Home রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ২০

রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ২০

রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ২০
রিক্তা ইসলাম মায়া

মায়ার প্রেগন্যান্সির জন্য রিদ দোতলা থেকে নিচ তলায় শিফট হয়েছিল মায়ার কনসিভ করার সাথে সাথেই। রিদ গটা করে মুখে আজও প্রকাশ করেনি তার বাবা হওয়ার অনুভূতি কি? সে বাবা হওয়াতে দুঃখ পেয়েছে নাকি খুশি হয়েছে? রিদের গম্ভীর চলাফেরার মাঝেও বোঝা মুশকিল রিদের অনুভূতি সম্পর্কে। মায়ার প্রেগন্যান্সিজনিত মুড সুইংয়ের ব্যাপারেও রিদকে হুটহাট রেগে যেতে দেখা যায়। খান বাড়ির সবাই বলে মায়া একা প্রেগন্যান্ট হয়নি মায়ার সাথে সাথে রিদও হয়েছে। তার কারণ মায়ার প্রেগন্যান্সির অবস্থায় যতটুকু না মুড সুইং হয় তার থেকে দ্বিগুণ মুড সুইং হতে রিদের দেখা যায়। এই ভালো তো এই হুটহাট রিদ মায়ার উপর রেগে যাচ্ছে। কাজে উনিশ থেকে বিশ হলেই আসিফের উপর, অফিসের স্টাফদের উপর, ম্যানেজারের উপর নয়তো খান বাড়ির কাজের মানুষের উপর রিদ রেগে যায়। রিদ মায়াকে নিয়ে অতিরিক্ত টেনশনে থাকে বলেই রিদের মেজাজে পরিবর্তন এসেছে। রিদ খান এমনই ঘাড় ত্যাড়া ঘাউরা মানুষ। বউয়ের প্রেগন্যান্সির পর আরও ঘাউরা হয়েছে। কথায় কথায় ত্যাড়ামি করে। এইতো সেদিন রিদ সকালে সবার সঙ্গে বসে ডাইনিংয়ে খেয়েছে।

খাওয়ার আগে সে মায়াকে পাশে বসিয়ে আগে খাইয়ে দিয়েছে। তারপর মায়ার প্রেগন্যান্সিজনিত মেডিসিন গুলো খাইয়ে সে অফিসে গিয়েছিল। মায়ার দায়িত্ব ছিল হেনা খান, আরাফ খান আর খান বাড়ির কয়েকজন কাজের লোকের উপর। সুফিয়া খান সেদিন ঢাকায় ছিলেন না, তিনি চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন রাদিফ, নিহাল খানের সঙ্গে দেখা করতে। মায়ার প্রেগন্যান্সির জন্য সুফিয়া খান নিহাল খান আর রাদিফকে একা করে ঢাকায় শিফট হয়েছেন আরাফ খান আর হেনা খানকে নিয়ে। সেজন্য তিনি মাঝেমধ্যে চট্টগ্রামে যান নিহাল খান আর রাদিফের সঙ্গে কয়েকদিন থাকতে। সেবারও তিনি তাই গিয়েছিলেন। সুফিয়া খানের অনুপস্থিতিতে মায়া ফ্রিজ থেকে আমের আচার খুলে কিছুটা আমের আচার খেয়েছে। দুপুরে ভাত খায়নি। আমের আচার খাওয়ায় সন্ধ্যায় মায়ার ভীষণ রকমের পেটে ব্যথা হয়। রিদের ভয়ে মায়া পেটে ব্যথা দাঁত কামড়ে সহ্য করে রুমের দরজা লাগিয়ে ছটফট করতে থাকে। মায়ার তখন আট মাস প্রেগন্যান্সির চলে। এই অবস্থায় গর্ভবতী মেয়েদের পেটে ব্যথা মা ও বাচ্চার জন্য রিস্ক। এর মাঝে আচার খাওয়ার ফলে দুপুর থেকেই মায়ার পেট খারাপ করেছে। ডায়েরিয়া,ঘনঘন বাথরুমে যাচ্ছে। মায়ার উঁচু পেটটা নিয়ে বারবার বাথরুমে চলাচল করা মুশকিল, তারপরও মায়া রিদকে নিজের সমস্যার কথা বলে না। মায়া কনসিভ করার পর থেকে রিদ রাত নয়টার ভেতরে বাড়ি আসার চেষ্টা করে। যতই কাজ থাকুক সবকিছু ফেলে রিদ চলে আসে মায়ার চিন্তায়। এমন না মায়া রিদকে ঠেঙ্গিয়ে চলে। রিদ যা বলে তাই শুনে মায়া। কিন্তু তারপরও মাঝেমধ্যে মায়ার ভুল হয়ে গেলে নিস্তার নেই।

