Home র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ২৩

র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ২৩

র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ২৩
ইয়ুশরা রিমু

পুরো কলেজজুড়ে যেন এক অদৃশ্য ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
একদিকে করিডোরে দাঁড়িয়ে শত শত মানুষের গুঞ্জন, অন্যদিকে কলেজ অফিসে একের পর এক ফোন করা হচ্ছে। পরিবেশ এতটাই অস্বাভাবিক যে, স্বাভাবিকভাবে নিঃশ্বাস নেওয়াটাও যেন কঠিন হয়ে উঠেছে।
বেলা এখনও নির্বাক দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখের কোণে শুকিয়ে যাওয়া অশ্রুর রেখাগুলো স্পষ্ট। বুকের ভেতরটা কাঁপছে। বারবার মনে হচ্ছে, এ যেন তার জীবন নয়, অন্য কারও জীবনের কোনো দুঃস্বপ্ন সে সামনে দাঁড়িয়ে দেখছে।
হঠাৎ,প্রিন্সিপালের অফিসের একজন কর্মচারী দ্রুত হেঁটে এসে বললো,

—স্যার, সারোয়ার খান সাহেবের সঙ্গে কথা হয়েছে। উনি রওনা দিয়েছেন। আর বাশার খান সাহেবও আসছেন। দু’জনই বলেছেন, যত দ্রুত সম্ভব কলেজে পৌঁছাবেন।
অধ্যক্ষ ধীরে মাথা নাড়লেন।
—ঠিক আছে।
কয়েক মুহূর্ত পর আরেকজন কর্মচারী এসে জানালো,
—স্যার, কাজী সাহেবের সঙ্গেও কথা হয়েছে। তিনি প্রায় বিশ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাবেন।
এই একটি বাক্য আবারও চারদিকে বিস্ময়ের ঢেউ তুললো।
—সত্যিই তাহলে বিয়ে হবে?
—-এটা কি সম্ভব?কলেজে এমন ঘটনা কোনোদিন শুনিনি!
পুরো কলেজে এখন আর কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের অপেক্ষায় নেই। যেন সবাই অপেক্ষা করছে একটি সিদ্ধান্তের।
এদিকে তানিয়ার শরীর ঠান্ডা হয়ে আসছে।তার চোখে-মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট।সে একবার সায়রের দিকে তাকায়, একবার বেলার দিকে। তারপর কাঁপা হাতে নিজের ওড়নার কোণা চেপে ধরে।মনের ভেতর একটাই কথা ঘুরপাক খাচ্ছে,

— সে কী করলাম এটা!সে শুধু চেয়েছিল বেলাকে অপমানিত করতে।চেয়েছিল সায়রের চোখে বেলাকে ছোট করে দিতে।কিন্তু তার সাজানো ষড়যন্ত্রে আজ সায়র নিজেই বেলাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন!তানিয়ার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো।
ঠিক তখনই কলেজের প্রধান ফটকের সামনে পরপর দুটি বিলাসবহুল গাড়ি এসে থামলো।
গাড়ি দুটি থেকে দ্রুত নেমে এলেন সারোয়ার খান এবং বাশার খান। দু’জনের পরনেই এখনও অফিসের ফরমাল পোশাক। কয়েক মিনিট আগেও তাঁরা নিজ নিজ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত ছিলেন। হঠাৎ কলেজ থেকে আসা জরুরি ফোন পেয়ে সবকিছু ফেলে তড়িঘড়ি করে চলে এসেছেন।
কলেজের করিডোরে এত মানুষের ভিড় দেখে দু’জনেই বিস্মিত হয়ে গেলেন।বাশার খানের বুকের ভেতরটা অকারণেই ধক করে উঠলো।মনে এক অজানা আশঙ্কা।
তিনি দ্রুত ভিড়ের ভেতর দিয়ে সামনে এগিয়ে গেলেন।
পরের মুহূর্তেই তাঁর চোখ পড়লো বেলার ওপর।মেয়েটার চোখ কান্নায় ফুলে লাল হয়ে আছে। মুখটা সম্পূর্ণ ফ্যাকাশে। দু’হাত দিয়ে আঁচল শক্ত করে চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। পুরো শরীরটা থরথর করে কাঁপছে।সেই দৃশ্য দেখেই বাশার খানের বুকটা যেন মোচড় দিয়ে উঠলো।তিনি আর এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। প্রায় দৌড়ে গিয়ে মেয়ের সামনে দাঁড়ালেন।

