রইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ২২
ইয়ুশরা রিমু
পুরোনো সাংস্কৃতিক কক্ষের সামনে মুহূর্তের মধ্যেই এক অস্বাভাবিক পরিবেশের সৃষ্টি হলো। কিছুক্ষণ আগেও যেখানে করিডোরটা প্রায় নির্জন ছিলো, সেখানে এখন অসংখ্য মানুষের ভিড়। অধ্যক্ষ মোস্তাফিজুর রহমানের পেছনে একে একে দাঁড়িয়ে আছেন কলেজের বেশ কয়েকজন শিক্ষক। তাঁদের পেছনে কৌতূহলী ছাত্রছাত্রীদের দীর্ঘ সারি। অনুষ্ঠানে আসা অনেক অভিভাবকও কী হয়েছে, তা জানার জন্য এগিয়ে এসেছেন। চারদিকে শুধু চাপা গুঞ্জন আর ফিসফাস।
—কী হয়েছে? সবাই এখানে কেন?
কেউ কেউ উওর দিচ্ছে,
—শুনলাম কোন ছেলে-মেয়েকে নাকি অনৈতিক কাজ করতে গিয়ে ধরা খেয়েছে!
কেউ নিশ্চিত কিছু জানে না, অথচ প্রত্যেকেই নিজের মতো করে অনুমান করে চলেছে। মুহূর্তের মধ্যেই একটি অস্পষ্ট গুজব পুরো করিডোরে ছড়িয়ে পড়েছে।
অধ্যক্ষ মোস্তাফিজুর রহমান ধীরে ধীরে দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর মুখের কঠোরতা দেখে আশপাশের সবাই নিঃশব্দ হয়ে গেলো। রাগে তাঁর চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। চোখেমুখে স্পষ্ট অসন্তোষ। তিনি একবার সবার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
—কেউ কোনো বিশৃঙ্খলা করবেন না। সবাই যেখানে আছেন, সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকুন।
চারপাশে পিনপতন নীরবতা নেমে এলো।ধীরে ধীরে তিনি দরজার বাইরের ছিটকিনির দিকে হাত বাড়ালেন। এক মুহূর্তের জন্য পুরো করিডোরের বাতাস যেন থমকে গেলো। শত শত চোখ তখন সেই দরজার দিকেই স্থির।একটা ধাতব শব্দ তুলে ছিটকিনিটা খুলে গেলো।অধ্যক্ষ ধীরে ধীরে দরজাটা ঠেলে খুললেন।দরজা খুলতেই তাঁর চোখের দৃষ্টি মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেলো।মুখের রাগ যেন এক নিমিষেই বিস্ময়ে পরিণত হলো।তিনি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষকরা অবাক হয়ে দরজার ভেতরে তাকিয়ে রইলেন।ছাত্রছাত্রীদের মাঝ থেকেও একসঙ্গে চাপা বিস্ময়ের শব্দ ভেসে এলো।
— সা… সায়র স্যার!
চারদিকে আবারও গুঞ্জন শুরু হয়ে গেলো।
ঘরের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে সায়র।আর তার থেকে কিছুটা দূরে, দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে আছে বেলা।বেলার চোখ দুটো কান্নায় ভিজে গেছে। মুখটা ফ্যাকাশে। দুহাত শক্ত করে আঁচল চেপে ধরে কাঁপছে সে।আর সায়রের মুখেও স্পষ্ট বিস্ময়। এত মানুষকে একসঙ্গে দরজার সামনে দেখে তিনিও কয়েক মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খেলো তানিয়া।তার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা বিজয়ীর হাসিটা মুহূর্তের মধ্যেই মিলিয়ে গেলো।মনে হলো শরীরের সমস্ত শক্তি যেন এক নিমিষে শেষ হয়ে গেছে।সে তো বেলাকে অন্য একজন ছেলের সঙ্গে ফাঁসানোর পরিকল্পনা করেছিলো।কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই ফাঁদে এসে পড়েছে সায়র।তার নিজের সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষক।তানিয়ার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো।সে মনে মনে বলতে লাগলো,
— না।এটা কীভাবে হলো? সায়র স্যার এখানে এলেন কীভাবে? আমি-আমি তো এটা চাইনি।
তার কপালে ছোট ছোট ঘামের বিন্দু জমে উঠলো। প্রথমবারের মতো নিজের সাজানো ষড়যন্ত্রকেই ভয় পেতে শুরু করলো সে।এদিকে করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষেরা আর নিজেদের আটকে রাখতে পারলো না।একজন আরেকজনের কানে কানে কথা বলতে শুরু করলো।
— ব্যাপারটা তো খুব খারাপ দেখাচ্ছে।
— স্যার আর ছাত্রী একই ঘরে!
