রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৭
সিমরান মিমি
‘পরশ শিকদার!!’
নামটা উচ্চারণ করেই তাচ্ছিল্য নিয়ে হাসলো শামসুল সরদার। একটানা তিনবার নির্বাচনে অপ্রতিরোধ্য বিজয় অর্জন করে পিরোজপুর ৩ আসনের এমপি হয়েছেন তিনি। বিশাল রাজনৈতিক দল, জন সমর্থনে পূর্ণ ভোটার তালিকা এবং দুর্দমনীয় হিংস্র রাজনীতিবিদ নিয়ে এখনো দাপটের সাথে চলছেন তিনি। তবে প্রতিবারের তুলনায় এবারের বিরোধী পদপ্রার্থী দেখে হতাশ তিনি। বিগত নির্বাচন গুলোতে সাবেক এমপি আমজাদ শিকদার দাঁড়িয়েছিলেন তার বিপক্ষে। তবে শামসুল সরদারের মতে, একটানা তিন বার হেরে আমজাদ শিকদারের মাথা নষ্ট হয়েছে। নাহলে তার মতো এতো অভিজ্ঞ এবং জনসমর্থনে থাকা এমপির বিরুদ্ধে নিজের অল্পবয়সী ছেলেকে দাঁড় করাতো না। কতটুকুই বা বয়স হবে পরশ শিকদারের? – আটাশ বা উনত্রিশ!
রিহান সরদারের কল এখনো কাটেন নি। হাতের সিগারেটে শেষ টান দিয়ে আক্রোশের সুরে বললেন,
– কি করেছে পরশ?
রিহান সাউন্ড বক্সের আওয়াজ থেকে কিছুটা দুরত্বে সরলো।ডান হাত বাড়িয়ে ফোনের স্পিকারের উপর চেপে মুখের কাছে নিয়ে বললো,
– পরশ শিকদার কিছু করে নি কাকা। দলের ছেলেরা তোমার জয়ের অগ্রিম পার্টি করতে চেয়েছে, তাই সেসবের আয়োজন করছি।
‘জয়’ শব্দ টা শামসুল সরদারের অতি পরিচিত প্রিয় এক শব্দ। সেটা শ্রবণ হতেই গর্বে বুক ফুলে এলো। মেঝো ভাইয়ের বড় ছেলের উদ্দেশ্যে বললেন,
– তো কর, যা লাগে খলিলের কাছ থেকে নিবি।
ঠোঁট কামড়ে বাহারের দিকে চাইলো রিহান। ডান হাত উঁচিয়ে বুড়ো আঙুল তুলে সংকেত দিলো, – মিশন সাকসেসফুল! কাকা মত দিয়েছে। আর এই পার্টির নাম নিয়ে কম পক্ষে ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার পকেটে ভরা যাবে। এটা নিয়েও তারা কম খুশি নয়। বড় চাচাকে আরেকটু খুশি করতে রিহান বললো,
– পার্টি’টা আমরা শিকদারদের ক্লাবের সামনের ব্লিডিং এর ছাদে করছি। পাঁচ টা সাউন্ড বক্স এনেছি, আর সব গুলোই ওদের ক্লাবের দিকে ঘুরিয়ে রেখেছি। সারা রাত জয়গান শুনবে তোমার! কিন্তু…..
কিন্তু শব্দটা শুনতেই উঠে দাঁড়ালো শামসুল। শিকদারদের সাথে যদি,তবু,কেনো, কিন্তু থাকতে পারে না। কিন্তুর কারন জানতে চাইলে রিহান বললো,
– সাউন্ড তো অনেক। যদি কোনো সমস্যা হয়…..
