Home রাজনীতির রংমহল ৩ রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ১৪

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ১৪

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ১৪
সিমরান মিমি

স্পর্শীয়া রাগে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে ফোঁসফোঁস করছে। তবুও কিছু বলতে পারছে না সামনে দাঁড়ানো অমানুষ দের। সোভাম হাত চেপে ধরে তাকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে আছে। ইচ্ছে হচ্ছে এই মুহুর্তে এদের মুখ থেতলে দিতে। কিন্তু সম্ভব নয়। এরা এসেছেই এই পরিকল্পনা করে। জেনেশুনে ইচ্ছাকৃত ভাবে তাদের রাগিয়ে দিয়ে কোনোভাবে উত্তেজিত করে ফেললেই খায়েশ পূর্ণ। কিন্তু তা তো হতে দেওয়া যাবে না। সোভাম একা থাকলেও বিষয়টা পুরো ভিন্ন ছিলো। তবে এখন সঙ্গে স্পর্শীয়াও উপস্থিত। ঝামেলার সূচনা ঘটালেও ওরা সব কজন মিলে ছোঁ মারবে বোনটাকে। এতোগুলো লোকের সাথে এই অবস্থায় লড়াও অসম্ভব। অতি উত্তেজিত হয়ে এমন বোকামো কখনোই করবে না সোভাম সরদার।

সোভামের চিন্তা-ভাবনা নিছক ফেলনা নয়। তবে তাদের মূল পরিকল্পনায় হয়তো ক্ষানিকটা ভিন্নতা ছিলো। উদ্দেশ্য সরাসরি স্পর্শীয়া নয় বরং সোভাম। নিজে থেকে কোনো ভাবে গায়ে টোকা বা গালিগালাজ করলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে অসুস্থ হাত ভাঙা মাস্টারের উপর। টেনে-হিঁচড়ে দুজনকেই নিয়ে যাবে চৌরাস্তার মোড়ে। ইচ্ছামতন খায়েশ মিটিয়ে পেটাবে মাস্টারকে , বলবে অনৈতিক কাজ করছিলো মেয়ে নিয়ে। পরে যদি প্রমাণ ও হয় এ তার বোন — তবুও সমস্যা নেই। কারন হিসেবে দেখাবে, তারা যখন সন্দেহের বশে দেখতে গিয়েছিলো তখন অযথাই হামলা করেছে,গায়ে হাত দিয়েছে। শোরগোল যখন খুব বেশি হয়ে যাবে, তখনই কেটে পড়তে হবে সকলের নজর এড়িয়ে। এটাই পরিকল্পনা বাহার ভাইয়ের। এভাবেই সাজিয়ে গুছিয়ে পাঠিয়েছে সকলকে।
সোভাম শান্ত কন্ঠে সিংহের ন্যায় গর্জে উঠলো। গম্ভীর চিত্তে বললো,

– ও আমার বোন। আর এই কথাটা পরশ শিকদার এবং পাভেল শিকদার দুজনেরই জানা। রাত কম হয় নি, কোনো ঝামেলা না করে চলে যান।
তৎক্ষণাৎ বিশ্রী শব্দে এক উত্তর ভেসে এলো। কেউ একজন গলা হাঁকিয়ে বললো,
– এইসব পরশ-পাভেল নিয়া তো আমরা বইসা থাকবো না। আমাদের লাগবে প্রমাণ।
সোভাম নিশ্চিত হলো। ঘাড় ঘুরিয়ে ছেলেটির দিকে তাকালো। এই দল শিকদার দের থেকে আসেনি। তাহলে এভাবে পরশ শিকদারকে অসম্মান করে মোটেও কথা বলতো না। খুব করে হলেও পরশ ভাই উচ্চারণ করতো। স্পর্শী দ্রুত ফোন হাতে নিলো। রাগে গিজগিজ করতে করতে বললো,
– তুই একটু অপেক্ষা কর ভাইয়া, আমি পাভেলকে কল করছি। তারপর পুলিশকে কল করবো।
মুহুর্তে’ই ফোন ছিনিয়ে নিলো পূর্বের সেই ছেলেটা। বিশ্রী রকমের একটা গালি দিতে গিয়েও চুপসে গেলো। পুলিশের গাড়ির সাইরেন শোনা যাচ্ছে। কিন্তু এতো রাতে ক্লাবের আশেপাশে পুলিশ ই বা কেনো আসবে? আকস্মিক এমন ঘটনায় ছেলেগুলো একে – অপরের দিকে চাইলো। মুহুর্তে’ই ফোন বেজে উঠলো কাদেরের। বাহার ভাইয়ের কল। রুমের কোনায় গিয়ে কল রিসিভড করে চাপা আওয়াজে বললো,