—কিন্তু স্যারকে তো এমন মানুষ মনে হয় না। কে জানে, সত্যিটা কী!
একজন শিক্ষক সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
— আগে পুরো ঘটনা না জেনে কেউ কোনো মন্তব্য করবেন না।
কিন্তু ভিড়ের মধ্যে সবাই সেই কথা শোনার মতো অবস্থায় ছিলো না।অনেকে নিজেদের মতো করে গল্প বানাতে শুরু করলো।কেউ বললো,
— আজকাল গুজব খুব দ্রুত ছড়ায়, তাই না জেনে কিছু বলা উচিত নয়।
আবার কেউ নিচু গলায় সন্দেহ প্রকাশ করলো,
— তবু এমন পরিস্থিতি দেখে মানুষ তো প্রশ্ন করবেই।
এই চাপা কথাগুলোই বেলার কানে একের পর এক এসে আ’ঘাত করতে লাগলো।সে কাঁপা গলায় বলার চেষ্টা করলো,
— বিশ্বাস করুন আমরা…
কিন্তু গলাটা যেন আটকে গেলো।কোনো শব্দ বের হলো না।চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু আর ধরে রাখতে পারলো না সে।টপ টপ করে অশ্রুবিন্দুগুলো গড়িয়ে পড়তে লাগলো তার গাল বেয়ে।সে অসহায় চোখে চারপাশে তাকালো।এতগুলো পরিচিত মুখ।এতগুলো প্রশ্নভরা দৃষ্টি।কিন্তু একজনও তার মনের ভয়, অপমান আর অসহায়ত্বটা বুঝতে পারছে না।হঠাৎ সে মুখে আঁচল চেপে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।তার কান্নার শব্দে কয়েকজন শিক্ষকের মুখও ভারী হয়ে উঠলো।তারা জানে বেলা এইসব অনৈতিক কাজ করার মেয়ে নয়। আর সায়রকে তো খুব ভালো করে চেনে এতো নম্র ভদ্র ছেলে কিনা এইসব কাজ করবে?
ঠিক তখনই সায়র সামনে এগিয়ে এলো।নিজেকে যতটা সম্ভব শান্ত রেখে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
—সবাই দয়া করে শান্ত হোন।
চারপাশের গুঞ্জন কিছুটা থেমে গেলো।সায়র এবার বললো,
—আপনারা যেটা ভাবছেন, বাস্তবে তার কিছুই ঘটেনি। বেলা এই কক্ষে কেউ ডেকেছিলো আমার নাম করে। আমি ওকে খুঁজতে এসে বিষয়টা বুঝতে পারি। আমি রুমের ভেতরে প্রবেশ করতেই। বাইরে থেকে কেউ লক করে দিয়েছে দরজাটা। আমরা অনেক ডাকাডাকি করেছি দরজাটা খুলার জন্য। কিন্তু ঠিক সেই সময় আপনারা সবাই এখানে এসে হাজির হয়েছেন।
সায়র প্রিন্সিপালের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—স্যার, আমি এই প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষক। আমি কখনো এমন কোনো কাজ করবো না, যাতে এই কলেজের সম্মান ন’ষ্ট হয়। বিষয়টি স্পষ্টতই পরিকল্পিত। কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
অধ্যক্ষ কিছুক্ষণ নীরবে সায়রের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা বলছিলো, তাড়াহুড়ো করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।সায়রকে সে অনেক বছর ধরে চেনে।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক শান্ত গলায় বললেন,
— আমি মনে করি, আগে পুরো বিষয়টি তদন্ত করা দরকার।
আরেকজন শিক্ষকও সম্মতি জানিয়ে বললেন,
—সত্যটা জানা ছাড়া কাউকে দোষী বলা ঠিক হবে না।
প্রিন্সিপাল ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।
— ঠিক বলেছেন। সত্য উদ্ঘাটনের আগ পর্যন্ত কেউ কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাবো না।