এই যে মায়ার একটু করে আমের আচার খেতে মন চেয়েছিল বলে সে খেয়েছে। মায়া জানতো না মায়ার একটু আমের আচার খাওয়াতে এমন জীবন-মরণ সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। মায়া দরজা খুলে করিডোরে এসে দাঁড়ায়। ভীষণ অশান্তি আর পেটে ব্যথা করছে মায়া। মায়া উঁচু পেটটায় আদুরে হাত বুলিয়ে বাচ্চাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে আর নীরবে কাঁদছে। মায়া বুঝতে পারেনি আচার খেলে এমন জটিল অবস্থা হবে ওর। মায়া এই মূহুর্তে কাউকে বলতেও ভয় পাচ্ছে। রিদ এসে নিশ্চয়ই মায়াকে বকবে? মায়া ভয়ে আবার ঘরে চলে যায়। আল্লাহ আল্লাহ করে পেট ব্যথা ভালো হয়ে যেতে। মায়ার গায়ে একটা সুতির গাউন পরা। এই গাউনগুলো সুফিয়া খান এনে দেন মায়ার প্রেগন্যান্সিতে পরার জন্য। মায়া গায়ের ওড়নাটা টেনে ফ্লোরে ফেলে দেয় অস্বস্তিতে। পেট বারবার মোচড় দিয়ে উঠছে। মায়া অবশেষে না পেরে রিদকে কল দেয়। রিদের ফোন আসিফের কাছে ছিল। আসিফ মায়ার কল রিসিভ করতেই মায়া ‘হ্যালো’ বলে। আসিফ সালাম দিয়ে বলে…

‘আসসালামু আলাইকুম ভাবী। আমি আসিফ।
মায়া কাঁদছে। কণ্ঠ বসে গেছে কান্নায়। মায়া নীরবে কেঁদে বলে…
‘উনি কোথায়?
‘ভাই মিটিংয়ে ভাবী।
‘উনাকে দিন।
মায়া কাঁদছে বিষয়টা আসিফ ঠাহর করতে পেরে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে…
‘কি হয়েছে ভাবী কাঁদছেন কেন?
মায়া আসিফকে কিছু বলে না। মায়ার কান্না আরও বাড়ে আসিফ জিজ্ঞাসা করাতে। মায়া ডুকরে কেঁদে বলে…
‘আপনার ভাইকে ফোনটা দিন।
আসিফ আর কিছু বলার সাহস পেল না। মায়া কাঁদছে, তারমানে সিরিয়াস কিছু একটা হয়েছে। আসিফ উদ্বিগ্নতায় দরজা ঠেলে তৎক্ষণাৎ রিদের কেবিনে প্রবেশ করতেই কয়েক জোড়া বিরক্ত চোখের সম্মুখীন হয়। রিদ চারজনকে নিয়ে একটা বিশেষ মিটিংয়ে বসেছিল নিজের কেবিনে। গোপনীয় বৈঠক হওয়ায় সেই আলোচনায় আসিফেরও উপস্থিতি নিষেধ ছিল। সেজন্য আসিফ রিদের ফোন নিয়ে রিদের কেবিনের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। মায়ার ফোন আসাতে সে রিদের কথা অমান্য করে কেবিনে ঢুকে পড়ে। রিদের সঙ্গে উপস্থিত ক্লায়েন্টগুলো আসিফের বিনানুমতিতে প্রবেশ করার ব্যাপারটা অসন্তুষ্ট হয়েছে, সেটা তাদের মুখমণ্ডল দেখেই বোঝা যাচ্ছে। রিদ কিছু বলবে তার আগেই আসিফ উদ্বিগ্নতায় রিদের ফোনটা রিদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে…

‘ভাই ভাবী কল দিয়েছে।
রিদ ফোনটা হাতে না নিয়ে আসিফকে চলে যেতে বলে…
‘পরে কথা বলব। তুই যা।
আসিফ আগের ন্যায় উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে…
‘ভাই ভাবী কাঁদছে। ইট’স ইমার্জেন্সি।
আসিফের এতটুকু কথাই যথেষ্ট ছিল। রিদ আসিফের থেকে ফোনটা ছিনিয়ে নেওয়ার মতো করে কেড়ে নিয়ে কানে ধরে ব্যস্ত কণ্ঠে, ‘হ্যালো’ বলতে মায়া রিদের কণ্ঠ পেয়ে শব্দ করে কাঁদতে থাকে। মায়ার কান্নায় রিদ বিচলিত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ায়। উদ্বিগ্নতায় বলে…
‘কি হয়েছে জান? কাঁদছো কেন?
‘আমার ভীষণ পেটে ব্যথা করছে। আপনি তাড়াতাড়ি বাড়িতে আসুন।