– আমি দেখে নেবো।
বড় চাচার সম্মতি পেয়ে পুরো দস্তুর সাউন্ড বাড়িয়ে দিলো। এতো উচ্চ আওয়াজে আশেপাশের লোকজন অতিষ্ঠ হয়ে উঠলো। ওপাশের ক্লাবের ছেলেরা রাগে থরথর করে কাঁপছে। কিন্তু কিছু বলার জোঁ নেই। পরশ শিকদার বিকালেই বলে দিয়েছে আজকের জন্য ক্লাব ছাড়তে। যা করার প্রয়োজন তা সে ক্লাবে না থেকেই করবে। আজ কোনো ঝামেলা হবেই তা আন্দাজ করে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে।
জাকের আলী এই বিল্ডিং এর নিচ তলায় থাকেন। সাথে স্ত্রী ও এগারো মাসের বাচ্চা। সদরে বড় কসমেটিকসের দোকান, এদিকে গর্ভবতী স্ত্রীর বার বার চেক আপ ও চিকিৎসার জন্য অজপাড়াগাঁ থেকে সদরে ফ্লাট নিয়েছিলেন দুই বছর আগে। বাচ্চা আজ হাঁটতে শিখেছে প্রায়। তাও ফিরে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না। এই বিল্ডিং এর চার তলায়’ই পার্টি হচ্ছে। এতো উচ্চ আওয়াজে কান নষ্ট হওয়ার পালা। দরজা, জানালা আটকে রাখার পরেও বাচ্চাটা এই আওয়াজে ভয় পাচ্ছে। ঘুমাতেও পারছে না, ক্ষণে ক্ষণে চিৎকার মেরে উঠছে। এ যাবৎ দুইবার গিয়েছিলো উপরে। অনুরোধের সাথে সাউন্ড কমানোর কথা বলে এসেছে। কিন্তু তাও কাজ হয় নি। কিন্তু আর বসে থাকা যাচ্ছে না। শেষে বাধ্য হয়ে আবারো রওনা হলো।
হাতের যান্ত্রিক ফোন টা আবার বেজে উঠলো। শামসুল সরদার রিসিভড করে কানে নিলেন।মুহূর্তে’ই ওপাশ থেকে চাপা আওয়াজ ভেসে আসলো। রিহান বললো,
– কাকা, ক্লাবের কারোর তো আওয়াজ পাই না। তবে জাকের আলীর খুব অসুবিধা হচ্ছে। পরশু দেখলাম, পরশ শিকদারের সমাবেশে ঢুকে জোর গলায় স্লোগান দিতে। অথচ এখন নাকি শামসুল সরদারের স্লোগান শুনতে তার অসুবিধা হয়। কি করবো?
– এটা আবার আমাকে জিজ্ঞেস করতে হবে? যে শুনতে চায় না, তার শোনার শক্তিই যেনো না থাকে – সেই ব্যবস্থা কর। আর অস্ত্র নিছিস তো। ওরা কিন্তু যে কোনো সময় হামলা করতে পারে। সাবধান, সরদারের দলের একটা মরলে, শিকদারের যেনো পাঁচ টা মারতে পারিস। না হলে বাড়িতে ঢুকবি না। প্রয়োজনে কোট-কাসারিতে আরো পঞ্চাশ লাখ ঢালবো,তাও শিকদার দের সামনে নত হবি না।