– ভাই, ওরা তো শান্ত! কি করমু?
বাহার ক্ষিপ্ত কন্ঠে অশ্লীল উচ্চারণে বললো,
– কু*ত্তার বা*চ্চা! ওরা শান্ত না, তোর বাপেরা যাইতেছে ওইখানে। ওই ছেমরি কি পুলিশেরে কল দিছে?
আহাম্মক হয়ে স্পর্শীর দিকে তাকালো কাদের। পরক্ষণেই শুধরে নেওয়া গলায় বললো,
– না ভাই, ওর ফোন তো আকবরের কাছে। ফোন কিভাবে দেবে?
একটু চিন্তায় পরে গেলো বাহার। সেকেন্ড খানেক পর তাড়াহুড়ো করে বলে উঠলো,
– আচ্ছা, পরে জানা যাইবে কে পুলিশ ডাকছে। কিন্তু এখন তোরা বাইর হ!
কাদের ঘাঁবড়ে গেলো। কিঞ্চিৎ চাপা আওয়াজে আকবরের নিকট এসে বললো,
– পুলিশ আসছে। বাহার ভাই এখনি যাইতে বলছে।
মিনিটের মধ্যেই সকলে হনহন করে ফাঁকা করলো রুম। যাওয়ার পূর্বে আকবরের হাত থেকে স্পর্শীয়ার ফোন টা টেনে নিয়ে গেলো সোভাম। ক্ষুদ্ধ চোখে সোভামের দিকে তাকিয়ে ‘পরে দেখে নেবে’ ইঙ্গিত টুকু করে গেলো আকবর। তবে পাত্তা দিলো না সোভাম। ঘর ফাঁকা হওয়ার পর বসে পড়লো খাটে। বাড়িওয়ালা হাঁপিয়ে উঠেছেন। শঙ্কিত চোখে তাকাচ্ছেন এদিক-ওদিক। সোভাম শান্ত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালো। সে জানে দোষ বাড়িওয়ালার নয়। তবুও ক্ষোভ কমলো না। রীতিমতো চেঁচিয়ে বলে উঠলো,

– আপনি জানতেন না ও আমার বোন? ফ্লাটে আনার আগে পরিচয় করে আনি নি আমি? তারপরেও এই মাঝ রাতে এতোগুলো ছেলে নিয়ে কোন সাহসে ফ্লাটে এসেছেন? আপনার ফ্লাটের জন্য নতুন ভাড়াটিয়া খুঁজুন। আমি এই মুহুর্তে বাসা ছেড়ে দিচ্ছি।
বৃদ্ধ লোকটি একটু আফসোস করলেন। মলিন কন্ঠে বললেন,
– আমার আর কিইবা করার ছিলো বাবা? আজকাল ক্ষমতা সব ছেলেপুলেদের হাতে। বোঝাইলে কি বুঝে? বরং হুমকি-ধমকি দেয়। ওদের কথা অনুযায়ী চললে আমি কি এই সদরে থাকতে পারবো?
বৃদ্ধের কথা শুনে ফোঁসফোঁস করে উঠলো সোভাম। কাদেরের বলা ‘বাহার ভাই’ নামটা সে শুনেছে। এই বাহার নামক মোটাসোটা ভয়ংকর সন্ত্রাসী লোকটা যে শামসুল সরদারের ডান হাত, সে ব্যাপারে সম্পুর্ন জ্ঞাত সে। ছেলেগুলো সরদার দের। তাহলে কি শামসুল সরদার পাঠিয়েছে? ঘৃণায় বিষিয়ে উঠলো শরীর। ভেতরটা গুরুতর ভাবে জখম হচ্ছে। জন্মদাতা, বাবা নামক শব্দটা যতটাও প্রিয় ছিলো তাও ধীরে ধীরে ঘৃণায় পরিণত হচ্ছে। এরকম নোংরা, জঘন্য একটা খেলা খেলতে কি শামসুল সরদারের একবারও বাঁধেনি? কষ্টে, যন্ত্রণায়, ঘৃণায় চোখ ফেঁটে পানি বের হয়ে গেলো সোভামের। স্পর্শীর অগোচরে তা মুছে বোনের দিকে তাকালো। সে বিমুর্ষ হয়ে বসে আছে। যেনো পূর্বের ঘৃণ্য ঘটনাটুকুই এখনো সরাতে পারে নি মস্তিষ্ক থেকে। সোভাম মলিন কন্ঠে তাকে ডাকলো।