মায়ার এতটুকু কথা যথেষ্ট ছিল। রিদ পাগল পাগল হয়ে ক্লায়েন্ট মিটিং, অফিস সবকিছু ফেলে বাড়িতে দৌড়ে আসে। বাড়িতে এসে দেখে মায়া অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। মায়ার মাথায় পানি ঢালছে হেনা খান আর কাজের লোকজন মিলে। হেনা খান মায়াকে ডাকতে এসেছিল। এসেই দেখে মায়া পেটে হাত বোলাচ্ছে আর কাঁদছে। মায়াকে কাঁদতে দেখে হেনা খান বিচলিত হয়ে মায়াকে জিজ্ঞাসা করে মায়ার কিছু হয়েছে জানতে। মায়া হেনা খানকে জানায় মায়ার পেট খারাপ করেছে সাথে পেটে ব্যথাও করছে। প্রেগন্যান্ট মেয়েদের পেট খারাপ করা মানে রিস্ক। হেনা খান আরাফ খান আর কাজের লোকজনদের ডাকতে ডাকতে মায়া ততক্ষণে জ্ঞান হারিয়ে পড়তে নিলে হেনা খান ঝাপটে ধরে ফ্লোরে বসে যান। হেনা খান সবাইকে কল করে মায়ার শারীরিক কন্ডিশন জানায়। সুফিয়া খান মায়ার খবর শুনে রাদিফ আর নিহাল খানকে নিয়ে ঢাকার জন্য রওনা হয়েছেন। জুঁইয়ের বাচ্চা হয়েছে সবে এক মাস হলো। সেজন্য জুঁই আসতে পারেনি। তবে আয়ন হসপিটালে মায়ার জন্য কেবিন বুকিং করেছে বলে জানায়। রিদ মায়াকে অজ্ঞান অবস্থায় দেখে পাগল পাগল হয়ে দৌড়ে এসে মায়াকে কোলে নিয়ে পুনরায় বাইরের পথে দৌড়ায়। আসিফ গাড়ি বের করে রাখে। মায়াকে হসপিটালে নেওয়া হলে ডাক্তার মায়ার কন্ডিশন দেখে সবাইকে দোষারোপ করে। মায়ের গর্ভে বাচ্চা প্রায় অনেকক্ষণ ধরে মায়ের ব্যথা সয়েছে।

রিপোর্টে এসেছে ঘণ্টা তিনেকের বেশি সময় হবে বাচ্চা মায়ের পেটে ব্যথা সহ্য করেছে। সাথে মায়ার ডায়রিয়ার জন্য, ঘনঘন বাথরুমে যাওয়া-আসার ফলে যেকোনো সময় বাচ্চা মাতৃগর্ভ থেকে বেরিয়ে যেতে পারতো যদি একটু অসাবধানতা হতো। একজন গর্ভবতী মেয়ের এই অবস্থা হওয়ার পরও কেন মেয়েটিকে ঘন্টার পর ঘন্টা বাসায় রাখা হয়েছে সেই নিয়ে ডাক্তার মহিলাটি হেনা খান, আরাফ খানকে যাতা বলে দোষ দিচ্ছে। হসপিটালে উপস্থিত সবাই ভয়ে ভয়ে রিদের দিকে তাকাচ্ছে। রিদ মাথা নত করে করিডোরে একটা চেয়ারে বসে। সে ডাক্তারের কথা সবকিছু শুনে স্তব্ধের ন্যায় বসে। কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না। এতক্ষণ রিদের হাতের আঙুলগুলো অনবরত কাঁপতে দেখা গিয়েছিল, এখন খানিকটা শীতল ভঙ্গিতে বসে। আসিফ রিদের থেকে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে রিদের কোট নিয়ে। আসিফের পাশাপাশি হেনা খান, আরাফ খান, আয়ন দাঁড়িয়ে। মায়া প্রেগন্যান্ট হওয়ার পর থেকে রিদ খুব সতর্কতা অবলম্বন করে মায়ার ব্যাপারে। মায়ার জন্য দোতলা থেকে নিচ তলায় শিফট হয়েছে। মায়া হাঁটলে যদি টাইলসের ঘরে পা পিছলে যায় সেজন্য রিদ পুরো খান বাড়িতে কার্পেট বিছিয়েছে মায়ার জন্য। রান্নাঘর, বাথরুম কোথাও বাদ রাখেনি। দুটো কাজের মেয়ে মায়ার সুবিধা-অসুবিধার জন্য আলাদাভাবে রাখা হয়েছে, সবাই যেন শুধু মায়ার খেয়াল রাখে। এত কিছুর পরও দুই দিন পরপর মায়ার একটা একটা সমস্যা হয়ে যায়। আজ একটুর জন্য রিদের জান বেরিয়ে যাচ্ছিল। রিদের মনে হচ্ছিল রিদ অতিরিক্ত টেনশনে সেও জ্ঞান হারাবে। রিদের একটা মাত্র বউ। এই বউটার কিছু হলে তার মাথা ঠিক থাকে না। পাগল হয়ে যায়। আরাফ খান রিদকে চুপ থাকতে দেখে বকবক করা ডাক্তার মহিলাকে বলে…