—বেলা…!
কাঁপা কণ্ঠে ডেকে দু’হাতে মেয়ের মুখটা তুলে ধরলেন তিনি,
—মা কী হয়েছে? কে তোকে কি বলেছে? কথা বল, মা!
বাবার কণ্ঠ শুনেই বেলা আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলো না।
—আ আব্বু।
এই একটি শব্দ উচ্চারণ করেই সে বাবার বুকে মুখ লুকিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো।বাশার খান শক্ত করে মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন।
—কাঁদিস না, মা। আমি এসে গেছি। আমি থাকতে তোকে কেউ কষ্ট দিতে পারবে না। আগে আমাকে বল, কী হয়েছে?

কিন্তু বেলা কোনো উত্তর দিতে পারলো না। সে শুধু বাবাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেই চললো।এই দৃশ্য দেখে চারপাশে উপস্থিত অনেকেরই বুক ভারী হয়ে উঠলো।অন্যদিকে সারোয়ার খান গভীর দৃষ্টিতে পুরো ঘটনাটা পর্যবেক্ষণ করছিলেন। ছেলের মুখের গাম্ভীর্য আর বেলার অসহায় মুখখানি তাঁর চোখ এড়ালো না।তিনি ধীরে ধীরে অধ্যক্ষ মোস্তাফিজুর রহমানের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
—স্যার, ফোনে শুধু বলেছিলেন জরুরি বিষয়। কী হয়েছে, দয়া করে আমাদের সব খুলে বলুন।
অধ্যক্ষ মোস্তাফিজুর রহমান কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর মুখের গাম্ভীর্য আরও বেড়ে গেছে। উপস্থিত শত শত মানুষের সামনে তিনি কোনো তাড়াহুড়ো করে কিছু বলতে চাইলেন না।তিনি ধীরে ধীরে বাশার খান ও সারোয়ার খানের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—আপনারা দু’জন দয়া করে শান্ত থাকুন। আমি শুরু থেকে পুরো ঘটনাটা বলছি।
বাশার খান তখনও এক হাতে বেলাকে আগলে রেখেছেন। মেয়ের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু তাঁর চোখেমুখে স্পষ্ট উদ্বেগ।

—স্যার, আগে শুধু এটুকু বলুন আমার মেয়েকে কে কি বলেছে।
অধ্যক্ষ শান্ত গলায় বললেন,
— আপনার মেয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ আছে বাশার সাহেব। চিন্তার করবেন না।
এই কথাটা শুনে বাশার খান কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও বুকের ভেতরের অস্থিরতা একটুও কমলো না।
তিনি আবার বললেন,
—তাহলে ও এভাবে কাঁদছে কেন? কী হয়েছে ওর সঙ্গে?
অধ্যক্ষ একবার সায়রের দিকে তাকালেন। তারপর ধীরে ধীরে পুরো ঘটনাটা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বলতে শুরু করলেন। কীভাবে বেলাকে সায়রের নাম করে ওই কক্ষে ডাকা হয়েছিলো, কীভাবে সায়র সেখানে গিয়ে ভেতরে আটকা পড়েছিলো, তারপর দরজা খুলতেই সবাই কী দেখেছে একটাও ঘটনা বাদ দিলেন না।
সব কথা শেষ হতেই বাশার খান কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।তিনি ধীরে ধীরে মেয়ের দিকে তাকালেন।বেলার মাথা এখনও নিচু। চোখ থেকে অনবরত পানি ঝরছে।বাশার খানের বুকটা আবার মোচড় দিয়ে উঠলো।
তিনি কাঁপা হাতে মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,