-চড়ুই?
– হু।
অন্যমনস্ক হয়ে উত্তর দিয়ে স্পর্শী। পরক্ষণেই ফোন হাতে নিয়ে পাভেলের নম্বরে কল করতে চাইলো। ঘৃণার সহিত বললো,
– এতো বড় নোংরা একটা ঘটনা ঘটিয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করবো ওই পরশ শিকদার কে। এতো জঘন্য মানুষ হয়!
সোভাম বাঁধ সাধলো। ধরে যাওয়া গলায় উত্তর দিলো,
– ওরা শামসুল সরদারের লোক।
স্পর্শী অবাক হতে গিয়েও ভুলে গেলো। শামসুল সরদার নামটা শোনা মাত্রই থমকে গেলো। এটা তার সবথেকে প্রিয়জনের নাম, বাবার নাম। যিনি দীর্ঘ বাইশ বছর পূর্বে মারা গেছেন। আজ অবধি এই নামের লোকগুলোর প্রতি তার আলাদাই টান, মায়া কাজ করতো। কিন্তু এবার….. এবার কেনো এতোটা কষ্ট হচ্ছে। বাবার নামের মানুষেরা সবাই কেনো বাবার মতো হয় না?
বাড়িওয়ালা চলে গেছেন খানিকক্ষণ পূর্বে। পুরো রুম জুড়ে এখন নিস্তব্ধতা। দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে দীর্ঘশ্বাস। দুজন খাটের দু-প্রান্তে বসে কিছুক্ষণ পূর্বের ঘটনা ভেবে হতভম্ব, বিমূঢ়। ভাতের প্লেট- গ্লাস পড়ে আছে পূর্বের মতোই —অযত্নে, অবহেলায়। পেটে নেই কিঞ্চিৎ পরিমাণেও ক্ষুধা। হুট করেই সোভাম উঠে দাঁড়ালো। এতোটা অপমান সহ্য করার নয়। এরপর যে এমন বিশ্রী ঘটনা আবার ঘটবে না, তার কি নিশ্চয়তা? হাত ধুঁয়ে ফোন পকেটে ভরলো। গম্ভীর কন্ঠে স্পর্শীয়ার উদ্দেশ্যে বললো,

– সাথে আয়।
কোথায় যাবে, কেনো যাবে, কার কাছে যাবে? – এ ধরণের নানা প্রশ্ন মনের মধ্যে উদয় হলেও তা প্রকাশ করার সাহস পেলো না স্পর্শী। যেনো সে কথা বলতেই ভুলে গেছে। চুপচাপ ফ্লাটের দরজায় তালা লাগিয়ে ভাইয়ের পিছনে হাঁটলো।
সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। ঘড়ির কাঁটায় তখন সাড়ে বারোটা। এতো রাতে দোকান-পাট প্রায়শই বন্ধ। গাড়িও যে খুব একটা বেশি চলছে তা নয়। বড় বড় বাস, ট্রাক, প্রাইভেট কার ইত্যাদি চলছে নিজেদের গতিতে। হাঁটতে হাঁটতে ব্রিজের এ প্রান্তে এসে থামলো সোভাম। একজন রিকশাওয়ালাকে দেখা যাচ্ছে। এতো রাতে যে তার চাহিদা কম হবে না , সে ব্যাপারে সোভাম নিশ্চিত। তবুও এ নিয়ে ভাববার কিছু নেই। সে যাবে সরদার বাড়িতে। এক্ষুনি, এই মুহুর্তে!