‘আচ্ছা হয়েছে, শুনেছি আপনার কথা। এবার আপনি এখন যান।
ডক্টর রেবা রেগে যান আরাফ খানের কথায়। ডক্টর রেবা মনে করেন পেশেন্ট মায়া তার শ্বশুরবাড়িতে অবহেলিত বউ বলেই কেউ এখন ডক্টর রেবার কথা শুনতে চাচ্ছে না। আজ সবার অসাবধানতার জন্য পেশেন্ট আর পেশেন্টের বাচ্চাটা একটুর জন্য বড় ধরনের বিপদের হাত থেকে বেঁচে গেছে। ডক্টর রেবা রেগেমেগে আরাফ খানকে বলে…
‘আজ আপনাদের অবহেলার জন্য পেশেন্ট মরতে বসেছিল। আপনারা পেশেন্টকে কি খেতে দিয়েছিলেন যে রোগীর ডায়রিয়া হলো? আপনি জানেন পেশেন্টের এই অবস্থায় ডায়রিয়া হওয়া মানে বাচ্চাটা মরতে পারতো।
আরাফ খান ভয়ে বারবার চেয়ারে নত মস্তকে বসা রিদের দিকে তাকাচ্ছে। শুধু আরাফ খান নয়, উপস্থিত সকলেই ভয়ে রিদের দিকে তাকাচ্ছে। ডক্টর রেবার কথায় এখন যদি রিদ রেগে যায় তাহলে রিদকে শান্ত করা মুশকিল হয়ে যাবে। রেগে হোক, আর যেভাবেই হোক। রিদ যখন শান্ত বসে আছে তাহলে শান্তই বসে থাকুক না? এটা সেটা বলে রিদকে রাগাবার কোনো দরকার নেই। আরাফ খান বিরক্তির কণ্ঠে আয়নকে বলে…
‘আয়ন এই ডাক্তানিরে নিয়ে যাতো ভাই। কান খারাপ করে দিচ্ছে এই ডাক্তারনি। এমনই এতো অশান্তি আর ভালো লাগছে না।

আরাফ খানের কথায় ডক্টর রেবা রেগে কিছু বলবেন, তার আগেই আয়ন এগিয়ে এসে ডক্টর রেবাকে বুঝিয়ে অন্য দিকে চলে যায়। আরাফ খান স্বস্তির শ্বাস ফেলে। রিদ ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই জায়গায় একই ভঙ্গিতে থমকে বসে। জায়গা থেকে নড়ছে না পর্যন্ত। আরাফ খান, হেনা খান বৃদ্ধ মানুষ হওয়ায় বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, অসুস্থ হয়ে যায়। সেজন্য আয়ন তাদের খান বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। আয়ন ডিউটি শেষ করে রাত এগারোটার দিকে বাসায় চলে যায়। রাতে আয়নের ডিউটি থাকে না। দিনে থাকে। আবার সন্ধ্যা ছয়টায় শেষ হয়ে যায়। মায়ার অসুস্থতার জন্য আয়নের আজ বাসায় যেতে লেট হয়। আয়ন জুঁইয়ের ছেলে হয়েছে একমাস পাঁচ দিন। আয়ন যথাসম্ভব চেষ্টা করে বউ-বাচ্চাকে সময় দিতে। আয়নের অসুবিধার বিষয়টা খেয়াল রেখে আসিফ আয়নকেও চলে যেতে বলে। আয়ন চলে যেতে আসিফ রিদের পাশে থাকে হসপিটালে। রিদ বারোটার দিকে উঠে দাঁড়ায়। চোখ-মুখ লাল হয়ে আছে। ক্লান্তি, টেনশন সবকিছু মিলিয়ে রিদের মুখশ্রী লাল হয়ে আছে। রিদ মায়ার কেবিনে প্রবেশ করতে করতে আসিফকে বলে…
‘তুই বাড়ি চলে যা আসিফ। কাল সকালে আসিস।