—বেলা!!
বেলা ধীরে ধীরে মুখ তুললো,
—আব্বু আমি কোনো ভুল করিনি। বিশ্বাস করো, আমি কিছুই করিনি।
এই কথাটুকু বলেই সে আবার কান্নায় ভেঙে পড়লো।
বাশার খান সঙ্গে সঙ্গে মেয়েকে নিজের বুকের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন।
—চুপ। একদম চুপ। তোকে কোনো কৈফিয়ত দিতে হবে না। আমার মেয়েকে আমি চিনি। পৃথিবীর সবাই যদি তোকে ভুল বোঝে, তবুও আমি কখনো তোকে ভুল বুঝবো না।
কথাগুলো শুনে বেলা আরও জোরে কেঁদে উঠলো ।চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা অনেকের চোখও ভিজে উঠলো।
এদিকে সারোয়ার খান এতক্ষণ একদৃষ্টিতে নিজের ছেলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।অবশেষে তিনি গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

—সায়র, আমি একটা কথার উত্তর চাই।
—জি, বাবা।
—সবাই বলছে, তুমি এখানে একটি বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছো। সেটা কি সত্যি?
সায়র কোনো দ্বিধা না করেই উত্তর দিলো,
—জি। সত্যি।
—তুমি বেলাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছো?
—জি, বাবা। আর আমি আমার সিদ্ধান্ত থেকে একচুলও সরে আসবো না।
বাশার খান অনেকক্ষণ ধরে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে সায়রের মুখের ওপর। সেই মুখে কোনো দ্বিধা নেই, কোনো অস্থিরতা নেই। বরং এক অদ্ভুত দৃঢ়তা স্পষ্ট। কিন্তু তবুও একজন অভিভাবক হিসেবে তাঁর মনে অসংখ্য প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগলো।
তিনি ধীরে ধীরে এক পা সামনে এগিয়ে এলেন। গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

—সায়র ছোটবেলা থেকে তোকে নিজের ছেলের মতোই মানুষ হতে দেখেছি। তোকে আমি খুব ভালো করেই চিনি। তুই কখনো হঠাৎ করে কোনো সিদ্ধান্ত নিস না। কিন্তু আজ যা শুনলাম, সেটা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হচ্ছে। বল তো, হঠাৎ এমন একটা সিদ্ধান্ত কেন নিলি? এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একবারও আমাদের সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজন মনে হলো না?
চারপাশে তখন পিনপতন নীরবতা।উপস্থিত প্রত্যেকটি মানুষ চোখ বড় বড় করে তাদের কথোপকথন শুনছে।
সায়র কয়েক সেকেন্ড নীরবে চাচার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর শান্ত, স্থির অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললো,

—চাচ্চু, আমি জানি আপনাদের সবার মনে অনেক প্রশ্ন জমে আছে। আর সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর আপনাদের পাওয়ার অধিকারও আছে। কিন্তু এই মুহূর্তে আমি শুধু এতটুকুই বলতে পারি, আমি কোনো আবেগের বশে কিংবা কারও চাপে পড়ে এই সিদ্ধান্ত নিইনি। সবকিছু ভেবে-চিন্তেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বিস্তারিত সব কথা আমি পরে বাসায় গিয়ে আপনাদের সামনে বসে বলবো। এখন শুধু আমার ওপর বিশ্বাস রাখুন।
বাশার খান কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তাঁর চোখেমুখে স্পষ্ট দুশ্চিন্তা।
তিনি আবার বললেন,
—আমি তোকে বিশ্বাস করি, বাবা। কিন্তু শুধু আমার বিশ্বাসে তো সব হবে না। একটা পরিবারের সিদ্ধান্ত শুধু একজনের ইচ্ছায় হয় না। তোর মা মমতাজ বেগম। তিনি কি এই বিয়ে মেনে নেবেন? আমি তো তাঁকে চিনি। তিনি খুব সহজে রাজি হবেন না। বরং এই সিদ্ধান্ত শুনে হয়তো কোনো বড় ঘটনা ঘটিয়ে ফেলবে।
সায়রের চোখে বিন্দুমাত্র দ্বিধা দেখা গেলো না।সে দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিলো,

—আম্মু কী বলবেন, পরে কী হবে, কে রাজি হবে আর কে হবে না । সেসবের দায়িত্ব আমার। আমি নিজেই সব সামলাবো। কাউকে কোনো সমস্যার মধ্যে পড়তে দেবো না। কিন্তু আজ আমি আমার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবো না। কারণ আমি জানি, আমি ভুল কিছু করছি না।
সায়রের কথাগুলো এতটাই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উচ্চারিত হলো যে, উপস্থিত অনেকেই অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলো।
ঠিক তখনই সারোয়ার খান ধীর পায়ে সামনে এগিয়ে এলেন।তিনি প্রথমে ছেলের দিকে তাকালেন, তারপর বাশার খানের দিকে।
কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে শান্ত অথচ কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠে বললেন,