কাকার নির্দেশ পেয়ে আরো হিংস্র হয়ে উঠলো রিহান। সবে এতোগুলো সিঁড়ি ডিঙিয়ে ছাদে উঠেছে জাকের। কিছু বলার পূর্বেই রিহানের ইশারা পেলো বাহার। ক্ষিপ্র গতিতে দু-পা এগিয়ে ঠাস করে থাপ্পড় মারলো জাকেরের গালের উপর। এরইমধ্যে দুজন এসে তাকে ঝাপটে ধরলো পেছন থেকে, যেনো নড়তে না পারে। বাহার স্বজোরে একটা ঘুষি মারলো নাকের উপর। দর দর করে বেরোতে লাগলো রক্তের প্রবাহ। পর পরই সেই একই গালের উপর আরো দুটো থাপ্পড় বসালো। ফলস্বরুপ কানের স্বচ্ছ পর্দা ফেটে বেরিয়ে আসলো রক্তধারা। জাকের আলী লুটিয়ে পড়লো মাটিতে। সাউনবক্সের আওয়াজে তার চিৎকার ক্ষীণ হয়ে গেলো।
সিঁড়ি দিয়ে কেউ উপরে উঠছে। ছয়/ সাত জোড়া বুটের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। উপস্থিত সবার কৌতূহল মিটিয়ে অবশেষে ছাদে উঠলো জুতার মালিকেরা। নেভী ব্লু রঙের শার্ট
পড়া স্বার্থান্বেষী পুলিশেরা হাজির। একজন বললেন,
– নির্বাচন কালীন যেখানে অতিরিক্ত মিছিল, সমাবেশ করাই বন্ধ ; এমনকি সন্ধ্যা সাত টার পর মাইকিং করাও নিষিদ্ধ করেছে সরকার। সেখানে আপনারা এই রাত এগারোটার সময়েও উচ্চশব্দে গান বাজাচ্ছেন। পুরো এলাকাবাসী বিরক্ত আপনাদের প্রতি। কি ভেবেছেন, এতে আপনাদের জনপ্রিয়তা বাড়ছে? মোটেও না। দিনশেষে ভোট সেই জনগণের হাতেই। তাই পরশ শিকদারকে জ্বালাতে এসে কতগুলো ভোট কমিয়েন না। অন্যভাবে ট্রাই করুন। এখন চলুন আমার সাথে, থানায়। এক্ষুণি যেতে হবে।
পুলিশ রিহান, বাহার সহ আরো পাঁচ জনকে গ্রেফতার করলো। কিন্তু হ্যান্ডকাফ পরালো না। এভাবেই অতিথির মতো আপ্যায়ন করে জিপে নিয়ে বসালো। ধীরে ধীরে ছাদ টা ফাঁকা হচ্ছে। গরুর মাংসের বিরিয়ানি, সাথে চিকেন রোস্ট। এছাড়া উঠতি তরুণদের জন্য পানীয়জলের ব্যবস্থা ও ছিলো। কিন্তু সেটা এখনো ছাদে আনা হয় নি।হয়তো মাঝরাতেই বের করার কথা ছিলো বাহারের। পার্টি ভন্ডুল হওয়ায় শেষে যে যার খাবার নিয়ে চলে গেলো বাড়িতে।
পাশের ছাঁদ থেকে সম্পুর্ন ঘটনাটা অবলোকন করেছে এক জোড়া চোখ। অবাক, অসস্তি, রাগ, ক্ষোভ সবকিছুরই অস্তিত্ব আছে সেই চোখে। বস্তুত উচ্চ আওয়াজে বিরক্ত হয়েই ছাদে এসেছিলো দেখতে। কিন্তু এর মধ্যেই জাকেরের করুণ দৃশ্য তাকে চমকে দিলো। কিছু বলার পূর্বেই পুলিশ হাজির। এরপরে কেমন অদ্ভুত আচরণ। সব মিলিয়ে সোভাম বিরক্ত। তবে একটা দিকে ভালোই হয়েছে। শব্দ তো আর নেই। এখন শান্তিতে ঘুমানো যাবে। কাল তার প্রথম ক্লাস।
‘আমার তো ক্লাস করতেই ভালো লাগছে না। আতাউর স্যার কে খুব মিস করছি। কেনো যে নতুন টিচার আসতে গেলো?