রিদ আসিফকে কিছু বলতে না দিয়ে মায়ার কেবিনে চলে যায়। প্রথমে রিদকে ছেড়ে যেতে চায়নি আসিফ, আবার কি মনে করে নিচে যায়। রিদ মায়ার কেবিনে ঢুকে দেখতে পায় মায়া ঘুমিয়ে আছে। মায়ার এক হাতে স্যালাইন চলছে। রিদ একটা টুল টেনে মায়ার বেডের পাশে বসে। মায়ার খালি হাতটা চেপে কপাল ঠেকিয়ে নিশ্চুপ বসে রইল। তার কিছুক্ষণ পর আসিফ মায়ার কেবিনের দরজায় নক করে প্রবেশ করে রিদের জন্য খাবার নিয়ে। রিদ না খেয়ে থাকলে প্রেশার ফল করে। আসিফ রিদের খাবারগুলো কেবিনে থাকা টেবিলের উপর রাখতে রাখতে বলে…
‘ভাই আপনার খাবারগুলো রেখে গেলাম, খেয়ে নিয়েন।
রিদ কিছু বলে না, নিশ্চুপ আগের ন্যায় বসে থাকে। আসিফ ফের বলে…
‘ভাই আপনার জন্য কাপড় নিয়ে আসব? গোসল করবেন এখানে?
রিদ অফিসের পোশাক পরে বসে। গোসল কিংবা ফ্রেশ হওয়ার সময় পায়নি। অফিস থেকে বেরোনোর পথে শার্টের হাতা দুটো টেনে কনুই অবধি গুটিয়েছিল, সেই গোটানো হাতা দুটো এখনো তাই রয়েছে। গলার টাই আর কালো কোটটা আসিফের কাছে দেওয়া। রিদ নিরস ভঙ্গিতে ছোট উত্তর দিয়ে বলে…

‘ওকে।
আসিফ চলে যায় খান বাড়িতে। খাওয়া-দাওয়া, গোসল শেষ করে আসিফ রিদের জন্য কাপড় নিয়ে রাত তিনটায় ফের ফিরে আসে হসপিটালে। কিন্তু কেবিনের দরজায় দুবার নক করেও ঢোকার সাহস পায়নি, কেবিনের ভিতর থেকে রিদের সাড়াশব্দ পায়নি বলে। মায়ার জ্ঞান ফিরে ভোর চারটার দিকে। মায়ার স্যালাইন করা হাতটা টনটন ব্যথা করছে। মায়ার স্যালাইন প্রায় শেষ, তার জন্য স্যালাইনের পাইপ বেয়ে রক্ত উঠছে। মায়া নড়াচড়া করে হাত টান দিতে রিদ চট করে উঠে বসে। মায়া স্যালাইনের হাতটা বারবার নাড়াচ্ছে দেখে রিদ সেদিকে তাকিয়ে মায়ার অসুবিধা বুঝতে পেরে তৎক্ষণাৎ মায়ার বাম হাত থেকে স্যালাইনের সুই টেনে বের করে। মায়া চোখ মেলে তাকায়। রিদ মায়ার হাতের স্যালাইনের সুই টেনে বের করছে দেখে মায়া ঘাবড়ে গিয়ে বলে…
‘কি হয়েছে? আপনি আমার হাতে সুই ঢোকাচ্ছেন কেন?
মায়া রিদের থেকে হাতটা টেনে নিতে চাইলে রিদ ফের মায়ার হাতটা টেনে ধরে। মায়া হাতটা রিদের থেকে ছাড়াতে মোচড়ামুচড়ি করে। রিদ মায়ার সুই করা জায়গাটায় বৃদ্ধাঙ্গুলেই কয়েকবার ঘষে ছেড়ে দেয়। মায়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মনে পড়ে সে কি কারণে হসপিটালে এসেছিল। মায়া পেটে হাত রাখে বাচ্চাটাকে সুস্থ দেখে স্বস্তির শ্বাস ফেলে। তবে
রিদের ভয়ে মায়া নিজের হয়ে সাফাই দিয়ে বলে…