—বাশার, সায়রকে আমি তোমার থেকেও একটু বেশি চিনি। ওর একটা স্বভাব কোনোদিন বদলায়নি। ও কখনো রাগের মাথায় সিদ্ধান্ত নেয় না। আর যদি কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সেটা অনেক ভেবে-চিন্তেই নেয়। তাই আজও আমি বিশ্বাস করি।
একটু থেমে তিনি বেলার দিকে তাকালেন।
তারপর আবার বললেন,
—আর একটা কথা । বেলা তো আমাদের পরের কেউ নয়। ও এই আমাদের ই মেয়ে। ছোটবেলা থেকে আমার চোখের সামনেই বড় হয়েছে। কোলে পিঠে করে বড় করেছি। যদি আল্লাহর ইচ্ছায় অন্য কেউ সায়রের ব‌উ হয়ে আসে , তাহলে নতুন কেউ আসবে না । ঘরের মেয়েই ঘরে থাকবে। আমার এই বিয়েতে কোনো আপত্তি নেই।
সারোয়ার খানের কথাগুলো শুনে উপস্থিত অনেকেই বিস্ময়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকালো।বাশার খানও কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন।কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই
—না!
কাঁপা অথচ স্পষ্ট একটি কণ্ঠ পুরো করিডোরের নীরবতা ভেঙে দিল।সবাই একসঙ্গে তাকালো বেলার দিকে।
বেলা ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো। তার চোখ দুটো এখনও কান্নায় ভেজা। মুখটা ফ্যাকাশে। ঠোঁট কাঁপছে, তবুও সে নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করছে।সে মাথা নাড়তে নাড়তে বললো,

—আমি এই বিয়েতে রাজি নই।
কথাটা শুনে চারপাশে আবার চাপা গুঞ্জন শুরু হয়ে গেলো।
বেলা চোখের পানি মুছে সবার দিকে তাকালো। তারপর সায়রের দিকে দৃষ্টি স্থির করে বললো,
—সায়র ভাই, আপনি আমার সম্মান বাঁচানোর জন্য যা করতে চাইছেন, তার জন্য আমি সারাজীবন আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবো। কিন্তু তাই বলে আপনার পুরো জীবনটাই আমার জন্য বদলে যাবে, এটা আমি কোনোদিন মেনে নিতে পারবো না।
তার কণ্ঠ ভেঙে আসতে লাগলো। বেলা পুনরায় বললো,
—মানুষ আমাকে নিয়ে যা খুশি বলুক। আমাকে অপমান করুক। আমার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলুক। আমি সব সহ্য করার চেষ্টা করবো। কিন্তু আমার জন্য আপনি নিজের ভবিষ্যৎ, নিজের পরিবার, নিজের মায়ের ইচ্ছা । সবকিছুর বিরুদ্ধে চলে যান, সেটা আমি হতে দিতে পারি না।
বেলা একবার বাশার খান, একবার সারোয়ার খানের দিকে তাকিয়ে আবার বললো,

—আব্বু, চাচ্চু তোমরা দয়া করে উনাকে বুঝিয়ে বলো। আমি কোনো অবস্থাতেই এই বিয়েতে রাজি নই। আমার কারণে উনার জীবনে এত বড় একটা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার আমার নেই।
কথাগুলো শেষ করেই বেলা মাথা নিচু করে ফেললো।চোখ থেকে আবারও টপটপ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগলো।
আর সায়র,তিনি স্থির দৃষ্টিতে শুধু বেলার দিকে তাকিয়ে রইলো। তাঁর মুখের দৃঢ়তা এতটুকুও পাল্টালো না। যেন বেলার প্রতিটি আপত্তির উত্তর সে নিজের মনেই আগেই দিয়ে রেখেছেন।
বেলার দৃঢ় কণ্ঠে বলা কথাগুলো যেন চারপাশের বাতাসকেও ভারী করে তুললো।
বাশার খান ধীরে ধীরে মেয়ের সামনে এসে দাঁড়ালেন। খুব স্নেহের সঙ্গে বেলার মাথায় হাত রাখলেন।
—আমার দিকে তাকাও, মা।
বেলা ধীরে ধীরে মুখ তুললো। কান্নায় ভেজা চোখদুটো বাবার দিকে স্থির হতেই বাশার খানের বুকটা ধক করে উঠে।তিনি কাঁপা গলায় বললেন,
—বেলা, আমি তোকে কখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে জোর করিনি। আজও করবো না। শেষ সিদ্ধান্ত তোরই হবে। কিন্তু তার আগে একজন বাবা হিসেবে আমার দুটো কথা শুনবি?
বেলা কোনো কথা বললো না। শুধু নিঃশব্দে মাথা নাড়লো।
বাশার খান গভীর শ্বাস নিয়ে বললেন,