সোহা’র ভীষণ মন খারাপ। আতাউর স্যার তার ভীষণ প্রিয়। অথচ আজ থেকে আর তিনি ব্যাকরণ ক্লাস নিবেন না। নিবে অন্য কেউ। সোহা তো ক্লাসে মনোযোগ দিতেই পারবে না। অবশ্য এই আফসোস টা শুধু তার না। ক্লাসের অধিকাংশ স্টুডেন্টই পছন্দ করে স্যার কে। তার জায়গায় নতুন কাউকে মানতে একটু তো কষ্ট হবেই। প্রেমা নিজেও হতাশ হলো। কাল স্যারের শেষ ক্লাস ছিলো। অথচ সে উপস্থিত থাকতে পারে নি। নোট নাহয় অন্যদের থেকে নেওয়া যাবে, কিন্তু তারপরেও তো আফসোস থেকে যায়।
ক্লাসরুমের বাইরে থেকে চাপা হাসির আওয়াজ পাওয়া গেলো। সেদিকে কান পাতলো প্রেমা। কিন্তু শোনা গেলো না কিছুই। পাঁচ ছয়টা মেয়ে জড়ো হয়ে পাশের ক্লাসের দিকে উঁকি মারছে। পরক্ষণেই হেসে এসে আরেকজনের কানে কানে কিছু বলতেই তারা আবার ছুটছে অন্যদিকে। বেঞ্চ ছেড়ে সামনে এগিয়ে এলো প্রেমা। কিছুক্ষণ পূর্বে আফসোস করা তোহা নিজেই চাপাস্বরে বলে উঠলো,
– ভাই, নতুন স্যারকে দেখেছিস? কতটা স্মার্ট, আর ইয়াং! আমি তো পুরোই ফিদা। চল দেখবি….
প্রেমা কৌতুহলী হয়ে উঠলো। কিন্তু তা বান্ধবীদের সামনে প্রকাশ করলো না। বরং তাদের অগ্রাহ্য করে বেঞ্চে এসে বসলো। বলল,
– স্যার তো ক্লাসেই আসবে ঘন্টা পড়লে। এমন উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখার কি আছে?
স্যারদের প্রতি মেয়েদের এমন আচরণ স্কুল লাইফে বেশ বিরক্ত লাগতো প্রেমার। কতটা বিকৃত মানসিকতা! ভাবলেই কেমন লাগতো। কিন্তু কলেজে ওঠার পর কেনো যেনো এটাকে আর অস্বাভাবিক ভাবে দেখা হয় না। স্যারদের নিয়ে প্রেমা নিজে কোনো আলোচনা না করলেও অন্যদের আলোচনা শুনতে বেশ ভালো লাগে তার। হাসি পায়, মাঝেমধ্যে আগ্রহ বাড়ে। হয়তো বয়স বাড়ার সাথে সাথে পূর্বের ধারণা গুলোও পালটে যায়। সত্যিই তো, কত স্যার রাও তো স্টুডেন্টদের বিয়ে করে, তখন তো বিষয়টা খারাপ ভাবে দেখা হয় না। যদিও এগুলো নিয়ে ভাবা অনুচিত, তাও কেনো যেনো নিজেকে সামলানো যায় না।
প্রায় দশ মিনিট পরে ঘন্টা পড়লো। যেসব মেয়েরা ক্লাস করবেনা বলেছিলো, তারাই আজ ঘন্টা পড়ার সাথে সাথে বই খাতা বের করে প্রস্তুতি নিচ্ছে। আবার কেউ তো চুল, ঠোঁটের লিপস্টিক ঠিক করছে। ক্লাসের এক কোণায় বসে বেঞ্চে হেলান দিয়ে সেগুলো অবলোকন করতে লাগলো আর্শিয়া। বিরক্তিতে চোখ-মুখ বিকৃত করে অন্যদিকে তাকালো। এসব আদিখ্যেতা দেখলে বমি পায় তার।
সোভাম ক্লাসরুমে ঢোকার সাথে সাথে সকলে উঠে দাঁড়ালো। পরবর্তীতে টিচারের ইশারা পেয়ে আবার বসলো। তবে প্রেমা বসতে পারলো না। অবাক চিত্তে হা হয়ে তাকিয়ে রইলো সোভামের দিকে। মুখ দিয়ে অস্ফুটস্বরে বললো,
– আ প নি এখানে??