শিকদার ক্লাব! তার তৃতীয় তলায় অবস্থিত নিরিবিলি ফ্লাটের সামনের বারান্দায় বসে আছে পাঞ্জাবি পরিহিত এক যুবক। নিজস্ব চেয়ারটাতে পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে। দৃষ্টি সামনের আহসান ভবনের দিকে নিবদ্ধ। হাতের অর্ধ খাওয়া সিগারেট ’টাতে পুনরায় সুখ টান দিয়ে তাচ্ছিল্যভরে হাসলো। কতটা বোকা, গর্দভ হলে এতো রাতে যুবতী বোন নিয়ে ফ্লাট ছেড়ে বের হয়। তা সোভাম সরদার কে না দেখলে বুঝতেই পারতো না। সুমন রেগে গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে চেয়ারের পাশে। এক সময় নিরবতা ভেঙে বলে উঠলো,
– ভাই, একবার বাঁচাইছেন। আর না। ওদিকে ফিরা তাকানোরও দরকার নাই আমাদের। নিজের ভালো যারা বোঝে না, তাদের পেছনে বাঁশ দিলেও বুঝে না।
পরশ মুখের ধোঁয়া টুকু সম্পুর্ণ বাতাসে নিঃসরণ করলো। নিস্তব্ধ, গুমোট পরিবেশে তুচ্ছ- তাচ্ছিল্য করে গম্ভীর কন্ঠে বললো,

– কে বললো ওদের বাঁচিয়েছি? শকুনের মতো ছিঁড়েখুঁড়ে খেয়ে ফেললেও বা আমার কি! তবে এই মুহুর্তে কিছু হলে অবশ্যই দায় আমার। এর প্রভাব নির্বাচনের উপর পড়তে সময় লাগবে না।
মাথা নাঁড়িয়ে সায় জানালো সুমন। সরল স্বীকারোক্তি দিয়ে বললো,
– হ ভাই, এইজন্যই তো আপনারে জানাইছি। আমি তো এতোগুলা মাস্ক পড়া পোলাপান দেইখা অবাক হইয়া গেছি। আগে থেকেই জানতাম, ওখানে মাস্টার থাকে। ঝামেলা যেহেতু আমাদের সাথে, তাইলে এতোরাতে ছেলেপেলে গেলে আমাদের দল থেকেই যাইবে। কিন্তু আপনার অনুমতি ছাড়া তো কেউ যাইবে না। সুজনের কাছে খবর নেওয়ার পর বুঝলাম ওরা আমাদের দলের কেউ না। তাইলে নিশ্চিত বাহারের লোক। কিছু হইলে তো দোষ আমাদেরই।

সরদার মঞ্জিল! মাঝরাতের কৃত্রিম এবং চাঁদের আলোয় শ্বেত পাথরে খচিত পুরোনো আমলের বাড়িটা একদম প্রাসাদের মতো ঠেকছে। স্পর্শীয়ার চোখ ধাঁধিয়ে গেলো বিশাল গেটের দিকে তাকিয়ে। অসস্তি নিয়ে সোভামের শার্টের হাতা চেপে ধরলো। এতক্ষণে বলে উঠলো,
– এখানে কেনো এসেছি আমরা? ভাইয়া, চল না। আমার কেমন যেনো লাগছে।
বাসা থেকে ক্রোধের বশে বের হলেও এখন নিজের কাছেই কেমন অসস্তি লাগছে সোভামের। তবে স্পর্শীর নিকট তা প্রকাশ করলো না। হাতের বাঁধন শিথিল করে জোরপায়ে এগিয়ে গেলো গেটের সামনে। দু-হাতে সর্বোচ্চ জোরে দুটো ধাক্কা মেরে চিৎকার করে উঠলো। বললো,
– গেট খুলুন। দারোয়ান কাকা……

আশ্চর্যের ব্যাপার! স্পর্শী অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো সোভামের দিকে। সে এমন ভাবে দারোয়ান কে ডেকে দরজা খুলতে বলছে, ঠিক যেনো নিজেদের বাড়ি। খানিকটা লজ্জা পেয়ে নিজেকে সংবরণ করে তাকিয়ে রইলো ভাইয়ের দিকে। হতদন্ত হয়ে ছুটে এলো দারোয়ান। সোভামের দিকে দু- পলক তাকিয়ে কিছুটা ধমকের সুরে বলে উঠলো,
– ডাকাইতের মত গেট ধাক্কান কেনো? আস্তে কথা বলা যায় না।
– এক্ষুণি গেট খুলুন।