—ছোটবেলা থেকে আমি সায়রকে দেখেছি। ওকে আমি নিজের ছেলের মতোই ভালোবাসি। ছেলেটা কখনো আবেগের বশে কোনো সিদ্ধান্ত নেয় না। আজ যদি ও সবার সামনে দাঁড়িয়ে তোর দায়িত্ব নেওয়ার কথা বলে থাকে, তাহলে বিশ্বাস কর, এর পেছনে করুণা নেই । আছে দায়িত্ববোধ , সম্মান।
তিনি একটু থামলেন।চোখের কোণটা ভিজে উঠেছে তাঁরও।
—মা, আমি জানি তুই কী ভাবছিস। তুই ভাবছিস, তোর জন্য সায়রের জীবন নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস, একজন মানুষ যদি নিজের ইচ্ছায় কোনো দায়িত্ব গ্রহণ করে, তাহলে তাকে সেটা থেকে জোর করে ফিরিয়ে দেওয়াও ঠিক নয়।আর তুই আমার একমাত্র আদরের মেয়ে। তোকে অন্য বাড়িতে পাঠিয়েও আমি শান্তি পাবো না। তোকে চোখের সামনে না দেখলে আমার বুকটা খালি খালি লাগে।
বেলা ফুঁপিয়ে উঠলো।
—কিন্তু আব্বু। সবাই বলবে আমি সায়র ভাইয়ের জীবন নষ্ট করে দিয়েছি।
বাশার খান মেয়ের চোখের পানি মুছে দিয়ে বললেন,
—মানুষ আজও বলছে, কালও বলবে। মানুষের মুখ বন্ধ কখনো হবে না ।
তিনি মেয়ের দুই হাত নিজের হাতে নিয়ে বললেন,
—তুই শুধু একটা কথা বল। তোর কি সায়রের চরিত্রের ওপর বিশ্বাস আছে?
বেলা চোখ বন্ধ করে ফেললো।তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো গত কয়েক বছরের অসংখ্য স্মৃতি।সায়রের শাসন,
যত্ন,রাগ, নীরব সুরক্ষা,সবকিছু।কয়েক ফোঁটা অশ্রু আবারও গড়িয়ে পড়লো তার চোখ থেকে।অনেক কষ্টে সে ফিসফিস করে বললো,

—আছে আব্বু।
বাশার খান মৃদু স্বরে বললেন,
—তাহলে নিজের বাবার ওপরও বিশ্বাস রাখ। আমি কখনো আমার মেয়ের খারাপ চাইবো না।
বেলা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না।সে বাবাকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কেঁদে উঠলো।অনেকক্ষণ পর ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিয়ে কাঁপা গলায় বললো,
— তুমি যদি মনে করো এটাই আমার জন্য ভালো। তাহলে তাই হোক।
কথাটা শুনেই চারপাশে নিঃশব্দ বিস্ময় ছড়িয়ে পড়লো।বাশার খান মেয়ের মাথায় চুমু খেয়ে বললেন,
—আল্লাহ তোকে সুখী করুক, মা।
কিছুক্ষণ পর কাজী সাহেবের উপস্থিতিতে কলেজের একটি কক্ষে অল্প কয়েকজন সাক্ষীকে নিয়ে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলো।বাইরে তখনও শত শত মানুষ অধিক আগ্রহে অপেক্ষা করছে।ভেতরে এক অদ্ভুত নীরবতা।কাজী সাহেব প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে বেলার সম্মতি জানতে চাইলে বেলা মাথা নিচু করে বসে রইলো।তার দুই চোখ থেকে অনবরত অশ্রু ঝরছে।অনেক কষ্টে কাঁপা কণ্ঠে নিজের সম্মতি জানালো সে। কণ্ঠে কোনো আনন্দ নেই।
শুধু বুকভরা দীর্ঘশ্বাস।