প্রিন্সিপালের সম্পূর্ণ কথা শেষ হওয়ার পরও করিডোরের পরিবেশ মোটেও শান্ত হলো না। বরং কয়েক মুহূর্তের নীরবতার পর আবারও চারদিকে চাপা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলো। প্রথমে দু-একজন নিচু স্বরে নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলো। তারপর সেই ফিসফিসানি ধীরে ধীরে একদল থেকে আরেকদলে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। কেউ নিশ্চিত কিছু জানে না, অথচ প্রত্যেকের মুখে যেন আলাদা আলাদা গল্প।আর সেই অসংখ্য দৃষ্টি, ফিসফিসানি আর অকারণ সন্দেহের ভারে বেলা যেন ভেতর থেকে ভেঙে পড়তে লাগলো। তার কাছে মনে হলো, এই কয়েকটি মুহূর্ত যেন একটি দীর্ঘ, অসহনীয় সময়ে পরিণত হয়েছে।যেখানে নিজের নির্দোষতার চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে মানুষের ভুল ধারণা আর গুজব। তারা বলছে,
—আমি তো এমনটা কখনো ভাবিনি। এতদিন তো সবাই সায়র স্যারকে খুব সম্মান করতো। ব্যাপারটা যদি সত্যি না-ও হয়, মানুষ কি আর এত সহজে বিশ্বাস করবে? একটা গুজব ছড়াতে সময় লাগে না, কিন্তু সেটা মুছে যেতে অনেক সময় লেগে যায়।
—এই সমাজে সত্য জানার আগেই মানুষ বিচার করে ফেলে। পরে সত্য প্রকাশ পেলেও সেই প্রথম অপবাদটাই মানুষের মনে থেকে যায়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত কয়েকজন অভিভাবকও নিজেদের মধ্যে নিচু গলায় আলোচনা শুরু করলেন। কারও মুখে বিস্ময়, কারও মুখে হতাশা, আবার কারও চোখেমুখে স্পষ্ট সন্দেহের ছাপ।
একজন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—সমাজ খুব কঠিন। সত্য জানার আগেই মানুষের বিচারের রায় দিয়ে দেয়।
আরেকজন তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন,
—আজ যা রটবে, কাল সেটাই সত্যি বলে সবাই ছড়াবে।
আরও একজন আক্ষেপের সুরে বললেন,
—একটা মেয়ের নামে এ ধরনের অপবাদ একবার সমাজে ছড়িয়ে পড়লে, সেই অপবাদের দা’গ আর সহজে মুছে যায় না। সত্য-মিথ্যা যাচাই করার প্রয়োজন কেউ অনুভব করে না। বরং মুখে মুখে গল্পের সঙ্গে নতুন নতুন কথা যোগ হতে থাকে। একসময় সেই মিথ্যাই সবার কাছে সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। অথচ কেউ একবারও ভাবে না, এসব ভিত্তিহীন কথার ভার নিয়ে একটি মেয়েকে প্রতিদিন কতটা মানসিক য’ন্ত্রণা সহ্য করতে হয়।
তিনি বেলার দিকে তাকিয়ে আবার বললেন,
—আহারে! এত শান্ত, ভদ্র আর সুন্দর একটা মেয়ের কপালে শেষ পর্যন্ত এমন ভয়ংকর বদনামই জুটলো! যে মেয়েটা হয়তো নিজের সম্মান নিয়েই সবচেয়ে বেশি সচেতন ছিলো, আজ তাকেই সবার সামনে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। চারদিকে শুধু ফিসফাস, কটাক্ষ আর আঙুল তোলা। কেউ সত্য জানার চেষ্টা করছে না, বরং সবাই যেন বিচারকের আসনে বসে গেছে।
একজন গার্ডিয়ান ঠোঁট বাঁকিয়ে ব্যঙ্গের সুরে বললেন,
—ইস! দেখতে তো একেবারে ভদ্র ছিলো, আসল রূপটা আজ বের হলো! এখন এই মেয়েকে বিয়ে করবে কে? বাপ-মায়ের নাম ডুবিয়ে দিলো। এরা কলেজে পড়াশোনা করতে আসে, নাকি ন’ষ্টামি করতে আসে, আমি বুঝি না!