সোভামের ক্রোধ মিশ্রিত কন্ঠে কিছুটা মিইয়ে গেলো দারোয়ান। বিরবির করতে করতে খুলে দিলো গেট। বাড়ির সদর দরজা বন্ধ। হয়তো ভেতর থেকে আটকে দিয়ে সকলেই ঘুমানোর প্রস্তুতি নিয়ে নিয়েছে। সোভাম মোবাইলে একবার সময় দেখে নিলো – বারোটা উনচল্লিশ। খুব একটা বেশিও রাত হয় নি। হলেও এসবের ধার ধারে না সে। তার ঘুম নষ্ট করে শামসুল সরদার আরামে ঘুমাবে? অসম্ভব। কয়েকবার দরজায় ধাক্কা পড়তেই সদ্য ঘুমাতে যাওয়া লোকগুলো সজাগ হয়ে উঠে বসলো। কান খাঁড়া করে শোনার চেষ্টা করলো ধাক্কার কেন্দ্র। সোনালী বেগম দ্রুত পায়ে নেমে এসে ড্রয়িং রুমের লাইট জ্বালালেন। ইতোমধ্যে খলিলুর , শামসুল সরদার, রুহান, রিহান সহ নাফিসাও ( রিহানের স্ত্রী) নেমে এলো। একে অপরের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো আগুন্তকের বিষয়ে। এতো রাতে বাড়ির দরজায় এসে কেইবা এভাবে দরজা ধাক্কাতে পারে, এ নিয়ে দ্বিধায় ভুগছে তারা।
কৌতূহলী দৃষ্টিতে দরজা খুলে তাকাতেই সোভাম কে নজরে এলো। মুহুর্তে’ই কপাল ঘুঁচিয়ে ফেললো রিহান। দরজার সামনে থেকে না সরেই জিজ্ঞেস করলো,

– কি চাই?
ভীষণ অপমানিত বোধ করলো সোভাম। মনের জোর বাড়লো প্রখর ভাবে। এটা তারও বাড়ি। কেউ কিছুতেই দরজার বাইরে দাঁড় করিয়ে এ বাড়িতে আসার জন্য প্রশ্ন করতে পারে না। একদমই পারে না। চোয়াল শক্ত করে রিহানকে তোয়াক্কা না করে হেঁটে গেলো ভেতরে। এর মধ্যে এক মুহুর্তের জন্যেও স্পর্শীর হাত ছাড়ে নি । শামসুল সরদার হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। ঘটনার কিছুই তিনি বুঝতে পারছেন না। এতো রাতে, এভাবে জোর করে বাড়িতে ঝামেলা সৃষ্টি করায় সূচালো দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো দুই ভাই-বোনের দিকে। সোফায় বসে তাকিয়ে দেখতে লাগলেন নাটক।
সোভাম স্পর্শীয়ার হাত ধরে টেনে শামসুল সরদারের সামনে এসে দাঁড়ালো। ক্রোধ নিয়ে ক্ষিপ্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

– স্পর্শীয়া যে আমার বোন, এ ব্যাপারে কি প্রমাণ চাই আপনার?
শামসুল সরদার চমকে গেলো। উত্তর দিতে পারলো না। যার দরুন আরো রেগে গেলো সোভাম। পুণরায় চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
– কথা বলছেন না কেনো? কি প্রমাণ চাই আপনার, বলুন।
– আওয়াজ নিচে। একে তো এই মাঝরাতে জোর করে বাড়িতে ঢুকেছো। তার উপর শামসুল সরদারের সামনে দাঁড়িয়ে গলার আওয়াজ উঁচুতে নিয়ে কথা বলছো। তোমার জিভ দু মিনিটের মধ্যে টেনে ছিঁড়ে ফেলতে পারি আমি, তা কি জানো?
এমন ক্রোধের সময় অহেতুক, অযাচিত হুমকিতে গায়ের রক্ত টগবগ টগবগ করে ফুটতে লাগলো সোভামের। সারা শরীর ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে গেছে। বাবা নামক এই মানুষ টাকে তীব্র ঘৃণা করে সে। প্রচন্ড আক্রোশের সহিত বললো,