‘আমিতো একটু করে আমের আচার খেয়েছিলাম মাত্র। কিন্তু এর জন্য যে আমার পেট খারাপ করবে আবার পেটে ব্যথাও হবে আমি বুঝতে পারিনি।
রিদ মায়ার কথায় মায়ার দিকে তাকাচ্ছে না পযন্ত আর না উত্তর দিচ্ছে। রিদ নিশ্চুপ নিজের কাজ করছে। স্যালাইনের নল বেয়ে ওঠা পাইপটা রিদ সরিয়ে রাখছে। মায়া রিদকে উত্তর করতে না দেখে মায়া ফের বলে…
‘সরি। আমি আসলে ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু করিনি। ভুলবশত হয়েছে সবকিছু।
রিদ তাও কথা বলে না। কেমন গম্ভীর আর নিশ্চুপ। মায়া রিদের গম্ভীর নিশ্চুপতাকে ভয় পায়। মায়া রিদের হাত টেনে বলে…
‘সরি বলছি তো। কথা বলছেন না কেন?

রিদ মায়ার হাতটা ঝাঁকিয়ে ফেলে দিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে যায়। মায়া অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে রিদের চলে যাওয়ার দিকে। রিদ মায়ার কাছে আর আসে না। নার্স মায়ার খেয়াল রাখে। ভোর পাঁচটার দিকে চট্টগ্রাম থেকে সুফিয়া খান, নিহাল খান, রাদিফ মায়ার সঙ্গে দেখা করতে আসে। তাঁরা মায়াকে হসপিটাল থেকে রিলিজ করে বারোটার দিকে বাসায় নিয়ে যায়। খান বাড়িতে ফিরে মায়া হেনা খানের মুখে নিজের শারীরিক কন্ডিশনের কথা শুনে আঁতকে ওঠে। আর একটু হলে নিজের সন্তানকে হারাতে পারতো মায়া। ভয়ে মায়ার চোখে পানি চলে আসে। মায়া বাচ্চামো করে আমের আচার খেয়েছে বিষয়টা এমন নয়। গর্ভবতী অবস্থায় মেয়েদের অনেক কিছুই খেতে মন চায়। বেশ কিছুদিন ধরে মায়ার আমের আচার খেতে মন চাচ্ছিল। কিন্তু সুফিয়া খান মায়াকে খেতে দিত না বলে সুফিয়া খানের অনুপস্থিতিতে মায়া একটু করে আমের আচার খেয়েছিল। বেশি খায়নি, এতেই মায়ার মরণদশা হয়ে গিয়েছিল। সবচেয়ে বড় বোকামি হচ্ছে মায়ার রিদের ভয়ে কাউকে কিছু না জানানোটা। হেনা খানকে অন্তত মায়ার শারীরিক কন্ডিশনের ব্যাপারটা জানালে আজ এতটা রিস্কে যেত না বিষয়টা। মায়া আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে এই যাত্রায় মায়ার ও মায়ার সন্তানের জীবন বাঁচানোর জন্য। কিন্তু সেদিন হতে রিদ আর মায়ার সঙ্গে কথা বলে না। আবার মায়াকে এড়িয়েও চলে না।

মানে রিদ মায়ার খেয়ালও রাখে আবার কথাও বলে না। রিদ মায়ার সঙ্গে ঠান্ডা শীতল ব্যবহার করে। মায়ার খাওয়া-দাওয়া, ওষুধ সেবন সবকিছু রিদ নিজের হাতে করে। ওইদিনের ঘটনার পর রিদ সন্ধ্যা সাতটায় বাসায় উপস্থিত থাকে। মায়ার ডেলিভারির ডেট এগিয়ে আসছে। আর কিছুদিন বাকি। ডাক্তার বলেছে যেকোনো সময় মায়ার লেবার পেইন হতে পারে, সেজন্য রিদ মায়াকে নিয়ে রিস্ক না নিয়ে সে যতটা সম্ভব পারে বাসায় থাকার চেষ্টা করে। ডাক্তার বলেছে মায়ার ছেলে হবে। ছেলে হওয়ার খুশিতে মায়ার সে কি আনন্দ উল্লাস চোখ-মুখে স্পষ্ট। তবে এই সংবাদটাতেও রিদের মায়াকে নিয়ে তেমন প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। শুধু একটা প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল। রিদ যখন এই খবরটা শুনে মায়ার হাসোজ্জ্বল মুখটার দিকে কয়েক পলক স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল, ব্যস এটুকুই ছিল রিদের বিশেষ প্রতিক্রিয়া। এরপর আর তেমন কোনো হেলদোল দেখা যায়নি।

