ্ছা।
তার গলায় এমন একরকম মৃদু মজা ছিলো, যেন সে বেলার কথাটা একটুও বিশ্বাস করছে না। বেলা বিরক্ত হয়ে ক্লিপটা মুঠো করে ধরলো।
— আমি যাচ্ছি।
বেলা আর দাঁড়ালো না। দ্রুত দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেলো। করিডোরে এসে হাঁটতে হাঁটতে সে টের পেলো, তার বুকের ভেতরটা এখনও কেমন দ্রুত উঠানামা করছে। বিরক্তিতে, অস্বস্তিতে, না অন্য কিছুর জন্য সে নিজেও বুঝতে পারছে না।শুধু এটুকু বুঝতে পারছে, আজ সন্ধ্যায় সায়র ইচ্ছে করেই তাকে একটু একটু করে অস্বস্তিতে ফেলতে চেয়েছিলো। কথা দিয়ে, খেয়াল রেখে, হালকা শাসন মেশানো কেয়ার দিয়ে।

সকালের শুরুটাই আজকে বেলার জন্য একদম ভালো হলো না।ঘুম ভাঙতে দেরি, তারপর তাড়াহুড়ো করে তৈরি হতে গিয়ে হিজাবের পিন খুঁজে না পাওয়া, চুল ঠিক করতে গিয়ে আরও সময় নষ্ট।সব মিলিয়ে যখন বেলা নিচে নামলো, তখন তার মুখটা বিরক্তিতে গোমড়া হয়ে আছে। এক হাতে ব্যাগ, অন্য হাতে ফোন, কপালের সামনে এলোমেলো চুল উড়ছে।আজকে কারও সঙ্গে একটা ভালো কথা বলারও মুড নেই তার।
ড্রইংরুমে বসে চা খাচ্ছিলেন সারোয়ার খান। বেলাকে সেই অবস্থায় নামতে দেখে তিনি ভ্রু তুলে বললেন,
—কী ব্যাপার মা, এমন মুখ করে কোথায় যাচ্ছিস?
বেলা তাড়াহুড়ো করে জুতো পরতে পরতে বললো,
—লেট হয়ে গেছে চাচ্চু। একদম লেট! আজকে তো ক্লাসে ঢুকতেই দিবে না।
সারোয়ার খান ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
—তা হলে দাঁড়িয়ে থেকে আর সময় নষ্ট করছো কেন? সায়রও এখন বেরোবে। ওর সঙ্গেই চলে যাও।
কথাটা শুনে বেলা যেন সঙ্গে সঙ্গে থমকে গেলো। মুখ তুলে তাকিয়ে বলে,

—কি????
ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলো সায়র। কালো শার্ট ,প্যান্ট হাতে বাইকের চাবি। চিরচেনা গম্ভীর, পরিপাটি চেহারা। চোখে সেই অদ্ভুত স্থিরতা, যেন চারপাশে কী হচ্ছে তাতে তার বিন্দুমাত্র হেলদোল নেই। কিন্তু বেলার মুখের অভিব্যক্তি দেখে ঠোঁটের কোণে খুব হালকা একটুখানি হাসি খেলে গেলো তার।সারোয়ার খান স্বাভাবিক গলায় বললেন,
—সায়র, বেলার দেরি হয়ে গেছে। ওকে নিয়ে যা আজকে।
বেলা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো,
—না না, দরকার নেই। আমি রিকশা নিয়ে চলে যাব।
সারোয়ার খান একদম কেটে দিয়ে বললেন,
—রিকশা নিয়ে গেলে তুমি কলেজে পৌঁছাবে টিফিনের সময়, আজকে সায়রের সঙ্গে চলে যাও।
বেলা এবার এমন একটা মুখ করলো, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে অন্যায় সিদ্ধান্তটা এইমাত্র তার বিরুদ্ধে দেওয়া হয়েছে। সে একবার সারোয়ার খানের দিকে, একবার সায়রের দিকে তাকালো। কিন্তু দু’জনের মুখ দেখেই বুঝে গেলো, এই সিদ্ধান্ত বদলানোর আর কোনো উপায় নেই।সায়র তখন শান্ত গলায় শুধু বললো,