তার কথা শেষ হতেই চারপাশে মুহূর্তের মধ্যে আরও নানা ধরনের মন্তব্য ছড়িয়ে পড়লো। কেউ আফসোস করে দীর্ঘশ্বাস ফেললো, কেউ ব্যঙ্গ করে হাসলো, আবার কেউ সীমা ছাড়িয়ে বেলার বাবা-মা ও পুরো পরিবারকে নিয়েও কটূক্তি করতে শুরু করলো।
—মেয়ে এমন হলে বুঝতে হবে পরিবারও তেমনই!বাবা-মা নিশ্চয়ই ঠিকমতো মানুষ করতে পারেনি।এইসব মেয়েদের কারণেই সমাজের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।
একজনের পর একজন বিষাক্ত মন্তব্য ছুড়ে দিতে লাগলো। সত্য-মিথ্যা যাচাই না করেই সবাই যেন বেলাকে আর তার পরিবারকে অপমান করতেই ব্যস্ত হয়ে উঠলো। কারও মুখে সহানুভূতির চেয়ে কৌতূহল বেশি, কারও চোখে করুণার চেয়ে অবজ্ঞা বেশি।
এই কথাগুলো যেন একটার পর একটা ধারালো তীর হয়ে এসে বিঁধতে লাগল বেলার হৃদয়ে।সে দুহাতে নিজের আঁচল শক্ত করে চেপে ধরলো। তার চোখের পানি থামার নামই নিচ্ছে না। ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু কোনো উত্তর দেওয়ার শক্তি নেই। মনে হচ্ছে চারপাশের শত শত মানুষের দৃষ্টি একসঙ্গে তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে প্রশ্ন করছে।বেলা মাথা নিচু করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো। অপমান, ভয়, লজ্জা আর অসহায়ত্ব মিলেমিশে তার পুরো শরীর কাঁপছে।
তার সেই কান্না দেখে কয়েকজন ছাত্রীও অস্বস্তিতে পড়ে গেলো। তারা বুঝতে পারছিলো, পুরো ঘটনা না জেনেই পরিস্থিতি ভয়াবহ দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু গুজবের স্বভাবই যেন এমন । একবার কোনো কথা ছড়াতে শুরু করলে তাকে থামানো সবচেয়ে কঠিন হয়ে যায়।
করিডোরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে একই আলোচনা ঘুরে বেড়াতে লাগলো।
বেলার চোখের পানি যেন থামার নামই নিচ্ছিল না।এই দৃশ্য দেখে এতক্ষণ নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা করা সায়রের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলো।তিনি ধীরে ধীরে এক পা সামনে এগিয়ে এলেন। তাঁর চোখেমুখে কঠোরতা স্পষ্ট। চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। গভীর অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
—যথেষ্ট হয়েছে।
মাত্র দুটি শব্দ।কিন্তু সেই দুটি শব্দেই পুরো করিডোর মুহূর্তের মধ্যে নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। সবাই একসঙ্গে সায়রের দিকে তাকিয়ে রইলো।
সায়র চারপাশে ধীরে ধীরে দৃষ্টি বুলিয়ে বললেন,
—আপনারা সবাই শিক্ষিত মানুষ। অথচ একজন মানুষের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ ছাড়াই শুধু অনুমান আর গুজবের ভিত্তিতে তাকে দোষী বানিয়ে দিচ্ছেন। এটা কোনো ন্যায়বিচার নয়।
সে একবার বেলার দিকে তাকিয়ে আবার সবার উদ্দেশ্যে বললো,
—আমি আবারও বলছি, এখানে কোনো অনৈতিক ঘটনা ঘটেনি। বেলা এই কক্ষে আটকা পড়েছিলো। আমি তাকে খুঁজতে এসে এই পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছি। এর পেছনে পরিকল্পিত ষ’ড়যন্ত্র রয়েছে।
তাঁর কণ্ঠে এমন দৃঢ়তা ছিলো যে উপস্থিত অনেকেই মাথা নিচু করে ফেললো। কিন্তু কিছু মানুষের মুখে এখনও সন্দেহের ছাপ রয়ে গেলো।
সায়র এবার আরও দৃঢ় স্বরে বললেন,