রাত আটটা পাঁচ মিনিট। রিদ ঘরে বসে ল্যাপটপে কাজ করছে। মায়া বসার ঘর থেকে ঘরে ঢুকেই এসির পাওয়ার বাড়িয়ে দেয়, ফ্রিজ খুলে ঠান্ডা স্পিড ক্যানের বোতল হাতে নিতেই রিদের সাথে চোখাচোখি হয় মূহুর্তে। রিদকে ঘরে দেখে মায়া থমথমে খেয়ে যায়। মায়া রিদকে ঘরে খেয়াল করেনি। এতক্ষণ সুফিয়া খান, হেনা খান, রাদিফ, নিহাল খানের সঙ্গে মায়া খান বাড়ির বাগানে হাঁটাহাঁটি করছিল। যার জন্য গরমে মায়ার শরীর ঘেমে গেছে, বড্ড পানি তৃষ্ণাও পেয়েছিল। রিদ যে আজকাল সন্ধ্যা সাতটায় তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসে এটা মায়ার মনে ছিল না। রিদ মায়ার হাতের ঠান্ডা ক্যানের দিকে তাকিয়ে আছে। মায়া বোকা হেসে মিথ্যা সাফাই দিয়ে বলে…
‘এটা আমার জন্য নাতো। দাদাভাই খাবে বলল। তাই নিচ্ছিলাম আরকি।
আরাফ খান সারাজীবনেও অল্প ঠান্ডা জাতীয় কিছু খায় না। সেই আরাফ খান আজ গর্ভবতী মায়াকে পাঠিয়ে নিজের জন্য স্পিড ক্যানের বোতল নিবে সেটাও রিদকে বিশ্বাস করতে হবে? রিদ যে মায়ার কথাটা বিশ্বাস করেনি সেটা রিদের কুঁচকানো কপাল দেখেই বোঝা গেল। মায়া স্পিড ক্যানের বোতলটা পুনরায় ফ্রিজে রেখে ঠান্ডা পানি হাতে নিতেই রিদ ঠাস করে উঠে দাঁড়ায়। রিদকে রেগেমেগে উঠে দাঁড়াতে দেখে মায়াও তৎপর করে তৎক্ষনাৎ হাতের ঠান্ডা পানির বোতলটা ফ্রিজে রেখে দিয়ে ফ্রিজ বন্ধ করে দিয়ে মায়া ব্যস্ত কণ্ঠে বলে….

‘রেখে দিয়েছি। রেখে দিয়েছি। আমি ঠান্ডা পানি খাওয়া জন্য ধরেনি তো, এমনই ধরেছিলাম। সত্যি বলছি।
রিদ সোফার টেবিলের উপর রাখা পানির মগ থেকে পানি ঢালে গ্লাসে। সেই গ্লাসটা মায়ার হাতে দেয় পান করতে। মায়া রিদের ভয়ে বাধ্য হয়ে নরমাল পানিটা পান করে। মায়া কনসিভ করার পর থেকে ঠান্ডা পানি পান করতে পারে না। মাঝেমধ্যে মায়ার রুহ বের হয়ে যায় একটু ঠান্ডা পানি পান করার জন্য, অথচ কেউ একটু ঠান্ডা পানি খেতে দেয় না। রিদ মায়ার বাড়িয়ে দেওয়া এসির পাওয়ারটা ফের কমিয়ে দেয়। মায়া গরম লাগলেও রিদের ভয়ে সহ্য করতে হয়। মায়ার কনসিভ করার পর থেকে সবাই খালি মায়াকে বাধা দেয়। মায়া এটা করো না, ওটা করো না। এটা খাওয়া যাবে না, ওটা খাওয়া যাবে না। আস্তে হাঁটো। জোরে হাঁটা যাবে না। এসির নিচে থাকা যাবে না। ঠান্ডা পানি খাওয়া যাবে না। মায়ার মাঝেমধ্যে মনে হয় এত সব নিষেধ হবে জানলে মায়া এই মূহুর্তে কখনোই কনসিভ করতো না। কত যে কষ্ট করতে হয় কনসিভ করার পর। যে কনসিভ করে সে বোঝে। মায়া মাঝেমধ্যে উঁচু পেটটার দিকে তাকিয়ে আবার শান্ত হয়ে যায়। নিজের সন্তানকে হাতে নিলে মনে হয় মায়ার সব দুঃখ-কষ্ট তখন শেষ হয়ে যাবে।
হঠাৎ ঘুমের মাঝে মায়া ছটফট করে রিদের বুকে খামচে ধরে। রিদ মায়াকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে ছিল হঠাৎ মায়ার আক্রমণে তৎক্ষণাৎ উঠে বসে। মায়া পায়ের ব্যথায় কাঁদছে। মায়ার প্রেগ্ন্যাসির নয় মাস চলছে। সেজন্য শরীরে পানি জমেছে। বিশেষ করে মায়ার পায়ের দুটো পাতায় পানি জমেছে বেশ। মধ্যরাতে মায়াকে কাঁদতে দেখে রিদ ঘাবড়ে যায়। রিদ মনে করেছিল মায়ার লেবার পেইন শুরু হয়েছে। রিদ মায়াকে আঁকড়ে ধরে উত্তেজিত হয়ে বলে…