ক্লাসের সবাই চমকে গেলো। প্রেমা কি তাদের নতুন স্যার কে চেনে? এতো স্মার্ট, ইয়াং স্যারের সাথে কি প্রেমার আগে থেকেই পরিচয়? কি সম্পর্ক তাদের? ভেবেই কয়েকজনের মন খারাপ হয়ে গেলো। সোভাম নিজেও ভড়কে গেছে। কে এই মেয়ে? সে কি তাকে চেনে? কি এক অসস্তিকর সম্বোধন। বলল,
– দাঁড়িয়ে আছো কেনো? বোসো!
সোভামের গম্ভীর আওয়াজে তড়িঘড়ি করে বসে পড়লো প্রেমা। লজ্জা লাগছে ভীষণ। ক্লাসের সকলের সামনে তার বোকা বোকা প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়েই বসিয়ে দিয়েছে। ইশশ! কেনো যে এই প্রশ্ন করতে গেলো! মাথা নিচু করে বসে রইলো বইয়ের দিকে তাকিয়ে। সোভাম পুরো ক্লাসে একবার চোখ বোলালো। এরপর গম্ভীর আওয়াজে বললো,
– ফার্স্ট ইয়ারে যখন ক্লাস নিচ্ছিলাম, তখন কে কে উঁকি মারছিলে? দাঁড়াও।
ঘাবড়ে গেলো সেসব মেয়েরা। একজন অন্যজনের দিকে চোখাচোখি করতে লাগলো। শেষে কেউই ভয়ে আর দাঁড়ালো না। কয়েকটা ছেলে পিঞ্চ মেরে হেঁসে বললো,
– স্যার, ওরা আপনাকে দেখছিলো।
এটেন্ডেন্স শিট খুললো সোভাম। তারিখ ও সিগনেচার দিয়ে না তাকিয়েই বললো,
– তোমরা বিরক্ত করেছো আমায়। ক্লাস নিতে অসুবিধে হচ্ছিলো। এই প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে সিনিয়র তোমরা। একটু ম্যাচিয়্যুর হও। এরকম অসস্তিকর ঘটনা তোমাদের দিয়ে দ্বিতীয়বার ঘটবে, এটা আশা করছি না আমি।
পুরো ক্লাসরুম নিরব। সোভাম রোল ডাকলো সকলের। দ্বাদশ শ্রেণীতে প্রায় আড়াইশো স্টুডেন্ট। সকলের রোল ডাকা শেষ হলে শিট বন্ধ করে বই বের করলো। এরইমধ্যে পেছনের সারি থেকে অলসতা নিয়ে দাঁড়ালো আর্শি। কিছু না বলেই আঁড়চোখে তাকিয়ে রইলো অন্যদিকে। সোভাম তা দেখলো, ভ্রুঁ কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
– তোমার কি সমস্যা?
– স্যার, আমার রোল একশো উনিশ।
– সম্ভবত এই রোল আমি তিনবার ডেকেছি। তখন কেনো বলো নি? কোথায় ছিলে?
আর্শি ভাবলেশহীন ভাবে জবাব দেয়, – এখানেই।
বিরক্তির চরম পর্যায়ে পৌছে গেলো সোভাম। ধমক দিয়ে বলল,
– শাট আপ!