—আর যদি কারও মনে হয়, একটা মেয়ের সম্মান নিয়ে এভাবে খেলাটা খুব সহজ, তাহলে ভুল ভাবছেন। একজন নির্দোষ মানুষের সম্মান ফিরিয়ে আনার জন্য যা যা করার প্রয়োজন, আমি তার সবই করবো। আর আপনারা যেহেতু ওর ভবিষ্যৎ নিয়ে এতটাই চিন্তিত, তাই আপনাদের সবাইকে সাক্ষী রেখে আজ,ঘোষণা করছি।আমি বেলাকে এই মুহূর্তে বিয়ে করবো।ওর শরীরের ক’লঙ্কের দাগ আমার জন্য ই যেমন লেগেছে। সেটাও মুছে দিব আমি।
সায়রের এই কথাটা যেন বি’স্ফো’রণের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো।পুরো করিডোর স্তব্ধ হয়ে গেলো।
বেলার শরীর কেঁপে উঠলো। সে বি’স্ফোরিত চোখে সায়রের দিকে তাকিয়ে রইলো। যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছে না।পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইরা দ্রুত এগিয়ে এসে বেলাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। কারণ সে বুঝতে পারছিলো, এই মুহূর্তে বেলা আর নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছে না।
চারপাশের সবাই নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলো। কেউ বিস্ময়ে হতবাক, কেউ অবিশ্বাসে স্থির, আবার কেউ ভাবতেই পারছে না।সায়র সত্যিই সবার সামনে এই ঘোষণা দিলেন।
করিডোরজুড়ে তখনও নিস্তব্ধতা।সায়রের শেষ কথাটি যেন উপস্থিত প্রত্যেক মানুষের মনে একসঙ্গে বজ্রপাতের মতো আ’ঘাত হেনেছে।
—“আমি বেলাকে বিয়ে করব।”
মাত্র একটি বাক্য। অথচ সেই একটি বাক্যই মুহূর্তের মধ্যে পুরো পরিবেশের রং বদলে দিলো। কিছুক্ষণ আগেও যেখানে গুঞ্জন, কটূক্তি আর অভিযোগে করিডোর ভারী হয়ে উঠেছিলো, সেখানে এখন নেমে এসেছে গভীর, ভারী নীরবতা। শত শত মানুষের চোখ একসঙ্গে স্থির হয়ে আছে সায়রের মুখের দিকে। যেন সবাই অপেক্ষা করছে এখন তিনি আবার কী বলবেন!
বেলা যেন নিজের শ’রীরের ওপর থেকেও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। তার মুখে কোনো ভাষা নেই। চোখের পানি থেমে গেছে, কিন্তু সেই বি’স্ফো’রিত চোখদুটো বারবার সায়রের মুখের দিকেই ফিরে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, সে এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না।কিছুক্ষণ আগেও যে মানুষটা সবার সামনে নিজের নির্দোষতা প্রমাণ করার চেষ্টা করছিলো, তিনিই এখন সবার সামনে তাকে বিয়ে করার ঘোষণা দিয়ে দিলেন!
ইরা শক্ত করে বেলার হাত চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সে বুঝতে পারছে, এই মুহূর্তে বেলা মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।
এদিকে অধ্যক্ষ মোস্তাফিজুর রহমান দীর্ঘক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে অসংখ্য জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে, কিন্তু এমন ঘটনার সাক্ষী তিনি আগে কখনও হননি। কিছুক্ষণ পর ধীর পায়ে সায়রের সামনে এসে দাঁড়িয়ে গভীর দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকালেন।কয়েক সেকেন্ড নীরব থাকার পর গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
—সায়র, তুমি কি সম্পূর্ণ সুস্থ মস্তিষ্কে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছো? নাকি পরিস্থিতির চাপে আবেগপ্রবণ বা রাগে হয়ে এমন কথা বলছো?