‘কি হয়েছে জান? পেটে ব্যথা করছে?
‘ না, পা ব্যথা করছে।
রিদ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। মায়ার সাথে রাগ ফেলে রিদ কথা বলে। বউয়ের সাথে যতই রাগ করে থাকুক সে, বউয়ের সামান্য কষ্টও তার কলিজায় লাগে। রিদ খানের মতো শক্তপোক্ত হৃদয়হীন মানুষ কিভাবে এমন নরম কলিজার হলো আল্লাহ জানে। বউয়ের সামান্য কষ্টই তার সহ্য হয় না। কলিজা পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। ছেহ, নষ্ট কলিজা তার। অল্পতেই পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। রিদ মায়ার গালে আসা চোখের পানি দু’হাতে মুছে মায়াকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে সে মায়ার পায়ের কাছে বসে। মায়ার পা দুটো কোলে নিয়ে আস্তেধীরে টিপে দেয় যাতে মায়া আরাম পায়। মায়া কনসিভ করার পর এমন অনেক রাত হয়েছে রিদ মায়ার পা টিপে দিয়েছে মায়ার আরামের জন্য। রিদ টিপে দেওয়াতে মায়া পায়ে আরাম পায়। রিদের দিকে তাকিয়ে মায়া বলে….

‘আপনি আমার সাথে কথা বলেন না, এতে আমার অনেক কষ্ট লাগে। আজ আপনি আমার সাথে কথা বলছেন না, আল্লাহ না করুক ডেলিভারির সময় যদি আমি আপনার সন্তানকে জন্ম দিতে গিয়ে মরে যাই, তাহলে আমাদের আর কখনোই কথা বলা হবে না নেতা সাহেব।
মায়া কথায় রিদ মায়াকে টেনে নিজের কোলে বসায়। এক হাতে মায়াকে বুকে জড়িয়ে নেয়, অপর হাতে মায়ার পা টিপে দিতে দিতে রিদ বলে…
‘হুশশ, কিছু হবে না তোমার। আমি আছি তো।
মায়া দু’হাতে রিদের গলায় জড়িয়ে বুকে মাথা রেখে নিঃশব্দে কেঁদে বলে…
‘ডেলিভারির ডেট যত এগিয়ে আসছে ততই আমার ভয় কাজ করছে। আমার খালি মনে হয় আমি মরে যাব হয়তো, আর বাঁচব না। আমি আপনাকে ছাড়া মরতে চাই না নেতা সাহেব।
মায়ার কথায় রিদ একটু করে বলে…
‘তুমি আমাকে কবরে পাঠিয়েই শান্তি পাবে রিত।

রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ১৯

বউকে নিয়ে রিদ নিজেও টেনশনে আছে। জীবনের প্রথম বেবি হবে দুজনের। রিদের প্রথম প্রথম অভিজ্ঞতা হচ্ছে মায়ার থেকে। প্রেগন্যান্সির লাস্টে মেয়েদের মন দুর্বল হবে সেটা রিদ জানে। কিন্তু রিদ জেনেও সে নিজেই দুর্বল হয়ে যাচ্ছে মায়ার কন্ডিশন দেখে। রিদ প্রথমেই বলেছিল তার এখন বেবি দরকার নেই। মায়ার অবস্থা এত খারাপ হবে জানলে সে এই বাচ্চা তখনই অ্যাবোরশন করিয়ে ফেলতো। এই বউয়ের জন্য রিদ খানের মতো শক্তপোক্ত মানুষ দিন দিন দুর্বল মনস্তত্ত্বের রূপান্তর হচ্ছে। যেটা রিদের খুবই অপছন্দনীয় কাজ। পুরুষ মানুষ হবে শক্ত লোহার মতোন, যেন ভাঙা না যায়। রিদের লোহার চেয়েও শক্ত ব্যক্তিত্বে বউ নামক দুর্বলতা ঢুকে তাকে কলঙ্কিত করে ফেলছে ক্রমশই, ছেহ।

রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ২১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here