–চল।
‘চল’ শব্দটার ভেতরেও এমন একটা নির্লিপ্ত ভাব ছিলো, যেন বেলাকে নিয়ে যাওয়া তার জীবনের সবচেয়ে বিরক্তিকর কাজ। আর সেটাই বেলার আরও বেশি রাগ উঠিয়ে দিলো। সে মুখ গোমড়া করে বাইকের দিকে এগিয়ে গেলো। হাঁটার ভঙ্গিতেই বিরক্তি ঝরছে।বাইকের পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই সায়র একবার ঘুরে তাকালো।
—উঠ। এইখানে পা দিয়ে শক্ত করে ধরে বসবি আমাকে।
বেলা ঠোঁট ফুলিয়ে বললো,
–আমি কি জানি না উঠতে?আর আপনাকে কেন আমি ধরে বসতে যাব আজব।
সায়র ভ্রু তুলে বলে,
–জানিস তো। এজন্য বাইকের দিকে ভ’য়ে ভ’য়ে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছিস।
বেলা রাগে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলে,
— এতো কথা বলেন কেন আপনি!
সায়র নির্বিকার গলায় জবাব দিলো,
—আমি তো কিছুই বলিনি।
বেলা আর কোনো উত্তর দিলো না। শুধু বিরক্ত মুখে বাইকে উঠে বসলো। কিন্তু বসেই এমনভাবে শরীরটা দূরে সরিয়ে নিলো, যেন সায়রের গায়ে একটুও ছোঁয়া লাগতে দেওয়া যাবে না । দুই হাত শক্ত করে নিজের ব্যাগের ওপর রেখে দিলো। সায়রের শার্টের এক কোণও ধরলো না।সায়র ইঞ্জিন স্টার্ট দিতে দিতে একবার পাশ ফিরে তাকিয়ে বলে,

—এভাবে বসে থাকলে পড়ে যাবি।
বেলা সঙ্গে সঙ্গে বললো,
—পড়লে পড়বো। আপনি আগে স্টাট দেন বাইক।
— ভালো কথা শুনতে তোর কোনো কালেই ভালো লাগেনি। কিন্তু সঙ্গে শুধু তুই না, আমাকেও টেনে নিয়ে পড়বি পড়ার সময়। আমার রাস্তার মাঝখানে উল্টে পড়ার শখ নেই।
বেলা এবার চোখ কুঁচকে তাকালো।
—আপনি ভাবছেন আমি আপনাকে ফেলে দিব ?আমি আপনাকে টাচ পর্যন্ত করবোনা দেখিয়েন।
সায়রের ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি ফুটলো।
—আচ্ছা
বেলা মুখ ফিরিয়ে নিলো।
বাইক মেইন রোডে আসতেই সকালের হালকা বাতাস এসে বেলার হিজাব উড়িয়ে দিচ্ছে বারংবার। রাস্তার দুপাশে দোকানপাট ধীরে ধীরে খুলছে, মানুষের ভিড় বাড়ছে, আর বেলা বসে আছে বাইকের পেছনে গোমড়া মুখে। ইচ্ছে করেই সায়রের দিকে একবারও তাকাচ্ছে না। যেন সে এখানে নেই, এই বাইকে বসেই নেই এমন একটা ভাব।কিন্তু সমস্যা হলো, বাইকটা একটু স্পিড নিতেই তার ভারসাম্য নড়ে উঠলো। বেলা তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিতে সায়রকে শক্ত করে জরিয়ে ধরলো।সামনে তাকিয়েই সায়র বললো ,