পুরো ক্লাসরুমে প্রতিধ্বনিত হলো সেই ধমক। কেঁপে উঠলো আর্শি । সহপাঠীরাও হতবাক। এর আগে কখনোই কোনো টিচার আর্শিকে শাসন করেনি। যদিও মহিব্বুল্লাহ স্যার একবার ধমক মেরেছিলেন। কিন্তু পরের মাসেই অলৌকিক ভাবে তার বদলি হয়ে যায়। যদিও ক্ষমতার দাপট বুঝতে কারোরই দেরি হয় না। সেজন্যই আর্শির থেকে অনেকটা দুরত্ব নিয়ে চলাফেরা করে সবাই। তবে প্রেমার বেলায় তা উলটো।
প্রথম দিনেই এভাবে কন্ট্রোল হারানো উচিত নয়। সোভাম নিজেকে সামলালো। আর্শির দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বললো,
– ক্লাস শেষে টিচার্স রুমে গিয়ে আমায় মনে করিয়ে দেবে। এখন ক্লাস করো।
সে পাঠ শুরু করলো। কিন্তু পাঁচ মিনিটের মধ্যেই পুণরায় বাঁধা পেলো। পেছনের বেঞ্চ থেকে চাপা কথার আওয়াজ আসছে। তাদের সাইলেন্ট হতে বললে, আর্শি ব্যাগ নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। মুখভঙ্গি স্বাভাবিক থাকলেও চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। কোনো রকম সময় ব্যয় না করে গটগট পায়ে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে। টিচারের পারমিশন টুকুও নেওয়ার প্রয়োজন মনে করলো না।
সোভাম বিপাকে পড়ে গেলো। মেয়েটা কি লজ্জা পেয়ে কেঁদে দিয়েছে? ইশশ! তার আরেকটু ধৈর্য্য রাখা প্রয়োজন ছিলো। থম মেরে দরজার দিকে তাকিয়ে রইলো। সামনের বেঞ্চ থেকে তোহা উঠে দাঁড়ায়। বলে,
– স্যার, ওর কথা ভাববেন না। ও এমনই, যখন ইচ্ছে হয় ক্লাস করে, আবার চলে যায়। স্যার রা কেউ কিছু বলে না। এমপির মেয়ে তো……
চমকে উঠলো সোভাম। কিন্তু প্রশ্ন করতে পারলো না। শিক্ষক হিসেবে এতোটা কৌতূহল তার থাকা উচিত না। এমনিতেই আজ প্রথম ক্লাস। সকল চিন্তা-ভাবনাকে সরিয়ে সে ক্লাসে মনোযোগী হলো।
একটানা পয়তাল্লিশ মিনিট ক্লাস চললো। ঘন্টা পড়লে শিট হাতে ক্লাসের বাইরে বেরিয়ে গেলো সোভাম। তড়িৎ গতিতে বেঞ্চ থেকে নেমে তার পেছনে ছুটলো প্রেমা। কিছুটা কাছে গিয়ে পেছন থেকে ডেকে উঠলো,
– সোভাম স্যার!!
পেছনে তাকালো সোভাম। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ভ্রুঁ কুঁচকাতেই হেসে দিলো প্রেমা। আনন্দে গদগদ হয়ে বললো,
– স্যার, আমি আপনাকে চিনি। আপনার অনলাইন ফ্রি ব্যাচের স্টুডেন্ট ছিলাম। আইডির নাম প্রেমা শিকদার, অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতাম। চিনেছেন?
– আচ্ছা!
ছোট্ট এ শব্দটুকু বলে টিচার্স রুমের দিকে এগিয়ে গেলো সোভাম। প্রেমার হাস্যজ্জ্বল এলিয়ে রাখা ঠোঁট দুটো ধীরে ধীরে কুঁচকে তেতো হয়ে গেলো। ‘আচ্ছা! শুধুই আচ্ছা! আর কিছুই বললো না? একটা হাসিও দিলো না। কিন্তু কেনো? প্রেমা ফ্রি তে পড়েছে তাই? সোভাম স্যার কি পেইড স্টুডেন্টদের সাথে কথা বলেন। নাকি এমনই! কই লাইভে তো মাঝে মধ্যেই দাঁত ক্যালাতেন। তাহলে তার সাথে এমন করলো কেনো?
রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৬
তোহারা পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। নিশ্চয়ই সব দেখে নিয়েছে। উফফফ! রাগ লাগলো প্রেমার। মনে মনে বেজায় ক্ষিপ্ত হয়ে বলল,,
– এটিটিউট! যেনো আমি প্রপোজ করতে এসেছি। করবোনা তোর ছাতার মাথার ক্লাস। আজকে গিয়েই পেইজ আনফলো করে দিবো।