– আপনি এতোটা নোংরা মানসিকতার তা ভাবতেও ঘৃণা হয় আমার। নিজের স্বার্থের জন্য কি করে পারলেন আমার বোন কে নিয়ে আমায় বাজে কথায় জড়াতে? ও যে আমার বোন, এটা কি আপনার অজানা? তাহলে কোন সাহসে নিজের পালা কুত্তাগুলোকে এই মাঝরাতে লেলিয়ে দিয়েছেন আমার পেছনে। তারা আমার ফ্লাটে গিয়ে রীতিমতো জঘন্য ভাবে অপমান করেছে আমায়, আমার বোনকে। ছিহ! কি করে পারলেন এমনটা? ছেলে- মেয়ে, স্ত্রী- সন্তান কিচ্ছু নেই আপনার? থাকলেও তাদের জন্য আমার করুণা হচ্ছে। এতোটা জঘন্য লোকের আশ্রয়ে কিভাবে বাঁচে তারা?
শামসুল সরদার আগে-পিছে কিছুই শুনতে পারলেন না, ভাবতে পারলেন না। শুধু কর্ণকুহরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে একটাই কথা। তার মতো ঘৃণ্য লোকের স্ত্রী-সন্তান থাকতে পারে না। সে স্তব্ধ চোখে তাকিয়ে দেখলো হাঁটুর বয়সী ছেলেটাকে। চিৎকার করে বলে উঠলো,
– বের হও। এই মুহুর্তে বের হও আমার বাড়ি থেকে। রিহান, বের করে দে এই অমানুষের বাচ্চাটাকে।
রিহান ক্ষিপ্ত পায়ে এগিয়ে আসলো সোভামকে ধরতে। কিন্তু গায়ে হাত দেওয়ার পূর্বেই স্পর্শী এগিয়ে গিয়ে বাঁধা দিলো। ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিয়ে বললো,

– একদম গায়ে হাত দেবেন না। আমরা চলে যাচ্ছি।
সে সোভামের হাত ধরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে টানলো। কিন্তু নাঁড়াতে পারলো না। ভাইয়ের দৃষ্টি এই মুহুর্তে শামসুল সরদারের দিকে নিবদ্ধ। সে তাচ্ছিল্য নিয়ে হাসছে। এক পর্যায়ে হেঁসে বলেই ফেললো,
– ভুল বলেন নি। আমার বাবা আসলেই একটা অমানুষ।
শামসুল সরদার ঘাঁমছে। বুকে ব্যথা বেড়েছে। ঘাঁমে ভিঁজে গেছে পাঞ্জাবি। গরমে হাঁস-ফাঁস করতে করতে সোফায় গা হেলিয়ে দিলেন। সকলে ছুঁটে আসলো সেদিকে। সোনালী দ্রুত হাতে পানি ঢাললেন। ভাশুরের মাথায় সামান্য পানি দিয়ে অস্থির চিত্তে বললেন,
– ভাইজান, আপনার কি প্রেশার বাড়ছে? নাফিসা, বাতাস করো।
প্রায় পাঁচ মিনিট ছটফট করার পর সামান্য সুস্থ হলেন শামসুল। রিহানের দিকে তাকিয়ে পরিশ্রান্ত কন্ঠে বললেন,
– বাহার রে ফোন দে।
প্রায় কয়েক বার কল করার পর ওপাশ থেকে রিসিভড করলো। নেশাক্ত গলায় এলোমেলো হয়ে বললো,