সায়র এক মুহূর্তও সময় নিলো না।তিনি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিলো,
—জি, স্যার। আমি সম্পূর্ণ সচেতন অবস্থায় এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি আমার প্রতিটি কথার দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত।
প্রিন্সিপাল আবার বললেন,
—একটা মেয়ের সম্মান রক্ষা করা অবশ্যই একজন ভদ্র মানুষের দায়িত্ব। কিন্তু সম্মান রক্ষার অনেক পথ আছে। বিয়ে জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত। রাগ, অপমান কিংবা আবেগের বশে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। আজ তুমি যা বলছ, কাল যদি তার জন্য অনুশোচনা হয়?
সায়রের চোখে কঠোরতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠলো,
—স্যার, আমি কখনো রাগের মাথায় সিদ্ধান্ত নিই না। আর একটা কথা আমি খুব ভালো করেই জানি আজ যদি আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকি, তাহলে কাল এই কলেজের প্রতিটি করিডোরে, প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে, এমনকি এই শহরের প্রতিটি অলিতে-গলিতেও বেলার চরিত্র নিয়ে আঙুল তুলবে। মানুষ প্রমাণ চাইবে না, সত্য জানবে না।শুধু অপবাদটাই ছড়িয়ে বেড়াবে। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একজন নির্দোষ মেয়ের জীবন ধ্বংস হতে দেখতে পারবো না।আমি ওর ভবিষ্যৎ ন’ষ্ট হতে দিতে পারিনা ।
তাঁর কণ্ঠের দৃঢ়তা উপস্থিত প্রত্যেক মানুষকে স্তব্ধ করে দিলো।একজন শিক্ষক ধীরে ধীরে বললেন,
—সায়র, বিষয়টা আরেকবার ভেবে দেখো। তুমি বেলাকে বিয়ে করলেই যে সব সমাধান হবে তার ও নিশ্চয়তা নেই।
সায়র শান্ত অথচ অটল কণ্ঠে উত্তর দিলেন,
—ভাবার সময় আমি পেরিয়ে এসেছি, স্যার। এখন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সময়।
এই কথাটা শোনার পর আবারও চারদিকে চাপা গুঞ্জন শুরু হয়ে গেলো।
—উনি সত্যিই বিয়ে করবেন!এত বড় সিদ্ধান্ত!এভাবে এখনই কলেজে বিয়ে হবে নাকি?
প্রিন্সিপাল একবার চারপাশে তাকিয়ে সবাইকে চুপ থাকার ইশারা করলেন। কলেজের সম্মান র’ক্ষাতে সে সায়রের কথাই মেনে নিলো। তারপর অফিস সহকারীকে ডাকলেন।
—রবিউল!
—জি, স্যার।
—অবিলম্বে একজন কাজীর সঙ্গে যোগাযোগ করো। তাঁকে বলো, কলেজে জরুরি ভিত্তিতে আসতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব যেন পৌঁছে যান।
অফিস সহকারী বিস্ময়ে কিছুক্ষণ সায়র আর অধ্যক্ষের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর মাথা নেড়ে দ্রুত অফিসের দিকে চলে গেলো।
সায়র এবার নিজেই সামনে এগিয়ে এলেন।
—স্যার, আর একটা অনুরোধ আছে।
—বলো।
—আমার বাবা সারোয়ার খানকে খবর দেওয়া হোক। তাঁকে দ্রুত কলেজে আসতে বলুন।
একটু থেমে আবার বললেন,
—আর বেলার বাবা । আমার চাচা বাশার খানকেও খবর দিন। মেয়ের অভিভাবক হিসেবে তাঁর উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
অধ্যক্ষ কয়েক মুহূর্ত সায়রের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন, ছেলেটা শুধু মুখের কথা বলছে না।সে সত্যিই নিজের সিদ্ধান্ত বাস্তবে রূপ দিতে প্রস্তুত।তিনি অফিসের আরেকজন কর্মচারীকে ডেকে বললেন,
—অবিলম্বে সারোয়ার খান সাহেব আর বাশার খান সাহেবকে ফোন করো। বলবে, বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি। তাঁরা যেন যত দ্রুত সম্ভব কলেজে চলে আসেন।
—জি, স্যার।
কর্মচারী দ্রুত সেখান থেকে চলে গেলো।এই দৃশ্য দেখে উপস্থিত মানুষের বিস্ময় যেন আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেলো।
—তাহলে কি সত্যিই বিয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে কলেজেই?এমন ঘটনা তো কোনোদিন শুনিনি!