–বলেছিলাম ধরে বসতে।
বেলা দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
—আমি ঠিক আছি।
— তুই ঠিক আছেন কি না, সেটা রাস্তায় পড়ে গিয়ে প্রমাণ করার দরকার নেই।
—আপনার এত চিন্তা করতে হবে না আমাকে নিয়ে।
—চিন্তা করছি না। শুধু চাই না, পরে গিয়ে এ’ক্সিডেন্ট হোক। পরে বলবে তোকে ইচ্ছে করে রাস্তার মাঝখানে ফেলে দিয়েছি। আমার হাজতবাস করার ইচ্ছে একেবারেই নেই।
বেলা এবার আর চুপ থাকতে পারলো না,
—আমার কিন্তু মেজাজ খারাপ হচ্ছে বলে দিলাম।
—আমার তো মনে হচ্ছে, তোর মেজাজ আগে থেকেই খারাপ ছিলো।
বেলা ফুঁসতে ফুঁসতে বললো,
—আপনি না একদম অসহ্য!
সায়র শান্ত স্বরে বললো,

—সকালে সকালে এমন সুন্দর কমপ্লিমেন্ট দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
বেলা এবার সত্যি সত্যিই রেগে গেলো। সে ইচ্ছে করেই আরও একটু দূরে সরে বসলো। কিন্তু রাস্তার একটা বাঁকে বাইক ঘুরতেই আবার কেঁপে উঠলো। এবারো এক মুহূর্তের জন্য ভারসাম্য হারিয়ে সে অনিচ্ছায় সায়রের শার্টের পেছনটা চেপে ধরলো। ধরেই আবার ছেড়ে দিলো, যেন ভীষণ বড় অন্যায় করে ফেলেছে।সায়র সেটা টের পেয়ে খুব স্বাভাবিক গলায় বললো,
—একটু ধরেছিস, এতে হাতে ফো’সকা পড়বে না।
বেলা লজ্জা আর রাগে একসাথে গরম হয়ে উঠলো।
—একদম কথা বলবেন না।
কথাটা বেলাই এবার সত্যি সত্যিই চুপ মে’রে গেলো। কিন্তু তার চুপ হয়ে যাওয়ার ভেতরেও বিরক্তি ছিলো, অস্বস্তি ছিলো, আর বুকের ভেতরে অদ্ভুত এক লুকোনো ধুকপুকানিও ছিলো।যেটা সে নিজেও স্বীকার করতে চাইলো না। সায়রের এত কাছে বসে থাকা, তার শার্টে মিশে থাকা সেই পরিচিত পারফিউমের ঘ্রান ‌নিচ্ছে তার কাছে সব স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে।
এরপর পুরোটা রাস্তা সে আর একটা কথাও বললো না। শুধু মুখ ফিরিয়ে বসে রইলো। আর সায়রও জোর করে কথা বাড়ালো না। তবে ঠোঁটের কোণে যে চাপা হাসিটা মাঝে মাঝে এসে পড়ছিলো, সেটা বেলা না দেখলেও অনুভব করছিলো।

কলেজের সামনে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তখন ভেতরে ভেতরে বেলার অস্বস্তি নতুন করে শুরু হলো। বাইরে গেইটের সামনে যথারীতি ছাত্রছাত্রীদের ভিড়। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে গল্প করছে, কেউ ক্লাসে ঢোকার তাড়ায় দৌড়াচ্ছে। এই ভিড়ের মাঝখানে সায়রের বাইক ঢুকতেই কয়েকজনের চোখ সেদিকে ঘুরে গেলো।আর বাইকটা যখন গেইট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলো, তখন যেন এক মুহূর্তে আশপাশের পরিস্থিতি বদলে গেলো।কারণ পরের দৃশ্যটা কেউই একটুও আশা করেনি।কলেজের হ্যান্ডসাম, গম্ভীর, সবসময় মেয়েদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখা প্রফেসর শাইবান খান সায়রের বাইকের পেছন থেকে নামছে বেলা!
বাইক থামতেই বেলা তাড়াতাড়ি নেমে পড়লো। মুখে এমন একটা ভাব আনার চেষ্টা করলো যেন এটা খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে নিজেই টের পাচ্ছিলো, চারপাশের দৃষ্টি কেমন একসাথে এসে তাদের ওপর আটকে গেছে।সামনেই দাঁড়িয়ে থাকা দুই-তিনজন মেয়ে অবিশ্বাস নিয়ে একে অপরের দিকে তাকালো।