আর তানিয়া যেন পাথরের মূর্তির মতো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলো। কয়েক মুহূর্ত আগেও যে মেয়েটা নিজের জয়ের হাসি দেখার অপেক্ষায় ছিলো, সেই মেয়েটাই এখন নিজের চোখের সামনেই নিজের পরাজয় দেখতে বাধ্য হলো।তার কানে বারবার ভেসে আসছে কাজীর উচ্চারিত সেই কয়েকটি শব্দ, আর সেই সঙ্গে বেলা ও সায়রের বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার ঘোষণা। প্রতিটি শব্দ যেন হাতুড়ির আ’ঘাতের মতো এসে আছড়ে পড়ছে তার বুকের ভেতর।
অন্যদিকে সায়র পুরো সময়টাতেই নিশ্চুপ।তার মুখে কোনো হাসি নেই।শুধু গভীর, স্থির এক দৃষ্টি।বারবার তার চোখ চলে যাচ্ছে বেলার দিকে।
বিয়ের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতেই বেলা আবারও ভেঙে পড়লো।ইরা তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে।বাশার খান চোখের পানি লুকানোর চেষ্টা করছেন।সারোয়ার খান দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকালেন।
আর সায়র ,সে শুধু একবার ধীরে ধীরে বেলার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললো,
—আমি জানি, আজ তুই আমাকে ঘৃণাও করতে পারিস। হয়তো মনে মনে হাজারো রাগ পুষে রাখবি তাও বুঝতে পারছি। কিন্তু কিছু করার নেই আমার। আজ এই অবস্থায় তোর সম্মান রক্ষার্থে আমাকে এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।

সন্ধ্যা নেমে এসেছে।কলেজ থেকে সবাই ধীরে ধীরে বেরিয়ে চলে যাচ্ছে।সায়র আর বেলা একই গাড়ির পেছনের সিটে পাশাপাশি বসে আছে।কিন্তু দু’জনের মাঝখানে যেন অদৃশ্য এক দূরত্ব।বেলা মাথা নিচু করে বসে আছে।চোখ দুটো এখনও লাল।মাঝে মাঝেই নীরবে চোখের পানি মুছে নিচ্ছে।গাড়ির ভেতরে একটাও কথা নেই।
সায়র জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে।তার বুকের ভেতরেও আজ এক অদ্ভুত অস্থিরতা।বিয়েটা হয়ে গেছে কিন্তু এখন সামনে আরও কঠিন একটা অধ্যায় অপেক্ষা করছে।তার মনে বারবার ভেসে উঠছে একটাই মুখ, তার মা মমতাজ বেগমের। মনে হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে,

—আম্মু তিনি কি এই বিয়ে মেনে নেবেন?
নাকি বেলাকে নিজের পুত্রবধূ হিসেবে দেখে রাগে, কষ্টে, অভিমানে এমন কিছু বলে বসবেন, যা আজকের সব অপমানের চেয়েও বেশি কষ্ট দেবে মেয়েটাকে?
এই প্রথমবার সায়রের দৃঢ় মনেও এক টু’করো উদ্বেগ জায়গা করে নিলো।সে একবার খুব আস্তে করে বেলার দিকে তাকালো।

র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ২২

বেলা তখনও নীরবে কাঁদছে।সে কিছু বলতে চেয়েও বললো না।কারণ সে জানে,আজ কোনো কথাই বেলার কান্না থামাতে পারবে না।গাড়িটা ধীরে ধীরে খান বাড়ির দিকে এগিয়ে চললো। আর সায়র-বেলা দু’জনের জীবনই নীরবে মোড় নিলো এমন এক পথে, যেখানে অপেক্ষা করছে কঠিন সম্পর্কের দায়িত্ব, অজস্র পরীক্ষা, আর এক সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায়।

র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ২৪