কেউ অবিশ্বাসে মাথা নাড়ছে, কেউ আবার মোবাইল বের করে পরিচিতজনকে ফোনে ঘটনাটা বলতে শুরু করেছে। কেউ কেউ লুকিয়ে লুকিয়ে সম্পূর্ণ ঘটনা ভিডিও করছে।
অন্যদিকে বেলা যেন এখনও বাস্তবে ফিরতে পারছে না।সে ধীরে ধীরে মাথা তুললো।চোখদুটো লাল হয়ে গেছে। কান্নার কারণে কণ্ঠও ভারী হয়ে এসেছে।অনেক কষ্টে সে বললো,
—স্যার আপনি ..আপনি কী করছেন?
সায়র কোনো উত্তর দিলেন না।বেলা আবার বললো,
—আপনি রাগের মাথায় এমন একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। আমার জন্য আপনার জীবন ন’ষ্ট করবেন না। মানুষ আমাকে নিয়ে যা খুশি বলুক, আমি সব সহ্য করবো। কিন্তু আপনার ভবিষ্যৎ,আপনার সম্মান, এতে আরো নষ্ট হবে আমাকে বিয়ে করলে।
কথাগুলো বলতে বলতেই তার গলা ভেঙে গেলো।সে আবার বললো,
—দয়া করে এই সিদ্ধান্ত বদলে ফেলুন।আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই না।
চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই নিঃশব্দে তাদের কথোপকথন শুনছিলো।সায়র ধীরে ধীরে বেলার দিকে এগিয়ে এলো তাঁর চোখে তখন অদ্ভুত এক দৃঢ়তা।গভীর কণ্ঠে বললো,
—শুনে রাখ বেলা আমি জীবনে কখনো আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নিইনি। আজও নিইনি। আর একবার যে সিদ্ধান্ত আমি নিয়ে ফেলি, পৃথিবীর কোনো শক্তিই আমাকে সেই সিদ্ধান্ত থেকে একচুলও সরাতে পারে না।
সে আরও দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
—আজ শুধু তোমার সম্মানের প্রশ্ন নয়, আমার নীতিরও প্রশ্ন। শুধু তোর নয় । তোর সঙ্গে সঙ্গে আমার চরিত্রের দিকেও আঙুল তুলছে।
সায়রের প্রতিটি শব্দ যেন করিডোরের দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো। বেলা আর কোনো কথা বলতে পারলো না।সে শুধু নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।আর সবচেয়ে বড় বিষয়, সায়র যে জেদ করে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বেলা এখন হান্ড্রেট পার্সেন্ট সিউর।
তার মনে হচ্ছিলো, কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার পুরো জীবন যেন অচেনা এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে।কিছুক্ষণ আগেও সে শুধু নিজের নির্দোষতা প্রমাণ করতে চেয়েছিলো।আর এখন কলেজে কাজী আসছেন।তার বাবা বাশার খান আসছেন। তার চাচা সারোয়ার খানো আসছেন।
আর উপস্থিত শত শত মানুষ অপেক্ষা করছে।আজ, এই কলেজ প্রাঙ্গণে হয়তো এমন একটি সিদ্ধান্তের সাক্ষী হতে, যা তাদের জীবনের গতিপথ চিরদিনের জন্য বদলে দেবে।বেলা শুধু নির্বাক চোখে সায়রের দিকে তাকিয়ে রইলো।
রইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ২১
তার কাছে সবকিছু যেন অবিশ্বাস্য এক স্বপ্নের মতো লাগছে । একটি এমন স্বপ্ন, যার শেষ কোথায়, সে নিজেও জানে না। কিন্তু বেলা ও তার কথায় অটল। সে কোনো ভাবেই সায়রকে বিয়ে করবে না।