—ওইটা… বেলা না?
–সায়র স্যারের বাইকে?
—কীভাবে?
আরেকপাশে দাঁড়ানো ছেলেদের মধ্যেও ফিসফাস শুরু হয়ে গেলো।
—-দোস্ত, আমি কি ভুল দেখছি?
—না ভাই, একদম ঠিকই দেখছিস।
—বিষয়টা কিন্তু ইন্টারেস্টিং!
বেলা ব্যাগটা কাঁধে ঠিক করতে করতে দ্রুত ভেতরে হাঁটতে যাচ্ছিলো, ঠিক তখনই তার চোখ পড়লো তানিয়ার দিকে।
গেইটের একটু ভেতরে, তার দুই বান্ধবীকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো তানিয়া। আর এই দৃশ্যটা দেখার পর তার মুখের রং মুহূর্তেই বদলে গেছে। চোখদুটো কেমন জ্ব’লে উঠেছে রাগে, হিংসায়, অবিশ্বাসে। ঠোঁট শক্ত করে চেপে আছে, যেন কোনোভাবে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু সেই চেষ্টা যে খুব একটা কাজে আসছে না, সেটা তার মুখ দেখলেই বোঝা যায়।তানিয়া প্রথমে সায়রের দিকে তাকালো, তারপর বেলার দিকে। আবার সায়রের দিকে। যেন সে কিছুতেই মিলাতে পারছে না।এই বেলা, যাকে সে এতদিন অপমান করে এসেছে, যাকে ছোট করার সুযোগ খুঁজেছে, সেই বেলাই আজ কলেজে ঢুকছে সবার কাঙ্ক্ষিত, নজরকাড়া প্রফেসরের বাইকে চেপে!তার পাশে দাঁড়ানো মেয়েটা ফিসফিস করে কী একটা বলতেই তানিয়া প্রায় ঝাঁঝিয়ে উঠলো,
—-চুপ!

তার চোখে তখন এমন আ’গুন, যেন ইচ্ছে করলে সেখানেই কাউকে জ্বা’লিয়ে দিতে পারে।বেলা তানিয়ার সেই মুখটা দেখেই ভেতরে ভেতরে অদ্ভুত এক তৃপ্তি অনুভব করলো। যদিও বাইরে সেটা একটুও প্রকাশ করলো না। বরং আরও বেশি গম্ভীর মুখ করে হাঁটতে লাগলো। কিন্তু বুকের ভেতর কোথাও একটা দুষ্টু আনন্দ ঠিকই খেলে গেলো। সায়র তখনও বাইকের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো। হেলমেট খুলে একবার চারপাশে তাকালো। এতসব ফিসফাস, এতসব অবাক দৃষ্টি সবই সে বুঝতে পারছে। কিন্তু তার মুখে তেমন কোনো ভাবান্তর নেই। বরং সেই একই শান্ত, স্থির অভিব্যক্তি।

র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ১৪

আর গেইটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তানিয়া? সে তখনও আ’গুনের মতো জ্ব’লছে। তার মুখের সেই হিংসায় পু’ড়ে যাওয়া অভিব্যক্তি দেখলে যে কেউ বুঝে ফেলবে।আজকের এই দৃশ্যটা সে এত সহজে ভুলতে পারবে না।
আজ থেকেই হয়তো কলেজে নতুন এক গুঞ্জনের শুরু হতে যাচ্ছে।কলেজের সবচেয়ে হ্যান্ডসাম প্রফেসরের বাইকে করে বেলা এসেছে।এমন খবর ছড়াতে বেশি সময় লাগার কথা নয়।

র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ১৬