– খাইতেও দিবি না? এতো রাতে কি হইলো আবার?
– শুয়োরের বা*চ্চা! তোর বদলে একটা কুত্তা পাললেও আমার কাজ হইতো। লক্ষ লক্ষ টাকা ঢাইলা তোর মতো একটা অশিক্ষিত, জানোয়ার রাখছি আমি দলে। যার জন্য প্রতিটা পরিকল্পনা নষ্ট হয়। কে বলছিলো বা*ল পাকনামি কইরা ফ্লাটে ঢুকতে? ওরা দুইজন যে ভাই-বোন, একথা তো পরশরে ছুরি ঢোকানোর পর রাস্তার কুত্তাটাও জানে। এইটা নিয়া কোন সাহসে ঝামেলা পাকাইতে গেলি? আর গেলি তো গেলি আমার নাম কিভাবে ফাঁস হইছে?
সাময়িক বিরতি নিয়ে ক্ষিপ্ত কন্ঠে বললো,
– তোরে যেনো আগামী তিন দিনে আমার চোখের সামনে না দেখি।
বাহারের নেশা কেঁটে গেছে ইতোমধ্যে। বিছানায় উবু হয়ে বসে অনর্গল ক্ষমা চেয়ে বললো,
– চাচা, রাগ কইরেন না। আমি বুঝতে পারি নাই আপনার পরিকল্পনা। ভাবছিলাম, হুট কইরা তো মারা যায় না। কোনো কারন তো লাগবেই। তাই এইভাবে…. আর ওরা চিনলো কেমনে তাও তো বুঝতে পারতেছি না।
আর শোনার প্রয়োজন মনে করলেন না শামসুল। কল কেটে না দিয়েই ছুঁড়ে মারলেন। রাগে সারা শরীর জ্বলছে। রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনা হচ্ছে, এটা বুঝতে পেরে পূর্বেই সোনালী এবং নাফিসা চলে গেছে ঘরে। শামসুল সরদার এসব আলোচনায় বাড়ির মহিলাদের অপছন্দ করেন। কখনো আশেপাশে দেখলেও ধমক মেরে পাঠিয়ে দেন অন্যঘরে। তা ভেবেই চলে গেছেন দুই শাশুড়ী -বউমা।

রাত গভীর। ঘড়ির কাঁটায় তখন দুটো বেজে আটচল্লিশ। আর্শির ঘরের জানালা খোলা, পর্দা সরানো। সেখান থেকে চাঁদের আলো হুমড়ি খেয়ে পড়েছে ঘরের বিছানায়। সেখানে শুয়ে জ্বরে কাতরাচ্ছে ছোট্ট শরীর টা। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে অনর্গল। খানিকক্ষণ পর পর হু হু করে কেঁদে উঠে কোলবালিশ জড়িয়ে ধরছে। ছটফট করছে একটা কোমল হাতের অভাবে। নিশ্চল, নিস্তব্ধ, নিরিবিলি বারান্দাতে চেয়ারে হেলান দিয়ে নির্ঘুম বসে আছেন শামসুল সরদার। এটা আর্শির ঘরের’ই বারান্দা। তবে তিনি যে এখানে বসে আছে, সে ব্যাপারে জ্ঞাত নয় মেয়েটা। সে খানিকক্ষণ পর পর মা – মা বলে কাঁতরাচ্ছে। আর সইতে পারলেন না শামসুল সরদার। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে রুমের মধ্যে প্রবেশ করলো। মেয়ের পাশে বসে ঠান্ডা হাতটা দিয়ে কপাল ছোঁয়ালো। ভেঁজা পাপড়ি দুটো খুলে বাবাকে শিয়রের পাশে দেখে ঠোঁট বাঁকিয়ে কেঁদে ফেললো আর্শি। গরম, উত্তপ্ত হাত টা বাড়িয়ে বাবার হাত টা জড়িয়ে ধরলো। সমস্ত আবেগ, কষ্ট, বিষাদ ঢেলে দিয়ে হু হু করে কেঁদে উঠলো। বললো,

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ১৩ (২)

– আমার কি দোষ আব্বু? কেনো এতো অযত্নে, অবহেলায় রাখছো? আমার ভীষণ কষ্ট হয়।
শামসুল চেয়ে রইলো অপলকভাবে। অন্ধকারে চাঁদের আলোয় অশ্রুতে ভেঁজা চোখ দুটো চিকচিক করে উঠলো। নিরবে তাকিয়ে রইলো ওভাবেই। হাত বোলাতে লাগলেন আর্শিয়ার কপালে। বেশ কিছু সময় পর আবেগহীন কন্ঠে ভারী নিঃশ্বাস নিয়ে বললেন,
– আমিই তো অযত্নে, অবহেলায় ভুগছি। তোমার যত্ন কিভাবে নেবো?

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ১৫